উপন্যাস

পল্লব শাহরিয়ার

২৩ অক্টোবর, ২০২০ , ১০:১২ অপরাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৮)

(পর্ব-৮)

অনেকক্ষণ আগেই বাড়িতে আলো জ্বেলে উঠেছে। এ সময় কত কী কাজ আছে, সকলেই কিছু না কিছুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রান্নাঘর সামলাতে যায় মা, রাতুলকে পড়াতে বসায় রাত্রি। রাত্রি দূর থেক্ েচিৎকার করে বললো, বাবা, তারুলের পড়ার সময় হয়ে গেছে।

ওই লোকটি, অবাঞ্চিত একটা লোক হয়ে গেছে যে শ্রাবণ, কিছুকাল আগেও এ বাড়িতে এলে জামাই আদর পাক বা না পাক, একটা সৌজন্য দেখাতে কেউ কার্পণ্য করতো না। এখন হয়ে গেছে ্কটা বিব্রতকর শুঁয়োপোকা। ঝাটায় ডগায় তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারলেই যেন শান্তি। শুধু ওই লোকটার উপস্থিতির কারণে সারা বাড়িটাই স্থির হয়ে গেছে। স্থির করে দেওয়া ভিডিও ছবির মতন, চলে গেলেই আবার সচল হবে।

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৮) 24

শ্রাবণ চলে যাবার সাথে সাথে রাতুল একটা ব্যাগ হাতে লাফাতে লাফাতে এল, বেশ খুশি। সঙ্গে সঙ্গে রাত্রির সমস্ত মন বিস্বাদ হয়ে গেল।

হাসি হাসি মুখে রাতুল বললো- কাকু কত কী দিয়ে গেল দেখ মা। ব্যাগ থেকে একটা ক্যাডবেরি বের করে বললো- কত বড় দেখ।

রাত্রির মুখ ততক্ষণে ক্রুদ্ধ কঠিন। ক্যাডবেরি আর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে বললো, এসব আমি তোমাকে কিনে দেব, আমি কিনে দেবো।

প্রথম প্রথম এই ভুলটাই তো করতে বসেছিল রাত্রি। ভাবত, রাতুল শুধুই আমার। এত স্নেহ, মমতা ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করে তুলছে, সে তো শুধু আমার। আমাকে সেই ভালবাসা ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার যেন আর কোনো অস্তিত্ব না থাকে। তার ভবিষ্যৎ, তার ভালমন্দ বিচার, সবাই আমার দায়িত্ব।

অথচ শ্রাবণ এলেই কেমন খুশি হয়ে ওঠে রাতুল। বেশ খুশি খুশি ভাবেই একদিন বলেছিল, আজ কাকুর আসার দিন, না মা?

ওর ওই খুশি খুশি ভাব, মুখের হাসি বিষাক্ত তীর হয়ে এসে বিধত রাত্রির বুকে। ওর নিজের মুখটাই বিবর্ণ হয়ে যেত। ভিতরে ভিতরে ছেলের ওপর রেগে যেত। কী অকৃতজ্ঞ, কী অকৃতজ্ঞ। তোকে মানুষ করে তুলব, বড় করে তুলব বলেই এত কষ্ট সহ্য করছি। অথচ তুই….

সেই প্রথম দিন যখন শ্রাবণ এসে রাতুলকে একটা বড় ক্যাডবেরি, আর এক ব্যাগ কত কী উপহার দিয়ে গিয়েছিল, সেদিনই রাত্রি বুঝতে পেরেছিল কোন মানুষই শুধু একজনের সম্পত্তি নয়, হতে পারে না।

অথচ এই রাত্রিই একদিন রেগে গিয়ে বাবা-মাকে বলেছিল, আমি কি তোমাদের সম্পত্তি নাকি, যে যেমনটা চাইবে তেমনই করতে হবে। আমি কারো প্রপার্টি নই।

রাতুলের বেলায় ঠিক সেটাই করে বসেছিল। এখনো ভাবতে পারে না, রাতুল আর কাউকে এক আনা ভালোবাসাও দেবে। কারণ ওর মধ্যে এখন হারানোর ভয়টাই প্রবল।

আমি তোমাকে কালই একটা ক্যাডবেরি এনে দেবো। যা কিছু দিয়ে গেছে, কিছু ছুবি না তুই, আমি সব এনে দেব।

রাতুল সেদিন কিছুই বুঝতে পারেনি। বিভ্রান্তের মতন শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছে। ওর চোখে জল এসেছিল কিনা তাও দেখেনি রাত্রি। ধীরে ধীরে সান্তনার স্বরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছে, তুই তো কিছুই বুঝিস না, ও তোকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল।

কিন্তু ছিনিয়ে নেওয়ার অর্থটা রাতুল বুঝতেই পারল না। শুধু ওকে দেখে মনে হয়েছিল একটা উল্লাস আর ফুর্তির মুখে কে যেন একটা প্রকান্ড চড় কষিয়ে দিয়েছে। রাত্রি কেন যে ওর আনন্দটুকু নষ্ট করে দিতে চায় তা কেমন করে বোঝাবে রাতুলকে। শুধুই হারাবার ভয়? নাকি রাতুল আর একজনকে, যাকে ও চায় না, পছন্দ করে না, তাকে একটু ভালবাসা দিয়ে দেবে সেই আশা।

রাতুল এক সময় নিরূপায় হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাত্রিই ঘুম পাড়ালো। জানালার বাইরে বাতাস লাগা নিম গাছ চামরের মতো দুলছে। শব্দটা যেন প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাসের মতো। আজ রাতে রাত্রির পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব। গাছের ডালে ভারি একটু কিছু এসে বসল। হয় প্যাঁচা না হয় বাদুর। রাতুল অকাতরে ঘুমাচ্ছে। রাত্রি এক ফাঁকে উঠে চোরের মতো পা টিপে টিপে অন্য ঘরে গেল। আজ তার মনটা ভীষণ খারাপ। নিলয়ের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে। চার মাসের লড়াই শেষ।

রাত্রি পেছন ফিরে তাকাতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। দরজার সামনে রাতুল। বড় বড় চোখ। কপালের ওপর চুল। ফুলের মতো মুখ। রাত্রি তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। রাতুল তাকিয়ে আছে, যেন স্বপ্ন দেখছে।

আমার বাবা কোথায়? নেই তো!

রাত্রি দু’হাতে রাতুলকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল।

রাতুল আবার বলল, আমার বাবা কোথায়? নেই তো! গলা ধরে এসেছে। গলা দিয়ে করুণ চিৎকারের মতো একটা শব্দ বেরুলেঅ – ‘বাবা।’

রাত্রি, রাতুলকে কোলে নিয়ে বসে পড়ল ঘরের লাল মেঝেতে। কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা খুবই কঠিন কাজ; তবুও রাতুলের জন্য হাসতে হবে। রাত্রি ছেলেকে বুকে চেপে ধরে বলল, তোমার বাবা বাইরে গেছে। দেখবে এবার তোমার জন্য কতকিছু নিয়ে আসবে।

ধরা ধরা গলায় রাতুল বলল, পিংকু যে বলে আমার বাবা নেই বলে আমরা নানু বাসায় থাকি। বাবা এবার যাবার সময় আমাকে কিছু বলে যায়নি। তোমাকে কিছু বলেছে কি?

বলে গেছে, রাতুল যেন লক্ষ্মী হয়ে থাকে। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করে। রাতুল স্কুলে কেউ যদি তোমাকে তোমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করে বলবে- বাবা অফিসের কাজে বাইরে গেছে।

রাত্রি উঠে যাবে বাবছিল, হঠাৎ রাতুল মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘আমার বাবা মারা গেছে তাই না!’

রাত্রি স্বম্ভিত হয়ে গেল। এত চেষ্টা সব ব্যর্থ! রাত্রি ঘুরিয়ে ছেলেকে প্রশ্ন করল- ‘মরে যাওয়া কাকে বলে তুমি জান বাপি?’

রাতুল ঠিক জানে না। এই তো কয়েক বছর হলো পৃথিবীতে এসেছে। শুনেছে মানুষ মরে যায়। চলে যাওয়াকেই কি মরে যাওয়া বলে! কাকে বলে মা?

রত্রি আবার বিপদে পড়ল। কি উত্তর দিবে এখন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- ‘মানুষ মরে না বাপি। ্ক জায়গা থেকে আর একজায়গায় চলে যায়।’

রাতুল সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘তাহলে চলে যাওয়াকে মরে যাওয়া বলব?’

রাত্রি অবাক হয়ে গেল। এইটুকু ছেলে কি কথা! এখন কী বলব।

রাতুল আবার বলল- তাহলে তুমি দাদু বাসায় গেলে, বলব তুমি মরে গেছ।

রাত্রির আর কোন কথা বলার ক্ষমতা নেই। এ কী! এতো অসম্ভবব ছেলে, রাত্রি উত্তর হাতড়াতে লাগল।

রাতুল বলর, তাহলে সেদিন যে আমার বেড়ালটা মরে গেল, কই সে তো চলে গেল না। বারান্দায় পড়ে রইল। আমাদের রাস্তা দিয়ে যখন মানুষকে ঢেকে নিয়ে যায়, তোমরা বল লাশ যাচ্ছে। মরে গেলেই তো লাশ হয়। তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলছ কেন মা?

রাতুল রাত্রির কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি সব জানি, আমি সব জানি। বাবা ওই বেড়ালটার মতো মরে গেছে। তুমি এতদিন আমাকে মিথ্যে কথা বলেছো।

তোমাকে এসব কথা কে বলেছে?

শ্রাবণ কাকু।

সন্ধেবেলায় নিজের ঘরেই ছিলো রাত্রি।

আট মাস এই বাড়ি, এই ঘরের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিলো না। অবশ্য সেভাবে বললে- বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো না বলা যায় না, তবে ঘরের সঙ্গে ছিলো না। এতদিন পর ফিরে এসে নিজের ঘরটাকে তার নতুন বা অচেনা মনে হয়নি। ঘর তার ঠিকই আছে, যেমন ছিলো। ঘরতো উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। কাজেই যেমন ছিলো তেমনি আছে। আসবাবপত্রও সবই সেইরকম, যেখানে যা যা ছিলো তেমনই আছে। খাট, আলমারি, হাল্কা ছোট টেবিল, আয়না। ঘরে লোক না থাকলে, বসবাস না করলে যে কোথাও ময়লা বসবে, কোথাও ছাপ ছোপ পড়বে, ধুলোর দাগ বসবে – এতো স্বাভাবিক।

নিশি যতটুকু পারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছে; তবু ঘরটা জেগে ওঠেনি। মানে রাত্রির নিত্যদিনের স্পর্শ পেলে যেমন সজীব থাকার তেমন দেখাচ্ছে না। খানিকটা বাসী বাসী, ময়লা, অসাড় দেখাচ্ছিল।

নিলয় মারা যাবার পর, রাত্রি যখন এ বাসা থেকে চলে গেল, তারপর থেকে এই ঘরে যে কোনোদিন হাত পড়ত না,  নজরে আনত না কেউ- তা নয়; তবে ওই মাঝেমধ্যে একবার ঝাটপাট দেওয়া, ধুলো ঝাড়া, জানালাগুলো খুলে দেওয়া- তার বেশি কিছু নয়।

সন্ধেবেলায় বাতি জ্বালাতে গিয়ে রাত্রি দেখল- দেওয়াল বাতির দুটোই খারাপ। বাল্ব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পাখাটা অবশ্য সামান্য শব্দ করল বিরক্তির, তারপর চলতে লাগল। এসব নিয়ে ভাবল না রাত্রি। কাল পরশু তরশু- দিন পড়ে আছে; গুছিয়ে নেবে ধীরেসুস্থে।

বাইরের জানালা খোলা। ভেতরেরটা বন্ধ। দরজা খোলা। বাইরে অন্ধকার। বৃষ্টি নেই, বাদলা বাতাস রয়েছে। ঘরের একটা বাতি জোরালেঅ নয় জ্বলছে এই।

ভাবি?

রাত্রি পায়ের শব্দ পায়নি, ডাক শুনল। তাকাল।

নিশি।

এগিয়ে  এল নিশি। াক, ফিরলে শেষ পর্যন্ত। সেই কবে গিয়েছো আর এই এলে। মাসের পর মাস যায় তোমার ফেরার নাম নেই। আমার তো মনে হয় তোমার কেসটা হলো- ফিরতে চাই না আমি পার্থিব সংসারে…।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৮)

পল্লব শাহরিয়ার

১৬ অক্টোবর, ২০২০ , ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৭)

(পর্ব-৭)

ইরাও সায় দিয়েছিল

আদর বাড়ে। আদর। শব্দটা উচ্চারণেই কি যেন অর্থ ছিল। রাত্রি তখন শুধুই হেসেছে। কিন্তু এত কিছু মাথায় আসার পরও একটা কথার অর্থ সে কিছুতেই বের করতে পারছে না। কেন তার শ্বশুর শাশুড়িকে ওই কথাটা বলল- রাত্রিকে এখন কিছু বলো না।

রাত্রি কথাটা শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওর বুকের মধ্যে একটা ভারি পাথর। ‘এখন রাত্রিকে কিছু বলো না। তড়তড় করে সিড়ি দিয়ে নেমে এল রাত্রি, শাশুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ডাকলো- মা

হ্যাঁ।

শুধু একটা শব্দ। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল রাত্রি। মনে হল যেন দৃষ্টি কেমন উ™£ান্ত। আর চোখের আড়ালে মনে হয় কান্না থমকে আছে। এক্ষুণি চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসবে।

একদিন একবারও আয়নার দিকে তাকায়নি রাত্রি। কারো দিকেই তাকায়নি। এমন কি নিজের দিকেও নয়। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে দিনগুলো। এই প্রথম এসে দাঁড়াল আয়নার সামনে। সঙ্গে সঙ্গে যেন বুকের ভেতরটা চমকে উঠলো।

এ কে? একে তো রাত্রি চেনে না, কখনো দেখেনি। সম্পূর্ণ একজন অচেনা মানুষ যেন ওর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। নিজেকে াহরিয়ে ফেলার জন্য হাহাকার।

একদিন ওর শুধুই মনে হচ্ছিল ওর সব কিছু হারিয়ে গেছে। কিন্তু সে ভাবনা কেমন অস্পষ্ট। এক এক সময় বিশ্বাসই হচ্ছিল না। যেন দুঃস্বপ্ন দেখছে, এখনি ঘুম ভেঙে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেরে হেসে উঠবে।

কিন্তু আয়নায় নিজেকে দেখে ওর চোখ ঠেলে জল এল।

এ কাকে দেখছে ও? সর্বাঙ্গে একটা সাদা কাপড়।

একটা দিনও নিছক একটা যন্ত্রের পুতুল হয়ে গিয়েছিল। যে যা বলেছে করে গেছে। কেউ এনে বসিয়ে দিয়ে গেলে বসেই থেকেছে। শুধু একটা অস্পষ্ট ধারণা, কি যেন চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও চমকে উঠল। ওর মুখোমুখি যে দাঁড়িয়ে আছে তাকেও চেনে না, কোনদিন দেখেনি। তার মুখ প্রথম চোখে পড়েনি। শুধু একটা সাদা কাপড়। ক্রমশ তার মুখ স্পষ্ট হয়ে ফুঁটে উঠল। নিস্তেজ প্রাণহীন ধ্বসে পড়া জীবনের একটা মুখ। চোখের নীচে কালি, কপালের শূন্যতা। গলায় দুটি হাতে সর্বাঙ্গ জুড়ে শুধুই নিঃস্ব নিস্তব্ধতা।

ফুপিয়ে কেঁদে উঠল রাত্রি।

ওর কিছুই মনে পড়ছে না। ওকি নিজেই একে একে সব খুলে রেখেছে! নিজেই এই সাদা কাপড়খানা শরীরে জড়িয়েছে। কিছুই মনে পড়ে না। ওতো একটা যন্ত্রের পুতুল হয়ে গিয়েছিল।

না, একটু একটু করে মনে পড়ছে এখন।

এখন সমস্ত বাড়ি আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

রাত্রির শুধু মনে পড়ছে সারা বাড়ি লোকজনে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। আর ঘরের মধ্যে দেয়ালৈ পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসেছিল রাত্রি। ও চোখে কিছুই দেখছিল না, কানে কিছুই শুনছিল না। উঠে দাঁড়াতেও ওর কষ্ট হচ্ছিল। শরীরে কোন শক্তি নেই।

নিলয়ের বাবা বারান্দার ডেক চেয়ারে দু’হাতে চিবুক রেখে বসে আছেন গুম হয়ে। নিলয়ের মা লুটিয়ে পড়ে আছেন মেঝের উপর। মাঝে মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। নিশির অবস্থাও একই রকম। তারপরও মাঝে মাঝে সান্তনা দিচ্ছে মা’কে, গায়ে মাথায় হাত বোলাচ্ছে। তমাল এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দিকে উ™£ান্তের মত তাকিয়ে ছিল রাত্রি।

আয়নার সামনে থেকে সরে এল রাত্রি। কেউ দেখতে পেলে কে কি বলে বসবে ও কিছুই জানে না। এখন ওর চারপাশ জুড়ে শুধু কি করতে আছে আর কি করতে নেই। এ ক’দিন ধরে ও শুধু একটা যন্ত্র হয়েগিয়েছিল। এখনও শুধুই একটা কর্তব্য।

ক্ষীণভাবে মনে পড়ছে গোসল করে এসে, ওর শরীরে তখন একটুও জোড় নেই, কার কাছে যেন একটা বিরুনি চাইলো। অভ্যাসবশেই হয়ত। হয়ত নিশির কাছে। সঙ্গে সঙ্গে কে যেন বলেছিল, চিরুনি নিতে নেই, আয়না দেখতে নেই।

ওই ঐটুকুই মনে আছে। কে বলেছিল তাও মনে নেই। ওর কাছে তখন বাড়ির সব মানুষগুলোই অর্থহীন।

এখন ওকে শুধুই কর্তব্য হতে হবে।

রাতুল! রাতুল কোথায় কে জানে। ওর গলার শব্দ শোনা যাচ্ছে না। সেই অনর্গল কথা বলে যাওয়া কবে থেকে যে থেমে গেছে রাত্রি জানেও না। হঠাৎ কেমন শান্ত হয়ে গেছে। কোনও প্রশ্নও করে না। হয়তো প্রশ্ন করে করে কোন উত্তর পায়নি বলে আপনা থেকেই থেমে গেছে। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিল, রাতুলকে হয়ত তারাই দেখেছে, গোসল করিয়েছে, খাইয়েছে।

শুধু একবার মনে পড়েছে ও এসে কোলের কাছে বসেছিল, চোখ মেলে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো, কাউকে কাঁদতে দেখলে ওর চোখেও জল আসত। কখনো শব্দ করে কেঁদে উঠত। কেন তা স্পষ্ট করে জানেও না। মৃত্যু কি তা তো ওর ধারণার বাইরে। চিরকালের জন্য ওর কি হারিয়ে গেছে তাও জানে না।

রাত্রি এ অবস্থাতেই বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কান্না দেখে ওর শুধু মনে হচ্ছিল, এই বৃদ্ধ মানুষটার বড় কষ্ট।

তুমি এসো না, এসো না, আমার সামনে।

শুনে আহত হয়ে দু’পা সরে এসেছিল রাত্রি। মনে হয়েছিল, বাবা ওকেই কেন দায়ী করছেন। কিন্তু তারপরই বলে উঠলেন, তোমার দুঃখ আমি দেখতে পারবো না। আর সঙ্গে সঙ্গে রাত্রির শরীরে মনে কি এক অ™ভুত ঠান্ডা প্রলেপ পড়ল। সারা শরীর জুড়িয়ে গেল।

মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বললেন, তোমাকে জানাতে বারণ করেছিলাম। মিথ্যে ভয় পাবে মনে করে। একটু থামলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন- আমার জন্যই হল, কেন যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বললেন- খবর শুনছিলাম, ভাল করে শুনিনি, কোথাও কি কিছুই না, শুধু কানে গেল একটা দুর্ঘটনার খবর। নিলয় যে ঐ বাসে আসবে আমি তাও জানতাম না। তবু কেন যে ভয় পেলাম। হয়তো সেজন্যই-

রাত্রি ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। পালিয়ে এসেছিল।

এখন সব একটু একটু করে মনে পড়ে যাচ্ছে।

নিশি এসে বলল, রাতুলকে খাইয়ে দিয়েছি, তুমিও খেয়ে নাও। আর রাতুলকে এবার একটু ঘুম পাড়াও।

রাতুল কিন্তু আগের মত রাত্রির পা জড়িয়ে ধরল না। শুধু ওর একটা হাত রাত্রির হাঁটু স্পর্শ করল। ও হয়ত ভাবছে মা দূরে সরে গেছে। সত্যিই তো ও দূরে সরে গিয়েছিল।

নিশির বুদ্ধি নয়, হয়ত মা শিখিয়ে দিয়েছে। রাত্রিকে আবার কাজের মধ্যে ভুলিয়ে দিতে চাইছে। রাতুলের মধ্যে।

এখন আর ওর সামনে কোন কাজ নেই, শুধু কর্তব্য। যা করা উচিত, যা সকলে চায়। এখন আর ওর নিজস্ব বলে কিছু নেই। ওর কোন ইচ্ছে এখন আর ইচ্ছে নয়।

রাত্রির ইচ্ছেও হয় না। এই কর্তব্যগুলোই ওর ইচ্ছে হয়ে গেছে। ও তো এখন একটা যন্ত্রের পুতুল হয়ে গিয়েছে। ও জানে এখন জীবন শুধু নেই। এত বিলাসীতার মাঝেও ওর মনটা এখন দুঃখবিলাসী। তাতে ওর কিছুই যায় আসে না, ওর এখন দুঃখটাই ইচ্ছে।

পাঁচ

মানুষ মানুষে কিভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠে,  ভেঙে যায়, আবার কেনই বা অন্য কোনো সম্পর্ক তৈরি হতে শুরু করে তা কী কেউ জানে। কোনও মানুষই বোধহয় জানে না। অভ্যাস এক ধরনের নেশা। নিলয় মারা যাবার পর রাত্রি আর ও বাসায় থাকেনি, নিজের বাবার বাড়িতে চলে এসেছে। কিন্তু এখানে এসেও ও নিস্তার পাচ্ছে না, কারণ নিলয় মারা যাবার এখনও চার মাস হয়নি, এরই মধ্যে শ্রাবণ রাতুলের পিতৃত্ব দাবি করে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। আর কেউ না জানুক রাত্রি জানে এখানে শ্রাবণের জয় হবে। রাতুল যে শ্রাবণের ছেলে, একথা ও নিলয়কেও জানিয়েছিল।

এতদিন যত দুশ্চিনাতা ছিল ওর ওই রাতুলকে নিয়েই। বাবা ভরসা দিয়েছে, উকিল বাবুর আইনের কচকচি যতই ওকে নিশ্চিন্ত করার চেষ্টা করুক, মাঝে মাঝেই ভয় পেয়েছে কোটের বিচার শেষ অবধি শ্রাবণকেই রাত্রির কাছ থেকে রাতুলকে ছিনিয়ে নেবার অধিকার দেবে নাতো। ওর এই নিঃস্ব শূন্য জীবনে রাতুলই একমাত্র লক্ষ্য, একমাত্র আশ্রয়।

‘আফটার অল বাবা তো’ উকিল বাবুর কথাটা ওকে সচেতন করে দিলেও মনের গভীরে গিয়ে পৌঁছালো না। রাতুলের ওপর যে শ্রাবণের কোন অধিকার থাকতে পারে ওর মন তা স্বীকার করতেও রাজি নয়। আমার শরীরের মধ্যেই ও গড়ে উঠেছে, আমার যত্নে ভালবাসায়, কত বিন্দ্রি রাত আর উৎকণ্ঠায়। রাতুল আমার সন্তান, শুধু আমারই, এমন একটা বোধ ওর সমস্ত শরীর মন আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

একেবারেই যে জানতো না তাও নয়, আগেই অনেকের কাছে শুনেছিল। তবু কথাটা নতুন করে শুনল, আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা তিক্ততায় ভরে উঠল। এই লোকটা, যার সঙ্গে রাত্রি দীর্ঘদিন কাটিয়ে এসেছে, এক ছাদের নিচে, এক বিছানায়কথাটা এখন আর মনেও পড়ে না, ধুসর অস্পষ্ট বিবর্ণ একটা ছবি, ঝড়ে জলে ধুয়ে ধুয়ে যা মুছে গেছে, যে টিকে আছে শুধু এক অসীম ঘৃণা হয়ে। আর সেই লোকটাই কিনা মাঝে মাঝে রাতুলের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। আইনের অধিকার নিয়ে।

নিলয় বেঁচে থাকতেও শ্রাবণ ও বাসাতে গিয়েছিল, কই তখন তো একবারও বলেনি আমার ছেলে, কিন্তু এখন কেন সে রাতুলকে তার ছেলে বলে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছে। নিলয় থাকতে ও যখন আসতো তখন তেমন অস্বস্তি হতো না, কিন্তু এখন, সঙ্কোচ, লজ্জা, অস্বস্তি মিলে অ™ভুত একটা জড়তা ওকে পেয়ে বসেছে। লোকটার সঙ্গে আবার মুখোমুখি হওয়ার মতো অস্বস্তি আর আছে নাকি। সেজন্য একটা আতঙ্ক ছিলো।

বাবা একদিন বলল- আজ শ্রাবণের আসার কথা, রাতুলের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবু রাত্রি ভয় পেয়ে বসলো। ভয় না অস্বস্তি ও নিজেও বুঝতে পারলো না।

রাতুলকে নিয়ে গেল বাবা। শ্রাবণের কাছে রাতুলকে রেখেই বাবা ফিরে এল। এসে বললো- বসার ঘরে বাবা-বেটায় যত খুশি গল্প করুক।

রাত্রি সঙ্গে সঙ্গে বাবার মুখের দিকে তাকালো। বাবা যে নির্বোধের মতো এমন একটা কাজ করে বসবে তা ও ভাবতেও পারেনি। ওই রাতুলকে ঘিরেই ওর যত ভয়। এখন আর আমার জীবনে ওই রাতুল ছাড়া কে আছে কী আছে? চোখে মুখে উম্মার ভাব ফুটিয়ে বলল, রাতুলকে তুমি ওর কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে এলে? কেন কাছে বসে থাকতে পারলে না।

আইনমাফিক বাবা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, হয়ত একটু আদর করবে, দুটো কথা বলবে, সে সময় সেখানে আর একজন কি বসে থাকা ভালো দেখায়। কথাই তো বলবে, বলুক না যত খুশি। একটা বড় ব্যাগ এনেছে শ্রাবণ, হয়তো রাতুলের জন্যই। কিছু উপহার-টুপহার। যদি তার মন চায় দিক না।

রাত্রি দেখলো বাবা ওর কথা শুনে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছে। হেসে বললো- রাতুলকে নিয়ে তো পালিয়ে যাবে না।

একটা সহজ কথা বাবার মাথায় ঢোকেনি বলে ও বিস্মিত না হয়ে পারল না।

বলে উঠল, রাতুলকে একা ছেড়ে দিয়ে এলে ওর কাছে, একা পেয়ে কি মন্তর পড়াবে তুমি জানো। সব কিছুর মধ্যে আতঙ্ক তো ওই একটাই। মাঝে মাঝে দেখা করতে আসবে শুনে সেজন্যই ভয় পেয়েছিল। মাকে ছেড়ে থাকার কথারাতুল ভাবতেই পারে না। বরং বাবার প্রতি ওর টান কম। কেন থাকবে সেই ভালোবাসা। নিলয় কি কোনো দিনও ওকে সেই ভালোবাসা দিতে পেরেছে, যা শ্রাবণ দিতে পারতো। কিংবা শ্রাবণও কি পারতো না…

কিন্তু কে জানে, এখন যদি ছেলের ওপর বেশি বেশি ভালোবাসা দেখাতে শুরু করে। ওই বয়েস তো শুধুই ভালোবাসা চায়, আদর পেলেই সেটাকে ভালোবাসা ভেবে বসে। আর সে ব্যাপারে শ্রাবণ কম দক্ষ নয়। রাতুলের কথা কি বলবে, রাত্রি নিজেই কি ওর ভালোবাসাকে চিনতে পেরেছিল? ওর তো সবটাই শুধু অভিনয়।

রাত্রির ভয়, শুধু ওকে জব্দ করার জন্যই হয়ত দেখা করতে আসার নামে একটু একটু করে মায়ের বিরুদ্ধে রাতুলের মন বিষিয়ে দিতে চাইবে শ্রাবণ। ওইটুকু বাচ্চা ছেলে, ও কিবা বোঝে, কি বা জানে। ভয় সেজন্যই। রাত্রি বাবার হাত ধর তুলে বললো, তুমি যাও, তুমি যাও। ওদের কাছে বসো গিয়ে।

রাতুল শ্রাবণের সঙ্গে বসে গল্প করছে, মাঝে মাঝে শব্দ করে হেসে উঠছে। হাসির কথাটা কী তা রাত্রির কাছে পৌঁছাচ্ছিল না।

শ্রাবণের উপস্থিতিটুকু ওর কাছে বিরক্তিকর মনে হচ্ছিল, চলে গেলেই যেন বেঁচে যায়। আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। তার ওপর রাতুলের অত গল্পে মজে যাওয়া, হেসে ওঠা সে আরেক যন্ত্রণা। রাত্রি কোথায় চাইছে শ্রাবণের সঙ্গে রাতুলের দূরত্ব আরো বেড়ে থাক, তার বদলে তাকে এত কী ভাল লাগছে তার সঙ্গ। রাত্রি চেয়েছে রাতুলকে নিজর মতো করে গড়ে তুলতে; ভেতর থেকে বলে উঠতে চেয়েছে, আমিই তোর বাবা, আমিই তোর মা।

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৬

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

 

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৭)

পল্লব শাহরিয়ার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৬)

(পর্ব-৬)

আবার ওই বাবা-মা’র দিকে তাকিয়েই অনেকেই দিব্যি জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালিয়ে যায়। তবু মনে মনে সব মেয়েই একটু বল পায় ওদের কথা ভেবে।  কোথাও কোন দাঁড়াবার জায়গা না থাক বাপের বাড়ি তো আছে। সেখানে সান্তনা আছে, নিখাদ সমবেদনা আছে।

রাত্রি জানে এত সবের পরও যদি ও গিয়ে দাঁড়ায়, দুঃখ পাবে ওরা ঠিকই, তবে ভরসাও দেবে। মা সেই তেমন করেই বুজে জড়িয়ে ধরবে ছলছল চোখে, বিয়ের পর ঠিক যেভাবে বিদায় দিতে গিয়ে কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরেছিল। তাই সবকিছু ভাবার পরও রাত্রি গিয়ে উঠেছিল বাবা-মা’র কাছে।

বাবা একটু আধটু অভিযোগ শোনার পর বলল, দেখ রাত্রি, সব বিয়েই এরকমই। মানিয়ে নিতে হয়।

website

যেন রাত্রি মানিয়ে নেবার চেষ্টা করেনি।

মা’ও কাছে বসিয়ে স্তোক দেবার মত করে বললেন, প্রথম প্রথম এ রকম হয়, একটু বাচ্চাকাচ্চা হলেই দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।

বাবা-মা’র কথা শুনতে শুনতেই দেখলো শ্রাবণ আসছে। শ্রাবণকে আসতে দেখেই মনে মনে খুশি হয়েছিল রাত্রি, কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করল না। ওর আশঙ্কা ছিল শ্রাবণ হয়ত ওর খোঁজ নিতে আসবে না। তাই দূর থেকে শ্রাবণের বিব্রত মুখটা দেখে ভেতরে ভেতরে খুশি হল। কিন্তু লজ্জা আর সংকোচ ওকে তখন গ্রাস করে ফেলেছে।

শ্রাবণ বেশ রাগত স্বরেই বলল, একটা কান্ড যে করে বসো।

ব্যাস।

যেন কোথাও কিছু ঘটেনি, যেমন ছিল তেমনি আছে। আসলে শ্রাবণের মুখ বিব্রত বাবটা অন্য কারণে। কোথাও কিছু নেই। হঠাৎ অফিসে বসে কাজ করতে করতে রাত্রির ফোন পেয়ে ও বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। ফেরার পথে বলেছিল, কী যে করে সবো, আমার অফিসে একটা প্রেস্টিজ আছে না। কলিগদের কানে গেলে কী বলবে।

চাপা রাগ আসলে অন্য কারণে। স্ত্রী ফোন করে বলেছে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কোথায় তাও জানাচ্ছে না, আশেপাশে অন্যরা শুনতে পাবে বলে নরম নরম তোষামুদে ভাষায় তার মানভঞ্জন করার উপায় নেই। তাই শ্রাবণকে নির্বিকারভাবে বলতে হয়েছে, বাড়ি ফিরে যাও, গিয়ে শুনব। এছাড়া আর কিইবা বলতে পাতো।

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৬) 25

বাবা-মা’র কাছে লজ্জার মাথা খেয়ে আসতে হয়েছে, সেখানেও সেই একই উপদেশ মানিয়ে নে; মানিয়ে নে। সেই অসহায়তার মধ্যে নিরূপায় হয়েই ওকে ফিরে যাবার কথা ভাবতে হয়েছে। কিন্তু শ্রাবণের কথাটা শুনেই তিক্ততায় মনটা ভরে গেল। বুঝতে পারল ও চলে এসেছে বলে শ্রাবণের মনে বিব্রত ভাব ফোটেনি। বিব্রত হয়েছে ওর চারপাশের লোকদের কাছে পরিচ্ছন্ন ইমেজটা নষ্ট হবে এই ভয়ে।

রাত্রির কোনও মূল্য নেই ওর কাছে। থাকলেও তা একটা অংশের মত। মানুষটাকে অধিকার করে আছে অনেকে, একা রাত্রির জন্য যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে তা শুধু একটা অংশ। অথচ রাত্রি চেয়েছে গোটা মানুষটাকেই। পেয়েছে শুধু রাতের বিছানা।

মা বলেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে, যায়নি। কোন সম্পর্কই গোটা মানুষটাকে পায় না। অথচ সম্পর্ক যাই হোক সকলেই সেই সম্পর্কের জোরে পুরো মানুষটাকে গ্রহণ করতে চায়। এর চেয়ে বড় বিড়মন্বনা মানুষের জীবনে আর কি আছে।

এতসব চিন্তার মাঝে রাতুল এসে দাঁড়িয়েছে মুখের সামনে। মা মণি আমরা নানুবাসা কবে যাচ্ছি?

– কাল বাবা।

– তোমার কালটা কবে আসবে?

– তুমি জানো নিলয়, তুমি না গেলে আমিও যাবো না।

– আব্বু তুমিও চল না।

– আচ্ছা, আমরা কালই রওনা দিব, তবে একটা শর্তে।

– কিসের শর্ত?

– তোমাকে নামিয়ে দিয়ে, আমি চলে আসবো …

রাত্রি আর রাতুল দুজনেই চুপ।

চার

চৌকাঠ ডিঙিয়ে এ বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে রাত্রি এখন ফুটকি। চার দেয়ালের ঘর নয়, ওর মনে হচ্ছে যেন একটা ছোট্ট সুন্দর দ্বীপে এসে পৌঁছেছে। চোখ শুধু সবুজ দেখছে, চোখ সমুদ্র দেখছে, সমুদ্রের ঢেউ। কোথাও কোন দেয়াল নেই, শুধু ঝড়ো বাতাসের স্পর্শ। সেখানে শুধু গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছা করে।

অনর্গল কথা বলে চলছে ও, আর হাতের কাজ সারতে সারতে মা হাসি হাসি মুখে শুনছে। যেন কত কালের কথা জমা হয়ে আছে। যেন কতকাল কথা বলতে পারেনি। মা এক ফাঁকে বললেন, যা তুই গোসল করে নে, রাতুলকে আমি গোসল করিয়ে দিচ্ছি।

– হবে, হবে।

অর্থাৎ গোসল, খাওয়ার জন্য তাড়া নেই। ফুটকি বলল, আমি তো ওসব ওখানেই সেরে আসতে পারতাম, কিন্তু তা হল আধাবেলা ছুটি কমে যেত। আসতে আসতে দুটো তিনটে বেজে যেত। সেজন্যই শ্বশুরকে দিয়ে ফোন করানো, এসে খাবো।

নিলয় বাইরে যাবার পরও দুটো দিন কাটিয়ে আসতে হয়েছে, সেটুকুতেই অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। তবু চক্ষুলজ্জা। সেই আগে মেযন কোথাও বেড়াতে যাবার কথা থাকলেও বলে উঠতে পারতো না শাশুড়িকে। নিশি তো বলেই বসলো, কেন এতদিন যেতে পারেনি, ভাইয়া যখন ছিল। ভাইয়া যেই গেল, অমনি বাপোর বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। তাই না?

কথাটায় বেশ একটা ইঙ্গিত আছে।

বিয়ে হয়ীন বলেই বিয়ে সম্পর্কে ওর মনে একটা স্বপ্ন আছে। কল্পনায় কি দেখে কে জানে। হয়তো বিয়েল আগে রাত্রিও স্বপ্ন দেখতো। দেখতোই তো। কিন্তু… নিশি ঠিক কি বলতে চেয়েছিল? নিলয়কে ছেড়ে রাত্রি এক মাহূর্ত থাকেত পারে না, নাকি ও থাকলে বাপের বাড়ির কথা ভুলেই থাকে? অথবা বলতে চাইলো নিলয় না থাকলে ওদের বাড়িটাই ওদের কাছে দুঃসহ? নিশিকে তাই ভাল লাগে না আজকাল। একটা কথাও সোজাভাবে বলে না।

মেয়েটা তো প্রেমফ্রেম করে কারো সাথে পালিয়ে গেলেই পারে। বিয়ে যখন হচ্ছেই না, তার নিজের পরিণতির কথা চিন্তা করেই হয়ত কথাটা বলল। দেখে তো মনে হয় এক সময় বেশ সুশ্রী ছিল, হয়ত সুন্দরীই।

প্রেম  করে কাউকে বিয়ে করলেও বাড়িতে কি আপত্তি করত। কই তার সময় তো কোন রকম আপত্তি ওঠেনি। মেয়ের আগে একটি বিয়ে হয়েছিল জানার পরও তারা তাকে এ বাড়ির বউ করে এনেছিল। নিশির কথা টেনে এনে আবার কথা শুরু করেছিল রাত্রি।

মা বলল, তুই যা বাবা, গোসল করে খেয়ে নে, পরে শুনবো। রাত্রি একটু অসন্তুষ্ট হল। ভেতরে একটা চাপা ক্ষোভও যেন গুমড়ে উঠলো। ও কি খেতে এসেছে নাকি এখানে। ও তো অনেক কথা নিয়ে এসেছে উজাড় করে দেবার জন্য। কতদিনের জমা হওয়া কথা। তার মধ্যে হাসিও আছে, আনন্দও আছে, আবার কান্নাও আছে। সব কথা অবশ্য বলবে না, বলা যায় না। তবু হাল্কা হওয়া তো যায়।

কিন্তু এ বাড়ির কথা শুনলেই নিলয় কেমন যেন করত। কখনো রাগত না। কিন্তু এবার রেগে গিয়েছিল। রেগে গিয়ে বলেছিল- ঐ ভাঙাবাড়িটায় কি আছে কি? রেগে ছিল বলেই বলেছিল। অথচ রাগ তো নিয়ে এসেছিল অফিস থেকে। ওকি করে জানবে!

ওর বুকের মধ্যে ক’দিন ধরেই এ বাড়িতে আসার ইচ্ছা হচ্ছিল। বাবা-মা’কে দেখার কিংবা দু’চারদিন এসে থাকার। এক এক সময় সে হাপিয়ে ওঠে। বেশ কয়েকদিন ইচ্ছেটা চেপে রেখে শেষে একদিন বলেই ফেললো- এই শোনো, আমি ভাবছি দু’দিন ও বাড়িতে থেকে আসবো। তার উত্তরে ঐ কথা। রাত্রি মেনে নিচ্ছে কিছু একটা ঘটেছিল অফিসে। রেগে ছিল, হয়ত নিজের ওপরই।

কিন্তু কথা একবার বলে ফেললে তো আর ফেরানো যায় না। যত আদর করে ভোলাবার চেষ্টা করো, স্লেটের দাগ নয় ভিজে কাপড় বুলিয়ে মুছে দেবে। মেয়েদের কেন যে টাকা হয় না। ওরা করতে দেবে না, দিলে চাকরি করত রাত্রি। কিন্তু তাতেই বা ক’টাকা হবে। সত্যি সত্যি যদি কোনদিন ওর অনেক টাকা হয়ে যেত, এই বাড়িটাকে একেবারে বদলে দিত ও। ভেঙে ফেলে একেবারে নতুন না করে ফেলুক, ভেঙে করে সারিয়ে সুরিয়ে এমন করে দিত যে দেখে নতুন মনে হত। বারান্দা সিড়ি সব ঝকঝকে তকতকে। ঘরের লাল সিমেন্ট তুলে ফেলে টাইলস বসানো।

শ্বশুর বাড়িতে যখন মাঝে মাঝে খুব নিঃসঙ্গ লাগে, ভেতরটা কেমন কেমন গুমড়ে ওঠে। কিছু করার না থাকলে, রাতুল হয়ত ঘুমচ্ছে, রাত্রি বিছানায় শুয়ে শুয়ে এখানে চলে আসে। বাপের বাড়িতে, আর টুকরো টুকরো ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে।

এখন আমাদের সব চাই। রাত্রি শুধু হাসল। মনে মনে ভাবলো, বাবা সেই একই রকম আছে। কোন স্বপ্ন নেই, উচ্চাশা নেই, বাঁচার মত করে বাঁচার ইচ্ছেও নেই। চলে গেলেই সন্তুষ্ট, জীবন যেন শুধু চলে যাওয়া। অথচ তার মধ্যেই কী এক তৃপ্তি। রাতুলের স্কুলের সামনে বসে যাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে তাদের অনেকের তো অনেক কিছু আছে। বাড়ি-গাড়ি, কতসব দামী দামী শাড়ি পরে আসে। কিন্তু অতৃপ্তি যায় না। দু’দশ মিনিট আড্ডা দিলেই সব বেরিয়ে আসে। রাত্রি নিজেও বুঝতে পারে না ও সুখী না অসুখী। ওদের সময়টাই বোধহয় অন্যরকম।

শ্বশুর বাড়িটাও যেন এই দু’সপ্তাহে টিভির মতই হয়ে গিয়েছিল। শব্দ আছে, কথা কানে যাচ্ছে না, ছবি আছে চোখ দেখছে না। তেমনই। শুধু আছে  এটুকুই মনে আছে। ফাঁকে ফাঁকে নিলয়ের কথা হয়ত মনে পড়ছে, মনে পড়ছে না। একেবারে অন্য জগতে চলে গিয়েছিল রাত্রি। নিশির ডাকেই সম্বিত ফিরে পেল।

– নিশি! কথা আছে।

রাত্রি চোখের ইশারায় সিড়ির দিকে ইঙ্গিত করল। নিশি সপ্রশ্ন চোখে তাকাল রাত্রির দিকে, তারপর ঈষৎ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। অর্থাৎ অভিযোগ, রাগ আছে, ক্ষোভ আছে, বিরক্তি আছে। আবার প্রয়োজনে কখনো কখনো দু’জনে অন্তরঙ্গ বন্ধু। একান্ত সঙ্গী। পরামর্শ দিতে হলে, সান্তনা দিতে হলে ওরা একাত্ম হয়ে যায়। অথচ তখনই আবার তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে রাগ কিংবা অভিমান।

গোপন হাসাহাসির কথা থাকলে, কিংবা লুকোনো শলাপরামর্শের জন্য ঐ একটাই জায়গা। ছাদে ওঠার সিড়ির একেবারে শেষ ধাপ। বসে গল্প করার জন্য ডাকেনি রাত্রি। শুধু একটা প্রশ্ন। নিশি বলবে কিনা জানে না। একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল। যদি জানা যায়।

সিড়ির শেষ ধাপ অবধি যেতে হল না, মাঝ পথেই দাঁড়িয়ে পড়ল রাত্রি।

– নিশি, কি হয়েছে বলতো? বাবা-মা’র মুখ কেমন থমথমে।

– বিশ্বাস করো ভাবি, কিছু জানি না। তবে একটা কথা শুনেছি- বাবা-মা কি সব বলাবলি করছিল, আমি ঢুকতেই থেমে গেল। শুধু একটা কথা কানে এসেছিল। বাবা মা’কে বলল, রাত্রিকে এখন কিছু বলো না।

এখন বুঝতে পারল কেন বাবা সেদিন ফেরার সময় বলেছিল একটা দুঃসংবাদ আছে। পরক্ষণেই মেয়ে যেন কষ্ট না পায় তাই তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নিয়েছিল, হাসতে হাসতে বলেছিল, বেয়াই ফোন করেছিল। একটু থেমে বিরক্তভাবে বললেন, নিলয় পরশু ফিরছে। কালই ওকে যেতে বললেন। রাত্রি তার পরদিনই ফিরে এসেছিল; কিন্তু নিলয়, তাহলে কি?

রাত্রিকে রেখে যেতে এসেছিল ওর বাবা। পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। শ্বশুর হৈহৈ করে উঠলেন, বেয়াই এসেছেন, বেয়াই। শাশুড়িও ছুটে এসেছিলেন সঙ্গে নিশিও।

বাবা চলে যাওয়ার পর রাত্রি ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল ঘর গোছাতে। মাত্র পনেরো দিন ছিল না, এরই মধ্যে ঘরখানা দেখে মনে হয় যেন পনেরো মাস ছিল না। ধুলো জমেছে আসবাবপত্রে, জানারায়, দরজায়। মেঝে পরিষ্কার হয়নি কতদিন।

পরদিন খুব ভোরবেলাতে ঘুম ভাঙলো রাত্রির। ভোরবেলাতেই ঘুম ভাঙে। তবু দরজা খুলে রেখেছিল, খিল দেয়নি। কি জানি কখন ফিরবে, যদি ঘুমিয়ে পড়ে, দরজায় টোকা দিলেও শুনতে পায় না রাত্রি। সে এক বিশ্রী কান্ড। তাই রাত্রি জেগেই ছিল, আর স্বামীর জন্য জেগে থাকাই বউদের কর্তব্য।

বরং খিল খোলা থাকলে নিলয় এসে ওকে ডেকে তুলতে পারবে, কিংবা গায়ে হাত দিয়ে। এরা কেউ জানতে পারবে না রাত্রি জেগে ছিল, না ঘুমিয়ে ছিল। বিয়ের পর নিলয়কে ছেড়ে কখনও থাকেনি। দুয়েকবার যা থেকেছে সে এ বাড়িতে নয়, বাবা-মা’র কাছে গিয়েছিল বলে। এই প্রথম এ বাড়িতে। দুটো সপ্তাহ ছিল না নিলয়। না থাকলে আদর বারে। মিনা আর ইরা বলেছিল।

মিনা চোখ টিপে ইঙ্গিত করে বলেছিল- দেখিস, দেখিস, ফিরে এলে কি করে। হেসে ফেলেছিল সবাই।

মিনার স্বামীর বেশ ভাল চাকরি, কি চাকরি ঠিক জানে না রাত্রি। তবে মাঝেমধ্যে দুয়েক সপ্তাহ বাইরে যায়। ঐটুকুই ওর ঈর্ষা ছিল। বেশ মজা। রাত্রির ওরকম হলে বাপের বাড়ি যাওয়া কত সুবিধা হত।

ইরা ঠাট্টা করল মিনাকে, তাই বল, মাঝে মাঝে তাই এত খুশি খুশি দেখায় তোকে। শুনে শুনে রাত্রিরও একটু ইচ্ছে হয়েছিল স্বপ্ন দেখার। দরজার খিল খুলে রেখেছিল সে কারণে, নিলয় আসবে, এসে নিঃশব্দে রাত্রির ঘুমন্ত শরীরের পাশে বসবে, কাঁধে কিংবা গানে হাত ঠেকিয়ে ডাকবে ফিসফিস করে।

– দেখিস, দেখিস ফিরে এলে কি করে?

(চলমান…)

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-১

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-২

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৩

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৪

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৫

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৭

মনের আধাঁর পেরিয়ে, পর্ব-৮

মনের আধাঁর পেরিয়ে (পর্ব-৬) 26

মুগ্ধতা.কম

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ