আমার এলেবেলে শৈশব

প্রমথ রায়

১৪ জানুয়ারি, ২০২৩ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ ;

আমার এলেবেলে শৈশব - প্রমথ রায়

আমার শৈশবের কথা বলতে গেলে প্রথমে মনে পড়ে কোনো কালবৈশাখি ঝড়ে আমি আমার মায়ের কোলে মানুষের ঘরের পিছনের চালার নিচে। আমরা অতি দরিদ্র হওয়ায় আমাদের খড়ের ঘর দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ত ও খুটি নড়বড়ে হওয়ায় যেকোনো সময় ঘর উড়ে যেতে পারে। গিয়েছিলোও দুবার। ছোটোবেলায় ঝড় আসলেই আমি খাটের নিচে লুকাতাম যাতে ঘর পড়লেও কিছুটা নিরাপদ থাকা যায়। শৈশবের বৃষ্টিতে আমার অনেক স্মৃতি। এই বৃষ্টির দিনে ভিজতে ভিজতে আমার সাঁতার শিখি। সাঁতার শিখতে গিয়ে পুকুরের জল গিয়ে মায়ের কাছে মাইর খাই। আমি কখনো মাছ মারতে পারতাম না। এক বৃষ্টির দিনে দুটি রুই মাছসহ অনেক মাছ পেলাম। বর্ষাকালে আমরা বন্ধুরা মিলে কলার গাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে বৃষ্টির পানিতে ভেসে বেড়াতাম। খুব ছোটোবেলায় আমাদের ছাতা ছিলো না। মানকচু বা কলার পাতা মাথায় দিয়ে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতাম। কখনো কখনো প্লাস্টিকের বস্তা উল্টিয়ে মাথায় দিতাম। পরে আসলো বাঁশ পাতা দিয়ে বাঁশের তৈরি ছাতা।

আমরা শৈশবে বন্ধুরা মিলে কলার পাতা দিয়ে ঘর বানাতাম। আবার কখনো কখনো মাটি দিয়ে পাকা ঘর বানাতাম আর রাজমিস্ত্রি হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। আবার কখনো বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করতাম কেউ হব বাসের ড্রাইভার, কেউ হেল্পার, কেউ কন্ডাক্টর।

আমাদের খুব শৈশবের খেলা ছিলো কাঠাল পাতা দিয়ে নইয়া খেলা। পরে ম্যাচের প্যাকেট দিয়ে খেলতাম। পরে মার্বেল ও পয়সা খেলা শুরু করলাম। একবার কয়েকজন মিলে একটি ফুটবল কিনলাম। পরে ঝগড়া লেগে সে বল কেটে ফেলে ফুটবল খেলার ইতি টালাম। ক্রিকেট খেলতে খেলতে যুবক হয়ে গেলাম।

আমাদের শৈশবে টিভি নাই বললেই চলে। আমাদের পাড়ায় একজন রিকন্ডিশন্ড টিভি কিনল। প্রতি শুক্রবার বিকাল ৩ টায় বিটিভিতে বাংলা ছায়াছবি দেখার জন্য আমরা পাড়া থেকে পাড়ায় ঘুরতাম। তখন জনপ্রিয় সিরিয়াল ছিলো, আলিবাবা চল্লিশ চোর, সিন্দাবাদ, আলিফ লায়লা, ভারতীয় জয় হনুমান। এগুলো দেখার জন্য রাতে রাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম।

শৈশবে আমার ফল চুরির করার অভিজ্ঞতা ছিলো না। আমাদের পাড়ায় এক ছেলে গরুর রাখাল হয়ে কাজ করতে এল। সে আমাদেরকে নিয়ে টিম বানাল এবং আমরা রাতে মানুষের ফলমূল চুরি করা শুরু করলাম। মানুষ ধান কেটে জমিতে শুকোতে দেয়, সেগুলো দিয়ে ভাপা পিঠা খেতাম। আমাদের এই দলটি যাত্রাগান দেখা ও ভিসিআর দেখায় ছিলাম নিয়মিত। এগুলোতে চলতো জুয়া খেলা। আমিও খেলতাম। বেশ লাভও করেছিলাম। 

খুব শৈশবে আমরা সুপারির খোলোস দিয়ে গাড়ি টানতাম। পরে বাঁশের মুড়া গোল করে চাকা বানিয়ে গাড়ি চালাতাম। এরপর ভ্যানের বিয়ারিং দিয়ে গাড়ি বানিয়ে চালাতাম। আমি মানুষের সাইকেল দিয়ে একাই একাই সাইকেল চালানো শিখি। প্রথমে ফ্রকের ভিতরে পা ঢুকিয়ে,  যেটাকে বলে ‘হাফ প্যাডেল’। পরে আস্তে আস্তে সিটে চড়ে। সিটে চড়ে চালাতে গিয়ে আমি দুবার এক্সিডেন্ট করি। গিয়ারের কাটা পায়ে ঢুকে যায়।

আমার শৈশবে আমার বাবা একবার একটা রিকন্ডিশন্ড রেডিও কিনেছিল। তখনও টিভি আসেনি।  তাই রেডিওটি আমাদের পরিবারে বেশ সমীহ ছিল। একদিন এটা আমি নস্ট করে ফেললাম। এটার জন্য আমার বাবা আমাকে মারতে উদ্যোত হওয়ার আমি দিলাম দৌড়। আমার বাবাও আমার পিছু পিছু দৌড়ায়। ঐদিন দেখেছি বাবার রাগ।

আমরা পড়াশুনা করেছি কেরোসিনের ল্যাম্প দিয়ে। পরে পেয়েছি হারিকেন। আমার পড়াশোনা শুরু খ্রিষ্টান মিশনারি পরিচালিত ফিডার স্কুলে। বাঁশের টংয়ে বসে মদনমোহন তর্কালংকার রচিত গোলাপি রংয়ের ‘প্রভাতি’ বই পড়তাম। পরে পড়লাম গণ সংগঠন স্কুলে। এখানে পড়েছি মাদুরে বসে। ভালো ছাত্র হওয়ায় দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে দূরের একটি সংগঠন স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করে দিলো। দূরে হওয়ায় এক সপ্তাহ স্কুলে গিয়ে আর গেলাম না। তারপর দুএকটি স্কুল ঘুরে চতুর্থ শ্রেণি না পড়ে ঐ বছরে বাড়ির কাছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। এ স্কুলে আবার শিক্ষকের পাকা চুল তুলে দিতে হতো। এতগুলো ক্লাস ডিঙিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে সবগুলো বিষয়ে ফেল করলাম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে আমি এতটাই বোকা ছিলাম, স্কুল পালিয়ে আসতে গিয়ে আমার বই রেখে অন্যের বই নিয়ে আসতাম। পরে বই ফেরত দিতে গিয়ে স্যারের কাছে মার খেতাম। পরীক্ষায় নকল আনতে গিয়ে স্যারের সামনে ধরা পড়তাম। পরে ষষ্ঠ শ্রেণিতে সবগুলো বিষয়ে ফেল করে দিনাজপুরে খ্রিস্টান বোর্ডিং এ পড়তে গেলাম। ওখানে আবার আমার বন্ধু তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ায় আমাকেও তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করাল। বোর্ডিং এ আবার খাওয়াতো গমের ভাত, যা আমার একদম সহ্য হয় না। ফেব্রুয়ারি মাসে ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসে আর গেলাম না। আমার বাবা রাগ হয়ে আমার পড়াশুনা বন্ধ করতে চাইল। আমি নিজে আর এক গণসংঠন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম। আমাকে আর পিছু ফিরতে হয়নি। আমি সামনের দিকে এগুতে থাকলাম আর আমার শৈশবগুলো হারিয়ে কৈশোর,  যৌবন ও ত্রিশোর্ধে পৌঁছে গেছে।

Latest posts by প্রমথ রায় (see all)

মন্তব্য করুন