আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

জাকির আহমদ

২৭ মার্চ, ২০২০ , ১:৪৮ অপরাহ্ণ ; 676 Views

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪

(পর্ব-৪)

চিন্তাভাবনা শুরু করল জাহাজটাকে নিয়ে। তাতে হয়তো কোনো বুদ্ধি মাথায় আসতেও পারে। প্রথমে জাহাজের যে ব্যাপারটি তার মনে কৌতূহলের সৃষ্টি করল তা হলো জাহাজের সমস্ত বাতি নেভানো। নেভিগেশন লাইট না জ্বেলে নেভিগেশন আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করছে। এর একটাই কারণ হতে পারে। এরা সমুদ্রে তাদের উপস্থিতি অন্য কাউকে জানতে দিতে চায় না। হয়তো এ জাহাজ কম্পাস ও পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে। তা না হলে নেভিগেশন লাইটের সাহায্য না নিয়ে যে কোনো সময় যে কোনো দ্বীপের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে। তাহলেই সব শেষ হয়ে যাবে।

জাহাজের ভেতরটা অন্ধকার হওয়াতে তার সুবিধাই হয়েছে। তা হলে নিশ্চয়ই জাহাজে পাহারাদার আছে। না থাকাটা অস্বাভাবিক। অন্ধকার থাকায় তাদের সামনে সহজে পড়বে না, যদি সে তাদের আগেই দেখতে না পারে, তাহলে নিশ্চিত বন্দী হতে হবে। কারণ লড়াই করার শক্তি তার নেই। এখনো কোনো বুদ্ধি বের হয়নি তার মাথা থেকে। মাথাটা কেমন ভার লাগছে। হঠাৎ কোথা থেকে যেন চাপা গলায় ইংরেজিতে ভেসে এলো, ‘বাইরেও আলো আছে।’ আর কিছুই শোনা গেল না।

চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। খুঁজে বের করারও ইচ্ছে করল না। জানে এ জাহাজেরই কোনো লোকের কাজ হবে। কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল তার মন। ‘বাইরে আলো আছে’ বলতে সেই অজ্ঞাত সাহায্যকারী কী বুঝতে চেয়েছে, কয়েক মুহূর্ত পরই বুঝতে পারল। হয়তো দরজার সামনে আলো আছে। হ্যাঁ, তাই হবে। আর দেরি করল না সে। কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল।

জাহাজটা খুব বড় নয়, মধ্যম আকৃতির। তবে দ্রুতগামী। জাহাজের পেছনের সামান্য একটু জায়গা ফাঁকা। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। সেখান খেকেই দেখতে পেল, লম্বা দুধার দিয়ে বেশ প্রশস্ত প্যাসেজ চলে গেছে। ডানের প্যাসেজ ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিল। পা টিপে টিপে এগোতে শুরু করল হাতের বাঁয়ের প্যাসেজ। মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তীক্ষè দৃষ্টি হানছে। কান দুটোকে যে কোনো শব্দ শোনার জন্য প্রস্তুত রেখেছে। সমস্ত অনুভূতি শক্তিকে জাগ্রত রেখেছে। দ্রুত নিজেকে লুকিয়ে ফেলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আছে। প্রায় বিশ গজের মতো এগিয়েছে। হঠাৎ করেই সামনে আগুন জ্বলতে দেখল। এক মুহূর্ত পরই সে আগুনের আলোয় একজন মানুষের মুখায়ব দেখতে পেল। বুঝতে পারল লোকটি সিগারেট ধরাচ্ছে। তবে এগিয়ে আসছে এদিকেই। কী করবে প্রথমে ঠিক করতে পারল না। ততক্ষণে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়েছে ছেলেটি। ঠিক সেই সময় অগ্রসরমান লোকটির সামনে একটা দরজা খুলে একজন লোক ভেতরের লাইট বন্ধ করে বাইরে বের হলো। তিনজনে গল্প জুড়ে দিল। ছেলেটিকে কেউ দেখেনি।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দেয়াল ঘেঁষে যতদূর পারা যায় দ্রুত পেছাতে থাকল। বারবার মনে হলো, সামনে আবার কেউ দরজা খুলে তার পথ রোধ করে না দাঁড়ায়। তবে পিছিয়ে আসতে গিয়ে যে তিনটা কামরা পড়ল, তার সব নীরব মনে হলো। কিছুক্ষণ পরই পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় এসে বিশ্রাম নিতে লাগল। শুয়ে পড়ার ইচ্ছা অনেক কষ্টে দমন করল। এবার বাঁয়ের প্যাসেজ ধরে এগোচ্ছে। কিছুদূর যেতেই হাত কয়েক দূরে একটি দরজা ফাঁক হয়ে একটি হাত তাকে ডাকতে লাগল।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল ছেলেটি। আতঙ্কে চিৎকার দিতে চাইল। ঘুরে দৌড় দেয়ার জন্য পা দুটো ছটফট করে চলছে। কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। এর মধ্যে মাথা ঠান্ডা রেখে ভালোভাবে তাকাতেই বুঝতে পারল তাকে কাছে ডাকছে। ওই লোকটিই হবে। কাছে আসতেই দরজা আগের মতো ফাঁক রেখে বলতে লাগল, ‘একটু সামনে ডানে সরু প্যাসেজ আছে। নীচতলায় গিয়ে ঘরের সামনে বাতি পাবেন, তবে সাবধান। আপনার মঙ্গল হোক।’ বলে দরজা লেগে গেল। বুঝল, তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। সত্যি দুটো নীরব কামরা পেরোনোর পর ডানে সরু প্যাসেজ পেল। কয়েক হাত এগিয়েই বুঝতে পারল, এই প্যাসেজ দুই ধারের প্যাসেজের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে। আরো কয়েক গজ। এগোনোর পর হাতের ডানে নীচে নামার সিঁড়ি দেখতে পেল।

হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটি। বুঝল, ধরা পড়ে গেছে। মাত্র কয়েক হাত দূরে হাতে রাইফেল নিয়ে টুলে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে লোকটি। তাকে উঠে আসতে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছেলেটি। ঘুমিয়ে পড়েছে, মৃদু নাক ডাকছে। অতি সাবধানে কাঠের সিঁড়িতে পা রাখল। কয়েক ধাপ নীচে নামতেই দুর্বলতার কারণে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগল ছেলেটি। অনেক কষ্টে রেলিং ধরে পতন ঠেকালেও সিঁড়িতে জোরে পা ঠোকার শব্দ রোধ করতে পারল না। এবার বুঝি টের পেয়ে গেছে লোকটি। কারণ নাক ডাকার শব্দ থেমে গেল। আবার কয়েক মুহূর্ত পর শুরু হতেই চেপে ধরা নিঃশ্বাস ছাড়ল ছেলেটি। নীচে এসে দাঁড়াল। দেখল, তার সামনে-পেছনে একমাত্র প্যাসেজ চলে গেছে। দুপাশে কামরা। বেশ খানিকটা সামনে প্যাসেজে একটা বাল্ব জ্বলছে। দূর থেকে আলোর সুবাদে দেখতে পেল, আলোর নীচে দরজার সামনে একজন পাহারাদার হাতে রাইফেল নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোভাবে তাকাতেই বুঝতে পারল সে জেগে আছে। আর বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে কোথায় আছে মেয়েটি। এখন কাজ একটাই, পাহারাদারকে ফাঁকি দিয়ে মেয়েটির ঘরে যাওয়া।

প্যাসেজের অন্য কোথাও আলো নেই। ওই একমাত্র বাল্বের আলোয় প্যাসেজের অন্ধকার সামান্যই কেটেছে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে জায়গাটা এমন অন্ধকার যে পাহারাদার ভালোভাবে লক্ষ না করলে তার উপস্থিতি টেরই পাবে না। পাহারাদারের মাথাটা তার বুকের ওপর নেমে এসেছে। হয়তো ঝিমাচ্ছে। পাহারাদারের সঙ্গে লড়ে তাকে কাবু করার মতো শক্তি তার নেই। এখন বুদ্ধি দিয়ে তাকে কাবু করতে হবে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চিন্তা করল। কয়েকটি বুদ্ধিই মাথায় এলো। কিন্তু কোনোটাই ঝুঁকিহীন না হওয়ায় মনমতো হলো না। অগত্যা তার মধ্য থেকেই একটা তুলনামূলকভাবে ভালো উপায় বেছে নিল। এটাতেও ধরা পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তারপরও তাকে চেষ্টা করতেই হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।

====

বসতে চেষ্টা করল। অর্ধেক উঠে আর উঠতে পারছে না। এবার আস্তে করে মাথার নীচে দুহাত দিয়ে শুয়ে পড়ল। তাকে উঠতে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলো না। বুঝতে পারল সে উঠে বসতে পারবে না। তাই গড়িয়ে খাবারের কাছে চলে এলো। হাত ধুয়ে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে ধীরে ধীরে গিলতে লাগল শুধু কয়েকটি শুকনো রুটি।

‘আরো দেয়া যাবে?’ খাওয়া শেষে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। দুজনেই ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল।

আবার শুয়ে পড়ল ছেলেটি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শক্তি অর্জন করতে চায়। দ্রুত সময় কেটে যাচ্ছে। ক্লান্তিতে দুচোখ বুজে আসছে। চোখ বন্ধ করেই ফেলেছিল। হঠাৎ ফজরের নামাজের কথা স্মরণ হতেই তন্দ্রা টুটে গেল।

‘এখন সময় কত?’ ছেলেটি শুয়ে থেকেই দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। কোনো জবাব এলো না। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব পেল না ছেলেটি। ক্ষুধা অনেকটাই মিটে গেছে। এখন মাথার পেছন দিকে ব্যথা হলেও পরিষ্কারভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারছে। চিন্তা করে ঠিক করল কী করবে?

প্রথমে উপুড় হলো। তারপর দুহাতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। দুর্বলতার কারণে শরীর মৃদু কাঁপলেও পাত্তা দিল না সে। আগের চেয়ে শরীরে এখন বেশি শক্তি আছে। সে জানে তাকে দরজার দিকে যেতে দেবে না। তাই বিপরীত দিকে গেল ধীরে ধীরে। এদিকেই জানালা থাকতে পারে। একটু খুঁজতেই পেয়েও গেল। জানালা খুলে বাইরে তাকাল। জানালায় লোহার গরাদ লাগানো। মাথা বের করার মতো ফাঁক নেই। বাইরে তাকিয়ে দেখল খানিক আগে সূর্য উঠেছে। সকালের সোনালি রোদ চারদিকে ঝলমল করছে। ফজরের নামাজ কাজা হয়ে গেছে। তাই আফসোস হতে লাগল তার। কিন্তু এখন করার কিছু নেই। কাজা পড়তে হবে।

অজু করার জন্য চারদিকে তাকাতে লাগল। এ ঘরের মধ্যে কোনো আসবাবপত্র নেই। ঘরটা ধুলায় ধূসরিত। মাকড়সার জাল যত্রতত্র। দেখেই বোঝা যায়, এ ঘর ব্যবহার হয় না। বাথরুম খুঁজে চলল ছেলেটির দৃষ্টি। একপাশে দরজা দেখতে পেল। পা পা করে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখল, বাথরুমই। ঢুকে পড়ল ভেতরে। পানিও আছে। লোক দুজন কোনো বাধা দিল না। বেশ কিছুক্ষণ পর বের হয়ে এসে জানালা খুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিক ঠিক করে নিল। গা কাঁপছে। তারপর সে দাঁড়িয়ে গেল তার প্রভুর সামনে।

দরজা বন্ধ হতেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল মেয়েটি। খিড়কি লাগানোর শব্দে সম্বিত ফিরে পেল। আছড়ে পড়ল দরজার ওপর। দম দম কিল-ঘুষি মেরে চলল দরজায়। ‘তোমরা আমায় কেন বন্দী করেছ, কী দোষ করেছি আমি? তোমরা আমায় ছেড়ে দাও, বের করো এ কারাগার থেকে।’ কাঁদতে কাঁদতে বলল মেয়েটি। একটু পর বুঝল, এভাবে কিছু হবে না। তাই দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বালিশের অনেকখানি জায়গা ভিজে গেল চোখের পানিতে।

বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে চোখ মুছে পানি দিতে লাগল। তারপর বাথরুমে রাখা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নায় দেখল তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। হঠাৎ খেয়াল হলো, লোকটি তাকে ছেলেটিকে ভুলে গিয়ে তার কথা ভাবতে বলছে কেন? বন্দী করেও তার সঙ্গে মেহমানের মতো আচরণ করছে কেন? ব্যাপারটি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতেই সে যা আন্দাজ করল তাতে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। অনেক ভেবেও এদের হাত থেকে পালানোর কোনো উপায় বের করতে পারল না। ছেলেটি এখন কী অবস্থায় আছে? তার ওপর কি অত্যাচার চলছে? সে কি নিজেই এদের হাত থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারবে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পেল না। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল নরম বিছানায়।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে জানে না। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়। দুজন লোক ঘরে ঢুকল। দুজনের হাতেই রাইফেল। একজন ইংরেজিতে বলল, ‘ম্যাডাম, আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। ক্যাপ্টেন আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে বলেছেন। চলুন।’ বলেই মেয়েটির জন্য পথ করে দিল দুজনে। মেয়েটি বুঝল, ক্যাপ্টেন এদের তার সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এদের ফাঁকি দিয়ে পালানো যাবে না। তাই বিলম্ব না করে দরজার দিকে এগোল।

সামনে একজন পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে, মাঝে মেয়েটি, পেছনে অপর পাহারাদার। ছাদে নিয়ে এলো মেয়েটিকে। সকাল হয়ে গেছে। সূর্য অনেক আগেই উঠেছে। ছাদের মাঝখানে বিরাট এক ছাতার নীচে টেবিল-চেয়ার পাতা। একটা চেয়ারে ক্যাপ্টেন দামি শার্ট-প্যান্ট পরে বসে আছে। তাকে সুদর্শনই বলা চলে। তবে তার চোখে যেন নিষ্ঠুর শীতলতা বিরাজ করছে। চেহারায় কর্তৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। ছাদে উঠতেই সামনে থাকা লোকটি সরে পেছনে চলে এসেছে। ক্যাপ্টেনকে বসে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল মেয়েটি। বুকের কাঁপুনি তিনগুণ বেড়ে গেল। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। আন্দাজ করতে পারছে না সে এরপর কী ঘটবে।

থমকে দাঁড়াতেই পেছন থেকে একজন বলল, ‘সামনে চলুন, ক্যাপ্টেন অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।’ তারপরও থেমে আছে দেখে আবার বলল, ‘তাড়াতাড়ি এগোন।’ অগত্যা আবার এগোতে হলো। দুপায়ে বারবার বাড়ি লাগছে। এতক্ষণ কী যেন পড়ছিল ক্যাপ্টেন। মেয়েটি টেবিলের কাছাকাছি আসতেই মুখ তুলে উঠে দাঁড়াল সে।

‘স্বাগতম, বসুন।’ তার সামনের চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করল। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বসে পড়ল মেয়েটি। সে বসতেই ক্যাপ্টেনও বসে পড়ল। ইশারা করতেই চলে গেল দুই পাহারাদার। এখন ছাদে দুজন ছাড়া কেউ নেই।

‘এর মধ্যে আপনার কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘না।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল মেয়েটি।

‘আমার ওপর রাগ করেছেন?’

কিছু বলল না মেয়েটি। পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আপনি আমাদের নিয়ে কী করতে চান?

এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল ক্যাপ্টেনের মুখে। ‘পরে বুঝতে পারবেন।’

‘আপনি আমাদের কখন মুক্তি দেবেন?’ গলায় ঘৃণার ভাব ফুটে উঠেছে।

‘এখানে মুক্তির কথা আসছে কেন? আপনি তো বহাল তবিয়তেই আছেন।’

‘আমি বহাল তবিয়তে থাকলেও মুক্ত নই, বন্দী।’

কিছু বলল না ক্যাপ্টেন।

‘ছেলেটি কোথায়, কেমন আছে?’

‘সে আপাতত ভালোই আছে।’

কিছুটা আশ্বস্ত হলো মেয়েটি। তার কথায় যেন বিশ্বাস করার মতো কিছু ছিল।

‘ঠিক আছে, পরেও কথা বলা যাবে, এখন খেয়ে নিই। তা না হলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।’ বলে টেবিলে রাখা নানা প্রকার নাশতা, ফলমূলের দিকে হাত বাড়াল সে। মেয়েটিও হাত বাড়াল, নীরবে খেতে লাগল দুজনে। কফি দিয়ে শেষ করল। খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়াতে গেল মেয়েটি।

‘প্লিজ, আর একটু বসুন।’ অনুরোধের বাক্য হলেও আদেশের মতো লাগল শুনতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বসে পড়ল মেয়েটি। ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ওইখানে পৌঁছব।’ ডান দিকে হাত তুলে দেখাল। ‘ততক্ষণ এখানেই থাকুন। যে দুজন আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছে তারাই আপনাকে পথ দেখিয়ে হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাবে। আমি এদিকে একটু ব্যস্ত থাকায় আপনাকে সঙ্গ দিতে পারব না বলে দুঃখিত।’ এক মুহূর্ত থামল।

তারপর বলল, ‘আপনার ডান হাতটা একটু বাড়িয়ে দিন তো।’ মেয়েটি তার উদ্দেশ্য আন্দাজ করতে পারছে না। ক্যাপ্টেন টেবিলের নীচে কী যেন করছে।

‘দিন না হাতটা বাড়িয়ে।’ অনুরোধ ফুটে উঠল তার কণ্ঠে। ইতস্তত করে বাড়িয়ে ধরল ডান হাতটা টেবিলের ওপর। হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। দুহাতই টেবিলের নীচ থেকে বেরিয়ে এলো। বাম হাত ফাঁকা। ডান হাতে মুক্তোখচিত সুন্দর একটা সোনার আংটি, যা মেয়েটি আগে তার হাতে দেখেছে। মেয়েটি মুহূর্তেই বুঝে গেল ক্যাপ্টেন কী করতে চাচ্ছে। ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিয়ে মুখে বলল, ‘ওসব এখন থাক।’ লজ্জায় নীচের দিকে নামিয়ে নিল মুখটি। ভয়ে কড়া কথা বলতে পারল না।

হাসি মুছে গেছে ক্যাপ্টেনের মুখ থেকে। তবে নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। অপমানে মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। ‘ঠিক আছে, অনুষ্ঠান করেই পরাব।’ আবার বাম হাতে আংটিটি পরতে পরতে বলল সে। ‘চলে গেলাম, আমাকে এখন যেতে হচ্ছে।’ বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল সে। কিন্তু মেয়েটি না দেখার ভান করে হাত বাড়াল না। এ অপমানও নীরবে হজম করল ক্যাপ্টেন। প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল সে। বের করে আনল মিনি ওয়াকিটকি। একটা বোতাম চেপে ধরে মুখের কাছে যন্ত্রটি এনে বলল, ‘চলে এসো।’

ওয়াকিটকি পকেটে ঢোকাতে না ঢোকাতেই ছাদে উঠে এসেছে সেই গার্ড দুজন।

‘আপনি বসুন। সময় হলেই এরা আপনাকে নিয়ে যাবে।’ বলেই দ্রুত চলে গেল ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন নীচে নেমে যাওয়ার আগেই লোক দুজন তিন হাত পেছনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটি ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝে গেছে। পেছনে লোক দুটির উপস্থিতি তার ভেতরে অস্বস্তির সৃষ্টি করছে।

এখন ছোট্ট বন্দরের গুটিকয়েক মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। বন্দরে আরো কয়েকটি জলযান নোঙ্গর করা। একটু পরেই জাহাজটি নোঙ্গর করল। ‘ম্যাডাম, চলুন’ বলল পেছনের একজন। উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। এবারো একজন মেয়েটির সামনে, অপরজন পেছনে।

নামাজ শেষ করে আবার শুয়ে পড়ল ছেলেটি। ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছে। শুয়ে শুয়েই ভাবছে এদের হাত থেকে পালানোর উপায়। এ অবস্থায় সে একা পালানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সে মেয়েটিকে এ নরপশুদের হাতে ছেড়ে একা পালানোর কথা ভাবতেই পারছে না। এরা মেয়েটিকে নিয়ে কী করতে চায় তা তার জানা নেই। শুধু এতটুকু আন্দাজ করে নিয়েছে, ভয়ঙ্কর কিছু। সে ঠিক করে ফেলল, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হোক মেয়েটি যদি রাজি থাকে তবে তাকে না নিয়ে কখনোই সে একা পালানোর চেষ্টা করবে না। যদি তা আপাতত তার কাছে প্রায় অসম্ভব লাগছে। এক সময় তন্দ্রা এসে গেল। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে ঘুমজড়িত চোখ মেলে সেদিকে তাকাল। দেখল, ক্যাপ্টেন ঢুকছে গম্ভীর মুখে।

ভেতরে এসে দাঁড়াতেই তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়াল পাহারাদার দুজন। স্থির হয়ে ক্যাপ্টেনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। নীচু গলায় তাদের কিছু নির্দেশ দিয়ে একবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বের হয়ে গেল দরজা খোলা রেখে।

‘উঠে পড়ুন, আমরা পৌঁছে গেছি।’ বলল একজন। ‘তাড়াতাড়ি।’ বলল অপরজন।

ওঠার ইচ্ছা না থাকলেও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। শরীর এখনো অত্যন্ত দুর্বল আছে। দাঁড়ালেই সর্বশরীর কাঁপছে। হাঁটতে গিয়ে যে কোনো সময় পড়ে যেতে পারে। পেছনে রাইফেলের বাঁটের মৃদু খোঁচা দিল একজন। সামনে এগোনোর ইঙ্গিত। ছেলেটি ধীরপায়ে এগোলো দরজার দিকে। পেছন থেকে একজন বলল, ‘বীরত্ব দেখার বা পালানোর চেষ্টা করবেন না। সোজা গুলি করে দেয়ার নির্দেশ আছে। কখনোই থেমে দাঁড়াবেন না। থামলেই রাইফেলের বাঁটের গুঁতো বা লাথি উপহার পাবেন। আর পেছন থেকে ডানে-বাঁয়ে বলে পথ নির্দেশ করা হবে, সেদিকে এগোবেন।’ একনাগাড়ে বলে থামল অপরজন। দরজা দিয়ে প্যাসেজে বের হয়ে এলো ওরা। জাহাজ থেকে সরু কাঠের ঢালু সিঁড়ি বেয়ে ডাঙায় নামার সময় পা ফসকে কোমর পানিতে পড়ে গেল ছেলেটি ধপাস করে। এ অকস্মাৎ পতনের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। হাতে-পায়ে বেশ আঘাত পেল।

‘তাড়াতাড়ি ডাঙায় উঠুন।’ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিল একজন। উঠতে দেরি দেখে ওপর থেকে ছেলেটির পিঠে রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করল। আঘাতের চোটে কুঁকড়ে গেল সে। আবার আঘাত হানতে পারে, এ ভয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনোরকমে উঠে এলো। রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর এগিয়েই দাঁড়িয়ে দম নিতে লাগল। পেছন থেকে পিঠে লাথি চালাল একজন। পড়ে গেল ছেলেটি মেঠো রাস্তায়।

‘হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দিয়ে চল। তবুও থামা চলবে না। থামলেই শাস্তি’ বলল অপরজন।

হামাগুড়ি দিয়েই এগিয়ে চলল অবশেষে। একবার পেছনে তাকাল। সামনে-পেছনে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেল না। শামুকের গতিতে এগোচ্ছে। থেমে লাথি, গুঁতো খেতে চায় না সে। একসময় সে শক্তিও নিঃশেষ হয়ে গেল। থেমে শুয়ে পড়েছে। আশপাশে অনেকেই তার দুরবস্থা দেখছে। কিন্তু সবাই শেষ পর্যন্ত তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। পিঠে রাইফেলের বাঁটের গুঁতো খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল ছেলেটি। জ্ঞান হারাল সঙ্গে সঙ্গেই। অজ্ঞান দেহটা দুজনে মিলে একটা গাড়িতে করে নিয়ে চলল।

কাঠের ঢালু সিঁড়ি দিয়ে জাহাজ থেকে ডাঙায় নেমে এলো মেয়েটি। সামনে কুলি, শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন লোক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। চারদিকে তাকিয়ে কোথাও ছেলেটিকে দেখতে পেল না। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আরো একটি মধ্যম আকৃতির জাহাজ, তিনটি মাছ ধরার ট্রলার, চারটি ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকা, সাতটা ডিঙি নৌকা নোঙ্গর করা অবস্থায় দেখতে পেল। আরো কোনো জলযান সমুদ্রে আছে কিনা তা সে জানে না। উল্টো দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখল দুটো কাঠের গুদাম ঘর। তার সামনে একটা একতলা কাঠের ঘর। ফটকের ওপরে লেখা ‘গার্ডরুম।’ কোনো অফিস চোখে পড়ল না। গার্ডরুমের পাশ দিয়ে মেঠো রাস্তা চলে গেছে। তবে পিচঢালা রাস্তার ন্যায় মসৃণ। রাস্তার এক পাশে লোহার ফলকে ডিজাইন করে লেখা, ‘ওয়েলকাম টু ফ্লাওয়ার্স আইল্যান্ড।’

এসব দেখতে দেখতে কখন যে তার পাশে ছাদবিহীন খোলা জিপ এসে দাঁড়িয়েছে তা টের পায়নি মেয়েটি।

‘ম্যাডাম, প্লিজ উঠে পড়ুন।’ ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভার। চমকে ফিরে তাকাল মেয়েটি। গাড়ির দিকে খেয়াল পড়তেই বুঝল কিসে চড়তে বলছে লোকটি।

‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?’ ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘গেলেই দেখতে পাবেন।’ হাসিমুখে জবাব দিল ড্রাইভার।

‘প্লিজ, আপনারা আমাকে ছেড়ে দিন। পৌঁছে দিন আমার বাবা-মার কাছে।’ যেন আর একটু হলেই কেঁদে ফেলবে সে।

‘ভয় পাচ্ছেন কেন, উঠে পড়ুন।’

‘আমি যাব না।’

‘আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ আছে আমার ওপর। অতএব কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ুন। প্লিজ।’ যেন অনুরোধ ঝরে পড়ল লোকটির কণ্ঠ থেকে। পাহারাদার দুজন চুপ করেই আছে।

জানে, এদের সঙ্গে সে পারবে না। তাই এরপর কথা না বাড়িয়ে উঠে বসল ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে। পেছনে উঠে বসল অন্য দুজন। গাড়িতে স্টার্ট দিল ড্রাইভার। এগিয়ে চলল গাড়ি মধ্যম গতিতে।

‘ম্যাডাম, আপনি দুপাশে দেখতে থাকুন, মাঝে মধ্যে আমি আপনাকে এ দ্বীপ সম্পর্কে বলব।’ সামনের দিকে তাকিয়ে বলল ড্রাইভার। বলার আগে থেকেই ডানে-বাঁয়ে দেখছিল মেয়েটি। রাস্তার দুধারেই চাষাবাদের জমি দেখতে পেল। কোনো জমি চাষ করা, কোনোটাতেবা ধান রোপণের জন্য চারা গজিয়েছে বা বড় হয়েছে। জমিতে কৃষকরা কাজ করছে। ‘ম্যাডাম, আমাদের কৃষকরা নিজেরাই কম্পোস্ট সার তৈরি করে, ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে। পাহাড়ের ঝরনা দ্বারা সৃষ্ট ছোট নদী থেকে পানি সেচের ভালো ব্যবস্থা আছে। এসব জমি থেকে যে শস্য পাওয়া যায়, তাতে এ দ্বীপবাসীর সারা বছর হয়ে যায়। কখনো খাদ্য সঙ্কট হয় না। দ্বীপের এ অংশটাই সমতল। বাকি অংশ পর্বতসঙ্কুল।’ দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থামল ড্রাইভার। এতক্ষণ চুপচাপ শুনল মেয়েটি।

কয়েক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার শুরু করল ড্রাউভার। ‘এ পথ এ দ্বীপের একমাত্র গ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে। গ্রাম না বলে শহরও বলা যেতে পারে। এ দ্বীপ শহরটি ছোট ছোট টিলার ওপর অবস্থিত। এই দ্বীপের ঘরবাড়ি কাঠের তৈরি। এসব বলতে বলতে তারা শহরের কাছাকাছি চলে আসল। রাস্তার পাশে ফলকে লেখা ‘ওয়েলকাম টু ফ্লাওয়ার্স টাউন।’ গাড়ি ঢুকে পড়েছে শহরের আবাসিক এলাকার মধ্যে। ড্রাইভার ঠিকই বলেছে। একে গ্রাম না বলে শহর বলাই উচিত। মেয়েটি যেন ভালোভাবে দেখার সুযোগ পায় সে জন্য ধীরে ধীরে চালাচ্ছে গাড়িটি। মেয়েটি দেখছে, কোনো কোনো বাড়ি টিলার ওপর, কোনোটি বা নীচে কোনো কোনো বাড়ি দোতলা তবে অধিকাংশই একতলা। প্রতিটা বাড়ির সামনে বাগান আছে। কোনো কোনো বাড়ির সামনে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছে।

যে রাস্তা ধরে তারা চলছে, সে রাস্তায় বেশ লোক চলাচল করছে। এ রাস্তা থেকে শাখাা রাস্তা শহরের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে। রাস্তায় লাইট পোস্ট দেখা যাচ্ছে। রাস্তা ধরে মাঝে মধ্যে বাইসাইকেল, ঠেলাগাড়ি যাচ্ছে। এক দুটো জিপও চোখে পড়ছে। সব মিলে সুন্দর সাজানো-গোছানো একটা ছোট শহর মনে হলো মেয়েটির। ডান দিকে হাত তুলে দিক নির্দেশ করল ড্রাইভার। ‘এ বাড়িগুলোর পেছনে আছে গোচারণ ভূমি। সেখানে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলল ড্রাইভার। হাত তুলে ডান দিকে মেয়েটিকে দেখাল সাইনবোর্ডে লেখা, ‘ফ্লাওয়ার্স সুপার মার্কেট।’ ‘এটি এ দ্বীপের একমাত্র মার্কেট। এখানে সবকিছু পাওয়া যায়।’ মার্কেটের ভেতরে অনেক লোক দেখা গেল। এবার বাঁয়ে হাত তুলল ড্রাইভার। মেয়েটি দেখল একটি কাঠের বিরাট দোতলা বাড়ি। প্রধান ফটকের ওপর লেখা ‘ফ্লাওয়ার্স হসপিটাল’, ‘অন্য সবকিছুর মতো এটাও এ দ্বীপের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে মোটামুটি সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। তবে বড় জটিল রোগের জন্য রোগী বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে বিনা টাকায় সব চিকিৎসা করা হয়। এ হাসপাতালের সব ব্যয় বহন করে এ দ্বীপের মহমান্য লর্ড। এ দ্বীপবাসীর জন্য বিভিন্ন খাতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। তাঁর কথাই এ দ্বীপের আইন। সবাই তাঁকে মান্য করে।

এর মধ্যে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে গাড়ি। ডানে আবার হাত তুলল ড্রাইভার। মেয়েটি কাঠের একটি বড় বাড়ির সামনে বড় একটা টাওয়ার দেখতে পেল। এ বাড়ির সামনে সাইনবোর্ডে লেখা ‘টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ এক্সচেঞ্জ’। তার পাশে একটি টাওয়ার বাড়ির সামনের সাইনবোর্ডে লেখা ‘পোস্ট অফিস’। ‘এ দুবাড়ির মাধ্যমে আমরা সারা দুুনিয়ার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করি। এবার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল ড্রাইভার। মাঝে মধ্যেই ছোট ছোট পাহাড়ের ওপর উঠছে, নামছে গাড়ি। ‘ওই পাশে’, হাত তুলে দিক নির্দেশ করল ড্রাইভার। ‘একটা পাহাড়ি ঝরনা আছে। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আছে। ঝরনার পানির সাহায্যে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তা দ্বীপের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকে। সেটা অবশ্য আমরা যাওয়ার পথে দেখতে পাব না।

এরপর গাড়ি ওপরের দিকে উঠবে, তাই গাড়ির ফোর হুইল ফিট করল ড্রাইভার। সিট বেল্ট বেঁধে নিল চারজনেই। ওপরে উঠতে শুরু করল গাড়ি। চারদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল মেয়েটি। পাহাড়ের গায়ে কোথাও ঘন, কোথাও পাতলা গাছপালা। প্রায় অধিকাংশ গাছের সঙ্গেই পরিচয় নেই মেয়েটির। পাখি ছাড়া অন্য প্রাণী চোখে পড়ছে না। গাড়ি যে রাস্তা ধরে ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমনিতে রাস্তা বেশ সরু, তার ওপর ডানে-বাঁয়ে মাঝে মধ্যে গভীর খাদ দেখে মেয়েটি বারবার চোখ বন্ধ করে ফেলছে।   একবার নীচে গড়িয়ে পড়লে হাড়গোড় খুঁজে বের করা মুশকিল। মাঝেমধ্যে রাস্তার দুপাশে বা একপাশে পাহাড় পড়েছে। একটু পরপর রাস্তা তীক্ষè বাঁক নিচ্ছে। প্রায় প্রতিটি বাঁকেই পাহাড়ের কারণে অপর পাশ দেখা যায় না। সে ক্ষেত্রে হর্ন দিতে হচ্ছে। অকস্মাৎ অপরদিক থেকে একটা গাড়ি আসলে নির্ঘাত মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটবে। কারণ গাড়ি দ্রুত সাইড করার মতো জায়গা নেই রাস্তায়।

মাঝে মধ্যে দেখ যাচ্ছে ডানে পাহাড়, বাঁয়ে গভীর খাদ, ঠিক তার মাঝ দিয়ে তীক্ষè বাঁক নিয়েছে রাস্তা। চালাতে একটু কম-বেশি হলেই, একটু অসতর্ক হলেই করুণ দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। তবে মেয়েটির পাশে বসা ড্রাইভার অত্যন্ত ঝানু। তা ছাড়া সে সবসময় এ রাস্তা ধরে চলাচল করে। রাস্তার প্রতিটি অংশ তার নখদর্পণে। সে গাড়ি চালাচ্ছে ধীরগতিতে। তারপরও কয়েকবার তাকে গাড়ির সঙ্গে লড়তে দেখেছে মেয়েটি। অনেকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে চালাচ্ছিল ড্রাইভার। কোনো কথা বলেনি। মেয়েটি মাঝে মধ্যে চোখ বন্ধ করে অস্পষ্ট শব্দ করছে দেখে মুখ খুলল। ‘আমি এই রাস্তায় প্রায় চৌদ্দ বছর থেকে গাড়ি চালাই। কখনই তেমন গুরুতর অ্যাক্সিডেন্ট করিনি। ছোটখাটো করেছি। আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমরা নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাবই। তাছাড়া আমি এমনিতে এ রাস্তায় ঘণ্টায় ত্রিশ কিলোমিটার স্পিডে চালাই। এখন আপনাকে নিয়ে বিশ-পঁচিশ কিলোর ওপরে চালাচ্ছি না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। তবে খুব জরুরি হলেও চল্লিশ কিলোর ওপরে চালাই না।’ কথা বলার সময় গতি কমিয়ে এনেছিল। আবার আগের গতি ফিরিয়ে আনল। কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। ‘এ পাহাড়ি জঙ্গলে নানা ধরনের পশু-পাখি আছে, তবে কোনোটাই হিংস্র, মানুষ খেকো নয়।’ মেয়েটি যাতে ভয় না পায় সে জন্য তার চিন্তা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য বলল ড্রাইভার।

‘আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাব’, বলল ড্রাইভার।

‘আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছেন?’ প্রশ্নটা আবার করল মেয়েটি।

‘এ দ্বীপের এক হাজার মানুষের শাসকের প্রাসাদ।’ কৌতুক করে জবাব দিল লোকটি।

‘কেন নিয়ে যাচ্ছেন?’ উদ্বেগ ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।

‘গেলেই জানতে পারবেন।’ সংক্ষিপ্ত জবাব এলো ওপাশ থেকে।

ডানে পাহাড়ের ওপাশে একটা রাস্তা অদৃশ্য হতে দেখে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘ওই রাস্তাটা কোথায় গেছে?’

‘একটা বাড়ির দিকে।’

আর কোনো কথা হলো না। একটু পরে ডানে মোড় নিয়ে প্রায় সমতল জায়গায় এসে পড়ল তারা। সামনে পাহাড়ের গায়ে কাঠ দিয়ে তৈরি সুন্দর দোতলা বড় একটা বাংলোর সামনে বাগানে নানা ধরনের ফুল ফুটেছে। ফুলের গন্ধ চারদিকে ম-ম করছে। গাড়ি থেমে দাঁড়াতেই পেছনের লোক দুজন লাফ দিয়ে নামল। তারপর নামল ড্রাইভার। এরপর সিটবেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে এ অপরিচিত অথচ সুন্দর জায়গাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল মেয়েটি। সমতল জায়গাটার মাখখানে পাশাপাশি দুটি খুঁটি পোঁতা। খুঁটির বিষয়টি মেয়েটি বুঝতে পারল না। একটু দূরে পাহাড়ের গায়ে কাঠের একতলা দোতলা কয়েকটি বাড়ি দেখতে পেল। দু-একজনকে বাইরে দেখতে পেল।

‘ওই যে বাঁয়ে পাহাড়ের গায়ে যে দুটি বাড়ি দেখছেন, তার একটি স্টাফ কোয়ার্টারগার্ড। আর ডানে পাহড়ের ধারে যে সুন্দর বাতিগুলো দেখছেন তা এ দ্বীপের অফিসারদের বাড়ি’, বলল ড্রাইভার। ‘এবার ভেতরে চলুন, বিশ্রাম নিন। পরে আরো জানতে পারবেন।’ বাংলোর দিকে ইশারা করে সামনে এগোলো ড্রাইভার পেছনে মেয়েটিকে আসতে বলল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাগানের মধ্যবর্তী রাস্তা ধরে বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল মেয়েটি। পেছনে চলল পাহারাদার। প্রধান ফটকের সামনে এসে পড়ল। ফটকের ওপরে সোনালি রঙে লেখা ‘ওয়েলকাম টু ফ্লাওয়ার্স প্যালেস’। ড্রাইভারের পেছন পেছন ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দোতলায়। অনেক কামরা আছে এ বাংলোর সামনের দিকে প্রশস্ত বারান্দা। সেই বারান্দা ধরে বাংলোর ডান ধারে একটা কামরার সামনে এসে দাঁড়াল তারা। ড্রাইভার দরজা খুলে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, আপাতত এটা আপনার কামরা। এটা গেস্ট রুম। পরে অন্য বাংলোয় থাকবেন। আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে ভেতরে আপনার বিছানার পাশে কলিং বেলের বোতামে চাপ দিলেই হবে।’ লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ‘গুডবাই’ বলে চলে গেল। মেয়েটি ধৈর্য সহকারে লোকটির কথা শুনল। লোকটি চলে যেতেই তার গমন পথের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল।

প্রথমে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত ঘরটির দিকে দৃষ্টি ফেরাল মেয়েটি। মুগ্ধ হয়ে গেল ঘরটির দিকে তাকিয়ে। ঘরটি সুন্দর করে সাজানো-গোছানো। ঘরের দেয়াল মেঝে ছাদ থেকে শুরু করে প্রতিটি আসবাবপত্র দামি কাঠের তৈরি। ঘরের ছাদ ও দেয়াল শিল্পীর নিপুণ হাতের কারুকাজ করা। তারপর বার্নিশ করা হয়েছে। মেঝের হাঁটাচলার জায়গায় মখমলের কার্পেট বিছানো, যেন রাস্তা। বাকি অংশে কাঠ দেখা যাচ্ছে তবে তাও পালিশ করা।

ঘরের দেয়াল পেইন্টিংগুলো ঘরের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছে। ঘরের যে দরজা দিয়ে ঢুকেছে তার বিপরীত দিকে দরজা ও জানালা দেখতে পেল। হাতের ডানে ছোট আর একটা দরজা দেখতে পেল। সব দরজা-জানালায় দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিলে যায় এমন রঙের পর্দা টানা। তাই দরজার ওপাশে কী আছে তা সে বুঝতে পারল না। জানালার ধারেই একটা ডাবল বক্সখাট সুন্দর মখমলের চাদর দ্বারা আবৃত।। বালিশের কভারও মখমলের। খাটের দুপাশের বেড লকারের ড্রয়ারগুলোতে তালায় চাবি লাগানো। তার পাশে রিডিং টেবিল চেয়ার। টেবিলের ওপর কাঠের রিডিং ল্যাম্প ও কিছু পত্র-পত্রিকা আছে। তার পাশে একট ড্রেসিং টেবিল। আয়না কাপড় দিয়ে ঢাকা। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে একটা মেকআপ বক্স রাখা। দূর থেকেই বোঝা যায় তা অত্যন্ত দামি। তার পাশে কাপড় রাখা আলনায় কোনো কাপড় নেই।

যে দরজা দিয়ে ঢুকেছে তার বাঁ ধারে সোফা সেট। সোফার পেছনে কোনো জানালা নেই। ডান ধারে সুইচ বোর্ড। ঘরে হয়তো পারফিউম স্প্রে করা হয়েছে। সুন্দর গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই সব দেখল মেয়েটি। গোসল করা দরকার। ডানের দরজার পাশে লাইটের সুইচ দেখে বুঝে নিল দরজার ওপাশেই বাথরুম। সুইচ দিয়ে পর্দা সরাতেই দেখল দরজা খোলাই আছে। বাথরুমটাও সুন্দরভাবে সাজানো। উন্নত রুচির পরিচয় সর্বত্র।

ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে কাপড় খুলতে খুলতে দেখল, এদের পানি সাপ্লাইও আছে। হঠাৎ খেয়াল হলো গোসলের পর এসব কাপড় পরা যাবে না। কারণ বহুদিন ধরে ধোয়া হয়নি, অন্য কাপড় তার চাই। কাপড় নেয়ার জন্য আবার কাপড় পরে ঘুরে দরজার দিকে দাঁড়াতেই দরজার পাশে হুকে কাপড় দেখতে পেল। কাপড় থেকে সুগন্ধ বের হচ্ছে। কাপড়ে কী জন্য সুগন্ধি দেয়া হয়েছে বুঝতে পারল না সে। বাথরুম থেকে বের হয়েই সামনে দেয়ালে আটকানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, দশটা বেজে পাঁচ। অর্থাৎ সে প্রায় আধা ঘণ্টা বাথরুমে ছিল। ঝরনার পানিতে গোসল করার পর শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। এগিয়ে গেল অপর দরজাটির দিকে। পর্দা সরাতেই বারান্দা দেখতে পেল।

বারান্দার ডানে-বাঁয়ে কাঠের দেয়াল। অপর পাশে কী আছে দেখার উপায় নেই। সামনের সম্পূর্ণ খোলা অংশ কাঠের রেলিং দেয়া। রেলিং ভাঙা ছাড়া এ পথে পালানোর কোনো উপায় নেই। বারান্দাতে টবে নানা ধরনের ফুলের গাছে ফুল শোভা পাচ্ছে। বারান্দা পশ্চিমমুখী হওয়ায় দুপুরের পর বারান্দায় রোদ পাওয়া যাবে। তার পরিধেয় কাপড় ধুয়ে বাথরুমেই শুকাতে দিয়েছে। দুপুরের পরের রোদে যেন তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এজন্য বারান্দায় এনে শুকাতে দিল। ক্ষুধা লেগে গেছে। আবার বিশ্রামও নেয়া দরকার। ক্ষুধা নিয়ে বিশ্রাম হবে না। তার দরজা খুলে আগের বারান্দায় বেরিয়ে মেয়েটি দেখল দরজার পাশেই একজন লোক পকেটে ডান হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি বুঝতে পারল, সে তার পাহারায় আছে।

মেয়েটির দরজা খোলার শব্দ শুনেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটি। ‘ম্যাডাম, এখানে আপনার নাশতা দেয়া হয়েছে। বসে খেয়ে নিন। এর আগে আপনাকে ডাকার জন্য দরজায় দুবার নক করেছি, কিন্তু আপনার কোনো জবাব পাইনি। আপনি বের না হলে হয়তো এতক্ষণে আবার নক করতাম।’ বিনয়ের সঙ্গে বলল লোকটি। সামনেই চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। টেবিলে নানারকম নাশতা, ফলমূল সাজানো। বসে পড়ল মেয়েটি। অর্ধেক খাওয়া হয়ে গেছে এমন সময় সামনের সমতল চত্বরে একটি গাড়ি এসে থামল। তারপর যা দেখল, তাতে খাওয়া বন্ধ করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।

হেডকোয়ার্টারে পৌঁছার কিছুক্ষণ আগে জ্ঞান ফিরে পেল ছেলেটি। প্রথমে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে ঘোর ঘোর ভাবটা কাটিয়ে ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলল। দেখতে পেল সে একটা বড় হুড খোলা জিপের পেছনে মেঝেতে শুয়ে আছে চিত হয়ে। দুপাশের সিটে সেই পাহারাদার দুজন রাইফেল হাতে বসে আছে। দুজনের একজন তাকিয়ে আছে তার দিকে। গাড়ি যে ওপরের দিকে উঠছে তা বোঝা যায়। মাঝে মধ্যে ঝাঁকুনি খাচ্ছে। এমনিতে সারা শরীরে ব্যথা, তার ওপর শক্ত ধাতব মেঝেতে ব্যথা ঝাঁকুনির কারণে দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে। উঠে বসলে হয়তো কিছুটা আরাম পাওয়া যাবে। শরীর নড়ানোর উপায় নেই। রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় হাত-পায়ের বোধশক্তি লোপ পেয়েছে এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। অগত্যা হাতের সাহায্য ছাড়াই বসার জন্য উঠতে শুরু করল। অর্ধেক উঠেছে। হঠাৎ বুকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে বাড়ি মারল একজন। আগে দেখতে পায়নি। তাই তাল হারিয়ে পড়ে গেল আবার। ঠুকে গেল মাথা শক্ত মেঝেতে। ভালোই আঘাত লেগেছে। জ্ঞান হারাল না, তবে চোখে সবকিছু অন্ধকার দেখতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করছে। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। দুই পাহারাদারের কেউ কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে সব ঝাপসা দেখতে লাগল। মাথার পেছনটা দপ দপ করে ব্যথা করছে। চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও খুলে রাখল। একটু পর ওয়াকিটকিতে ড্রাইভারকে কথা বলতে শুনল ছেলেটি। ধীরে ধীরে চোখের ঝাপসা ভাবটা কেটে গেলেও ড্রাইভারের দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখার জন্য যদি আবার রাইফেলের বাঁটের গুঁতো খেতে হয়, এ ভয়ে আর তাকাল না। মাথাটা খুব একটা ভালো কাজ করছে না। ওয়াকিটকিতে ড্রাইভার কার সঙ্গে সংক্ষেপে কথা বলল, তাও সে বুঝতে পারল না। তবে গাড়ি যে দাঁড়িয়ে গেল তা পরিষ্কার বুঝতে পারল। কতক্ষণ থেমে ছিল বলতে পারবে না সে। তবে আবার ওয়াকিটকিতে কথা বলার পর ড্রাইভার গাড়ি চালু করল।

বেশ কিছুক্ষণ ওপরে ওঠার পর গাড়ি যে একটা সমতল জায়গায় থেমে দাঁড়াল তা বুঝতে পারল ছেলেটি। তবে খোলা আকাশ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। প্রথমে ড্রাইভার নামল গাড়ি থেকে। এর মধ্যে পাহাদারদের একজন ছেলেটির পাঁয়ের বাঁধন খুলে দিল। তার হাত দুটো খুলে পেছন দিকে বেঁধে দিল। তারপর দুজনে মিলে ছেলেটিকে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিল। কিন্তু বাঁধা অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকার কারণে তার হাত-পা অবশের মতো। ছেড়ে দিতেই ভারসাম্য হারিয়ে হাঁটু ভেঙে পড়ে যেতে শুরু করল ছেলেটি। পাহাদার দুজন তাকে ধরলও না। হাঁটু ভেঙে প্রথমে বসে পড়ল। তারপরও তাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। হাত পেছনে বাঁধা থাকায় ঠেকাতে পারল না সে। ‘সামনে এগোও, তা না হলে আবার আগের অবস্থা হবে’, বলল পাশে দাঁড়ানো একজন। ছেলেটি জানে এরা যা বলল তা করবে। কিন্তু এ অবস্থায় কীভাবে সামনে এগোবে প্রথমে বুঝতে পারল না। কয়েক মুহূর্ত পর বুদ্ধিটা মাথায় এসেই গিয়েছিল; এমন সময় পিঠের ওপর একটা লাথি পড়ল। লাথির আঘাতে ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। কিন্তু এখন তার কিছু করার নেই। পা দুটো মুক্ত থাকায় কিছুটা নড়াচড়া হওয়ায় এর মধ্যে পায়ের বোধশক্তি কিছুটা ফিরে এসেছে। আরো দেরি করলে আরো আঘাত হানবে তারা। তাই আর দেরি না করে বুকের ওপর ভর দিয়ে পায়ের সাহায্যে হেঁচড়ে হেঁচড়ে সামনে এগোতে লাগল পাহাদারের নির্দেশিত দিকে। খুব জোর দশ গজ এগিয়েছে ওভাবে। কিন্তু এর জন্য কমপক্ষে পঁচিশবার থামতে হয়েছে তাকে। তবে থেমেছে এক মুহূর্তের জন্য। আর লাথি মারেনি দুজনের কেউই। ছেলেটি পৌঁছে গেছে নিকটবর্তী দুটো কাঠের খুঁটির মাঝখানে। ওপরে মাথা উঠিয়ে দেখল। খুঁটি দুটোর ওপরে একটা কাঠের টানা দেয়া। তবে কি এরা আমাকে ফাঁসি দেবে? শিউরে উঠল ছেলেটি নিজের অজান্তেই।

‘এই, উঠে দাঁড়াও তাড়াতাড়ি’, বলল একজন। হাত এখনো পিঠের ওপর বাঁধা। এ অবস্থায় উঠে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব ছেলেটির জন্য। কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুললেও বলতে পারল না সে পাশ থেকে ছুটে আসা পদশব্দ শুনে। মুখ তুলে তাকাল। দেখল তার পাশে এসে দাঁড়াল এক লোক। তাকে চেনে না ছেলেটি।

‘আরে, আমার জন্য ভাগ রাখ। তোমরা অনেক করেছ, এখন ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও’, বলল নতুন আগন্তুক। সরে দাঁড়াল আগের দুজন।

‘তোমরা দুজনে গুনবে’, বলে শপাং করে ছেলেটির শরীরে চাবুক কষল আগন্তুক।

‘আল্লাহ’ শব্দটি বের হয়ে এলো ছেলেটির মুখ থেকে। ব্যথায় চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে উঠল।

এরপর চাবুক কষতে শুরু করল আগন্তুক। এক, দুই করে গোনা শুরু করল দুই পাহারাদার।

প্রথম চাবুকের আঘাতে শপাং করে শব্দ হতেই চাপা আর্তনাদ করে দুহাতে মুখ ঢেকে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। এতক্ষণ খাওয়া বাদ দিয়ে সব দেখেছে; তবে কথা ভালোভাবে শুনতে পায়নি।

‘ম্যাডাম, আপনি উঠতে পারবেন না। এখানে থেকেই যা দেখার দেখুন; তা না হলে সরে গিয়ে বিশ্রাম করুন’, মেয়েটিকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বলল পেছনে দাঁড়ানো পাহারাদার। লোকটি অনুরোধের সুরে বললেও তার কথা আদেশের মতোই লাগল মেয়েটির কাছে।

ওখানে বসে এ দৃশ্য দেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়ে টালমাটাল পায়ে দরজার কাছে পৌঁছেছে, এমন সময় গাড়ির শব্দ শুনে ফিরে তাকাল মেয়েটি। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ভেজা চোখে প্রথমে ঝাপসা দেখল। তারপর চোখ মুছে পরিষ্কার দেখতে পেল। যা দেখল তাতে আবার বারান্দার রেলিংয়ের ধারে এসে দাঁড়াল মেয়েটি।

দ্বিতীয় চাবুকের আঘাতেই জ্ঞান হারাল ছেলেটি। চাবুক কষা থামাল আগন্তুক। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো। একটি সুন্দর ছাদওয়ালা জিপ এসে থেমে দাঁড়াল। গাড়ি থামার আগমুহূর্তেই গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল ক্যাপ্টেন। নেমেই চাবুক মারা থামানোর জন্য হাত তুলল ক্যাপ্টেন। কিন্তু তার আগেই থেমে গেছে আগন্তুক। ক্যাপ্টেন ইশারা করতেই গাড়ি নিয়ে চলে গেল ড্রাইভার।

‘কি, অজ্ঞান হয়ে গেছে?’ জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল আগন্তুক।

‘জাহাজ থেকে নামার পর এখন পর্যন্ত ছেলেটির ওপর কী শাস্তি হয়েছে?’ দুই পাহাদারের কাছে জানতে চাইল ক্যাপ্টেন।

সংক্ষেপে বলল একজন। কথা ধরিয়ে দিল অপরজন।

‘হুম, শোনা শেষ হলে গম্ভীর হয়ে বলল ক্যাপ্টেন। এক মুহূর্ত ভেবে বলল, ‘থাক, যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছে। এখন একে এ অবস্থায় রেখে সবাই চলে যাও, বিশ্রাম নাও, যদিও এ অবস্থায় পালাতে পারবে না, তারপরও দূর থেকে লক্ষ্য রেখ’, বলে ছেলেটির দিকে নজর বুলিয়ে বাংলোর দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল মেয়েটির দিকে। মেয়েটি দৃষ্টি নামিয়ে নিল বলে মনে হলো। তারপরও সেদিকে তাকিয়ে এগোতে লাগল বাংলোর দিকে।

ছেলেটিকে আর মারতে হবে না ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আগন্তুক। তবে তা উপস্থিত কেউই বুঝতে পারল না। ক্যাপ্টেন চলে যেতেই তিনজনে হাঁটতে শুরু করল তাদের গন্তব্যের দিকে।

‘হাই, কেমন আছেন? ভালোভাবে পৌঁছেছেন তো?’ মেয়েটির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে দূর থেকে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। মুখে বিস্তৃত হাসি।

ছেলেটির দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাল চোখ মুছতে মুছতে, তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না।

‘আপনি কাঁদছেন কেন?’ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। এর মধ্যে পাহারাদার সরে বেশ দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারো কোনো উত্তর দিল না মেয়েটি। ক্যাপ্টেন বুঝে ফেলল কেন কাঁদছে সে।

‘আচ্ছা, বলেন, কী হলে আপনার মুখে হাসি দেখতে পাব? আপনার কান্না দেখতে চাই না’, কোমল সুরে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘ওকে’ হাত তুলে ছেলেটিকে নির্দেশ করল মেয়েটি। ‘এবং আমাকে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে’, অনেক কষ্টে মুখ দিয়ে কথাগুলো বের করলে সে।

‘কে বলল, আপনাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে? আপনার তো হাত-পা বাঁধা হয়নি। ওকে তো হাত বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আচ্ছা, আপনি যদি খুশি হন, তো ওর হাতের বাঁধন খুলে দিতে বলি।’

মেয়েটি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই দূরে দাঁড়ানো পাহারাদারকে কাছে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল।

পাহারাদার চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই ‘ওহ হো, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বললাম, খেয়ালই করিনি’, বলেই মেয়েটিকে অপর চেয়ারে বসার ইঙ্গিত করে ক্যাপ্টেন নিজে বসে পড়ল অন্য একটি চেয়ারে। বসে দুজনেই নীরবে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। তবে ক্যাপ্টেন মাঝে মধ্যে আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে।

ছেলেটি এখনো অজ্ঞান হয়ে দড়িতে হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলে আছে। একটু পরেই সেই পাহারাদার পানির পাত্র নিয়ে পৌঁছল ছেলেটির সামনে, পাত্র থেকে পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিল ছেলেটির চোখে-মুখে। কয়েক মুহূর্ত পরই নড়ে উঠল ছেলেটি। ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আবার বন্ধ করে আবার খুলল। এরপর আর বন্ধ করল না।

একহাত দিয়ে ছেলেটিকে ধরে অপর হাতে ধরা ধারালো ছুরি দিয়ে হাতের বাঁধন সাবধানে কেটে দিয়েই ছুরি ফেলে দিয়ে দুই হাতে পাঁজা করে ধরল পাহারাদার, যাতে ছেলেটি পড়ে না যায়। আস্তে করে একটা খুঁটির পাশে বসিয়ে দিল ছেলেটিকে। তারপর পানির পাত্রটি ছেলেটির মুখের সামনে এগিয়ে ধরল। পাত্রে মুখ লাগিয়ে পানি খেল ছেলেটি। অনেকটা স্বস্তি বোধ করল। তবে দুহাতের রক্ত চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। শরীর এত দুর্বল যে তার বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আস্তে করে পাথুরে চত্বরে শুয়ে পড়ল। তার পাশে রাইফেল হাতে পাহারাদার। রোদটা বেশ ভালো লাগছে তার।

কেন, তাকে কোনো একটা ঘরে এনে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়া যায় না, আমার মতো? ছেলেটি মাটিতে শুয়ে পড়ার পর ক্যাপ্টেনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল মেয়েটি। সে ভেবেছিল ছেলেটির জন্যও ঘর বরাদ্দ করা হবে। কোনো উত্তর দিল না ক্যাপ্টেন। যেন মেয়েটির কথা শুনেইনি এমনি ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কি আপনি খুশি?’ মেয়েটি কোনো উত্তর না দিয়ে মুখখানা নীচের দিকে নামিয়ে নিল। জানে এদের ছেলেটির প্রতি সামান্য পরিমাণ দরদ নেই। তাই পুনরায় আর প্রশ্ন না করে চুপ করে থাকল।

‘আমাদের এই দ্বীপ দেশ আপনার কেমন লাগল? ড্রাইভার সব দেখিয়ে বলে দিয়েছ তো?’ প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলল ক্যাপ্টেন।

‘ভালো।’ মেয়েটি বুঝল ক্যাপ্টেনই ড্রাইভারকে বলে দিয়েছিল, যাতে তাকে এই দ্বীপের সব দেখানো হয়, সেই সঙ্গে সব জানানোও হয়।

‘এটাকে দ্বীপ দেশ কেন বললাম জানতে চাইলেন না যে।’ মেয়েটি চুপ করে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। মেয়েটির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিজেই বলতে লাগল, ‘এই দ্বীপটা ইংল্যান্ডের। এই দ্বীপের অধিকাংশই ইংরেজ। আমাদের মহামান্য লর্ড ইংল্যান্ডের কাছ থেকে এ রকম কয়েকটা দ্বীপ প্রথমে বার বছরের জন্য লিজ নেয়। এরপর তার মেয়াদ বর্ধিত করে নিরানব্বই বছর করেছে, লিজ নেয়ার প্রায় পনের বছর হয়ে গেছে। লর্ড লিজ নেয়ার পর থেকে একরকম স্বাধীনভাবে এসব দ্বীপ শাসন করছেন। ইংল্যান্ডকে শুধু কর দিতে হয়, এছাড়া তারা এসব দ্বীপের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করে না। যথাসময়ে কর জমা দেয়া হয়। যার ফলে কখনো কোনো গোলমালের সৃষ্টি হয়নি। শুধু এই দ্বীপেই মানুষের বসতি আছে, আর বাকি কোনো দ্বীপে মানুষ বাস না করলেও সেসবও মাঝে মধ্যে ব্যবহৃত হয়। আরো অনেক কিছু জানতে পারবেন, দেখতে পারবেন। কারণ আপনি তো এখানকার বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছেন।’ শেষ বাক্যটা মুখভরা হাসি নিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘তার মানে?’ মেয়েটি ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্য জানে, তারপরও নিজের অজান্তে প্রশ্ন করে বসল।

‘তার মানে খুব সহজ, লাঞ্চে লর্ডের মুখ থেকেই শুনবেন।’ মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হলো।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল মেয়েটি; কিন্তু সামনের চত্বরে একটা সুন্দর হুড খোলা জিপ সামনে থামতেই সেদিকে ফিরে তাকালো দুজনে। ড্রাইভারের সিট থেকে নামল একজন।

সুপুরুষই বলা চলে। লম্বা-চওড়ায় বেশ। লাল চুল। মাথা নীচু করে এগিয়ে আসছে বাংলোর দিকে।

‘ইনিই হলেন আমাদের মহামান্য লর্ড। বাইরে বেরিয়ে ছিলেন। প্রায়ই বাইরে যান দ্বীপের হালহকিকত দেখার জন্য।’ গাড়ি থেকে নামতেই বলল ক্যাপ্টেন। কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না। এর মধ্যে বাংলোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে লর্ড। ‘ঠিক আছে, আপনি না হয় এখানে বসে থাকুন। তা না হলে ঘরে গিয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিন। আমি তো কেবল জাহাজ থেকে এলাম। এখন গিয়ে গোসল করব, কিছুক্ষণের মধ্যে লাঞ্চের জন্য ডাকবে, তখন দেখা হবে, এখন চলি’, বলেই উঠে দাঁড়িয়ে দুহাতে দুবার তালি দিল।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একজন লোককে এদিকে আসতে দেখল মেয়েটি। লোকটির প্যান্টের ডান পকেট একটু ফোলা। লোকটি কাছে এসে দাঁড়াতেই ‘আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে ও থাকল।’ বলেই আর দাঁড়াল না ক্যাপ্টেন। হাসি মুখে ‘বাই’ বলে চলে গেল।

মেয়েটি চেয়ারে বসেই থাকল। তার থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। মেয়েটির দৃঢ়বিশ্বাস তাকে পাহারা দেয়ার জন্যই সে আছে। মেয়েটি চোখ ফেরাল চত্বরের দিকে। দেখল, ছেলেটি তেমনই পড়ে আছে। আর তার পাশেই আছে পাহারাদার।

ছেলেটির প্রতি কেমন যেন একটা মায়া জন্মে গেছে পাহারাদারের। এই প্রথম সে ছেলেটির কাছে এলো। কাছে এসে ছেলেটির দিকে তাকিয়েই কেন যেন ছেলেটিকে ভালোবেসে ফেলেছে সে। তার একটা এরই বয়সী ছেলে ছিল যে জ্বরে মারা গেছে। ছেলেটিকে সে খুব স্নেহ করত। এই ছেলেটি অনেকটা তার ছেলের মতোই। এটাও ভালোলাগার একটা কারণ হতে পারে। আসার সময়ই ক্যাপ্টেনের নির্দেশ মোতাবেক ছেলেটির জন্যও খাবার পাঠানোর কথা বলে এসেছে। এখনো খাবার নিয়ে কেউ আসছে না দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে পাহারাদার। ছেলেটা যে ক্ষুধায় দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেটা সে বুঝতে পারছে। হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনে ভাবনায় বাঁধা পড়ল পাহারাদারের। গাড়িতে লর্ডকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে বাংলোর ভেতরে লর্ড ঢুকে পড়তেই আবার বসে পড়ল।

কেটে গেল আরো অনেকক্ষণ। একবার চোখ পড়ল দোতলার বারান্দার দিকে। দেখল, মেয়েটি এদিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকাল। দেখল, তার চোখ বন্ধ। বুক ছন্দময়ভাবে ওঠানামা করছে। খানিক পরেই একজনকে খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে এদিকে আসতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পাহারাদার। ট্রে-টা নামিয়ে রেখেই চলে গেল লোকটি।

‘তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ? তোমার খাবার এসেছে।’ কোমল কণ্ঠে বলল পাহারাদার। আশপাশে যে কেউ নেই তা আগেই দেখে নিয়েছে।

কথা শুনেই চোখ মেলল ছেলেটি। সে ঘুমায়নি বুঝল পাহারাদার।

‘শুয়ে খেতে অসুবিধা হবে, উঠে এ খুঁটিতে হেলা দিয়ে খাও।’ বলতে বলতে ছেলেটিকে তুলে খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল।

‘তুমি খুব দুর্বল হয়ে গেছ, নিজে খেতে পারবে না, আমি খাইয়ে দিচ্ছি’, বলতে বলতে গরম রুটি ছিঁড়ে গরম গোস্তের ঝোলে চুবিয়ে তার মুখের কাছে ধরল পাহারাদার। মুখ সরিয়ে নিল ছেলেটি।

‘কিসের গোস্ত?’

থমকে গেল পাহারাদার। ‘খাসির।’

‘সত্যি তো?’ আবার প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘হ্যাঁ, সত্যি।’ বিস্মিত হয়ে গেল পাহারাদার। সে যথেষ্ট পড়াশোনা করে অবসরে। ছেলেটিকে দেখেই বুঝে ফেলেছে যে সে মুসলমান। বুঝার আরো একটা কারণ, শুয়ে শুয়ে কয়েকবার সে ‘আল্লাহ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে। সে বিস্মিত হলো এ জন্য যে, এ অবস্থায়ও ছেলেটি তার ধর্মীয় অনুভূতিকে আশ্চর্যজনকভাবে জাগ্রত রেখেছে।

‘আজ শুধু মুরগি আর খাসি জবাই হয়েছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি।’

‘আমার তো মনে হয় কোনো মুসলমান জবাই করেনি।’ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ছেলেটির।

‘হ্যাঁ।’ বলল পাহারাদার।

‘তবে শুধু রুটিই দিন।’

‘গোস্ত ও তার ঝোল দিয়ে রুটি খাওয়ার আর চেষ্টা করল না। জানে এ ছেলে খাবে না। তাই শুধু রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে তার মুখে পুরে দিতে লাগল সে। তবে বিস্মিত হয়েছে আগের চেয়ে বেশি। ছেলেটির প্রতি মায়া আরো বেড়ে গেল তার। মাঝেমধ্যে শুকনো রুটি গলায় আটকে যাচ্ছে। তাই পানিতে ভিজিয়ে দিতে লাগল। পাঁচটা রুটি ছিল। সব শেষ হয়ে গেল।

‘আরো খাবে?’

‘না।’ বলল ছেলেটি।

‘তুমি এখন পারলে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নাও।’

‘তবে আমাকে দ্বিপ্রহরের আগে জাগিয়ে দেবেন, নামাজ পড়ব।’

‘ঠিক আছে।’

ছেলেটিকে শুইয়ে দিয়ে পাশে বসে থাকল পাহারাদার। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল ছেলেটি।

অনেক সময় কেটে গেছে। ছেলেটি এখনো শুয়ে আছে। ঘুমিয়েছে কিনা, তা বোঝা যাচ্ছে না দূর থেকে। এমন সময় পায়ের শব্দে ফিরে তাকাল মেয়েটি। দেখল হাসিমুখে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ক্যাপ্টেন। গোসল করে ধোয়া প্যান্ট-শার্ট পরে ভ্রমণের ছাপ চেহারা থেকে কিছুটা দূর হওয়ায় ভালোই লাগছে তাকে। বেশ স্মার্ট মনে হচ্ছে।

‘চলুন। লাঞ্চ টেবিলে লর্ড অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য।’ মেয়েটিকে তার দিকে তাকাতে দেখে বলল ক্যাপ্টেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। তারা নীচতলায় ক্যাপ্টেনের পেছনে একটা বিরাট ঘরে এসে ঢুকল। মেয়েটির ঘরের মতোই এটার দেয়াল, ছাদ কারুকাজ করা, সম্পূর্ণ মেঝে কার্পেটে ঢাকা। ঘরের মাঝে একটা বিরাট পিতলের ঝাড়বাতির নানা রঙের লাইটের আলোয় আলোকিত ঘরখানা। দুটো শোকেসে যেন রাজ্যের জিনিস সাজানো। একটা বড় অ্যাকুয়ারিয়ামে নানা ধরনের মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। ঝাড়বাতির ঠিক নীচে বিরাট ডাইনিং টেবিল। তার চারদিকে চেয়ার আছে।

‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম মাই ক্যাপ্টেন্স ডার্লিং।’

এতক্ষণে কথা শুনে চোখ পড়ল টেবিলের ওধারে দাঁড়িয়ে থাকা লর্ডের দিকে।

‘আসুন, বসে পড়ুন।’ লর্ড তার সামনের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে বলল।

দুজনেই এসে লর্ডের সামনের চেয়ারে পাশাপাশি বসে পড়ল। ভদ্রতার খাতিরেই ক্যাপ্টেনের পাশে বসল মেয়েটি।

‘হও! ক্যাপ্টেন, সত্যিই তোমার পছন্দ আছে।’ হাসি মুখে বলল লর্ড। ‘তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে।’ শুনেই ধক করে কেঁপে উঠল মেয়েটির বুক। হয়তো মেয়েটির কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েছে লর্ডের।

‘তুমি তাকে ও ব্যাপারে কিছু জানাওনি?’

‘সরাসরি জানাইনি’ মুখ নীচু করে বলল ক্যাপ্টেন। মনে হলো খানিকটা লজ্জা পেয়েছে।

‘ঠিক আছে। আমি সব বলব তোমার পক্ষ থেকে।’ এক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার বলল, ‘খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেতে খেতে বলা যাবে খান।’

এর মধ্যে ওয়েটার এসে গেছে। পরিবেশন করা শুরু করল।

‘আপনি নিশ্চয়ই সাব-কন্টিনেন্টের মানুষ।’ মেয়েটিকে অবাক করে দিয়ে বলল লর্ড, তাই আপনাদের খাবারই রান্না করা হয়েছে। আমাদের রাঁধুনি অনেক ধরনের রান্না জানে’, যেন কথার কথা বলল লর্ড।

‘আপনি কীভাবে জানলেন?’ এই প্রথম বসার পর চোখ তুলে তাকাল লর্ডের দিকে। লর্ডও চোখ তুলে তাকাল, মুখে হাসি। তার চোখগুলো বুদ্ধিদীপ্ত, তীক্ষè।

‘অনুমান’, সংক্ষেপে জবাব দিল লর্ড। আপনার দেশ?

‘বাংলাদেশ’, চোখ নামিয়ে বলল মেয়েটি। ‘তবে থাকি আমেরিকার নিউ ইয়র্কে।’ মেয়েটি দেখল সত্যিই সব খাবার তাদের দেশীয়। খানিকক্ষণ নীরবে খেয়ে চলল তিনজনে। একজন ওয়েটার তদারকি করছে হঠাৎ খেয়াল হতেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘এটা তো মুরগির গোস্ত, অন্যটা কিসের?’

‘খাসির’, পাশ থেকে জবাব দিল ক্যাপ্টেন।

আরো কয়েক মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর মুখ খুলল লর্ড। ‘আমি প্রায় সবসময় ব্যস্ত থাকি। আলাদা করে, বিশেষভাবে কথা বলার সুযোগ কম। তাই এখনই খেতে খেতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনি কী বলেন?’

মাথা কাত করে সায় জানাল মেয়েটি। ক্যাপ্টেন মুখ নীচু করে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে মুখের খাবার গিলে পানি খেয়ে শুরু করল লর্ড, ‘আমি তার হয়ে (ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেনকে দেখাল) সংক্ষেপে আপনার সঙ্গে কথা বলব। আপনি আস্তে আস্তে খেতে থাকুন। সেই সঙ্গে আমার কথা শুনুন।’ এক মুহূর্ত দম নিয়ে আবার শুরু করল। ‘গতকাল সকাল বেলা জাহাজ থেকে ও আমাকে ফোন করে জানায় যে, তার জাহাজের এক লোক বাইনোকুলার দিয়ে এক দ্বীপে পাহাড়ের ওপর একটি মেয়েকে সাদা কাপড় হাতে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দেখে অর্থাৎ মেয়েটি তাদের সাহায্য চাইছে, এ কথা ওকে জানানোর পর সে নিজে বাইনোকুলার দিয়ে আপনাকে ওই দ্বীপ থেকে তুলে আনার অনুমতি চাইলে আমি সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি দেই। আপনাকে এমন সময় জাহাজের লোকজন দেখতে পায়, যখন জাহাজ অনেকদূর এগিয়ে যায়। আপনাকে নেয়ার জন্য পুনরায় জাহাজকে ঘুরতে হয়। একনাগাড়ে অনেক কথা বলে থেমে কিছুক্ষণ খেল লর্ড। মেয়েটি লর্ডের কথামতো এতক্ষণ খেয়েই যাচ্ছিল, সেই সঙ্গে শুনছিলও।

লর্ড কী বলতে চাচ্ছে তা মেয়েটির কাছে আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তারপরও গায়ে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল তার। এর মধ্যে তার প্লেট ফাঁকা হয়ে গেছে। ইচ্ছা করলে আরো একটু খেতে পারবে কিন্তু গলা দিয়ে আর কিছু নীচে নামবে না।

‘কি, খাওয়া শেষ হলো? আর কিছু নেবেন না?’ জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন তার দিকে তাকিয়ে।

‘খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, আর কিছু নেব না’, তাড়াতাড়ি বলল মেয়েটি। হাত দিয়ে প্লেট ঢেকে ধরল। কারণ, ওয়েটার তার প্লেটে কিছু দিতে ধরেছিল।

‘ঠিক আছে, হাত ধুয়ে এসে বসুন। তারপর বাকি কথা বলি’, বলল লর্ড।

একপাশে ঝকঝকে সাদা বেসিন, তাতে ঠান্ডা গরম দুই ধরনের পানি কল। হাত ধুয়ে এসে আবার আগের জায়গায় বসল মেয়েটি। এরপর এক এক করে ক্যাপ্টেন ও লর্ড উভয়েই হাত ধুয়ে এসে বসল। লর্ড সামান্যই খেয়েছে।

চেয়ারে বসেই শুরু করল লর্ড, ‘আপনি হয়তো এর মধ্যেই বুঝে গেছেন, আমি এরপর কী বলব?’ থামল। আবার শুরু করল, ‘ঠিক করা হয়েছে, আগামীকাল রবিবার ফ্লাওয়ার্স টাউনে অবস্থিত ও দ্বীপের একমাত্র গির্জায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাপ্টেন ও আপনার বিবাহ হচ্ছে। আশা করি আপনি অমত করবেন না।’

‘আমি রাজি না। আমাকে আমার বাবা-মার কাছে যেতে দিন।’ গলায় দৃঢ়ভাবে ভাব ফুটিয়ে তোলার শক্তি খুঁজে পেল না সে।

‘আপনাকে রাজি হতেই হবে।’ বলল লর্ড দৃঢ়স্বরে। আপনি চাইলেই এ দ্বীপ ছেড়ে যেতে পারবেন না।’

মেয়েটি মুখ দিয়ে কিছু বলতে চাইলেও মুখে কথা জোগাল না। নিরুপায় হয়ে কান্না লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাল।

‘আপনি রাজি না হলেই ভুল করবেন।’ আবার শুরু করল লর্ড। আপনার মতো সুন্দরী মেয়ের জন্য সে অনুপযুক্ত নয়। তাছাড়া সে আমার চাচাতো ভাই, আমার আর অন্য কোনো উত্তরাধিকারী নেই। তাই আমার পরে সেই এখানকার লর্ড হবে, তাহলে কথা এখানেই শেষ। আশা করব, আর অমত করবেন না’, বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল লর্ড। তারপর ক্যাপ্টেন। মেয়েটি উঠে দাঁড়াল চোখ মুছতে মুছতে। দরজার দিকে এগোতে শুরু করল তিনজন।

দ্বিপ্রহরের পর মৃদু ঝাঁকি দিয়ে ছেলেটিকে জাগিয়ে দিল পাহারাদার।

‘নামাজের সময় হয়ে গেছে।’

ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল ছেলেটি। চোখ কচলে পাহারাদারের দিকে তাকাল। কোনো কথা না বলে সামনে জগের পানি দিয়ে অজু করল। দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা কেমন যেন করে ওঠায় আবার বসে পড়ল। বসেই নামাজ পড়ল। মোনাজাতের পর খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে বসল। শক্ত চত্বরে শুয়ে থাকা কষ্টকর।

‘এখন কি কিছুটা সুস্থ লাগছে?’ জিজ্ঞেস করল পাহারাদার।

‘হ্যাঁ।’ জাহাজের ব্যাপারটা খেয়াল হলো ছেলেটির। ‘আপনি কি জাহাজে ছিলেন?’ নীচু স্বরে জানতে চাইল ছেলেটি।

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৪ 1
Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •