জাকির আহমদ

২৪ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৪৮ অপরাহ্ণ ; 501 Views

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-জাকির আহমেদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

(পর্ব-৮)

‘এই রিমোট কন্টোলের মাধ্যমে টাইম বোমাকে অকেজো করে দেব; কিন্তু যদি ফেরার পরে মুখ না খোল, তাহলে তোমাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হবে।’

ছেলেটি যতই শুনছে ততই ঘামছে।

‘টাইম বোমাটি তোমার সিটের ঠিক নীচেই থাকবে’, বলে থামল। টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পানি খেল। যেন ছেলেটির চেয়ে সেই বেশি বিপদে পড়েছে।

‘তবে এত কিছুর পরও বাঁচতে পারবে, যদি পাহাড়ি পথে নীচের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে পারো। ওখানে আমার দুজন লোক থাকবে, তারা টাইম বোমাকে অচল করে দেবে। তাহলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে। তা হলো, নিজের প্রাণটাও বেঁচে যাবে, মুখও খুলতে হবে না। এটাই হলো এই খেলার প্রধান আকর্ষণ। আকর্ষণটা কি বুঝতে পেরেছো?’ এক মুহূর্ত থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার শুরু করল।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮ 1

‘ঠিক আছে খুলেই বলি।’ যেন এসব বলে দারুণ মজা পাচ্ছে ক্যাপ্টেন। ভাব দেখে তাই মনে হয়।

‘তা হলো সন্ধ্যার পর পাহাড়িয়া পথ এমনিতেই অন্ধকার হয়ে যাবে, আকাশে চাঁদও থাকবে না, অন্ধকারে ভয়ঙ্কর দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় নীচে নামতে হবে। বোমা বিস্ফোরণের নির্দিষ্ট সময়ের অর্ধেক অতিক্রম হওয়ার আগেই যদি মুখ খুলতে রাজি হও, তবে তো ওয়াকিটকিতে জানিয়ে দেবে। এদিকে রিমোট টিপে টাইম বোমাকে অচল করে দেব। তুমি সেখানেই গাড়িতে বসে থাকবে, আমরা গিয়ে তোমাকে গাড়ি থেকে নামাব। আর যদি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাও, তবে দ্রুত গাড়ি চালাতে হবে। তুমিই জানো ব্রেক ছাড়া এই পাহাড়ি পথে শুধু ক্লাচ, গিয়ার আর এক্সিলেটরের ওপর দ্রুত গাড়ি চালাতে পারবে কি না। তবে আমি যেভাবে সময়ের হিসাব করেছি, তাতে এক যুগের অভিজ্ঞ ড্রাইভারও আমার মনে হয় পারবে না। তুমি যদি পারো তবে প্রথম বারেই হেরে যাব, তুমি চেষ্টা করতে পারো। কারণ, আমি এমনিতে খারাপ হতে পারি কিন্তু কথা দিয়ে তা ভঙ্গ করি না। বলতে পারো, আমার এই একটি ভালো গুণ আছে। আমার কথা বিশ্বাস কর, সত্যি বলছি তুমি যদি নীচে নির্দিষ্ট জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছতে পারো, তবে প্রথমত তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে, দ্বিতীয়ত মেয়েটির সম্পর্কে মুখ খুলতে হবে না’, শেষের বাক্যগুলো জোর দিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

‘কিন্তু আমি নিশ্চিত, তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবে না’, এ বাক্যটা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর কণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন। যেন ছেলেটির দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। কারণ জোরে চালাতে গেলে তুমি নির্ঘাত গাড়িসহ খাদে পড়ে যাবে। ফলে বোমা বিস্ফোরণের আগেই তুমি পরপারে পাড়ি জমাবে।’

কিন্তু ছেলেটি তা গ্রহণ করল কিনা বোঝা গেল না তাকে দেখে। বেশ কিছুক্ষণ আগে ঘাম মুছে শান্ত হয়ে বসেছে সে। থেমে আবার পানি খেলো ক্যাপ্টেন। ‘কি ভয় লাগছে, তোমার মতে হিরোর তো ভয় পাওয়া সাজে না’, একটু থেমে ছেলেটির মুখের দিকে তাকাল।

‘কি মুখ খুলবে? শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করলাম। এরপর বাঁচতে চাইলে নিজে থেকে জানাতে হবে।

‘এক কথা বারবার ভালো লাগে না। আমি আমার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দিচ্ছি, আর নতুন কিছু বলার নেই’, বিরক্তি প্রকাশ পেল ছেলেটির কণ্ঠে।

‘ও ঠিক আছে। তুমি যদি তোমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেল তাতে আমার আপত্তি নেই।’ যেন হতাশ হয়েছে ক্যাপ্টেন। ‘আচ্ছা, অহেতুক একটা গাড়ি ধ্বংস করার ভূতটা আপনার মাথা চাপল কেন, বলুন তো?’ ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘বেশি কিছু তো ধ্বংস করছি না। পুরনো বাতিল-প্রায় এক জিপ গাড়িকে গ্যারেজে ফেলে না রেখে ধ্বংস করে দেয়া অনেক ভালো। তাছাড়া তোমার মতো একজন হিরোর জন্য একটা সামান্য জিপ ধ্বংস, এটা তো কোনো ব্যাপারই নয়’, বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতে লাগল ক্যাপ্টেন।

‘থামুন, এসব কথাবার্তা আমার মোটেও ভালো লাগছে না।’ বিরক্ত হয়ে বলল ছেলেটি। ‘আপনাদের লর্ড কোথায়? তার সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।’ এ ক্যাপ্টেনের চেয়ে লর্ড হয়তো তার ব্যাপারে কিছুটা উদার হবে। অন্তত তার তাই মনে হয়। মনে মনে সাহায্য চাচ্ছে আল্লাহর কাছে।

‘ওহ হো, তুমি তো জানো না, আমাদের মহামান্য লর্ড তার বিশেষ কাজে গতকাল বাইরে গেছে, ফিরতে কয়েকদিন দেরি হবে। তোমার বিচার আমাকেই করতে বলেছে।’

ছেলেটি এর মধ্যে বুঝে গেছে এ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তার কোনো আপস হবে না, তাই অহেতুক কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকল।

‘সন্ধ্যা হয়ে এলো, এখন ওঠা যাক। গাড়ির কাছে গিয়ে আর কিছু বলে, তোমাকে বিদায় জানাব।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন।

পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। মাথার ওপর দিয়ে মাঝে মধ্যে নানা ধরনের পাখি উড়ে যাচ্ছে।

‘আমার একটা কথা রাখবেন?’ বসেই বলল ছেলেটি।

‘আগে বল।’ সতর্ক হয়ে গেছে ক্যাপ্টেন।

‘আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য অস্ত যাবে, আমাকে শুধু মাগরিবের নামাজ পড়ার সুযোগ দেবেন?’ বলে জবাবের আশায় তাকালো ক্যাপ্টেনের দিকে।

একটু ভেবে ক্যাপ্টেন, ‘উম, ঠিক আছে, আর কিছু?’

‘না।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল ছেলেটি।

আবার চেয়ারে বসল ক্যাপ্টেন। সময় হলে নামাজের দাঁড়িয়ে গেল সে। নামাজ শেষে দুই হাত তুলল মহান আল্লাহর দরবারে ‘হে আল্লাহ। তুমি আমার জানা, অজানা, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় করা সব ধরনের গুনাহ মাফ করে দিও। …হে আল্লাহ, আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা আদৌ ঠিক হয়েছে কিনা তা আমার ভালোভাবে বোধগম্য হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে থাকলে আমাকে তুমি মাফ করে দিও। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করো। হে আল্লাহ, তুমিই তো রিজিকের মালিক, তুমি আমার রিজিক বৃদ্ধি করে দাও। হে আল্লাহ, এটাই যেন আমার শেষ নামাজ না হয়।’ তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

তাকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে প্রায় জোর করে জিপের কাছে নিয়ে আসা হলো। পাশেই এলএমজি হাতে তিনজন তাকে পাহারা দিচ্ছে। তাছাড়া সে বিকেল থেকেই লক্ষ্য করছে, ক্যাপ্টেনের প্যান্টের ডান পকেটটা বেঢপ উঁচু হয়ে আছে। আর ক্যাপ্টেন যে কী ধরনের ক্ষিপ্র তা তার জানা আছে। যদিও পালানোর উপায় নেই আর এরপর তা পাবেও না। শেষ চেষ্টা কি করে দেখবে? কীভাবে? সে ইচ্ছায় ইস্তফা দিল। কারণ তা চরম বোকামি হয়ে যাবে। খালি হাতে এতগুলো অস্ত্রের সামনে সে কিছুই করতে পারবে না। শুরু করতেই তাকে শেষ করে দেয়া হবে। তাই নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল।

‘সময় হয়ে গেছে। এবার বাকি তথ্যগুলো জানিয়ে তোমাকে বিদায় দেব, হয়তো তা হবে চির বিদায়।’ জিপটা থেকে হাত কয়েক দূরে এসে থামতেই কৌতুক করে বলল ক্যাপ্টেন। নীরবে শুনতে লাগল ছেলেটি।

‘এই দুর্গম পাহাড়িপথে মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ ত্রিশ কিলোমিটার বেগে নামা যাবে। বেশিরভাগ সময় বিশ কিলোর বেশি চালানো যায় না। কখনোবা গতিবেগ পাঁচ কিলোমিটারে নামাতে হয়। এভাবে এখান থেকে সাড়ে দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক জায়গায় পাহাড়ি পথটা নিচ থেকে অনেকটা খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে আবার তেমনি বিপজ্জনকভাবে নীচের দিকে নেমে গেছে। ওখানে পৌঁছতে হবে, বোমা বিস্ফোরণের সর্বনিম্ন সময় পাঁচ মিনিট পর। ওখানে আমি এর মধ্যে দুজনকে পাঠিয়েছি। তারা পথে তোমার পৌঁছার অপেক্ষায় আছে। ওই একই পথ তোমাকেও এই জিপে পাড়ি দিতে হবে। তুমি গাড়িতে স্টার্ট দেবে, তারপর আমি নিজ হাতে দেড় ঘণ্টা সময় দিয়ে টাইম বোমা অ্যাডজাস্ট করাব, ঠিক দেড় ঘণ্টা পড়ে ঘটবে বিস্ফোরণ।’ লোকটির কথা শুনতে শুনতে দর দর করে ঘামছে ছেলেটি। বুঝতে পারছে সে, তাকে কী ভয়ানক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

‘তোমার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে না। কারণ, ব্রেক না থাকায় তোমাকে পুরো আধা ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে তোমার একটা দুর্বল দিক হলো ওই পথের সঙ্গে তোমার একদম পরিচিতি নেই, অথচ আমরা কোনো বাঁকে গাড়ি থামতেই সামনের পথ ডানে গিয়েছে, না বামে তা বলে দিতে পারি। তারপরও ও পথে গাড়ি চালাতে এখনো আমার বুক কাঁপে’, একটু দম নিল ক্যাপ্টেন।

‘যা বলার ছিল এর মধ্যে বলেছি, শুধু এতটুকু বলা বাকি আছে, অহেতুক নিজের জীবন বাজি রাখছ। তারচেয়ে বরং…… থাক, তুমি যদি মৃত্যুর পেছনে ছুটো তাহলে আমার কী করার থাকতে পারে?’ বলে থামল ক্যাপ্টেন।

‘ড্রাইভিং সিটে উঠে বসো। সময় বয়ে যাচ্ছে, বিদায় বেলা এসে গেল।’

কিন্তু নড়ল না ছেলেটি বাঁচার উপায় ভাবছে।

‘স্বেচ্ছায় না উঠলেও অনিচ্ছায় উঠতে হবে, উঠতে না চাইলেও শেষ সময়ে কিন্তু আদর করতে ছাড়ব না’, যেন হুমকি দিল ক্যাপ্টেন।

একবার ভাবল, বলে দেবে মেয়েটির কথা। পরক্ষণে ভাবলাম তাহলে মেয়েটিকে বাকি জীবন মানুষরূপী এ পশুর নির্যাতন সইতে হবে, হয়তো আর কোনো দিন বাবা-মা, ভাই-বোনদের মুখ দেখাতে পারবে না। মেয়েটি তাকে বিশ্বাস করেছে। সে বিশ্বাসঘাতক হতে পারবে না।

ক্যাপ্টেনের হুমকিপূর্ণ কথাগুলো তার কানে না পৌঁছলেও তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আল্লাহর নাম নিয়ে জিপের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল।

ক্যাপ্টেন তাকে সিটের বাঁধার জন্য এগোল। হঠাৎ পাশ থেকে একজন বলল, ‘বসো, আপনার কষ্ট করার দরকার নেই, আমিই বদমাইশটাকে বাঁধছি। আপনি পিছিয়ে দাঁড়ান।’ গলায় অনুরোধ ঝরে পড়ল লোকটির কণ্ঠে।

ঝট করে ছেলেটি তাকাল সেদিকে। দেখল, একটু দূরে দাঁড়ানো কয়েকজনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে একজন। রাতে চত্বরে জ্বালানো লাইটের হালকা আলোতেও লোকটিকে চিনতে কষ্ট হলো না। এ লোকটিই তাকে প্রথম দিন চাবুক মেরে ছিল।

‘আপনার এর সঙ্গে পরিচয় আছে?’ লোকটিকে দেখিয়ে বলল ক্যাপ্টেন।

কোনো জবাব দিল না ছেলেটি। ক্যাপ্টেনকে তার অসহ্য লাগছে।

‘এ হচ্ছে, আমাদের সবচেয়ে বড় জাহাজ সি কুইন ওয়ানের ফাস্ট ইঞ্জিনিয়ার।’ পরিচয় করিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। চুপ করে থাকল ছেলেটি।

লোকটি এমনভাবে ছেলেটির কাছে এসে দাঁড়াল যে ক্যাপ্টেন পিছিয়ে যেতে একরকম বাধ্য হলো।

 

গাড়ির বাঁ দিকে একটু দূরে তিনজন গার্ড আছে। জিপের ড্রাইভিং সিঠ ডান দিকে। লোকটা জিপের পেছন থেকে মোটা রশির বান্ডিলটা নিয়ে সিটের সঙ্গে ছেলেটিকে পেঁচিয়ে বাঁধতে শুরু করল। একবার পেছনে ঘুরে দেখল, হাত কয়েক দূরে তাদের দিকে চেয়ে আছে ক্যাপ্টেন। তার পেছনে আছে দুজন গার্ড। একটু দূরে আরো কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। একবার ছেলেটির খুব কাছে সরে এলো ইঞ্জিনিয়ার। বুঝল এভাবে নিরাপদ নয়। পেছনে গিট দেয়ার জন্য জিপের পেছনে চড়ে ছেলেটির সিটের পেছনে বসল। তার ধীরে ধীরে গিট দিতে শুরু করল।

‘শান্ত থাক’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দেখল শান্তই আছে সে।

‘আমার কমেন্ট বুঝতে পারছ?’ জিজ্ঞেস করে তাকাল ছেলেটির দিকে।

‘পারছি।’ দুজনই ইংরেজিতে অতি নীচুস্বরে কথা বলছে। যেন দুহাত দূরের কেউ শুনতে না পায়।

ছেলেটি বুঝতে পারছে না লোকটি তাকে কী বোঝাতে চায়।

‘যদি কোনোভাবে বাঁচতে পার, তবে পূর্ব দিকে সমুদ্রের ধারের বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িতে এসো, আমি অপেক্ষা করব’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘ঠিক আছে’ বলে সায় দিল ছেলেটি। আর কিছু বলল না লোকটি। কারণ পাশেই আছে ক্যাপ্টেন। ধরা পড়তে পারে।

তাহলে দুজনকেই করুণ পরিণতির শিকার হতে হবে। গিট দেয়া শেষ হলে গাড়ি থেকে নেমে গেল ইঞ্জিনিয়ার।

ক্যাপ্টেন এগিয়ে এসে প্রথমে ছেলেটিকে বাঁধা ঠিক হয়েছে কিনা তা দেখল। তারপর ছেলেটিকে সার্চ করে তার কোমরে গোঁজা কাঁচির অংশটা পেল। দূর থেকে ভেসে আসা লাইটের আলোয় ছেলেটি সিটে বসে যতদূর নাগাল পেতে পারে তার সবখানে সার্চ করে কিছুই পেল না।

‘চাবি লাগানো আছে, স্টার্ট দাও’ যেন নরম সুরে আদেশ করল ক্যাপ্টেন।

কিন্তু নড়ল না ছেলেটি। বাক্য ব্যয় না করে ছেলেটির দিকে শীতল দৃষ্টি হেনে চাবিতে নিজেই মোচড় দিল ক্যাপ্টেন। স্টার্ট নিল গাড়ি।

‘চেষ্টা করে দেখ তো তোমার সিটের নীচে হাত দিতে পারো কিনা’, হেসে বলল ক্যাপ্টেন। তাকে এমনভাবে বাঁধা হয়েছে যে ডানে, বাঁয়ে, সামনে কোনো দিকেই হেলতে পারল না। তার পেট থেকে বুক পর্যন্ত রশি দিয়ে পেঁচানো কোনোভাবেই তার হাত সিটের নীচে পৌঁছতে পারল না। পকেট থেকে একটা ইলেকট্রনিক্সের ঘড়ি বের করে ছেলেটির ডান হাতে পরিয়ে দিল ক্যাপ্টেন। তারপর কোনো কথা না বলে একটা ক্ষুদে বোতামে টিপে মুখে দিকে তাকাল।

‘আমি তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না, তার আগেই বিদায় নিতে চাই। সময় মানব জীবনের যে কত অমূল্য সম্পদ, তা আজ বুঝতে পারবে। আমি টাইম অ্যাডজাস্ট করেই উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে শুরু করবে। তাই আগেই গাড়িতে ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে রাখ’, থামল ক্যাপ্টেন।

‘হয়তো তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ বলে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল ছেলেটির দিকে। কিন্তু ছেলেটি হাত না বাড়ানোয় ফিরিয়ে নিল হাতখানা।

‘আমি জানি তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে গিয়ে নিজের জীবন বাজি রাখবে, তবু মুখ খুলবে না। আমি নিশ্চিত তুমি বাঁচতে পারবে না, তাই জানিয়ে দিচ্ছি। এখন যে অপমান করলে এর জন্য না হলেও আমাকে চড় মারার প্রতিশোধ অবশ্যই নিতাম। তুমি সত্যি বুদ্ধিমান, থাক আর কথা না বাড়াই, এখন দেখ ঘড়িতে ক’টা বাজে। বোতাম টিপে দেখল সাড়ে ছয়টা বাজতে দুই মিনিট বাকি। এদিকে ক্যাপ্টেন নিজের ঘড়ি দেখে বসে পড়ল তার পাশে। তার সিটের নীচে রাখা টাইম বোমায় টাইম অ্যাডজাস্ট করতে লাগল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে ফার্স্ট গিয়ার দিয়ে ক্লাচ চেপে রেখে, পা এক্সিলেটরের ওপর আলতোভাবে রাখল। একটু পরই ঝট করে উঠল ক্যাপ্টেন। ততক্ষণে নড়ে উঠেছে ঝরঝরে পুরনো জিপ।

‘গুড লাক’ বলে চেঁচাল ক্যাপ্টেন। কিন্তু শুনল কিনা ক্যাপ্টেন তা বুঝতে পারল না। এর মধ্যে তার কাছ থেকে জিপ সরে গেছে। সবাই জিপটিকে পাহাড়ের ওধারে হারিয়ে যেতে দেখল। যখন এক্সিলেটরের চেপে ধরে ক্লাস ছাড়ছে ছেলেটি তখন একবার দূরে দাঁড়ানো ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল লোকটি।

সেকেন্ড গিয়ার দিয়ে ফেলেছে ছেলেটি। এর মধ্যে বুঝে ফেলেছে গাড়ির বডিটা ঝরঝরে হলেও এর ইঞ্জিনের কন্ডিশন এখনো যথেষ্ট ভালো। ব্রেক ছাড়া গাড়ি কীভাবে কন্ট্রোল করতে হয় তা জানা আছে তার, যদিও খুব কঠিন কাজ। লোকগুলোকে বেশ পেছনে ফেলে এসেছে সে। পথ এতই দুর্গম যে, থার্ড গিয়ার দেয়া যাচ্ছে না।

একটু পরই ফার্স্ট গিয়ারে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়। গতিবেগ দশ-বার কিলো। দ্রুত স্টিয়ারিং কাটাতে হচ্ছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। তাকে অবশ্যই জিততে হবে। সে জন্য সে ঝুঁকি নিতে রাজি আছে। কারণ ঝুঁকি নেয়া ছাড়া সাফল্য আসে না। মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাচ্ছে সে।

ঘড়িতে দেখল এর মধ্যে বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে। মাইল মিটারে দেখল এখন পর্যন্ত অর্ধ-কিলোমিটার এসেছে। ঘামতে শুরু করল ছেলেটি নিজের অজান্তেই। আরো দ্রুত এগোতে হবে। তাতে ঝুঁকি অনেক বাড়বে। সেকেন্ড গিয়ার থেকে এ প্রথম থার্ড গিয়ারে দিল ছেলেটি। একটু ডানে-বাঁয়ে তীক্ষè মোড় নিতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে একধারে পাহাড় অন্য ধারে গভীর খাদ পেরোতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ইঞ্চি পেরোতে হচ্ছে তাকে মৃত্যুর আশঙ্কা মাথায় নিয়ে।

দ্রুত ডানে-বাঁয়ে বাঁক নিতে হলে এক্সিলেটর থেকে পা সরিয়ে দ্রুত স্টিয়ারিং কাটছে। মাঝেমধ্যেই খাদের কিনারায় গিয়ে পড়ছে বা পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে যেন প্রতিবারে পার পেয়ে যাচ্ছে সে। নিজেও বুঝতে পারছে না। তবে ছেলেটি মাথা ঠান্ডা রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগোচ্ছে। চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষè হয়ে উঠেছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সজাগ হয়ে আছে। অত্যন্ত সতর্ক আছে সে। গতি বেশি থাকা অবস্থায় তীক্ষè মোড় নিলে মাঝেমধ্যেই চাকা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। হঠাৎ ডানে দ্রুত বাঁক ঘুরতে গিয়ে বাঁয়ে চাকা দুটি মাটি থেকে একটু ভেসে উঠল। অল্পের জন্য এ যাত্রায় খাদে পড়া থেকে বেঁচে গেল।

পরের দশ মিনিটে এবার প্রায় এক কিলো এগিয়েছে। কিন্তু এভাবে চালাতে গিয়ে কোনো সময় সমস্ত সম্ভাবনার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এভাবে মরতে চাচ্ছে না ছেলেটি। কিন্তু তারইবা কী করার আছে?

এখন একটাই উপায় আছে তা হলো হার মানা, ক্যাপ্টেনের আছে মুখ খোলা। তার ওপর যদিও প্রতিশোধ নেয়, তারপরও কমপক্ষে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। হঠাৎ খেয়াল হলো তার তো জলাতঙ্কও হতে পারে। ক্যাপ্টেনের কাছে মাফ চেয়ে নিলেই হয়তো সে তার এআরভির ব্যবস্থা করে দেবে। তবে তো সে আরো কিছুদিন বাঁচতে পারবে। হঠাৎ যেন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে ব্যাকুল হলো ছেলেটি। গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে।

স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে লাগানো ওয়াকিটকিটা খুলে তা হাতে নিল। কী মনে করে কয়েক মুহূর্ত সে তাকিয়ে থাকল হাতে এন্টিনা যুক্ত যন্ত্রটির দিকে। তারপর ছুড়ে দিল দূরে। হারিয়ে গেল অন্ধকারে। এখনো ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলার পনের মিনিট সময় আছে। এই সময়টা বড় বিরক্ত করত ওই যন্ত্রটি। সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। যদি না সত্য মিথ্যার সামনে মাথা নত না করে। সে মরবে, কিন্তু সত্যকে পদানত হতে দেবে না। আবার গাড়ি চালানোয় মন দিল। ঝুঁকি নিয়ে এবার বেশ জোরেই চালাচ্ছে গাড়ি।

থার্ড গিয়ারে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে প্রায় পঁচিশ কিলো স্পিডে চলছে গাড়ি। উত্তেজনায় রাতের ঠান্ডা বাতাস টেরই পাচ্ছে না। আগে বুঝতে পারেনি ছেলেটি। যখন বুঝল তখন সময় শেষ হয়ে গেছে। ডানে পাহাড় তা সে আগেই দেখেছে। পাহাড়ের ওপাশে যে পথ হঠাৎ ডানে মোড় নিয়েছে তা বুঝতে পারেনি। মোড়ে রাস্তায় বাঁয়ে গভীর খাদ। গাড়িটা কীভাবে কন্ট্রোল করল নিজেও বলতে পারবে না। তবে প্রথমেই এক্সিলারেটর ছেড়ে দিয়ে ক্লাচ করেই ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। তারপরই ক্লাচ ছেড়ে দিতেই মাটিতে চাকা ঘর্ষণের কর্কশ আওয়াজ পাওয়া গেল। এক ধাক্কায় পঁচিশ কিলো থেকে দশ কিলোতে নেমে এত গতি।

তারপর আবার এক্সিলারেটর হালকাভাবে চেপে ধরে দ্রুত ডানে স্টিয়ারিং কাটাল সে। গাড়ির সামনের ডান চাকা খাদে পড়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। এ যাত্রাও বেঁচে গেল। আবার থার্ড গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। এভাবে কোনো গাড়ি পঞ্চাশ কিলো চললেই সেই গাড়িকে কোনো গ্যারেজের সামনের শোপিস হিসেবে পাঠাতে হবে ভাবল ছেলেটি।

তাকে ওই জায়গায় পৌঁছতেই হবে, যেখানে দুজন লোক তার টাইম বোম নিষ্ক্রিয় করার জন্য অপেক্ষা করছে। তারপর যেভাবেই হোক সে ক্যাপ্টেনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে কিন্তু কীভাবে তা এখনো ঠিক করেনি, সময় নেই।

পরবর্তী আধা ঘণ্টায় চার কিলো এগোল। আর বাকি আছে আধা ঘণ্টা। এখনো পাঁচ কিলো পথ বাকি আছে। কিছুটা হলেও সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। এবারো থার্ড গিয়ারে প্রায় পঁচিশ কিলো স্পিডি পাহাড় বেয়ে নীচে নামছে জিপ। বাঁয়ে পাহাড়ের সারি রেখে ছুটছে গাড়ি। ডানে খাদ। হেডলাইটের আলোয় বেশি সামনে দেখা যাচ্ছে না। দৃষ্টি তীক্ষè রেখে গতি বজায় রেখেছে। হঠাৎ ডানে তীক্ষè মোড় নিল পথ। বায়ে খাদ। এবার আর কোনো কথাই শুনল না। সোজা নেমে গেল খাদে। খাদটা বিপজ্জনকভাবে ঢালু হলে অনেক নীচে নেমে গেছে। সোজা নীচে নামতে লাগল গাড়ি। এই স্পিডে কোথাও ধাক্কা খেলে মুহূর্তে সব চুরমার হয়ে যাবে। মাথা ঠান্ডা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল সে। প্রথমেই ফার্স্ট গিয়ারে নিয়ে এলো গাড়ি। তারপর ক্লাচ, এক্সিলারেটর দুটি থেকেই পা সরিয়ে নিয়ে দুই হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরল। গতি কমে এসেছে। এখন ঘণ্টায় দশ কিলো স্পিডে নীচে নামছে। এ স্পিডে ধাক্কা খেলে তেমন ক্ষতি হবে না। হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা স্মরণ হতেই শিউরে উঠল ছেলেটি। তা হলো এ ঢাল থেকে যদি এমন কোনো খাদে পড়ে যার কোনো ঢাল নেই, তাহলে সোজা কয়েকশ’ ফুট নীচে…। আর ভাবতে চাইল না সে। এখন কী করা যায় তাই ভাবতে লাগল। একটাই উপায় আছে। ডানে কাটল গাড়ি। সোজ হলো বটে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গাড়িয়ে পড়তে লাগল গাড়িসহ। প্রথমে বামে কাত হয়ে পড়ে গেল। তারপর চারটা চাকাই ওপরে চলে গেল। এরপর ডানে কাত হলো। তারপরই সোজা হলো; কিন্তু স্থির হলো না। গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নামতে লাগল। কত পাক খেয়েছে হিসাব করেনি। তার তেমন কোথাও লাগেনি। জিপে বর্ষাকালে প্লাস্টিকের হুড দেয়ার জন্য স্টিলের ফ্রেম করাই ছিল। সেগুলোর ওপর দিয়েই সব ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেল। তবে সেগুলো দুমড়ে-মুচড়ে একাকার। সে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা থাকায় ছিটকে পড়েনি।

এমন সময় একটি বড় টিলার গায়ে ধাক্কা লেগে থেমে গেল জিপ। তবে ডানে থেমেছে। ফলে সে নীচে আছে।

গাড়ির স্টার্ট অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছ। হেডলাইট নিভে গেছে। হয়তো ভেঙেও গেছে।

ঘড়িতে দেখল আর দশ মিনিট আছে বিস্ফোরণের। কী করবে বুঝতে পারছে না। বারবার ঢোক গিলছে। ঘামছে দরদর করে। আল্লাহর কাছে শুনাহ মাফ চাচ্ছে, সাহায্য প্রার্থনা করছে। নিজেকে শান্ত রাখার জন্য নিজের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাকে।

গড়িয়ে নীচের নামার সময় টাইম বোমটি কোথাও পড়ে যায়নি তো। কিন্তু তা তো সে নিশ্চিত হতে পারছে না। যদি গাড়িতে তারই ছিটের নীচে থেকে থাকে তাহলে……। আর ভাবতে চাচ্ছে না সে। জানে তারপর কী হবে। তার চিহ্নও হয়তো পাওয়া যাবে না। গাড়ির বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে যাবে নানা দিকে। তারপর বিজয়ীর হাসি হাসবে ক্যাপ্টেন।

পানিতে পড়ে মানুষ খড়কুুটোকেও ভেসে থাকার অবলম্বন মনে করে। ছেলেটিরও অবস্থা তাই হয়েছে। এখন একটাই উপায় আছে, দড়িটা যদি কোনোভাবে কাটা যায়। কিন্তু কী দিয়ে কাটবে? এপাশ-ওপাশ হাতড়াচ্ছে সে কিছু পাওয়ার আশায়। ঘড়িতে দেখল আর সাত মিনিট আছে। ব্যস্ত হয়ে উঠল সে। হঠাৎ দেখল উইন্ডশিল্ডের কাচ ভাঙা। কতগুলো টুকরো ফ্রেমের সঙ্গে এখনো আটকে আছে। ঝট করেই বুদ্ধিটা মাথায় এলো। শুয়েই কোনোমতে সামনে ঝুঁকল। গড়িয়ে নীচে পড়ার সময় বাঁধন একটু ঢিলে হয়েছিল বলেই হয়তো শেষ পর্যন্ত উইন্ডশিল্ডের ফ্রেমে হাত নিয়ে যেতে পারল। এক ঝটকায় ফ্রেমে আটকে থাকা কাচের একটা টুকরো ভেঙে নিল। ভাঙতে গিয়ে হাত কেটে গেল। টেরই পেল না সেটা। দ্রুত রশি কাটতে শুরু করল। ঘড়িতে দেখল পাঁচ মিনিট বাকি আছে। দ্রুত হাত চালাতে লাগল। এক সময় একটা রশি কেটে গেল। এত রশি এক এক করে কাটতে যাওয়া হবে বোকামি। পেঁচানো রশি খুলতে লাগল দ্রুত হাতে। ঘড়িতে দেখল আর দেড় মিনিট আছে। সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আল্লাহর নাম নিচ্ছে। অবশেষে এক সময় মুক্ত হয়ে গেল। রক্তাক্ত হয়ে গেছে হাত দুইখানা। দড়িগুলোতেও রক্ত লেগেছে। সেদিকে খেয়াল নেই। আগে গাড়ি থেকে বের হয়ে সরে যেতে হবে।

এরপর ছেলেটি কীভাবে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো জানে না। তারপর দুকানে আঙুল ঢুকিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে দিল দৌড়। পেছনের প্রচণ্ড শব্দে হোঁচট খেয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সে। কানের পর্দা ফেটে গেল কিনা বুঝতে পারছে না। তবে দ্রুত উঠে বসে পেছন ফিরে তাকাল।

যা দেখল তাতে শিউরে উঠল নিজের অজান্তেই। দেখল জিপের মধ্যে আগুন ধরে গেছে। সে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশমুখে উঠছে। এত দূর থেকেও আগুনের তাপে যেন চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। গাড়িতে থাকলে এতক্ষণে তার কী অবস্থা হতো ভাবতেই দ্বিতীয়বার শিউরে উঠল। এবারো মহান আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। সে যেন নতুন জীবন পেল।

এখানে অপেক্ষা না করাই নিরাপদ। যতদূর সম্ভব দ্রুত ক্যাপ্টেনের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে হবে। একটু ভেবেই নীচে নামতে শুরু করল। এতকিছুর পর শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। বাম হাত অনেকটা কেটে গেছে। ডান হাত দিয়ে কাটা জায়গায় টিপে ধরেছে যাতে রক্ত না বের হয়। তবুও রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না দেখে পায়জামার ডান পায়ের নীচের একাংশ ছিঁড়ে কাটা জায়গাটা বেঁধে ফেলল। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। এই সামান্যর ওপর দিয়ে যে তার জানটা বেঁচে গেছে তাই ঢের। অনেকক্ষণ পর নীচে পৌঁছে গেল সে। পথিমধ্যে এবার সামান্য সময় বিশ্রাম নিয়েছে।

যেখানে এসে পৌঁছেছে তা থেকে বেশ দূরে গ্রাম। বাড়িগুলোর ভেতর থেকে মিটিমিটি আলো আসছে। ডানে-বাঁয়ে দুই দিকেই সমুদ্র বেশ দূরে। পূর্ব ধারে আছে সেই ভদ্রলোকের বাড়ি, যে তার জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু কেন? কোনো সন্তোষজনক উত্তর নিজেকে দিতে পারল না। তার ডানদিকে পূর্ব দিক। সতর্ক থেকে পা বাড়াল। চিন্তা করছে যে, যে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটছে হয়তো তার শব্দ এ দ্বীপের সবাই শুনতে পেয়েছে। ক্যাপ্টেন হয়তো এ ক্ষণে বিজয়ীর হাসি হাসছে। নাকি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ঘটনাস্থল দেখতে বেরিয়ে আসছে? বিস্ফোরণ কোথায় হয়েছে তা হয়তো হেডকোয়ার্টার্স থেকেই দেখা গেছে। রাতে না গিয়ে হয়তো দিনেই দেখতে যাবে। তবে এতটুকু ধরে নেয়া যায়, এ অন্ধকার রাতে গার্ডরা তাকে দেখলে ভূত ভাবতে পারে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে সে পূর্ব দিকে পৌঁছে গেল। পাশেই গ্রাম। বাড়িগুলোর বাইরে তেমন লাইট জ্বালা নেই। পথঘাট একরকম অন্ধকারেই ডুবে আছে। তবে বাড়ির ভেতরে প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। সমুদ্রের ধারের বাড়িগুলোর নম্বর দেখছে। বেশি খুঁজতে হলো না, একটু পরেই পেয়ে গেল বিয়াল্লিশ নম্বর বাড়িটা। ছিমছাম সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো কাঠের বাড়িটা। বাড়ির সামনে বাগান। তাতে নানা ধরনের ফুলের গাছ, অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বড় করা হয়েছে তার ছাপ স্পষ্ট। আবার তাকালো বাড়িটার দিকে। বাড়িটার কোনো নাম নেই। এ বাড়িই তো? নম্বর তো ঠিকই আছে।

আল্লাহর নাম নিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠক ঠক করে দুবার শব্দ করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল দরজা। যেন জানত যে সে এখনই আসবে। ঘরের ভেতরের আলো তার ওপর এসে পড়ল। চোখে হঠাৎ আলো পড়ায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দেখল তার সামনে ইঞ্জিনিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। তাকেই অবাক হয়ে দেখছে। আপনি স্বয়ং এসেছেন! আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আসুন আসুন, ভেতরে আসুন, কেউ দেখে ফেলবে। সরে ছেলেটিকে ঢোকার জায়গা করে দিল। ঘরের ভেতরে ঢুকল ছেলেটি। বসতে বলায় একটা চেয়ারে বসে পড়ল সে। সুন্দর সাজানো ঘরটি। লোকটির রুচির তারিফ করল মনে মনে।

‘পথে আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?’ ছেলেটির পাশে বসতে বসতে বলল ইঞ্জিনিয়ার। তাকাল ছেলেটির দিকে। প্রথমেই চোখ পড়ল তার বুকের ক্ষতগুলোর দিকে। এখনো শুকায়নি।

তারপর হতের দিকে তাকিয়ে ‘আপনি বসুন’ আমি আসছি। বলে চলে গেল সে। ফিরে এলো স্যাভলন, তুলা ও ব্যান্ডেজ নিয়ে। বসে গেল ডাক্তারের ভূমিকায়। হাতে প্যাঁচানো রক্তাক্ত কাপড়টা খুলেইÑ ‘ইস, কতদূর কেটেছে!’ বলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। এই প্রথম ছেলেটি তার হাতের অবস্থা দেখল। নাহ লোকটি বাড়িয়ে বলেনি।

‘তারপর, আপনি কীভাবে পালালেন, তারপর কী হলো, আবার ধরা পড়ার সময় মেয়েটি ছিল না কেন, সব খুলে বলুন। আমাকে আপনার বন্ধু ভাবতে পারেন।’ স্যাভলন, তুলা দিয়ে কেটে যাওয়া জায়গায় পরিষ্কার করতে করতে বলল লোকটি।

সংক্ষেপে সব খুলে বলল ছেলেটি। এমনকি, কী মনে করে জেলের কথাটাও বলল। কোনো কিছুই বলেনি লোকটি। শুধু শুনেছে। ততক্ষণে ব্যান্ডেজ করা শেষ হয়েছে। ব্যথা কিছুটা কমে গেছে।

‘পরে আরো কথা হবে, এবার গোসল করে নিন’, চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল লোকটি।

‘গোসল করলে তো ভালোই হয়।’ তার সারা গায়ে ধুলাবালি লেগে থাকায় তার অস্বস্তি লাগছে। বাথরুমে এসে ঢুকল ছেলেটি। দেখল নতুন এক সেট শার্ট-প্যান্ট। বুঝতে পারল তারই জন্য রাখা হয়েছে এগুলো। এ দ্বীপে পায়জামা-পাঞ্জাবি পাওয়া যাওয়ার কথা না। তাছাড়া তার পরিধেয় বস্ত্র বলতে একমাত্র পায়জামাটি। তাও তাকে ছিঁড়তে হয়েছে আজ। অনেক দিন ধরে পরে থাকায় এমন অবস্থা হয়েছে যে যখন-তখন ছিঁড়ে যেতে পারে। গোসল করে শার্ট-প্যান্ট পরে বের হলো সে।

‘ভালোই মানিয়েছে, আজ ফেরার পথে দুই সেট কিনে এনেছি।’ তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বসে থাকা ইঞ্জিনিয়ার বলে উঠল।

এরপর এশার নামাজ পড়ে নিল ছেলেটি। তারপর খেতে বসল দুজনে। এক সময় খাওয়ার পর্ব সমাপ্ত হলো।

‘আমি আর বিশ্রাম করব না, মেয়েটি হয়তো ঠান্ডায় কাঁপছে, আমি গিয়ে তাকে এ শার্টটা পরতে দেব’, বলে নিজের শার্টটা দেখাল। ‘আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি, আর…’ একটু দ্বিধা করে বলেই ফেলল। ‘আমাদের যদি কোনো দেশের উপকূলে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দিতেন, তবে বেঁচে যাই। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াতে গেল ছেলেটি।

তাকে আবার বসিয়ে দিল ইঞ্জিনিয়ার, আরে বসুন না, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন, আমি আপনাকে দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে আসব।’ আপনি দ্বীপে পৌঁছে দিতে যাবেন, এ রাতে?’ বিস্ময়ের সঙ্গে বলল ছেলেটি।

‘কেন আপনি যদি রাতে সুদূর আমেরিকার দিকে পাড়ি জমাতে পারেন, তবে কি আমি এই রাতে আপনাকে পাশের দ্বীপে পৌঁছে দিতে পারব না?’ হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এত রাতে নৌকা কোথায় পাবেন?’

‘আমার নিজের সৈকতে ডাঙ্গায় তুলে রাখা আছে। এখন কাজের কথায় আসি, আর নৌকায় যেতে আপনার টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা শুনব। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে যেন কথা গুছিয়ে নিয়ে শুরু করল ইঞ্জিনিয়ার। আপাতত কোনো দেশের উপকূলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। যতদিন কোনো ব্যবস্থা করতে না পারি, ততদিন আপনাদের কোনো দ্বীপে লুকিয়ে থাকতে হবে। অবশ্য আপনারা যে দ্বীপে আছেন, সেটা এ দ্বীপের কাছে হওয়ায় সেখানে থাকা চলবে না। বলে দম নিল ইঞ্জিনিয়ার।

তাহলে কোথায় থাকব?’ ফাঁক পেয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘বলছি, বলছি। এ দ্বীপের দক্ষিণে দূরে আরো একটি দ্বীপ আছে। ওই দ্বীপটা এ মূল দ্বীপ থেকে দেখতে পাওয়া যায় না। তাছাড়া সহজে ওদিকে কেউ যায় না। ওই দ্বীপটায় ছোট ছোট টিলা আছে, গাছপালা আছে, আর আছে একটা কেবিন; যাতে আপনারা থাকতে পারবেন। এছাড়া এ অঞ্চলে আপনাদের লুকিয়ে থাকার মতো আর ভালো জায়গা নেই। কাল রাতে আমি আপনাদের ওই দ্বীপে নিয়ে আসব। কোনো চিন্তা নেই, ওখানে আপনারা বাড়ির মতোই থাকতে পারবেন।’

‘এত ঝামেলায় না গিয়ে আমাদের একটা ছোট নৌকা জোগাড় করে দিলে হয় না!’ কথাটা শেষ করতে পারল না ছেলেটি।

‘উহু! কখনোই না, কোনো দেশের উপকূল এখান থেকে দেড় হাজার কিলোমিটারের কম নয়। জাহাজের রুটগুলোও অনেক দূরে। তাছাড়া আপনারা যে অভিজ্ঞ নাবিক নন, তা হলফ করে বলতে পারি। নৌকায় সমুদ্রে খুব জোর দুই দিনের বেশি টিকবেন না। নিত্যন্ত ভাগ্যক্রমে এ দ্বীপ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগেই আপনাদের নৌকাটি উল্টে গিয়েছিল। বলে এক মুহূর্ত থামল। যদিও সম্মুখে করা ঠিক না তারপরও আপনার সাহসের প্রশংসা করতেই হচ্ছে। অবশ্য আপনার সাহসের পরিচয় জাহাজেই পেয়েছিলাম।’

‘তার মানে?’ নিজের অজান্তে গলায় স্বর উঁচু হলো ছেলেটির। তার মানে আপনি জাহাজে আমাকে ওঠানোর জন্য দড়ি নামিয়ে দিয়েছিলেন, দরজার আড়াল থেকে আপনিই আমার সঙ্গে কথা বলেছেন।’

‘জি, আমিই’, মাথা নীচু করে জবাব দিল ইঞ্জিনিয়ার। যেন লজ্জা পেয়েছে।

‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। যেন নিজের প্রতি অভিমান করেছে সে।

ঘটনাটা খুলে বলুন তো, আমি তারপর থেকে এ ব্যাপারে উদগ্রীব ছিলাম।’

‘সেই দ্বীপে যেখান থেকে মেয়েটিকে ধরে আনা হয়, সেই দ্বীপের কথা বলছি, মেয়েটিকে নিয়ে আসছে এমন সময় আমি আপনাকে একটা পাহাড়ের আড়াল থেকে বের হয়ে লাফ দিয়ে সমুদ্রে পড়ে ডুবে যেতে দেখি, তখন আমি জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তারপর যখন একটা লোক আপনাকে দেখে ক্যাপ্টেনকে ডাকে তখন আমিও ক্যাপ্টেনের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এরপর বিকেলে একবার দেখতে গিয়েছিলাম, একটা মানুষের একটি কাঠকে আঁকড়ে ধরে এতক্ষণ জাহাজের সঙ্গে লেগে থাকতে পারাটা কঠিন ব্যাপার। বলতে পারেন, তখনই আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। তাছাড়া আমি জানতাম, আপনারা দুজনেই ক্যাপ্টেনের নির্যাতনের শিকার, তাই আমি তখনই ঠিক করি সন্ধ্যার পর পর্যন্ত যদি টিকে থাকতে পারেন, তবে আপনাকে তোলার ব্যবস্থা করব। কিন্তু ওদিকে জাহাজের ইঞ্জিনের একটু সমস্যা দেখা দেয়ায় আপনার কাছে আসতে দেরি হয়ে যায়। আপনি রশি দিয়ে ওপরে উঠে আসার পর আপনাকে ওই কথাগুলো জানানোর জন্য লুকিয়ে আপনার ওপর নজর রেখেছিলাম’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এরপর জাহাজ থেকে নেমে জিপে করে হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করার জন্য যাওয়ার পথে আপনার ওপর ওদের অত্যাচার দেখতে পাই। আমি ওদের সঙ্গে কাজ করলেও মাঝে মধ্যে অন্যের জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে ছাড়ি না। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আপনারা যদি ওদের হাত থেকে পালাতে পারেন, তবে আপনাদের জন্য আমি এগিয়ে যাব। এরপর হেডকোয়ার্টারে যখন আপনাকে এগোতে বলছিল, আমি তখনই বুঝেছিলাম যে ওরা আপনাকে প্রচণ্ড কষ্ট দেবে। তাই এগিয়ে আপনাকে আমার আওতায় নেই এবং কৌশলে আমার বাড়ির নম্বর আপনাকে জানাই, যদি আপনি বুঝতে পারেন। আর পরিষ্কার করে বলাটা সে সময় আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইঙ্গিত দেয়ারও সুযোগ ছিল না। আমি চাইছিলাম, আপনারা যদি ওদের হাত থেকে পালাতে পারেন, তবে যেন আমার কাছে চলে আসেন। যা-ই হোক, অবশেষে আপনি এসেছেন, আর সেদিন আপনাকে যে চাবুক কষেছিলাম, তার কারণ ছিল ওরা যাতে সন্দেহ করতে না পারে। আমি আস্তেই চাবুক কষেছিলাম; কিন্তু আপনি অত্যন্ত দুর্বল থাকায় দ্বিতীয় চাবুকে জ্ঞান হারান। অবশ্য তাতে আপনার ভালোই হয়েছিল। কিছুক্ষণের জন্য আপনি সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, থামল লোকটি।

‘এতক্ষণ ধরে লোকটির কথা মনোযোগ সহকারে শুনছিল ছেলেটি।

‘আসলে খুব টেনশন থাকায়, আপনার ওই ইঙ্গিতটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পাইনি’, লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল ছেলেটি।

‘কমপক্ষে চাবুক মারার দিন আপনার গলা চিনতে পারা উচিত ছিল।

‘আর আজকে যদিও আপনার এখন এখানে থাকার কথা ছিল না, তারপরও ক্ষীণ একটু আশা বুকে ধরে, ঝুঁকি নিয়ে আপনাকে আজকে পরিষ্কার করেই বলেছি, তা না হলে আজ এ সময় আপনি এখানে থাকতেন না।’

‘খুবই ভালো করেছেন, তা না হলে অবশ্য জেলের বাড়িতে চলে যেতাম, সত্যিই আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে রইলাম।’

‘আমি তো ভেবেছি আমি আপনার শিষ্য হব। এ কয়দিন আপনি যা দেখালেন না!’ হেসে বলল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

‘আরে কী যে বলেন!’ লজ্জা পেয়েছে ছেলেটি। ঘড়ির দিকে তাকাল।

‘ইয়া আল্লাহ, প্রায় ভোর হয়ে গেছে, এখনই রওনা হওয়া দরকার।’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাই তুলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে রাত যে কোন দিক দিয়ে শেষ হলো টেরই পেলাম না, হ্যাঁ এবার ওঠা যাক’, বলেই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল লোকটি।

‘আপনি একটু বসুন, আমি আসছি’, বলে ভেতরে চলে গেল লোকটি। একটু পরেই একটা প্যাকেট হাতে ফিরে এলো ‘চলুন, বেরিয়ে পড়ি।’

নৌকায় সময় কাটানোর ছলে টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটা বলল মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে। নৌকা তীরে পৌঁছে গেল। তাকে এক জোড়া স্যান্ডেল দিয়েছে লোকটি। প্যান্টটা একটু তুলে হাঁটা পানিতে নামল ছেলেটি। লোকটি তার আগেই তার হাতে প্যাকেটটা দিয়েছে। এই প্যাকেটটা মেয়েটার জন্য, এর মধ্যে সে তার কাপড় পাবে, আর আমি সন্ধ্যার পরপরই আসব আপনার এখানে। আশপাশেই থাকবেন, যেন ডাকলেই শুনতে পান, গুড লাক’, চলে গেল লোকটি। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি দ্বীপের দিকে। সূর্য ওঠার আর বেশি বাকি নেই। ফজরের নামাজ আদায় করে পা বাড়াল সে।

সকালের সূর্যের আলো চোখে পড়েছে। ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটির। প্রথমেই চোখ কচল চারদিকে তাকাল। ছেলেটিকে কোথাও গেল না। হয়তো আশপাশেই আছে। দিনের বেলা পাথরের পেছনে আরো জড়সড় হয়ে বসল সে। ক্ষুধা লেগেছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটি পৌঁছে যাবে। অনেকক্ষণ কেটে গেল। সূর্য অনেক ওপরে উঠে গেছে। এখনো ছেলেটি ফিরছে না দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল মেয়েটি। কোথায় গেছে সে? এখন এ অবস্থায় সে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাল রাত যেখানে অগ্নিকুণ্ডটা জ্বালানো হয়েছিল, সেখানে এখন ছাই পড়ে আছে। বেশি দূরে নয়। গত রাতে ছেলেটি আগুন জ্বালিয়ে তার বামে বসেছিল। তার স্পষ্ট স্মরণ আছে। তারপর কখন যে চোখের পাতা বুজে এসছিল তা সে বলতে পারবে না। কিছু একটা জিনিস চোখে ধরা পড়েও পড়ছে না। ছাইগুলোর এপাশে মাটিতে কিসের যেন আঁকি বুকি দেখা যাচ্ছে। কোনো ধরনের ম্যাসেজ বুঝতে পারছে না। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। প্রায় মাথার ওপর সূর্য উঠে এসছে। নাহ, দেখতেই হচ্ছে। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। জড়সড় হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোলো সামনে।

‘আপনার কাপড়ের সন্ধানে আমি মূল দ্বীপে যাচ্ছি। আপনার চিন্তা করার কোনো কারণ নেই, আমি সাবধানে থাকব ইনশাআল্লাহ। আর ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই, আমি ধরা পড়লেও তাদের কাছে আপনার ব্যাপারে মুখ খুলব না। আমি তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করব, ভাল থাকুন, খোদা হাফেজ।’ মাটিতে সুন্দর করে বাংলায় লেখাগুলো পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়ল মেয়েটির।

তার জন্য ছেলেটি আবার বাঘের গুহায় পা দিতে গেল! হয়তো এ মুহূর্তে সবাই পুরস্কারের আশায় তাদের খুঁজছে, ছেলেটির ধরা পড়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এতক্ষণে কি সে ধরা পড়ে গেছে? হয়তো পড়েনি। কী জানি? সে এত দূর থেকে কীভাবে জানবে? আচ্ছা, এ দ্বীপে কি তাকে খুঁজতে আসবে? আসতেও পারে। এ অবস্থায় কোনো লোকের সামনে পড়লে তার কী হবে ভেবে শিউরে উঠল সে। অথচ ছেলেটি…। তাড়াতাড়ি কোথাও লুকিয়ে পড়ার তাগিদ অনুভব করছে সে। কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। কী খাবে চারদিকে নারকেল বা কোনো ফলের গাছ নেই। এ অবস্থায় দ্বীপে খুঁজে বেড়াতে পারবে না। অগত্য ছেলেটি ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। আশপাশে লুকানোর ভালো জায়গা নেই। একটু আশপাশ ঘুরে দেখবে কি? সামনে আড়াআড়িভাবে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আশপাশটা খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। একখানে বসে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলো ছেলেটি ফিরে এলে আগের জায়গায় যাবে। তাকে ওখানে না পেলে, এপাশ-ওপাশ খুঁজেও না পেয়ে যদি তাকে ধরে নিয়ে গেছে ভেবে আবার মূল দ্বীপে ফিরে যাব! এছাড়া এখন পর্যন্ত লুকানোর মতো ভালো জায়গা পায়নি। ভাবতে ভাবতে আবার আগের জায়গাটায় ফিরে এলো।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এখনো ছেলেটির দেখা নেই। হয়তো রাতে ফিরবে। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল মেয়েটি। সূর্যের রক্তিম আভা পূর্বাকাশে ফুটে উঠেছে। চারদিকে দিনের আলো ফুটে উঠেছে ধীরে ধীরে। তবে এখানে অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্য দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

প্যাকেটটা খুব ভারী। শুধু কাপড়ের ওজন এত হতে পারে না। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে ছেলেটি। তাছাড়া বাঁ হাতে ব্যথা পাচ্ছে। সামনের বাঁকটা ঘুরলেই পৌঁছে যাবে। মেয়েটি আছে তো! নাকি ধরে নিয়ে গেছে এর মধ্যে?

মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে আনল ছেলেটি। পাঁচ হাত সামনেও দেখছে না। ঢুকে পড়েছে খোলা জায়গায়।

‘আপনি কোথায়? আমি আপনার জন্য কাপড় নিয়ে এসেছি’, চেঁচিয়ে বলল সে।

কিন্তু কোনো জবাব এলো না। আর একবার বলল। এবারো জবাব এলো না। এবার আরো জোরে চেঁচিয়ে বলল। জবাব নেই। তবে কি…?

মুখ তুলে তাকাল। দেখল দূরে পাথরের আড়ালে মেয়েটি আছে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ফিরিয়ে নিল সে। বুঝে নিল সে। হয়তো মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে। ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি ‘পেছন দিক দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে এলো।’

একটু দূরে আছে মেয়েটি। ‘এই যে, শুনছেন, আমি…’ বলে শেষ হলো না। মাথার ওপর দিয়ে কর্কশ আওয়াজ করতে করতে একটা সামুদ্রিক পাখি উড়ে গেল। আবার বলতে যাবে কিন্তু এবারো বলা হয় না।

‘কে আপনি?’ পাখিটার কর্কশ আওয়াজে চোখ খুলেই একটু দূরে, ওপাশে ঘুরে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল মেয়েটি। বলেই চিনতে পারল।

‘আমি ফিরে এসেছি’, একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল ছেলেটি।

‘দুঃখিত। এখন চিনতে পেরেছি’, অপ্রস্তুত হয়ে বলল ছেলেটি।

‘এই বাক্সে আপনার কাপড় আছে, নতুন। পরে নিন’, বলে প্যাকেটটা মাটিতে রেখে ছাইগুলোর পাশে বসে পড়ল।

তাকিয়ে থাকল পূর্ব দিকের রক্তিম আকাশের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ পর তার থেকে একটু দূরে বসে পড়ল মেয়েটি।

‘কীভাবে যে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, ভেবে পাচ্ছি না’, আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

‘আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়োজন নেই, একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এসবের ব্যবস্থা করেছেন।’

‘একটু খুলে বলুন তো।’

ইঞ্জিনিয়ার সম্পর্কে সংক্ষেপে সব খুলে বলল। তবে তার ধরা পড়ার কথা, টাইম বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার কথা কৌশলে এড়িয়ে গেল। আজ সন্ধ্যার পর সে যে এসে তাদের অন্য দ্বীপে নিয়ে যাবে সে কথাও বলল।

সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল মেয়েটি। উঠতে গেল ছেলেটি।

‘বসুন, বসুন, বলতে ভুলে গেছি। প্যাকেটের মধ্যে একটা করে শার্ট-প্যান্ট, এক জোড়া কমন স্যান্ডেল, সেই সঙ্গে খাবারো আছে। আমি খাবার আনতে যাচ্ছি’, বলে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। একটু পরই একটা বড় প্লাস্টিকের টিফিন বাটি নিয়ে এসে বসল।

বেশ তফাতে বসে নীরবে খেয়ে চলেছে দুজনে। বেশ বেলা হয়েছে। ‘এই খাবারে দুপুরও চলবে।’ নীরবতা ভাঙল মেয়েটি। তাকাল ছেলেটির দিকে।

‘আরে আপনার হাতে কী হয়েছে, ব্যান্ডেজ করা কেন?’ একবারে দুটো প্রশ্ন করল সে।

এতক্ষণ হাতটা লুকিয়ে রেখেছিল, কখন যে প্রকাশ্যে এসে গেছে তা খেয়াল করেনি ছেলেটি।

‘একটু কেটে গেছে, ও এমন কিছু না।’

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৮ 2
Latest posts by জাকির আহমদ (see all)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •