জাকির আহমদ

৩০ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:০৮ অপরাহ্ণ ; 534 Views

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী - জাকির আহমেদ

‘কী দিয়ে কেটেছে?’ উদ্বিগ্ন মনে হলো তাকে।

‘কাঁচ দিয়ে।’ ছেলেটি যে উত্তর দিতে চাচ্ছে না তা বুঝতে পেরে আর প্রশ্ন করল না তাকে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্য ডুবতে বসেছে। সারা দিন দুজনে ভালোই বিশ্রাম নিয়েছে। ফলে খুবই ভালো লাগছে তাদের। অন্ধকার হয়ে আসতেই সৈকতে চলে এলো। অপেক্ষা করতে লাগল। এক সময় সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নৌকা নিয়ে এলো মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

‘গুড ইভিনিং’, সহাস্যে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘গুড ইভিনিং’, হেসে জবাব দিল মেয়েটি। চুপ করে আছে ছেলেটি।

‘আপনাদের দুজনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে। তবে দূরত্ব বেশি হয়েছে’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। হাসি মুখে লেগেই আছে। দুজনের কেউই কিছু বলল না। তবে আরো সরে গেল ছেলেটি। দেখেও আর কিছু বলল না ইঞ্জিনিয়ার। শুধু তার হাসিটা আরো প্রশস্ত হলো।

‘তারপর, আজ সারাদিনে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯ 1

‘না’, দুজনেই উত্তর দিল।

‘আপনারা নতুন দ্বীপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত?’

‘জি’, ছেলেটি জবাব দিল।

‘তবে আসুন’, বলে ঘুরে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার।

লোকটির পেছনে পেছনে নৌকায় এসে উঠল দুজনে।

‘এগুলোতে কী?’ নৌকার পাটাতনে রাখা পোঁটলা-পুঁটলিগুলোর দিকে ইশারা করে বলল মেয়েটি।

‘সবই জানতে পারবেন, এগুলো পরে নিন, তাহলে ঠান্ডা লাগবে না’, বলে দুজনের দিকে দুটো জ্যাকেট এগিয়ে দিল।

‘আপনি এ অন্ধকারে দ্বীপে পৌঁছতে পারবেন তো?’ জ্যাকেটের চেন টেনে দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘কেন আপনার সন্দেহ আছে?’ বৈঠা বাইছে ইঞ্জিনিয়ার।

‘না নেই।’

‘আপনারা ওই দ্বীপে পৌঁছলেন কেমন করে?’ জিজ্ঞেস করল ইঞ্জিনিয়ার।

সংক্ষেপে সব বলল ছেলেটি। তবে তাদের মধ্যকার ঘটনাগুলো এড়িয়ে গেল। মেয়েটিও ধরিয়ে দিল না।

অবশেষে পৌঁছে গেল নতুন দ্বীপে। রাতের আঁধারেও বোঝা গেল, অত্যন্ত সুন্দর এই দ্বীপটা।

দ্বীপটা যে ছোট তা দেখেই বোঝা যায়। ছোট ছোট টিলা আছে অনেক। কতগুলো বিশাল পাথরের চাঁই আছে ছোট সৈকতে, যেন সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে। ঢেউয়ের পানিতে এগুলোর একাংশ ডুবে যাচ্ছে। কিছু গাছপালাও আছে এ দ্বীপে। কিন্তু কোনো কেবিন চোখে পড়ছে না। নৌকা থেকে মালপত্রগুলো সৈকতে নামিয়ে রেখে নৌকাটা ডাঙায় তুলে রাখল দুজনে। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে চারদিকে দেখছে।

এরপর প্রত্যেকে যতটুকু সম্ভব মালপত্র নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের পেছনে পেছনে চলল। টিলার পাথর কেটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে। সিঁড়িটা ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠেছে। হঠাৎ থেমে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। ডানে হাত তুলেÑ ‘ওইটা থেকে বালতির সাহায্যে পানি তুলবেন। কেবিনে দড়ি লাগানো বালতি আছে।’

‘এটা রাতেও কুয়ার মতো মনে হচ্ছে। ‘কুয়া নাকি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘না, ওটাকে বলা চলে পানির আধার’, ব্যাখ্যা করে বলছে ইঞ্জিনিয়ার। ‘ওপরে বাংলার চাল এমনভাবে তৈরি করা যাতে সব বৃষ্টির পানি পাইপ দিয়ে এই ট্যাংকে এসে জমা হয়, সব সময় বৃষ্টি হয় না, তাই খুব হিসাব করে পানি খরচ করতে হবে। কীভাবে জানলেন?’ প্রশ্ন করল ছেলেটি।

‘কয়েক দিন আগেও এসেছিলাম।’ আর দাঁড়াল না। ওপরে উঠে এলো। এতক্ষণ কেবিনটা নজরে পড়ল। দুটো উঁচু টিলার ওপরে ছোট কেবিনটা কাঠের তৈরি। আসলে অন্ধকারে টিলার ওপর কেবিনটাকে একটা উঁচু টিলা বলেই মনে হয়েছিল। পকেট থেকে একটা মাস্টার কী বের করে দরজা খুলে ফেলল। চার ব্যাটারির টর্চ বাম হাতে।

‘আমি এর আগে এখানে তিন দিন একাকী থেকে গেছি’, ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল লোকটি। ‘তবে সাধারণত এই দ্বীপে কেউ আসে না।’

ঘরে ঢুকল সবাই। কেবিনের ভেতরটা আরো সুন্দর। ঘরটির দরজা ওপর দিক দিয়ে। চারদিকে তাকাতে তাকাতে ‘এই দ্বীপে এ কেবিন কে বানিয়েছে, কেন বানিয়েছে?’ এক সঙ্গে দুটো প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘তা তো বলতে পারব না, এর আগে এখানে দুইবার এসেছিলাম, একাই’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘লর্ডও বানিয়ে থাকতে পারে’, মেয়েটি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

দরজা দিয়ে ঢুকেই ডান দিকে জানালার ধারে একটা ডাবল খাট। অবশ্য বিছানা পাতা নেই। খাটের পেছনে আর একটা জানালার ধারে একটা টেবিল। তিন দিকে তিনটি সুন্দর চেয়ার। দক্ষিণ দিকের দেয়ালের গায়ে একটা ওয়াল হ্যাঙ্গার টাঙানো। ঘরটিতে আসবাবপত্র বলতে এই। টর্চের আলোয় দেখলো সেগুলোতে ধুলো জমেছে। আবার বেরিয়ে এলো তিনজনে। এবারো তিনজনের কিছু মালপত্র নিয়ে এলো।

একটা বস্তার মুখ খুলে বড় একটা মোমের প্যাকেট বের করল ইঞ্জিনিয়ার। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে দুটোই মেয়েটির হাতে দিল। ‘মোম জ্বালিয়ে গোছানোর কাজ শুরু করে দিন। আর আমরা দুজনে বাকি মালপত্রগুলো নিয়ে আসি।’

‘নতুন জায়গায় একা থাকতে ভয় লাগবে’, মেয়েটি বলল।

‘ঠিক আছে, তাহলে আসুন’, হেসে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

সব জিনিস আনা হয়েছে। পূর্ব দিকের দেয়ালে দুটো জানালা। পশ্চিমের মতো জানালার মধ্যে একটা দরজা। দরজা খুলে দিল ইঞ্জিনিয়ার।

বারান্দায় হাফ রেলিং দেয়া। অনেক ফুলের টবও আছে। তবে যত্নের অভাবে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তারপর দক্ষিণে উত্তরের দরজা বরাবর একটি দরজা দিয়ে বের হয়ে একটা সরু প্যাসেজ। প্যাসেজের দক্ষিণে কিচেন ও বাথরুম পাশাপাশি। কিচেনটা খুবই ছোট। চুলার সঙ্গে কিছু শুকনো খড়িও আছে। তাদের সব দেখল ইঞ্জিনিয়ার।

‘সেসব মালপত্র আনা হলো, তার মধ্যে এখানে আপনাদের থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব আছে, আমার মনে হয় আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। আমি আবার কয়েক দিন পরে আসব, ওহ হো আর একটা কথা বলা হয়নি, প্রয়োজন হতে পারে, তাই মালপত্রগুলোর মধ্যে দুটো লাইফ জ্যাকেটও আছে। সাবধানে থাকবেন, চলি’, বলে বেরিয়ে গেল লোকটি। পেছনে বেরিয়ে এলো দুজনে। নৌকার কাছে এসে দাঁড়াল তিনজন।

কী মনে হতে ঘুরে দাঁড়াল ইঞ্জিনিয়ার। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল, ‘এটা আপনার নিজের সঙ্গে রাখেন, প্রয়োজন হতে পারে’, এক মুহূর্ত থামল। চালাতে পারেন তো?’

দুজনই তার হাতে একটা ছোট কালো পিস্তল দেখতে পেল।

‘হ্যাঁ, পারি’, হাত বাড়ায়নি ছেলেটি।

‘হাতে নিন’, হাতটা আরো বাড়িয়ে ধরল ছেলেটির দিকে। একবার দ্বিধা করে ছেলেটি হাত বাড়িয়ে পিস্তলটা নিল।

নৌকাটা ঠেলে পানিতে নামানোর জন্য ঘুরল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি যদি মনে কিছু না নেন, তাহলে বলি’, জানাল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে বলুন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘আপনি আপনার জন্য আমাকে কিছু করতে দেবেন, এত ঋণ মাথায় বহন করার শক্তি নেই’, মাথা নীচু করে বলল ছেলেটি।

‘আমি যদি বলি, আপনাদের জন্য কিছু করতে পেরে আমি আনন্দ পাচ্ছি, তবে কি আপনি আমার আনন্দে বাধা দেবেন?’ একটু ঘুরিয়ে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘না’, সংক্ষেপে জবাব দিল ছেলেটি।

‘তাহলে আজ চলি, হয়তো আবার দেখা হবে’, বলে এগোলো নৌকার দিকে। নৌকাটি পানিতে নামাতে ছেলেটিও সাহায্য করল।

‘গুড লাক’, বলে নৌকায় চড়ে বসল ইঞ্জিনিয়ার। এক সময় চলে গেল চোখের আড়ালে।

দুজনে ফিরে এলো কেবিনে। যে মোমটি জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিল তার এক-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে গেছে। এখানে মোমই রাতের আলোকবর্তিকা। ক্যাপ্টেনের দেয়া ঘড়িটা এখনো ছেলেটির হাতে আছে। রাত প্রায় এগারটা বাজে। এশার নামাজ আদায় করে নিল ছেলেটি। অ্যারোসল বের করে সারা ঘর স্প্রে করল ছেলেটি। ততক্ষণে মেয়েটি তাদের আনা একটি বক্স থেকে তোশক, কাঁথা, চাদর, দুটো বালিশ বের করে বিছানা করে ফেলল। আজো তাদের জন্য খাবার তৈরি করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। খেয়ে নিল দুজনে।

‘আজ রাতে ঘুমিয়ে শরীরটা সরস করে নেই, কাল দিনে সব গোছানো যাবে’, খাওয়া শেষে ছেলেটির কথা ভেবে প্রস্তাব দিল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে’, সায় দিল ছেলেটি।

দুজনের জন্য দুটো করে বালিশ ও দুটো কম্বল আছে। কম্বলটা মেঝেতে বিছাতে গেল ছেলেটি।

‘আরে আপনি তো বিছানায় শোবেন’, বাধা দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘আমি মেঝেতে শোব।’

‘না আমি শোব।’

‘না, আমি।’

‘ঠিক আছে, আজ আমি মেঝেতে শুই, কাল আপনি, পরশু আবার আমি, এভাবে চলবে’, প্রস্তাবটা দিল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত ভেবে ‘উম ঠিক আছে’, রাজি হলো মেয়েটি।

মেঝেতে কম্বলটা নিজের ভাগের বালিশটা নিয়ে খাটের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল।

মেয়েটিও শুয়ে পড়ল। ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ ধরে অন্ধকার ছাদের দিকে চেয়ে আছে। নানা কথা ভাবছে, গত রাত থেকে টানা বিশ্রাম নেয়ায় তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। তাই চোখে ঘুম আসছে না।

দরজা-জানালা ভালোভাবে লাগানো আছে। তারপরও রাতের ঠান্ডা আবহাওয়ায় তার একটু শীত করছে। ঘরটা অন্ধকার হওয়ায় তা হয়তো বেশি অনুভব হচ্ছে।

খেয়াল হলো ছেলেটি তার কম্বল মেঝেতে বিছিয়েছে, গায়ে দেয়নি। বালিশের নীচে দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা রেখেছে। মোম ধরাল। তার কম্বলটা ছেলেটির গায়ে দিয়ে দিল। আর নিজে বিছানার চাদর তুলে গায়ে দিল। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা বলতে পারবে না।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল ছেলেটির। উঠে দেখল তার গায়ে কম্বল, মেয়েটি বিছানার চাদর গায়ে দিয়ে জড়সড় হয়ে ঘুমিয়েছে। ফজরের নামাজ পরেও দেখল মেয়েটি ঘুমাচ্ছে। কম্বলটা তার গায়ে দিয়ে দিল।

মেয়েটি হয়তো মুসলমান, তাকে নামাজ পড়তে বলতে হবে।

বসে না থেকে কেবিন গোছানোর কাজে লেগে গেল। তার ঘড়িতে যখন পৌনে সাতটা বাজে, তখন ঘুম ভাঙল মেয়েটির।

উঠে দেখল ছেলেটি কাজ করছে। বাথরুম থেকে ফিরে হাত-মুখ মুছছে মেয়েটি।

‘আপনি রান্না করতে জানেন তো?’ কাপড়গুলো ওয়াল হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘জি, পারি।’ ঘুমের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটে না তার।

‘তাহলে আপনি নাস্তা বানাতে যান, আর আমি ততক্ষণে গোছানোর কাজ শেষ করি’, বলল ছেলেটি।

‘আমি বেশি ঘুমিয়েছি, আমার জন্যও কিছু কাজ রাখুন’, যেন অনুরোধ করল ছেলেটিকে।

‘সে পরে দেখা যাবে’, বলে কাজে মনোযোগ দিল ছেলেটি।

আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেল মেয়েটি। সেও কাজে লেগে গেল। যখন মেয়েটি নাশতা নিয়ে ঘরে ঢুকল তার কিছুক্ষণ আগে গোছানোর কাজ শেষ করে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এক নাগাড়ে দুই ঘণ্টা ধরে কাজ করায় হাঁপিয়ে উঠেছে। ‘আপনি তো সব কাজ শেষ করেছেন। এমনকি আমার বিছানাটাও গুছিয়ে রেখেছেন’, অনুযোগের সুর ফুটে উঠল মেয়েটির কণ্ঠে।

‘এ দ্বীপে আমাদের কতদিন থাকতে হবে, তার কোনো ঠিক নেই’, বলছে ছেলেটি।

‘এখানে আমাদের কাজ ভাগ করে নিয়ে করতে হবে, আপনি একাই বেশি কাজ করতে চাইলে আমি কী করব? সময় কাটানোর জন্য আমাকেও কাজ করতে হবে’, বলে থামল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত ভেবে ‘ঠিক আছে, তবে আমি কাজ বণ্টন করব’, বলল মেয়েটি।

‘না, আমি করব।’

‘ঠিক আছে আপনিই বলুন’, মুখ গোমড়া করে বলল মেয়েটি।

‘নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে তারপর বলি।’

গমের আটার রুটি, আলু ভাজি দিয়ে ভালোই খেল দুজনে।

ছেলেটি মেঝেতে বসে নাশতা করতে চাইলে মেয়েটিও মেঝেতেই বসে পড়েছে। খাওয়া শেষ হয়েছে।

কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে শুরু করল ছেলেটি ‘প্রতিদিন সকালে নামাজ পড়ে আমি নিচ থেকে পানি নিয়ে আসব, আর…’

কথা শেষ করতে পারল না ছেলেটি ‘অত সকালে নীচে নামলে আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে’, বলল মেয়েটি।

‘লাগবে না।’ আগের কথা ধরল ছেলেটি। ‘বরং সকালে পানির পাত্র নিয়ে কয়েকবার ওঠানামা করলে ব্যায়াম হবে। এদিকে আপনি নাশতা তৈরি করবেন, নাশতা করে আমি বড়শি নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাব, আপনি ঘর গোছাবেন এরপর আপনি দুপুরের রান্না শুরু করবেন, এরই মধ্যে আমি মাছ নিয়ে ফিরব। তারপর গোসল করে নামাজ পড়ে নেব, আমার পর আপনি গোসল করবেন, সেই ফাঁকে আমি খাওয়ার আয়োজন করে ফেলব। আর একটা কথা, আমরা নিজেরাই নিজেদের কাপড় ধোব।’ এক মুহূর্ত থেমে দম নিল ছেলেটি। ‘দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নেব, আসরের নামাজের পর আমি রাতের জন্য আবার মাছ ধরতে যাব, আর আপনি বারান্দায় বসে থাকতে পারেন, দ্বীপে ঘুরে বেড়াতে পারেন অথবা টবগুলোর যত্ন নিতে পারেন, তা না হলে কোনো ফাঁকে আমিই নিব, মাগরিবের নামাজের পর আপনি রাতের জন্য রান্না করবেন, আর আমি…’ মাথা চুলকালো ছেলেটি। সে কী করবে ভেবে পেল না।

‘আপনি তখন বসে বিশ্রাম নেবেন, তারপর খেয়ে-দেয়ে ঘুম’, মেয়েটি শেষ করে দিল।

‘তুলনামূলকভাবে আপনি নিজের ভাগে বেশি কাজ নিয়েছেন, পানি আপনাকেও আপনি ব্যায়াম হিসেবে দেখিয়েছেন, কিন্তু আসলেই খুব পরিশ্রমের কাজ। আর অনেক সময় মাছ ধরতে বিরক্ত লাগে, আর আমার ভাগে শুধু রান্না করা, আর ঘর গোছানো’, যেন অভিযোগ করল মেয়েটি।

‘তিন বেলা রান্না করাও কঠিন। আর অনেক সময় বিরক্তিকর কাজও’, বলল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে হয়েছে, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। নিজে নিজের ঘাড়ে বেশি বোঝা চাপালে আমি কি করতে পারি?’ অভিমানের সুরে বলল মেয়েটি।

‘আজ দুপুর থেকে এ রুটিন কার্যকর হবে’, যেন ঘোষণা করল ছেলেটি।

‘আপনার কথা মানলাম, তবে আমারও একটি কথা আপনাকে মানতে হবে’, মেয়েটিও যেন ঘোষণা দিল।

‘কী কথা?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘অতগুলো মালপত্র কমপক্ষে দুজনে মিলে গোছাতে হতো, অথচ খুব সকাল থেকে আমাকে না জানিয়ে একাই সব গুছিয়েছেন, যেহেতু এখনো রুটিন কার্যকরের সময় শুরু হয়নি, সেহেতু আমি এখন নিচ থেকে পানি আনব। আর আপনি মাছ ধরতে যেতে পারেন’, বলেই উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। কী ভেবে বাধা দিল না ছেলেটি।

রুটিন কার্যকরের সময় শুরু হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে বালিশ নিয়ে পড়ল ছেলেটি। কিচেন থেকে ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ‘আরে আপনি বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন’, উঠে বসল ছেলেটি। ‘যেদিন রাতে আমি বিছানায় থাকব, তার পরদিন দুপুরে বিছানায় বিশ্রাম নেব। একই কথা আপনার জন্যও প্রযোজ্য। বলে শুয়ে পড়ল আবার। অগত্যা মেয়েটি শুয়ে পড়ল বিছানায়।

তৃতীয় রাতে মেঝেতে শুয়েছে মেয়েটি। দুপুরে খেয়ে ভালোই ঘুমিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে আছে ঘুম আসছে না। ভাবছে অনেক কিছু। মেয়েটি হয়তো এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। গায়ে বিছানার চাদর। গত রাতে ছেলেটিও চাদর গায়ে দিয়েই ঘুমিয়েছিল। মেয়েটি তাকে দ্বিতীয় কম্বলটা নেয়ার জন্য চাপাচাপি করেছে। সে নেয়নি।

কী মনে হতেই বালিশের তলা থেকে দিয়াশলাই বের করে মোম ধরাল।

মেঝেতে বসিয়ে দিল মোমটা। ঘরটায় যেন আলো-আঁধারির খেলা শুরু হলো। কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারবে না। তবে হঠাৎ মেয়েটির গলার আওয়াজ গেয়ে ঝট করে মোমের আগুনের কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল।

ছেলেটির আগেই শুয়ে পড়েছে মেয়েটি। ঘুম আসছে না। বাবা-মা, ভাইয়ের কথা ভাবছে। কবে তাদের কাছে ফিরতে পারবে?

ঘরে আলো জ্বলে উঠল। এই তো একটু আগে মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল ছেলেটি। একদম চুপ করে পড়ে আছে মেয়েটি। একটু পর প্রায় নিঃশ্বাসে পাশ ফিরল। খানিক পর মাথা তুলে দেখল ছেলেটি মোমের পেছনে বসে এক অদ্ভুত কাণ্ড করছে। ভালোভাবে দেখার জন্য চুপচাপ উঠে বসল বিছানায়। অনেকক্ষণ ধরে তার কাণ্ড দেখল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। ছেলেটি পাগল হয়ে যায়নি তো?

ছেলেটি প্রথমে তার ডান হাতটা মোমের আগুনের প্রায় একহাত ওপরে রাখছে। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা আগুনের ওপর নামিয়ে আনছে। আগুনের একদম কাছাকাছি হতেই ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিচ্ছে একটুক্ষণ হাতটাকে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তারপর আবারো একই কাজ করছে।

‘আপনি কী করছেন?’ অকস্মাৎ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘চমকে উঠে দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিল ছেলেটি। মেয়েটি যে তারই সামনে বিছানায় বসে দেখছিল, তা সে খেয়ালই করেনি। মহা অস্বস্তিতে পড়ে গেছে ছেলেটি।

‘কি, জবাব দিন’, আবার বলল মেয়েটি।

তবুও চুপ করে থাকল ছেলেটি।

‘কী করছিলেন?’ আবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘আপনি তো দেখছেন।’ কোনো মতে বলল ছেলেটি।

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে মুখ খুলল ছেলেটি। জানে, চুপ করে থেকে কোনো লাভ নেই। সে প্রশ্ন করতেই থাকবে। শুনলে হয়তো পাগল ভাববে। ভাবুক তাতে আমার কিছু আসে-যায় না।

‘আমি পরীক্ষা করছিলাম দুনিয়ার আগুন কতক্ষণ সহ্য করা যায়, দেখলাম এক সেকেন্ডও সহ্য করা যায় না, অথচ দোজখের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে বহুগুণ তেজি, আল্লাহতাআলা মানুষের গুনাহর কারণে মানুষকে দোজখে দেবেন। সেই আগুন সহ্য করব কীভাবে?’ আর বলতে পারল না ছেলেটি, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

‘আপনি মুসলমান, তাই না?’

মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল ছেলেটি। ‘আপনি জানতেন না?’

‘আমেরিকায় জন্ম, সেখানেই বড় হয়েছি, এর আগে কখনো তেমনভাবে মুসলমানের সংস্পর্শে আসিনি, তবে এটুকু জানি যে, তারা আল্লাহয় বিশ্বাস করে।’

‘আপনি মুসলমান নন?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘না, আর ধর্ম নিয়ে আমার অত মাথাব্যথাও নেই’, জবাব দিল মেয়েটি। চুপ করে রইল ছেলেটি।

‘হঠাৎ এ ধরনের খেয়াল হওয়ার কারণ কী?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘এমনি’, বলে মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ছেলেটি।

ছেলেটি উত্তর দিতে চায় না বুঝতে পেরে আর জিজ্ঞেস করল না মেয়েটি। সেও শুয়ে পড়ল।

কেটে গেল আর দুদিন। সূর্য ডোবার প্রায় দুই ঘণ্টা পর এস হাজির হলো ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েটি সে সময় কিচেনে রান্না করছিল। আর ছেলেটি বিছানায় চুপচাপ বসে ছিল।

দরজায় হঠাৎ ঠক ঠক আওয়াজে প্রথমে চমকে উঠল ছেলেটি। রাতে আবার কে এলো? ইঞ্জিনিয়ার নাকি ক্যাপ্টেন বাহিনী?

‘কে?’ দরজ খুলতে ইতস্তত করছে।

‘আমি’, ওপাশ থেকে সাড়া দিল।

গলা চিনতে কষ্ট হয়নি। খুলে দিল দরজা। চেয়ার এগিয়ে বসতে দিল।

‘ম্যাডাম কোথায়?’

‘কিচেনে।’

‘হ্যালো ম্যাডাম, এদিকে আসুন’, হাঁক ছাড়ল ইঞ্জিনিয়ার।

একটু পরে হাসি মুখে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। তার জন্য ইঞ্জিনিয়ার অবশ্য শার্ট-প্যান্টের বদলে জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করেছে। আজ সে গোলাপি রঙের একটা থ্রিপিস পরেছে। ডিজাইনটা আকর্ষণীয়।

‘এ কয়েক দিন কেমন কাটল?’ ছেলেটির উদ্দেশে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘ভালোই।’

চেয়ার টেনে নিয়ে বসল মেয়েটি। ছেলেটি আছে বিছানায়।

‘আমি আপনাদের একটা সংবাদ দিতে এসেছি’, বলে থামল ইঞ্জিনিয়ার। দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ‘সেটা হলো, কাল সকালে আমরা জাহাজে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছি। চৌদ্দ-পনের দিনের মধ্যে ফিরব, তাই আপনাদের জন্য আরো চাল, আটা, আলু, শুকনো খাসির গোশত, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি এনেছি। সেই সঙ্গে বিস্কুট, চানাচুর, চিনি, কফিও এনেছি; যাতে খাদ্য সঙ্কট না হয়। এগুলো নৌকায় আছে। ও ভালো কথা, এর মধ্যে কি কোনো কিছুর সঙ্কট হয়েছিল?’ বলে পালা করে দুজনের দিকেই তাকাল। মেয়েটি তাকালো ছেলেটির দিকে। সে মুখ নীচু করে চুপচাপ বসে আছে।

‘না।’ একবার দ্বিধা করে জবাব দিল মেয়েটি। তাদের আর একটা কম্বল ও সময় কাটানোর জন্য কিছু বইয়ের দরকার ছিল। কিন্তু লোকটিকে হয়রান করাতে ইচ্ছে হলো না।

‘সময় কম, আবার দ্বীপে ফিরে রাতে লম্বা ঘুম দিতে হবে’, লোকটির ইঙ্গিত বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে। আপনারা দুজনে থাকুন, আমি নৌকা থেকে ওগুলো নিয়ে আসছি’, বলে উঠে দরজার দিকে এগোতে গেল ছেলেটি।

‘থাকুন’, বলতে বলতে উঠে এগিয়ে এলো ইঞ্জিনিয়ার। ‘ম্যাডাম, আপনি থাকুন আমরা আসছি।’

প্রতিবাদ করল ছেলেটি। কিন্তু তার কথা শুনল না লোকটি।

তিনবারে সব নিয়ে এলো দুজনে। পথে ইঞ্জিনিয়ার জানতে চাওয়ায় এ কয়দিন তাদের কীভাবে কাটল, সংক্ষেপে জানালো ছেলেটি।

তিনবার বোঝা নিয়ে ওঠানামা করায় দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছে।

দুজনেই বিছানায় বিশ্রাম করছে। এমন সময় ট্রে হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। টি টেবিল নেই। অগত্যা চেয়ারে নাশতার ট্রে-টা নামিয়ে রাখল।

‘এসব করলেন কেন?’ মেয়েটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এ আর কী কষ্ট, নিন, শুরু করুন’, বলল মেয়েটি।

‘আপনি আগে শুরু করুন’, মেয়েটিকে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

নাশতা শেষ হতেই কফি নিয়ে এলো মেয়েটি।

লোকটিকে বিদায় দিতে তার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের দিকে চলছে দুজনে।

‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কী আনতে যাচ্ছেন?’ এমনিতেই জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

‘মেয়ে মানুষ’, কোনো দ্বিধা না করেই বলল ইঞ্জিনিয়ার।

ঝট করে লোকটির দিকে তাকাল ছেলেটি। ‘তার মানে?’

‘এখানকার মহামতি লর্ড একজন আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম গডফাদার’, চমকে উঠল দুজনে। সৈকতের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে চলেছে ইঞ্জিনিয়ার। ‘অন্য গডফাদারদের সঙ্গে এই গডফাদারের সুসম্পর্ক আছে। এই লর্ডের কিছু বিশ্বস্ত এজেন্ট আছে আফ্রিকা ছাড়াও আরো অনেক দরিদ্র দেশে। সেই এজেন্টের আবার কতগুলো চ্যালা এজেন্ট আছে, যারা এ লর্ডকে চেনে না। যা-ই হোক, আফ্রিকা মহাদেশে অনেক দরিদ্র দেশ আছে সেই বস দেশের মেয়েদের কৌশলে ধরে আফ্রকার বিভিন্ন সমুদ্র তীর থেকে ওই দ্বীপে…’ ইঙ্গিতে মূল দ্বীপ দেখাল। ‘পাঠানো হয়। এখানে মেয়েদের বন্দিশালায় রাখা হয়, তাদের ওপর অনেক সময় অত্যাচার করা হয়। তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দরিদ্র দেশ থেকে সংগৃহীত মেয়েরাও বিভিন্নভাবে এখানে পৌঁছেÑ এই হচ্ছে লর্ডের ব্যবসা।

‘অপরাধের আর কোনো দিক নেই তো লর্ডের?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। মেয়েটি যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।

‘না, নেই’, একটু থামল। ‘আমি লক্ষ্য করে দেখেছি লর্ড এমনিতে মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো। কিন্তু কেন যেন তার নারী জাতির প্রতি একটা বিদ্বেষপূর্ণ ভাব আছে। এর কারণ আজো বুঝতে পারিনি’, থামল লোকটি। তারা কখন যে ডাঙায় তোলা নৌকার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।

‘অনেক রাত হলো’, বলে নৌকায় হাত লাগাল ইঞ্জিনিয়ার। ছেলেটিও এগিয়ে এসে হাত লাগাল। মেয়েটি সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্র থেকে আসা ঢেউ পদযুগল ভিজিয়ে দিচ্ছে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

‘চলি গুডলাক’, বলে বৈঠা হাতে তুলে নিল ইঞ্জিনিয়ার।

দ্বীপে দশম রাতে বারান্দায় একটা চেয়ার এনে বসেছে ছেলেটি। আকাশে চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারিদিকে। মেঘ আর চাঁদের আলোয় যেন আলো-আঁধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ভেসে আসছে। কিছুটা হলেও রাতের নীরবতাকে খান খান করে দিচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। সব মিলে অনিন্দ্য সুন্দর এক রাত। নীচে ট্রাউজার পরেছে। ওপরে জ্যাকেট চাপিয়েছে। গলায় মাফলার পেঁচিয়েছে। তারপরও একটু ঠান্ডা লাগছে। কিন্তু ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। নানা ধরনের ভাবনা যেন আজ রাতে তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে লর্ডের অপরাধ কাহিনি শোনার পর থেকে তার কোনো কিছুতেই ভালো লাগছে না। সে কি পারবে এই অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে? যদিও পারে, তবে কীভাবে?

খাওয়া শেষ করেই চেয়ার নিয়ে বারান্দায় চলে এসেছিল অনেক্ষণ হলো। মেয়েটি এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে? তার পেছনের দরজা খোলা আছে। পিছনে ফিরলেই ঘরে আলো জ্বলছে কিনা দেখতে পাবে। তাকাল না। চেয়ারে বসে বারান্দার রেলিংয়ে দুহাত দিয়ে তার ওপর থুঁতনি রেখে সামনে খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে।

কখন যে তার পাশে মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি ছেলেটি।

‘বারান্দার ঠান্ডায় বসে থেকে কী করছেন? ঘুমাবেন না? অনেক রাত হয়েছে’, ছেলেটির থেকে তিন হাত দূরে রেলিংয়ে ভর দিয়ে বলল মেয়েটি। খাওয়া শেষ করে প্লেট-গ্লাস-বাটি ধুয়ে রেখে ঘরে এসে ঢুকেছিল মেয়েটি। দরজা খোলা থাকায় বারান্দায় ছেলেটিকে বসে থাকতে দেখল। মোম জ্বেলে রেখেই শুয়ে পড়ল মেয়েটি। চোখে ঘুম আসছে না। ঘরে ফেরেনি ছেলেটি। বাইরে কুয়াশা পড়ছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ঠান্ডা লাগবে ছেলেটির। উঠে প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো বারান্দায়।

হঠাৎ পাশে মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠল, সোজা হয়ে বলল ছেলেটি। ‘ও, আপনি এখনো ঘুমাননি?’

‘আপনিও তো ঘুমাননি’, বলল মেয়েটি।

‘তা ঠিক, চলুন ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলে উঠতে গেল ছেলেটি।

‘প্লিজ একটু বসুন’, গলায় স্পষ্ট অনুরোধ। বসে পড়ল ছেলেটি। যেন বাধ্য ছেলে।

‘আপনাকে একটা কথা বলব?’ ইতস্তত করে অবশেষে বলে ফেলল মেয়েটি।

‘বসুন’, একটু ভেবে বলল ছেলেটি।

‘বাংলা ভাষায় আপনি সম্বোধনে পরস্পরের মধ্যে একটা দূরত্ব বজায় থাকে। তুমি সম্বোধনে তা থাকে না’, বলে থামল মেয়েটি।

‘একটু পরিষ্কার করে বলুন’, সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকল ছেলেটি।

‘আমরা সম্বোধনে আপনি শব্দটি বাদ দিয়ে তুমি ব্যবহার করতে পারি না?’ বলে থামল মেয়েটি। মাথা নীচু করে রেখেছে।

‘কেন?’ অবাক হয়েছে ছেলেটি।

এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল ছেলেটি। দ্রুত কথা গুছিয়ে নিয়ে ‘আমার মনে হয় আমরা সমবয়সী বা দু-এক বছরের বড়-ছোট হতে পারি, এ ক্ষেত্রে আপনি…’ আর বলতে পারল না মেয়েটি, লজ্জায় কথা জড়িয়ে গেল।

কিছু একটা বলা দরকার। কিন্তু কী বলবে। একবার দ্বিধা করে ‘আমার মনে হয় আপনি সম্বোধনটাই ঠিক আছে।’ বলতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছেলেটি। ছেলেটির জবাবে একটু বলেও আহত হয়েছে। মুখ দিয়ে আর কথা ফুটছে না তার।

‘অনেক রাত হয়েছে, চলুন শুয়ে পড়ি।’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। বলার কিছু না পেয়ে মেয়েটিও ঘরে এসে ঢুকল। এরপর আরো পনের দিন কেটে গেল। এর মধ্যে তিন দিন ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হয়েছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে তাদের কাছে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ার। দুদিন আগে সন্ধ্যার পর। বেশিক্ষণ দেরি করেনি। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে গেছে।

প্রথমেই তাদের খোঁজখবর নিয়েছে। এবারো তাদের জন্য নানান কিছু নিয়ে এসেছিল। বলে গেছে তাদের আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করার সুযোগ খুঁজছে সে। আরো জানিয়েছে, এবার তারা পঁয়ত্রিশ জন নারীকে ধরে এনেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনই কুমারী। তাদের বন্দিশালায় রাখা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের বিক্রি করে দেয়া হবে। এসব শুনে দুজনেরই মন খারাপ হয়েছিল। সকাল নয়টা পার হয়েছে। বড়শি হাতে সৈকতে এসে দাঁড়িয়েছে ছেলেটি। সাগরের পানি ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠেছে। জোরে বাতাস বইছে। আকাশ ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়, সেই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাতের লক্ষণ। সূর্য অনেক আগেই অদৃশ্য হয়েছে আকাশ থেকে। আজ আর মাছ মারা হবে না। কেবিনের দিকে পা বাড়াল ছেলেটি।

মেয়েটি জানাল আজ মাছের বদলে গোশত, সেই সঙ্গে ডাল থাকবে। মেয়েটি কিচেনে রান্না করছে।

ছেলেটি ঘরের সব জানালা-দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। এই ঝড়ো বাতাসে টিলার মাথায় বসানো কেবিনটা টিকবে তো?

নাকি তাদের নিয়ে উড়ে যাবে? গত তিন দিনের চেয়ে আজকের অবস্থা শোচনীয়।

ঘরে মোম জ¦ালালেও নিভে যাচ্ছে। কোনদিক দিয়ে যেন বাতাস ঢুকছে।

অন্ধকারে ঘরে শুধু শুধু বসে থাকতে ভালো লাগছে না ছেলেটির। শার্ট খুলে শুধু প্যান্ট পরে বারান্দায় বের হয়ে এলো আল্লাহর কুদরত দেখার জন্য। বাতাসে আপনাআপনি দরজা লেগে গেল। রেলিং ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বারান্দায়। তা না হলে বাতাসে পড়ে যাবে। সাগর ফুঁসে উঠেছে। দ্বীপের অনেক ওপরে এসে একেকটা বিলাল ঢেউ ভাঙাচ্ছে। ঢেউগুলোর মাথায় দুধের মতো ফেনা। যেন এগুলো ঢেউয়ের মুকুট। বাতাসে যেন যে কোনো সময় তাদের কেবিনটা উড়ে যাবে। বিদ্যুৎ চমকানোর পরপরই বাজ পড়ার বিকট শব্দে যেন কানের পর্দা ফেটে যেতে চাচ্ছে। দিনের বেলাই যেন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকায় ভিজে গেল সে। তবুও ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে হলো না। দাঁড়িয়েই রইল।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর ঝলকানিতে একটু ডানে দূরে এক পলকের জন্য কী যেন দেখতে পেল ছেলেটি। পরক্ষণে আবার বিদ্যুৎ চমকালো। এবার এক সেকেন্ডের জন্য হলেও দেখতে পেল জিনিসটি। ছাউনি দেয়া একটা বড় বোট। নিশ্চয়ই ইঞ্জিনচালিত। তীর থেকে মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে আছে। তীরে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা চলছে কিন্তু কথা শুনছে না বোটটি। নিশ্চয়ই যাত্রীরা চরম বিপদে পড়েছে। সে কী তাদের জন্য কিছু করতে পারে? হাতল ধরে একটানে খুলে ফেলল দরজা। ঘরে ঢুকে দ্রুত হাতে একটা লাইফ জ্যাকেট পরে নিল। আর একটা হাতে নিল। মেয়েটি ঘরে নেই। তাই কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো না।

আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সৈকতে পৌঁছে গেল আধ মিনিটের মাথায়। বাতাস বার বার তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা যেন সুচের মতো আঘাত হানছে শরীরে।

ছেলেটি বেরিয়ে যাওয়ারও একটু পরেই ঘরে ঢুকল মেয়েটি। ছেলেটিকে দেখতে পেল না। তার বদলে মূল দরজা খোলা অবস্থায় পেল। তবে দরজার পাল্লা বন্ধই আছে। দরজা লাগিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে খোঁজ করেও ছেলেটিকে পেল না। এই প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টিতে গেল কোথায় ছেলেটি? বারান্দায় নেই তো? বারান্দায় এসে দাঁড়াল। না এখানেও নেই। ফিরতে যাবে এমন সময় চোখ পড়ল সৈকতে। দেখতে পেল ছেলেটিকে। বাতাসে উড়ে আসা বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাচ্ছে মেয়েটি। সেদিকে তার খেয়াল নেই। রেলিং ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায়। তাকিয়ে থাকল সৈকতের দিকে। বড় বোটটা দেখতে পেয়েছে। এতদূর থেকে ডাকলে শুনতে পাবে না ছেলেটি। তারপরও ডাকল। কিন্তু শুনতে পেল না সে। ছোট্ট সৈকতটা দ্রুত পেরোচ্ছে ছেলেটি। তীরের খুবই কাছে এসে গেছে বোটটি। আর মাত্র বিশ-ত্রিশ গজ দূরে আছে। হঠাৎ করে বিশাল এক ঢেউয়ের ধাক্কায় অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে এলো বোটটি। একটা বিরাট বড় পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। সংঘর্ষের শব্দটা মেয়েটিও শুনতে পেল। দুমড়ে-মুচড়ে গেল বোটের অগ্রভাগ। ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে গেল। বোটে মাত্র দুজনকে দেখতে পেল ছেলেটি। বৃষ্টির কারণে চেহারা চিনতে পারল না। তার এ মুহূর্তে চেহারা চেনার কোনো প্রয়োজন নেই। বোটটা দ্রুত ডুবে যাচ্ছে। লোক দুটো একে অপরকে চিৎকার করে কী যেন বলছে। বুঝতে পারছে না বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের কারণে। ছেলেটি লাফ দিল অশান্ত সাগরে। সাগরের দুষ্ট ঢেউ তাকে নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। একবার তাকে ঢেউয়ের মাথায় তুলছে পরক্ষণে অনেক নীচে নামিয়ে দিচ্ছে। কখনো তার ওপর দিয়ে যাচ্ছে বিশাল ঢেউ, তবে ডুবে যাচ্ছে না। অন্য লাইফ জ্যাকেটটা কোমরে পেঁচিয়ে নিয়েছে। নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি ঢুকে যাওয়ায় মুখের ভেতর যেন লবণে ভরে গেছে। সেই সঙ্গে হাঁচি পাচ্ছে।

প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেটি। এই অবস্থায় তার সাগরে নামাটা উচিত হয়নি তা সে ভুলেই গেছে। বোটটা এর মধ্যে আবার দূরে সরে গেছে। বোটটা একবার সামনে এগোচ্ছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ডুবে যাচ্ছে সেটি। একটু পরই সাগরের বুকে নিমজ্জিত হবে। বোটটার কাছে চলে এসেছে ছেলেটি। তাকে দেখতে পেয়ে দুজনই লাফ দিল সাগরে। এতক্ষণে তাদের চিনতে পেল ছেলেটি। একজন লর্ড, অপরজন ক্যাপ্টেন। এখন কী করবে ছেলেটি? যে উদ্দেশ্যে এসেছে তাই করবে নাকি তাদের ছেড়ে চলে যাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। এখন অত ভাবার সময় নেই? এগিয়ে গেল তাদের দিকে। হাবুডুবু খাচ্ছে দুজনই। তাকে ওরা দেখতে পেয়েছে।

‘আপনি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন।

‘হ্যাঁ, আমি’, নির্দ্বিধায় জবাব দিল ছেলেটি।

দ্রুত কোমর থেকে অপর লাইফ জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। ‘কাকে দেব?’

লর্ড ইঙ্গিত করল ক্যাপ্টেনের দিকে। দিয়ে দিল ছেলেটি। অনেক কষ্টে পরে নিল। এখন লর্ডের ভাসতে কষ্ট হচ্ছে। ডাঙ্গা মাত্র পঞ্চাশ-ষাট গজ দূরে। এই দূরত্বই তাদের কাছে পঞ্চাশ-ষাট মাইল মনে হচ্ছে। ইশারায় কথা হলো তাদের। ডানদিকে ছেলেটি, বামদিকে ক্যাপ্টেন আর মাঝখানে লর্ড। লর্ডের গায়ে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। ঠিক হলো লর্ড তাদের মাঝখানে সাঁতার কাটবে। বড় কোনো ঢেউ এলে তারা লর্ডকে আঁকড়ে ধরবে। এভাবেই পাশাপাশি তিনজন এগোতে লাগল। মাঝেমধ্যেই তারা ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে ওপরে উঠছে আর নামছে। কখনো কখনো বিশাল ঢেউ তাদের ঢেকে দিচ্ছে। তার আগেই দুপাশ থেকে দুজন লর্ডকে আঁকড়ে ধরছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মেপে মেপে এগোচ্ছে তারা।

কোনো অবস্থাতেই তিনজন বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে একবার এগোচ্ছে আবার পিছিয়ে আসছে। সমুদ্রের অশান্ত পানিতে ঢেউয়ের কারণে ডাঙায় উঠতে পারছে না। ছেলেটির খেয়াল হলো দ্বীপের বেশ ওপরে পানি উঠেছে। দাঁড়িয়ে গেল। পায়ে মাটি ঠেকল। অন্য দুজনও তার দেখাদেখি দাঁড়িয়ে গেল। ডাঙায় উঠেই শুয়ে পড়ল তিনজনেই। কেউই কোনো কথা বলছে না। শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। প্রথমে ছেলেটিই উঠে দাঁড়াল। ‘চলুন, এবার কেবিনে যাওয়া যাক।’ নীরবে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তিনজনই। ছেলেটির মাথায় চিন্তার ঝড় বইছে। এরপর কী হবে? অবশ্য দুজনের কেউই এখনো পিস্তল বের করেনি। দরজার সামনে পৌঁছে গেল তারা।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে মেয়েটি সবই দেখল। ছেলেটির আচরণে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। দূর থেকে আগন্তুক দুজনকে চিনতে পারল না। তবে যখন ডাঙায় উঠে এলো তখন চিনতে পারল। ভয় পেয়ে গেল মেয়েটি। তাদের এখন কী হবে? দ্রুত ঘরে ঢুকে কাপড় পাল্টাল। কাপড় পাল্টাতে যেতে খেয়াল হলো পিস্তলের কথা। গুলি ভর্তি আছে। টেবিলের ওপর থেকে পিস্তলটা তুলে নিয়ে তাদের আসার অপেক্ষা করতে লাগল।

দরজায় ঠক ঠক শব্দ হতেই মেয়েটি দরজা খুলে দিয়ে দ্রুত বাম পাশে সরে গেল। প্রথমে ঘরে ঢুকল ছেলেটি। তারপর বাকি দুজন।

‘মাথার ওপর হাত তুলে স্থির হয়ে যান, আমার হাতে পিস্তল আছে।’ ঝট করে লোক দুটোর পেছনে এসে তাদের দিকে পিস্তল তাক করে আঙুল ট্রিগারে রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল মেয়েটি।

বিনা বাক্য ব্যয়ে হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াল দুজন। ছেলেটি এর মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল। যাক মেয়েটি ভালোই করেছে। তাকে আর বলতে হলো না। দুজনকে সার্চ করে পাওয়া গেল দুটি পিস্তল। আর লর্ডের কাছে পাওয়া গেল অতিরিক্তভাবে একটি ওয়্যারলেস সেট।

পিস্তল দুটো নিজের দুই পকেটে ঢুকিয়ে রাখল ছেলেটি। আর ওয়্যারলেস সেটটি টেবিলে রেখে এসে মেয়েটির হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে নিল। দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি।

‘এবার আপনার হাত নামাতে পারেন, আশা করি আপনারা সুযোগ কাজে লাগাবেন না। আপনারা এখন থেকে আমাদের অতিথি।’ বলেই দুজনের দিক থেকে পিস্তল সরিয়ে নিল ছেলেটি।

হাত নামাল দুজনে। মেয়েটি কিছু বলল না।

ওয়াল হ্যাঙ্গারে ঝোলানো ইঞ্জিনিয়ারের তাকে দেয়া শার্ট-প্যান্ট, দুটো এনে দুজনের হাতে ধরিয়ে দিল। ‘বাথরুম থেকে তাড়াতড়ি কাপড় বদলিয়ে আসুন।’

‘আপনি আগে যান, আপনার গায়ে এমনিতেই কিছু নেই’, এতক্ষণে মুখ খুলল লর্ড।

‘অতিথি আগে’, বলে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করল ছেলেটি। কথা না বাড়িয়ে চলে গেল দুজনেই।

‘আপনি এটা রাখুন, আর সাবধান থাকবেন। কী হবে কিছুই এখন বলা যাচ্ছে না।’ পিস্তলটা মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল ছেলেটি। নিজে লর্ডের ছোট পিস্তলটা কাছে রেখে অন্যটি কিচেনে রাখা চালের বস্তার মধ্যে লুকিয়ে রাখল।

কিছুক্ষণ পর কাপড় পাল্টে ফিরল দুজনেই।

‘আপনারা বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন, আমি কাপড় পাল্টে আসছি।’ বলেই কাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে গেল ছেলেটি।

দুু’জনেই বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বিছানায় শুয়ে পড়ল।

পাশে চেয়ার নিয়ে বসে রইল মেয়েটি। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি ফিরে এলো।

অতিথিদের জন্য আবার রান্না করতে কিচেনে গেল মেয়েটি। ছেলেটি বসে পড়ল চেয়ারে। মাথায় চিন্তার বোঝা। সময় কেটে যাচ্ছে দ্রুত। দুপুর দেড়টা বাজে। এর মধ্যে ঝড় বৃষ্টির প্রকোপ একটু কমে গেছ, তবে থামেনি। উঠে পড়ল ছেলেটি। নামাজ পড়ে নিল। ততক্ষণে রান্নার কাজ শেষ হয়েছে। মেঝেতে বসে খাবারের আয়োজন করতে লাগল দুজনে।

বিছানায় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

‘উঠুন, দুটো বেজে গেছে, খেয়ে নিন’, ডাকল ছেলেটি।

ঘরে ফিরে দেখল দুজনই ঘর থেকে উধাও। তবে দরজা দিয়ে দেখা গেল, দুজনেই চেয়ার নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসে আছে। বাতাসের বেগ কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি আর বারান্দায় এসে পৌঁছাচ্ছে না। দুজনই নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন। তাদের বিরক্ত করতে চাচ্ছে না দুজন। ছেলেটি বসে পড়ল বিছানায়, মেয়েটি বসল চেয়ারে। দুজনের একই প্রশ্ন, ‘এরপর তাদের কী হবে?’ অবশ্য তারা খুব খারাপ অবস্থাতে নেই। কারণ, লর্ড ও ক্যাপ্টেন দুজনেই বলতে গেলে তাদের হাতের মুঠোয়। এ অবস্থায় ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করা যায়। এখন তাদের একটা নৌকা বড়ই প্রয়োজন ছিল। কাল দিনে কিছু একটা করতে হবে, আজ সময় নেই। তবে লর্ড ও ক্যাপ্টেনের চুপ করে থাকার বিষয়টা বুঝতে পারছে না।

সূর্যাস্তের অনেক পরে দুজনে ঘরে ফিরল। এর মধ্যে ছেলেটি তাদের দুজনকে দুটো সোয়েটার দিয়ে এসেছিল।

তারা দুজনে ঘরে ঢুকলে বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে বসল ছেলেটি।

‘আরে থাকুন না’, ছেলেটিকে বিছানা থেকে উঠতে দেখে লর্ড বলল।

‘ঠিক আছে, আমি চেয়ারেই বসছি’, বলল ছেলেটিকে। তর্ক না করে দুজনে বিছানায় বসল।

‘বলুন তো, আমাদের আপনি কীভাবে দেখতে পেলেন?’ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ পর লর্ডই প্রথম নীরবতা ভাঙল। সংক্ষেপে খুলে বলল ছেলেটি।

‘আপনারা বুঝি ওই দ্বীপে ঘুরতে গিয়েছিলেন?’ ইঙ্গিতে দ্বীপটার দিকে দেখাল ছেলেটি।

‘আপনি কীভাবে জানলেন ওই দ্বীপের কথা?’ কৌতূহল ফুটে উঠল স্বভাবগম্ভীর লর্ডের কণ্ঠে।

‘জেনে নিয়েছি।’

‘কার কাছে?’

‘বলা যাবে না।’

এমন মুহূর্ত চুপ করে থাকল লর্ড। ‘হ্যাঁ, ওই দ্বীপেই গিয়েছিলাম’, হেসে বলল।

‘যখন দেখলেন ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে, তখন এত ঝুঁকি না নিয়ে ওখানে থাকলেই ভালো করতেন’, বলল মেয়েটি। এতক্ষণ পর মুখ খুলল সে। বসে আছে অন্য চেয়ারে।

‘আজ খুব সকালেই দুজনে বের হয়েছিলাম। তার আগে বলি, ‘ও আমার কাজিন’, ক্যাপ্টেনকে দেখিয়ে বলল লর্ড। ‘দুই ভাই যখন দ্বীপের কাছে এসে পৌঁছলাম তখন দেখি সাগর অশান্ত হতে শুরু করেছে, খুব জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে, আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। মূল দ্বীপে ফেরার জন্য বোট ঘোরালাম, কাটা ঘায়ে নুন ছিটানোর মতোই মাঝপথে বোটের ইঞ্জিন থেমে গেল, ঠিক করে আবার স্টার্ট করতে সময় লেগে গেল। ততক্ষণে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। খুব দ্রুতই সাগরের পানি অশান্ত হয়েছে। তখন ঠিক করলাম এ দ্বীপে উঠব। কারণ মূল দ্বীপে ফেরার চেষ্টা করাটা বোকামি হয়ে যাবে। সাগর অশান্ত থাকায় সেই সঙ্গে তীব্র বাতাসের কারণে এই দ্বীপে নৌকা পৌঁছাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম’, থেমে আবার শুরু করল লর্ড। ‘যখন তীরের কাছে পৌঁছে গেছি, তখন আপনাকে সৈকতে দেখতে পাই, তারপর বিশাল এক ঢেউয়ের কবলে পড়ে একটা বড় পাথরে ধাক্কা লাগল বোটটি। অবশ্য এসব আপনি দেখেছেন’, ছেলেটিকে বলল লর্ড। ‘তারপর যখন দেখলাম, আপনি সমুদ্রে, আশার আলো দেখতে পেয়ে দিলাম লাফ, আপনি ছাড়া আজ আমরা বাঁচতেই পারতাম না, আপনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ’, বলল লর্ড। সংক্ষেপে সব খুলে বলল লর্ড।

‘আমি নই, আমার মাধ্যমে আল্লাহই আপনাদের বাঁচিয়েছেন’, বলল ছেলেটি। কিছু বলল না লর্ড।

‘আপনি যে বেঁচে আছেন, এটা আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না’, এতক্ষণে মুখ খুলল ক্যাপ্টেন। যদিও বিধ্বংস গাড়িতে আপনার কোনো চিহ্ন পাইনি, আমরা ভেবে নিয়েছিলাম যে আপনি ভস্মীভূত হয়ে গেছেন, কারণ টাইম বোমাটা আপনার নীচেই ছিল। এরপর শুধু আপনাকে…’ মেয়েটিকে বলল ক্যাপ্টেন।

‘আপনাকে খোঁজা অব্যাহত ছিল, কিন্তু পাঁচ-সাত দিন পরও আপনার সন্ধান না পেয়ে আপনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম’, বলে থামল ক্যাপ্টেন।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কিসের বিধ্বংসী গাড়ি, কিসের টাইম বোমা, একটু খুলে বলুন’, কৌতূহলী হয়ে বলল মেয়েটি।

‘কেন উনি আপনাকে কিছু বলেননি?’ কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলল ক্যাপ্টেন।

‘না তো!’

তিন জোড়া অদ্ভুত দৃষ্টি বিদ্ধ করে ফেলেছে ছেলেটিকে।

‘আপনি ওনাকে বলেননি কেন?’ বলে থামল। ‘এক্সকিউজ মি’, বলে উঠে গেল ছেলেটি।

বাথরুম থেকে অনেক দেরি করে ফিরল সে। ততক্ষণে ক্যাপ্টেন মেয়েটিকে সব খুলে বলেছে। সব শুনে কেমন যেন হয়ে গেল মেয়েটি। উঠে দাঁড়াল ‘রাতে কী খাবেন?’

এক মুহূর্ত ভেবে ‘রুটি, গোশত’, জবাব দিল লর্ড ‘যদি ঘরে থাকে’, যেন শর্ত লাগাল।

রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরল মেয়েটি। ঠিক এমন সময় ছেলেটি ঘরে ঢুকল। চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিল ছেলেটি।

‘কোথায় যাচ্ছেন?’ জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘রুটি বানাতে’, কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে। কিছু বলল না ছেলেটি। নামাজে দাঁড়িয়ে গেল সে।

এর মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। তবে সাগর এখনো অশান্ত আছে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। দুই ভাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ, এখন শোয়ার পালা। অনেক চাপাচাপির পর দুই ভাই বিছানায় শুতে রাজি হলো। যখন দুজনের কেউ বিছানায় শুতে রাজি হচ্ছিল না তখন ছেলেটি কৌতুক করে বলল, ‘দেখুন আপনারা আমাদের হাতে বন্দী, আর আমরা যা বলব আপনাদের তাই করতে হবে।’ হেসে রাজি হয়ে গেল দুজনে। তবে ঠিক হলো তারা কম্বল গায়ে দেবে না। ছেলেটি একদিকে, মেয়েটি অন্যদিকে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। তারা দুজনই বালিশ ছাড়া শুয়ে পড়েছে, তা দুই ভাইয়ের কেউই খেয়াল করল না। মোম নিভিয়ে দিল ছেলেটি।

পরদিন কেবল সূর্য উঠি উঠি করছে। দুই অতিথি বারান্দায় চেয়ারে বসে ছিল। ছেলেটি পানি আনছে, ক্যাপ্টেন তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল কিন্তু ছেলেটি তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। অগত্যা সে তার বড় ভাইকে সঙ্গ দিচ্ছে। মেয়েটি কিচেনে নাশতা বানাচ্ছে।

নাশতা খেতে বসেছে সবাই। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হতেই উঠে দরজা খুলে দিল ছেলেটি। ঘরের ভেতর পা রাখল ইঞ্জিনিয়ার। ফিরে তাকাল দুজনই। দরজাতেই সে যেন বরফের মতো জমে গেল।

‘ও, বুঝেছি আপনিই তাহলে এদের দ্বীপে এনেছেন, এতসবের ব্যবস্থা করেছেন?’ বলল লর্ড হাসিমুখে।

‘ওভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভেতরে আসুন।’

আতঙ্কের মেঘ অনেকটা কেটে গেল ইঞ্জিনিয়ারের। ছেলেটির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে লর্ডের পাশের ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ল সে।

‘কাল যা ঝড়-বৃষ্টি হলো, তাতে মনে হলো কেবিনটা বহাল তবিয়তে আছে তো, সন্ধ্যার পরপরই যখন একেবারে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন আসার জন্য বের হয়েও আসা হয়নি, কারণ তখনও সাগর অশান্ত ছিল। তাই আজ খুব ভোরেই বেরিয়ে পড়ি; কিন্তু লোকের চোখ এড়ানোর জন্য ঘুরপথে আসতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। যেন আসতে দেরি হওয়ায় কৈফিয়ত দিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘নাশতা খেয়ে নিন’, বলল মেয়েটি। খাওয়ার সময় কোনো প্রকার কথা হলো না।

‘আপনারা এখানে কেন?’ খাওয়া শেষে এই প্রথম মুখ খুলল ইঞ্জিনিয়ার। সংক্ষেপে সব বলল ক্যাপ্টেন। কিছু বলতে যাবে ইঞ্জিনিয়ার এর আগেই ‘সত্য কথা বলতে কি, এরা আমার চোখ খুলে দিয়েছে’, হঠাৎ করে বলল লর্ড। কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই।

‘তার মানে?’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল ইঞ্জিনিয়ার।

‘বলছি বলছি, কাল থেকে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এ ব্যাপারেই আলাপ করছি। এ দুজনের ওপর বিশেষ করে ওনার ওপর চরম নির্যাতন করা হয়েছে। যেন জাদুমন্ত্র বলে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে। কেমন করে সে বেঁচে গেছে যদিও সে কাহিনি এখনো শোনা হয়নি। নৌকায় যেতে যেতে সে কাহিনি শুনব আমরা। বলছিলাম, এত কিছুর পরও এরা দুজন আমাদের বিপদে আপনজনের মতো বা তার চেয়েও ভালো ব্যবহার করেছে। ‘উনি’ ছেলেটাকে দেখাল লর্ড। ‘হয়তো অন্য মানুষ মনে করে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের দেখে ফেলে আসেনি। বলতে বলতে কেঁদে ফেলল লর্ড। সবাই মাথা নীচু করে শুনছে। এ লোকটির অনুমান ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হলো ছেলেটি। এরা আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেয়েও নেয়নি। অথচ আমি আজ পনের বছর ধরে নারী জাতির ওপর প্রতিশোধ নিয়ে আসছি’, বলে থামল লর্ড। যেন কথা আটকে গেছে।

‘খুলে বলুন’, বলল ইঞ্জিনিয়ার। ‘আমি অনেক কিছুই জানি না।’

‘আজ থেকে পনের বছর আগেও আমি মানুষ ছিলাম’, দম নিয়ে শুরু করল লর্ড। ‘কিন্তু এখন আমি একজন অমানুষ, আমার বাবা একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন।’ সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে লর্ডের অতীত কাহিনি। ‘বিশ বছর আগে ভালোবেসে একজনকে বিয়ে করি। সে আমার কাছে মাত্র তিন বছর ছিল। আমাদের একটি মেয়ে হয়েছিল। এর মধ্যে আমার বাবা মারা যাওয়ায় বাবার ব্যবসা দেখার জন্য প্রায় বাইরে থাকতে হতো। সেই ফাঁকে আমার স্ত্রী একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। একদিন আমার অনুপস্থিতিতে সে পালিয়ে যায়। একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল, আমি যেন তাকে ভুলে যাই। সে সময় মেয়েটির বয়স ছিল ছয় মাস। মা ছাড়া মেয়েকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে গিয়েছিলাম। তার তিন মাস পর সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মেয়েটি মারা যায়। তাতে আমি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাই। একের পর এক আঘাতে আমি পাগলপ্রায়।’ লর্ডের গাল দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এসছে। ‘এরপর থেকে নারী জাতির প্রতি আমার প্রবল ঘৃণা জন্মে ওঠে। একসময় অপরাধ জগতে পা দেই। তারপর জড়িয়ে পড়ি নারী পাচার ব্যবসায়। এ দ্বীপগুলো লিজ নেই ইংল্যান্ড সরকারের কাছ থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। কোনো অপরাধ দমন সংস্থাই আমাদের ঘাঁটতে সাহস পায় না। তবে মাঝেমধ্যে পত্র-পত্রিকাগুলো আমাদের নিয়ে অযথা নাক গলায়’, থামল লর্ড। ‘কিন্তু এতদিন পর কালই প্রথম বিবেক নাড়া দিয়ে উঠল। এতদিন বিবেক সুপ্ত অবস্থায় ছিল। গতকাল বুঝতে পারি, যে মেয়ে আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল, তার প্রতি তো প্রতিশোধ নেইনি। শুধু শুধু মায়ের বুক থেকে কন্যাকে, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে সরিয়ে তাদের ওপর চরম অন্যায় করেছি। আমি এর মধ্যে এসব থেকে মনে মনে বেরিয়ে এসেছি। আমি ঠিক করেছি এই ভাইটিকে হাতে…’ ইঙ্গিতে ক্যাপ্টেনকে দেখাল। ‘দ্বীপের দায়িত্বভার তুলে দিয়ে চলে যাব, এমন কোনো জায়গায় যেখানে আমাকে কেউ চিনবে না। আবার নতুন করে জীবন শুরু করব। তবে একা, ও শুধু দ্বীপটার দেখাশোনা করবে। নারী পাচার বা অন্য কোনো অপরাধমূলক ব্যবসা করবে না। সে আমাকে এ ব্যাপারে শুধু কথা দেয়নি, শপথ করে বলেছে’, বলে থামল লর্ড। চোখের পানি মুছল। আমি পরিবেশটা ভারী করে ফেলেছি। দুঃখিত।’ মুখে হাসির ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল লর্ড।

‘না, না আমরাই তো শুনতে চেয়েছিলাম’, তাড়াতাড়ি বলে উঠল মেয়েটি।

‘কেন আপনিও এখানেই থেকে যান’, বলল ছেলেটি।

‘এই দ্বীপে আমি অপরাধ করেছি। এখানে আমি থাকতেই পারব না। এখানে থাকলেই আমি বিবেকের তাড়নায় পাগল হয়ে যাব। নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে আমার অপরাধ জীবন ভুলে থাকার চেষ্টা করব, আর কখনোই এখানে ফিরব না।’

‘আপনাকে কি এখানকার বাসিন্দারা যেতে দেবে?’ শেষ চেষ্টা করল ছেলেটি।

‘হয়তো যেতে দেবে না। কারণ এদের ওপর কখনোই অত্যাচার করিনি। তাছাড়া এখানে থাকার জন্য তাদের কোনো প্রকার কর দিতে হয় না। তবে হয়তো তাদের কাঁদিয়ে যেতে হবে, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

‘কোথায় যাবেন?’ হঠাৎ প্রশ্নটা করল মেয়েটি।

‘তা কাউকে জানাব না, পরিচিত সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাব।’

‘মানুষের চোখ এড়িয়ে কীভাবে যাবেন?’ আবার প্রশ্ন করল মেয়েটি।

‘এ নিয়েও ভেবেছি, আমি একটা ছোট জাহাজ নিয়ে একাই খোলা সাগরে বেরিয়ে পড়ব, কোন দিকে যাব এর মধ্যে ঠিক করে রেখেছি, তবে বলব না। ইঞ্জিনের জাহাজ একাই সামলানো কোনো সমস্যা না। খাবার-দাবার আগেই নিয়ে নেব, আর বাবার কিছু ব্যবসার টাকা এখনো আলাদাভাবে আছে, সেগুলো নেব। প্রথমে সাগরে ঘোরাঘুরি করে দেখব, কেউ আমার পিছু নিয়েছে কিনা। তারপর নির্দিষ্ট রুটে এগিয়ে যাব। উপকূল থেকে দূরে থাকতেই তলা ফুটো করে দিয়ে জাহাজ ডুবিয়ে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় তীরের দিকে যাব। তীরে পৌঁছে নৌকাটিও ডুবিয়ে ফেলব। কোস্টগার্ডদের ফাঁকি দেয়া আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না, তারপর ঢুকে পড়ব কোনো ভূ-খণ্ডে। ফলে কেউ আমার অবস্থান জানতে পারবে না’, বলে থামল লর্ড। সবার দিকে তাকিয়ে হাসল।

‘আর আমাদের কী হবে?’ প্রশ্নটা করল ছেলেটি।

‘তার আগেই আপনাদের কাক্সিক্ষত দেশে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দেব।’

‘আমরা কালই রওনা হতে চাই’, বলল মেয়েটি।

‘ঠিক আছে, তাই হবে’, তাদের আশ্বস্ত করল লর্ড।

ওয়াটার প্রুফ, গোল্ডেন কালারের ঘড়িটার দিকে তাকালো লর্ড। সাড়ে এগারটা বাজে। দ্বীপে পৌঁছা দরকার।

‘আপনার নৌকাটা ছোট’, ইঞ্জিনিয়ারকে উদ্দেশ করে বলল লর্ড।

‘একজনের জায়গা হবে, তাছাড়া ওনাদের অবশিষ্ট মালপত্রগুলোও নিয়ে যেতে হবে’, বলতে বলতে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে ওয়্যারলেস সেটটা তুলে নিয়ে একট বড় বোট পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে ফিরে এলো লর্ড।

‘ইঞ্জিনচালিত বোট আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে, সব গুছিয়ে নেয়া দরকার।’

সবাই মিলে গুছিয়ে নিল। সব নিয়ে নীচে নেমে এলো। বোট পৌঁছে গেছে। নীচে নামতে নামতে ‘হিরো সাহেব, নৌকায় যেতে যেতে আপনার টাইম বোমা থেকে বেঁচে যাওয়ার কাহিনি বলতে হবে’, ছেলেটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ক্যাপ্টেন।

‘ঠিক আছে’, অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো ছেলেটি।

সবাই বোটে উঠে পড়েছে ইঞ্জিনিয়ারের ছোট নৌকাটাকে বেঁধে নেয়া হলো বড় নৌকার সঙ্গে। পানি কেটে এগোতে শুরু করেছে জলযান।

এই দ্বীপটা ছেড়ে যেতে তাদের দুজনের বড় কষ্ট হচ্ছে। এই দ্বীপে তারা কোনো বিপদে পড়েনি। মায়া জন্মে গিয়েছিল দ্বীপটার প্রতি। হয়তো আর কোনো দিন এখানে আসা হবে না। মেয়েটি হাত নাড়তে লাগল দ্বীপটির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এর কোনো প্রতিউত্তর এলো না।

‘শুরু করুন আপনার কাহিনি’, ছেলেটিকে বলল ক্যাপ্টেন। কাহিনি শোনায় মগ্ন হয়ে গেল মেয়েটি।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব- ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-৯ 2
Latest posts by জাকির আহমদ (see all)