আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১

জাকির আহমদ

৬ মার্চ, ২০২০ , ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ ; 1069 Views

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১ 1

(পর্ব – ১)

সময়টা বসন্তের মাঝামাঝি। চৈত্রের এক সকাল। সেই সকালটা কাছে টানার মতো। মায়ের মনের মতো সেই সকালের আকাশটাও পরিষ্কার। বাতাস মুক্ত ও নির্মল। কোনো ক্লান্ত দেহকে প্রশান্তি দিতে এর জুড়ি নেই। বসন্তের নানান ফুল তাদের পাপড়ি মেলে দিয়ে প্রকৃতিকে অপরূপ করে তুলেছে। কোকিলের কুহুকুহু ডাক মোবাইলের কৃত্রিম রিংটনের বিরক্তি নয়, কৃষ্ণের বাঁশির মতো পাগল করা।

এসব মিলে বেঁচে থাকাটাকে সার্থক করে তুলতে চায় প্রকৃতি। বোঝা যায় প্রকৃতি বরাবরই নিষ্ঠুর! প্রকৃতি বরাবরই সুন্দর-মমতাময়ী।

প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন যে আলোর দেবতা সূর্যের কোমল আলো পৃথিবীর মুখে এসে পড়েছে তা টের-ই পাইনি। দূরে দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীর মুখ দেখি আস্তে আস্তে দিনে রূপ নিচ্ছে।   আরো দূরে চেয়ে দেখি ইতোমধ্যে নতুন এই দিনে সবাই কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়েটিং রুমে অনেক মানুষ অপেক্ষা করছে। সবাই কিছু না কিছু করে অপেক্ষার সময় পার করছে। কেউ দৈনিক পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ছে। কেউ সহযাত্রীর সঙ্গে গল্প করছে। আপন মনে বাচ্চারা মৃদু হইচই করছে বা খেলছে, আবার কেউ কিছু চেয়ে পায়নি বলে কাঁদছে। এয়ার কন্ডিশনারের মধ্যে থেকেও কেউবা অহেতুক ঘামছে।

বিমানবন্দরের বিস্তৃত আঙিনায় বিশালাকার একটি বিমান সুদূর আকাশে ডানা মেলার পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছে। একটু পরেই মাটির মায়া ত্যাগ করে আকাশের দিকে ছুটবে। হঠাৎ ওয়েটিং রুমের দেয়ালে বসানো স্পিকার থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘সম্মানিত লন্ডনগামী যাত্রী মহোদয়…।’ বাংলায় বলার পর একই কণ্ঠ ইংরেজিতে বলল, ‘ওয়েলকাম লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…।’

এর মাঝে যাত্রীদের কেউ কেউ সঙ্গে থাকা হালকা ব্যাগসহ নির্ধারিত দরজার দিকে হাঁটা শুরু করেছে। মায়েরা তাদের সন্তান সামলাতে যেন মহাব্যস্ত। দুজন লোক যাত্রীদের পথ দেখিয়ে দিতে সাহায্য করছে। তাদের পরনে নির্ধারিত পোশাক। দরজায় হালকা ভিড় জমে গেছে। অনেকে আগে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। পেছন থেকে অনেকেই সামনের জনকে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে। ফলে সামনের জন তার সামনের জনকে একইভাবে ধাক্কা দিচ্ছে। নয়তো ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে গায়ের ওপর পড়ছে। বিরক্তিতে অনেকের মুখ কালো হয়ে গেছে। কিন্তু বলার কিছু নেই।

ভিড়ের মাঝে শ্মশ্রুমণ্ডিত, পাজামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরা এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যেমন লম্বা-চওড়া তেমন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ তার শরীর। দেখলে সহজে চোখ ফেরানো যায় না। এমন সুদর্শন যুবকের মুখে অদ্ভুত সারল্য ফুটে উঠেছে। কিন্তু তার বাহ্যিক বেশভূষা দেখে অতোটা বোঝা যাবে না যে তার ভেতরে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

যুবকের ঠিক সামনে অষ্টাদশী, অনিন্দ্যসুন্দর এক মেয়ে হাতব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ডাগর চোখের চঞ্চল চাহনি ঘুরে ফিরছে এপাশ-ওপাশ। হয়তো সামনে এগোনোর পথের সন্ধানে। নয়তো অন্যকিছু। কে জানে তার চাহনির রহস্য কী!

অনেকে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। অবশেষে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অনেক কষ্টে। কেউ কেউ তার শরীর থেকে পারফিউমের সুগন্ধ পাচ্ছে। আর ফিস ফিস করে ‘কী দারুণ সুগন্ধ’ বলে একে অপরের কাছে বলাবলি করছে। কেউ আবার চোখ বন্ধ করে পারফিউমের সেই গন্ধ শুকতে শুকতে স্বপ্ন রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

যুবকের পেছনে আরো তিজন দাঁড়ানো। তারাও পরস্পর নীচু গলায় কী যেন আলাপ করছে আর হাসছে। তবে সামনের ছেলেটির সে সম্পর্কে কোনো আগ্রহ নেই। সে তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে। বিমান ছাড়ার এখনো বিশ মিনিট বাকি। পেছন থেকে হঠাৎ কে যেন ছেলেটাকে কাঁধ দিয়ে বেশ জোরে ধাক্কা দিল। এমন ধাক্কায় নিজেকে সামলাতে না পেরে মেয়েটির গায়ে গিয়ে পড়ল। মেয়েটি এ ধাক্কার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সেও ভারসাম্য হারিয়ে সামনের লোকটির কাঁধ ধরে শেষ পর্যন্ত সামলে নিল। ছেলেটিও সোজা হয়ে দাঁড়াল অপরাধীর ভঙ্গিতে।

‘ইস! শেষ করে দিলো আমার পা-টা।’ মেয়েটি ঘুরে ছেলেটির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, ‘পায়ে পাড়া দিয়ে হলো না, আবার গায়ে এসে পড়লেন, ছি!’ স্যান্ডেল খুলে পা-টা ভাঁজ করে তুলে হাত দিয়ে পায়ের আহত জায়গাটা ম্যাসাজ করল।

তার এমন কথায় যুবকের চেহারা লাল হয়ে গেল, কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। ‘দেখেন, আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি।’ এক মুহূর্ত পর আমতা আমতা করে বলল ছেলেটি।

‘তবে কি আপনার ইচ্ছে পূরণ করতে কেউ আপনাকে ধাক্কা দিয়েছে!’ রাগের সঙ্গে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল মেয়েটার মুখ থেকে। লজ্জায় তার গোলাপি ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। দুজনের কথাবার্তায় এরই মধ্যে আশপাশের অনেকেই দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ব্যাপারটা কী আঁচ করতে পেরে মুখ টিপে হাসছে।

পরের কথাতেও আগের কথার সঙ্গে স্পষ্ট মিল থাকায় ছেলেটি এমন বিব্রত হয়ে পড়ল যে, মেয়েটাকে দেয়ার মতো সন্তোষজনক উত্তর মাথায় তৈরি করে নিলেও মুখে এলো না। অনেক কষ্টে শুধু বলতে পারল, ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

মেয়েটা হয়তো ভদ্র ঘরের সন্তান, তাই আর কিছু না বলে ঘৃণামিশ্রিত দৃষ্টিটা ফিরিয়ে নিল। ততক্ষণে সে স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে একটু বেকায়দা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে।

এতক্ষণে ছেলেটি পেছনের তিনজনের দিকে তাকানোর সুযোগ পেল। তাকিয়ে বুঝল, তারাও বিব্রত মুখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি তাদের দিকে তাকাতেই একজন বলল, ‘আমরা মাফ চাইছি ভাই, একটু ছেলেমি করতে গিয়ে আপনাকে অনেকের সামনে ছোট করে ফেললাম, আর কখনো এমন দুষ্টুমি…।’

ছেলেটি অপ্রস্তুত হয়ে কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, এ আর এমনকি, আমি কিছু মনে করিনি।’ ‘সত্যি, আপনাকে ওই অবস্থায় ফেলে আমরা বেকুব বনে গেছি। মেয়েটির রাগ দেখে কিছু বলতেও ভয় পাচ্ছিলাম।’ বলল আরেকজন।

‘এই যে ভাই, আপনারা যাবেন না? সময় আর মাত্র পনের মিনিট’, বলল ইউনিফর্ম পরা একজন। ছেলেটা তাকিয়ে দেখে তারা চারজনসহ আরো জনাকয়েক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারা এদের পরবর্তী কথা শুনে শ্মশ্রুমণ্ডিত ছেলেটার দিকে এবার সুনজরে তাকিয়ে আছে। গাইডের কথায় ইতোমধ্যে সবাই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখে বাকি সবাই অনেক সামনে গেছে। ছেলেটি দেখল, সেই মেয়েটিও অনেক সামনে চলে গেছে। সে যে দোষী নয়, তা হয়তো সে জানল না। বাকি সবাই দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। এরপর কারো সঙ্গে কারো কথা হলো না।

বিমানের পেটের ভেতরে ঢুকেই ছেলেটির মনে হতে লাগল, এরই মধ্যে যেন সে মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্বদেশ ত্যাগের কষ্ট সে উপলব্ধি করতে লাগল। বিমানের ভেতর ছেলেটি প্যাসেজ ধরে হাঁটছে আর নিজের সিট খুঁজছে। হাঁটতে হাঁটতে সে বিমানের মাঝামাঝি চলে এলো। সিট খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ করেই মেয়েটার দিকে চোখ পড়ল ছেলেটির। দেখল, মেয়েটি তার দিক থেকে ঝট করে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। মেয়েটি এক বাচ্চাসহ মহিলার সঙ্গে বসেছে। মেয়েটার সিটের একসারি পেছনে সে তার সিট পেয়ে গেল। কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। সে ওয়েটিং রুমের ওই ঘটনার পর থেকেই কামনা করছিল যেন তার সিটটা এমন জায়গায় হয়, যেন মেয়েটাকে চোখে না পড়ে। এক মিনিট পরই সহযাত্রী এসে তার পাশে বসল এবং তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

‘ওয়েটিং রুমে তো বিশ্বসুন্দরীর সঙ্গে দারুণ এক ঘটনার জন্ম দিলেন, মুখরোচক হিসেবে ভালোই, কী বলেন?’ হাসি আরো বেড়ে গেল লোকটার। খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল ছেলেটি।

‘বিশ্বসুন্দরী বলা কি ভুল হলো? আমার অনুমান ক্ষমতা ভোঁতা না হলে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় সেরা সুন্দরীর খেতাবটা সে-ই পাবে।’ এক মুহূর্ত থামল লোকটি।

‘আচ্ছা, ওই সুন্দরীর কথায় কি আপনি মন খারাপ করেছেন?’ ছেলেটির চোখের দিকে চোখ রেখে বলল লোকটি। ছেলেটির কাছে লোকটির কথা ব্যঙ্গাত্মক মনে হলো। ফলে তার অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল। ‘না মানে, ব্যথা কেন পাব, ওই অবস্থা হলে যে কোনো শান্ত-ভদ্র মেয়েই এসব কথা রাগের মাথায় বলে ফেলবে, আর অত লোকের সামনে যে কারোরই ওই অবস্থায় রাগ হওয়া স্বাভাবিক।’ দুজনেই কথা বলছে নীচু স্বরে, যাতে পাশে কেউ শুনতে না পায়।

‘আপনি হয়তো আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করছেন, আসলে আমি অমন…’ বাকিটুকু শেষ করতে পারল না ছেলেটি। ‘আপনি হয়তো খুব অস্বস্তিবোধ করছেন’, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল লোকটি। ‘আপনি যে ও রকম করেননি তা আমি জানি।’

‘জানেন?’ খানিকটা বিস্মিত কণ্ঠে বলল ছেলেটি।

‘পরে আপনি যখন পেছনের ছেলে তিনটির দিকে ফিরে কথা বলছিলেন, ততক্ষণে মেয়েটি সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ সে জানতে পারল না যে, আপনি নির্দোষ, তবে আমার মতো আরো কয়েক অধম সত্য ঘটনাটা জানে।’

‘ও, তাহলে আপনারা ছেলে তিনটির সঙ্গে আমার কথাবার্তা শুনেছেন?

‘জি, হ্যাঁ।’ আন্তরিক হেসে জবাব দিল লোকটি।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল ছেলেটি। মনে মনে আল্লাহর প্রশংসা তো করলই।

‘আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।’

‘মানে?’, বুঝতে না পেরে বলল ছেলেটি।

‘আপনি অমন এক পরিস্থিতিতে যে ধৈর্য ও নম্রতার পরিচয় দিয়েছেন, অন্য কারো পক্ষে তা কঠিন হতো।’

‘থাক, থাক আর প্রশংসা করতে হবে না’, লজ্জিত হয়ে বলল ছেলেটি। ‘ইসলাম তো মানুষকে সব ধরনের পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছে, সর্বদা বিনয়ী ও নম্র হতে বলেছে।’

এর মধ্যে দানব আকারের আকাশযানের ইঞ্জিনগুলো গর্জে উঠেছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে তার আওয়াজ। বিমানের ভেতরে যদিও আসল আওয়াজ ঢুকছে না, তারপরও যতটুকু ঢুকছে তাই ঢের। আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোচ্ছে বিমান তার বিশাল দেহটা নিয়ে। বিমানের লাউড স্পিকার থেকে ভেসে এলো ক্যাপ্টেনের ইংরেজি কণ্ঠ, ‘ওয়েলকাম লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান…’। তারপরের কথাগুলো বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘এরই মধ্যে আমরা যাত্রা শুরু করেছি সুদূর লন্ডনের দিকে। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বাংলার মাটির স্পর্শ ত্যাগ করে আকাশে ডানা মেলব, আপনিও আমন্ত্রিত, তাই অনুগ্রহ করে আপনাদের সিটে সংযুক্ত সিটবেল্ট বেঁধে ফেলুন, আপনাদের যাত্রা আনন্দময় ও শুভ হোক, ধন্যবাদ’, একনাগাড়ে বলে থামল গমগমে কণ্ঠটি। যাত্রীরা তাদের দেহকে সিটের সঙ্গে বাঁধতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিমানের গতি এর মধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। আশপাশের সবকিছু দেখতে দেখতে দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে। দূরের সবকিছুই যেন বিমানের সঙ্গে ছোটার প্রতিযোগিতা করছে। তবে তারা হেরে যাচ্ছে। বিমানের ছোট্ট জানালা দিয়ে বাংলার অতি পরিচিত কিছু দৃশ্য চোখে পড়ছে। আকাশে ডানা মেলার সঙ্গে সঙ্গে সেসব হারিয়ে যাবে ধীরে ধীরে।

বিমানের গতি চূড়ান্তভাবে বেড়ে গেছে। এর মধ্যে বিমানের সুন্দরী, স্মার্ট এয়ার হোস্টেসরা যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে দেখে গেছে, সবাই সিটবেল্ট বেঁধেছে কিনা বা কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। যারা বাঁধতে পারছে না, তাদের দেখিয়ে দিচ্ছে বা বেঁধে দিচ্ছে। হঠাৎ মৃদু একটি ঝাঁকি দিয়ে মাটি ছেড়ে শূন্যের দিকে যাত্রা করল বিশাল প্রজাপতি তার প্রকাণ্ড ডানা মেলে। বেশ কিছুক্ষণ আড়াআড়িভাবে উড়ে একসময় সোজা হলো তার বিশাল দেহ।

খানিকক্ষণ পরই স্পিকার থেকে ভেসে এলো ক্যাপ্টেনের কণ্ঠস্বর, ‘ওয়েলকাম লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমরা এর মধ্যেই মাটি ছেড়ে আঠার হাজার ফুট ওপরে চলে এসেছি। আপনারা সিটবেল্ট খুলে স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারেন, আমরা পাকিস্তানের করাচি অভিমুখে এগোচ্ছি, ওখানে আমরা আধাঘণ্টা বিরতি করব, তারপর দুবাই বিমানবন্দরে বিরতির মধ্য দিয়ে যাত্রাবিরতি শেষ করে রওনা হব লন্ডনের দিকে। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের স্ন্যাক্স দেয়া হবে, আপনাদের যে কোনো অভিযোগ এয়ার হোস্টেসকে জানাবেন। আপনাদের যাত্রা আনন্দময় ও শুভ হোক, ধন্যবাদ। একনাগাড়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থামার পর বিমানের ভেতরটা বড় বেশি নীরব হয়ে এলো। সামনে বড় স্ক্রিনে বিমানের গ্লোবাল পজিশন দেখানো হচ্ছে নিয়মিত।

কথামতো কিছুক্ষণের মধ্যে যার যার পছন্দমতো স্ন্যাক্স এলো। সেই সঙ্গে নানান ড্রিংকস। সবার খাওয়া শেষ হলো এক সময়। বাংলাদেশের আকাশসীমা ছেড়ে ভারতের আকাশ সীমানায় ঢোকার ও আটত্রিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার খবরটা ক্যাপ্টেন জানিয়ে দিল। পাশের জানালা দিয়ে অনেক নীচে দেখা যাচ্ছে বাংলার সবুজ প্রান্তর, বাড়ি-ঘর সেখানে অস্পষ্ট, মাঝে মাঝে সাদা রঙের মেঘের ভেতর দিয়ে বিমানের যাওয়া, সব মিলে এক অপূর্ব দৃশ্য। ক্যাপ্টেনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ভারতের একই দৃশ্যের ওপর। অতি পরিচিত বাংলার আকাশ ছেড়ে ভারতের আকাশে উড়ছে বিমান। খাওয়া শেষ করে অনেকেই সিটে হেলান দিয়ে ঝিমাচ্ছে। অনেকে পেপার, ম্যাগাজিন বের করে পড়ছে। কেউবা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে, অনেকে সামনের সিটের পেছনে লাগানো মিনি মনিটরে দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখছে। সেই মেয়েটি এরই মধ্যে ঘুমিয়ে গেছে। আর ছেলেটি ইংরেজি কাগজ পড়ছে।

‘আপনি ইংরেজি পত্রিকা পড়েন!’ এতক্ষণ পাশের লোকটিও ইংরেজি ম্যাগাজিনের মধ্যে ডুবে ছিল। হঠাৎ পাশে চোখ পড়তেই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

লজ্জিত হাসি হেসে ছেলেটি বলল, ‘জি, আল্লাহর রহমতে পারি।’ এরপর দুজনের আর কারোরই পড়া হলো না। গল্পের আসর জমিয়ে ফেলল দুজনে। ভদ্রলোকের আগ্রহে ইংরেজিতেই কথা হলো যতক্ষণ না ক্যাপ্টেনের কণ্ঠে শোনা গেল, ‘ওয়েলকাম, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমরা পাকিস্তানের করাচিতে ল্যান্ড করার জন্য প্রস্তুত, আপনারা দয়া করে সিটবেল্ট বেঁধে নিন…।’

প্রথমে পরিচয়পর্ব শেষ হলো। জানা গেল, ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ লেকচারার, সরকারিভাবে পিএইচডি করার জন্য লন্ডনে যাচ্ছেন অর্থাৎ ছেলেটির অর্ধেক পথের যাত্রী। দুজনে নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করল। যখন ক্যাপ্টেন তাদের আলোচনায় বাধা দিল, তখন তারা পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে কথা বলছিল।

করাচির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আধাঘণ্টা দেরি করে আবার ডানা মেলল বিমান। জোহরের নামাজের সময় হলে দুজনেই সিটে নামাজ পড়ে নিল। অজু আগেই করে রেখেছিল। কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার পরিবেশন করল এয়ার হোস্টেসরা। এয়ার হোস্টেসের আন্তরিক আতিথেয়তায় তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শুরু করল সবাই। খাওয়া শেষে সফট কোল্ড ড্রিংকস। খেয়ে-দেয়ে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল। আর সেই মেয়েটি বসে ম্যাগাজিন পড়া শুরু করল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। প্রথমে লোকটির ঘুম ভেঙে গেল। বাথরুম সেরে অজু করে দুজনেই আসরের নামাজ পড়ে নিল। বেশ কিছুক্ষণ পর দামি বিস্কুটসহ বিকেলের চা পরিবেশন করা হলো। দুবাই বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল বিমান। এখানে বিমানে  ফুয়েল ভরা হবে বলে বিরতি সোয়া এক ঘণ্টা। এতক্ষণ বিমানে বসে থাকা কষ্টকর। তাই সব যাত্রীকে বিমান থেকে নামিয়ে নিয়ে টার্মিনালের লাউঞ্জে বসানো হলো।

ছেলেটি যেখানে বসেছে তার থেকে বেশ দূরে বসেছে মেয়েটি। মুখের সামনে তুলে ধরা একটা ম্যাগাজিন। অপেক্ষার সময় কখনোই দ্রুত ফুরায় না। এ ধরনের সময় যেন এগোয় শামুকগতিতে। এশার নামাজের সময় হলে দুজনেই বিমানবন্দরের নামাজ ঘরে নামাজ পড়ে নিল। নামাজ পড়ে ফিরে জানতে পারল কোনো কারণবশত বিমান নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর রওনা দেবে। কী আর করা! অপেক্ষা করতে হবে যেন আরো দুশো বছর।

আবার যখন সবাই বিমানে  উঠল তখন বেশ রাত হয়েছে। খিদেয় চোঁ চোঁ করছে পেট। তবে যাত্রীদের পেটের খবর বুঝি ভালো করেই রাখেন বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানের উচ্চতা চল্লিশ হাজার ফুটে আসতেই রাতের খাবার দেয়া হলো। খেয়ে-দেয়ে সবাই লম্বা ঘুম।

ক্যাপ্টেনের কণ্ঠ শুনে যখন প্রায় সবার ঘুম ভেঙে গেল, তখন বিমান লন্ডনের হিথ্রো বন্দরে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন দিনের আলো ফুটতে তখন আর বেশি দেরি নেই। একসময় বিমানবন্দরের আঙিনায় স্থির হলো বিমান। পাশের ভদ্রলোক নামার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন। ছেলেটিও উঠে দাঁড়াল। তবে তাকে অন্য বিমানে  চেপে পাড়ি জমাতে হবে নিউ ইয়র্কের পানে। লাউঞ্জে পৌঁছে ছেলেটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে যখন বিদায় নিচ্ছিল ইংলিশ লেকচারার, তখন বাংলায় ছেলেটিকে বলল, ‘আপনি কিন্তু খুব সুন্দর করে ইংরেজি বলেন।’

‘কী যে বলেন…।’ স্বলজ্জ হেসে বলল ছেলেটি।

‘চলি, আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ্। বলে সালাম দিয়ে ছেলেটির দিকে আর একবার তাকিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল ছেলেটি, ‘এত অল্প সময়েই মানুষের মাঝে কত আন্তরিকতা জন্ম নেয়।’

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নিউ ইয়র্কগামী সবাই জানতে পারল, যে বিমান ধরে তাদের আকাশপথে পাড়ি দেয়ার কথা, সেই বিমানের এয়ার রুট পারমিট বাতিল হয়েছে। বিমান ছাড়বে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। মেয়েটিকে দেখতে পেল ছেলেটি। একটা লম্বা সোফায়, একাই চোখ বন্ধ করে বসে আছে। হঠাৎ মনে হলো, মেয়েটির ভুল ধারণা ভেঙে দেয়া যায়। পরক্ষণেই মনে হলো, কী লাভ হবে মেয়েটির কাছে ভালো মানুষ হয়ে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। মেয়েটি অপেক্ষা করছে কেন? সেও কি তবে পাড়ি দেবে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বিমানে?

===========================

বিমানের করিডোর ধরে নিজের সিট খুঁজছে ছেলেটি। সারাদিন লন্ডনের দুটি হোটেলে তাদের সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল বিমান সংস্থা। ছেলেটি যে হোটেলে উঠেছিল, মেয়েটি সে হোটেলে ছিল না। বার ঘণ্টারও বেশি সময় হোটেলে অপেক্ষা করাটা যেন অসহ্য হয়ে উঠেছিল। বিমানের সামনের দিকে এক সারিতে বসেছে মেয়েটি। তার পাশে বাচ্চাসহ সেই মহিলাটি। মাঝের দিকে নিজের সিট পেল ছেলেটি। দুই মিনিট পরই তার পাশে এসে বসল এক ইংরেজ ভদ্রলোক।

একসময় বিমান আবার আটত্রিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে পশ্চিমে ডানা মেলল। এরপর বাকি পথটুকুর সিংহভাগ উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর থাকতে হবে। এশার নামাজের সময় হয়ে এলো। কিন্তু বিমান এখন একটু দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হয়ে ছুটছে। অর্থাৎ নামাজ পড়তে হলে পাশের ভদ্রলোককে তুলে দিতে হবে। একান্ত তুলে দিতে না পারলে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যে পাশের লোকটির সঙ্গে দু-চারটি কথা হয়েছে। লোকটি অমিশুক না। ছেলেটা প্রথমে বেশ অস্বস্তি প্রকাশ করতে শুরু করল। নড়াচড়া করছে, পেপার-ম্যাগাজিন ঘাঁটছে, কোনোটাতেই যেন স্বস্তি পাচ্ছে না এমন ভাব। একপর্যায়ে পাশের ভদ্রলোক ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কোনো সমস্যা? আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি?’

‘নামাজের সময় হয়েছে, নামাজ পড়ব, কিন্তু বিমানটা একটু দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হয়ে যাচ্ছে…।’

ইংরেজ ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা বুঝে নিলেন।

‘আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি। আপনি ততক্ষণে নামাজ পড়ে নিন’, বলে উঠে চলে গেলেন।

ছেলেটি ধন্যবাদ জানাল ভদ্রলোককে। কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এলো। এর মধ্যে নামাজ পড়া হয়ে গেছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর রাতের খাবার পরিবেশন করা হলো। খেয়ে-দেয়ে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়ল। মেয়েটি একটি ম্যাগাজিন নিয়েছে। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়বে। তবে ছেলেটি দুপুরে ঘুমিয়েছে। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসবে না, তাই একটা পত্রিকা হাতে নিল।

দীর্ঘ রাত। বিমানের ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। আকাশে চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের স্নিগ্ধ আলো পৃথিবীপৃষ্ঠে যেন তার কোমল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো সময় মেঘের আড়ালে চাঁদ হারিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ একটা এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলছে। একটা বিশাল অঞ্চল অন্ধকারে ঢাকা আর একটা অঞ্চল চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে পৃথিবীতে যেন এক রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করছে।

বিমান একটা নির্দিষ্ট আওয়াজ সৃষ্টি করে উড়ছে। সবকিছুই যেন ছন্দের সঙ্গে চলছে। শুধু ছন্দের পতন ঘটেছে আকাশ পরীদের মধ্যে। একজন এয়ার হোস্টেস ককপিট থেকে বের হয়ে এসে তার সহকর্মীর কানে কী যেন বলতেই তার চেহারায় আতঙ্ক ফুটে উঠল। তার পরেরজনকে বলতেই তারও ভাবান্তর ঘটল। এভাবে প্রত্যেকের চেহারায় পরিবর্তন ঘটল। তারা করিডোরের টহল বাদ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ককপিটের দিকে।

এদিকে, যাত্রীদের কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। অনেকে দিনে বেশ ঘুমানোর কারণে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুম পাচ্ছে না। তাদের কেউ কেউ রিডিং লাইট জ্বেলে পেপার-ম্যাগাজিন পড়ছে। কেউ হেডফোন কানে লাগিয়ে অডিও ক্যাসেট জ্যান্ত করে দিয়েছে, কেউবা সহযাত্রীর সঙ্গে হালকা গল্প করছে। অনেক মহিলা তাদের সন্তানদের ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত। কেউ বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে প্যাসেজ ধরে হাঁটছে। কেউ বাথরুম সারতে গেছে। কেউবা ঘুমের ঘোরে ডুব দিয়েছে। এভাবে একেকজন একেকভাবে মগ্ন আছে।

আরো পাঁচ মিনিট পর বেরসিকভাবে জ্যান্ত হয়ে উঠল বিমানের প্রতিটি লাউড স্পিকার। সেখান থেকে ভেসে এলো ক্যাপ্টেনের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর, ‘হ্যালো, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…।’ এবার ওয়েলকাম বলল না ক্যাপ্টেন। ‘আমরা উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যখান দিয়ে উড়ে চলেছি। আমাদের নীচে আশপাশে বিমান নামানোর মতো অর্থাৎ ল্যান্ড করার মতো কোনো দ্বীপ নেই, যেসব ছোট দ্বীপ আছে, ওপর থেকে সেসব সহজে চোখে পড়ে না।’ ক্যাপ্টেন তার উত্তেজিত কণ্ঠকে স্বাভাবিক রেখে কথা বলার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। যারা জেগে ছিল তারা প্রথম থেকেই কান খাড়া করে শুনছে। যারা ঘুমন্ত ছিল তারাও এর মধ্যে জেগে উঠে এই অস্বাভাবিক কথাবার্তায়…

‘তার ওপর দ্বীপগুলোয় পাহাড় আছে, আছে ঘন জঙ্গল। পাহাড়ে ধাক্কা লাগলে কারো বাঁচার সম্ভাবনা একদম কম, সে জন্য সে চেষ্টা না করে পানিতে নামার চেষ্টা করাই অপেক্ষাকৃত শ্রেয়। কারণ সাঁতরিয়ে এক-দুজন বেঁচেও যেতে পারে।’

এসব কথাবার্তায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে গেছে। আসল বিষয় জানতে পারছে না। না থেমেই বলে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন, ‘আমার এসব কথাবার্তায় অনেকে হয়তো অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। তিক্ত হলেও সত্য, আপনাদের জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে। দুঃসংবাদ দেয়ার আগে পরিস্থিতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম, যেন তা শুনে প্রথমেই অস্থির হয়ে না পড়েন। এবার মনকে শক্ত করে দুঃসংবাদটি শুনুন।

‘প্রায় আধা ঘণ্টা আগে প্রথম ধরা পড়ে, আমাদের বিমানের ফুয়েল অস্বাভাবিকহারে কমে গেছে। তারপর থেকে দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিকের তুলনায় ফুয়েল অতি দ্রুত কমছে। মাত্র আর বিশ মিনিট ওড়ার মতো ফুয়েল আছে। ফুয়েল যে হারে কমছে সেই অনুপাতে এই হিসাব করা হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিমান ল্যান্ড করানোর মতো কোনো দেশে পৌঁছানো যাবে না। আমাদের জানামতে নীচের বিস্তীর্ণ এলাকা বিরান ভূমি। মানুষের বসবাস নেই। ফুয়েল এত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে, হয়তো ফুয়েল ট্যাংকের কোথাও ছিদ্র হয়েছে। বুঝতেই পারছেন, আমরা আর আঠার মিনিট ভেসে থাকতে পারব। আরো কিছুক্ষণ ভেসে থাকার জন্য চারটা ইঞ্জিনের দুটো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে আমরা মাত্র বার হাজার ফুট উঁচুতে রয়েছি। পাঁচ মিনিট আগে কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছি না। আমরা ব্যর্থ, আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাদের কয়েকটা প্যারাসুট আছে, কিন্তু আমরা তা ব্যবহার করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরাও আপনাদের পরিণতির সঙ্গী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে আপনাদের মধ্যে কেউ যদি তা ব্যবহার করতে পারেন, তবে এখনই ককপিটে চলে আসুন, ভাগ্য ভালো হলে কোনো দ্বীপে ধীরে ধীরে নেমে যেতে পারবেন। আকাশে চাঁদ আছে। তবে পানিতে নেমে লাভ নেই, প্যারাসুট নিয়ে পানিতে ভেসে থাকা যাবে না।’

এর মধ্যে কম-বেশি সবাই তীব্র আতঙ্কে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কেউ কেউ মৃত্যুর আগে চোখ বুজে আছে। কেউবা সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু জেনে দোয়া-কালাম পড়ছে, তওবা করছে আল্লাহর কাছে। সবমিলে এক করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যেন মৃত্যুর আগেই সবার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কেউ প্যারাসুটের জন্য ককপিটের দিকে এগিয়ে গেল না, কারণ প্যারাসুট নিয়ে বাঁচার সম্ভাবনা একদম কম।

ক্যাপ্টেন আবার শুরু করলেন, ‘আমরা গতি ও উচ্চতা দুটোই দ্রুত হারাচ্ছি। আমরা কোনো দ্বীপের কাছাকাছি ল্যান্ড করার চেষ্টা করছি, যাতে কেউ না কেউ বাঁচতে পারে। কিন্তু আশপাশে কোনো দ্বীপও চোখে পড়ছে না, অথচ থাকার কথা। যেন আমাদের বিপদ দেখে সব উধাও হয়ে গেছে। তবে আমরা এখন পাঁচ হাজার ফুটে নেমে খুঁজে যাচ্ছি। এখনো কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।’

‘আর বড়জোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা পানির ওপরে আছড়ে পড়ব। তাতে বিমানের লাফানোর সম্ভাবনা আছে। আপনাদের মধ্যে যারা শেষ পর্যন্ত বাঁচার জন্য লড়তে চান, তাদের জন্য সামনে-পেছনে উভয় দরজা পানিতে পড়ার আগে খুলে দেয়া হবে। অবস্থা বুঝে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করবেন। যারা ভেসে থাকতে বা সাঁতরাতে পারবেন না, তারা অহেতুক শেষ সময়ে কষ্ট না করে সিটে বসে সিটবেল্ট বেঁধে শেষ প্রার্থনা করতে থাকুন। আমরা আপনাদের সঙ্গী হতে পেরে মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও আনন্দিত। আপনারা যারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছুক, তারা দুই দরজার যে কোনো দরজার সামনে দাঁড়ান। শক্ত করে কিছু ধরুন। তা না হলে আহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। আবার বলছি, দরজা খুলে যাওয়ার পর অবস্থা বুঝে পানিতে ঝাঁপ দেবেন। সময় আর নেই। তিন মিনিটের মধ্যে বিমান পানিতে আছড়ে পড়বে। এ নির্মম পরিণতির জন্য আমরা আবারো আপনাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি ও ক্ষমা চাচ্ছি। সম্মানিত যাত্রীগণ বিদায়!’ বলে ককপিট থেকে বের হয়ে এলেন কেবিনে। স্পিকার থেমে যেতেই কান্নার শব্দ বেশি করে কানে বেজে উঠল।

ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ইংরেজ ভদ্রলোকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে পেছনের দরজায় গিয়ে শক্ত হাতল ধরে দাঁড়াল। এর মধ্যে সে আল্লাহর দরবারে তওবা করে নিয়েছে। তার আগে দুজন একইভাবে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর আরো তিনজন কাঁদতে কাঁদতে একদম দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে সবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। আর কোনোদিন তাদের দেখতে পাবে না। যারা উঠে আসছে না, তারা এ অথৈ সমুদ্রে ভেসে থাকতে বা সাঁতার কাটতে পারবে না বলেই নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষায় বসে আছে।

এয়ার হোস্টেসরা অনেকক্ষণ ধরে যাত্রীদের পানি খাওয়াতে ব্যস্ত। যারাই চাইছে তাদের দিকেই এগিয়ে ধরছে পানি ভর্তি গ্লাস। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা শেষ সময়ে যাত্রীসেবা করে চলেছে, তাদের দায়িত্ব পালন করছে। ক্যাপ্টেনও এসে সে সময় যাত্রীসেবায় যোগ দিল, মুখে তার কোনো ভাবান্তর নেই। মৃত্যু যেন তার কাছে খেলা। তার মুখে কোনো আতঙ্ক ফুটে ওঠেনি। সব যাত্রীই যেন মৃত্যুর আগে পানি খেয়ে মরতে চায়। আরো দুই পাইলট ককপিট থেকে বের হয়ে এসে যাত্রীদের দিকে বিদায়সূচক হাত নাড়তে লাগল। এর মধ্যে সেই মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকে মায়ের কোল থেকে ক্রন্দনরত মেয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। সামনের দরজায় দুজন ক্রন্দনরত মেয়ে শক্ত কিছু ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে যেতে উদ্যত হতেই সিট থেকে মহিলাটি দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট সোনামণিকে চুমো খেল বেশ সময় নিয়ে। তারপর নিজের সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করে মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বলল, ‘যদি দেখ একে বাঁচাতে গিয়ে তোমার জীবন বিপন্ন, তখন একে ছেড়ে নিজের জীবন বাঁচিও, এটা আমার অনুরোধ।’ আর বলতে পারলেন না মহিলা, সিটে বসে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

এদিকে এয়ার কন্ডিশনের মধ্যেও মৃত্যুর আতঙ্কে সবাই ঘেমে উঠেছে। যারা সিটে বসে আছে তারা প্রত্যেকে তাদের আপনজন, প্রিয়জন বা সহযাত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মায়েরা তাদের বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কয়েকজন শ্মশ্রুমণ্ডিত মানুষ দুহাত তুলে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করছে। সব মিলে হাহাকার পড়ে গেছে।

মেয়েটা যখন বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে সামনের দরজায় অপেক্ষমাণ মেয়ে দুটির দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে এগোচ্ছে, তখন অনেকে তাদের দুজনকে তাকিয়ে দেখছে। সবার মনেই যেন একই প্রশ্ন, যেখানে নিজের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় নেই, সেখানে এ অবুঝ বাচ্চাসহ মেয়েটা বাঁচতে পারবে তো? দরজার দুপাশে লাগানো হাতলের একপাশে একহাতে ধরল, অন্য হাতে বাচ্চা মেয়েটাকে জড়িয়ে রইল। অন্য পাশের হাতল মেয়ে দুজন আগেই দখল করেছে।

তারপরই স্পিকার দুই সেকেন্ডের জন্য সচল হলো। ভেসে এলো ককপিটে অবস্থানরত একমাত্র পাইলটের কণ্ঠ, ‘আর মাত্র এক মিনিট। সঙ্গে সঙ্গে কান্নার শব্দ ভরে উঠল বিমানের ভেতরটা। ককপিট থেকে বের হয়ে আসা পাইলট দুজন ককপিটে অবস্থানরত তাদের সহকর্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়েই এসেছে। শেষ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তারা দুজনেই ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে তাদের কায়দায় অভিবাদন জানাল। ক্যাপ্টেনও তার জবাব দিলেন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, যেন কিছুই ঘটবে না। শেষদিকে দুজন লোক সামনের দরজায় মেয়েদের পাশে গিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াল। ধরার মতো আর কিছুই সেখানে নেই। সময়ও হাতে নেই। সিটে বসে থাকা সবাই সিটবেল্টে এর মধ্যেই নিজেদের বেঁধে নিয়েছে। তা নাহলে মৃত্যুর আগে ঝাঁকুনিতে আহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। হঠাৎ করে ‘রেডি’ বলে একদম নীরব হয়ে গেল স্পিকার। দুটো দরজাই খুলে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়ল বিমান সাগরের বুকে। তারপরই আবার বিমানটা প্রায় পঁচাত্তর ফুট লাফিয়ে উঠল, আবার আছড়ে পড়ল; আবার প্রায় পঞ্চাশ ফুট লাফিয়ে উঠল, আবার আছড়ে পড়ল উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। আর লাফিয়ে উঠল না।

তিনবারই প্রচণ্ড শব্দ হলো। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার তুলনামূলক কম হয়েছে। পানি অনেকদূর ছিটকে গেছে। বিমানের ভেতরে সবাই ভয়ে প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠল। প্রত্যেকবার আছাড় খাবার সময় সিটবেল্ট থাকা সত্ত্বেও কম-বেশি সবারই আঘাত লাগল। অধিকাংশ মায়ের কোল ফাঁকা হয়ে গেছে। কারণ তাদের বাচ্চা কোনদিকে ছিটকে পড়েছে তার ঠিক নেই। প্রথমবার আছড়ে পড়ার পরই সব আলো নিভে গিয়ে যেন অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছে বিমানের ভেতরে। বাচ্চারা ছিটকে পড়ে যাওয়ায় আহত হয়েছে। তাদের গগনভেদী আর্তচিৎকার যে কোনো পাষাণ হৃদয়ও গলে যাবে। নরক গোলজার অবস্থা। এর মধ্যে বিমানে  পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ভরে যাবে অথৈ পানিতে। সামনের দরজায় দণ্ডায়মান লোক দুজন প্রথমবার আছড়ে পড়ার আগেই লাফ দেয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; এর মধ্যে বিমানটা খানিক এগোনোর ফলে বিমানের ডানা এসে তাদের ওপর আছড়ে পড়ল। ফলে তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়ে তলিয়ে গেল। প্রথমবার আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাসহ মেয়েটি ছিটকে কেবিনের দেয়ালে কপালে বাড়ি খায়। যে হাত দিয়ে হাতল ধরে ছিল, তা খুলে গেছে। হাত খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটাকে সে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেই আছড়ে পড়েছে বলে বাচ্চাটা তেমন কোথাও আঘাত পেল না। দ্বিতীয়বার আছড়ে পড়তেই মেয়ে দুজন লাফিয়ে পানিতে নামে কিন্তু বিমানের আছড়ে পড়াতে যে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, তার কবলে পড়ে দুজনেই তলিয়ে যায়। দ্রুত ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দুজনেই দম হারিয়ে ফেলে। ফলে অক্সিজেনের জন্য মুখ খুলতেই দ্রুত লবণাক্ত পানি গিলে ফেলে। নাকে-মুখে পানি ঢোকায় প্রচণ্ডভাবে হাত-পা ছুড়তে শুরু করে। তাতে দ্রুত শক্তি নিঃশেষ হয়ে চূড়ান্তভাবে তলিয়ে যায় সমুদ্রগর্ভে।

দেয়ালে বাড়ি লাগায় মেয়েটার কপাল খানিকটা ফেটে গিয়ে রক্তের ধারা পড়া শুরু করেছে। তবুও বাচ্চাটাকে সে শক্ত করে ধরে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে বাচ্চাটাও যেন কাঁদতে ভুলে গেছে। ককপিট থেকে কেবিনকে যে দেয়ালটা পৃথক করেছে, তার মাঝখানে একটা দরজা আছে। দরজাটা খোলাই ছিল। প্রথমবার আছড়ে পড়াতে দরজার কব্জাগুলো একদম নড়বড়ে হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার আছড়ে পড়াতে তা দেয়াল থেকে খুলে মেঝেতে মেয়েটার পাশে পড়ল। আছড়ে পড়ার শব্দে মেয়েটা চমকে উঠল। বিমানের ভেতরে অন্ধকার থাকায় কিছু দেখাও যাচ্ছে না; তবে চাঁদের ম্লান আলো দরজা গলে কিছুটা ভেতরে আসছে। প্রায় একই অবস্থা ঘটল ছেলেদের বেলায়ও। প্রথম যে দুজন এসে দাঁড়িয়েছিল, তারা দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল। আর দরজা খুলে গেছে পানিতে বিমান পড়ার ঠিক তিন সেকেন্ড আগে।

প্রথম দুজনের মধ্যে একজন প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে মাথা নীচের দিকে হয়ে পড়ে গেল। অথৈ পানিতে তার ওপর বিমান আছড়ে পড়ায় সৃষ্টি হওয়া বিশাল ঢেউয়ে একদম তলিয়ে গেল। দম ফুরিয়ে যাওয়ায় আর ভাসতে পারল না। দ্বিতীয়জন লাফ দিতে গিয়ে বুকের পাশ পানিতে পড়ে যায়। বুকে পানির প্রচণ্ড চাপে অজ্ঞান হয়ে ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল। বাকি চারজনের মধ্যে একজনকে কেউ বাধা দেয়ার আগেই দ্বিতীয়বার আছড়ে পড়ার আগে লাফিয়ে পানিতে পড়ল। সেই ছেলেটা পূর্ববর্তী দুজনের পরিণতি চাঁদের আলোয় আবছাভাবে দেখতে পেয়ে তাকে বাধা দিতে চেয়েছিল; কিন্তু সুযোগ পেল না।

ছেলেটা পানিতে পড়তেই বিমান দ্বিতীয়বার আছাড় খেল এবং বিমানের খুলে যাওয়া দরজাটা তার মাথায় প্রচণ্ড বাড়ি মেরে ডুবে যাওয়ার আগেই তার মৃত্যু ঘটল। বাকি চারজনের প্রত্যেকেই যখন পূর্বগামীদের করুণ পরিণতি দেখে পানিতে ঝাঁপ দেয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই তৃতীয়বার পানিতে আছাড় খেয়ে অনেকটা স্থির হয়ে গেল বিমান। বিমান স্থির হওয়াতে হাতঘড়ির লাইট জ্বেলে সময় দেখে নিল ছেলেটি। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। আছাড় খাওয়ার প্রত্যেকবারই যারা দরজার হাতল প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে ছিল, তাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি লেগেছে। কিন্তু যারা বিমান আছড়ে পড়ার আগেই ঝাঁপ দিয়েছে, তাদের তেমন লাগেনি; তবে করুণ পরিণতি তাদের দ্রুত মুক্তি দিয়েছে। বিমান স্থির হয়ে যাওয়াতে সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে চারজনই পানিতে লাফ দিল। চারজনই বাঙালি। চারজনেরই অপ্রকাশিত উদ্দেশ্য হলো একটু দূরে ভেসে থাকা বিশাল দরজাটা। চারজনের মধ্যে দুজন মাঝবয়সী, বাকি দুজন যুবক। শ্মশ্রুমণ্ডিত মাঝবয়সী একজন। সে দরজা থেকে লাফিয়ে অনেক দূরে পড়ল। বাকি তিনজন বেশ কাছে লাফিয়ে পড়ল। তারা তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে দরজাটা আঁকড়ে ধরল। উৎকণ্ঠায়-পরিশ্রমে হাঁপাতে লাগল তিনজনই। সাঁতরিয়ে এগিয়ে আসছে লোকটা। ভাসমান দরজাটা আঁকড়ে ধরে তিনজন লোকটার জন্য অপেক্ষা করছে, বিশ্রামও নিচ্ছে। তিনজনেরই নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি ঢোকায় হাঁচি আসছে। তাতে শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে যাচ্ছে। ঢেউয়ের তালে তালে দরজাসহ তিনজনই একবার ঢেউয়ের মাথায় উঠছে, আবার নীচে নামছে। লোকটা সাঁতরিয়ে অনেক কাছে এসে পড়েছে, আর অল্প একটু বাকি। বিপরীত দিক থেকে হঠাৎ করেই এক বিশাল ঢেউ এসে অপ্রত্যাশিতভাবে দরজাসহ তিনজনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিল। শেষ মুহূর্তে লোকটা সম্মুখে যমদূতকে দেখতে পেল; কিন্তু ততক্ষণে সময় শেষ হয়েছে। ইস্পাত মোড়া দরজাটা প্রচণ্ড জোরে লোকটার মাথায় ঠুকে গেল। মাথা ফেটে যাওয়ায় গা শিউরে ওঠা একটা শব্দ হলো। পরমুহূর্তে লোকটা হাত-পা ছেড়ে দিয়ে তিনজন মানুষের সামনেই তলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। তিনজনের মুখেই শোকের এক নীরব ছায়া ফুটে উঠল। আর কারো জন্য অপেক্ষা করার নেই। ভাসমান দরজাটা ধরে তিনজনই বাঁচার আশায় কোনো একদিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

তৃতীয়বার আছড়ে পড়ার পর বিমান খানিকটা স্থির হতেই ভেতরে পানি ঢোকা শুরু হলো। বিমানের ভেতরে অন্ধকারে মানুষের আর্তচিৎকারে এক নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি হলো। তারা ধীরে ধীরে ডুবে যাবে সাগরের তলদেশে। মৃত্যু যেন তাদের সঙ্গে আলিঙ্গন করতে সদা প্রস্তুত। আর্তচিৎকার ছাপিয়ে ক্যাপ্টেনের গম্ভীর গলা শোনা গেল, ‘আপনারা প্রত্যেকেই এই অন্ধকারে সিটবেল্ট খুলে মুক্ত হউন; তাতে বিমান যখন পানিতে ভরে উঠবে, তখন আপনারা হয়তো বাঁচার জন্য হাত-পা ছুড়তে পারবেন, এতে মৃত্যুকষ্ট কিছুটা হলেও কম হতে পারে। কমপক্ষে বন্দী অবস্থায় তো মৃত্যু হবে না। আমি আপনাদের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে নেয়ার জন্য বিমানের ভেতরেই থেকে গেলাম।’ শেষের বাক্যটা যাত্রীদের কিছুটা হলেও সান্ত¦না দেয়ার জন্য বলল ক্যাপ্টেন। ‘বিদায় বন্ধুগণ, বিদায়।’ এর মধ্যে মেয়েটি বাচ্চা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বিমানটা দরজার পাশে খানিকটা হেলে গেছে। হাঁটু পর্যন্ত পানিতে মেঝে ডুবে গেছে। দ্রুত পানি ঢুকছে, সেই সঙ্গে একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে বিশাল কাঠামো।

পানিতে কাঠের দরজাটি ভেসে উঠেছে। দরজা দিয়ে পানি ঢোকার স্রোতে দরজাটি বিপরীত দিকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। দরজাটি ভাসতে দেখে হঠাৎ করে মেয়েটির মাথায় একটা বুদ্ধি চাপল। বিপদে পড়লে অনেকের মাথা থেকে এমন সব বুদ্ধি বের হয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয় না। মেয়েটা পানি ভেঙে গিয়ে বাচ্চাটাকে দরজার মাথায় বসিয়ে দিয়ে নিজে শুয়ে পড়ল তার ওপর। যখন দেখল, দরজাটা তাদের নিয়ে কোনোরকমে ভেসে থাকল, একদম তলিয়ে গেল না, তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল মেয়েটার মুখে। তারপর মেঝেতে পা ঠেকিয়ে এগোতে লাগল। দরজার কাছাকাছি এসে আর কিছুতেই সামনের দিকে এগোতে পারছে না, দুটো বাধার জন্য। প্রথমত দরজা দিয়ে পানি ঢোকার স্রোতের জন্য, দ্বিতীয়ত ভেতরের পানি বেশ বেড়ে যাওয়ায় দরজাসহ বেশ ওপরে ভেসে উঠেছে। ফলে মেঝেতে মেয়েটার পা আর নাগাল পাচ্ছে না। সাঁতরাতেও পারছে না ভালোভাবে, কারণ একহাতে বাচ্চাটাকে দরজার গায়ে আটকে রাখছে, আর একহাতে নিজেকে অতিকষ্টে দরজার ওপর ধরে রাখছে। ধীরে ধীরে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের ম্লান আলোতেও বেশ দূর থেকে তাদের এই দুরবস্থা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবে।

‘তুমি ওকে ফেলে দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা কর।’ মেয়েকে বিদায় দিয়ে মা বসে পড়লেও বিমান স্থির হতেই সিটবেল্ট খুলে দাঁড়িয়ে তাদের দুরবস্থা দেখছেন। প্রায় কোমর পর্যন্ত পানি উঠেছে। এ অবস্থায় হেঁটে তাদের কাছে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব। ‘ওর জন্য তোমার মারা যাওয়ার দরকার নেই।’ ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন মহিলা। মহিলার চিৎকার শুনে তাদের দিকে ফিরে তাকালেন ক্যাপ্টেন। এক মুহূর্ত লাগল মেয়েটির উদ্দেশ্য ও সাধনের পথে বাধা হওয়ার কারণ বুঝতে। তিনি দেখলেন পানি অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় হাঁটা প্রায় অসম্ভব। তবে তিনি ওই মহিলার চেয়ে অনেক কাছে আছেন। কালবিলম্ব না করে তিনি তাদের দিকে সাঁতরানো শুরু করলেন।

ততক্ষণে অনেক পিছিয়ে গেছে মেয়েটা বাচ্চাসহ। পানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই। ‘ওর জন্য তোমার মারা যাওয়ার কোনো অর্থ নেই।’ আবার চেঁচিয়ে বললেন মহিলা। সবার কান্নার শব্দ ছাপিয়ে তার কথা সবাই শুনতে পেয়ে কেউ কেউ তাকাল। ‘ওকে ফেলে চলে যাও, দোহাই তোমার।’

‘না, আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব।’ চেঁচিয়ে জবাব দিল মেয়েটি। তীব্র আতঙ্কে সুন্দর মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেছে। এয়ার হোস্টেসরা খালি সিটগুলোয় বসে আছে, তাদের কর্তব্য শেষ হয়েছে। কিন্তু ক্যাপ্টেনের কর্তব্য যেন এখনো বাকি আছে। তাই তিনি এর মধ্যে পৌঁছে গেছেন ভাসমান দুই মানবীর কাছে।

‘ম্যাডাম, আমি আপনার সাহস ও বুদ্ধির প্রশংসা করছি। আমি আমার সর্বশেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আপনাদের দুজনকে এই বিমান থেকে বের করে দেব, তারপর ঈশ্বর আপনাদের ফয়সালা করবেন।’ বলতে বলতে মধ্যবয়স্ক স্মার্ট ক্যাপ্টেন দুহাতে দরজার পেছনে ধরে সাঁতরিয়ে দরজার দিকে টলতে লাগলেন। ‘আপনি মা মণিকে নিয়ে স্থির হয়ে শুয়ে থাকুন, যা করার আমি করছি।’ কিন্তু সাঁতরিয়ে তিনি তাদের বেশি সামনে নিয়ে যেতে পারলেন না। কারণ পানি দরজা দিয়ে দ্রুত ঢুকে বিপরীত দিকে ঠেলছে। এভাবে হবে না ভেবে পা দুটি মেঝেতে নামালেন অর্থাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। ক্যাপ্টেন লম্বা মানুষ, তার বুক পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। এরই মধ্যে অতি কষ্টে প্রায় সবটুকু শক্তি দিয়ে পানি ভেঙে হেঁটে দুহাত দিয়ে ভাসমান জীবনতরীটিকে দরজার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই কাজটুকু করতে সমুদ্রের ঠান্ডা পানিতেও ঘেমে যাচ্ছেন। দরজার পাশে বিমান বেশি হেলে যাওয়ায় এখানে ক্যাপ্টেনের গলা বরাবর পানি হয়েছে, প্রায় এগোনোই যাচ্ছে না। তীরে এসে তরী ডুববে ভেবে ক্যাপ্টেন তার সমস্ত মনোবল ও শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা পার করে দিয়ে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন এই ভেবে যে, শেষ সময়েও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়েছেন।

দরজা থেকে বেরিয়েই মেয়েটা দেখতে পেল, ক্যাপ্টেন দরজার একটা হাতল একহাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে তাদের উদ্দেশে বিদায় জানাচ্ছে। দুজন মানব সন্তানকে এই নরককুণ্ড থেকে খোলা সাগরে জীবনতরীসহ বের করে দিতে পারার আনন্দে ক্যাপ্টেনের চোখে পানি এসে গেছে। কিন্তু সে অশ্রু তাদের দেখতে পারার কথা নয়, দেখার দরকারও নেই।

‘ক্যাপ্টেন, আপনিও আসুন।’ চেঁচিয়ে বলল মেয়েটি। ‘এটা ধরেই আমরা ভেসে বাঁচতে পারব।’ ইঙ্গিতে দরজাটা দেখাল সে। এ মুহূর্তেও চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় তাকে পরীর মতো রূপসী লাগছে।

‘আমি যাব না, দেরি না করে চাঁদের সাহায্যে দিক ঠিক রেখে পূর্ব দিকে চলে যান, কারণ চাঁদ এখনো পূর্ব দিকেই আছে। বিদায়।’ শেষবার হাত নেড়ে সাঁতরে ভেতরে ঢুকে গেলেন ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেনের শেষ উক্তিটা সামনের কয়েকজন যাত্রী শুনতে পেয়েছে। একজন জোরে বলল, ‘ক্যাপ্টেন, আপনি চলে যান, বাঁচার চেষ্টা করেন।’ কয়েকজন যেন ওই একই কথার প্রতিধ্বনি তুলল। ‘হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন, আপনি চলে যান।’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, ‘আমি আপনাদের এ অবস্থায় ফেলে চলে যেতে পারি না। আমিও আপনাদের অবস্থার শিকার হব বলে থেকে গেলাম। তাছাড়া আমি বেশিক্ষণ সাঁতরাতে পারব না।’ বলতে বলতে তিনি কেবিনের মধ্য দিকে সাঁতরানো শুরু করলেন। এর মধ্যে অনেকেই অন্ধকার কেবিনে সাঁতরানো শুরু করেছে। যারা সাঁতরাতে পারে না, তারা সিটের ওপরে দাঁড়িয়ে পড়েছে, যাতে বিলম্বে মৃত্যু হয়। এ পৃথিবীর মায়া বড় ভয়ানক জিনিস। বিমান অর্ধেকের বেশি পানিতে তলিয়ে গেছে। বড় জোর আর দশ-পনের মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণটা পানিতে নিমজ্জিত হবে।

এখন প্রায় সবাই ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অনেকেরই কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে। অল্পসংখ্যক লোক এখন কাঁদা বাদ দিয়ে শেষ প্রার্থনা করছে। ছোট বাচ্চাদের মা-বাবারা শেষবারের মতো তাদের সন্তানদের আদর করে মাথার ওপরে তুলে ধরছে। তাদের বুক বা গলা পর্যন্ত পানি উঠেছে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা ডুবে যাবে, তখন মৃত বাবা-মার হাত থেকে তারাও পানিতে পড়ে মারা যাবে। বিমানের ভেতর অনেকদিন পর হয়তো তাদের লাশ অথবা কঙ্কাল পাওয়া যাবে। এ কথা ভাবতেই অনেকের মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে।

খোলা আকাশের নীচে ভাসতে ভাসতে মেয়েটা দেখল, ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। পরক্ষণেই তার মনে হলো, কেন আমিও তাদের মৃত্যুর সঙ্গী হলাম না, কেন আমি মৃত্যুর ভয়ে পালাতে চাচ্ছি। তারপর বিবেক থেকে সঠিক উত্তর পাওয়া গেল। এ মেয়েটির মা আমার হাতে তাকে দিয়েছে এ আশায় যে, আমি যেন তাকে বাঁচাই। যেন সে আরো অনেকদিন পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে পারে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুধু এই বাচ্চাটাকে বাঁচানোর জন্যই আমার বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং আর দেরি নয়। এখনই আমাকে রওনা দিতে হবে। ক্যাপ্টেন বলেছেন, চাঁদের সাহায্যে দিক ঠিক রেখে পূর্ব দিকে যেতে। কারণ চাঁদটা এখনো পূর্ব দিকেই আছে। তাতে দিক ঠিক রাখার সুবিধা হবে। পূর্ব দিকে না গেলে দ্বীপ পাওয়া যাবে, সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। পূর্ব দিকে কত দূরে দ্বীপ আছে, সে এসব ভাবতে চাইল না। কারণ, তাহলে আর বাঁচার চেষ্টা করতে ইচ্ছে হবে না। অবশেষে পূর্ব দিকেই যাওযার সিদ্ধান্ত নিল। পেছনে তাকিয়ে দেখল, বিমান ডুবতে আর অল্প বাকি আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা হারিয়ে যাবে পানির মধ্যে। ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখার জন্য দেরি করে লাভ নেই। তাই এখনই রওনা দেয়ার জন্য মনস্থির করল।

নিজে দরজার ওপরে শুয়ে পা দুটো পানিতে ঝুলিয়ে রাখল মেয়েটি, যাতে পা দিয়ে পানিতে বাড়ি মেরে সবসহ এগোতে পারে। বাচ্চাটাকে একহাত দিয়ে বুকের কাছে শক্তভাবে চেপে ধরে রাখল। অন্য হাত দিয়ে দরজার সঙ্গে লাগানো হাতল চেপে ধরল, যাতে দরজা ছুটে চলে না যায়। মাথা উঁচু করে রাখল, যাতে নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি তেমন না ঢোকে। আর সামনের দিকটা যাতে দেখা যায়। বাচ্চাটার বয়স চার বছরের বেশি হবে না, বেশ চঞ্চল। কিন্তু কোলে নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারও কাঁদেনি, এমনকি কোনো কথা পর্যন্ত বলেনি, যেন বোবা হয়ে গেছে। হয়তো এ পরিস্থিতি তাকে এমন নিশ্চুপ করে দিয়েছে। বাচ্চাটাও দুহাতে মেয়েটার গলা আঁকড়ে ধরেছে, আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটা পা পানিতে বাড়ি মেরে পূর্ব দিকে ফিরল। তারপর শেষবার নিমজ্জিতপ্রায় বিমানটাকে একনজর দেখে পানিতে পা বাড়ি মেরে যাত্রা শুরু করল পূর্ব দিকে।

পূর্ব দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কিছুক্ষণ কেউই তেমন নড়ল না। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বিমানের দিকে। ‘আপনারা কি এখানেই থাকবেন, না বাঁচার চেষ্টা করবেন?’ বলল অপর ছেলেটি। এর মধ্যে অল্প কিছুক্ষণ আগে মৃত কয়েকটা নারী-পুরুষের লাশ ভেসে উঠেছে। তার মধ্যে কোনো কোনোটা থেকে রক্ত বের হয়ে নীল দরিয়াকে লাল দরিয়ায় পরিণত করছে। সেদিকে তাকিয়ে সেই ছেলেটি বলল, ‘আমার আর এখন এ মৃত্যুপুরী থেকে পালাতে ইচ্ছে করছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে, এ পাপ-পঙ্কিলময় দুনিয়ায় বেঁচে থেকে শুধু পাপের বোঝাই বাড়বে, পুণ্য আর কতটুকু বাড়বে! ‘আমি কিছুক্ষণ আগে তওবা করেছি। তারপর আমার মনে হয় আর কোনো পাপ কাজ এখন পর্যন্ত স্বজ্ঞানে করিনি। এ অবস্থায় মরতে পারলে হয়তো আল্লাহ্ মাফও করতে পারেন।’

‘আমার মনে হয়, তোমার মা আছেন।’ কথায় বাধা দিয়ে বলল মধ্যবয়স্ক শ্মশ্রুমণ্ডিত লোকটি।

‘জি, আমার বিধবা মা আছেন।’ বলল ছেলেটি।

‘নবী করিম (সা.) মায়ের কথা তিনবার বলেছেন, মায়ের পদতলেই সন্তানের বেহেশত। মায়ের সেবা করার নিয়তে তোমার বাঁচার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহর সাহায্য কামনা কর, তুমি বেঁচে যাবে ইনশাআল্লাহ্।’ উদাস কণ্ঠে বলল লোকটি। ‘আমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই, তবে আমাদের বাঁচার চেষ্টা করাই উচিত। তা নাহলে ভুল হবে। আল্লাহ্ই জানেন, তিনি কার কতটুকু হায়াত রেখেছেন।’ বলে থামল লোকটি।

এর মধ্যে বিমানের প্রায় সিংহভাগ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সবটাই নিমজ্জিত হবে। ‘ওই দেখেন, দরজায় ক্যাপ্টেন, আর পানিতে ভাসমান একটা বাচ্চাসহ মেয়ে।’ বলল অপর ছেলেটি। ফিরে তাকাল বাকি দুজন। ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছে বলে তাকে চেনা যাচ্ছে।

‘আচ্ছা, বাচ্চাসহ মেয়েটা কে?’ আবার বলল যুবক।

‘অত মানুষের মধ্যে কয়জনের চেহারা চিনে রাখা যায়! আর এতদূর থেকে ভালোভাবে দেখাই যাচ্ছে না।’ বলল সেই ছেলেটি।

‘ওই দেখ, ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে ডুবে যাচ্ছে।’ বলল মধ্যবয়সী লোকটি। ‘উনি যাবেন না। দেখেন, আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ডুবে যাবে।’ তিনজনই বিমানের দিকে তাকিয়ে আছে। তন্ময় হয়ে দেখতে থাকল বিমানের ডুবে যাওয়ার করুণ দৃশ্য। ভেতর থেকে শোনা যেতে লাগল আর্তচিৎকার।

কতক্ষণ কেটে গেছে কেউ বলতে পারবে না। হয়তো পাঁচ মিনিট বা দশ মিনিট। সজাগ হলো তখন, যখন ভুশ করে একদম তলিয়ে গেল বিমানটা অথৈ সাগরে। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল সব ক্রন্দন, আর্তচিৎকার। হঠাৎ করেই চারদিক সব নীরব হয়ে গেল, যেন এখানে কিছুই ঘটেনি। তিনজনেরই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা।

‘আর এখানে থেকে লাভ নেই। এবার যাত্রা শুরু করা যায়। তাতেই অনেক দেরি হয়ে গেল।’ বলল অপর ছেলেটি। ঘড়ি দেখল সেই ছেলেটি, প্রায় পৌনে বারটা বাজে। ‘কোনদিকে যাওয়া যায়?’ অনেকক্ষণ পর কথা বলল অপর লোকটি। ‘চাঁদের হিসাব অনুযায়ী চাঁদ এখনো পূর্ব দিকে আছে। ভোর পর্যন্ত তা আকাশে থাকবে। আর চাঁদের আলোয় তারাগুলো ম্লান হয়ে গেছে। তাই আমার মনে হয়, চাঁদের সাহায্যে দিক ঠিক রেখে পূর্ব দিকে যাওয়া যায়। কোনো দ্বীপ পাওয়া যেতে পারে।’ একনাগাড়ে কথা বলে থামল শ্মশ্রুমণ্ডিত লোকটি। যেন সে পুরো বিষয়টা বিশ্লেষণ করল।

বাকি দুজন মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘আচ্ছা, আমরা তো পূর্বে যাচ্ছি। মেয়েটা বাচ্চাসহ কোনদিকে গেল?’ সামনে তাকিয়ে বলল অপর ছেলেটি। ‘তাই তো’ বলে সামনে তাকাল বাকি দুজন। কিন্তু তিনজনই চারপাশে চোখ বুলিয়ে আশপাশে মৃত লাশ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। শেষ পর্যন্ত খোলা আকাশের নীচে পূর্ব দিকে রওনা হলো তিনজনের কাফেলা।

ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল দুই মানবীর ছোট্ট কাফেলা। মহাসাগরের ঢেউ এসে বারবার ভিজিয়ে দিচ্ছিল দুজনকে। পানি অত্যন্ত ঠান্ডা, ইতোমধ্যে দুজনেরই কাঁপুনি ধরে গেছে। দুজনে ঢেউয়ের তালে তালে ঢেউয়ের মাথায় উঠছে, আবার নামছে। কখনো বড় বড় ঢেউ গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তখন নাকে-মুখে পানি ঢোকায় প্রচণ্ড কাশি-হাঁচি হচ্ছে। হাঁচি হওয়াতে শরীর অনেকটা সতেজ হচ্ছে। বাচ্চাটা মেয়েটার ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে চুপ করে আছে। গলা জড়িয়ে ধরে আছে। মেয়েটা বুঝতে পারছে তার মতো বাচ্চাটাও ঠান্ডায় ও আতঙ্কে কাঁপছে। নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে তাকে কিছুটা হলেও উষ্ণতা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। খানিক পরপর পা নেড়ে এ মহাতরীর গতি ও দিক ঠিক রাখতে মেয়েটা হিমশিম খাচ্ছে। পায়ে জুতা ছিল। বাচ্চাটাকে বিমানে  কোলে নেয়ার সময় তা খুলে রেখে এসেছে। তা না হলে এখন তা খুলে সমুদ্রে ফেলে দিতে হতো, নচেৎ কিছুতেই পা বেশিক্ষণ নড়ানো যেত না। শরীরের কাপড় নিজেকে অনেকখানি ভারী করে ফেলেছে। তবে তা খুলে ফেলে দেয়া যাবে না। কারণ কোনো দ্বীপে পৌঁছতে পারলে কাপড় অপরিহার্য। মানুষের মৌলিক চাহিদা বস্ত্র।

মেয়েটা ভালোই সাঁতার কাটতে পারে। নদীতে সে দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কেটেছে। তবে সমুদ্রে এ এক আলাদা অভিজ্ঞতা। সে জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের সঙ্গে মহাযুদ্ধ করে চাঁদের দিকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্লান্তি এসে যাচ্ছে, কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। মনোবল ঠিক রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে।

মনে মনে ভাবছে, মেয়েটির মা তার সহযাত্রী হওয়ায় শুধু আপনি আপনি করে সম্বোধন করে গেছে, নাম জানা হয়নি। ঠিকানাও জানা হয়নি। এসব জানার প্রয়োজন পড়েনি। যখন সে তার বাঁচার চেষ্টা করার ইচ্ছাটা জানাল মহিলাকে, তখন তিনি তাঁর বাচ্চাকে সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ জানান। তাঁর বাচ্চা বাঁচলেই যথেষ্ট। তবে এ কথাও জানিয়ে দেন, বাচ্চার কারণে যদি মেয়েটির নিজের জীবন বিপন্ন হয়, তবে যেন বাচ্চাটিকে বাদ দিয়ে নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে। বাচ্চাটা বাঁচলে কাকে দেবে সে সম্পর্কেও কিছু বলেননি। যদি বাচ্চাটা বলতে পারে, তাহলে তো ভালোই হয়। তা নাহলে ঠিক করল পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবে। বাচ্চার বাবা বা আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ পাওয়া গেলে তখন তাদের কাছে বাচ্চাটাকে ফেরত দেবে। তা না হলেও কোনো অসুবিধা নেই। সে ক্ষেত্রে সে নিজেই বাচ্চাটার লালন-পালনের দায়িত্ব নেবে, নিজের হাতে তাকে মানুষ করবে। বাচ্চাটাকে কাছে পেলেই সে বেশি খুশি হবে। কারণ এর মধ্যেই যে সে তাকে আপন করে নিয়েছে। সময়ের হিসাব না রেখেই এসব ভেবে চলল মেয়েটি।

এর মধ্যে চাঁদ প্রায় মাথার ওপরে এসে গেছে। এ রকম অবস্থায় দিক ঠিক রাখা কঠিন। এখন কী বুদ্ধি করা যায়, ভাবতে লাগল মেয়েটি। চাঁদ পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যাওয়ার সময় দক্ষিণ দিকে হেলে থাকে। তাহলে হাতের ডানে দক্ষিণ। যেহেতু চাঁদ পূর্ব-পশ্চিমের মাঝামাঝি জায়গায়, এমতাবস্থায় এ জীবনতরী হঠাৎ ঘুরে গেলে উত্তর-দক্ষিণ বোঝা না গেলেও পূর্ব-পশ্চিম বোঝার উপায় নেই। তাই সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজাগ রাখতে হবে, যাতে হঠাৎ ঘুরে গেলেও দিক বোঝা যায়। এভাবে ইন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে অত্যন্ত সংশয় নিয়ে অনেকক্ষণ ভেসে চলল। তারপর চাঁদের হেলে পড়া বোঝা যেতে লাগল। এখন পূর্ব দিক চেনা খুব কঠিন হবে না। বারবার পেছনে ফিরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে দিক ঠিক রাখতে হবে।

এদিকে পালাক্রমে তিনজনই পানিতে পা নেড়ে পূর্ব দিকে এগোতে লাগল। গতি অত্যন্ত মন্থর। তিনজনের কারো মুখেই অনেকক্ষণ থেকে কোনো কথা ফুটছে না। সবাই কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছে।

‘বিমানে  আপনাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন ছিল?’ অনেকক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘না, আমি একাই যাচ্ছিলাম।’ একসঙ্গে দুজনেই জবাব দিল। মধ্যবয়স্ক লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কেউ ছিল?’ ছেলেটি বলল, ‘না।’ তারপর অনেকক্ষণ কোনো কথা হলো না।

এভাবে এগিয়ে চলল অনেকদূর। প্রত্যেকেই পালাক্রমে একটা আনুমানিক সময় পা নেড়ে চলছে। কখনোবা ঢেউয়ের তোড়ে কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছে। একবার ঢেউয়ের মাথায় চড়ছে, পরক্ষণেই নেমে যাচ্ছে। কখনো বড় বড় ঢেউ গায়ের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। সামনে যতদূর চোখ যায়, আশার আলো হিসেবে কিছুই দেখা যায় না। শুধু চারদিকে পানি আর পানি। হঠাৎ করে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনে থেকে পাহাড়সমান বিশাল এক ঢেউ এসে দরজাটাকে সামনের দিক থেকে উল্টে পেছনের দিকে ফেলে দিল।

সেই ছেলেটি আর মধ্যবয়স্ক লোকটি দুপাশের কিনার আঁকড়ে ছিল। উল্টে যাওয়ার সময় উভয় হাত থেকে দরজাটা ছুটে গেছে। কিন্তু অপর ছেলেটি দরজার মধ্যখানে হাতল আঁকড়ে ধরে ছিল। দরজাটার পিঠ পাশ দিয়ে স্থির হতেই দুজনেই মাথা তুলে ছেলেটিকে খুঁজতে লাগল। কোথাও তাকে দেখা গেল না। উপায় না দেখে ছেলেটি ‘এই, তুমি কোথায়? সাড়া দাও’ বলে ডাকল। দুজনের কেউই তার নাম জানে না। কয়েকবার ডেকেও সাড়া মিলল না দেখে দুজনে মিলে দরজাটা সরাতে লাগল। একটু পরেই ভুশ করে একটা দেহ ভেসে উঠল। ভেসে ওঠার ভঙ্গি দেখেই বোঝা গেল, মৃত। তারপরও মধ্যবয়স্ক লোকটি পরীক্ষা করে দেখে বলল, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না…।’

‘আপনি নিশ্চিত? ওর তো কোথাও জখম হয়নি দেখা যাচ্ছে’, বলল ছেলেটি। যেন ওই ছেলেটির মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না।

‘আমি ডাক্তার, এর বেশি তোমাকে আর কী বলব’, বলল লোকটি। ‘হয়তো প্রচণ্ড ধাক্কায় তার মৃত্যু ঘটেছে। ইন্নালিল্লাহি…’, বলল ছেলেটি। চোখের পানি আটকাতে পারল না। ডাক্তারের চোখও ভিজে গেল। লাশটাকে ওভাবেই পানিতে রেখে আবার দরজাটা আঁকড়ে ধরে ভেসে যাত্রা শুরু করল পূর্ব দিকে। কিছুক্ষণ আগেই ছেলেটি তাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। আর এখনই তাদের ফেলে চলে গেল বলে আর কারো মুখে কথা ফুটছে না। অনেকক্ষণ কেটে গেল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছেলেটি দেখল, মাথার ওপরে আসার আর অল্প কিছুক্ষণ বাকি। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, কালো নম্বরগুলো উধাও হয়েছে। দাঁত দিয়ে খুলে পানিতে ফেলে দিল ঘড়িটি। ওটা আর দরকার হবে না তার। ‘এই শুনছ? একটা দুঃসংবাদ আছে। খেয়াল করেছ? দরজাটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে’, বলল ডাক্তার। সামনের দিক থেকে চোখ ফেরাল ছেলেটি। বুঝতে না পারার ইঙ্গিতে তাকাল ডাক্তারের দিকে।

‘এ ইস্পাতের দরজার ভেতরে যে ফাঁকা জায়গায় বাতাস ছিল, উল্টে যাওয়ায় এটির ভেতরে দ্রুত পানি প্রবেশ করছে। কারণ আগে এটির পিঠ ছিল পানির ওপরে, সেদিকে ছিদ্র ছিল। তার ওপর দিয়ে ঢেউ বয়ে গেলেও তাতে ভেতরে খুব বেশি পানি ঢোকেনি। কিন্তু ওখানে উল্টে যাওয়াতে পিঠ নীচের দিকে গেছে। ফলে খুব দ্রুত পানি ঢুকেছে। এখন আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে। আর দুই মিনিটের মধ্যেই পুরোটা ডুবে যাবে। আমি আগেই এ ব্যাপারটা টের পেলেও তোমাকে বলিনি। কারণ তুমি আগেই আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পার। এখন বলার সময় হয়েছে, তাই বললাম। এখন যতক্ষণ পারা যায়, সাঁতরাতে হবে। এছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই।’ দীর্ঘক্ষণ ধরে ব্যাখ্যা করে থামল ডাক্তার।

ছেলেটি প্রথম দিকেই বুঝে গেল। তার মুখে কথা ফুটছিল না। তন্ময় হয়ে শুনে যাচ্ছিল। ‘ছেড়ে দাও, ডুবে যাচ্ছে।’ বলে লোকটিও ছেড়ে দিল তাদের দীর্ঘক্ষণের সঙ্গী ভেলাটি। দুজন মানুষের চোখের সামনে দরজাটা ডুবে গেল দ্রুত। দুজনেই ভেসে আছে পানিতে। বাম হাত নাড়াতে গিয়ে কঁকিয়ে উঠল ডাক্তার। বাম ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথার উদয় হলো। ‘কী হলো?’ বলে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। মনে হয় দরজাটা উল্টে যাওয়ার সময় আঘাত পেয়েছিলাম, তখন উত্তেজনায় অতটা টের পাইনি। তারপর দরজা ধরে থাকাকালে তেমন হাত নাড়াতে হয়নি বলে বুঝতে পারিনি। এখন হাত আর নাড়াতে পারছি না।’ গলা স্বাভাবিক রেখে বলল ডাক্তার।

‘আমাকে ধরুন। তারপর দুজনে একসঙ্গে যতদূর পারি এগিয়ে যাব’ বলে হাত বাড়িয়ে দিল ছেলেটি ডাক্তারের দিকে। ‘না, তা হয় না বাবা।’ খানিক বিরতি নিয়ে আবার শুরু করল ডাক্তার। ‘তুমি আমার জন্য অপেক্ষা না করে চলে যাও, এতে তোমার দেরি হচ্ছে।’

‘না, আপনাকে এ অবস্থায় ফেলে আমি কিছুতেই যাব না।’ দৃঢ়স্বরে বলল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে, যতদূর পারি তোমার সঙ্গে এগোচ্ছি।’ বলে সাঁতরাতে শুরু করল ডাক্তার। পাশে সাঁতরিয়ে চলল ছেলেটি। দুজনে অনেকক্ষণ সাঁতরালো। যখনই লোকটি পিছিয়ে পড়ছে, ছেলেটি থেমে তাকে এগিয়ে আসার সময় দিচ্ছে। একসময় লোকটি একদম থেমে গেল, আর এগোলো না। ছেলেটি একটু সামনে এগিয়ে ছিল, আবার তার কাছে ফিরে এলো।

‘তুমি ফিরে এলে কেন?’ বলল ডাক্তার।

‘আপনি পিছিয়ে পড়েছেন যে।’ বলল ছেলেটি।

‘আমি আর যেতে পারব না, তুমি চলে যাও।’ বলল ডাক্তার।

‘আপনাকে এভাবে ফেলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।’ জবাব দিল ছেলেটি।

‘শোন, পাগলামী কর না, আমার জন্য অপেক্ষা করে নিজের মৃত্যু ডেকে এনো না। তুমি চলে যাও। সাঁতরানো দূরের কথা, আমি আর ভেসেও থাকতে পারছি না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো ডুবে যাব।’ থামল লোকটি।

‘আপনি আমার হাত ধরুন। আমি আপনাকে টেনে নিয়ে যাব।’ বলে আবার হাত বাড়াল ছেলেটি।

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১ 2
Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •