একজন কবির নীরব প্রস্থান

এস এম সাথী বেগম

৬ নভেম্বর, ২০২১ , ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ ; 289 Views

কবির সাথে প্রথম কবে কখন দেখা হয়েছিলো ঠিক মনে নেই। শুধু মনে  আছে বিনয়ী একজন নারী কবিকে চিনতাম। নারী কবি পরে প্রথমে সে একজন অসম্ভব ভালো মনের মেয়ে।

যে আমাকে বড় বোনের মত সম্মান করতো, আমার এক কথায় সে বেদ বাক্যের মত মানতে। হ্যাঁ আমি জানাহারা আরজু রুবলীর কথা বলছিলাম। গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ এর রুবলী।
আমার সাথে লেখা বিষয়ক সব সময় পরামর্শ করতো।কোনো ভালো খবর মন্দ খবর সবার আগে ফোন করে আমায় জানাতো।
আমি বয়সে বড় হলেও আমরা ছিলাম বন্ধু।
রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদ এর ২০১৭ সালের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বেগম রোকেয়া একাডেমি পায়রাবন্দ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য সম্মেলন। গাইবান্ধা থেকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন রুবলী। সেদিন দেখেছি প্রাণচঞ্চল কবিকে, পুরো অনুষ্ঠানে তার দায়িত্ববোধ। খুব সুন্দর করে হাসতে পারতো বলে কিছুই বোঝা যেতো না
 কতোটা কাজের মধ্যে ডুবে থাকতো।
২০১৯ সালে বগুড়া থেকে কবি সংগঠক ইসলাম রফিক ভাই জানালেন বগুড়া লেখকচক্র ৩১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।  নারী কবিদের নিয়ে কবিতা উৎসবের কথা। আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। তখন মনে পড়লো রুবলী প্রায় বলতো আপু তুমি সাহিত্যের অনুষ্ঠানগুলোতে যাও আমাকে জানিও আমিও যেতাম। ইসলাম রফিক ভাইকে বললাম রুবলীর কথা। ভাই রুবলীকেও আমন্ত্রণ করলেন। আমরা একসাথে বগুড়ায় যাই। রুবলীর আন্তরিকতা খুব কাছে থেকে দেখেছি।
রুবলী চমৎকার করে কথা বলতো উপস্থাপনা ছিলো সাবলীল। সেবার ২৯ জানুয়ারী ২০২০ সালে বিভাগীয় লেখক পরিষদের বার্ষিক পিকনিক ছিলো। নীলফামারী জেলার নীলসাগর পিকনিক স্পট। রংপুর টাউনহল চত্বর থেকে বাসে উঠে রওয়ানা দেই। ভাগ্যক্রমে রুবলী যে বামে সে বাসে আমিও সেটিতে। সারাটা রাস্তা রুবলীর গান শুনে যাই। এক সময় রুবলী বলে আপু আজ আমার হারিয়ে যাওয়ার দিন। একসাথে এতো সময় ধরে কখনও এতো গান গাইনি। আমার ছেলেরা  জানেই না তাঁদের মা গান জানে। সংসারের দায়িত্বে নারীরা ভুলে যায় অনেক কিছুই।রুবলী বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে চাকরি করতো। এসোসিয়েশন করতো। ঢাকায় এসোসিয়েশনের সম্মেলনে দেখা হয় রুবলীর বড় ছেলে রুপক ও বন্ধুদের সাথে। বড় ছেলে রুপকের সাথে কথা হয়। ছেলে যতটা জানতো মাকে সেদিন অনেক বেশী বুঝেছে তাদের মা কবি ছাড়াও একজন সংগঠক। ছেলের সাথে যখন মায়ের গল্প করছিলাম বড় ছেলে অবাক হয়ে শুনছিলো  আমার গল্প।ছোট ছেলে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে পড়ার কারণে রংপুরে থাকতো মাঝে মাঝে। রংপুরে থাকলেই প্রিয় বইবাড়িতে আমাদের আড্ডা হতো।
রুবলী সব ধরণের কবিতা লিখতো। গত বছর বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ সংখ্যা “সাহিত্যের কাগজ দুয়ার”প্রকাশ হয়েছে। রুবলী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে কবিতা লিখেছিলো ‘দুয়ার’ এ ৪১ পৃষ্ঠায় প্রকাশ পেয়েছে। আমার একটি বড় কষ্টের জায়গা রুবলীকে বঙ্গবন্ধু সংখ্যাটি পৌঁছাতে পারিনি।
জাহানারা জামান রুবলী নামেই বেশী লিখতে। রুবলী বেড়াতে পছন্দ করতো, আমরা নারীরা একবার পরিকল্পনা করি শুধুমাত্র নারীরা মিলে বান্দরবান রাঙ্গামাটি( সাজেক ভ্যালী) আর কক্সবাজার বেড়াতে যাবো। রুবলী বারবার তাগাদা দিচ্ছিলো কবে যাবো। যদিও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। আমি যখন ‘ছুটিছাটা’গ্রুপের সাথে বেড়াতে গেলাম রুবলীকে জানাতেই সে জানালো তাঁর স্বামীকে দেখার কেউ নেই বাসায়। তখনি কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি রুবলীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, প্যারালাইজড। দারুণ নিষ্ঠাবান দায়িত্ববান স্ত্রী রুবলী স্বামীকে গোসল, প্রসাব পায়খানা পরিস্কার করাসহ নিয়মমাফিক ওষুধ খাওয়ানো এক হাতে করতো।
এরপরও রুবলী চাকরিক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। সেরা কর্মী নির্বাচিত হয়েছে বারবার।
রুবলী গত আটাশ অক্টোবর আমাকে পনেরোটি কবিতা পাঠিয়েছে। একটি যৌথ কাব্যগ্রন্থের জন্য। শেষ কথা হয় ঊনত্রিশ  অক্টোবর বেলা চারটায়। আহারে কতো গল্প ফোনে করেছি কতো কথা ফেইজবুকের ম্যাসেঞ্জারে হয়েছে। সন্তানদের জন্য ভাবনার শেষ ছিলো না। একজন ভালো মা তাঁর সন্তানদের রেখে অসংখ্য বন্ধুবান্ধবী, কলিগ, শুভানুধ্যায়ীকে রেখে গত তিন নভেম্বর হৃদযন্ত্র ক্রিয়া বন্ধ জনিত কারণে চলে গেলেন। জাহানারা আরজু রুবলীর মৃত্যুতে এক শূন্যতা বিরাজ করছে। ওপারে রুবলী ভালো থাকুক।
৫/১১/২০২১
Latest posts by এস এম সাথী বেগম (see all)

মন্তব্য করুন