মুগ্ধতা.কম

২ এপ্রিল, ২০২০ , ৩:৫৯ অপরাহ্ণ ; 1055 Views

একজন মৃত মানুষের বিবৃতি   

রেজাউল ইসলাম হাসুর গল্প একজন মৃত মানুষের বিবৃতি   

না না। অফিসে ঢোকা যাবে না। একে তো আপনি অপরিচিত। তার উপর কোনো ভিজিটিং কার্ডও নেই আপনার কাছে। গেটে ওয়াচম্যানের দায়িত্বশীল আওয়াজ শুনে শাদাফ সম্পাদকের কক্ষে প্রবেশ করলেন। আমাকে যেতেই হবে। আমি আপনার নিষেধ মানতে পারছি না বলে দুঃখিত।

সম্পাদকের কক্ষ থেকে বের হয়ে বিজ্ঞাপন কক্ষে প্রবেশের সময় আবারও কোনো এক অনুপ্রবেশকারীর বিনয়ী আর বলিষ্ঠ আওয়াজ শুনতে পেলেন তিনি।

এমনিতেই বিজ্ঞাপনের বাজার মন্দা যাওয়ায় মেজাজটা বিগড়ে আছে। তার উপর এইসব বিশৃঙ্খলা তার মনে একরকম বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে প্রায়। বিজ্ঞাপন ম্যানেজার বলে বিগড়ানো মেজাজকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন নিজের ভেতর, নিঃশব্দে।

আওয়াজ আর পাল্টা আওয়াজ-সমূহের শঙ্কার সংক্রমণ ছড়তে শুরু করলো। শাদাফ বেরিয়ে এলেন টেবিলের কাজ ফেলে। ওয়াচম্যানকে ডেকে অনুপ্রবেশকারীকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি জ্ঞাপন করলেন।

লোকটাকে বিজ্ঞাপনকক্ষে নিয়ে আসা হলো। আমি সত্যিই দুঃখিত। এছাড়া কোনো পথ ছিলো না। একজন মৃত মানুষের বিবৃতি    করুন, আমি সত্যিই নিরুপায়। লোকটা খুব দ্রুততা আর নম্রতার সঙ্গে কথাগুলো বললেন শাদাফের উদ্দেশে।

শাদাফ প্রথমত এসিটা বন্ধ করে দিলেন। কারণ লোকটা অসুস্থ্য কিনা পরীক্ষা করবার জন্য। যদি লোকটা অসুস্থ্য হয়ে থাকেন : এক. তাহলে তিনি গরমে জোরে জোরে শ্বাস নেবে। দুই. তা না হলে সজোরে হাঁচি দিবেন। তিন. তাও না হলে প্রবলভাবে একটা কাশি দিবেন।

এসি বন্ধ করে দেবার পর এসবের কোনোটাই না ঘটলে শাদাফ নিশ্চিত হলেন লোকটার সুস্থতা সম্বন্ধে।

এরপর শাদাফ একটি সদ্যপ্রাপ্ত বার্তার সফট কপির কাগজ উল্টো দিক করে লোকটার সামনে ধরে পড়তে বললেন। কারণ লোকটা উন্মাদ কিনা পরীক্ষা করবার জন্য। যদি লোকটা উন্মাদ হয়ে থাকেন : এক. তাহলে তিনি উল্টো দিক থেকেই পড়তে শুরু করবেন। দুই. তা না হলে কাগজের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন।

ভাই, সোজা করে ধরুন।

কাগজটা উল্টো দিক করে ধরার পর যখন লোকটার মুখ থেকে এমন আওয়াজ শোনা গেলো তখন ধরে নেয়া যায় লোকটা উন্মাদ না।

তবে লোকটাকে খুব ক্লেদাক্ত, সন্ত্রস্ত আর উত্তেজিত মনে হলো। কিসের জন্য এ উত্তেজনা। উদঘাটনের চেষ্টা করে শাদাফ।

এসবের পরেও তার খুব অদ্ভুত লাগছে এই ভেবে যে, এই দুঃসময়ে লোকটা একটি টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে কেনো এলেন!

আপনি এখানে কেনো এসেছেন? খুব বিনয়ের সঙ্গে জানতে চান শাদাফ।

প্রশ্ন শুনে লোকটা ঘামছেন।

দয়া করে একটু পানি হবে। শেষবারের মতো পানি পান করার প্রায় পঁনের ঘণ্টা পার হয়ে গেলো। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শাদাফ সঙ্গে সঙ্গে কলিংবেল চাপলেন। কী লাল একটা কলিংবেল!

ত্বরিৎ-গতিতে একজন পিয়ন এলো। কেমন একটা সন্দেহের চোখে লোকটার দিকে তাকায় পিয়ন ছেলেটা। এক গ্লাস পানির সঙ্গে এক টুকরো কেক নিয়ে এসো। খুব তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু।

পিয়নকে কড়া তাগাদা দেন শাদাফ।

জানেনি তো, শহরে কারফিউ চলছে। খাবার-পানি পেতে খুব বেগ পেতে হচ্ছে। এরপরে আবার লোকটার দিকে মনোযোগ বাড়ান।

আপনি এখানে কেনো এসেছেন? একটা ক্ষুদ্র নাস্তা শেষে লোকটার কাছে শাদাফ আবার জানতে চান খুব বিনয়ের সঙ্গে।

আমি একটি বিবৃতি সম্প্রচার করতে চাই। পানির গ্লাসটা টেবিলে রাখতে রাখতেই বলেন লোকটা।

শাদাফ খুব অবাক হন। না না। এখানে কোনো ব্যক্তিগত বিবৃতি সম্প্রচার করা হয় না। শাদাফ আবারও বিনয়ের সঙ্গে বলেন।

এটা ব্যক্তিগত বিবৃতি নয়। লোকটা শাদাফকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এই বিবৃতি প্রত্যেক মানুষের বিবৃতি। এই বিবৃতি অন্ধকারে নিমজ্জিত সমগ্র রাষ্ট্রের বিবৃতি। লোকটা আরও ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

তাহলে মানুষদের কাছে যান। রাষ্ট্রের কাছে যান। শাদাফ লোকটাকে বুঝিয়ে বলেন।

লোকটা বুঝতে চান না।

শাদাফ তাকে সম্পাদকের কক্ষে নিয়ে যান। এই লোকটা একটা বিবৃতি সম্প্রচার করতে চান। শাদাফ সম্পাদককে অবগত করতে থাকে অত্যন্ত আনুগত্যের সঙ্গে।

যত অর্থ লাগে আমি দেবো। তবু বিবৃতি সম্প্রচার করতে হবে। যদিও এটা একটি মানবিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রিক দায়িত্ব। লোকটা এসি সচল কক্ষেও বসুন্ধরা টিস্যু দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে কথাগুলো বলতে থাকেন।

কিসের বিবৃতি? কে লিখেছে? তিনি কি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব? হলে কোন দল করেন? সম্পাদক বিবিধ প্রশ্নবাণে লোকটাকে বিদ্ধ করবার চেষ্টা করেন।

এটা লিখেছেন না, লিখেছিলেন একজন অসুস্থ্য মানুষ। যখন তিনি বেঁচেছিলেন আর অবরুদ্ধতার ভেতর ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তখন। প্রথম প্রশ্নটার উত্তর না দিয়েই উত্তর দিতে শুরু করেন লোকটা।

তার মানে এটা একজন মৃত মানুষের বিবৃতি! লোকটার কথার প্রেক্ষিতে আশ্চর্য হয়ে সম্পাদক বলেন।

তিনি কোনো দল করেন না।

তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই লোকটা চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে চলে যান। তার মানে তিনি একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর চতুর্থ উত্তেরই পেয়ে সম্পাদক আশস্ত হয়ে বলেন।

আপনি যত অর্থই দেন না কোনো মৃত মানুষের বিবৃতি আমরা সম্প্রচার করি না। সম্পাদক খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন।

দপ্ করে লোর্ডশেডিং হলে সামর্য়িক অন্ধকারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে পুরো অফিস। কেবল বার্তাকক্ষে তখনো আলোর ঝিলিক দেখছিলেন লোকটা। বার্তাকক্ষের বিবৃতিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন লোকটা। ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকেন লোকটা। ক্যামেরাম্যানের দিকে তাকিয়ে থাকেন লোকটা।

ততক্ষণে ইলেক্ট্রিসিটি চলে এসেছে। অন্যান্য অন্ধকারগুলো হেসে উঠেছে সোডিয়াম দাঁত বের করে। যেহেতু বিবৃতিটা একজন মৃত মানুষের আর এর সঙ্গে অসুস্থতা জড়িত। সেহেতু আপনি থানায় যান। সম্পাদক ধোঁয়া উঠা কফিতে শুকনো গলাটা ভেজাতে ভেজাতে বলেন।

প্রথমে আমি হাসপাতালেই গিয়েছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই বিবৃতি শুনতে সম্মত হয়নি। কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তারা আমাকে থানায় রেফার্ড করেন। তারপর আমি থানায় যাই।

তারা আমাকে লাঠিচার্জ করে মুখে মাস্ক পড়িয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠান। বিশ্বাস করুন এসব এই বিবৃতিতে লেখা আছে। এই বিবৃতিতে আরো অনেক বিষয় লেখা আছে। যেগুলো আপনারা আপনাদের বার্তাকক্ষে লুকোচ্ছেন। সম্প্রচারিত বিবৃতিগুলো থেকে লুকোচ্ছেন। ক্যামেরার লেন্স থেকে লুকোচ্ছেন। ক্যামেরাম্যানের দৃষ্টি থেকে লুকোচ্ছেন।

হাসপাতাল থেকে যেগুলোকে ধাক্কা মেরে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হচ্ছে। এই বিবৃতিকে বিশ্বাস করুন। যদিও অবিশ্বাসের অতলে আপনারা ডুবে আছেন। লোকটা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সম্পাদকের উপর বিবৃতি সম্প্রচারের দাবি করতে থাকেন।

একজন সাধারণ মানুষের বিবৃতি আমরা সম্প্রচার করতে পারবো না। আর তিনি জীবিত থাকলে হয়তো বিবৃতি বিশ্বাস করা যেতো। যেহেতু তিনি মৃত। যেহেতু বিবৃতিতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ আছে। যেহেতু সেটা সম্প্রচার করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আমরা চাই না এর দায়ে আমাদের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাক। এত মানুষ বেকার হয়ে যাক।

সম্পাদক অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলবার চেষ্টা করেন লোকটাকে।

ঘড়ি আছে? যদিও সামনে প্রকাণ্ড একটা সুইজ ঘড়ি ঝুলছে। লোকটা তা না দেখেই সম্পাদকের কাছে জানতে চান। বারো বার পেণ্ডুলামের আওয়াজে এমন সময়ে সম্পাদকের আগে ঘড়িটাই উত্তর দেয় লোকটাকে।

রাত বারোটা বাজে! লোকটা আঁৎকে ওঠেন। ভেতর থেকে যেন বাইরের পৃথিবীকে বোঝাই যাচ্ছে না। খুব অসহায়ত্বের সঙ্গে সম্পাদক বললেন। আস্তে আস্তে বিনোদনকক্ষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনকক্ষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তখনও লোকটা বার্তাকক্ষে আলোর ঝিলিক দেখছিলেন। তখনও লোকটা বিবৃতি সম্প্রচারের শেষ চেষ্টা করছিলেন। তখনও তিনি অফিসের বাইরে রাস্তার ল্যাম্পোস্টের নিচে বিবৃতি নিয়ে চিৎকার করছিলেন…

 

রেজাউল ইসলাম হাসু

তরুণ সাহিত্যিক।

প্রকাশিত বই দুইটা।

এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ

দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।