মাসুদ বশীর

১৩ জুলাই, ২০২০ , ১০:১৩ অপরাহ্ণ ; 365 Views

এক ভরা বরষার অন্ধকার রাতে…

এক ভরা বরষার অন্ধকার রাতে

বৃষ্টি। বাংলা এই শব্দটির ভেতরে একটা অমায়িক সুন্দর দ্যোতনা ও ঝংকার বহমান। শব্দটি কানে এলেই তা যেন মস্তিষ্কের গভীরে একটা রিমঝিম দোলায় আপনাআপনিই খেলা করতে থাকে। আবার টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ সে-তো আরও বেশি রোমাঞ্চকর। বৃষ্টি, বর্ষাকাল নিয়ে- গান, কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস বিশ্ব সাহিত্যসহ বাংলা সাহিত্যেও একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পৃথিবীতে এমন কোন লেখক খুঁজে পাওয়া যাবেনা যিনি এই বৃষ্টি নিয়ে জীবনে অন্তত দু’চার লাইন লেখা লিখেন নি।

বৃষ্টি নিয়ে স্মৃতির ক্যানভাসে অনেক সুন্দর ছবিই আমার মনোজগতে বিচরণ করে। কোন স্মৃতিই অমলিন নয়, সব স্মৃতিই যেন বারবার মনকে আন্দোলিত করে এবং আমাকে নিয়ে যায় সেইসব সোনালি মধুর দিনগুলোতে।
প্রায় বছর বারো আগেকার সেরকমই একটি মজার সোনালি স্মৃতিকথা, মুগ্ধতার সম্মানিত পাঠকদের সাথে আজ আমি শেয়ার করছি।

আমার শ্বশুরালয় রংপুর শহর থেকে প্রায় ২২কি.মি. দূরে পাগলাপীর বাজার ছেড়ে পরের স্টপেজ সালেয়াশাহ বাজার। আমার পরদাদা শ্বশুরের নামে এই বাজারের নামকরণ করা হয়েছে- “সালেয়াশাহ বাজার”। সে যাক, তখন আমি কেয়ার বাংলাদেশের একটি প্রকল্পে ‘এমএন্ডই অফিসার’- পদে কর্মরত। আমার পোস্টিং বা কর্ম এলাকা ছিলো নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর। প্রতিদিন আমার নিজস্ব বাইকে করে আমি অফিস করতাম। যেহেতু অফিস যাওয়া-আসার পথে পরতো আমার শ্বশুরালয়, তাই মাঝে-মধ্যেই ফেরার পথে সেখানে আমি ঢুঁ মারতাম। কিন্তু সেদিন আবহাওয়া বিপরীত দেখে শ্বশুরালয়ের সকলের চাওয়ায় সেখানেই আমি রাত্রি যাপন করলাম। তখন ছিলো একদম ভরা বর্ষাকাল এবং আমের সিজন, বলতে গেলে মধুমাস। প্রতিটি আমগাছে তখন আমের বিপুল সমাহার। সেইরাতে আকাশ ভেঙ্গে তুমুল ঝড় উঠলো, দমকা হাওয়াসহ ঝমঝমিয়ে শুরু হয়ে গেলো প্রবল বৃষ্টি। মাঝে-মাঝেই প্রকট আওয়াজে বাঁজ পড়ছে, বিজলি চমকাচ্ছে এবং অনবরত চলছে গুরুগম্ভীর মেঘের গর্জন। তার মাঝেই থেকে থেকে কানে ভেসে আসছে আমগাছ থেকে আম পড়ার শব্দ। হঠাৎ, কি জানি কি মনে হলো, মনের খেয়ালে তখনই একটু আনন্দ উপভোগের অভিপ্রায়ে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা নেয়ার মানসে সেই গভীর রাতেই (যখন মহল্লার সকলেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির আনন্দ দোলায় গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত) আমি, আমার সহধর্মিণী ও ছোট দুই শালিকাদ্বয়কে সাথে নিয়ে নেমে পড়লাম ঘুটঘুটে অন্ধকারে আম কুড়ানোর প্রমত্ত উন্মত্ত নেশায়। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎও চলে গেলো। প্রথমে আমরা ছাতা মাথায়, হাতে মোবাইল ও টর্চের আলোতে কুড়াতে থাকলাম আম, কিন্তু পরবর্তীতে এমনই আম পেতে লাগলাম যে, যার কারণে আম কুড়ানোর আরও গভীর নেশায় যেন পেয়ে বসলো আমাদের সকলকে। তখন আম রাখার মতো আর কোন পাত্রই হাতের কাছে না পেয়ে, সকলেই যে যার ছাতার ভেতরেই গলাতে শুরু করলাম আম। এমনিতেই আমি মেঘের গর্জন, বিজলি চমকানোকে ভীষণ ভয় পাই, বুকটা ধরাস করে স্থবির হয়ে যায়! কিন্তু সেরাতে ওই অন্ধকারেও আমার যেন তা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই, কোন ভয়ই যেন আর আমার মধ্যে কাজ করলো না। আসলে মানুষ যখন কোন বিষয়ের একদম গভীরে অবগাহন করে তখন অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি তাতে তেমন কোনই প্রভাব ফেলতে পারেনা। আম কুড়ানো শেষে, অবশেষে আমরা ঘরে ফিরলাম। তখনও ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিক, তবুও মোবাইল ও টর্চের আলোতে আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম অগণিত আম! কতো ধরনের যে আম কুড়িয়েছি আমরা, যা বলে শেষ করা যাবেনা- পাঁকা-কাঁচা, ছোট-বড়, বিভিন্ন রকমের আম। এদিকে সকলের শরীর তো একদম বৃষ্টির জলে ভিজে-ভিজেই সারা, ঠিক যেন একটা একাকার অবস্হা সবার! সে রাতের অমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা আজও মনে পড়লে, তা আমাকে মনের গভীরে ভীষনভাবে আনন্দের দোলা দেয় এবং বাংলার অপূর্ব সুন্দর সবুজে-শ্যামল চিরায়ত শাশ্বত রূপটি চোখের সামনে অকপটে নিদারুন ছবি আঁকতেই থাকে সারাক্ষণ। সত্যিই, আমার প্রিয় মাতৃভূমির মতো এতো সুন্দর অপরূপ সাবলীল অপূর্ব সৌন্দর্য পৃথিবীর আর কোথাও কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়না, যাবেনা এবং একদম নেইও।

তাইতো পল্লী কবি জসীমউদ্দিন তার ‘মামার বাড়ি’ কবিতায়- বাংলার চিরায়ত অপরূপ রূপটি নিপূণ সুন্দরভাবে এঁকেছেন এভাবেইঃ

মামার বাড়ি

জসীমউদদীন 

আয় ছেলেরা , আয় মেয়েরা

ফুল তুলিতে যাই,

ফুলের মালা গলায় দিয়ে

মামার বাড়ি যাই।

ঝড়ের দিনে মামার দেশে

আম কুড়াতে সুখ,

পাকা জামের মধুর রসে

রঙিন করি মুখ।

মাসুদ বশীর
Latest posts by মাসুদ বশীর (see all)