করোনা : আমাদের সংকট ও সরকারের করণীয়

মুগ্ধতা.কম

২১ মার্চ, ২০২০ , ৪:০৮ অপরাহ্ণ ; 1025 Views

করোনা : আমাদের সংকট ও সরকারের করণীয়

করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যে বিশ্বের ১৮৬ টি দেশে আঘাত হেনেছে। এ পর্যন্ত বিশ্বে রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৮৪ হাজার ৭১২ জন।

চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে ৯৩ হাজার ৫৭৬ জন রোগী। এ রোগে মৃতের সংখ্যা ১১ হাজার ৮৪২ জন।

২১ মার্চ সন্ধ্যা ৬ টা ৩৪ মিনিটে ওয়ার্ল্ড ও মিটার ওয়েব সাইট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শতকরা মৃতের হার মাত্র ৪ ভাগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী শতকরা ৮০ ভাগ রোগী কোন বিশেষ চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়েছেন।

এছাড়া করোনায় আক্রান্ত শতকরা ১৭ ভাগ রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়। যাদের অধিকাংশই আরও অন্যান্য রোগ দ্বারা আক্রান্ত এবং বয়ঃবৃদ্ধ। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তবে এ ভাইরাস থেকে শিশু এবং যুবকরাও নিরাপদ নয়।

করোনার বৈশিষ্ট্য :

১. মানুষ / কোন প্রাণীর দেহ ছাড়া করোনা ভাইরাস বাহিরে বেঁচে থাকতে পারে না।

২. হাঁচি-কাশির সাথে দেহ থেকে বেরিয়ে করোনা ভাইরাস কোন না কোন সারফেসের (টেবিল, চেয়ার, ফাইল ইত্যাদি) উপরে লেগে থাকে। এ অবস্থায় কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন এই ভাইরাস বেঁচে থাকে।

৩. মানুষের দেহে এটি নিজে নিজে প্রবেশ করে না।

ক. অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সময় এক মিটার থেকে দুই মিটারের মধ্যে কোন সুস্থ ব্যক্তি হাঁচি-কাশির ড্রপলেট ইনহেল (শ্বাসগ্রহণ) করলে ।

খ. মানুষ হাত দিয়ে এটি ক্যাচ করে (ধরে নেয়)- কোন না কোন সারফেসের উপর থেকে। তারপর মনের অজান্তে হাতের মাধ্যমে চোখ, মুখ এবং নাক স্পর্শ করে সংক্রমিত হয়। ( সুতরাং নো কন্টাক্ট, নো করোনা ) বলা হয়, Without Hand wash, don’t touch your mouth, nose and eyes. This is the only procedure to prevent it.

আমাদের সংকট :

১. ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সমিশন আমরা বন্ধ করতে পারিনি। এটাই বাস্তবতা।

২. লোকাল ট্রান্সমিশন বন্ধ করে ম্যানডেন্টরি কোয়ারেন্টাইন করতে পারিনি। অনেকে পালিয়ে গেছে। এটাই বাস্তবতা।

৩. কমিউনিটিতে পালিয়ে যাওয়া কিংবা অজ্ঞতার জন্য ঘোরাঘুরি করা লোকজন কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে ব্যবহৃত গণপরিবহন, অটোরিক্সা, রিক্সা, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ প্রভৃতির আসন সংক্রমিত করেনি বলে আমাদের কাছে সঠিক তথ্য নেই।

৪. বিপদ হচ্ছে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে জিওম্যাট্রিক হারেরও বেশি গুণে এটি দেশকে আক্রান্ত করতে পারে।

৫. কোথাও কোথাও লক ডাউন করে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

৬. বর্তমান বাস্তবতা হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স ও চিকিৎসকবৃন্দ সাধারণ সর্দি, কাশি ও জ্বরের সাথে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত রোগী পৃথক করে চিকিৎসা দিতে আতঙ্কিত হচ্ছেন এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কষ্টকর হচ্ছে।

৭. বিভিন্ন হাসপাতালে নার্স, ইন্টার্ন চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকগণ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গাউন, ক্যাপ,মাস্ক কিংবা পিপিই’র স্বল্পতার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কিংবা কাজে মনোনিবেশ করতে পারছেন না।

৮. কোন কোন ক্ষেত্রে নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে চিকিৎসক ও নার্সগণ নিজে নিজে গাউন, ক্যাপ, মাস্ক বানিয়ে ব্যবহার করছেন।

৯. গণমাধ্যমে প্রচারিত বারবার অবধারিত মৃত্যুর ঘন্টা ধ্বনি জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে ফেলেছে।

সরকারের করণীয় :

১. গণমাধ্যমে সুস্থ হয়ে যাওয়া রোগীর পজেটিভ সংবাদ প্রচার করতে হবে।

২. নার্স, ইন্টার্ণ চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী ও চিকিৎসকগণের (ফ্রন্ট ফাইটারস্) নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দ্রুত গতিতে সরবরাহ করতে হবে।

৩. প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা সর্দি, কাশি, জ্বর সংক্রান্ত রেসপিরেটরী রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার করতে হবে। সেখানে চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।

৪. বস্তুত করোনা, নন করোনা প্রমাণের জন্য শুধু মাত্র টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট ছাড়া আপাতত কোন পদ্ধতি নেই। যা এই স্বল্প সময়ে দেশে টেস্ট কিট সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব। সরকারকে টেস্ট কিটের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. আইসোলেটেড হাসপাতাল, বিশেষায়িত আইসিইউ প্রতিটি বিভাগীয় শহরে স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

৬. পিপিই পরিধান, মাস্ক পরিধান, অন্যান্য সরঞ্জামের ব্যবহার ও করোনা রোগী ম্যানেজমেন্টে ট্রেনিং শিডিউল দ্রুত গতিতে অনলাইন ভিত্তিক চালু করতে হবে।

৭. প্রশিক্ষিত নার্স, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তাসহ তাদের মানসিক সাহস জাতিকে করোনা যুদ্ধে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে।

দেশপ্রেমিক ধনীক শ্রেণির করণীয় :

১. জীবনুনাশক স্প্রে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, স্প্রে মেশিনসহ বিভিন্ন সংক্রমিত স্থান জীবানুমুক্ত করতে বিভিন্ন সংগঠন, যুব সমাজ, ছাত্র সমাজ, ক্লাবকে কাজে লাগিয়ে তহবিল সরবরাহ করে এ যুদ্ধে নামতে পারেন।

২. বিভিন্ন পোষাক শিল্পে কর্মীদেরকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর পরিমাণে ক্যাপ, মাস্ক, গাউন তৈরি করে প্রযোজ্য জায়গায় সরবরাহ করতে পারেন।

৩. অচিরেই দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সংকট ও আয় সংকট দেখা দিবে। তা মোকাবেলার জন্য কল্যান তহবিল জরুরী।

সার্বিক প্রতিরোধ : মাত্র তিনটি বার্তা

১. হাত না ধুয়ে চোখ, নাক এবং মুখ স্পর্শ করা যাবে না। সুস্থ-অসুস্থ সবার ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই পালনীয়।

২. রেসপেরিটরী হাইজিন অর্থ্যাৎ অসুস্থ ব্যক্তি যেখানে-সেখানে সর্দি-কাশি, হাঁচি, দেবেন না। নিজের কনুই কিংবা টিস্যুতে / গামছায় / ওড়নায় / শাড়ির আঁচল প্রভৃতি দিয়ে ভাইরাস ছড়ানো ঠেকাতে হবে।

৩. বাড়িতে ফেরার পর পরিধানের কাপড়-চোপড় সবকিছু সাবান জলে এক ঘন্টা ডুবিয়ে রেখে পরিস্কার করুন।

 

ডা. জামাল উদ্দিন মিন্টু

রেজিস্ট্রার, মেডিসিন, রমেক হাসপাতাল।

আইসিইউতে কর্মরত।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •