সিরাজুম মনিরা

২ জুলাই, ২০২০ , ৯:০৪ অপরাহ্ণ ; 523 Views

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীর জন্য একটি বৈশ্বিক দূর্যোগ। আর যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা সংকটে বয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবকালীন সময়ে বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই বয়সের ব্যক্তিদের জন্য ডিমেনশিয়া একটি কঠিন মস্তিষ্কের রোগ।

বিশ্বব্যাপী ৫০ মিলিয়ন মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন করে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। সমগ্র পৃথিবীতে বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য ডিমেনশিয়া একটি মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। ডিমেনশিয়া এবং কোভিড-১৯ মহামারি উভয়ে একত্রে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সঠিক তথ্য ও উপাত্ত জানার সুযোগ বেশ সীমিত। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া একটি প্রধান সমস্যা। এর ফলে তাদের জন্য কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সুরক্ষা পদ্ধতি যেমন – বারবার হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা ইত্যাদি মনে রাখা বেশ কঠিন। এছাড়া তাদের কগনেটিভ সমস্যা থাকায় প্রচারিত জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য বোঝা ও বেশ কঠিন। স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রমে অবহেলা এবং কোয়ারেনটাইনের অপর্যাপ্ত ব্যাবস্থা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-১৯ সংক্রমনের ঝুঁকি বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তুলতে পারে।


কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রোধে সরকার লকডাউন, কোয়ারেনটাইন ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছে। আমাদের দেশে বয়স্ক ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রধানত তাদের পরিবারের সাথেই বাস করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক বাসায় অবস্থান করতে হচ্ছে এবং আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে দেখা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এমনকি বাহিরে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রযুক্তি ব্যবহার সম্পর্কে পারদর্শিতা না থাকায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ নেই বললেই চলে। এর ফলে তারা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখছে এবং নিজেদের পরিত্যাক্ত ভাবছে। এসকল বিষয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে করোনা সংক্রমণের ভয় এবং অন্যদিকে লকডাউনের ফলে দীর্ঘদিন ঘরে অবস্থান করা নিয়ে উদ্বেগ ও বিষন্নতা, একই সাথে দুটি বিষয় নিয়ে বেশ চাপ অনুভব করছে। এছাড়া করোনায় কাছের মানুষের মৃত্যু তাদের মানসিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। একইসাথে পরিবারের সদস্যবৃন্দ যারা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক যত্ন করে তাদের মাঝেও উদ্বেগ ও বিষন্নতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা গেছে। এছাড়াও সার্বক্ষণিক যত্ন ও সেবা করার কাজে নিয়োজিত থাকার ফলে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে ও বার্ন আউটের শিকার হচ্ছে।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদি জটিল ও কঠিন রোগ থাকে যার জন্য তাদের প্রায়শই হাসপাতালে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিকট যেতে হয়। কিন্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি বাড়তি চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সেবার সুযোগ সুবিধা নেই পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ও অধিক। এসকল বিষয় ও পরিবারের জন্য বেশ উদ্বেগের কারণ।

বর্তমান বৈশ্বিক মহামারিতে বিশেষজ্ঞগণ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তার উপর জোর দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কাউন্সেলিং সেবার উপরও গুরুত্বারোপ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে এতে কোভিড-১৯ এবং ডিমেনশিয়া উভয়ের জটিল প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। আলঝাইমার ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল নামক সংস্থাটি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য অতি দ্রুততার সাথে নানাবিধ সহায়তা প্রদানেরউপর জোর দিয়েছে। এই সংস্থাটির মতে ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী পেশাজীবি, সমাজকর্মী এবং নানাবিধ সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে যৌথভাবে একত্রে কাজ করা প্রয়োজন।

করণীয়:

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের নিজেদের মানসিকভাবে ভালো থাকা ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতার জন্য নিম্ন লিখিত কাজগুলো চর্চা করতে পারে –

» ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি সম্বলিত তথ্যসমূহ ছবিসহকারে সহজ ভাষায় লিফলেট তৈরি করে বাসার কিছু নিদির্ষ্ট জায়গায় লাগিয়ে রাখা। এতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যবিধি ভুলেগেলেও লিফলেট দেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সহজ হবে।

» গৃহ পরিমণ্ডলে করা সম্ভব এমন কিছু বিনোদনমূলক কাজ বাসার সকলে মিলে আয়োজন করা। এতে লকডাউনের কারনে দীর্ঘদিন বাসায় অবস্থান করার ফলে সৃষ্ট একঘেয়েমি দূর করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে এবং পরিবারের সকলের সাথে ভালো সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

» আত্মীয়-স্বজন ও কাছের মানুষজনের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যাবস্থা করে দেয়া।

» ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে বাসার ভিতরে কিছু আনন্দদায়ক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি তাদের বিষন্নতা ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে।

» চাপ কমানোর উপায় হিসেবে শিথিলায়ন চর্চা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার কেয়ারগিভারের জন্য একটি বেশ ফলপ্রসূ উপায়।

» করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত তথ্য সহজ ভাষায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে জানানো।

» ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির আচরনগত ও আবেগীয় সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনে চিকিৎসামনোবিজ্ঞানী ও মনরোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা।

» পরিবারের একজন ব্যক্তিই সার্বক্ষণিকভাবে দেখাশোনা করার দায়িত্ব না নিয়ে অন্যান্য সদস্যদেরও সম্পৃক্ত করা । এতে কেয়ারগিভারের বার্ন আউটের সম্ভাবনা ও চাপ কমবে।

সর্বোপরি বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিশেষ চাহিদা ও যত্ন সম্পর্কে পরিবার ও সকলের মাঝে সচেতনতা অতীব জরুরী।

করোনা পরিস্থিতিতে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যত্ন 1