করোনা ভাইরাস: ওয়াসফিয়া নাজরীনের চিঠি

মুগ্ধতা.কম

২২ মার্চ, ২০২০ , ২:২৪ অপরাহ্ণ ;

করোনা ভাইরাস: ওয়াসফিয়া নাজরীনের চিঠি

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীন গত ২১ মার্চ তার ফেসবুক পেজে এই লেখাটি প্রকাশ করেন। সময়ের গুরুত্ব বিবেচনায় লেখাটি মুগ্ধতা ডট কম- এর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করে দেয়া হলো। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন পল্লব শাহরিয়ার।

ওয়াসফিয়া নাজরীন

ওয়াসফিয়া নাজরীন: এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশী পর্বতারোহী।

এটা সত্যি যে আমি কোভিড ১৯ এর সাথে লড়াই করছি তবে আশা করছি সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। সারা বিশ্বে ও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া ভুলগুলো ভাঙ্গার জন্য একজন বন্ধুর সাহায্য নিয়ে আমার কথাগুলো শেয়ার করতে চাচ্ছি। আমার নিজের দেশ বাংলাদেশের জন্যই আমার সবচেয়ে বেশি চিন্তুা হচ্ছে, সেখানে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে করোনা।

দেশের জনসংখ্যা ও সামর্থ্য বিচার করলে আমাদের সবাই প্রথমেই বুঝতে হবে কিসের বিরুদ্ধে লড়ছি আমরা। এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে আমাদের আপামর জনসাধরণকে সচেতন করতে হবে। সর্বপ্রথম কাজ দয়া করে সবাই শান্ত থাকুন। এ সময় সবার মনকে শান্ত রাখা সবচেয়ে জরুরি। আতংকিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত সংবাদ শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।

প্রতিটি খবরের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি চিন্তা করে দেখুন। শরীরে আরেকটু শক্তি পেলে আমি আমার ফেইসবুক থেকে আপনাদের আরও কিছু তথ্য দিবো যেগুলো আমাকে সেরে উঠতে সাহায্য করছে, আশা করি সেগুলো আপনাদেরও সাহায্য করবে। প্রথমেই বলি কিভাবে ঘটনাটা ঘটলো: বেশ কয়েকটি জায়গায় বক্তব্য আর কিছু অ্যাডভেঞ্চার করে ১২ই মার্চ রাতে আমি বিমানে লস এঞ্জেলেস ফিরে আসি। সবদিক থেকে লোকজন ফিরে আসার কারণে বিমানবন্দরে ভালোই ভিড় ছিলো, ফলে আমি কিছু সময়ের জন্য আটকা পড়ি।

গতবছরের শেষ দিক থেকে বেশ কয়েকটি মৃত্যু, ব্যক্তিগত কিছু ক্ষতি ও সমস্যার কারণে আমি এমনিতেই মানসিকভাবে ক্লান্ত ছিলাম। তাই বাসায় ফিরে আসার পর ক্লান্ত লাগাটাকে গত কয়েকমাসের অতিরিক্ত পরিশ্রমকেই দোষ দিচ্ছিলাম।

১৩ তারিখে শরীর একটু খারাপ লাগলেও ১৪ তারিখে আমি ভালো বোধ করি। কিন্তু ১৫ তারিখ থেকে মাথা ঘুরানো শুরু হয়ে যায় এর পর ১৬ তারিখে শাসকষ্ট দেখা দেয়। এর সাথে সাথে খাবারের অরুচি, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া (এটা করোনার লক্ষণ নয় যদিও), অনিদ্রা দেখা দেয়।

পুরো সময় ধরে আমি ডাক্তারের সাহায্য চেয়ে পাইনি আমেরিকার হেলথ কেয়ার সিস্টেমের কারণে (এটা নিয়ে অন্য সময় লিখবো)। অবশেষে ১৭ তারিখ বিকেলে সফল হই।

আমার চেয়ে কম লক্ষণ নিয়েও অনেকে করোনা ভাইরাস টেস্ট করতে পেরেছে। আপনি যদি আমার মতো কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা রাখেন তাহলে আমি বলবো আপনার আরো সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।

নিজের শরীরের লক্ষণগুলোর প্রতি নজর রাখুন, যত্ন নিন। লস এঞ্জেলেস ফিরে আসার পর থেকেই আমি হোম কোয়ারাইন্টাইনে আছি। তবে এখন আরো কঠিনভাবে সেটা বাস্তবায়ন করছি। এক কদম হাটতে আমার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, গোসল করতে যাওয়াটাকে মনে হচ্ছে একটা পুরো অভিযান, আর একা একা রান্না করাটা পুরোপুরি ভয়ংকর ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এভারেস্টের সফল অভিযান থেকে ফিরে বিমান বন্দরে প্রকৃতির উপর আমরা অনেক অত্যাচার চালিয়েছি। অনেক প্রজাতি, আবাসভূমি, আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। সভ্যতাকে এখন এর মূল্য দিতে হবে।

পৃথিবীই এখন আমাদের বাধ্য করছে সবকিছু বন্ধ করে দিতে। জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা সত্বেও এর দিকে কোন নজর দেইনি। শুধু লস এঞ্জেলেস না, সারা বিশ্বের ডাক্তার, নার্সসহ এ দুঃসময়ে যারা সামনে আছেন একেবারে সামনের সারিতে আছেন তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

আমার বন্ধুরা আমার সাথে সব সময় আছেন তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। সবার প্রতি আমার ভালবাসা রইলো। আমি প্রার্থনা করি তাড়াতাড়ি ফিরে আসার।

 

ওয়াসফিয়া নাজরীন

এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশী পর্বতারোহী।

এছাড়া তিনি ওশেনিয়া/ অস্ট্রেলেশিয়া অঞ্চলের কার্সটেনস পিরামিড পর্বত শৃঙ্গ জয়ের মাধ্যমে বিশ্বের সাতটি অঞ্চলের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ জয়ের অভিযান পূর্ণ করেন ২০১৫ সালে।

মন্তব্য করুন