করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা !

মুগ্ধতা.কম

২৮ এপ্রিল, ২০২০ , ৯:১৭ অপরাহ্ণ ; 1219 Views

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা ! 1

যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি লেখক ও চিকিৎসক অপূর্ব চৌধুরী লিখেছেন মুগ্ধতা ডট কমে


একটি নতুন রোগ যখন শুরু হয়, চিকিৎসকেরা প্রথমে চেষ্টা করেন প্রচলিত জানা পদ্ধতিতে সারিয়ে তুলতে। যখন বুঝতে পারেন যে, বাঁচানোর যত ওষুধ কিংবা উপায় আছে, তা কাজ হচ্ছে না, নতুন নতুন ওষুধ বা উপায়ে বাঁচাতে চেষ্টা করেন। নতুন জাতের করোনা ভাইরাস SARS-CoV-2 তেমন একটি রোগ COVID-19 এর জন্ম দিলেন।

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচানোর সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা ! 2

শুরুর দিকে এই SARS-CoV-2 ভাইরাসকে বলা হতো Novel Coronavirus । এই Novel মানে নতুন। যদিও novel মানে উপন্যাস বুঝায়, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই novel মানে নতুন জীবাণু যার নাম এখনো দেয়া হয় নি। WHO ২০১৫ সালে শব্দটি নতুন জীবাণু নামকরণের গাইডলাইনে হিসাবে প্রকাশ করেন প্রথম । অনেকে তিনটি শব্দে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। ভুল শব্দ লিখে ! Novel, Noble, Nobel । শুধু Novel এর এক অর্থ উপন্যাস, আরেক অর্থ নতুন। Noble মানে অভিজাত, আর Nobel নেয়া হয়েছে নোবেল পুরস্কারের প্রণেতা Alfred Bernhard Nobel এর নাম থেকে নেয়া!

কোনো ইনফেকশন হলে চিকিৎসকদের হাতে থাকে জীবানুনাশক ওষুধ, অথবা পরবর্তীতে জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে ভ্যাকসিন, কিংবা দুটোর কোনোটাই না থাকলে – যার হয় নি – তাকে বাঁচাতে – আক্রান্ত থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেন। নতুন করোনা ভাইরাসটি দমনে চিকিৎসকদের হাতে কোনো জানা ওষুধ নেই, কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই শেষ ভরসা হিসাবে বলেন – সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ।

চিকিৎসকরা বসে নেই। রোগী বুঝে নতুন নতুন মেডিসিন এপ্লাই করছেন, পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন বানাতে নেমে পড়েছেন। কিন্তু ওই দুটো কাজ সময় সাপেক্ষ । বসে থাকলে ততদিনে আক্রান্ত বেশিরভাগ মরে যাবে। তাই নতুন পদ্ধতির খোঁজ শুরু করলেন চিকিৎসকরা।

করোনা আক্রান্ত বাঁচাতে এখনো পর্যন্ত ভ্যাকসিন এবং মেডিসিন, এই দুটোর পাশাপাশি সবচেয়ে যুগান্তকারী চিকিৎসা ভাবা হচ্ছে Convalescent Plasma Therapy । সহজ করে ব্যাপারটি বলবো এখন।

Convalescent শব্দটি খুব একটা প্রচলিত না বলে হুট্ করে কানে লাগতে পারে। এর আরেকটি ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Recovery । মানে সেরে ওঠা বা অরোগ্য লাভ করা।

Convalescent Plasma Therapy হলো কোনো জীবাণু আক্রান্ত রোগী, যিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, সেরে ওঠার পর তার দেহ থেকে Plasma নামক রক্তের উপাদানটি নিয়ে সেই রোগে আক্রান্তের দেহে ঢুকিয়ে সুস্থ করে তোলা।

রক্তে দুটো জিনিস থাকে । অর্ধেক তার জল জাতীয়, অর্ধেক কোষ। এই জলের অংশটাকে বলে Plasma । Plasma দেখতে অরেঞ্জ জুসের মতো হলুদ হয় । রক্ত দেখতে লাল হয় RBC নামের কোষ অনেক বেশি থাকে বলে। আর প্লাজমা দেখতে হলুদ, কারণ হলো বিলিরুবিন নামের একটি প্রোটিন অনেক থাকে বলে । রক্তের এই জলের অংশটি বিজ্ঞানী Vesalius প্রথম ধারনা দেন চারশো বছর আগে।

প্লাজমা থেরাপি দিয়ে কী লাভ তাহলে ?

দেখা গেছে যে, করোনা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে – তার শরীরে ভাইরাসটি প্রতিরোধে যে এন্টিবডি তৈরি হয়, সুস্থ হয়ে ওঠার মিনিমাম ২৮ দিন বা চার সপ্তাহ পর – তার শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে – সেই রক্ত থেকে প্লাসমা পৃথক করে – কোনো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর দেহে ঢুকিয়ে দিলে – তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন, কেউ কেউ বেঁচে যান, কারো উপসর্গগুলো কমে যায়। মেডিসিন কিংবা ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এই প্লাসমা থেরাপি হলো এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সফল চিকিৎসা পদ্ধতি । তবে এটার অনেক কমপ্লিকেশন আছে। এই জটিলতার কারণে সব রোগীকেই এটা যেমন দেয়া যায় না, তেমনি সব সুস্থ হয়ে ওঠা করোনা রোগীর দেহে সঠিক এন্টিবডিটি থাকে না। তাই এটি সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দিয়ে বিভিন্ন রোগীদের উপর এপ্লাই করা হচ্ছে। অনেক সুফল পাওয়া যাচ্ছে। রোগীও বেঁচে উঠছে।

মজার ব্যাপার হলো এই পদ্ধতিটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে একেবারে নতুন নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল ঠিক এই থেরাপি টির কারণে। ১৯০১ সালে জার্মান ডাক্তার Emil von Behring প্রথম নোবেল পুরস্কার পান এই যুগান্তকারী পদ্ধতিটি আবিষ্কারের কারণে। তখন বাচ্চারা অনেক বেশি ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হতো। যারা সুস্থ হয়ে উঠতো – তাদের শরীর থেকে এমন প্লাসমা নিয়ে অসুস্থ বাচ্চাদের সুস্থ করতেন তিনি। তার পদ্ধতিটির নাম ছিল Serum Therapy। রক্তের প্লাসমা থেকে fibrinogene নামের রক্তজমাটকারী একটি উপাদান কৃত্ৰিম ভাবে সরিয়ে নিলে যে প্লাজমা থাকে, সেটাকে বলে সিরাম।

এই সিরাম থেরাপি অনুসরণ করে পরবর্তীতে অনেক সমস্যাতেই প্লাজমা থেরাপি এপ্লাই করা হয়েছে। গত একশো বছরে ক্যান্সার থেকে আগুনে পোড়া রোগী, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত, প্রথম এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে আহত সৈনিকদের উপর, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সার্স, মার্স এবং ইবোলা রোগীর দেহে এই প্লাজমা থেরাপি দিয়ে সুফল পাওয়া গেছে। ১৯১৮ সালে ঘটে যাওয়া Spanish Flu প্যান্ডেমিক সময়ে HIN1 ভাইরাসে আক্রান্তের শরীরেও প্লাজমা থেরাপি দিয়ে অনেক রোগীকে বাঁচানো হয়েছিল। একশো বছর পর আরেকটি প্যান্ডেমিক থেকে বাঁচতে আবারো ঘুরে এসে দাঁড়িয়েছে সে। কেউ কেউ একে Convalescent Plasma Therapy এর পাশাপাশি – Plasma Antibody Therapy, অথবা Blood Plasma Therapy, এমনকি Plasma Transplant এমনসব বলে থাকে। অন্যভাবে বললে – একজনের Active Immunity দিয়ে অন্যজনের Passive immiunity হওয়াকে বলে Convalescent Plasma Therapy

কেমন করে প্লাজমা সংগ্রহ করা হয় ?

রক্ত দেবার মতো করে আপনার শরীর থেকে রক্ত নেয়া হবে। সেই রক্ত সরাসরি ব্যাগে না ঢুকে আপনার শরীরের সাথে যুক্ত থাকা একটি মেশিনে ঢুকবে। সেই মেশিন Centrifuged বা ঘুরে ঘুরে সেই রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা করে ফেলবে, সেই প্লাজমা আরেকটি ব্যাগে জমা হবে, বাকি রক্ত আরেকটি সেলাইন জলের সাথে মিশে আপনার শরীরে ফিরে যাবে। পুরো এই কাজটি হতে দু ঘন্টার মতো সময় লাগে। নরমাল রক্ত দেয়ার সাথে সময়টি শুধু পার্থক্য। একবারে এমন সংগ্রহ করা প্লাসমা দিয়ে তিনজনের শরীরে ট্রিটমেন্ট করা যায় । রক্ত দেয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হলো, আপনি সুস্থ হয়ে ওঠার মিনিমাম ২৮ দিন পর রক্ত দিতে পারবেন। ২৮ দিন করার কারণ হলো, সুস্থ হয়ে ওঠার মিনিমাম ৩ সপ্তাহের আগে শক্তিশালী এবং অধিক পরিমান এন্টিবডি দেখা যায় না রক্তে।

চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের এই প্লাজমা সংগ্রহে করে দিতে সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট রেড ক্রস প্রায় ১৭০ টি দেশে কাজ করছে এখন। সাথে এক ডজনের বেশি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অনেকগুলো গ্ৰুপের মাঝে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছে। গত দুইমাসে প্রায় আধা ডজনের উপর Peer Review গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো থেকে। যদিও অনেক ডোনার পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তার ১০% মাত্র সঠিক মাত্রার এন্টিবডি সম্পন্ন প্লাসমা পাওয়া যাচ্ছে । ইংল্যান্ডে এতোদিন এটার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি চলছিল। গত সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে রক্ত সংগ্রহ এবং আক্রান্তের শরীরে প্রয়োগ। এটার উপর এতো গুরুপ্ত দেয়া হয়েছে যে, প্রতি সপ্তাহে মিনিমাম ১০ হাজার ইউনিট ব্লাড প্লাসমা সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে ৫ হাজার করোনা আক্রান্তকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। দক্ষিণ পশ্চিম লন্ডনের Tooting এ প্রথম একজন সুস্থ হয়ে ওঠার দেহে পাওয়া গিয়েছিলো সঠিক মাত্রার এন্টিবডি। তার রক্ত সংগ্রহ করে ট্রায়াল শুরু করা হয়েছে। ইংল্যান্ডের চিকিৎসকদের মতে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হতে আরো দেড় দুই বছর সময়ের মধ্যে এই Convalescent Plasma Therapy সবচেয়ে সফল পদ্ধতি হয়ে উঠবে করোনা আক্রান্তদের বাঁচাতে। সমস্যাগুলো পাহাড়সম, কিন্তু চাহিদা সাগর। চায়না ইতালিকে সাহায্য করতে এই মাসে এ রকম চার টনের মতো সুস্থ হয়ে ওঠা করোনা আক্রান্তদের প্লাসমা পাঠিয়েছিল, কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেলো যে- তাদের অর্ধেক দুর্বল এন্টিবডি, অনেকগুলো অন্য ধরনের strains। ইতালিতে করোনা ভাইরাসটির C স্ট্রেইন ছড়িয়েছিলো, চীনে B স্ট্রেইন এবং আমেরিকাতে A স্ট্রেইন। ভাইরাসটির এক একটি স্ট্রেইন যে এন্টিবডি তৈরী করছে সেটি শুধুমাত্র সেই স্ট্রেইন আক্রান্ত করোনা আক্রান্তের দেহে কাজ করবে। এক দেশের লোকের রক্ত আরেকদেশে কাজ করবে না তেমন। চায়নার হেল্পও ইতালির তেমন কাজে লাগে নি।

এখন যারা যারা সেরে উঠছেন, বিভিন্ন দেশে তাদের রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। মাইক্রফটের chatbot ট্রেসিং এপ্সের পাশাপাশি আমেরিকান CDC র সাথে Plasmabot তৈরি করে সুস্থদের রক্ত সংগ্রহ, ট্রেসিনের কাজ করছে তারা। সাথে একটি প্লাজমা বিষয়ক ল্যাবের সাথে polyclonal hyperimmune globulin বা সংক্ষেপে H-Ig নামের একটি এন্টিবডি সরাসরি আক্রান্তের দেহে দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে কাজ করছে।

চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসার ভাষায় Convalescent Plasma Transfusion নাম ব্যাপারটি পরিচিত। সংক্ষেপে CP বলে । হেমাটোলজিস্ট এবং বায়োকেমিস্টদের কাছে classic adaptive immunotherapy নামে পরিচিত বিষয়টি। এখন এ নিয়ে যা বলবো, এই অংশটি চিকিৎসকদের কাজে লাগবে বেশি, সাধারণের একটু মাথার উপর দিয়ে যাবে। তারপরেও জানা থাকলে ভরসা পাবেন।

করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত থেকে সুস্থ হয়ে উঠলে রোগীর দেহে  neutralizing antibody থাকে। ডোনারের দেহে এই এন্টিবডির titre মাত্রার অনুপাত 1:640 এর উপরে থাকতে হবে। এই মাত্রার CP করোনা আক্রান্তের দেহে ট্রান্সফিউস্ড করার পর ডাক্তাররা যা দেখতে পেয়েছেন, সে সব ট্রায়ালের সারমর্ম তিনটি।

এক . এই মাত্রার CP আক্রান্তের দেহে তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া করছে না।

দুই . তিনদিনের ভিতর ক্লিনিক্যাল সিম্পটমসগুলো কমছে এবং ল্যাবরোটারী প্যারামিটারগুলো, বায়োকেমিক্যাল সূচকগুলোর পরিবর্তন হচ্ছে। যেমন : SaO2 বা অক্সিজেন স্যাচুরেশন বেড়ে যায়, Lymphocytopenia বা lymphocyte সংখ্যা বাড়ে, যা রোগীর পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুপ্তপূর্ণ ধরা হয়। C-reactive protein কমে যায়। সাথে alanine aminotransferase, aspartate aminotransferase কমে যায়।

তিন. সাত দিনের মাথায় এক্স রে করে দেখা গেছে ফুসফুসের ক্ষত অনেকাংশে শুকিয়ে গেছে। CT স্ক্যানে দেখা গেছে ফুসফুসের pulmonary parenchymal consolidation ছোট হয়ে গেছে।

চীন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স চিকিৎসকদল এই পদ্ধতিতে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছে। ইংল্যান্ড, আমেরিকায় চিকিৎসকদল সহ আরো অনেক দেশই এখন Convalescent Plasma Therapy -কে এই মুহূর্তের সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা ভাবছে। সময় বলে দেবে পদ্ধতিটি কতজন আক্রান্তকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে তুলছে।

সূত্র :

1. PNAS : Proceedings of National Academy of Science
2. The Lancet
3. Nobel Prize Lists
4. NHSBT UK
5. Preprint Health Science : medRxiv
6. SMC: Scientific Media Center
7. NIH Clinical Trials

ডা. অপূর্ব চৌধুরী 
লন্ডন, ইংল্যান্ড

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •