কিছু অপ্রকাশিত পাপ

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

১৩ এপ্রিল, ২০২১ , ১১:৫৯ অপরাহ্ণ ; 307 Views

কিছু অপ্রকাশিত পাপ

আক্কাস কবে প্রথম এসেছিল এই গ্রামে এবং এসে বাড়ি করেছিল কেউ তা বলতে পারে না। কিন্তু তার কথা সবাই জানে। জানে মানে গল্পের আসরে তার নাম উঠে আসবেই। পাকুড় গাছের নীচে যেখানে আক্কাসের দোকান ছিল সেখানে বসলেই তার কথা আসে। এখন সেখানে দোকান করে লিয়াকত ব্যাপারী। হাটে যাওয়া লোক কিংবা গ্রামবাসী পান খেতে খেতে বলে, এটেকোনা পোরথোম দোকান করছিল আক্কাস বাহে। গ্রামের  সবাই তাকে মনে রেখেছে। কিন্তু কেন আক্কাস চলে গেল গ্রাম ছেড়ে গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক আলীম দাঁড়িয়া, গেন্দু বেটি কেউই বলতে পারে না! সবাই শুধু বলে সে অনেকদিন আগের কথা। আমার বাপ গেন্টুরে জিঙ্গেস করলে বলে,মোর দাদার দাদা  যখন বাঁচি আছিল তখন আক্কাস এ গ্রামোত আসছিল। সে আসছে বড় নদীর ওপার থেকে। ঘুরতে-ঘুরতে একদিন এই গ্রামে আসে। গ্রামের লোকজন দেখে এক উঁচালম্বা লোক পাকুড় গাছের নীচে বসে আছে। সে তো অনেকেই থাকে। চৈত্রের দুপুরে একজন- দুজন হাঁটুরে লোক হরহামেশাই বসে বাতাস খায়। শরীর জুড়ায়। সবাই ভেবেছিল এই লোকটাও বুঝি তেমন! সারাদিন পরেও যখন দেখা গেল লোকটার যাওয়ার কোন লক্ষ্মণ নাই তখন সবাই নড়েচড়ে বসলো। ইসহাক মৌলভী এশার নামাজ পড়ে বাড়িতে যাওয়ার সময় দেখে লোকটা শুয়ে আছে গাছের নীচে। কাছে গিয়ে জানতে চায়,বাড়ি কোটে তোমার বাহে?

বাড়ি নাই।

যাবা কই?

যাবার যাগা নাই।

খাইছো কিছু?

দুদিন ধরি মুই কিছু খাও নাই।

মৌলভী তারে বাড়িতে নিয়ে যায়। লাল চালের ভাত,পাটশাক আর আলুরডাল দিয়ে ভাত খেতে দেয়। লোকটা ভাত খায় পরাণ ভরে তারপর আবার গিয়ে শুয়ে থাকে পাকুড় গাছের তলে। এভাবেই চলে কয়েকদিন। সারাদিন পাকুড়গাছের নীচে বসে থাকা লোকদের সাথে গল্প,গ্রামের ছোটছোট ছেলেমেয়েদের দোলনা বানিয়ে দেয়া। দোলনা বানানোর নিয়মটা সহজ। বসার পিড়ির দুদিকে গরুছাগল বাঁধা দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দিলেই হলো। কাউকে বসিয়ে প্রথমে পিঁছিয়ে যেতে হবে অনেকটাদূর তারপর পিড়িটা ধরে সামনে দৌড়ে কিছুটা দূর নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিতে হয়। গ্রামের মানুষ যেমন একটুতেই উৎসাহী হয়ে ওঠে তেমনি তাদের উৎসাহে ভাঁটা পড়তেও সময় লাগে না। তেমনি অচেনা অজানা লোকটাও তাদের গ্রামেরই একজন হয়ে গেল। একদিন গ্রামের সবাই অবাক হয়ে দেখলো পাকুড় গাছটার নীচে লোকটা একটা চট বিছিয়ে বিড়ি,মুড়ি,চকলেট,বিস্কুট নিয়ে বসে আছে। উত্তরের গ্রামগুলোতে যারা বাস করে তাদের বছরে দুইবার ফসল ফলানো ছাড়া তেমন কোন কাজ নেই। ধান বিক্রি করে সংসার চালায় আর কার্তিক মাসের অভাবে সুদে টাকা ধার নেয়। গ্রামে কোন দোকান নাই। টুকটাক কেনাকেটা করতেও কাঁচাবাড়ি হাটে যেতে হয়। সেখানে এমন একটা দোকান দেখে সবাই অবাক হয়।আর মনেমনে ভাবে ইস্ আমরা কেন আগে এমন দোকান দিলাম না! বাজারে যাওয়া হাঁটুরেরা এখন পাঁকুড় গাছের নীচে বাতাস খাওয়ার পাশাপাশি বিড়ি খায়,পান খায়,বাতাসা মুড়ি খায়। ছোট ছেলেমেয়েরা দোল খেতে এসে লজেন্স খায়। সময়ের সাথে চট থেকে টংএর দোকান হয়। একটু জমি কিনে মাটির ঘর উপরে খড় দিয়ে ঘর বানায়। গ্রামের মহিলারা মুখ টিপে হাসে। সমবয়সীরা বলে কি বাহে মনোত অং নাগছে?  বিয়া কোরমেন নাকি? আক্কাস কিছু বলে না। কমকথা বলা আক্কাস একমনে কাজ করে যায়।

দোকানের পূর্বদিকে হাজ্জাজের বাড়ি। হাজ্জাজ অন্যের জমিতে কাজ করে।  পাঁচ ছেলেমেয়ের একজন মনো। সবাই ডাকে মনো পাগলী। বুদ্ধি কম বলে পড়াশুনা করেনি। মাদ্রাসায় বহুত কষ্টে আমপারা পড়েছে। কোরআন আর ধরা হয় নাই। মনোর স্বভাব হলো প্রায়শই বাড়ি থেকে দুরে চলে যায়। এ জন্য মায়ের কাছে পিটুনি খেতে হয়। মনোর একটা শখ শিশুদের সাথে ছিবুড়ি,কুতকুত খেলা। বড় হয়ে গেছে মাসেমাসে শরীর খারাপ হয় বলে এখন আর কেউ আর তাকে খেলতে নিতে চায় না তারপরও শিশুদের দলে ঘেষার চেষ্টা করে। যদি একজন খেলোয়াড় কম পড়ে তখন সে দলে ঢুঁকে যায়। আজও সে বসে আছে পাকুড় গাছের তলে আক্কাসের দোকানে। এখানেই সবাই আসে খেলতে। দোকানে আসলে আক্কাস মনোরে মাঝেমাঝে লাঠি লজেন্স দেয়। আজও লজেন্স চুষতেছে মনো। মুখের ভিতর লাঠি লজেন্স ঢুকাচ্ছে আর বের করতেছে। একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে হঠাৎ আক্কাস অস্থির হয়ে বলে, মোর বাড়িত হাট, তোক জিলাপি খাওয়াইম এলা। সকাল দুপুরের মধ্যখানে আক্কাস, মনোকে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে। বেড়ার ঘরের ফাঁক দিয়ে আলো কে রুখা যায় না। চুইয়েচুইয়ে সে আলো পড়ে ঘরে, শরীরে। দরজা বন্ধ করে আক্কাস যখন ঘুরে তাকায় তখন মনোর মুখে পড়ছে আসমান থেকে টর্চের আলো। আমপারা পড়া মনো নিজ বিপদ বুঝতে পেরে জোরেজোরে পড়তে থাকে সুরা ফাতেহা,আলহামদুলিল্লাহ হির রাব্বিল আলামিন আররাহমানির রাহিম। ঘরটা মুহুর্তে আলো হয়ে যায়। মনোর শরীরে আগুনের শিখা। সারা শরীর কেঁপে ওঠে আক্কাসের। দরজা খুলে বের হয়ে আসে দ্রুত। তারপর দৌড় শুরু করে বাজারে যাওয়ার রাস্তা ধরে। কোনদিকে হুঁশ নাই। পায়ে চলা লোক,সাইকেল সবাইকে ছাড়িয়ে আক্কাস দৌড়াতেই থাকে দৌড়াতেই থাকে।

 

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ
Latest posts by ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •