কেন করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন নেবেন? 

মুগ্ধতা.কম

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ , ১:০৬ পূর্বাহ্ণ ; 629 Views

কেন করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন নেবেন? 

সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন বের হয়েছে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে ভ্যাক্সিন দেয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ তার মধ্যে প্রথম সারিতেই আছে। অনেকের মধ্যেই ভ্যাক্সিন নেয়া বা দেয়া নিয়ে দ্বিধা আছে। একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমি মনে করি সুযোগ থাকলে আপনার করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন নেয়া উচিৎ। তবে আপনার যদি কোন গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা থাকে, তবে আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে তবেই ভ্যাক্সিন নেবেন। চলুক দেখা যাক কেন আপনার/আমার ভ্যাক্সিন নেয়া উচিৎ?

১) এই ভ্যাক্সিন নিরাপদঃ

বর্তমানে যে ৩টি ভ্যাক্সিন সকল স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেয়া হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে ক) ফাইজার ও বায়োনটেক ভ্যাক্সিন খ) মডার্নার ভ্যাক্সিন এবং গ) অক্সফোর্ড এস্ট্রাযেনেকা ভ্যাক্সিন। এছাড়াও রাশিয়া-চীনসহ নানা দেশ নিজেদের ভ্যাক্সিন বের করার চেষ্টা করছে কিন্তু সেগুলো এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দ্বারা স্বীকৃত হয়নি। যে ৩টি ভ্যাক্সিন সর্বজন স্বীকৃত সেগুলো প্রয়োজনীয় গবেষণার মানদণ্ড মেনে, নানা ধাপ পেরিয়ে তবেই স্বীকৃতি পেয়েছে। সুতরাং আপনি যদি এই ৩টি ভ্যাক্সিনের যে কোন একটি নেবার সুযোগ পান, তবে অবশ্যই এই ভ্যাক্সিন নেবেন। এছাড়াও সামনে জনসন ও জনসনের একটি ভ্যাক্সিন আসছে যেটি ইতিমধ্যে অন্যগুলো থেকেও সার্বিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২) অক্সফোর্ড এস্ট্রাযেনেকা ভ্যাক্সিন ভারতের নয়ঃ

ভারতে প্রস্তুত হচ্ছে বলে অক্সফোর্ড-এস্ট্রাযেনেকা ভ্যাক্সিন নিয়ে অনেকের মনে দ্বিধা আছে। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের আচরণ নিয়ে সন্দেহ থাকা অমূলক নয়। কিন্তু করোনা প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন উৎপাদনে ভারতের যে ভূমিকা তা নিয়ে বিতর্কের তেমন কোনো সুযোগ নেই। করোনা ভাইরাস নির্মূল করতে হলে পৃথিবীর সকল মানুষকেই ভ্যাক্সিন দেওয়া জরুরি। এখন ৭০০ কোটি মানুষকে ভ্যাক্সিন দেওয়ার জন্য যে পরিমাণ ভ্যাক্সিন বানানো দরকার সেটা প্রস্তুত করার সক্ষমতা পৃথিবীর খুব বেশি দেশের নেই। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভ্যাক্সিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। তারা করোনার আগেও পৃথিবীর নিত্য প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিনের প্রায় ৮০ ভাগ উৎপাদন করে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে আসছিল। অক্সফোর্ড-এস্ট্রাযেনেকা ভ্যাক্সিনের কারিগরি দিক-নির্দেশনা, ফর্মূলা সবই অক্সফোর্ডের, ভারত শুধু উৎপাদনকারী দেশ, এর বেশি কিছু না। সুতরাং ভারতকে বিশ্বাস না করলেও এই ভ্যাক্সিনকে বিশ্বাস করতে কোনো সমস্যা নেই। যে ভ্যাক্সিন বাংলাদেশে আসছে সেটি ভারতের আভ্যন্তরীণ গবেষণাধীন কোন ভ্যাক্সিন নয়, যুক্তরাজ্যের নামকরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাক্সিন।

৩) ভ্যাক্সিন ছাড়া করোনাভাইরাসে মৃত্যু ঠেকানোর বিকল্প নেই বললেই চলেঃ

এটি পরিষ্কার করে উল্লেখ করা দরকার যে, করোনাভাইরাস এমন একটি মহামারীর জন্ম দিয়েছে যা পৃথিবীর সকল দেশের, সকল অঞ্চলের, সকল ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষকেই আক্রান্ত করেছে। কোথাও বেশি কোথাও কম। ভ্যাক্সিনই এখন পর্যন্ত একমাত্র কার্যকরী উপায় যার মাধ্যমে করোনাভাইরাসে মৃত্যু থেকে বাঁচা সম্ভব। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ভ্যাক্সিন নিলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে, কিন্তু ভ্যাক্সিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ভ্যাক্সিন নিলে কেউ যদি আক্রান্তও হয়, তবে এই ভ্যাক্সিন সেই ভাইরাসকে দুর্বল করে ফেলবে, যা আক্রান্ত ব্যক্তিকে মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থ হওয়া থেকে বাঁচাবে।

৪) করোনাভাইরাস মহামারীতে হার্ড ইমিউনিটি হবে নাঃ

জনস্বাস্থ্যের একজন মামুলি ছাত্র হিসেবে সাহস করে একটা বড় কথা বলে ফেলি । সেটা হচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই আমরা হার্ড-ইমিউনিটির কথা বলছিলাম। এটি একটি জটিল ধারণা সাধারণ মানুষের জন্য। কিন্তু মূল বিষয়টি হচ্ছে যদি একটি নির্দিষ্ট এলাকার ৮০ ভাগ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়, তবে বাকি ২০ ভাগের আর এই রোগ হবে না। কারণঃ

ক) যারা আক্রান্ত হয়ে যাবে তাদের আর সংক্রমণের ভয় নেই।

খ) ৮০ ভাগ মানুষ যদি আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যায় তাহলে বাকি ২০ ভাগ মানুষকে আক্রান্ত করার জন্য আর কেউ ওই এলাকায় বাকি থাকবে না।

কিন্তু এটা করোনা ভাইরাসের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণঃ

ক) করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কোন নির্দিষ্ট এলাকায় হয়নি। সারা বিশ্বে হয়েছে। সুতরাং আপনি কোন একটা নির্দিষ্ট এলাকাকে আলাদা করে তাদের সংরক্ষিত রাখতে পারবেন না। বর্তমান বৈশ্বিক যোগাযোগের যুগে এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকায় যাবেই। সুতরাং কোন নির্দিষ্ট এলাকা বা জনগোষ্ঠী আলাদা করে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করবে না।

খ) করোনা ভাইরাসে আপনি একবার আক্রান্ত হলেই যে সেটি আর হবে না এমনটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। এখন পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত দেখে মনে হচ্ছে যে, যারা একবার আক্রান্ত হয়, তাদের দ্বিতীয়বার এই সংক্রমণ হয় না, কিন্তু এটি নিশ্চিত করে বলার জন্য যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে নেই।

সুতরাং হার্ড-ইমিউনিটি হয়ে যাবে, ভ্যাক্সিনের দরকার নেই – এটি ভ্রান্ত ধারণা।

৫) মাস্ক পরা, হাত-ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ভালো, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়ঃ

মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা অনেক ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্যই ভালো এবং ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা। কিন্তু এই তিনটির নিয়মিত বাস্তবায়ন বছরের পর বছর ধরে বজায় রাখা সম্ভব নয়। এছাড়াও মাস্কের ধরণ ও তার বর্তমান যে ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, তা করোনার মতো ভাইরাস প্রতিরোধে কতটা কার্যকরী তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। হাত ধোয়া সবসময়ই ভালো অভ্যাস, কিন্তু করোনা ভাইরাস অনেক সময়েই সরাসরি বাতাসে ভেসে ছড়ায় এবং ফলশ্রুতিতে হাত নিয়মিত ধুলেও নানা উপায়ে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা প্রবলভাবে থেকে যায়। সার্বিক বিবেচনায় মানুষের পক্ষে মাস্ক পরে, হাত ধুয়ে এই ভাইরাস ঠেকানো দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হবে না। এছাড়া দীর্ঘদিনের জন্য শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাও সম্ভব না। এগুলো সবই ছিল ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের আগের পদক্ষেপ। এখন যেহেতু ভ্যাক্সিন বের হয়েছে, করোনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য ভ্যাক্সিন নেয়াই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি । তবে যতদিন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী নির্মূল না হবে, ততদিন পর্যন্ত মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার অভ্যাস জারি রাখলে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকবে। কিন্তু ভ্যাক্সিন না নিয়ে শুধু এই তিনটি ধাপ অনুসরণ করলে একসময় না একসময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

৬) একবার করোনা হয়ে গেলেও ভ্যাক্সিন নিতে হবেঃ

অনেকে ভাবতে পারেন, একবার করোনা হয়ে গেলে আর কখনও হবে না, তাই ভ্যাক্সিন নেবার দরকার নেই। এখন তথ্য প্রমাণের দিকে তাকালে দেখা যায় একবার করোনা হয়ে গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে তার আবার করোনায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু এর চাইতে দীর্ঘমেয়াদে কী হয় তার গ্রহণযোগ্য তথ্য গবেষকদের কাছে নেই। অর্থাৎ একবার করোনা হলেও পরবর্তীতে আপনার আবার করোনা হতে পারে। ভ্যাক্সিন নিয়ে নিলে পরবর্তীতে আবার করোনা হবার সম্ভাবনা কমে যায়, এমনকি যদি আবার হয়ও, তবুও তাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা এই ভ্যাক্সিন উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেবে। একবার হয়ে গেছে ভেবে পরবর্তীতে আবার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নেয়ার চাইতে ভ্যাক্সিন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সিদ্ধান্তই হবে সঠিক ও কার্যকরী।

৭) ভ্যাক্সিন নেবেন নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, অন্যের জন্যঃ

ভ্যাক্সিন নিলে একজন ব্যক্তি শুধু নিজেই করোনার ভয়ংকর মৃত্যু ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন তাই নয়, বরঞ্চ তিনি তার পরিবার, প্রতিবেশী ও আশেপাশের সবাইকে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচাবেন। সুতরাং এটি আসলে একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

উপরে ব্যবহার করা কোন তথ্যই মন-গড়া নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি, জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোসহ নানা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে লেখা। বাংলাদেশ ভ্যাক্সিন আনার ক্ষেত্রে বড় ধরণের কূটনৈতিক সফলতা দেখিয়েছে। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ভ্যাক্সিন অগ্রীম কিনে নেয়া ক্যানাডার চাইতে বাংলাদেশে ভ্যাক্সিন দেয়া মানুষের সংখ্যা আগামী কয়েকমাসে বেশি হবে। সুতরাং আপনি যদি সুযোগ পান তবে অবশ্যই এই ভ্যাক্সিন নেবেন। তবে ভ্যাক্সিন নেয়ার বা না নেয়ার সিদ্ধান্ত আপনার নিজের। একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমি মনে করি এটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নিরাপদ। কিন্তু বাকিটা আপনার বিবেচনা। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

 

শামীম আহমেদ:
সোশাল এন্ড বিহেভিয়ারাল হেলথ এনালিস্ট,
ইউনিভার্সিট অফ টরোন্টো, কানাডা।

৩০ জানুয়ারি ২০২১।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •