কোডাক ক্যামেরা

রবীন জাকারিয়া

৪ জুন, ২০২২ , ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ ; 122 Views

রবীন জাকারিয়ার গল্প - কোডাক ক্যামেরা

শাহেদ ভীষণ বিরক্ত হয়ে আছে৷ সারাটা বাড়ি তন্ন তন্ন করেও সে তার অত্যন্ত একটা জরুরি ফাইল খুঁজে পাচ্ছে না৷ ভয়াবহ ব্যাপার! ওটার ভেতরে নিজের সমস্ত একাডেমিক সার্টিফিকেট, বাড়ির মূল দলিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রাখা আছে৷ ফাইলটার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই সে ফাইলের কভারে মার্কার পেন দিয়ে বড় বড় হরফে লিখে রেখেছে “কাগজপত্রের মূলকপি”৷ অথচ এখন উধাও৷ সে কখনো এতো দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়৷ জীবনে এমন ঘটনা ঘটেনি৷ সে এত পরিপাটি যে কোন জিনিস কোথায় আছে তা অন্ধকার বা বিদ্যূত চলে গেলেও বের করতে পারবে৷ কয়েল, মোমবাতি, দিয়াশলাই কিংবা টর্চলাইটটা কোথায় রাখা আছে তা ওর নখদর্পনে৷ কিন্ত এখন সে কোনোটাই জায়গামত পায় না৷ এটা শুরু হয়েছে বিয়ের পর থেকে৷ এখনকার বউরা কোনো কাজই সঠিকভাবে করতে চায় না৷ শুধু দায়সারা কাজ৷ দরজার চাবিটা ঠাশ করে কোথায় রাখল সেটাই খুঁজতে নষ্ট করে ফেলে আধা ঘন্টা৷ শাহেদ এত বলে সঠিক স্থানে রাখ দেখবে তোমারই সুবিধা হবে৷ কিন্ত কে শোনে কার কথা৷ গত তিরিশ বছর ধরে একই চিত্র৷ বদলায় না কিছুই৷ না অভ্যাস আর না ভোগান্তি৷ অথচ আমাদের মায়েরা কত কষ্ট করে সংসার চালাত৷ সীমিত আয় আর অনেক সন্তানসহ যৌথ পরিবারের সীমাহীন কাজ শেষেও সবকিছু ছিল তাদের নখদর্পণে৷ তাঁরা সংসারটাকে Own করতেন৷ কিন্ত এখনকার মেয়েরা তা করে না বোধ হয়৷

শাহেদ কিছুটা সময় খোঁজাখুঁজিতে ক্ষান্ত দিলো৷ মেজাজটাকে ঠান্ডা করে চিন্তা করল৷ নতুন করে খুঁজতে হবে৷ যেভাবেই হোক ফাইলটা তাকে পেতেই হবে ৷ কারণ ঐ ফাইলে রাখা কিছু কাগজপত্র তার খুবই জরুরি৷ আর কিছুদিনের মধ্যে তাকে LPRএ যেতে হবে৷ সরকারি প্রসিডিউর মেইনটেইন আর কাগজপত্র সাবমিট করতে করতে এমনিতেই তার ত্রাহি অবস্থা৷ এর মধ্যে ফাইল খোঁজাটা যেন গোঁদের উপর বিষফোঁড়া৷

বেশ কিছু পর শাহেদ আবারো ফাইলটা খোঁজা শুরু করল৷ বইয়ের আলমারি, ফাইল কেবিনেট এবং অবশেষে স্টিল আলমারি৷ পাওয়া গেল সিন্দুকের ভেতর৷ নিশ্চয়ই এটা তার স্ত্রী শেলী এখানে এনে রেখেছে৷ এটা নিশ্চিত আর যাই হোক সিন্দুকে সে ফাইলটা রাখেনি৷ রেখেছিল স্টিল আলমারিতে৷ যাক পাওয়াতো গেল৷ টেনশন কমলো৷ সে ফাইলটা বের করতে যাবে এমন সময় তার চোখে পড়ল ক্যামেরাটা৷ অনেক পুরোনো দিনের কোডাক ক্যামেরা৷ যেগুলো দিয়ে ছবি তুলতে ‘ফিল্ম রোল’ এর প্রয়োজন হতো৷ সেসময় ফুজি ফিল্ম জনপ্রিয়তার তুঙ্গে৷ এখনতো সব ডিজিটাল৷ আর সকলের হাতেই ক্যামেরা৷ মোবাইলে ক্যামেরা৷ ডিজিটাল ক্যামেরা কত কী! কিন্ত সে সময় একটা ক্যামেরা মানে একটা এসেট৷ আভিজাত্য৷ লোকে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে দর্শনীয় স্থানে ভ্রমন করত অনেকটা গর্বের সাথে৷ পিকনিক কিংবা কোন অনুষ্ঠানে বন্ধু কিংবা আত্মীয়ের কাছ থেকে ক্যামেরা ধার করে সকলে চাঁদা তুলে ফিল্ম কেনা হতো৷ এরপর সকলে সমানুপাতিক হারে ছবি তুলত৷ গ্রুপ ছবি৷ সিঙ্গেল ছবি৷ সবচেয়ে মজার ব্যাপার হতো ক্যামেরা সামনে ধরার আগে পর্যন্ত সকলে নরমাল থাকত৷ কিন্ত ছবি তোলার সময় কেন যেন সকলেই নার্ভাস হয়ে যেত৷ দাঁড়ানো, হাত দুটো সঠিকভাবে রাখা কিংবা মুখের হাসি সবকিছুই অস্বাভাবিক হতো৷ সে সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টাইলটা ছিল দুই বন্ধু হ্যান্ডশেকরত অবস্থায় ছবি তোলা৷ যার কারণে বেশিরভাগ ছবি ভাল হতো না৷ অবশ্য সে মূল্যায়ন করবার সক্ষমতাও ছিল না৷

একটা রিল ফিল্ম দিয়ে ৩০-৩৫টি ছবি তোলা যেত৷ তারপর ফিল্ম ডেভেলপ৷ পরিশেষে ল্যাবে ছবি ওয়াশ৷ আহ্ কী সময় ছিল৷ শাহেদ ক্যামেরাটা দেখতে পেয়ে নস্ট্রালজিক হয়ে পড়লো৷ মনে পড়লো কীভাবে সে ক্যামেরাটা কিনেছিল৷ স্বপ্ন থাকলেও বেকার শাহেদের পক্ষে ক্যামেরা কেনা অসম্ভব ছিল৷ একদিন এক বন্ধু ওকে সেটা কিনতে বলায় সে হাসি দিয়ে বলেছিল “আমাকে বিক্রি করলেও ওটা কিনতে পারব না৷ অসম্ভব! তখন বন্ধুটি জোর করে ওর হাতে ক্যামেরাটা দিয়ে বলেছিল তুই যা পারিস তাই দে৷ দরকার হলে পরে টাকা দিস৷ তবুও এই অলক্ষুণে জিনিসটা তুই নিয়ে নে৷ শাহেদ বলল, অলুক্ষণে মানে কী? বন্ধুটি বললো এটা অভিশপ্ত ক্যামেরা৷ এটা দিয়ে প্রথম যে ছবিটা তুলেছি সেটা হলো আমার মায়ের৷ ছবি তোলার দু’দিন পর মা হঠাৎ মারা গেলেন৷ শাহেদ হেসে বলল এতে কি প্রমাণ হয় এটা অভিশপ্ত? বন্ধুটি বলল আরেকটি কারণ আছে৷ সেটা হলো এর লুকিংটা কেমন ভূতুরে আর মাঝে মাঝে নিজে থেকেই “ক্লিক” শব্দ করে উঠে৷ আমার ভয় করে৷ এখন তুই নিলে নে৷ নাহলে এটা ভেঙে ফেলব৷ শাহেদ এসব আজগুবি আর ভূতুরে গল্পে বিশ্বাসী নয়৷ তাই সে ক্যামেরা নিল৷

মনে পড়ে সেই বিশেষ দিনের কথা৷ যেদিন শাহেদ ফিল্ম লোড করে ক্যামেরাটা নিয়ে বাড়িতে এলো৷ তা দেখে আব্বা-মা, ভাই-বোন সকলে খুশি৷ আমার একটা ছবি তোল, আমার একটা ছবি তোল বলে সবাই হুড়োহুড়ি৷ কিন্ত শাহেদের এক কথা এটা দিয়ে প্রথম ছবি তুলবো আব্বা-মা’র যুগল ছবি৷ তারপর অন্যদের৷ আব্বা কেবল অফিস থেকে ফিরেছেন৷ তাঁদেরকে বলা হলো ভাল ড্রেস আর একটু মেকআপ করার জন্য৷ বাবা স্যুট-টাই পরলেন৷ আর মাকে শাহেদের বোন সুন্দর একটা লাল শাড়ি পরিয়ে আর সাজিয়ে নিয়ে এলো৷ সব রেডি৷ ছবি তোলার স্পট পছন্দ হচ্ছিল না৷ অবশেষে বাড়ির ভেতর ছোট্ট গোলাপ বাগানের মাঝে তাঁদের বসানো হলো৷ ছবি তোলার ঠিক আগ মূহুর্তে তার বাবা বলে উঠলেন, তোল৷ ভাল করে ছবিটা তুলে রাখ৷ এটাই জীবনের শেষ ছবি৷ এ কথা শোনামাত্রই শাহেদের মা ভীষণ রাগান্বিত হলেন৷ বললেন, এসব কী অলুক্ষণে কথা বলো? মন খারাপ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি উঠে চলে গেলেন৷ বললেন তিনি আর ছবিই তুলবেন না৷ শত চেষ্টা করেও তাঁর ছবি তোলা হলো না৷ আচমকা এমন ঘটনার ফলে সেদিন ঐ একটি ছবি ছাড়া আর কারোরই ছবি তোলা হলো না৷ আনন্দটা নষ্ট হয়ে গেল৷

দু’দিন পর শাহেদের বাবা হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা গেলেন৷ বাবার মৃত্যুর পর সংসার, জীবন-জীবিকার তাগিদে সকলে ক্যামেরার কথা ভুলেই গেল৷ এমনকি শাহেদও৷ আজ প্রায় তিরিশ বছর পর ক্যামেরাটা দেখে সবকিছু যেন ছবির মত ভেসে উঠল৷ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো৷ কৌতুহল বশে শাহেদ ক্যামেরাটাকে হাতে নিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল৷ আজ বন্ধুর কথাটা সত্য মনে হলো৷ আসলেই এটা দেখতে কেমন ভূতুরে৷ সে এগুলো পাত্তা দেয় না৷ পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই৷ এমন সময় ক্যামেরার সাটারটা একাই ক্লিক করে উঠলো৷ যেন কেউ একজন একটা চোখ টিপে দিলো৷ শাহেদ মজা পেল৷ ফিল্ম না থাকার পরও সে তাই মোবাইলে সেলফি তোলার মতো করে একবার ছবি তোলার বাটন চাপলো৷ এরপর খুঁজে পাওয়া ফাইলটা বের করল৷ আর আলো বাতাসে রাখবে বলে ক্যামেরাটা ড্রইং রুমের খোলা বুক শেলফে রেখে দিলো৷

দু’দিন পর শাহেদের বাড়িতে প্রচুর লোকের সমাগম৷ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, কলিগ, পাড়া-প্রতিবেশিতে ভরপুর৷ হঠাৎ স্ট্রোক করে শাহেদ আজ মারা গেছে৷ অস্বাভাবিক ব্যাপার৷ কেউ মানতে পারছে না৷ সকালেও সুস্থ্ একটা মানুষ ফজরের নামাজের পর জগিং শেষে ফ্রেকফাস্ট সারল৷ হালকা রসিকতা আর কথাবার্তায় পরিবারের সকলকে আনন্দে ভরে দিলো৷ অথচ হঠাৎ নেই হয়ে গেল৷

চারিদিকে কান্না আর হাহাজারিতে সারাটা বাড়ি বেদনায় ভরপুর৷ লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ এসময়ে কান্নার বাঁধ যেন আরো ভেঙে পড়ল৷ কত লোক যে শেষকৃত্যের জন্য এসেছে তার হিসাব নেই৷ সকলেই পরিচিত নয়৷ বেশিরভাগই অচেনা৷ লাশ কাঁধে তোলার সময় চিৎকার শুনে এক তরুণ ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে এলো৷ হাতে একটা শপিং ব্যাগ৷ লাশের পিছু পিছু এলোমেলোভাবে পা ফেলে হাঁটছে তরুণ৷ ওকে দেখে সকলে দুঃখ পাচ্ছে এই ভেবে যে সে হয়তো মরহুম শাহেদের নিকটাত্মীয়৷ তাই সে কষ্টটা নিতে পারছে না৷ ধীরে ধীরে সেই তরুন একটা সময় লাশ দাফনের লাইন থেকে বেরিয়ে অন্য পথ ধরে৷ হাতে থাকা শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে “ক্লিক” শব্দটি কানে পৌছায় না মাদকাসক্ত সেই তরুণের৷ যার ফলে সে বুঝতে পারলো না শপিং ব্যাগে করে চুরি করা জিনিসটা শুধু কোডাক ক্যামেরা নয় বরং অদ্ভূতুরে ও অভিশপ্ত এক সিরিয়াল কিলার৷ আর যার পরবর্তী নিশানা হয়তো সে-ই৷

 

Latest posts by রবীন জাকারিয়া (see all)

2 responses to “কোডাক ক্যামেরা”

  1. রবীন জাকারিয়া says:

    অসংখ্য ধন্যবাদ মুগ্ধতা পরিবারকে

  2. Sumi Zaman says:

    অসাধারণ গল্প! বিশেষ করে Endingটা চমৎকার

মন্তব্য করুন

%d bloggers like this: