ক্যাডেট কলেজ ভর্তি: শেষ মুহূর্তের ভাইভা প্রস্তুতি

মজনুর রহমান

১০ মার্চ, ২০২১ , ১০:৪৭ অপরাহ্ণ ; 788 Views

ক্যাডেট কলেজ ভর্তি: শেষ মুহূর্তের ভাইভা প্রস্তুতি 1


২০২১ সালের ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষার লিখিত পর্বে যারা কৃতকার্য হয়েছ তাদের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
এখন সামনে ভাইভা। আজ আমরা জানতে চেষ্টা করব কী করে একজন পরীক্ষার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য তার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে পারবে।

মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত বুদ্ধি, চাল-চলন, আচার-আচরণ ইত্যাদি যাচাই করা হয়ে থাকে। সাধারণত মৌখিক পরীক্ষার পূর্বে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় প্রার্থীর উচ্চতা, ওজন, চোখের দৃষ্টি শক্তি, বুকের মাপ, শরীরে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রোগ ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।
এখন আসি প্রস্তুতি নিয়ে।

যা পড়তে হবে:

১. মৌখিক পরীক্ষার কোনো সিলেবাস থাকে না। তবে পরীক্ষার উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীর বয়স ও জানার পরিধি বিবেচনা করেই প্রশ্ন করা হয়। অর্থাৎ তোমরা যে শ্রেণিতে পড় বা পড়তে যাচ্ছ এসবের প্রেক্ষাপটেই প্রশ্ন করা হবে।


২. ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা, ইরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান ও সাধারণ বিজ্ঞান থেকে প্রশ্ন করা হতে পারে।


৩. সপ্তম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান ও সাধারণ বিজ্ঞানের প্রথম ২/৩ টি অধ্যায় আয়ত্ত্ব করবে। যেহেতু তোমরা ইতোমধ্যে নতুন ক্লাসে উঠেছ তাই এখানকার শুরুর কিছু অধ্যায় থেকে প্রশ্ন করতেই পারে।


৪. লিখিত পরীক্ষায় যে প্রশ্নগুলো এসেছিল সেগুলো মনে করে আবার সেগুলোর সঠিক উত্তর অনুশীলন করবে এবং সেগুলোর সাথে প্রাসঙ্গিক অন্য তথ্য জেনে নেবে।


৫. ইংরেজির জন্য About yourself, Spelling, Synonym, Antonym ইত্যাদি পড়তে হবে। English for today বইটি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে।
৫. বীজগণিতের বর্গের সূত্রাবলী, পরিমাপের সূত্রাবলী, মানসাংক, জ্যামিতির সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী, উপপাদ্যের সিদ্ধান্ত ইত্যাদি চর্চা করতে হবে।


৬. বাংলা সাহিত্যের (বিশেষ করে চারুপাঠের) লেখক ও কবি পরিচিতি, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর, ব্যাকরণের খুঁটিনাটি বিষয়সমূহ চর্চা করতে থাকবে।


৭. কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স থেকে পড়বে, প্রতিদিন বাসায় জাতীয় পত্রিকা রাখবে। প্রতিদিন পত্রিকা পড়বে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ নোট করবে এবং পত্রিকার সম্পাদকের নাম জেনে রাখবে। বর্তমান বিশ্বের আলোচিত দেশ ও ঘটনাসমূহ, বিভিন্ন দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশ, দেশ, রাজধানী, মুদ্রা, ভাষা, সরকার প্রধান, রাষ্ট্র প্রধান, রাজা, বাদশাহ, সুলতান, পররাষ্ট মন্ত্রীদের নাম, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রধানের নাম, আলোচিত রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধানের নাম, বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং তিন বাহিনীর প্রধানের নাম শিখবে। বিশ্ব মানচিত্রে বিভিন্ন দেশের অবস্থান, সাগর, মহাসাগর, অক্ষরেখা, দ্রাঘিমা রেখা সম্পর্কিত বিষয়- বিশেষ করে সার্ক ভূক্ত রাষ্ট্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখবে।


৮. নিজের নামের অর্থ, নিজ নামের সাথে মিল আছে এমন বিখ্যাত কোন ব্যক্তি, তাঁর কৃতিত্ব, নিজ জেলার অবস্থান, জেলা কেন বিখ্যাত, কোন নদীর তীরে অবস্থিত, নিজ জেলার বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের অবদান সম্বন্ধে বিস্তারিত জানবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে জেনে নিবে।


৯. পরীক্ষার দিনের বাংলা, ইংরেজি, হিজরী সালসহ তারিখ এবং তোমার জন্মদিন বাংলা সনসহ তারিখ জেনে রাখবে।


১০. সর্বশেষ আলোচিত সিনেমা, চরিত্র, পুরষ্কার, বিশেষ করে নোবেল পুরষ্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরষ্কার ইত্যাদি জেনে নিবে।


১১. খেলাধুলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। তোমার প্রিয় খেলা, প্রিয় খেলোয়াড়ের বিস্তারিত তথ্য, বাংলাদেশ ও বিশ্বের উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় এবং তাঁদের রেকর্ডসমূহ জেনে নিবে। ক্রিকেটের খুটিনাটি বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত্ব করবে। বিশেষ করে সর্বশেষ খেলা সম্পর্কে জেনে নিবে। যে খেলোয়াড়কে প্রিয় খেলোয়াড় বলবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেবে। একইভাবে প্রিয় গায়ক, প্রিয় শখ যখন যেটা বলবে তার সম্বন্ধে বিস্তারিত বলতে হতে পারে।


১২. তুমি কেন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে চাও, কোন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে চাও, ক্যাডেট কলেজ সমূহের বিভিন্ন তথ্য যেমন- স্থাপনকাল, কোনটি প্রথম, কোনটি শেষ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করা হতে পারে। তোমার জীবনের লক্ষ্য ও শখ এবং তা নির্ধারণের কারণ কী ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হতে পার।

পরীক্ষার আগের রাতে ও সকালে:

পরীক্ষার আগের রাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখবে যাতে পরীক্ষার দিন সকাল বেলা কোনো কিছু খোঁজাখুঁজি করতে না হয়। পরীক্ষার দিনের প্রধান দৈনিক পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেখে নিবে।

ভাইভাকক্ষে প্রবেশ:

ভাইভা কক্ষে প্রবেশের সময় যথাসম্ভব কম শব্দ করে অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। প্রবেশ করার পর সালাম দিয়ে আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিবে। ধীরে ধীরে তোমার জন্য নির্ধারিত চেয়ারের কাছে যাবে। জুতার মচমচ শব্দ করা থেকে বিরত থাকবে এবং ডানে বাঁয়ে সামনে পিছনে ঝুঁকে হাঁটবে না। বসতে না বললে চেয়ারের পাশে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। বসতে বললে ধন্যবাদ জানিয়ে চেয়ারে সোজা হয়ে বসবে, হেলান দিয়ে কিংবা পায়ের উপর পা তুলে বসবে না। হাঁটুর উপর হাত রাখবে, টেবিল বা চেয়ারের হাতলের উপর হাত রাখবে না। পরীক্ষকের প্রশ্ন ভালোভাবে শুনে শান্ত ভাবে আত্মবিশ্বাসের সাথে এক এক করে উত্তর দিবে।

প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে:

ক. যে ভাষায় প্রশ্ন করা হবে সে ভাষায় জবাব দিবে।


খ. প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিবে।


গ. উত্তর হতে হবে সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য।


ঘ. ভালোভাবে না শুনে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবে না, প্রশ্নকর্তা কী বলেন সেদিকে মনোযোগ সহকারে খেয়াল রাখতে হবে এবং কোনো প্রশ্ন বুঝতে অসুবিধে হলে বিনয়ের সঙ্গে পুনরায় জেনে দিতে হবে। যেমন- দুঃখিত স্যার, বুঝতে পারিনি, আরেকবার বললে ভালো হয়।


ঙ. তুমি তোমার বক্তব্যে স্থির ও অটল থাকবে তবে স্যারদের সাথে তর্কে জড়াবে না। বিনয়ের সাথে বলবে, স্যার আমার জানামতে এটাই সঠিক। দু’তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে তেমন কিছু যায় আসে না। তাই না ঘাবড়ে মনোবল অটুট রাখবে । বোর্ড তোমার উপস্থিত বুদ্ধি যাচাই করার জন্য কটাক্ষ করেও কিছু প্রশ্ন করতে পারেন, তাই বলে তুমি রাগান্বিত বা বিরক্ত হবে না। শান্ত হয়ে বসে থাকবে।


চ. উত্তর জানা না থাকলে বিনয়ের সাথে স্বীকার করবে আমতা আমতা করবে না। Sorry sir বা দুঃখিত স্যার, আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই- এমন বলবে।


ছ. শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং হাসি মুখে উত্তর দিবে। কৃত্রিমতা পরিহার করবে।


জ. কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করবে। উচ্চস্বরে বা মিনমিন করে অতি নিম্মস্বরে উত্তর দেবে না। উপস্থিত সকল পরীক্ষক যেন তোমার উত্তর শুনতে এবং বুঝতে পারেন সেভাবে উত্তর দিবে।


ঝ. উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাবে। প্রশ্নের গুরুত্ব অনুধাবন করে চিন্তাশীল ও যথাযথ উত্তর দিতে চেষ্টা করবে। আমতা আমতা করে উত্তর না জেনে জানার ভান করবে না। ‘তুমি সবকিছু জানো’ এই রকম ভাব পোষণ করবে না। ভুল তথ্য দিয়ে পরীক্ষকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে না।

ঞ. হাত নেড়ে কথা বলবে না, টেবিলের উপর হাত রাখবে না, দুই হাত হাঁটুর উপর রেখে স্বাভাবিক ভাবে বসবে, এক হাত দিয়ে অন্য হাত খোঁটাখোঁটি বা আঙ্গুল মটকাবে না । নিচের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিবে না। তোমার যদি মুদ্রাদোষ বা বদ অভ্যাস যেমন – পা নাচানো, মাথা চুলকানো, এক কথা কয়েকবার বলা, মানে মানে শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার করা প্রভৃতি থাকলে তা পরিহার করবে।


ট. প্রশ্ন করা শেষ হলে প্রশ্নকর্তা তোমাকে চলে যেতে অনুরোধ করবে। তুমি সালাম দিয়ে, শব্দ না করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সহজ ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসবে। বেরিয়ে আসার সময় দরজা আবার আস্তে বন্ধ করে রাখবে। হাঁটার সময় যেন জুতার কোন বিরক্তিকর আওয়াজ না হয়। মনে রাখবে ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ক্ষেত্রে মার্কিং এর ব্যবস্থা রয়েছে। তাই প্রত্যেক ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সর্বোপরি মনে রাখবে, মৌখিক পরীক্ষায় সাফল্যের মূল সূত্র হলো মাথা ঠাণ্ডা রাখা, চোখ কান খোলা রেখে প্রশ্ন শোনা ও উত্তর করা, ঘাবড়ে না যাওয়া।
তোমার সাফল্যে উদ্ভাসিত হোক পরিবার ও দেশ- এই দোয়া রইল।

মজনুর রহমান
বি.এ (সম্মান), এম. এ (বাংলা)
পরিচালক: বাংলাবাড়ি, রংপুর।
শিক্ষক: ভেনাস ক্যাডেট কোচিং, রংপুর।
ফোন: ০১৭২৮-৭৫৩৫৭৬/ ০১৮৯০-২৭৭৪৭১

মজনুর রহমান
Latest posts by মজনুর রহমান (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •