জনগণের স্বাস্থ্য দেখার দায়িত্ব কার?

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ , ১১:৪২ অপরাহ্ণ ; 77 Views

স্বাস্থ্য বলতে আমরা সাধারণ জনগণ বুঝি মোটাসোটা, ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারাকে। বাস্তবে স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, স্বাস্থ্য হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি অবস্থা, কেবল রোগ বা দূর্বলতার অনুপস্থিতি নয়। এখানে শুধু শারীরিক সুস্থতার কথা বলা হয়নি।বলা হয়েছে মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতারও কথা। শারিরীক সুস্থতার যখন ঘাটতি ঘটে তখন আমরা স্মরণাপন্ন হই চিকিৎসকের।

চিকিৎসক বা ডাক্তার তারাই যার সরকারি নিবন্ধন আছে এমন সরকারি বা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাঁচ বছর অথবা চার বছর পড়াশুনা করে এমবিবিএস /বিডিএস ডিগ্রি লাভ করে। এর বাইরে যারা, তারা কখনই নামের সামনে ডা.শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পল্লী চিকিৎসক, এলএমএফ, আরএমপি, ডিএমএফ,হোমিও ইত্যাদি এবিসিডি অনেক অনেক পদবীর মানুষ যাদের কারোই রোগী দেখার আইনগত অনুমোদন এবং যোগ্যতা নেই তারা নামের সামনে ডা.পদবী বসিয়ে চুটিয়ে প্রতারণা করছে।

প্রতারণা কোন অর্থে, কারণ তারা মানবদেহ সম্বন্ধে কিছুই না জেনে তিন থেকে ছয়মাসের ট্রেনিং করে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষকে। একথা সবসময় বলা হয় গ্রামে ডাক্তার পাওয়া যায় না,এরাই ভরসা। আসলে এসব কথা আগে প্রযোজ্য হলেও বর্তমানে এসব কথার কোনই গুরুত্ব নাই। এখন প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, যেখানে ডাক্তার, মেডিকেল এ্যাসিষ্টেন্ট কর্মরত। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ, মেডিকেল অফিসার, নার্স পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মরত। যারা ২৪ ঘন্টা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করে রোস্টার ডিউটি মতো। এসব সত্ত্বেও অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছে ওষুধের দোকান যেখানে দোকানদার ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। এসব ওষুধের দোকানদার নিজেদের নামের আগে ডাক্তার উপাধি বসিয়ে সামান্য সর্দি কাশিতেও নির্বিচারে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে। আমরা জানি সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরে কোনই এন্টিবায়োটিক লাগে না সেখানে পল্লি চিকিৎসক, ওষুধের দোকানদার এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে কোনই সংকোচ ছাড়া কারন তার কাজ ওষধ বিক্রি করা। জ্বর আসলেই তারা দুইটি সিফিক্সিম অথবা এজিথ্রোমাইসিন দিয়ে দেয় কিন্তু খাওয়ার কথা সিফিক্সিম ন্যুনতম পাঁচদিনে দশটা আর এজিথ্রোমাইসিন তিনটা। কোর্স কমপ্লিট না করার কারণে জীবানুগুলো ড্রাগ রেজিস্টান্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন দেখা যায়  টাইফয়েড জ্বরে অনেক ওষুধ কাজ করে না, যা কয়েকবছর আগেও কাজ করতো। এ পরিস্থিতিতে ওষধ প্রশাসনের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহন করার কথা থাকলেও তারা নিস্ক্রিয়।

লোক দেখানো বছরে একবার দুবার অভিযান চালালেও বেশীরভাগ সময় তারা বসে সময় কাটায়। আরো করুণ অবস্থা গ্রামে সেখানে সাধারণ বিস্কুট, চায়ের দোকানেও বিক্রি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ।  মুড়ি মুড়কির মতো মানুষ সেবন করছে গ্যাসের,কাশের আর ঘুমের ওষুধ। দেশ ওষুধ শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেললেও মানহীন অসংখ্য ওষুধের কারখানা গড়ে উঠেছে। সেসব কারখানায় ওষুধের বদলে দেয়া হয় আটা, যা দিয়ে বানানো হয় ট্যাবলেট। এমনকি খোদ ঢাকার বিএমএ ভবন ওষুধ মার্কেটে বিভিন্ন নামীদামী কম্পানীর মোড়কের আড়ালে বিক্রি হচ্ছে নকল ওষুধ। সেই ওষুধ চলে যাচ্ছে সারাদেশের গ্রামের হাটের ওষুধের দোকানে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি চলছে যত্রতত্র। OTC(over the counter drug) সাধারণত সেসব ওষুধ ক্রয় করতে কোনও প্রেসক্রিপশন লাগে না। এসব ওষুধের মধ্যে আছে প্যারাসিটামল,গ্যাসের ওষুধ, ভিটামিন ইত্যাদি।

এন্টিবায়োটিক ক্রয় করতে প্রেসক্রিপশন লাগলেও বাস্তবে এন্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে মুড়িমুড়কির মতো। না বুঝেই ওষুধের দোকানদার দিচ্ছে এন্টিবায়োটিক সাধারণ জ্বর, কাশি আর ডায়রিয়াতে অথচ এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক দেবার কোনও দরকারই ছিলো না। শুধুমাত্র প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর,কাশিতে মধু, লাল চা আর ডায়রিয়াতে ওরস্যালাইন ব্যবহার করে এসব রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব। আর এক শ্রেণির ওষুধ ব্যবসায়ী গড়ে উঠেছে যারা নিজেদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে দাবী করলেও তারা এলোপ্যাথিক ওষুধ হিসেবে তৃতীয় প্রজন্মের এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে আর এদের এসব ব্যবহারে উৎসাহী আর সাহসী করে তোলে ওষুধ কম্পানীর প্রতিনিধিরা। উচ্চ শিক্ষিত এসব ওষুধ কম্পানীর প্রতিনিধিরা তাদের ওষুধ বিক্রির জন্য মরিয়া হয়ে ছুটে বেড়ায় গ্রাম,শহরের অলিতে-গলিতে।

স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় আয়ের ছয় ভাগ বরাদ্দ হওয়া উচিত ধরা হয়। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ব্যয় শতকরা এক ভাগেরও কম। এবার বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা আর বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়ায় গিয়ে চিকিৎসা বাবদ বছরে ব্যয় ৩২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে মরার উপর খড়ার ঘায়ের মতো পরেছে ওষুধের বাজারের উত্তাপ। বেড়েছে ৫৩টি ওষুধের দাম। আরও বেশ কিছু বাড়ানোর প্রস্তাব জমা পড়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে।

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি,আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিকে দাম বাড়ার কারন বলছে কোম্পানিগুলো। বর্তমানে দেশে জেনেরিক আছে ১৬৫০ টি। সরকার নিয়ন্ত্রণ করে ১১৭টি। এই ওষুধের ভিতর ৫৩টি ওষুধের দাম পুননির্ধারণ করা হয়েছে। পাইপলাইনে আছে আরও ওষুধ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে,বর্তমানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৬৮.৫০%। এরমধ্যে ৬৪% ব্যয় হয় ওষুধে।

খাবারের দাম বাড়লে জনগন কম খেয়ে পুষিয়ে নিতে পারলেও ওষুধ ছাড়া বেঁচে থাকাই সম্ভব না। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে রোগীর কাছে ওষুধ সেবার উপাদান হলেও ব্যবসায়ীদের কাছে এটা একটা পণ্য। এ থেকে মুক্তির পথ বাতলেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তাঁর মতে দেশে প্রয়োজন স্বাস্থ্যবীমা এবং ১৯৮২সালের ওষুধ নীতিতে ফেরত যাওয়া। সব কিছু ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনও সভ্য দেশের নীতি হতে পারে না।

Latest posts by ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ (see all)

One response to “জনগণের স্বাস্থ্য দেখার দায়িত্ব কার?”

  1. দরকারি লেখা। ওষুধের পরিমাণ কমিয়ে, দাম বাড়িয়ে বাজারজাত করছে কোম্পানিগুলো। এ আরেক সমস্যা।

মন্তব্য করুন