তাজনিন মেরিন লোপা

৯ মার্চ, ২০২১ , ১০:৩৫ অপরাহ্ণ ; 137 Views

জেমি ও ট্রাগাস

তাজনিন মেরিন লোপার গল্প - ট্র্যাগাস - ৪

দুইদিন হলো জেলেনের বাসায় থাকছে ওরা। বাসায় জেলেন আর তার কুকুর ট্রাগাস। এই দুইদিনে ট্রাগাসের কেয়ারিং আর কথা বোঝার ক্ষমতা দেখে উষা, সান দুজনেই খুব অবাক। টিভিতে সাপের একটা ভিডিও চলছিল, কেউ খেয়াল করেনি জেমি ভয়ে সোফায় সেটে আছে সেটা দেখে। কিন্তু ট্রাগাস খুব অস্থির হয়ে ভুক ভুক আওয়াজ করতে করতে জেলেনের হাত থেকে টিভি রিমোট নিয়ে নিল। এরপর জেমির কার্টুন চ্যানেলে চেঞ্জ করে দিলো। ঘটনার পরে উষা খেয়াল করলো ভয়ে ছেলেটার মুখ লাল হয়েছিল। তারপর কতক্ষণ যে জেমি আর ট্রাগাসকে কোলে নিয়ে বসে ছিল উষা তার খেয়াল নেই।

জেলেন ট্রাগাসকে আদর করে বলল, ভেরি ব্রেভ এন্ড গুড বয় ট্রাগাস, আই ক্যান রিলাই অন ইউ। ডোন্ড অরি ওসা (এভাবেই উষাকে ডাকে সে) ডারলিং। এভরিথিং উইল বি ফাইন।

জেলেনের সাথে কথা বলতে বলতে তার শেকড় সম্পর্কে জানল ওরা। সে ইটালিয়ান, স্প্যানিস, অস্ট্রেলিয়ান আর ইউরোপের ডিএনএ বহন করছে। মানে তার দাদা প্রথম ইটালি থেকে অস্ট্রেলিয়াতে আসে। তার দাদি ছিলেন স্প্যানিস। তার মা বিয়ে করে একজন অস্ট্রেলিয়ানকে, যিনি অস্ট্রেলিয়ান এবরোজিনাল মানে এখানকার এথনিক কমিউনিটির। আর জেলেনের প্রেম হয় একজন স্কটল্যান্ডের ভদ্রলোকের সাথে। তাদের প্রায় পঁচিশ বছরের সংসার। তার স্বামী মারা গেছে চার বছর হলো। শুনে খুব খারাপ লাগলো। খুব মিস করে সে তার স্বামীকে। ছবি দেখালো তাদের। দুটো মেয়ে তাদের, ব্রীজবেনে থাকে। জেলেন একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। এখন নিজের মতো কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। তার মধ্যে উষাদের এই বাসার সাপের রহস্য বের করা একটা। এই বিষয়টা নিয়ে দুই বছর ধরে পড়ে আছে। এখনও কোন সমাধানে আসতে পারেনি। আর এর আগের ভাড়াটিয়াদের কাছ নাকি কোন সাপোর্টও পায়নি। লোকে ভাড়া নেয়, আর কয়দিন পর চলে যায়। কিন্তু কারোও কাছে কোন কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

জেলেন অদ্ভুত মানুষ, সকাল উঠে একবার খাবার খায়, আর সারাদিন কোন খাওয়া নেই। অনেক কাজ করে সে। এরপর রাতে খাবার খায়, ঘুমানোর আগে ট্রাগাসের সাথে প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলে। ট্রাগাসও মাথা নাড়ায় তার সাথে সাথে। এরপর ঘুমাতে যায়। উষারা না ঘুমানো পর্যন্ত ট্রাগাস জেমির সাথেই থাকে। মাঝে মাঝে ‘কালাকাকলি কিকিলি’ টাইপ কথা বলে। এর কিছুই বোঝা যায় না। ওইদিন মাঝরাতে উষা দেখে জেমি ঘুমের মধ্যে কম্বল ফেলে দিয়ে ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে আছে। আর ট্রাগাস এসে তার গায়ে কম্বল দিয়ে দিচ্ছে। কী অদ্ভুত বন্ধুত্ব!

জেলেন ট্রাগাসকে নিয়ে আসে চার বছর আগে, যখন থেকে সে একা হয়ে গেল। ট্রাগাস অস্ট্রেলিয়ান শেপার্ড আর সাইবেরিয়ান হাচকির ব্রিড। খুব অদ্ভুত একটা কুকুর। উষা আগে কখনোও এরকম কুকুর দেখেনি। মাথার দিকটা সাদা, গলার কাছে কালো, শরীরটা বাদামী, আবার পায়ের দিকে একটু সাদা আর কালো। কেমন যেন একটা মায়া তৈরি করে ফেলে। ট্রাগাস অর্থ কানের শ্রবণশক্তির একটা অংশ। এর কারণে কুকুররা সাধারণত বিশেষ শ্রবণশক্তির অধিকারী হয়। যার কারণে তারা প্রকৃতির সব ধরণের শব্দ শুনতে পায়, এমনকি অশরীরি কোনো শব্দও। আর ট্রাগাসের ঘ্রাণশক্তি অন্য কুকুরের চাইতে বেশি প্রবল আর মানুষের কথা বোঝার ক্ষমতাও। সেজন্যেই ট্রাগাস এতো কেয়ারিং আর সেনসেটিভ।

এই বাসায় ওরা খুব নিরাপদ বোধ করে। কোন অস্বস্তিও নেই। তবে অন্যের বাসায় আর কতদিন থাকা যায়। ওরা দুজনে এটা নিয়ে ভাবছিল, কিন্তু ওই বাসায় সাপ সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা যাচ্ছে না। এরমধ্যে বাসার এজেন্সির সাথে কথা হয়েছে। সাপের বিষয়টা উদ্ধার না হলে ওখানে কাউকে থাকার অনুমতি দিবে না। নতুন বাসা খুঁজে উঠতে সময় লাগবে। আর তাছাড়া ফার্নিচার নেয়ার জন্যও ঐ বাসায় ঢোকাটা নিরাপদ না বলে অনুমতি

অপেক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় নেই এখন।

এরমধ্যে জেলেন ওদেরকে ঐ বাসার আগের বাসিন্দা সম্পর্কে ধারণা দিলো।যা শুনে খুব ভয় পেয়েছে ওরা।রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কারও সাথে শেয়ার করতে না করেছে জেলেন। আগের বাসিন্দা জোসেফ জেলেনের কাছের এক বন্ধু। সাপ তার প্রিয় প্রাণী।অস্ট্রেলিয়াতে সাপ পোষা বৈধ। জোসেফের বাসায় দুইটা খুব বিরল জাতের সাপ ছিল।নাম ’ব্লু কোরাল স্নেক’, পুরো শরীরটা নীল, মাথা আর লেজেটা লাল।এই সাপই তো দেখেছে উষা।কি ভয়ঙ্কর! মানে সেই সাপ এখনোও রয়ে গেছে! জেলেন বললো জোসেফের দাবি ছিল সাপ দুটির ভেনম মানে বিষ ছিল না । তবে সাপগুলোকে কারই নিরাপদ লাগতো না।এই সাপ নাকি সহজে পোষ মানে না, ভীষণ হিংস্র ।জোসেফ কোনোভাবে আবিস্কার করেছে, নীল এই সাপটা বাচ্চাদের খুব পছন্দ করে।বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের বাচ্চাদের।উষার রীতিমতো কেঁপে কান্না চলে আসছিল এই কথা শুনে।সান বুঝতে পেরে একটু জরিয়ে ধরে বসলো। জেলেন বুঝতে পেরে খুব শান্তনা দিলো ওদেরকে।এই বাসায় থাকা অবস্থায় ওরা নিরাপদ, কোন সমস্যা হবে না।আর সাপদের পাওয়া গেলে ওরা বাসা নিতে চাইলে জেলেন সাহায্য করবে ওদের।একপ্রকার জেলেনকে যেন মায়ের মতো একটা ছায়া মনে করে।

জেলেন আরও বলল, নীল এই সাপ ছোট বাচ্চাদের পছন্দ করে কারণ মাসের একটা সময় যখন ভরা পূর্ণিমা থাকে তখন বাচ্চাকে কিছুক্ষণ পেঁচিয়ে ধরে রাখলে সাপটার শক্তি অনেক বেড়ে যায়। আর এই শক্তি মিশে যায় সাপের রক্তে।সেই রক্তের সামান্য পরিমাণ নিয়ে জোসেফ একটা নতুন ঔষধ বানাচ্ছে।যে ঔষধটা কেউ একবার খেয়ে সারারাত না ঘুমিয়ে জেগে থাকতে পারলে মৃত্যু তাকে আর স্র্শ করতে পারবে না। ভীষণ রকমের একটা অবৈধ গবেষণা, আশংকার আর ক্ষতিকরও।জেলেনের এই বিষয়টা খুব অবৈজ্ঞানিক মনে হয়েছিল, তাই প্রথমে গুরুত্ব পায়নি।তবে সে একদিন জোসেফের গোপন ফাইল পড়ে ফেলে।ওরা দুজন খুব ভালো বন্ধু, জেলেন কম্পিউটার বিষয়ে যে কোন সমাধান দিতে পারে।জোসেফের ল্যাপটপ একদিন কোনভাবেই ওপেন হচ্ছে না। জেলেনকে দেখাতে নিয়ে আসে সে।আর তখনই জোসেফের একটা আর্জেন্ট কল আসলে বের হতে হয়।জেলেন কোনোভাবে ল্যাপটপ ওপেন করে।সব ঠিকঠাক আছে কিনা, চেক করতে গিয়েই সাপের এই পুরো গবেষণার লেখা, ছবি পেয়ে যায।

এর কিছুদিন আগে জোসেফের নামে বাচ্চাদের ঠিকমতো কেয়ার না করার অভিযোগ আসে।জোসেফ বাচ্চাদের খুব পছন্দ করতো। সপ্তাহে দুইদিন চাকরির পর হাতে সময় ছিল।তাই সে সপ্তাহে তিনদিন তার বাসায় বাচ্চা রাখার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। সে জানায় যেসব বাবা-মায়েরা চাকরি করে। ডে-কেয়ারে বাচ্চা রাখার খরচে দিতে পারছে না। বা যেসব বাবা-মা অনেকটা অসহায়, সিঙ্গেল বাবা-মায়ের বাচ্চাদের সে বিনে পয়সায় দিনের বেলা, সন্ধ্যা পর্যন্ত রাখবে।এই বিজ্ঞাপনে অনেক পরিবার তার কাছে আসে। এর মধ্যে দুটো বাচ্চাকে রাখতে সে রাজি হয়।এই বাচ্চা দুটির বয়স ছিল তিন বছর আর চার বছর।এর মধ্যে চার বছরের বাচ্চাটা দুই সপ্তাহ পর থেকে আর আসতে চাইতো না। বাবা-মা তারপরও আরও দুই সপ্তাহ রেখে গেছে ওর কাছে। কিন্তু এরপর সে বেশ অসুস্থ হতে থাকে।তাই আর তারা বাচ্চাটাকে রেখে যায়নি।জেলেন এই বিষয়গুলি জানার পরে ঐ বাচ্চার ঠিকানা বের করে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখে।বাচ্চাটার আচরণ একবারে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। মানসিকভাবে স্থির ছিল না।দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিল আর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল।তবে দুই বছর পর অনেকটা স্বাভাবিক এখন সে পরিবারটিকে জানিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল সে।কিন্তু সাপের ঐ গবেষণার ডকুমেন্ট জেলেন কোনভাবেই সেভ বা কপি করতে পারেনি।কেন জানি সেটা হচ্ছিল না। প্রমান না থাকায় আর বাচ্চাদের ডে-কেয়ার রেজিট্রেশন না থাকায় অভিযোগ খুব একটা গুরুত্ব পায়নি তখন।

এর প্রায় ছয় মাস পরে তিন বছরের বাচ্চাটা যখন মারা যায়, তখন বিষয়টা তদন্তের গুরুত্ব পায। এরপর অভিযোগের ভিত্তিতে জোসেফকে গ্রেফতার করতে আসে পুলিশ।কিন্তু বাসায় ঢুকে জোসেফকে মৃত পায়। সাথে সাপ দুটির মৃতদেহ পায়।জানা যায় পুলিশ আসার পাঁচ ঘন্টা আগে জোসেফ মারা যায়, আর সাপগুলি আগেই মারা গিয়েছিল। বাসায় প্রায় হাজারখানেক ছোট্ট ওষুধের কন্টেইনারে লাল রঙ্গের ঔষধ পায়।জোসেফ পাঁচটা কন্টেনারের ঔষধ শরীরে নিয়ে রাতে না ঘুমানোর চেষ্টা করছিল।আর সেটা করতে গিয়ে মাতালের মতো আচরণ করছিল সে।রহস্যময় ব্যাপার হলো, শেষ পর্যন্ত সকালে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় তার।আর অনেক বেশি ঔষধ বানানোর নেশায় সাপের রক্ত নেয়ার জন্য সে নিজেই সাপগুলিকে মেরে ফেলে। এর মধ্যে একটা সাপকে মেরে ফেলার পরেও জোসেফকে হাতের কাছে পেলে ছোবল দেয়।এই সাপগুলি এইজন্যই মারাত্মক; কখনোও কখনোও মেরে ফেলার পরেও মাথাটা যদি থেতলে না দেয়া হয়, নাগালের মধ্যে কাউকে পেলে ছোবল দিয়ে দিতে পারে।আর এর ছোবলের এক মিনিটের মাথায় তার মৃত্যু হতে পারে।অথচ জোসেফ নিশ্চিত করেছিল সাপগুলির বিষদাঁত নেই।এই ঘটনার পর বোঝা যায় অনেক কিছুই গোপন করেছিল সে।দুইবছর ওই বাসা নজরদারীর মধ্যে ছিল।এক সময় নিরাপদ মনে হলে বাড়ির মালিকের অনুরোধে ভাড়া দেয়ার অনুমতি পায়।তবে নতুন ভাড়াটিয়া এসে কন্ট্রাক্ট থাকা সত্ত্বেও থাকছিল না।কোন এক রহস্যময় কারণে চলে যাচ্ছিল। উষারাই দুমাস ধরে আছে।

জেলেন এই সাপের রহস্যের কাজটা স্বেচ্ছাসেবক হিসাবেই নিজে থেকে করছে বলেই এ্যানথোনিও মানে তার ভাই অনেক রাগ করে আছে। এই কাজে তার মনে হয়েছে জেলেন নিরাপদ না।এই নিয়ে তাদের কথা কাটাকাটিও হয়েছে, তবে জেলেন এর সমাধান না করে ছাড়তে চায় না।এরপর থেকে এ্যানথোনিও অভিমান করে আছে বোনের উপর।এজন্যই এ্যানথোনিও জেলেনের সম্পর্কে ওইদিন কথা বলতে চায়নি উষাকে।এরমধ্যে একদিন ট্রাগাস একটু অসুস্থ বোধ করায় ওকে একদিন ভেটেরিয়ান হসপিটালে রাখা হয়। খুব খারাপ লগছিল সবার। বিশেষ করে জেমি একটু পরপর জিজ্ঞেস করছিল, ‘ট্রাগাস এখনোও আসছে না কেন মাম’! খুব চিন্তায় পড়ে গেছে সে। ঘুমাতেও খুব দেরি করছিল।

ভোরে উষার ঘুম ভাঙ্গলে হঠাৎ তাকিয়ে দেখে জেমি ওর বিছানায় নেই।কী এক আশংকায় উষার বুকটা হাহাকার করে উঠে।জেমি তো একা একা কখনোও ওয়াশরুমেও যায় না।সানকে উঠালো সে, দুজনে খুব অস্থির হয়ে খুঁজতে লাগলো জেমিকে।জেলেন হাঁটতে বের হয়েছে। বাগানের দিকে এসে জেলেনের প্যানথার ক্যাপটা পেল।এটা নিয়ে জেমি খুব খেলতে পছন্দ করে।তাহলে জেমি কোথায় গেলো! হঠাৎ উষার মনে হলো, ওদের বাসাতেই যায়নিতো জেমি।গতকাল ওর একটা হেলিকপ্টার প্রিয় খেলনার কথা বলছিল মাকে।কিন্তু ওই বাসায় এখন যাওয়া নিষেধ বলেছিল তার মা।

ওরা বাসার দিকে আসতে থাকে। এরমধ্যে জেলেনকে ফোনে পায়।সে ওদেরকে বাসাটার সামনেই থাকতে বললো।জেলেন ট্রাগাসকে নিয়ে আসবে আর স্নেক রেসকিউয়ারদের আর্জেন্ট আসতে বলবে।জেলেনের ধারণা ওই বাসায় আরও সাপ কোনভাবে লুকিয়ে আছে।এই সাপের ডিমও নাকি একটা দীর্ঘ সময় ভালো থাকে, তারপর উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে।বাসার সামনে গিয়ে পাগলের মতো উষা আর সান জেমিকে ডাকতে থাকে।ওরা জানেনা এই ডাক কাজে দেবে কিনা। কিন্তু বাবা-মা বাচ্চার এরকম বিপদের আশংকায় স্থির থাকবে আর কি করে?

দূর থেকে ট্রাগাসের আওয়াজ পায় ওরা। যাক একটু ভরসা পেল।এই সময় বাসার ভেতর থেকে আওয়াজ এলো- “মাম, স্নেক…” ।কিন্তু আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে কেউ তাকে চেপে ধরে রেখেছে! সান-উষা খুব অস্থির হয়ে গেল।উষা দরজার কাছে ছুটে গেল। কোনভাবে খুলতে পারে কিনা। সানও চেষ্টা করতে লাগলো।দরজার কাছেই ওরা জেলেনের ক্যাপটা পেলো।আর এর মধ্যেই ট্রাগাসে এসে প্যানথার ক্যাপটা মুখে নিয়ে সানের হাতে ভর দিয়ে এক লাফে বসায় উঠে গেলে। এর মধ্যেই স্নেক রেসকিউয়ার চলে আসলো; ক্রিস আর জ্যাক।ওরা ভেতরে ঢুকলে সান, উষা, জেলেন সবাই উপরে আসলো।ট্রাগাস ভীষণ চিৎকার করেই যাচ্ছে। কি আকুতি তার সেই চিৎকারে।এমন শব্দ এর আগে ওরা কেউ কখনোই শুনেনি।ট্রাগাসের আওয়াজ ধরে ওরা সবাই বেডরুমটায় এলো।ছোট বড়, নানান আকারের এতো সাপ ওরা এর আগে কখনোই দেখেনি।সবগুলোর মাথা, লেজ লাল আর শরীর নীল। তবে বাচ্চা সাপগুলি পুরোটা নীল।কি ভয়ংকর সে দৃশ্য।বিছানার উপরে সবাই জেমিকে ঘিরে আছে আর একটা বড় সাপ জেমিকে পেচিঁয়ে ধরেছেজেমির হাতে তার প্রিয় হেলিকপ্টার খেলনাটা!! কি করবে, উষা? এই দৃশ্য দেখে উষা ছুটে যাচ্ছিল জমিকে উদ্ধার করতে। কিন্তু বিষয়টা ভয়ংকর। সাপ ছোবল দেবে আর ছড়িয়ে গেলে ওদেরকে ধরতে পারাটা খুব মুসকিল হয়ে যাবে। ক্রিস আর জ্যাক ওদেরকে একটু দূরে থাকতে বললো।

“প্লিজ, স্টে কাম, জেমি উইল বি ওকে”,  ক্রিস বললো।

উষাকে ধরে রাখা সান আর জেলেনের জন্য বেশ কষ্টকর হচ্ছিল। এদিকে ট্রাগাস মুখের ক্যাপটা যেদিকে রাখছে সেদিক থেকে সাপ সরে যাচ্ছে। ক্রিস ওদের সাপ ধরার বক্সগুলি নানানভাবে পজিশন করে বসাচ্ছে। আর জ্যাক চারদিকে কিছু স্প্রে আর পাউডার ছড়িয়ে দিচ্ছে। যেগুলোর কাছে সাপ আর আসছে না। ট্রাগাস জেমির খুব কাছে পৌছে গেছে। হঠাৎ একটা বিশাল লাফ দিয়ে সে জেমির মাথায় ক্যাপটা দিয়ে দিলো, সাথে সাথে বড় যে সাপটা জেমিকে পেঁচিয়ে ছিল, ওকে ছেড়ে দিয়ে আরেকদিকে চলে গেল। অন্য সাপগুলিও সরে গেল। আর টাল সামলাতে না পেরে ট্রাগাস, জেমি কোলের উপরে পড়ে ধাক্কা খেয়ে দুজেনই বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেল। উষা প্রায় লাফিয়ে জেমির কাছে আসতে যাচ্ছিল; কিন্তু সান খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে। ছেলেকে বিপদ থেকে উদ্ধার চেষ্টায় উষাকে সে বিপদে ফেলতে পারে না। উষা ওখানটায় গিয়ে কিছুই করতে পারবে না। এরকম বিপদে মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত জরুরি। আবেগের বসে ভুল করলে বিপদ বেড়েই যাবে, দুজনকেই বিপদে ঠেলে দেয়া হবে তখন। উষার কান্না যেন থামছেই না। এরমধ্যে সাপগুলি সব ফোঁস ফোঁস আওয়াজ করতে করতে পেতে রাখা ফাদগুলিতে সুরসুর করে ঢুকে গেল। মনে হলো ভেড়ার পাল!

আর কোন সাপ নেই, এটা নিশ্চিত করলো ক্রিস আর জ্যাক। এরপর ওরা দুজনে বিছনার ওইপাশে গিয়ে জেমি আর ট্রাগাসকে পেল। দুজনে খানিকটা ব্যাথা পেলেও সুস্থ আছে। সান, উষা ছুটে এলো। উষা জেমিকে কোলে নিয়ে কোন কথা বলতে পারছে না। আদর থামাতে পারছে না। সান ওদেরকে জরিয়ে ধলো। জেলেন অনেক সান্তনা দিলো। জেমি কুই কুই করে ওদের পায়ের কাছে ঘুরছিল। জেলেন ওকে কোলে নিলো। সবাই এই ভয়ংকর বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়ার আনন্দ যেন ভাগাভাগি করে নিলো। জেমির হিরো যেন ট্রাগাস। আজ ট্রাগাস ছাড়া জেমিকে অক্ষত উদ্ধার করা খুব বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সবার জন্যই। বিশেষ করে ক্রিস আর জ্যাক বলছিল এই কথা। তাদের এই বিশ বছরের সাপ উদ্ধারের অভিজ্ঞতায় এরকম ঘটনা এই প্রথম। ওরা নিজেরাও ঘাবড়ে গিয়েছিল জেমিকে সাপরা এভাবে ঘিরে আছে দেখে। ব্যাপারটা ভীষণ ভয়ংকর ছিল কারণ একে তো এতোগুলো সাপ, তারমধ্যে এই সাপের ছোবলে দুই মিনিটই মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।

জেলেন সাপের ব্যাপারে অনেক কিছু জানে। খুব ছোটবেলা থেকেই ওর আগ্রহ সাপ নিয়ে। জেলেনের ক্যাপটায় এই প্যানথারটা ওর দাদী বুনন করে দিয়েছে। পারিবারিকভাবে শক্তির সিম্বল মনে করে ওরা প্যানথারকে। এর মধ্যে একটা কিছু কেমিকেল জেলেন দিয়েছে যা প্যানথারের সুতোর বুননে ঢুকে আছে। এটা কখনই চলে যাবে না। আর এইজন্যই সাপগুলি এই ক্যাপটার কাছে আসছিল না।

জেমি আর ট্রাগাস ভালো আছে। শরীর বেশ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। তবে ওদেরকে তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হলো। জেমির নিয়মিত চেকআপ আর কাউন্সিলিং চলছে। মানসিকভাবে খুব ভীত হয়ে গেছে সে। বাবা-মাকে ছাড়া থাকছে না। এমনকি ট্রাগাস কাছে না থাকলেই কাঁদছে।

অনেক দেখে ওরা একটা নতুন বাসায় উঠেছে। ট্রাগাসকে ছাড়া জেমি থাকতে পারছে না। তাই ট্রাগাসকে জেলেন ওদের কাছে দিয়ে দিয়েছে। প্রায় দিন দেখা হয় ওদের। ট্রাগাস ভীষণ লাফাতে থাকে জেলেনকে দেখে। জেলেনও অনেক আনন্দিত হয়। জেলেন একটা অস্ট্রেলিয়ান শেফার্ডের অর্ডার করেছে। সে যেহেতু একা থাকে তার একটা পোষা কুকুর লাগবেই। এবার জেলেন একটা মেয়ে কুকুর পছন্দ করেছে। তার কথা হচ্ছে, ট্রাগাস বড় হয়েছে, ওর তো একটা সঙ্গী লাগবে। নিজের ছেলের মতো ট্রাগাসকে মনে করে সে। কি মায়া!!

যেদিন নতুন পোষা কুকুরকে পেলো। ওইদিনই নিয়ে এলো উষাদের বাসায়। খুব সুন্দর সে। সুন্দরী এক নারী যেন। নাম রেখেছে এ্যামারিনা; অর্থ বৃষ্টি। নামটাও মিষ্টি। এ্যামারিনাকে দেখে জেমি লাফাতে লাফতে তার কাছে গেল। এ্যামারিনাও যেন জেমিকে আগে থেকেই চেনে। তবে ট্রাগাস মোটেও লাফালো না। এমনকি জেলেনকে দেখে ওর কাছে গিয়ে একটু দাঁড়িয়ে থাকলো, যেন একটু পারসোনালিটি দেখাচ্ছে!!

জেলেন আর উষা চা খেতে খেতে গল্প করছিলো বাগানের পাশে। এইসময় দেখলো জেমি ট্রাগাস আর এ্যামেলিনা দুজনের সাথেই খেলছে। জেমি মাঝে, আর ওরা ওকে ঘিরে লাফালাফি করছে। জেমি একটা বল নিয়ে দূরে ছুঁড়ে দিতেই দুজনেই ছুটলো ওটা নিতে। এক সাথে লাফ দিতে গিয়ে দুজনেই ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। আর এর একটু পরেই দুজনেই উঠে কাছে এলো। আর হঠাৎ করে দিলো ছুট। জেলেন আর উষা একটু যেন ভয় পেয়ে গেলো। কোথায় যাচ্ছে ওরা? কিন্তু না, ফিরে এলো দুজনই হাঁফাতে হাঁফতে। আসার পরেই দেখা গেলো, দুজনের বেশ ভাব হয়েছে। ওরা জেমির সাথেও খেলছে আবার নিজেদের মধ্যেও খেলছে। কুকুরের এরকম সেনসিভিটি উষার অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। অবশ্য ট্রাগাস আসলেই অনেক অলাদারকম।  

-“ থ্যাংস গড! আই ওয়াজ ওরিড এ্যাবাউট ট্রাগাস। হি ইজ এ থটফুল বয়, বাট ইটস গুড দ্যাট হি লাইকস হিজ গার্লফ্রেন্ড”

-“ ইয়েজ হি ইজ। আই এম রিয়েলি গ্রেটফুল টু ইউ এন্ড ট্রাগাস। ইউ আর গ্রেড ব্লেসিংস ফর মি” । মনে হলো যেন কোন মানুষ নিয়ে কথা বলছি আমরা।

এরমধ্যেই ট্রাগাস, এ্যামেলিনা আর জেমির ওদের কাছে আসলো। ওদেরকে ঘিরে খেলতে খুব মজা পাচ্ছিল ওরা। ট্রাগাস জেলেনের কাছে এসে কুইকুই করে কোলে উঠে গেল। কৃতজ্ঞতা আর ভালবাসা বোঝানোর চেষ্টা করছিল যেন।

সান বাসায় ফিরে সবাইকে দেখে খুশি। আজকে ক্রিস ডেকেছিল সানকে সবকিছুর আপডেট জানাতে। সান বললো, সাপগুলিকে গবেষণাগারে দেয়া হয়েছে। ব্যাপারটা খুব ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল। প্রথম সাপগুলিকে মারার আগে জোসেফ প্রায় একশোর মতো ডিম সংগ্রহ করে রেখেছিল। ভবিষ্যতের জন্য। তবে এগুলো সে ভীষণভাবে লুকিয়ে রেখেছিল। যা কোনভাবেই কোন টিম উদ্ধার করতে পারেনি। একটা দীর্ঘ সময় পর উপযুক্ত পরিবেশ আর আবহাওয়া পেয়ে ওরা ডিম ফুটে এক এক করে বার হয়েছে। এজন্যই তাদের আকার বড়-ছোট একেক রকম। ওই বাড়ির নানান জায়গায় মাটির নিচে ওরা আরও কিছু সাপের ডিম পেয়েছে। জোসেফ কিছু একটা দীর্ঘস্থায় ব্যবস্থা করে রেখেছিল,তাই সাপ কখনোই ওই বাসার বাইরে যেতে পারতো না। ওরা শীঘ্রই জেলেন সহ সবার জন্য একটা ‘এপ্রিসিয়েশন পার্টি ‘ আয়োজন করবে। এই ব্যাপারটা ওদের দ্বারা সমাধান না হলে অনেক ভয়ংকর হয়ে যেত।

জেমি খেলতে খেলতে দৌড়ে এসে “ড্যাড” বলে এক লাফে বাবার কোলে। সাথে ট্রাগাস আর এ্যামেলিনাও সানের উপরে লাফিয়ে পড়লো। আরেকটু হলেই সব পড়ে যাচ্ছিল ঘাসের উপরে। জেলেনের ’ছেলে’র বউ সানেরও খুব পছন্দ হয়েছে। সবার সাথে এ্যামেলিনাও ওকে দেখে আপ্লুত।।

শেষ

জেমি ও ট্রাগাস 1
Latest posts by তাজনিন মেরিন লোপা (see all)