দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ হিলিং

মুগ্ধতা.কম

১২ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৫৬ অপরাহ্ণ ; 656 Views

করোনার দিনগুলো: দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ হিলিং

রাজিয়া সুলতানা আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি লেখক। তিনি সেখানকার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে পরিবারসহ বসবাস করছেন এবং সেখানে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের দুঃসহ সময়ে লকডাউনে থাকাকালীন তিনি লিখছেন তাঁর সেইসব অভিজ্ঞতার কথা।


সেদিন আমাদের ব্যাকইয়ার্ডে প্রথম ড্যাফোডিলটাকে সূর্যের আলোয় হাসতে দেখে বোস্টনের জরুরি বিভাগের ডাক্তার এলিজাবেথ মিচেলের মতো আমারও মনে হয়েছিল পৃথিবীতে বসন্ত এসে গেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় –‘বসন্ত এসেছে দ্বারে।

পাতায় পাতায় একি শিহরণ নতুনের অভিসারে।‘  ইয়েস, নতুনের অভিসার এ যে!  কিন্তু সংশয়, আশঙ্কা আতংক কমছিল না। এরপর নিউ ইয়র্কে হাজার হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে শুরু করলে প্রতিদিন বুকে পাথরের ভার জমা হতে থাকে। যদিও বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।

এক বিকেলে মেয়েকে বললাম – ‘ভয়াবহ এক রোগে আক্রান্ত পৃথিবী।‘

মেয়ে বলল –‘রোগ নয় আম্মু, ব্যাধি, বিশৃঙ্খলা (disorder)।‘

মেয়ের রেস্পন্সটা ভালো লাগল। জিজ্ঞেস করলাম –‘ভয় করছে না তোমার?’ মেয়ে  বলল – ‘Who doesn’t fear death? But the world is healing.’ মেয়ে পড়ছে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি নিয়ে। মাস্টার্সের প্রথম বছরে। আসছে ফল ( Fall) সেমিস্টার থেকে সে সরাসরি পিএইচডি ডিগ্রির অধীনে চলে যাবে। মাস্টার্সের প্রথম বছরের প্রার্থীদের মধ্য থেকে প্রফেসরদের প্রথম ‘পিক’ ছিল ও।

নতুনদের চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দিতেই হবে। তাই আরো আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম –‘কী রকম?’ সে বলল –‘ আমরা সবাই শুধু ছুটছি আর ছুটছি। সময় যেন নেই কারও। প্রিয়জনদের কাছে পাই না আমরা।

তুমি কি ভেবেছিলে এই রমজানে আমি বাড়িতে থাকব?

করোনা না এলে আমি থাকতাম ক্যাম্পাসে।

সামারেও তো কোর্স করছি।

চারবছর পর এবার বাড়িতে একসঙ্গে রোজা করতে পারব আমরা।

তুমি এই সময়টা আমাকে মিস করো বলেছিলে। আমিও করি। সেই সুযোগ এসে গেল। এখন আমরা হোম কোয়ারেন্টিনে। একসঙ্গে কতকাজ করছি আমরা। সেই সুযোগটা এসে গেল।

অ্যাডাম আমাকে পেয়ে খুশি। আমারও ভালো লাগছে। আব্বুও খুশি।

বাইরে কিছু করতে না পারলেও ঘরে কোয়ালিটি সময় পার করছি আমরা। একসঙ্গে সবজি  বাগান করব এবার ভাবতে ভালো লাগছে।

মানুষ  লকডাউনে থাকায় শপিং মল, সিনেপ্লেস, স্কুল কলেজ, সব বন্ধ; তাতে পৃথিবী শুশ্রুশা পাচ্ছে।

প্রকৃতিরও তো ব্রেক প্রয়োজন।  আমরা শুধু নিয়েই যাই, দেয়ার কথা ভাবি না। দেখো, আমরা গাছপালা কেটে বন উজাড় করে দিচ্ছি। এ জন্য বন্যা হচ্ছে। মানুষ মরছে। নগরায়ন, শিল্পায়নের জন্য কত আবাদী জমি নষ্ট করে ফেলছি। বায়ূ দূষিত করে ফেলেছি। এসিড রেইন হচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকায় পৃথিবীর বরফ গলে যাচ্ছে। আমরা আমাদের পৃথিবীটাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি।

আমি কী ভাবছি জানো, যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যেত। যদি সবাই সবার মঙ্গল চাইতাম আমরা। তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ খেয়ে পরে বাঁচত। ডাইভার্সিটি বজায় রেখে যদি একটা আম্ব্রেলার নীচে সবগুলো দেশ নিজেদের এক মানবজাতি হিসেবে সরকার গঠন করত -তাহলে মানবতা রক্ষার জন্য মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীরগুলো উঠে যেত; ভালোবাসাই যদি আমাদের কাজ হতো, তাহলে ঘৃণার কাজগুলো থেকে মানুষ সরে আসত। এত হানাহানি, মারামারি, খুনাখুনি হতো না।

একটা সাউন্ড সোশাল সিস্টেম চালু করার জন্য যা যা করা দরকার- আমরা তা বুঝি কিন্তু মানুষ সমষ্টিগত চিন্তা থেকে সরে এসে বারবার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে মরিয়া হয়ে ওঠে। অথচ শেষ পর্যন্ত কী লাভ হয় বলো? পৃথিবী ছেড়ে তো একদিন চলে যেতেই হয়।  এই অহেতুক প্রতিযোগিতায় মানুষ সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়। এই রেসের ঘোড়ার লাগামটা যদি আমার হাতে থাকত, দেখতে আমি পৃথিবীটা সুন্দর একটা জায়গা বানিয়ে ফেলতাম। বছরে দুইবার লকডাউনের নিয়ম চালু করতাম।

সেই সময়টাতে মানুষ যেমন অবসর পেত, তেমনি পৃথিবীও জুড়াতো। পল্যুশন দূর করার জন্য এটা চমৎকার একটা ব্যবস্থা হতো। এখন যেমন হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ভূ-কম্পন কমে গেছে। ভারতে দূর থেকে তাজমহল, ঝলমলে তারাভরা আকাশ, শুকতারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মানুষ। কলকারখানায় ভারি শিল্প উৎপাদন বন্ধ এখন, যানবহনের জ্যাম নেই, তাই রাস্তাঘাটে  ধূলিকণা উড়ছে কম।

বিশ্বাস করতে পারো এখন ২০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা তারাদের খোঁজ মিলছে! এর বৈজ্ঞানিক কারণ জানো তো? এ যেন আমাদের স্বপ্নের সেই পৃথিবী যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ওহ! ভাবতে খারাপ লাগছে -লকডাউন শেষ হয়ে গেলে আমাদের পৃথিবীটা আর জুড়াতে পারবে না। আবার দূষণ শুরু হয়ে যাবে। প্রকৃতির ওপর আবার নির্যাতন শুরু হয়ে যাবে।  করোনায় মানুষ মরছে, আরো মরবে।

All these have been overdue,  ammu. It sounds bad but we are paying now for what we have done to our world. This is our earth; we did not take care of it on time. Now, nature itself is dressing us down, reprimanding us. That is how it is. Tough love, who won’t say? Can we really deny that? Let us not worry about death. Let us stay locked down. There is a way to escape Corona if we do everything right. Today or tomorrow doctors and scientists will come up with its vaccine but if we do not learn how to behave to save our own earth, there will be something new in future, some other kind of virus or germ to destroy us. We will be dumb not to learn from our mistakes.’

আমি নীরব শ্রোতা। আত্মজার কথাগুলো শুনে গেলাম শুধু আর ভাবলাম এদের মতো, এই নতুনদের মতো কেন চিন্তা করতে, পৃথিবীটাকে ভালোবাসতে শিখি না আমরা?

 

রাজিয়া সুলতানা

কবি, লেখক ও অনুবাদক।

জন্ম গাইবান্ধা জেলার সৈকতপাড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে তিনি অনার্স ডিগ্রি নেন। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সেখানে তিনি গণিত ও অন্যান্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনশেষে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। ভালোবেসে ভালো নেই তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন (২০১৫)। দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থের নাম হারপুনে গেঁথেছি চাঁদ (২০১৬) । সম্প্রতি ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ইংরেজিতে অনূদিত বাংলা কবিতার সংকলন পোয়েটিকস অব গ্রীন ডেল্টা য় তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। এছাড়া তার অনূদিত আরও দুটো বই-‘ইশিগুরো তিনটি বড় গল্প’ এবং স্লোভেনীয় কবি গ্লোরজানা ভিবারের নির্বাচিত কবিতাগ্রন্থ In Proximity of Silence এর অনুবাদ ‘নৈ:শব্দ্যের কাছাকাছি’। এই গ্রন্থটি স্লোভেনিয়া থেকে প্রকাশিত হয়।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •