পঞ্চগড়ে মুক্তিযুদ্ধ: বিজয় এলো যেভাবে

মো. লুৎফর রহমান

১৭ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৭:১৭ অপরাহ্ণ ;

পঞ্চগড়ে মুক্তিযুদ্ধ- বিজয় এলো যেভাবে

২৯ শে নভেম্বর ঐতিহাসিক পঞ্চগড় মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার বীর মুক্তিসেনারা ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সহায়তায় পঞ্চগড়কে পাকসেনাদের কবল থেকে দখলমুক্ত করতে সমর্থ হয়। পঞ্চগড়ের মাটিতে পাকিস্তানের পতাকা জ্বালিয়ে দিয়ে উড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা। বর্তমানে এই দিনটিকে মুক্তিযোদ্ধারা পঞ্চগড় মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে এই ঐতিহাসিক দিনটির কথা তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখনো জানে না।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা সৈয়দপুর, দশমাইল এসব এলাকায় পাকবাহিনীর তীব্র আক্রমনে টিকতে না পেরে পিছু হটতে থাকে। একাত্তরের ১৪ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধারা পঞ্চগড় জেলার সিএন্ডবি মোড়ে অবস্থান নেয়। ১৭ এপ্রিল পাকসেনারা ভারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে পঞ্চগড় আক্রমণ করে। এ আক্রমণে টিকতে না পেরে মুক্তিসেনারা পিছু হটে তেঁতুলিয়া উপজেলার মাগুরমারি এলাকায় অবস্থান নেয়। ওই দিন রাতেই চাওয়াই নদীর উপর ব্রীজে ডিনামাইট চার্জ করে ব্রীজটি উড়িয়ে দেয়। ব্রীজ উড়িয়ে দেয়ায় পাকসেনারা নদীর এপারে অমরখানা নামক স্থানে অবস্থান নেয়। নদীর এপারে পাকবাহিনী ওপারে মুক্তিবাহিনী। জুলাই মাসে প্রতিদিনই হয় খন্ড যুদ্ধ ও গুলি বিনিময়। চাওয়াই নদীতে ব্রীজ না থাকায় পাকসেনারা তেঁতুলিয়ার দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তেঁতুলিয়ার পুরো অঞ্চলই ছিলো মুক্তাঞ্চল।

মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড় ছিল ৬ নং (ক) সেক্টরের আওতাধিন। এ অঞ্চলে মোট ৭ টি কোম্পানির অধিনে ৪০টি মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ৬ নং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এম কে বাশার, স্কোয়াড্রন লিডার সদরুদ্দিন, ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার, লেফটেন্যান্ট মাসুদুর রহমান, লেফটেন্যান্ট আব্দুল মতিন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট হাসান আলী (আই ও), মেজর কাজিম উদ্দিন, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুব আলম এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগীতা ও পরামর্শ দেন তৎকালীন সংসদ সদস্য মুজিবনগর সরকারের সিভিল এ্যাডভাইজার সিরাজুল ইসলাম।

২০ নভেম্বর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর আর্টিলারি সহায়তায় ইপিআর, আনছার-মুজাহিদ ও মুুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে পাক সেনাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাটি অমরখানা ক্যাম্পে আক্রমন করে। যৌথ বাহিনীর আক্রমনে টিকতে না পেরে পাকসেনারা জগদল বাজার এলাকায় অবস্থান নেয়। পরে জগদলে টিকতে না পেরে পঞ্চগড়ে অবস্থান নেয়। ২৮ নভেম্বর শিংপাড়া, মলানি, মিঠাপুকুর এলকায় ডিফেন্স গড়ে মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত মাস মিত্র বাহিনীর সহযোগীতায় পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অমরখানা, জগদল, শিংপাড়া, তালমাসহ নতুন এলাকা হানাদার মুক্ত হতে থাকে। ২৮ নভেম্বর পঞ্চগড় সিও অফিস এবং একই দিনে আটোয়ারী ও মির্জাপুর মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা।

পাক বাহিনী মূলত ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শুরু থেকেই কার্যত মুক্তিবাহিনীর চতুর্মূখী আক্রমণের তীব্রতার মুখে পঞ্চগড় শহর থেকে অমরখানা ও তালমার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পঞ্চগড় এলাকায় তারা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ ব্যাটালিয়ন। নভেম্বর মাসের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পঞ্চগড়ে পাক সেনাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাটি অমর খানা ও পরে জগদল ছেড়ে পঞ্চগড়ের দিকে পালিয়ে যায় খানসেনারা। ২৬শে নভেম্বরের মধ্যে পঞ্চগড় শহরের চারদিকে ৭ম মারাধা, ২১ রাজপুত এবং ১৮ রাজপুত রাইফেল রেজিমেন্টের প্রায় ৩ ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য অবস্থান নেয়। ২৯শে নভেম্বর সকাল ৮টার দিকে শহরে প্রবেশের অনুমতি আসে। প্রতিটি কোম্পানী সেকশন ও প্লাটুন অনুযায়ী আসতে থাকে শহরের দিকে। প্যান্ট লুঙ্গি ও সাধারণ পোশাক পরিহিত, মাথা ও কোমরে গামছা জড়ানো মুক্তিযোদ্ধার দল কাধে স্টেনগান, রাইফেল, এস.এল.আর, এল.এম জি.ও ২ ইঞ্চি মর্টার ঝুলিয়ে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ও পুড়ে খাক হয় যাওয়া শহরে একের পর এক প্রবেশ করতে থাকে। কোন দিক থেকে কোন বাঁধা পায় না মুক্তিযোদ্ধারা। তবে কিছু কিছু ঘর বাড়িতে তখনও আগুন জ্বলছিল। বোঝা যায় কিছুক্ষণ আগেও পাকসেনারা শহরেই ছিল। দখলে আসে পঞ্চগড়। তবে তখনও সুগারমিল এলাকায় বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চলছে। পঞ্চগড় শহর তখন যেন শ্মশান ঘাট। ঘর-বাড়ি দোকান সব ভস্মিভূত। তখনও কোন রকমে টিকে ছিল লাল রঙ্গের টিনের থানা ভবন ও পার্শ্ববর্তী ডাক বাংলো। অসংখ্য পরিত্যক্ত ব্যাংকার পড়ে ছিল। হাজার হাজার নিক্ষিপ্ত গোলা উড়ে এসে আঘাত হেনেছে পঞ্চগড় শহরের মাটিতে। তারপর শুরু হয় পঞ্চগড় চিনিকল এলাকায় যুদ্ধ। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সাথে সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী প্রবল আক্রমণ গড়ে তোলে পঞ্চগড় চিনিকল এলাকায়। অবশেষে মুক্তিবাহিনীদের সাথে না টিকতে পেরে খান সেনারা ময়দানদিঘি, বোদা ও পরে ঠাকুরগাঁর দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এই যুদ্ধে চিনিকল এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর রশিদ। ২৯শে নভেম্বর মুক্ত হয় পঞ্চগড়। ধ্বনিত হতে থাকে ‘‘জয় বাংলা’’ ধ্বনি। পঞ্চগড় মুক্ত করার যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীর প্রায় ২৫০ জন হতাহত হয়। পাক সেনাদের মধ্যে ২০০ জন হতাহত হয় এবং ২৭ জনকে জীবিত আটক করা হয়। এ দিনটি পঞ্চগড়ের মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলবার নয়। তাইতো এ দিন এলেই তাদের কানে বাজে ‘‘জয় বাংলা’’ ধ্বনি। কিন্তু দেশের সূর্যসন্তানদের গৌরবের এই কীর্তি আজও অজানা রয়ে গেছে তরুণ প্রজন্মের কাছে। পঞ্চগড় মুক্ত দিবসে তরুণ প্রজন্মের কাছে এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার দাবি মুক্তিযোদ্ধাদের।

তথ্য সূত্র: বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমের ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ ও ড. নাজমুল হকের পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

মন্তব্য করুন