মুগ্ধতা.কম

২৯ এপ্রিল, ২০২০ , ৩:৫২ অপরাহ্ণ ; 348 Views

পরিক্রম

পরিক্রম

দোকানের কাছাকাছি আসতেই থমকে দাঁড়ায় বারেক শেখ। রাস্তার ওপাড়ে যে দোকানটার ঝাপ এতদিন বন্ধ ছিল, সেই দোকানে কাজ চলছে। দোকানটা ঠিক তার দোকানের উল্টো মুখে। বাজারের এই রাস্তাটা উঁচু হবার পর দোকানটা রাস্তা থেকে এক হাত নিচে চলে গেছে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় শরীরের ভার রাখতে না পেরে দেবে গেছে। বৃষ্টি হলে পানি আটকে যায়।

এর আগে প্রসাধনীর দোকান ছিল এটা, বার বার পানি উঠে কসমেটিকস নষ্ট হয়। শোকেজটাও পানি খেয়ে পঁচে গিয়েছিল নিচের দিকে। দোকান মালিক আব্দুল মতিন অতটা স্বচ্ছল না। এই এক দোকানের ভাড়া আর ছেলের চাকরির টাকায় কোন রকমে সংসার চলে তার। দোকান উঁচু করার কাজ ধরবার মত টাকা তার হাতে নেই।

প্রসাধনীর দোকানদার ফজল বার বার অনুরোধ করেছিল দোকান উঁচু করতে। আজ কাল করে একবছর কেটে গেলেও কাজ ধরার মত টাকা আব্দুল মতিনের হাতে আসে না। ফজল শেষে শর্ত দিল হয় দোকান উঁচু করে দিবে, নইলে এডভান্সের টাকা ফেরত দিতে হবে, ফজল এই দোকান ছেড়ে দিবে।

এডভান্সের বিশ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার মত অবস্থাও তখন মতিন মিয়ার নেই। শেষে আট মাস ভাড়া না দিয়ে এডভান্সের টাকা উসুল করে এই দোকান ছেড়ে পঁচিশ কদম সামনে আলাউদ্দিনের দোকানটা ভাড়া নেয় ফজল। এরপর গত ছয় মাস এই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ ছিল। হঠাৎ করেই দোকান মেরামতের কাজ চলতে দেখে উৎসুক হয় বারেক শেখ।

নিজের দোকান খুলে পানি ছিটিয়ে ঝাড়ু দিয়ে ক্যাশ খুলে পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট ক্যাশবাক্সে রাখে বারেক মিয়া। এটা তার অনেক পুরনো অভ্যেস। সকালে ক্যাশে টাকা রাখা লক্ষীর শুরু বলে তার বিশ্বাস। এই বাজারে গত তেইশ বছর ধরে তার ক্যাসেটের দোকান। পাশাপাশি ভিসিয়ার, টেপ রেকর্ডার, রেডিও, টেলিভিশন মেরামতের কাজ জানেন তিনি। অত্র এলাকার মেরামতের কাজ তার হাতে আসে।

নোয়াপাড়া বাজারের এপাশটায় বারেক শেখের দোকান থেকে একশ কদম দূরেই হাজী রফিকউদ্দিন স্কুল ও কলেজ। চারকোণা মাঠের উত্তর পশ্চিম পূর্ব দিকে যথাক্রমে প্রাইমারী স্কুল, হাই স্কুল আর কলেজের দালান। দক্ষিণ দিকটায় মেইন গেইটের দুই পাশে উঁচু দেয়াল করা, রাস্তা গেছে এদিক দিয়ে। প্রতিদিনই স্কুল কলেজের শত শত ছেলেমেয়ে এই বাজার দিয়ে যাতায়াত করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে বাজার।

মেরামতের জন্য আসা সাদাকালো টিভির পিকচার টিউবটা খুলে বাইরের দিকে ধরেন বারেক শেখ। টিউবটায় ফুঁটো হয়েছে একটা। মেরামত করে এটাই ঠিক করা যাবে, চলবে পাঁচ ছয় মাস। তারপর আবার তার দোকানেই আনতে হবে। নতুন পিকচার টিউব লাগানো হয়েছে বলে তিনশ টাকা আর মেকানিকের বিল পঞ্চাশ টাকা হিসাব ধরে তিনশ পঞ্চাশ টাকার বন্দোবস্তো হয়ে আছে তার।

পিকচার টিউবটা বাইরের দিকে ধরতেই আবার উল্টো পাশের দোকানটার দিকে চোখ যায় তার। সাদা লুঙ্গি আর ঢিলে সাদা পাঞ্জাবী পরা আব্দুল মতিন কাজের তদারকি করছেন। বাজার এখনো জমে উঠে নি, পিকচার টিউবটা রেখে রাস্তা পার হয়ে আব্দুল মতিনের পাশে যেয়ে দাঁড়ায় বারেক শেখ, ‘মিয়া সাব দোকান উঁচা করতাছেন নাকি?’

বারেক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। প্রশ্ন শুনে পাশ ফিরে তাকিয়ে বারেক শেখকে দেখে প্রশস্ত হাসি হাসে আব্দুল মতিন, ‘শেখ সাব কী খবর? আছেন কেমন?’

‘আল্লাহ রাখছে যেমন। দোকান ভাড়া হইছে?’

‘হ ভাড়া দিয়া দিলাম, ছয় মাস খালি থাকনে হাত টানাটানি গেছে খুব। তার আগের থাইকাই তো ফজল এডভান্স কাটা শুরু করছে। শেষ পর্যন্ত দোকানের একটা গতি হইল।’

‘এডভান্স কত টেকা দিছে পার্টি?’

‘তিরিশ হাজার এক মুঠে দিয়া গেছে। আরো দশ হাজার দিব দোকান উঁচা করনের পরে। মালদার পার্টি বুঝলা। পাঁচ হাজার টেকা ভাড়া দিব পার্টির নিজের মুখের কথা। আমিও দামদর করি নাই, পার্টি ভাল। ফজইল্লা তো আড়াই হাজার দিত।’

‘কিসের দোকান দিব মিয়া সাব?’

‘ঐ কি যেন নতুন চালু হইছে, ভিসিভি না ভিসিডি কি যেন। গোল ক্যাসেট। ঐগুলার দোকান দিব।’

‘মালদার পার্টি মিয়া সাব, টেকার হিসাব নাই। ভিসিডি কয় জনের ঘরে আছে? ধরা খাইয়া দেখবেন মাস ছয়েক পরে উইঠা গেছে।’

‘শেখ সাব তাগোর দোকান না চললে আমার তো কিছুই না। এডভান্সের টেকায় দোকান উঁচা করতাছি, তাগোর দোকান না চললে ভাড়ার টাকা এডভান্সের থেইকা কাইটা নিব। মাঝখান থেইকা আমার দোকান উঁচা হইয়া যাইতেছে। ওয়ান টুতে ভাড়া দেওন যাইব।’

দোকানে বসে পিকচার টিউবটা ঠিক করতে করতে নানান চিন্তা ভর করে বারেক শেখের মাথায়। শহরের অভিজাত এলাকায় ইতিমধ্যেই ভিসিডির দোকান চালু হয়েছে। সৌখিন লোকেরা ভিসিআর ফেলে সিডি প্লেয়ার আনছেন বিদেশ থেকে। গোল পাতলা চাকতির মত প্লাস্টিকের একটা চকচকে জিনিসে গান ভিডিও চলতে দেখে অবাক লেগেছে বারেক শেখের। অভিজাত এলাকার এই বাতাস শহরের এই প্রান্তেও লাগবে বলে চিন্তা হয় বারেক শেখের। আজকাল সাদাকালো টিভি ঠিক করানোর জন্য খুব একটা হাতে আসে না। নষ্ট হলে সাদাকালো বদলে রঙিন টিভি ঘরে তুলছে লোকেরা। গত কয়েক বছরে শহরে সাদাকালো টিভি একেবারে বিপন্ন হয়ে গেছে।

এতে অবশ্য ভালোই লাভ হয়েছে বারেক শেখের। নষ্ট-ভালো সাদাকালো টিভি তার দোকানে কমদামে বিক্রি করে দিয়েছে অত্র এলাকার লোকেরা। সেসব ঠিকঠাক করে মফস্বলের পাইকারদের কাছে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেছে সে। ঠিক তেমনি যদি ভিসিআরের মার্কেট সিডি প্লেয়ার দখল করে, নতুন করে পুঁজি খাটাতে হবে তার। এই এলাকাতেও কিছু ঘরে সিডিপ্লেয়ার এসেছে। বিশেষ করে যাদের বাড়ির কেউ বিদেশ থাকে, দেশে আসার সময় প্লেয়ার নিয়ে আসে। কেউ কেউ আসে সিডি আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে। না পেয়ে তারা অভিজাত এলাকা থেকে কিনে আনে।

মেকানিকের কাজ, ফিতার অডিও ক্যাসেট বিক্রি ও ভিডিওটেপ ভাড়া দিয়ে বেশ ভালই চলছে তার। তাছাড়া চারটা ভিসিআর আছে তার দোকানে, প্রতিদিনই ওগুলা ভাড়ায় যায়। ভিসিআর ভাড়া দিনে পঞ্চাশ টাকা আর ক্যাসেট ভাড়া বিশ টাকা। দুপুর বারোটার মধ্যে ফেরত না দিলে দশ টাকা এক্সট্রা চার্জ। দিনে পাঁচ ছয়শ টাকা ইনকাম হয়ে যায় তার সব মিলিয়ে। কিছুদিন আগে আরো বেশি ছিল, ডিশওয়ালারা এখন ডিশের লাইনে নতুন নতুন সিনেমা ছাড়ে। কেউ তার দোকান থেকে ভিডিও টেপ ভাড়া নিয়ে ডিশওয়ালাদের কাছে দিয়ে আসলে তারা কয়টা বাজে সিনেমা ছাড়বে বলে দেয়। সময়মত সবাই ডিশের চ্যানেল খুলে বসে থাকে। এজন্যে ভিসিআর এখন কম যায় ভাড়ায়৷ তবে কারেন্ট গেলে অন্য হিসাব, তখন আর সিনেমা দেখা হয়ে ওঠে না। এজন্যে ভিসিআর ভাড়া এখনো যায়।

টেপ রেকর্ডারে এন্ড্রুকিশোরের নতুন এলবামটা ছেড়ে চায়ে চুমুক দেয় বারেক। বাজার জমজমাট হয়ে গেছে। টেপ রেকর্ডারে নতুন এলবামের গান চালু রাখতে হয় সারাদিন। এরপরে আইয়ুব বাচ্চুর নতুন ক্যাসেট ছাড়তে হবে। কলেজের ছেলেমেয়েরা আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, মাইলসের গান বেশি পছন্দ করে। এসব ক্যাসেট মুড়ির মত বিক্রি হয়। তবে বারেকের পছন্দ এন্ড্রু কিশোর, কুমার সানু, উদিত নারায়ণদের গান। এদের গানে যে টানটা আছে সেই টান কি এই সময়ের কারো মধ্যে আছে? কিসব ব্যান্ড ফ্যান্ডের গান শুনে পাগল এখনকার ছেলেরা। বারেক শেখের কিঞ্চিৎ রাগ হয়, কিন্তু রাগ দিয়ে তো ব্যবসা চলবে না৷ এজন্যে ব্যান্ডের গানের ক্যাসেট শোকেজের উপরে সবার সামনে সাজিয়ে রাখে সে।

সন্ধ্যার পরে বাজারের ভিড় কমে যায়। একটু তাড়াতাড়িই দোকান বন্ধ করে বাড়িতে চলে যায় বারেক শেখ। হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’ আছে বিটিভিতে। দোকানে বসেই সে দেখতে পারে ইচ্ছে করলে, কিন্তু ঘরে বসে সবার সাথে দেখার আনন্দটাই অন্যরকম। ডিশের লাইনের দুইটা চ্যানেল ছাড়াও নতুন একটা চ্যানেল আসছে। নতুন নতুন অনুষ্ঠান দেখায় এরা। এই চ্যানেলের সংবাদের প্রশংসা সবার মুখে। এক ঝাঁক তরুণ সাংবাদিক সাহসী প্রতিবেদন করছে, নতুন ধাঁচের নাটক প্রচার করছে। তারপরেও ইত্যাদির জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি।

অনুষ্ঠানের মাঝে দশটার ইংরেজি সংবাদ চালু হলে টিভির সামনে থেকে উঠে খেতে বসে বারেক। দুই মেয়ে খেতে বসেছে তার সাথে। বড় মেয়ে এবার কলেজে ভর্তি হয়েছে। ভাল কোন সম্বন্ধ আসলে মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দেয়ার চিন্তা আছে। মেঝ মেয়েটাও গা ঝাড়া দিয়ে বড় হচ্ছে৷ ক্লাস নাইনে উঠে গেছে।

ছোট ছেলে ক্লাস ফাইভে উঠেছে এবার। এই সন্তানটি বারেকের বড় আদরের। সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে গেছে ছেলে। খাওয়া শেষে ছেলেকে দেখতে শোবার ঘরে ঢুকে বারেক। খাটের উপরে মশারি টাঙানো। মশারিটা ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে দুর্বল চোখে মশা খোঁজে বারেক। কাছের জিনিস একটু কম দেখে সে, প্লাস পাওয়ারের চশমা লাগে পত্রিকা পড়তে। তবে মশা তার চোখ ফাঁকি দিতে পারে না। ছেলের হাতের উপরে বসে থাকা একটা মশা চোখে পড়ার সাথে সাথে হাতের পাঞ্জায় মশাটা পিষে মারে বাকের। সেই হাত স্ত্রীর সামনে ধরে বলে, ‘ছেরাডারে মশায় খাইয়া শেষ কইরা ফালাইল, মশারি ঝাড়া দিয়া টানাইতে পারো না?’

‘ইত্যাদি’ শেষ করে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ঘুমাতে যায় বারেক। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে, ঘুম আসে না। পাশে তার স্ত্রী হা করে ঘুমাচ্ছে। স্ত্রীর একটা হাত তার বুকের উপরে পরে আছে। ঘুমন্ত মানুষের ওজন সম্ভবত বেড়ে যায়, বুকের উপরে চাপ অনুভব করে বাকের, কিন্তু হাতটা সরায় না। একটা শূন্য অনুভব জেঁকে বসে তাকে, দোকানের ভবিষ্যত নিয়ে একটা ভয় জেঁকে বসে তাকে। ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা লেগে আসে তার।

স্বপ্নে দেখে নদীতে ডুবে যাচ্ছে সে, কাছেই একটা নৌকায় বসে আছে তার স্ত্রী সন্তানরা৷ সে প্রাণপণে চিৎকার করছে, কিন্তু কেউ শুনছে না তার চিৎকার। ঘুমের মধ্যে গোঙায় বারেক। গোঙানোর শব্দ শুনে ঘুম ভাঙ্গে তার স্ত্রীর। আধো ঘুমে স্বামীকে হালকা ধাক্কা দেন আবেদা। ধাক্কা পেয়ে বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে বাম পাশে কাত হয়ে গোঙানো থামিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় বারেক। লুঙ্গি উঠে পশ্চাতদেশ উদোম হয়ে থাকে বারেকের। আবেদা লুঙ্গি টেনে স্বামীর বিভক্ত মহাদেশ ঢেকে দিয়ে ডান দিকে কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

ছয় মাস পেরিয়ে প্রায় বছর ঘুরে গেছে। বারেকের ভবিষ্যদ্বানী সত্যি হয়নি। আব্দুল মতিনের নতুন ভাড়াটিয়া বহাল তবিয়তে টিকে আছে। বরং ছয় মাস পরে এসে বেশ জমজমাট হয়েছে। নতুন ভাড়াটিয়া চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী মিন্টু তার দোকানে ঝকঝকে আলোকসজ্জা করিয়েছে। সেই দোকানের কাছে রাস্তার এপারের বারেক শেখের দোকান মুমূর্ষু মনে হয়। সারাদিন উচ্চ ভলিউমে সাউন্ড সিস্টেমে নতুন নতুন হিন্দি আর বাংলা ব্যান্ডের গান বাজতে থাকে। বারেকের টেপ রেকর্ডার বিট দেয় না, কিন্তু মিন্টুর সাউন্ড সিস্টেম তুমুল বিট দেয়। সেই বিট বারেকের বুকের ভিতরে কাঁটার মত লাগে।

বুকের কাঁটা গোপন রেখে উচ্চ ভলিউমে গান বাজানোর অপকারিতা এবং এ ব্যাপারে সমাজের সচেতন নাগরিকদের করনীয় বিষয়টি বুঝাতে এবং বিট বন্ধ করতে বারেক আব্দুল মতিনের কাছে বিচার দিয়েছে, কাজ হয়নি। বাজার সমিতির সভাপতির কাছে নালিশ করেছে, কাজ হয়নি। মিন্টুর বাবা একটু প্রভাবশালী। এলাকায় ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে যাওয়ার সাহস হয়নি, মিন্টু কমিশনারের চ্যালা সবাই জানে। বারেকের কিছু করার নেই, কিছুই করার থাকে না। বারেক বিরস বদনে বসে বসে অভিশাপ দেয় শুধু।

মিন্টুর দোকানে তরুণ যুবক বয়সী ছেলেমেয়েদের ভিড় লেগেই থাকে। দোকানের সামনে সমবয়সী ছেলেরা ধুমছে সিগারেট টানে, আড্ডা দেয়। কলেজের মেয়েরা দল বেঁধে দোকানে ঢুকে। বাজারে কসমেটিকস আর ষ্টেশনারী দোকান ছাড়া অন্য কোন দোকানে মেয়েদের এমন ভিড় আগে কখনো দেখা যায়নি। দোকানের দেয়াল জুড়ে সিডি ক্যাসেট সাজানো। টিভিতে চলে গানের ভিডিও।

এদিকে বারেকের ব্যাবসা দিন দিন কমতির দিকে। গণেশ এত তাড়াতাড়ি উল্টে যাবে ভাবতে পারেনি বারেক। রঙিন টিভির বিপ্লব ঘটেছিল দুই তিন বছর সময় নিয়ে, কিন্তু সিডি প্লেয়ার বিপ্লব তার থেকেও অধৈর্য্য। গত ছয় সাতমাসে ধীরে ধীরে সিডির চাহিদা বাড়লেও ইদানিং তা অতি বেশিই বেড়ে গেছে। বিভিন্ন শো-রুমে সাধ্যের মধ্যে দামে চায়নিজ সিডি প্লেয়ার বিক্রি শুরু হয়েছে। ভিডিও টেপের ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে আচমকা।

ইদানিং ভিসিআর একদমই ভাড়ায় যায় না। ভিডিও টেপ দিনে দুই/চারটার বেশি ভাড়া যায় না। টিভি টুকটাক ঠিক করাতে আনে লোকে তবে রেডিও টেপ রেকর্ডার বাজার থেকে উঠে গেছে। মধ্যবয়সী কিছু লোক এসে এখনো বারেকের দোকানে বসে, চা খায়, পত্রিকা পড়ে আর বারেকের সাথে ‘যুব সমাজ ধ্বংসে মিন্টুর দোকানের ভূমিকা’ বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেয়। তাদের আলোচনা শেষে প্রতিদিনই মিন্টু দোষী সাব্যস্ত হয়। কিন্তু মিন্টুর চুল বাঁকা করার ক্ষমতা তাদের কারো নাই।

বারেকের বউ মুখ বেজার করে প্রতিবেশী ভাবীদের বলেন, ‘শিউলির আব্বার ব্যবসা একটু মন্দ যাইতেছে। ঐ যে বাজারে মিন্টা দোকান দিছে না? এজন্যে। বাজারে শিউলির আব্বা এত বছর দোকানদারি করতেছে, মিন্টার কি উচিৎ হইছে বাজারে দোকান দেওয়া, আপনেই কন ভাবী। তার উপরে নিছস ভাল কথা, দোকানের সামনে দোকান নেওয়া লাগবো? বড় অশান্তিতে আছি ভাবী, শিউলির আব্বার মুখের দিকে চাওন যায় না।’

শিউলি কলেজ থেকে ফিরার পথে দুই দোকানের মাঝখান দিয়ে বাড়ি যায়। মিন্টুর সিডির দোকানে তার বান্ধবীরা ঢুকে, শিউলিরও ইচ্ছা করে যেতে। কিন্তু উল্টো পাশেই বাপের দোকান, দেখলে আস্ত রাখবে না। শিউলির আর সাহস হয় না। নতুন সব সিনেমা এখন সিডিতে আসে। তাছাড়া দশ/বারোটা ভিডিও গান একসাথে করে সিডিতে ছাড়ে। বান্ধবীদের কাছে সেই গল্প শোনে শিউলি। অথচ বাবা ক্যাসেটের দোকানদার হওয়ায় আগে সব সিনেমা শিউলির সবার আগে দেখা হইতো। তার গল্প সবাই শুনত।

শিউলি প্রথমে তার মা আবেদা বেগমকে ‘সিডি প্লেয়ারের উপকারিতা এবং কেন ঘরে একটি ভিসিডি প্লেয়ার প্রয়োজন’ সে বিষয়ে একটি সবিনয় লেখচার দিয়ে ব্যাপারটা মায়ের মাথায় ঢুকিয়ে দিল৷ আবেদা বেগম যতটুক বুঝল ততটুক স্বামীকে বুঝিয়ে বললেন। শুরুতে বারেক শক্ত অবস্থানে থাকলেও ব্যবসার অবস্থা খারাপ হতে চলায় একটু নরম হলেন। একদিন রাতে খাবার খেতে খেতে তারা সিদ্ধান্ত নিল একটা ভিসিডিপ্লেয়ার কিনে ঘরে এনে পরীক্ষা করা যাক। পরের সপ্তাহে বারেক একটা ভিসিডি প্লেয়ার কিনে আনলেন, কিন্তু ডিস্ক মিন্টুর দোকান থেকে কিনেন নাই, ডিস্ক অন্য এলাকা থেকে কিনে এনেছেন। ব্যাবসায় রাইভালি বলে তো একটা টার্ম আছে, তাই না?

ভিসিডি প্লেয়ায়ের জাদু বুঝতে বারেকের খুব বেশি সময় লাগল না। বারেক বুঝে গেল এটাই এখন নতুন আশ্চর্য, টিকে থাকতে হলে এটাই মেনে নিতে হবে। বারেক খবর দিল মফস্বলের পাইকারদের। দুই সপ্তাহের মধ্যে সব ক্যাসেট, ভিসিআর, টেপ প্লেয়ার পাইকারি দামে বিক্রি করে দিল। সেই টাকার সাথে জমানো কিছু টাকা মিলিয়ে দোকানের কাজ ধরল নিজের টাকাতেই। দোকান মালিক এডভান্স আর ভাড়া না বাড়ালে নতুন করে দোকানের কাজ করাবেনা সোজা জানিয়ে দিয়েছে।

দোকানে রঙ করে সিডির জন্য দেয়ালে নতুন করে তাক লাগানো হলো। সাউন্ড সিস্টেম কেনা হলো। পাটুয়াটুলি থেকে শত রকমের গানের আর সিনেমার সিডি কিনে আনা হলো। দুই মাসের মধ্যেই বারেকের দোকান যেন নতুন যৌবন লাভ করল। এলাকার লোকেদের মুখে বাঁকা হাসি আসলো, তারা মনে মনে বলল, ‘সিডির দোকান এখন দুইটা, এরা নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করলে সিডির দাম কমবে। লাভ তো আমাদেরই।’

মিন্টুর মত জমজমাট না হলেও বারেকের দোকান আগের থেকে মোটামুটি ভালই চলতে থাকে। মিন্টুর দোকানে যেমন তরুণদের ভিড় লেগে থাকে, বারেকের দোকানে অত ভিড় না হলেও মাঝ বয়সী কাস্টমারের চাহিদা আছে। মধ্যবয়েসী লোকেরা চেংরা মিন্টুর দোকানে লজ্জায় যায় না, বারেকের দোকানে আসে গরম ভিডিওর সিডি ভাড়া নিতে আসে। তাছাড়া বারেকের ওল্ড ইজ গোল্ড গানের সিডির কালেকশন মিন্টুর থেকে বড়। পেয়ার কিয়া তো ডারনা কেয়া, এক পারদেশি মেরা দিল লেগ্যায়া, কাভি কাভি মেরে দিলমে, পেয়ার হুয়া একরার হুয়া -এসব গানের মধ্যে হিট এলবাম কোনটা মিন্টু তার কি বুঝবে? এসব শুনেই তো চুল পেকেছে বারেকের৷

তবে নতুন সিনেমার চাহিদা সবচে বেশি। এই দিকেই বারেক ধরা। নতুন হিন্দী বাংলা সিনেমার খবর বারেকের কাছে থাকে না। পাটুয়াটুলি থেকে নতুন বলে যেটা ধরায় দেয় সেইটাই নিয়ে আসে। এজন্যে মাঝেমধ্যে বারেক কুশল বিনিময় করতে মিন্টুর দোকানে যায়। আড়চোখে মিন্টুর সিডির কালেকশন দেখে। চা খেতে খেতে শোনে কাস্টমার কি সিডি চায় মিন্টুর কাছে। পাটুয়াটুলি যেয়ে খোঁজ করে সেসব ছবির। এছাড়াও শিউলি আর পারুল ডিশের লাইনে ট্রেলার দেখে নতুন সিনেমার লিস্ট করে দেয় বাবাকে।

তবে সমস্যা হচ্ছে ছোকরা ছেলেগুলাকে নিয়ে। এরা যে কি সিডি চায় বারেক আগামাথা কিছুই বুঝে না। কেউ এসে বলে আঙ্কেল ফিফা আছে? কেউ বলে জিটিএ ভাইস সিটি আছে? কেউ বলে উইন্ডোজ এক্সপি আছে? কেউ বলে এন্টিভাইরাস আছে?

ভাইরাস থাকে মানুষের শরীরে এটুক বারেক জানে, সিডিতে কেন ভাইরাস খোঁজে ছোকরাগুলা তা বারেকের মাথার উপর দিয়ে যায়। কিন্তু ব্যবসা করতে হলে টেকনিক খাঁটাতে হবে কাস্টমারের সাথে। বারেক চশমাটা নাকের ডগায় এনে জিজ্ঞেস করে, ‘কি নাম বললা সিডির?’

‘আঙ্কেল NFS- Need For Speed’

‘ও আচ্ছা, এটা তো প্রচুর চলে, মার্কেটে সিডি শর্ট আছে এইটার, তুমি সিডির নাম আর কবে লাগবে তারিখ লিখে দিয়ে যাও, আমি আনায় রাখবো।’

বারেক পাইকারি মার্কেটে যেয়ে সেই নাম দেখিয়ে ডজনখানেক সিডি কিনে আনে৷ কাস্টমার ফেরানো যাবে না। পোলাপানও এক কাঠি সরেস, সিডি নিয়ে কম্পিউটারে ইন্সটল দিয়ে বারেকের দোকানে এসে বলে, আঙ্কেল NFS এর সিডিটা চলে না। এইটা বদলায়ে GTA vice city দেন। বারেক এত কিছু বুঝে না, সে বদলায়ে দেয়। মিন্টুর দোকানে এই ঘাপলা করতে পারে না পোলাপান। মিন্টু এই জিনিস জানে। এজন্যে ইতর পোলাপান বারেকের দোকানে যায়।

তারপরেও বারেকের অবস্থা ভালই চলছিল। বড় মেয়ে শিউলির বিয়ে ঠিক হয়েছে। সম্বন্ধটা বেশ ভাল। ছেলে বিদেশ থাকে। এখানে সম্বন্ধ হলে ছোট মেয়েটার জন্যেও চিন্তা থাকবে না, জামাই কোন একটা ছেলের ব্যবস্থা করে দিবে। তারপর ছেলেটাকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করতে পারলে আর কি চাই জীবনে।

এরমধ্যেই একদিন চাউর হলো মিন্টু মেয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। এলাকায় এই খবর বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে গেলো। আব্দুল মতিনের দোকানে সেই দোকানে পুনরায় ঝাপ নামলো। সমস্ত ঘটনা শুনে বারেকের আনন্দ আর ধরে না। সে বাজারে মুখ টিপে হাসে আর যাকে সামনে পায় চোখ টিপ দিয়ে বলে, ‘মিন্টার ঘটনা শুনছেন? ঘটনা তো ঘটায় ফেলছে।’

ঘটনা হচ্ছে মিন্টুর দোকানে কলেজের মেয়েরা যে ভিড় করত তা তো সকলেই জানে। এই ভিড়ের মধ্যেই মসজিদ কমিটির সভাপতির মেয়ে নাছরিনের সাথে মিন্টু লাইন করেছে। প্রেম বলতে মুরুব্বিরা শরম পায়, তাই লাইন বলে। নাছরিনের বাপের পাঁচতলা বাড়ি এলাকায়। চাউলের আড়ৎ আছে। এলাকায় বেশ সম্মানিত ব্যক্তি। নাছরিনের বাপ সিডির দোকানদারের সাথে মেয়ে বিয়ে দিবেন তা তো অসম্ভব।

প্রেম কি আর সিডির দোকানদার দেখে। তাছাড়া এলাকার ওসব চেংড়া সিডির দোকানদার বেশ চার্মি হতো। বডি ফিটিং শার্ট পোর্ট, শাহরুখ খান স্টাইলে চুল রাখত, হাতে সালমানের ব্রেসলেট লাগাইত। এগুলা ছিল ঐ সময়ের লো বাজেটের প্লেবয়দের স্টার্টার প্যাক। মেয়েদের মন তো কোন যুগে কেউই বুঝে নাই, তারা ঐসব চেংড়াদের প্রেমেই পড়ত। তার উপরে মোবাইল কোম্পানির সারারাত টকটাইম, বান্ডেল বান্ডেল মেসেজ দিয়েছিল সেই সময়ের ছেলে মেয়েগুলাকে প্রেম করার অপার স্বাধিনতা।

সেই স্বাধিনতার সুযোগ নিয়ে মিন্টু ভেগেছে নাছরিনকে নিয়ে। ইজ্জত গেছে নাছরিনের বাবার। লাভ হয়েছে বারেকের। বাজারে এখন বারেকের আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। এরমধ্যেই ধুমধাম করে শিউলির বিয়ে দেয়া হইল। বারেকের দোকান জমজমাট।

এই সুখ অবশ্য বেশিদিন বারেক শেখের কপালে সইল না। চার মাসের মাথায় একদিন সকালে বাজারে গিয়ে দেখে মিন্টু দোকান খুলে বসে আছে।

ঘটনা হচ্ছে মিন্টু কাজ পাকায় দিছে। নাছরিনকে ভাগায় নিয়ে বিয়ে করে একমাস কক্সবাজারে, একমাস সিলেটে আর দুই মাস যশোরে মামার বাড়িতে থাকছে। এর মধ্যেই কাজ পাকায় ফেলছে। নাছরিনের পেটে বাচ্চা শুনে নাছরিনের বাবার মন গলছে। একমাত্র মেয়ে আবেগে পড়ে যা করার করছে, মেয়ে তো আর ফেলায় দেয়া যায় না।

কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে আরো। নাছরিনের মেয়ের বয়স দুই বছর হয়ে গেছে। নাছরিনের বাবা নাতনিকে কোলে করে এলাকায় ঘুরে বেড়ান। নাছরিনের আবার পেট হয়েছে। ডাক্তার বলেছে মেয়ে হবে। ছেলে মেয়ে যাই হোক মিন্টুর দুঃখ নাই। বিয়ের পরে তার মধ্যে অনেক বদল এসেছে। রাতে নাছরিন হা করে ঘুমায় থাকে, দেখতে ভাল লাগে। ঘুমের মধ্যে মিন্টুর উপরে পা তুলে দেয়। মিন্টু পা সরায় না, তার ভাল লাগে।

সিডির ব্যাবসা একটু কমতির দিকে। বাজারে নতুন ফোন, এমপিথ্রি, এমপিফোর এসেছে। এখন মোবাইল এমপিফোরের ভিডিও দেখা যায়, এমপিথ্রিতে গান আর এফ এম রেডিও শোনা যায়। এগুলোই ছেলেমেয়েদের মধ্যে নতুন ক্রেজ। ব্লুটুথে দেয়া নেয়া হয় গান, ফানি ভিডিও।
তাছাড়া বাজারে চায়নিজ টাচস্ক্রিন নতুন সেট এসেছে। বিকট শব্দে গান বাজে ওগুলোতে। আর নিন্মবিত্তের হাতে পর্যন্ত ওসব চায়নিজ সেট পৌঁছে গেছে। কম্পিটার থেকে গান ভরতে আসে তারা। এক শ গান মেমরিকার্ডে ভরে দিলে পাঁচশ টাকা।

মিন্টো বুঝতে পারল টিকে থাকতে হলে বাজার ধরতে হবে। মিন্টো নিজের টাকা আর শশুরের থেকে ধার নিয়ে দুইটা কম্পিউটার কিনে দোকানে বসালো। সিডি সব পাইকারীতে বিক্রি করে শেলফে মোবাইলের চার্জার, মেমরিকার্ড, হেডফোন, কভার উঠালো। একটা কর্মচারি রাখল মোবাইল রিপেয়ার করাতে।

মাস ছয়েকের মধ্যে মিন্টোর দোকান জমে গেল। এক ডাটাকেবল কম্পিউটারের সাথে শত শত ফোনের সংযোগ ঘটিয়ে দিল। প্রতিদিনই চায়নিজ ফোন আসে রিপেয়ারে। চার্জারের পোর্ট জ্বলে যায় বেশিরভাগের। তাতাল দিয়ে ঘষেটষে পোর্ট ঠিক বলে মাদারবোর্ড গেছিল। সাত আটশ টাকা বিল করে দেয়। নকিয়া বাটন ফোনের দাম দুই হাজারের নিচে চলে এসেছে। সবার হাতে মোবাইল চলে এসেছে। সেই সাথে বেড়েছে মিন্টোর ব্যবসার পসার।

ওদিকে বারেক শেখের বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। পারুলের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলে বড় হয়েছে। মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। সিডির দোকানের অবস্থা যা তা। কেউ এখন আর সিডি তেমন একটা কিনে না। ডিশের চ্যানেলে সারাদিন একের পর সিনেমা চলতেই থাকে। দোকান ভাড়া বেড়েছে কয়েক দফা। দাম বেড়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের। দোকানের আয়ে চলছে না আর। এই বয়সে নতুন করে মিন্টোর মত শুরু করার স্পৃহা বা টেকনোলজির জ্ঞান কোনটাই আর নেই।

বারেক শেখ সিদ্ধান্ত নেন গ্রামে চলে যাবেন। ছেলেকে হোস্টেলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আবেদাকে নিয়ে গ্রামে জমি বর্গা দিয়ে কোনমতে চালিয়ে নেয়া সম্ভব। খরচের এই শহরে আর পারা যাচ্ছে না। দোকানের মালপত্র আসবাব বিক্রি করে প্রস্ততি নিয়ে ফেলেন। যাওয়ার দিন শেষ বারের মত বাজারে যান সবার সাথে বিদায় নিতে। সবার সাথে বিদায় নিয়ে বারেক শেখ এসে বসেন মিন্টোর দোকানে। চুল দাড়ি পেকে গেছে, চেহারা মলিন হয়ে গেছে। মিন্টোর দোকানের ঝকঝকে আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে আসে। মিন্টোর দোকান থেকে তাকিয়ে থাকেন তার জীবন যৌবন পার করে আসা দোকানের দিকে। ঝাপ বন্ধ দোকানটা কেমন মায়ায় ডাকছে তাকে। চোখ ভিজে আসে বারেক শেখের। পাঞ্জাবীর হাতায় চোখ মুছে লম্বা করে নিশ্বাস ছাড়েন বারেক শেখ। মিন্টো তার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘কাকা না গেলে হয় না?’

বারেক শেখ মলিন হেসে বলেন, ‘আর কেমনে হয় মিন্টো, তুমিও তো এই রাস্তায় হাইটা আসছ। তুমি তো জানোই।’

মিন্টো বারেক শেখের পাশে এসে বলে, ‘তা জানি কাকা। বাজারে অন্য কোন ব্যবসা করেন না হলে। আপনারে তো এলাকার সবাই চিনে।’

বারেক শেখ মাটির দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলেন, ‘না রে বাবা। এই বয়সে আর কিছুই ঠিকমত হইব না। তোমারে অনেক কষ্ট দিছি বাবা, প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছি, কিছু মনে কইরো না বাবা।’

মিন্টো বারেক শেখের হাত ধরে বলে, ‘কি যে বলেন কাকা। ব্যবসা ব্যবসার জায়গায়। কারো রিজিক কি কেউ নিতে পারে? আমি কিন্তু আপনারে কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবি নাই। আপনি যা করছেন নিজের ব্যবসার জন্য করছেন, আমার তো কোন ক্ষতি করেন নাই।’

বারেক শেখ উঠে দাঁড়ায়। মিন্টোর দোকান থেকে বেরিয়ে তার দোকানের বন্ধ ঝাপটার দিকে তাকায়। ঝাপটায় হাত রেখে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে হাটা শুরু করে বারেক শেখ। পেছন ফিরে তাকায় না, পেছনে অনেক মায়া।

অনেক সময় গড়িয়েছে। মিন্টো নাছরিনের বড় মেয়ে হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ছোট মেয়ে প্রাইমারীতে। নাছরিনের আবার পেট হয়েছে। এখনো আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়নি। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখেই কেটে যাচ্ছে নাছরিনের জীবন। মাঝে মধ্যে শুধু ঝগড়া হলে মিন্টোকে বলেন, ‘পাগলা কুত্তায় কামড়াইছিল যে তোরে বিয়া করছি, আজকে নইলে আমি রাজরানী হয়ে থাকতাম’

মিন্টোর ফোনের দোকান ভালই চলছে। তবে মোবাইলে গান ঢুকানোর ব্যবসাটা আগের মত নেই। এখন ইন্টারনেটের যুগ। সবকিছু নেট থেকে নামিয়ে নেয় লোকে। এছাড়া এক্সেসরিজের বেচাকেনা ভালই চলছে। তবে আগের মত আড্ডাবাজি নেই দোকানে। সিডির দোকানের মত মানুষের ভিড় নেই। হাই ভলিউমে গান বাজানো হয় না। মিন্টোর সংসারে কোন টান নেই। এভাবে বাকি জীবন পার করে দিতে পারলে মন্দ হয় না।

একদিন সকালে দোকানের কাছাকাছি আসতেই মিন্টোর চোখ পড়ে রাস্তার অপর পাশে বারেক শেখের দোকানের দিকে। দোকানটার ঝাপ খোলা। বারেক শেখ যাওয়ার বেশ কয়েকবার দোকানটা হাত বদল হয়েছে। শেষে এক টেইলার্সের দোকান ছিল। দুই বছরের ভাড়া আটকে এক রাতে মেশিন টেশিন নিয়ে পালিয়ে গেছে। কয়েকমাস বন্ধ ছিল দোকানটা। নোয়াপাড়া বাজারে এখন দোকানের অনেক চাহিদা। দোকানের এডভান্স আর ভাড়া বেড়েছে আলোর গতিতে।

মিন্টো জানতে পারল কি সব টেকনোলজিস আইটেম নিয়ে দোকান দিচ্ছে সামি নামের এক চব্বিশ পঁচিশ বছরের ছেলে। মিন্টোর মনে ভাবনা জেঁকে বসলো। তাহলে বুঝি আবার যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সব বদলাতে হবে।

কিছুদিনের মধ্যেই সামির নতুন দোকান সেট আপ হয়ে গেল। তিনটা ফটোকপি মেশিন সারিবেঁধে দাঁড় করানো। শোকেস ভরা মোবাইলের এক্সেসরিজ। মিন্টো যেখেনে পাতাল মার্কেট থেকে এক্সেসরিজ কিনে আনে, সেখানে সামি চায়না থেকে সরাসরি আনে। খরচ পরে মিন্টোর অর্ধেকেরও কম। মিন্টো যে দামে এক্সেসরিজ কিনে আনে, সামি সেই দামে বিক্রি করে। স্ক্যানার প্রিন্টার কপি থাকায় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের ভিড় বাড়তে থাকে। তাছাড়াও শেষ দিকে প্লাইউড দিয়ে খোপ খোপ ঘর করে সাইবার ক্যাফে বসানো হয়েছে।

মিন্টোর মনে হতে লাগল এখনি সময় চেইঞ্জ করার। দেরী করা যাবে না। মিন্টো লোন নিয়ে তার দোকান নতুন করে ডেকোরেশন করালো। চায়না থেকে এক্সেসরিজ এনে দেয়ার লোক ম্যানেজ করল। দুইটা ফটোকপি মেশিনের ব্যবস্থা করল। কিন্তু মিন্টোর দৌড় এখানেই থামল, কারণ সামি ওয়ার্ড-এক্সেল-ফটোশপের কাজ জানে। স্কুলের প্রশন, এলাকার সব ব্যানের পোস্টারের ডিজাইন, প্রিন্টিং করতে সামির দোকানে ভিড় লেগেই থাকে।

জমিতে পানি দিলে পাশের আগাছাও কিছুটা পানি পায়। তেমনি সামির ভিড়ের কিছুটা মিন্টোর ভাগ্যেও জুটে যায়। মোটামুটি করে মিন্টুর চলে যায়। কিন্তু ভয় থাকে মনে। এরপর, এরপর কী?

মিন্টোর মেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। নাছরিনের আবারো মেয়ে হয়েছে। তিন মেয়ে নিয়ে মিন্টোর ক্ষেদ নেই, কিন্তু নাছরিন আবারো প্রেগনেন্ট হতে চায়। তার একটা ছেলের শখ। মিন্টো তাকে বুঝায়, ‘মেয়ে কলেজে পড়ে, কিছুদিন পরে বিয়ে দিবা, এই বয়সে পেট হলে লোকে কি বলবে?’

নোয়াপাড়া বাজার এখন শহরের অন্যতম প্রধান এলাকা। সব ব্যাংকের শাখা খুলেছে। পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে এপার্টমেন্ট উঠছে। অনেক অফিস শোরুম হয়েছে। এই বাজারে এখন আর রাত হয় না। হ্যালোজেন বাতির আলোয় সারারাত ঝকঝক করে এই এলাকা। রাত দিন সমান কর্মব্যস্ত।

এরই মধ্যে একদিন সামিন দোকান ভাঙ্গা পড়ে। এই জমিতে এপার্টমেন্ট উঠবে। চোখের সামনে ভেঙ্গে ফেলা হলো পুরনো বিল্ডিংটা। এত বছর পরে হঠাৎ করেই মিন্টোর মনে পড়ল বারেক শেখের কথা। বুকের ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠে।
বারেক শেখের শেষ দিনের কথাটা মনে পড়ে, ‘তুমি তো একই রাস্তায় হেটে আসছ।’ মিন্টোর ভিতরের ভয়টা আবারো জেঁকে বসে। ‘রাস্তার শেষটা কী তবে বারেক কাকার মতই হয়?’, নিজেকেই প্রশ্ন করে মিন্টো।
লোকটা এখন কোথায় কেমন আছে কোন খোঁজ নেই। যাবার আগে ফোন নাম্বার দিয়ে গিয়েছিলেন বারেক শেখ। দোকানের ডায়েরিতে লেখা থাকার কথা। দোকানে ঢুকে ডায়েরি ঘেটে নাম্বার পেয়ে যায় মিন্টো। তিনটা রিং হবার পরে ওপাশ থেকে ফোন ধরে আবেদা। মিন্টো জানতে পারে বারেক কাকা আর বেঁচে নেই।

এক বছরের মধ্যেই অপরপাশের এপার্টমেন্ট উঠে গেল। সুউচ্চ এসব ভবনের চূড়ায় তাকাতে গেলে ঘাড় ব্যথা করে। সামি তার আগের পজিশনেই দোকান পেয়েছে। এবার সে দোকান কিনে নিয়েছে। প্রচুর টাকা খরচ করে দোকানের ডেকোরেশন করেছে। দোকানের সামনের অংশ গ্লাস দিয়ে ঢাকা। ভিতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। কাঁচের শোকেজ গুলো দেয়ালে ফিট করা। একদম সামনের দেয়ালে ঢাউস আকারের একটা স্মার্ট টিভি। ভেতরে শত শত মোবাইল সেট আর মোবাইল এক্সেসরিজ। হরেক রকমের হোম এপ্লাইয়েন্স। লেজার রেজার থেকে শুরু করে আইফোন পর্যন্ত।

এপাশ থেকে দেখলে মনে হয়না ওপাড়ে কোনকালে বারেক শেখ নামের একজন লোকের দোকান ছিল। জীবনের ত্রিশ বছরের বেশি যিনি কাটিয়ে দিয়েছিলেন সেই দোকানে। এপাশে দাঁড়িয়ে মিন্টোর চোখ জ্বালাপোড়া করে। রাতে ঘুম হয় না ভালো। ঘুমের মধ্যে বাজে স্বপ্ন দেখে, বোবায় ধরে, গোঙ্গাতে থাকে। সামির মত এত চাকচিক্যময় শো রুম করার সাধ্য তার নেই। এদিকে ব্যবসাও আগের মত নেই। এই ব্যবসাটা বদলে অন্যকিছু শুরু করতে হবে। এখনো সময় আছে। বারেক শেখের মত, ‘এই বয়সে আর কিছুই হইব না’ বলার সময় এখনো আসেনি।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে মিন্টোর। এসব ছেড়ে কোথায় যাবে? কিভাবে যাবে? এই বাজার-এই দোকানে জীবন যৌবন পার হয়েছে তার।
এখানে মায়া আছে, অদৃশ্য এক মায়া।

প্যারিস, ফ্রান্স থেকে