পাঁজরের বাল্বগুলো

হেলেন আরা সিডনী

৮ আগস্ট, ২০২০ , ৮:২২ অপরাহ্ণ ; 672 Views

পাঁজরের বাল্বগুলো - হেলেন আরা সিডনী

সুমি বারান্দার গ্রিলে দাঁড়িয়ে মুক্ত আকাশটাকে দেখে ভাবে কতো না বিশালতা নিয়ে জেগে আছে সে । ঝড়-বৃষ্টি-রৌদ্র, আলো-ছায়ার অপূর্ব খেলায় মাতিয়ে রাখে প্রকৃতি, মাতিয়ে রাখে জনজীবনের চলার পথ।

মানিয়ে নেওয়া আর মেনে নেওয়া জীবনে সকলে তাই অভ্যস্ত হয়ে পরে। কিন্তু সুমির চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে। প্রশ্নের ঝাঁকুনিতে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে চোখ বেয়ে। হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জানতে চায়, আচ্ছা কেন কেউ বুঝতে চায় না বা পারে না যে পাঁজরের অলি-গলি, এমনকি উপগলিটাও কোনো একদিন দারুণ নির্মমতার মধ্যে দিয়ে ফাঁকা হয়ে যায়। ভালোলাগার হৃদ পাঁজরের বাল্বগুলো ঢুলুঢুলু হতে হতে একদিন ছেঁড়া তারে নষ্ট হলে কষ্টের ঝুড়িতে ফেলে দিতে হয় নিজের হাতে। এলোমেলো ঝড়ো হাওয়ায় নিবিড়তার বুকে জমাট বাঁধা রক্তকে শিথিল করে নিয়ে সরে যেতে হয়। কেউ বুঝতে চায় না এমন দুর্ভাগ্যময় ভাগ্য বাসিন্দার জীবনগল্প।

যে সংসার জীবনের জন্য একটি মানুষ তার সুখ- শান্তি-আহ্লাদ এমনকি ভালোবাসাটুকু ত্যাগ করে নাড়ি ছেঁড়া ধনের দিকে তাকিয়ে বুকে আশা আর চোখে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ করার জন্য যখন যে কাজ পেয়েছে সেই কাজ করতে কুন্ঠা রাখেনি, কারণ সুমি জানে সৎ পথে থাকতে গেলে কষ্ট করতেই হবে। হায় কষ্ট, দাও আরো যতো পারো কষ্ট দাও। সারাটা জীবনের মতো সব সময় সুমি চাইবে সব কষ্ট, সব ত্যাগের বিনিময়ে ভালো থাক সকলে। সে কষ্ট কোনো কষ্ট না, বড় কষ্ট পেলো আজ। ওর নিঃসঙ্গ – একাকিত্বের সবটাই নাকি ছিল রং মেখে ঢং করা…বাড়িতে একাকি থাকা তাই তো সকলে চলে গেলো শুধু মাত্র আঁকড়ে পরে থাকা বাড়ির ভিটা থেকে বের হলো না বলে। না সুমি ভালো না..একটুও ভালো না। একটা মন্দ মেয়ে লোক এই তার স্বত:স্ফূর্ত প্রাপ্তি। সুমি এখন হাসে…হা..হা..করে হাসে, এতো সুন্দর পুরস্কার পাওয়ার পর আর কিছু পাওনা থাকে কি?

সুমি অবাক হয়ে ভাবে যা ঘটে যাচ্ছে তার চোখের সামনে তা রং বদলানো বিবেক বোধের নিশ্বাসে – প্রশ্বাসে বিষ ছড়ানো স্বার্থপরতার ঘৃণিত এক রূপ। তাকে ঘৃণা করে সুমি, ভীষণ ভাবে  ঘৃণা করে কারন সুমি নিজে কখনো স্বার্থের লেনদেনে জীবনের কোন সিদ্ধি লাভের কথা ভাবে নি, খুঁজেও নি সে পথ। অথচ রক্তের বিশ্বাসঘাতকতাকে তারি চোখের সামনে দেখে দেখে আজ সুমি সত্যি বড় ক্লান্ত। কোন লোভের মোহনা  টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওর রক্তের বাঁধনকে। আর কেনো এতো তাড়াতাড়ি জীবনের সুসভ্য সামাজিক উদ্যম, নিজের ব্যক্তি সত্তা হারিয়ে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন পতন স্রোতে ভাসিয়ে দেয় নিজের মূল্যবোধকে???

কতো না জল-কাদা, ঝড় -বৃষ্টি, মান-অপমানের প্রখর দাপটকে জীবনবাজী রেখে বুকের ভেতর ভালোবাসার শেকড়কে লুকিয়ে লুকিয়ে সামনে এগুনোর প্রবল এক চেষ্টার সময়ের প্রতীক্ষায় ছিল পথ চেয়ে থাকা। সে পথ জুড়ে যেন ঝরা পাতার মর্মরধ্বনি – প্রতিধ্বনিতে মুখরিত আজ।  নেই জীবনাস্পন্দন, নেই অন্তরাত্মার আনন্দ – উল্লাস, নেই কোনো ভালোবাসা আছে শুধু পথের বুকে শব্দহীন চিৎকার।

কতোটা দায়বোধ থেকে শূন্যতার আপনালয়ে ভালোবাসার শেকড়কে পূর্ণতার শেখরে সাজাবার স্বপ্ন আর আশায় বুক বেঁধে ছিল। মহান করুণাময় কেন এমন করলো তার ভাগ্যটাকে। তবে যা ছিল তা কি শুধুই দুঃস্বপ্ন। সুমির বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে….। বাহিরের চারদিকে ছুঁয়ে থাকা পাতলা আঁধারের সীমাহীনতা  ধীরে ধীরে চোখের গহীনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে ঘনীভূত করে সুমিকে টেনে নিয়ে যায় আগামীর দুঃসময়ের অন্ধকার গহ্বরে…..সুমি জানে না জীবনের চাওয়া – পাওয়া বিসর্জনের
অনাগত ভবিষ্যৎ তার জন্য আর কী উপহার রেখেছে…..

 

পাঁজরের বাল্বগুলো 1
Latest posts by হেলেন আরা সিডনী (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •