প্রশ্নবোধক

অঙ্কনা জাহান

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০০ অপরাহ্ণ ;

প্রশ্নবোধক

তন্দ্রা কয়েকদিন থেকে আকাশের কিছু বিষয় লক্ষ্য করছে যা তাকে দ্বিতীয়বার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভাবাচ্ছে।

বান্ধবী নিরা বারবার করে বলেছিল, ছেলেরা হলো ভ্রমরের মতো, যতদিন মধু ততদিন তারা আছে, যখন মধু শেষ তখন তারা হাওয়া।

তন্দ্রা পাত্তা দেয়নি নিরার কথায়। বরং নিরাকেই সংকীর্ণমনা বলেছে। যৌবন, মধু এই শব্দগুলো তন্দ্রা ভীষণ অপছন্দ করে। তবে আকাশের পরিবর্তনও সে মেনে নিতে পারছে না। একে অপরকে ভালোভাবে জানার জন্য একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। এতে দুজনের পরিবারই বাধ সেধেছিল। কিন্তু তারা কারো বাধা শোনেনি। নিজেদের জীবন নিজেরা যাপন করবে ভেবে বেছে নিয়েছিল লিভ ইন এর পথ।

কলিগ হিয়া বলেছিল, ভালোবাসা মানেই তো প্রিয় মানুষটির ভালো থাকাকে প্রাধান্য দেওয়া, তার পছন্দ-অপছন্দের মূল্যায়ন করা, পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ। পরস্পরকে যদি ভালোই বাসো তাহলে লিভ ইনে থেকে একে অন্যকে জানার কী আছে? যতটুকু জানো তাতে কি একটা জীবন পার করে দেওয়া যায় না?

স্মিত হেসে হিয়াকেও পাশ কেটে গেছে তারা। বেশ ভালোই যাচ্ছিল তাদের জীবন। দুজনে সারাজীবন একসাথে থাকারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই তো গতমাসে দুজনে মিলে প্ল্যান করছিল যে আকাশের চলমান প্রজেক্টটা শেষ হলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে নিবে। তখন পরিবার বা সমাজ কারোরই কিছু বলার থাকবে না।

সমস্যা শুরু হলো দিন পনেরো আগে আকাশের এক পিসি মারা যায়। সেই খবর পেয়ে সে গ্রামে গিয়েছিল। সেখান থেকে আসার পর থেকে আকাশ কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে, তন্দ্রার সাথে ভালোভাবে কথা বলে না। তন্দ্রা কিছু বললেও মেজাজ দেখায়। তন্দ্রা ভাবে পিসির শোকে এমন করছে সে।

কিন্তু দিন দিন তন্দ্রার প্রতি আকাশের বিরক্তি বেড়েই যাচ্ছে। যে আকাশ তন্দ্রার ন্যাওটা ছিল সেই এখন তন্দ্রা একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে পাশে বসলেও বিরক্ত হয়। যতক্ষণ বাসায় থাকে সারাক্ষণ ফোন নিয়েই পড়ে থাকে। তন্দ্রা কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে, তোমাকে সব বিষয়ে জানতে হবে না। এত প্রশ্ন করো কেন?

আকাশ একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখে তন্দ্রার মা বাসায় এসেছে। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে চা পান করছেন তিনি। আকাশ কোনো সৌজন্যতা না দেখিয়ে বেডরুমে চলে যায়। তন্দ্রাও আকাশের পিছে পিছে যায়। ফিসফিস করে বলে, মাকে দেখে তুমি কিছু না বলেই ভেতরে চলে এলে? কী ভাববে মা?

-আমার প্রচন্ড মাথাব্যথা করছে, কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তোমার মা এসেছে তুমি গিয়ে গল্প করো।

শান্ত শীতল কণ্ঠে কথাগুলো বলল আকাশ। তন্দ্রাও আর কথা না বাড়িয়ে মায়ের কাছে চলে গেল। মা-মেয়ে আরও কিছুক্ষণ গল্প করার পর তন্দ্রার মা চলে গেল। মা চলে যাওয়ার পর তন্দ্রা ঘরে প্রবেশ করে দেখে আকাশ বাইরের কাপড় না ছেড়েই উপুর হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। তন্দ্রা আকাশের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, বাইরের কাপড়টা এখনো ছাড়োনি যে?

মাথা তুলে আকাশ বলে, মাথা ব্যথায় আমি মারা যাচ্ছি আর তুমি আছো বাইরের কাপড় নিয়ে? বাইরের কাপড় পরে বিছানায় শুলে কি তা অচ্ছুৎ হয়ে যাবে?

-তুমি জানো আমি এসব ছুৎ অচ্ছুৎ মানি না। দাও তোমার মাথা টিপে দেই, ব্যথা কমে যাবে।

-এসব আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। তোমার মাকে যেতে দিলে কেন? আজ তিনি থেকে যেতেই পারতেন।

সারারাত দুজনে মিলে গল্প করতে।

আকাশের কণ্ঠ শুনেই তন্দ্রা বুঝতে পারে তার মা আসাতে সে খুশি হয়নি।

-আকাশ তুমি দিন দিন কেমন বন্য হয়ে যাচ্ছ। আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করছ ইদানীং। আর আজ মায়ের সাথেও কোন কথা বললে না। কী হয়েছে আমাকে বলবে তুমি?

উঠে বসে আকাশ। বালিশে হেলান দিয়ে বলে- তোমাকে বলার কী আছে? তুমি তো ভালোই আছো? তোমার মা বাসায় আসছে, অফিসে যাওয়ার পথে তোমার বাবার সাথেও দেখা হয়। তোমার সবই ঠিক আছে। শালা, আমারই কিছু ঠিক নেই। বাবা-মা আমার মুখ দেখতে চায় না, ফোন করলে ফোন রিসিভ করে না, ভুলে রিসিভ করলেও কথা বলে না। তোমাকে তো কিছুই হারাতে হয়নি তাই তুমি বুঝবে না। আমাকে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হারাতে হয়েছে। আমার পরিবারের একজন মানুষ মারা গেছে সেই কথাটাও তারা আমাকে জানায়নি। বুঝতে পারছো আমি তোমার জন্য কি হারিয়েছি? তোমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোই আমার জীবনের সব থেকে বড় ভুল ছিল।

আকাশের কথা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না তন্দ্রা। সে ভাবে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে।

অবাক বিস্ময়ে সে বলে, এসব কী বলছো আকাশ? আমি তোমাকে বাধ্য করেছি এসব করতে? আমি তোমাকে বলেছিলাম, শুরু করার আগেই শেষ করতে। আমাদের ধর্ম ভিন্ন, দুই পরিবারের জীবন দর্শন ভিন্ন। আমরা এক হতে পারবো না কখনো। কী বলেছিলে তখন তুমি? বলেছিলে, ভালোবেসে নিজের জীবনেই যদি এতটুকু পরিবর্তন আনতে না পারি তাহলে কিসের প্রগতিশীলতা, কোন অসাম্প্রদায়িকতার জন্য লড়াই করছি আমরা। ভুল তো সেদিন আমিও করেছিলাম তোমার কথায় মুগ্ধ হয়ে। তুমি বলছো, আমাকে কিছু হারাতে হয়নি। তুমি জানো আমি কি কি হারিয়েছি? আমার বাবাকে প্রতিদিন অফিসে, পাড়ার রাস্তায় কত কথা শুনতে হয়, কতটা হেনস্থা হতে হয়? আমার মা বাসা থেকে বেরনো বন্ধ করে দিয়েছে মানুষের কথায়। মানুষের কথা সহ্য করতে না পেরে বাবা আমাকে ত্যাজ্য করার জন্য আইনী প্রসেস করছে দেখে মা আজ এসেছিল আমাকে ফিরিয়ে নিতে। তোমার কথা ভেবে আমি মাকে ফেরত দিলাম। আর তুমি কি না এসব কথা বলছ?

বিছানা থেকে নামে আকাশ। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলে তাহলে, আছ কেন এখনো? যাও। আর আমাকেও মুক্তি দাও।

আকাশের শার্টের কলারের নিচটা চেপে ধরে তন্দ্রা বলে, এই যদি তোমার শেষ কথা হয় তাহলে আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করলে কেন?

কলার ছাড়িয়ে নিতে নিতে আকাশ বলে, তোমার জীবন নষ্ট হওয়ার কী আছে? চেহারা-ছুরত তো ভালোই তোমার। চাইলেই আমার মতো যে কাউকে পটাতে পারবে। আর হ্যাঁ এবার নিজের ধর্মের কাউকে পটিও তাহলে সুখে থাকতে পারবে।

এই কথা শোনার পর তন্দ্রা পাগল প্রায় হয়ে যায়। আকাশের বুকে এলোপাথারি কিল ছুড়তে ছুড়তে বলে, কী বললে? আমি তোমাকে পটিয়েছি? যে কাউকে পটাতে পারব? আমার ভালোবাসার কোন দাম নেই তোমার কাছে?

তন্দ্রার দুহাত চেপে ধরে আকাশ বলে-আমার জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়ে এখন ড্রামা করছ? যত্তসব!

তন্দ্রাকে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় সে। কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে পেছনে ফিরে দেখে ড্রেসিং টেবিলের এককোণায় পড়ে আছে তন্দ্রা। তার হাত লেগে কয়েকটি কসমেটিকস মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আবারও ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে কী ভেবে ফিরে আসে তন্দ্রার কাছে। তন্দ্রার হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে। তন্দ্রা ওঠে না, মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আকাশ দেখে তন্দ্রার মাথার পেছন দিক থেকে টকটকে লাল রক্তের স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছে।

পরদিন সকল নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ প্রচারিত হয়- অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে তরুন-তরুণীর মরদেহ উদ্ধার।

মন্তব্য করুন