বই থেকে আলোচনা : পতিত চিনার : আমি ডুবতে রাজি নই

মুগ্ধতা.কম

২৩ মার্চ, ২০২০ , ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ ; 1097 Views

বই থেকে আলোচনা : পতিত চিনার : আমি ডুবতে রাজি নই

পতিত চিনার

বই : দ্য ফ্যালেন চিনার : আই রিফিউজ টু সিঙ্ক

কবি : মাশুদ রাথার

মূল :রিয়াজ মির

অনুবাদ : রেজাউল ইসলাম হাসু

প্রকাশক : লিপার পাবলিকেশনস (শ্রীনগর)

প্রকাশকাল : ২০১৮

পৃষ্ঠা : ৫৬

 

দ্য ফ্যালেন চিনার : আই রিফিউজ টু সিঙ্ক জম্মু ও কাশ্মীরের আঠারো বছরের তরুণ কবি মাশুদ রাথারের প্রথম কবিতার বই। বইটি সহিষ্ণুতার সঙ্গে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শেষ করা যেতে পারে। তবে কীভাবে একজন তরুণ বিবিধ জটিল বিষয়গুলোকে এমন নান্দনিকতার সঙ্গে কবিতাময় করে তুলেছে তা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।

কবিতার ছন্দবিন্যাস, অবয়ব এবং ট্রানসফার অব সাইনের (উৎপ্রেক্ষা, অলংকার ও অনুপ্রাস গুণাবলি) মতো মৌলিক পরিমিতিগুলো আমাদের হৃদয় ও মনকে আন্দোলিত করে। এগুলোকে মাঝেমধ্যে শব্দের খেলা বলা হয়ে থাকে। কেননা, তার কাব্যিক দক্ষতা, আঞ্চলিক ভাষার সদ্ব্যবহার এবং কল্পনা, যা আত্মাকে অস্বাভাবিক যাত্রায় নিয়ে যায়।

সত্যিকারার্থে কবিতার আকৃতি এবং কৌশল নিয়ে বিশ্লেষণ করলে নিখুঁতভাবে দ্য ফ্যালেন চিনার কোনো কবিতার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। তবে অধিকাংশ কবিতায় প্রকাশের সৃজনশীলতা অনন্য এবং এই তরুণ কবির স্পষ্টতা এবং শক্তিমত্তা যেন কাব্যিক আকাক্সক্ষাকেই প্রতিফলিত করে। কবিতাগুলোর ভেতর জার্নি করার সময় গভীরভাবে বিশ্বাস করা যায় না যে, কবি একজন আঠারো বছরের তরুণ। তিনি তাঁর কবিতায় কিছু পরিপক্ব অভিজ্ঞতা এবং বিস্তৃত কল্পনার জগতকে কিছুটা অপ্রথাগত অভিব্যক্তির সাথে তুলে ধরেছেন।

কবি মনে হয় এমন একজন সংবেদনশীল মানুষ, যিনি তার চারপাশের সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তারপর তাঁর কল্পনার জগতকে কবিতায় অনুবাদ করছেন। দ্য ফ্যালেন চিনার তার অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতিগুলো সিরিয়াস প্রক্রিয়াকরণের প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে। প্রতীকী প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে তিনি চিনার এবং এর পরিণতি সম্পর্কে লিখেছেন :

 

ঋতুরা এলো

আর চলে গেলো

যেন চোখ থেকে

অদৃশ্য হয়ে গেলো

তারপর

ছুতারের সঙ্গে দেখা হলো

যেন কাঠঠোঁকড়ার খোদাই করা

তার গল্পগুলো

 

শৈশবকালের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেবার মতো দায়েব এই বইয়ের একটি সুন্দর কবিতা। দায়েব কাশ্মীরের পুরনো বাড়িগুলোতে বারান্দা হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং এর রেলিঙ স্পর্শ করতে চমৎকার লাগতো। মাশুদ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কীভাবে তিনি দাউবে দাঁড়িয়ে বাতাসে পা ঝোলাতেন এবং অবারিত প্রকৃতির সঙ্গে আনন্দময় মুহূর্তগুলো উপভোগ করার মিশ্র অনুভূতি লিখতেন :

নীল তারা

সোনালি চাঁদ

কর্ষিত মাটি

শুষ্ক মাঠ

ধূ-ধূ

যেন আমরাই

বেঁচে আছি শুধু…

সে উড়ে গেছে

দীর্ঘ পালক বেয়ে

এবং পালিয়ে গেছে

আমার কাছ থেকে

আমার দগ্ধ দৃষ্টি

দেখেছে তাকে

আমি মেঘে গিয়েছিলাম কবিতায় তরুণ কবি অলৌকিক কিছু অর্জন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাই তিনি নীলাকাশের গভীরে যেতে চান। প্রতীকীভাবে এমন একখানে, যেখানে তিনি যেন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন প্রকৃতভাবে পৃথিবীতে কী ঘটছে।

আমার আত্মায় একজন মা পেয়েছি বইটির আরও একটি সুন্দর কবিতা। এটি একজন মায়ের কাছে নিখাঁদ ভালোবাসা এবং আত্মিক শ্রদ্ধাবোধ জানান দেয় আমাদের আত্মায়। কবির ভাষায় :

তারপর

দুঃসময়ে

আমার হৃদয়ে

একটি মোমবাতি জ্বলে ওঠে

তার উদ্ভাসন

আর আন্দোলন

দেখেছি আমরণ

এই দৃষ্টির রেখাতটে।

 

ঠিক পরের কবিতা বৃথা কান্না ছেলো হারোনো একজন মায়ের অন্তর্বেদনার প্রতিফলন এবং তার শোক বয়ে যাচ্ছে কিন্তু সব কান্না বৃথা হয়ে যাচ্ছিলো :

তুমি তল্লাশ করতে পারো না

কারণ তাদর উপাত্তসমূহ মুছে দিয়ে

তারা মরে গেছে।

বিষয়, চিন্তা ও কল্পনাগুলো পরিবর্তিত হয় অথবা এমন একটি পরিস্থিতি উপস্থাপন করে যা মাঝেমধ্যে আশাবাদ থেকে হতাশ্বাসের দিকে নিয়ে যায় কিংবা রাষ্ট্রের অন্ধকার থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করতে উদ্ভুদ্ধ করে। হয়তো কবি এই সমস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন অথবা তিনি সমাজে যা দেখছেন বা অনুভব করছেন তার বয়ান নিতে তিনি এত সংবেদনশীল? কবির মনে বিভ্রান্তি অথবা কবিতায় কোনো নতুন বিষয় উপলব্ধি করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

যেহেতু তিনি বয়সে খুব তরুণ, সেহেতু এত জটিল বিষয়ে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠা এবং কবি হিসেবে সেগুলো কবিতায় উপস্থাপন করাও একটি রূঢ় কাজ। চিন্তা ও কল্পনা-কলহের মুখোমুখি হওয়ার জটিলতা প্রকাশের জন্য যখন কবিতা বেছে নেওয়া হয় তখন অবস্তুগতভাবে তুলে ধরা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক আর কঠিন হয়ে যায়।

সুইজারিং কবিতায় কবি আশা ও হতাশার ঘূর্ণিপাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সুতরাং তিনি একের পর এক আশা এবং হতাশা, আস্থা এবং অবিশ্বাস, আনন্দ এবং বেদনা, ভালোবাসা এবং ঘৃণা, শান্তি এবং যুদ্ধের মতো শব্দগুলি লিখেছেন। বইয়ের অনেক কবিতায় বৈসাদৃশ্যের ধারণাগুলি দেখা যায়। মাশুদ রাথারের মতো এসব একজন তরুণ কবির কাছে অসাধারণ কিছু বলেই মনে হচ্ছে।

বইটিতে কিছু চমৎকার কবিতা রয়েছে যা আমাদের আবেগ, অনুপ্রেরণা এবং সংবেদনকে প্রভাবিত করে। কবিতাও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাশ্মীরের শরৎ, দ্য লিঙ্গারিং নাইট ইন মি, আজাদি।

কবি বিগত দুটো কবিতায় নির্যাতনময় কারাগারে বুনো উল্লাসের বিকৃত অনুভূতিকর কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এর নিকৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবিকে আরও নিপুণভাবে আঁকার চেষ্টা করেছেন।

লেট ট্র্যাজেডিস ড্যান্স একটি প্রতিনিধিমূলক কবিতা, যা তাঁর নিজস্ব সমাজের নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যু, যন্ত্রণা ও দুর্দশার বিষন্ন বয়ান এবং তিনি দার্শনিকভাবেই লিখেছেন-

আসুন, মৃত্যুকে আবার শান্তিময় করি

শেষ কবিতাটি কারো কারো জন্য কিছু আত্মবাচক জিজ্ঞাসার মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। কাশ্মীরের ভয়াবহ জীবনের জিজ্ঞাসা সবার কাছে। এমনকি অন্য কবি অথবা বেসামরিক মানুষের কাছেও তার একই জিজ্ঞাসা :

তুমি কি এখনও কবিতার আড়ালে আড়াল?

পিছনে হতাশা ও অন্তর্ঘাত!

এখনও কি জীবন রচনা করো

ঝরা পাতার মতো মুক্ত পতনের ঝড়ে?

 

বই এবং কবিতাটি ভয়ানক উদ্বেগের সাথে শেষ হয়েছে :

 

অনন্তকালের জন্য

আমি এখনই ঘুমোতে চাই

কেননা

আমি দাঁড়াতে পারছি না

যুদ্ধের বিষ্ঠায়

ততক্ষণ

তোমরা আমার মুখের ভেতর

জন্মহীন

মৃত্যুর সংজ্ঞা সন্ধান করো

 

কবির ভালো কাব্যিক দক্ষতা রয়েছে। তার কল্পনাশক্তি তার বয়সকে ছাড়িয়ে তাঁর সৃজনশীলতাকে আরও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। যারা অনেক জটিল অভিব্যক্তিতে সাধারণ অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাকে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন তাদের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় যারা সহজ অভিব্যক্তিতে লেখেন। সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই মাশুদ রাথারের সাহিত্যও পাঠকের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পাবার দাবি রাখে।

কবিতায় চেনাশোনার পরিমণ্ডলে স্বতন্ত্র হলে পৃথিবীকে জানা যায় ততটা, যতটা প্রচলিত বা প্রথাগত সমাজের কাছে যায় না। ভিন্নভাবে উপস্থাপনের সর্বোত্তম শিল্প প্রয়াসের জন্য শুভকামনা, মাশুদ রাথারকে।

 

অনুবাদক : তরুণ সাহিত্যিক। প্রকাশিত বই দুটো। এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ ও এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

One response to “বই থেকে আলোচনা : পতিত চিনার : আমি ডুবতে রাজি নই”

  1. GuexOxige says:

    Bnqrfz cialis achat internet forum https://bestadalafil.com/ – Cialis Xidihq Learn basic terminology combining forms and other word parts related to these systems. Lasix Online Pharmacy best cialis online Can help in identifying cause of pancreatitis e. Pawnkl https://bestadalafil.com/ – buying cialis online reviews

Leave a Reply

Your email address will not be published.