বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন

আনওয়ারুল ইসলাম রাজু

১৭ মার্চ, ২০২১ , ১২:০১ অপরাহ্ণ ; 428 Views

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন - আনওয়ারুল ইসলাম রাজু

‘ধন্য সেই পুরুষ/ যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে স্বাধীনতা/

ধন্য সেই পুরুষ/ যাঁর নামের ওপর ঝরে/মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’-

তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশ স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই মহান নেতার রাজনৈতিক দর্শন গভীর প্রজ্ঞাময় ও দূর দৃষ্টিসম্পন্ন। বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের কর্মকান্ডের মধ্যদিয়েই আমরা তাঁর রাজনৈতিক দর্শন উপলব্ধি করতে পারি।

বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ছিল, মূল্যবোধ ছিল, লক্ষ্য ছিল এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি আজীবন একনিষ্ঠভাবে এবং নিরলস কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতেই তাঁর একটি উদ্ধৃতি রয়েছে :

‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’।- এই উদ্ধৃতির মাত্র তিনটি বাক্যেই বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মপরিচিতি, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক দর্শন পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। এথেকে এটা স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু নিজেকে একাধারে মানুষ এবং তার সঙ্গে বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁর কর্মপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করছেন বাঙালি এবং মানব সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর ভালোবাসা। এই আত্মপরিচয় থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য : বাঙালি জাতিসত্তা, জনসম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সমাজতন্ত্র। অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের আরও অনেক বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করা যায়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখা দরকার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগ অংশই কেটেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুবই অল্প সময়ের জন্য সাড়ে তিন বছর তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি ব্যয় করেছেন ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং তারপর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বহুদিন সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের জন্য।

আর তাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এদেশের সোঁদা মাটির গন্ধ আর বাঙালি জাতির হাজার বছরের ভাষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সর্বোপরি স্বাধীনতার জন্য লালিত স্বপ্ন-আকাঙ্খা, সংগ্রাম-সাধনার ভিত্তিতে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ উপহার দেওয়ার প্রত্যয়ে প্রোথিত ছিল।

বাঙালির জাতীয়জীবনের সুদীর্ঘ সময় কেটেছে পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ থেকে। নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে এ থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছে বাঙালি। কিন্তু কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক দর্শন এবং সুযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতিকে একটি প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছিলেন এবং তাঁর নির্দেশেই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে জাতির দীর্ঘ দিনের লালিত ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন’ পূরণ সম্ভব হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন মনে-প্রাণে বাঙালি। শৈশবেই বঙ্গবন্ধুর মানস-চেতনায় বাঙালি জাতির শৃঙ্খলমুক্তির আকাঙ্খা এবং রাজনৈতিক চেতনার বীজ প্রোথিত হয়েছিল। গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলন কিশোর মুজিবের মানসচেতনায় রোপণ করেছিল বাঙালিয়ানার বীজ। ১৯৩৯ সালে গোপালঞ্জ মিশনারীর স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে ভর্তির পর তিনি এ আন্দোলনে যুক্ত হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে ও বাঙালির মধ্যে জ্ঞান, শ্রম, একতা ও দেশপ্রেমের দীক্ষাদানের জন্য ১৯৩১ সালে গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলনের সূচনা করেন। গুরুসদয় দত্তের বাঙালিয়ানার মন্ত্র – ‘ষোলো আনা বাঙালি হ’/ বিশ্ব মানব হবি যদি/ শাশ্বত বাঙালি হ’- শোণিতে ধারণ করেই শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু- বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি । ব্রতচারী আন্দোলনের স্বদেশপ্রেম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা হৃদয়ে লালন করেই শেখ মুজিব প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদেন এবং বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের পুরোটা সময় ‘ষোলআনা বাঙালি’ হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন।

স্কুলজীবনেই নানা সমাজসেবামূলক কর্মকা- ও রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ সফররে আগত তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরিচয় ঘটে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত এ দুজন রাজনীতিবিদসহ বাঙালিয়ানার মন্ত্রে উজ্জীবিত সমসাময়িক অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার কর্ম ও আদর্শ তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় রূপ দেয়।

১৯৪৭ এর দেশবিভাগের পূর্বে মুসলিমলীগের হয়ে পাকিস্তান আন্দোলেনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন শেখ মুজিব। তবে এক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর বাঙালি আত্মপরিচয়, স্বকীয়তা এবং তা নিয়ে গর্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, সে সময় জনসভায় পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি উত্থাপিত করতেন লাহোর প্রস্তাবের ধারণায়, দুটি মুসলমান প্রধান সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে :

‘পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা পশ্চিম পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে।’

কিন্তু মিস্টার জিন্নাহর ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে লাহোর প্রস্তাবের বাস্তব রূপায়ন সম্ভব হয়নি।

বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি এবং নিজস্ব আবাসভূমির দাবিতে তিনি বরাবরাই ছিলেন সোচ্চারকণ্ঠ। দেশভাগের পর বাংলাকে বাদ দিয়ে একমাত্র উর্দ্দুকে পকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টাসহ বাঙালির প্রতি পশ্চিমা শাসকদের বৈষম্যমূলক আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে বাঙালি। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনসহ বাঙালির অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামের পুরোভাগে ছিলেন শেখ মুজিব।

১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আমতলায় সাধারণ ছাত্রসভায় প্রথম সভাপতিত্ব করেন তিনি। এবছরই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৫২-এর ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যার ঘটনার দিন শেখ মুজিব জেলে ছিলেন। ২৬শে ফেব্রুযারি মুক্তি পেয়ে ভাষা আন্দোলনে আরও সক্রিয় হন। ভাষা-আন্দোলনের ফলে তাঁর মধ্যে যে চেতনা জাগ্রত হয় এবং এর মাধ্যমে তিনি যে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করেন, তা তাঁকে স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানের শক্তি দান করে এবং তাঁকে অবতীর্ণ করে ইতিহাসের মহানায়কের ভূমিকায়।

ঔপনিবেশবাদী পাকিস্তানী শাসকদের বিভিন্ন শোষণের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য।

আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন: ‘পূর্ব বাংলার সম্পদ কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে কত তাড়াতাড়ি গড়া যায় একদল পশ্চিমা নেতা ও বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা গোপনে সে কাজ করে চলেছিল।… শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন, যে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে কোনো নজর দেওয়াই তারা দরকার মনে করল না।’

এই বৈষম্য ও শোষণ বঞ্ছনা থেকে মুক্ত করে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্টার লক্ষ্যে শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের কনভেনশনে ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ শিরোনামে বাঙালির মুক্তিসনদ ‘ছয় দফা’ দাবি ঘোষণা করেন।

ছয় দফার দাবিগুলো ছিল :

এক : সরকারের বৈশিষ্ট হবে ঋবফবৎধষ বা যৌথরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যৌথরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যারভিত্তিতে হবে।

দুই : কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় এবং তৃতীয় দফায় বর্ণিত শর্তসাপেক্ষ বিষয়।

তিন : পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময় করা চলবে। অথবা এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে।

চার : রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান দেয়া হবে। সংবিধানে নির্দেশিত বিধানের বলে রাজস্বের এই নির্ধারিত অংশ স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে জমা হয়ে যাবে। এহেন সাংবিধানিক বিধানে এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটি এমন একটি লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে যেন রাজস্বনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকে।

পাঁচ : যৌথরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে, সেই অঙ্গরাজ্যের সরকার যাতে স্বীয় নিয়ন্ত্রনাধীনে তার পৃথক হিসাব রাখতে পারে, সংবিধানে সেরূপ বিধান থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, সংবিধান নির্দেশিত বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে তা আদায়করা হবে। সংবিধান নির্দেশিত বিধানানুযায়ী দেশের বৈদেশিক নীতির কাঠামোর মধ্যে, যার দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে থাকবে।

ছয় : ফলপ্রসূভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সাহায্যের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের সুবর্ণফসল বাঙালির মহামুক্তির সনদ এই ছয়দফা। যার ভিত্তিতে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৯৭০এর নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন এবং ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ছয় দফার আন্দোলন পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ১৯৬৮ সালে ১ জানুয়ারি আইয়ুব খান শেখ মুজিব ও তাঁর সঙ্গীদের নামে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলে। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় গোটা বাঙালি জাতি। যার অনিবার্য পরিণতি ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। দুর্বার গণঅভ্যুত্তানের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে আইয়ুব খান ২২শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তিদান এবং ১৯৭০-এ সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। পরদিন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জানিয়ে বাঙালি জাতি এই মহান নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। সেদিন থেকে তিনি আর শেখ মুজিব বা নেতা-কর্মীদের মুজিব ভাই নন। হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

১৯৭০-এ সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে না দেয়ার হীন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা। ১৯৭১-এর ১ মার্চ অনির্দিষ্ট কালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধু তাদের দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে পূর্ববাংলার স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রত্যয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি উপনীত হয় মুক্তি মহামোহনায়। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষনা করেন : ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’। সেদিন বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার চূড়ান্ত আহ্বানটি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাও দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের কাছে লাল-সবুজ পতাকাকে মূর্তিমান করে তোলে। আর এরই মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই ঐতিহাসিক ভাষণের ধারাবাহিকতায় ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দিয়ে যান ।

শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ‘জয়বাংলা’ বলে বঙ্গবন্ধুর নামে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়।

পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদ- দেয়ার অপচেষ্টা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পরাজিত পাকিস্তান সরকার।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে যেকোন মূল্যে সমুন্নত রাখার সুদৃঢ় প্রত্যয় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পথে লন্ডনে বিবিসি বাংলাকে দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারেই বঙ্গবন্ধু বলেন :

“সাহায্যের প্রয়োজন আছে দুনিয়ার কাছ থেকে। কিন্তু এমন সাহায্য আমি চাইনা, যার দ্বারা আমার স্বাধীনতার উপর কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে। আমার দেশের স্বাধীনতা বিক্রি করে আমি কোন সাহায্য চাইনা।”)

১৯৭২এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে ফিরে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সমাবেশে অশ্রুসিক্ত চোখে জাতির উদ্দেশ্যে যে আবেগঘণ ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু তার মধ্যদিয়েও ফুটে ওঠে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য ক্ষুধা-দারিদ্র, শোষণ-বঞ্চনা মুক্ত সোনারবাংলা গড়ে তোলার উদাত্ত্ব আহ্বান।

“নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা, বাংলার মানুষ হাসবে বাংলার মানুষ খেলবে বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে এই আমার সাধনা এই আমার জীবনের কাম্য আমি যেন এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারি এই আশীর্বাদ এই দোয়া আপনার আমাকে করবেন।”

১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি যেমন ছিল স্বাধীনতার সুস্পষ্ট রূপরেখা, ঠিক তেমনি ৯ মাস পর ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের পর রেসকোর্সে দেয়া তাঁর ভাষণটি ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের একটি রূপকল্প। ওই ভাষণে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজের প্রতিই তিনি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সম্মিলিত উদ্যোগে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন বারবার। দৃপ্তকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশের পুনর্গঠন কাজ পরিচালিত হবে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং যুদ্ধবিদ্বস্ত দেশ পুণর্গঠনে সর্বতোভাবে আত্মনিয়োগ করেন।

বঙ্গবন্ধু মাটি ও মানুষের সুপ্ত শক্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্খাকে অবলম্বন করে শোষণ-বঞ্চনামুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ সোনারবাংলা গড়ে তোলা এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ উপহার দেওয়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বমানের একটি সংবিধান জাতিকে উপহার দেন। ১৯৭২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে শেখ মুজিব স্বাক্ষর করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি ভূখ- লাভ কিংবা পতাকা বদলের জন্য হয়নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সার্বিক মুক্তির আশায়। জনগণের এই আকাঙ্খা তথা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন মূর্ত হয়েছিল ১৯৭২-এর সংবিধানে।

এই সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে। বাংলাদেশের মূল সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রের এই চার মূলনীতিই মূলত: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, যা অর্জিত হয়েছে তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর এই রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির হীন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট শাহাদতবরণ করেন। এরপর ১৯৭২এর সংবিধান তথা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনকে ভূলুন্ঠিত করে পাকিস্তানী কায়দায় দেশ পরিচালনার অপচেষ্টা চলে । বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রার ইতিহাসে সূচিত হয় এক কারো অধ্যায়ের।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিকম আদর্শে উজ্জীবিত বাংলাদেশে এই অপচেষ্টা বেশিদূর এগুতে পারেনি। ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় মুছে দিয়ে জাতির জীবনে আলোর দিশারি হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সংগ্রামের হাল ধরেন তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আবারও শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার নিরন্তর সংগ্রাম। অব্যাহত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজযন্তীর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুকন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্ত তার কর্মময় জীবন ও রাজনৈতিক দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে উত্তরোত্তর উন্নতির সুউচ্চু শিখরে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বিনম্র শ্রদ্ধা এই মহান নেতার প্রতি ।#

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন 1
Latest posts by আনওয়ারুল ইসলাম রাজু (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •