যেদিন জেগেছিলো হৃদয়

শাহেদুজ্জামান লিংকন

৪ জুন, ২০২০ , ১২:২২ পূর্বাহ্ণ ; 675 Views

যেদিন জেগেছিলো হৃদয় - শাহেদুজ্জামান লিংকন

বরের দশদিন, কন্যার একদিন। হিসেবটা কান্নার। বিবাহোত্তর শোকপর্বের।

বন্ধুমহলের কানাঘুষা এ কান-ও কান হয়ে আমার কানে এসে পৌঁছায়। ‘শেষ পর্যন্ত তুইও?’ আমার হার মানা তাদের গলায় বুঝি হাঁড় হয়ে বিঁধে। যে দু-একজন আমার পক্ষ নেয় তারা বলে যে, বাকিরা ঈর্ষাকাতর। কিন্তু ঈর্ষার কারণ আমার কাছে ধোয়াশার মতো, অনেকটা অযৌক্তিক। আমার মুখ বন্ধ। আমিও দেয়ালবন্দী।

বিছানায় বসে আছি । পাশের রুমে রঙ্গিন পর্দায় কে কি দেখবে না দেখবে তাই নিয়ে হৈ-হুল্লোড়। অনেক দিনের বাসনা হঠাৎ আরো অনেককিছুর সাথে পূর্ণ হওয়ার আনন্দ। এর-ওর কথা মতো একেক রকম স্বাদ নিতে গিয়ে শেষাবধি কারো ইচ্ছাই পূর্ণ হচ্ছে না।

বাইরে মোটরসাইকেলের হর্ণের শীৎকার। বিশ্রী শব্দ। ছোটভাইকে মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সামনের এস.এস.সি. পরীক্ষার চেয়ে এই মুহূর্তে মোটরসাইকেল চালানো শেখা তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দকর তো বটেই, গর্বেরও। অগ্রগতির হিসেব সে প্রতিদিন পেশ করে। আমি একমনে শুনি অথবা শুনি না। ওর উচ্ছ্বাসে আমি তেমন আগ্রহ দেখাই না বলে ও শেষ পর্যন্ত চুপচাপ চলে যায়, তবে উদ্দীপনায় ভাটা পড়ে না। জীবনের এমন সময়ে আমার উদাসীনতার কারণ হয়তো তাকে হতবাক করে এবং সে নিজে হলে যে সারাদিন দুয়ার লাগিয়ে থাকতো, মুখে সারাক্ষণ হাসি লাগিয়ে রাখতো- এমনটাই হয়তো সে ভাবে। কিন্তু কোনো অবস্থার সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত, সেই অবস্থার অনুভূতি যে কখনোই কেউ ঠিকঠিক অনুভব করতে পারে না এটা-ই বা কে তাকে বোঝায়?

ফ্রিজে রাখা আপেল কেটে এনে সে সামনে ধরে। আমি একবার মুখ তুলে তাকাই। তাকানোর আগমুহূর্তের সামান্য সময়ে অনেকগুলো ঘটনা, দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যেদিন আমার মনে হয়েছিলো শ্যামলী পরিবহন সত্যি সত্যি আজ পরী বহন করছে, টাউন হলের প্রোগ্রামে ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ শুনে যে রাতে আমার ঘুম হয়নি, গতবছর বন্ধু কাজলের বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর হঠাৎ একটি কবিতা লিখেছিলাম। এমনি আরো অনেক ঘটনা। অনেক মুখ। নিজেকে সংবরণ করেছি বারবার আর তা নিতান্তই বাধ্য হয়ে। পাছে পুষতে গিয়ে নিজেই পিষ্ট হই। তবু অনেক অনেক ভালো লাগতো আমার। নেই, তবু যেন আছে। নিজের ইচ্ছেমতো ভাবনাকে সাজাতাম। কারো কোনো বাধা নেই। যাকে নিয়ে ভাবনা সে না জানলেও যেন চলে। বরং জানালেই সে অধিকারটুকু থেকেও বঞ্চিত হই। এইসব ঘটনা মনে করে আমি আশা নিয়ে মুখ তুলি। শতগুণ হতাশা নিয়ে দৃষ্টি ফেরাই। সে বলে, তাড়াতাড়ি ধরো। সিরিয়াল শুরু হয়ে যাবে।

আগামীর সম্ভাবনার প্রতি আস্থা দেখে আমি হতবাক হই। হয়তো এমনটাই বাস্তব যার মুখোমুখি হইনি বলেই আমার এমন বর্তমান। কতোগুলো সময় আছে যখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে হয়। এই এখন যদি আমি মরে যাই? আমি বোধহয় একবার বলেছিলাম এ কথা যে, আমি যদি মরে যাই? যদি তেমন কিছু করতে না পারি? কিন্তু লাভ হলো না কোনো। আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস ও অবিচল আস্থা এমন বক্তব্যকে নস্যাৎ করে দেয়। আমি আশ্বস্ত হতে পারি না শুধু। ‘যদি’ আর ‘কেন’ নামের রোগ ধরে বসে। কেন আমাকে নিয়ে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসী বুক ফোলাতে পারে? আর আমি কেনই বা শেষ পর্যন্ত অটল থাকলাম না। পিতা-মাতার মুখের দিকে চেয়ে এতো যদি মায়া, তার দিকে নয় কেন? যদি আমার বাবাও হতো তার বাবার মতোই? উচ্চতর ডিগ্রীটা না নিলেই নয় কেন? এসব ভেবে ভেবে নিজেকে নৈরাশ্যবাদী ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। পরক্ষণে আমার ক্ষোভ ও আক্ষেপ জেগে ওঠে। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার, চাওয়া-পাওয়ার কি কোনো মূল্য নেই? আমি কি মানুষ নই?

আমরা থাকি পিঠের দিকে পিঠ করে অথবা মুখের দিকে পিঠ করে। মুখোমুখি কখনোই নয়। সেও বুঝতে পারে। এইটুকু বোধ তার আছে। তাকে যে একটি পণ্য করে দেয়া হয়েছে তা নিয়ে তার মধ্যেও নিশ্চয় একটা ক্ষোভ আছে, যন্ত্রণা আছে। তাই কোনো বাড়াবাড়ি সে করে না। কিন্তু ইচ্ছে করলেই সে তা করতে পারে। ডানহাতের একটি অতিরিক্ত আঙ্গুল তার অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। আর মুখশ্রী? খেয়ে-দেয়ে একটা কাজের জন্যই তো কেউ আসেনি। আমার মতোই হয়তো সেও প্রতিদিন একটু একটু করে মরে। উভয়েই সেটা টের পাই কিন্তু প্রতিকার বা প্রতিরোধের সম্মিলিত উদ্যোগে কারো মন সায় দেয় না। আমি বুঝতে পারি আমারই এগিয়ে আসা দরকার। পদক্ষেপ নিতে গিয়ে আমার মনস্খলন হয়, পদস্খলন হয়। আমি পারি না, পারি না। আমার ভাল্লাগে না। কিছু ভাল্লাগে না।

কাজ-কর্মে একটু মনোযোগ দেই। তাও সে জোরপূর্বক। সে জোরের জোর নেই। মাঝখানে সে একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। নিয়ম রক্ষার্থে মাঝখানে আমিও দু’দিন থেকে আসি। তারা কিছুই বুঝতে পারে না। আমি যথাসাধ্য নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। আমি সেই দু’দিন ভীষণ তটস্থ ছিলাম- সে কিছু বলে দেয় কিনা। স্বাক্ষর যেহেতু অজ্ঞানে নয় সজ্ঞানেই করেছি সেহেতু তার অধিকার খর্ব করার অধিকার আমার নেই। এবং তা করলে শাস্তি দেয়ার অধিকারও তাদের আছে। আমাদের দুই পুরুষকে সে শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে।

দিন কীভাবে, কখন যায় টের পাই না আমি। তাই সঠিক হিসাব বলতে পারবো না। চারমাস হতে পারে। আমার ঘুম ভাঙ্গে খুব ভোরে। চোখ খুলতেই দেখি সে আমার মুখোমুখি। এ কি সে-ই? আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না। আমার এত্তো ভালো লাগে! এত্তো! আমি কতোক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সকালের সূর্য তার বার্তা পাঠালে তার কাঁধে আমি মৃদু ঝাঁকুনি দেই। সে চোখ খুলে তাকাতেই আমি হাসি। সেও হাসে। তখুনি আমি তার কাছে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব পেশ করি। ‘চলো আমরা হারিয়ে যাই?’ সেও দেখি কোনো প্রশ্ন না করে সম্মতি জানায়- ‘চলো।’ ওখানে আমাদের কেউ পণ্য ভাববে না। আমাদের নিয়ে কোনো কানাঘুষা হবে না। রবিঠাকুরের একটি কবিতার লাইন খুব করে মনে পড়লো আমার- ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।’ আমি জানালাটা খুলে দেই। জানালার পাশের মেহগনি গাছটাতে আবার নতুন পাতা গজিয়েছে।

শাহেদুজ্জামান লিংকন
কবি, কথাসাহিত্যিক, চিকিৎসক

 

যেদিন জেগেছিলো হৃদয় 1
Latest posts by শাহেদুজ্জামান লিংকন (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •