রেইনলিলি ও ঘাসফুল

মোকাদ্দেস-এ-রাব্বী

৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৩:০১ অপরাহ্ণ ;

রেইনলিলি ও ঘাসফুল

মোবাইলটা হাত থেকে ফসকে নিচের দিকে না পড়ে উপরের দিকে উঠল প্রথমে। পরে নিচের দিকে পড়তে শুরু করল। অমনি কমোডের উপর থেকে ড্রাইভ দিয়ে লাফিয়ে পড়ল নাহিদ। দুর্দান্ত একটা ক্যাচ লুফে নিল যেন। কিন্তু এই ক্যাচে কোন উইকেটের পতন ঘটল না । তবে এ যাত্রায় মোবাইলটা সেভ হলো আরকি। কিন্তু নাহিদের অবস্থা অনেকটা শোচনীয়। ডান হাতে এবং কোমড়ে ব্যাথা পেয়েছে বেশ ভালোই। আর ভেজা ফ্লোরে পড়েও পুরো শরীরও ভিজে গেছে। সবকিছুই এতই ডিজিটাল হয়েছে যে ওয়াশরুমে গিয়েও ডিজিটালাইজ কর্মকান্ড সম্পাদন করতে হয়। নাহিদ কমোডে বসে রেইনলিলি নামের ফেইসবুক আইডির সাথে চ্যাটিং করছিল। কমোডে বসে চ্যাটিং! বিষয়টা হাস্যকর হলেও প্রেম বলে কথা। আইডিটা ফেক না। ছদ্ধনাম ব্যবহার করা একটি মেয়ের আইডি নিশ্চিত হয়ে প্রেমে পড়ে নাহিদ। নাহিদ এর নিজের আইডিটাও অবশ্য ছদ্ধ নামে ব্যবহার করা। ওর আইডির নাম ঘাসফুল। রেইনলিলি ও ঘাসফুল আইডির সম্পর্ক এতই গভীর হয়েছে যে যখন তখন যে কোন মূহুর্তে চ্যাটিং-এ জড়িয়ে পড়ে তারা। রোমান্টিক রোমান্টিক সব বাক্যের ডালি যেন ঘুরে বেড়ায় দুজনের ইনবক্সে। আইডি ছদ্ধ নামে হলেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হওয়ার কারণে একে অপরের নামটাও জেনেছে তারা। প্রোফাইল পিকচারের মতো নামেরও মিল আছে তাদের। রেইনলিলির নাম নিনা। নাহিদ ওয়াশরুমে থেকে বেড়িয়ে অন্য একসেট পোশাক নিয়ে আবার ওয়াশরুমে ঢুকে।

রেইনলিলি ও ঘাসফুল এর বন্ধুত্ব হয় প্রায় ছয় মাস আগে। শুরুটা অবশ্য নাহিদই করেন। নাহিদ রেইনলিলি আইডিতে প্রোফাইল পিকচারে পিংক কালারের রেইনলিলি ফুলের ছবি দেখে কিছুটা চমকে উঠেছিল। তাঁর ঘাসফুল নামের আইডিতেও প্রোফাইল পিকচারে সেম কালারের ঘাসফুলের একটা ছবি আপলোড করা আছে। ফুলের জাত কিংবা গাছ আলাদা হলেও ফুল দুটি দেখতে একই রকম। কৌতুহল হয়ে রিকোয়েস্ট পাঠায় সে। কিন্তু রেইনলিলি সে রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করে ঝুলায় রাখে। এক সপ্তাহ পরে ইনবক্সে নক করে নাহিদ। নাহিদ লিখেছিল,

‘আপনার ফ্লওয়ার কত?’

‘অনেক। জুই,চামেলি,গোলাপ,বেলি,টগর,সন্ধ্যা মালতী, রজনীগন্ধ্যা—- আরও লিখব?’

‘সরি, লিখতে একটু ভুল হয়েছে। আসলে আপনার ফলোয়ার কত?’

‘৬১৩৪ জন। কিন্তু কেন? আমার ফলোয়ার কি আপনি কিনে নিবেন নাকি সরায় ফেলবেন?’

‘না, কিছুই করব না। শুধু বলব ঐ ৬১৩৪ জনের মধ্যে আমিও একজন। বন্ধু হতে না পেরে না হয় ঝুলেই থাকলাম। ফলোয়ার হয়ে থাকলাম তো।’

এটা দেখার পর রেইনলিলি একটা হাসির ইমো সেন্ড করে। ক্ষণিক পরে বন্ধুত্ব হওয়ার নোটিফিকেশনও চলে আসে। এরপর এই পথ চলা।

ইনবক্সে চ্যাটিং এর মধ্যেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। এরপর একে অপরকে বুঝে নেয় তারা। দুজনের বিভিন্ন বিষয়ে মিলও অনেক। মতেরও মিল অধিকাংশ সময় হয়। দুজন দুজনকে ভালো বুঝতে পারাটা প্রেমের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তবে এই সম্পর্ক তৈরির কিছু শর্তাবলীও ছিল। ভয়েস কল, ভিডিও কল, ছবি শেয়ার করা,আরও ইত্যাদি ইত্যাদি শর্তাবলীর মধ্যে ছিল। সব শর্তাবলী খুব সহজে মেনে নিয়েছিল নাহিদ। যে কারণে কিছু শর্তাবলী মাঝে মাঝে শিতিল হয়ে যাচ্ছিল। যার মধ্যে তারা কোন কোন সপ্তাহে একবার করে ম্যাসেঞ্জারে ভয়েস কলে কথা বলে। কিন্তু ভিডিও কলের সুযোগ হয়নি কখনো। নাহিদ অবশ্য ভুল করে কখনো চেষ্টাও করেনি।

ওয়াশরুমে পড়ে যাওয়ার পর হাত আর কোমড় প্রচন্ড ব্যথা করছিল। যে কারণে পোশাক পরিবর্তন করে এসে পেইন কিলার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। এরপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারেনি ও। এক ঘুমে বিকাল। ঘুম ভাঙ্গলো তাও মায়ের ডাকে। সকালের ওয়াশরুমের দুর্ঘটনার কথা শুধু মা জেনেছে। যে কারণে ছেলের রুমে খবর নিতে আসা। মা অবশ্য আরও দুইবার এসে নাকি ফিরে গিয়েছে ছেলেকে ঘুমানো দেখে। এবার এসে আর না ডেকে পারল না। বিছানা থেকে উঠে অবশ্য অনেকটা ভালো লাগছে এখন। খুব সাবধানে আবার ওয়াশরুমে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল হাতে নেয়। ফোন হাতে নিয়ে দেখে রেইনলিলি হোয়াটসঅ্যাপে ৫বার এবং ম্যাসেঞ্জারে ৫ বার ভয়েস কল দিয়েছিল। দেখে যেন মাথায় হাত দেয় ও। এর পর দেখতে পায় রেইনলিলি’র লেখা। ও পরে লিখেছে,

‘এতবার কল দেওয়া দেখে পুনরায় ভয়েস কল দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। খুব খুশি হয়ে কল দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম না লিখে সরাসরিই বলি। যা হোক কোন কারণে হয়তো ধরতে পারোনি। অনলাইনে অর্ডার করা তোমার দেওয়া গিফট আমার হাতে এসে পৌঁছে্ছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

ইনবক্সে লেখাটা দেখে মনটা ভালো হয়ে যায় নাহিদের।

গত ছয় মাসে কোনভাবেই কোন গিফট দিতে পারেনি রেইনলিলিকে মানে নিনাকে। কিভাবে পাঠাবে? ঠিকানা নেই। ঠিকানা চাওয়ার সাহসও দেখায় নি নাহিদ। সেদিন অনলাইনে একটা পিংক কালারের শাড়ি খুব পছন্দ হয় নাহিদের। শাড়ির ক্যাটালগ ডাউনলোড করে ইনবক্সে দিয়ে খুব রিকোয়েস্ট করে নাহিদ। নিনা রাজি হয়। পরে একটা মোবাইল নাম্বার এবং বসুন্ধরা গেট,ঢাকা লিখে ঠিকানা দেয়। তার সাথে লিখে দেয় এই ফোন নাম্বারে শুধু হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করা হয় এবং ঐ ফোনটি সবসময় ঘরে থাকে। কাজেই অফলাইনে এই নাম্বারে যোগাযোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করিও না। এরপর এই ঠিকানা দিয়ে অনলাইনে বিল পেইড করে অর্ডার করে গত পরশু। আর আজকেই হাতে চলে গিয়েছে তার। নাহিদ আন্দাজ করতে পেরেছে বসুন্ধরার-ই কোন বøকে থাকে নিনা। নাহিদের ফ্লাটও তো বসুন্ধরা এ বøকেই। অতকিছু ভাবতে চাইল না ও। একদিন না একদিন দেখা তো হবেই। ফোন রেখে মাকে ডাকতে ডাকতে রুম থেকে বের হলো নাহিদ। মার কাছ থেকে চায়ের আবদার করল ও। মা চা এনে দিল ওকে। মা বলল, আজকে আর বাইরে বের হওয়ার কোন দরকার নেই। মায়ের কথা রাখতেই হলো। সচরাচর নাহিদ ছাদে যায় না কিন্তু চা খেয়ে ছাদে চলে এলো ও।

ছাদের উপরটা কারা যেন সবুজ করে ফেলেছে। বিভিন্ন ফলের গাছ। সবজির গাছ। অবাক হলো দুইটা কলা গাছও আছে। সে গাছে আবার কলাও ধরেছে। ছাদে উঠে অনেক ভালো লাগল ওর। হঠাৎ ছাদে অন্য কারো উপস্থিতি অনুভব করল নাহিদ। ঘার ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে দেখে ছয় তলার ফ্লাটের মেয়েটি। যার সাথে নাহিদের প্রায়ই গেটে দেখা হয়। কিন্তু কখনো কথা বলা হয় নি। দেখেই চোখ সরিয়ে নেয় ও। চোখ সরিয়ে নেয়ার পরও মনে হলো কি যেন অবাক করার মত কিছু দেখেছে। বাধ্য হয়ে চোরের মত পূনরায় তাকানোর চেষ্টা করে। তাকিয়েই যেন অবাক হয়ে যায়। মেয়েটি শাড়ি পড়ে এসেছে। পিংক কালারের শাড়ি। শুধু পিংক কালারের না। এই শাড়িটাই সেই শাড়ি যে শাড়িটা ঘাসফুল রেইনলিলিকে অনলাইনে গিফট পাঠিয়েছিল।

মন্তব্য করুন