শাশুড়িকে লেখা চিঠি 

সফুরা খাতুন

৭ জানুয়ারি, ২০২৩ , ১:৪৮ অপরাহ্ণ ;

শাশুড়িকে লেখা চিঠি

আম্মা,

আমি আপনাদের ভালোবেসেছি। জানি,এ কথাটা আপনার এবং আপনার সন্তানদের পক্ষে বিশ্বাস করা অসম্ভব। কারণ আপনার শৈশব।

শৈশব সৎ মা আর সৎ ভাইবোনের সংসারের পরিবেশ আপনাকে ভালোবাসা, বিশ্বাস, শেয়ারিং এসব শেখায় নি।

বরং ঈর্ষা, ভাগ বাটোয়ারা, হাম হাম, তুম তুম, ম্যা ম্যা তু তু,শিখিয়েছে।

বাবাকে দেখেছেন আপনার ভাগের ভালোবাসা অন্যকে দিতে। দুই মাকে দেখেছেন কি করে স্বামীকে নিজের কাছে ছলে বলে কৌশলে রাখতে হয় তাই করতে।

এইসব পলিটিক্স থেকে আপনি বের হতে পারেননি আজো।

মা,আপনিতো শিক্ষিত মানুষ। আপনি শিক্ষক। কী করে এই শিক্ষা নিজ সন্তানকে দিলেন?

কেন শিক্ষার আলো দিয়ে নিজের ভেতরের শৈশবের সেই ভাগিয়ারী স্বার্থপরতার অন্ধকার দূর করতে পারলেন না?

কেন মা,

আপনি শুধু আপনার সন্তানের মা হলেন?

কেন শাশুড়িও হতে পারলেন না?

কেন সব সময় সতীন টাইপ মনোভাব নিয়ে বেঁচে আছেন? আম্মা,আজ হয়ত একের পর এক সংসার ভেঙ্গে ছেলেকে নিজের কাছে রেখে আনন্দ পাচ্ছেন!নিজেকে সুখী ভাবছেন,জয়ী মনে করছেন। আসলে কি আপনি জয়ী মা?

আপনার ছেলেটা আজ কিছু করেনা।আপনি করতে দেন না।

আরেক ছেলে আপনার চালাকিটা স্বভাবে পেয়েছে।কিংবা আপনার স্বার্থপরতা রপ্ত করে নিজের ভালো থাকাটা নিশ্চিত করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে আপনার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। তাই তার সংসার অক্ষত আজো। আপনি ভাঙতে পারেননি।

আমি ওর বুদ্ধির তারিফ করি।

মা, কিন্তু আপনার এই বোকা ছেলেটা যে অন্যের উপার্জনের টাকার দয়ায় জীবন নির্বাহ করছে,ননিজের যোগ্যতা থাকার পর কর্মহীন হচ্ছে বারবার। শুধু আপনার কারণে! আপনার কি একটি বারও খারাপ লাগে না?

জানেন মা, ওর বন্ধুমহলে ও যখন বলে -দোস্ত, আমার জন্য একটা কাজ দেখ না!

কিংবা আত্মীয়দের কাছে, চাচা মামাদের কাছে বা চাচাতো মামাতো ভাইদের কাছে বলে চাকরির সুপারিশের কথা আমার লজ্জা লাগে, আমি ছোটো হয়ে যাই।

আপনি কেন হন না মা?

নিজ স্বার্থে কেন ছেলেটার জীবন নষ্ট করছেন?

কেন আপনি আমার কাছ থেকে আমার স্বামীকে আলাদা করেছেন? কেন তার সন্তানকে পিতার কাছ থেকে আলাদা করেছেন?

কেন দ্বিতীয় বউটিকেও আপনি সংসার করতে দিলেন না? এভাবে আর কতজনের ঘর ভাঙবেন। আপনার বাবার করা অপরাধের সাজা আপনি কাকে দিচ্ছেন? 

কেউ আপনার মায়ের স্বামী কেড়েছে বলে কি আপনি ছেলের বউয়ের স্বামী কেড়ে নেবেন?

কেউ আপনার বাবার ভাগ কেড়েছে বলে কি আপনি আপনার নাতি নাতনির বাবাকে আলাদা করবেন? 

আম্মা,নিজের বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন যে,আপনার ছেলের বউদের অপরাধ কী? আমার অপরাধ কী? কোনো দিন আমি আপনাকে কিছু বলেছি?

আম্মা, নিজের শৈশবের প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় আপনি শুধু পরের মেয়েদেরকে নয়, নিজের সন্তানকেও পুড়ছেন। তার জীবনটাও নষ্ট করছেন!

আজ এত বছর পর এই বয়সে এসে খুব বেশি কি করবে আপনার সন্তান? অন্য সহোদরের  কেয়ারটেকার হয়ে জীবন কাটাবে? মা হয়ে এতটা বৈষম্য কি করে করলেন?আপনার এই মা ভক্ত ছেলে সেটা না বুঝলেও মৃত্যুর পর একদিন এর জবাব কিন্তু উপরওয়ালা চাইবেন?

সন্তানের কাছ থেকে, স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীকে আলাদা করার দায় থেকে বিধাতাও মুক্তি দেবেন না।

আম্মা, হাদিস কোরানের কথা বলে আমি ব্যর্থ হয়েছি।

বড় মসজিদের হুজুরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম, আপনি, আপনার ছেলে আল্লাহ, হুজুর হাদিস কিছুইতো মানেন না।

লোক দেখানো মাঝেমধ্যে নামাজ পড়েন।

আমি খুব কষ্ট পাই যখন জোর করে ঠেলেও আপনার ছেলেকে জুমার নামাজে মসজিদে পাঠাতে পারিনা।

আম্মা, মা না হোক, স্বাভাবিক শাশুড়ি হউন। ছেলের বউয়ের সাথে ঝগড়া করুন, গালি দিন। কিন্তু সংসার ভাঙার এই খেলা থেকে বেড়িয়ে আসুন।

মা,আপনার ছেলেটাকে অন্য ছেলেটার কাছে, আত্মীয় স্বজনের কাছে,বন্ধু বান্ধবের কাছে আর ছোটো করবেন না।তার মাতৃভক্তির সুযোগ নেবেন না।

ওর কি সংসার করতে মন চায় না? না হলে কি বারবার ভালোবাসতো? ভালোবেসে বিয়ে করতো? ব্যভিচারের মতো গোনাহর দিকে মা হয়ে ছেলেকে ঠেলে দেওয়ার গোনাহ করতে পারেন না।

জেদ, হিংসা,অহংকার মায়েদের জন্য না। মা তো ত্যাগ করার জন্য। আপনি কি কিছু ত্যাগ করেছেন এই ছেলেটার জন্য? বরং সে ত্যাগ করেছে আপনার জন্য!এখনো করেই চলেছে!

মনে আছে আম্মা,আমি সাজলে আপনার ছেলে খুশি হয়, কিন্তু আপনি অখুশি হন। তাই আমার সাজ আপনার ছেলে আর পছন্দ করেনা।

সেদিন ওর জন্মদিনে, আপনি কি বাগড়াটাই না দিলেন। স্ত্রী চেয়ে আপনার ছেলের জীবনে কি অন্য আত্মীয়া মহিলার হক বেশি?

আবার অসুস্থ আমাকে নিতে আসতে না দিয়ে আপনি তাকে আপনার ভাগনা বউয়ের ডেলিভারিতে পাঠালেন। অথচ আপনার ভাগনাসহ সবাই ছিল সেখানে।

তারপর প্রতি ঈদে আপনি আমার কাছ থেকে ওকে আলাদা করতেন। আমাদের একান্ত সময়গুলিতে আপনি ঢুকে পরতেন মাঝখানে। 

এসব কি একজন মায়ের কাজ?

আম্মা, আপনার ছেলেকে বলেছিলাম, আপনার কাউন্সিলিং করাতে। আপনার চিকিৎসা দরকার। কিন্তু, সে তো আমার কথা শোনার মানুষ না। উল্টো আমাকেই উত্তম মধ্যম দিয়ে দিলো। এতে অবশ্য আপনি বেশ খুশি।

মা,

আপনি একদিন তো চলে যাবেন পৃথিবী ছেড়ে, এটা মানেন তো? তাই যদি হয়, তবে আপনার চলে যাবার পর আপনার অলস ছেলেটাকে কে দেখে রাখবে?কে ভালোবাসবে?

সবাই ভালোবেসে আসে না। কেউ কেউ প্রয়োজনে বা বিপদে পড়ে আসে। তারা ভালোবাসে না।

আপনি শিক্ষিত মানুষ, এবারে অন্তত বুঝুন। আপনি যে বুঝবেন না, আমি তাও জানি।

ভালো থাকবেন মা। আমার স্বামীকে ভালো রাখবেন।আমি অনেক ভালোবাসি তাকে।

ছোটো মুখে আজ একটা বড় কথা বলি মা। আপনার ছেলেকে আমি বেশি ভালোবাসি। কখনো প্রাকটিকাল পরীক্ষা হলে আপনি হেরে যাবেন।

সন্তান মরলে শোক চিহ্ন থাকে না। আলাদা কোনো নাম হয় না। স্বামী মরলে তার নাম হয় বিধবা। আপনি জানেন। আর শোক চিহ্ন সাদা কাপড়। যদিও আপনি সাদা কাপড় পরেন না।

আমি হলে পরতাম। সাদা কাপড়।

স্বামীর দাম নিশ্চই সন্তানের চেয়ে বেশি।

এখনো জেদ,অহংকার বা ইগো আছে আপনার,এসব নিয়েই যদি বাঁচেন,ছেলের প্রতি ভালোবাসা যদি আপনার স্বার্থপরতা না হয়, যদি সাহস থাকে তবে ভালোবাসার পরিক্ষা দিন আমার সাথে।

আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত করুক, বুঝবার তৌফিক দান করুক।আমিন।

ইতি 

আপনার ছেলের তৃতীয় বউ।

One response to “শাশুড়িকে লেখা চিঠি ”

  1. কবি- নীলকণ্ঠ/চিত্রকর লিফু says:

    আজ কন্যা, কাল বৌমা তার পরের দিনই আজকের কন্যা শাশুরী আম্মা হচ্ছে , শুধু মাত্র শাশুড়ির “আচরণের ঐতিহ্য” আজও আমরা ধরে রাখতে পেরেছি,কারন আমরা প্রতিশোধ পরায়ণ ।

মন্তব্য করুন