সুজন   দেবনাথ

১ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:৩৫ পূর্বাহ্ণ ; 1136 Views

সক্রেটিসের শহর থেকে ২

সক্রেটিসের শহর থেকে ২

লেখক সুজন দেবনাথ গ্রিসের এথেন্সে বাংলাদেশ দুতাবাসের কাউন্সেলর। সেখান থেকে মুগ্ধতা ডট কমের জন্য লিখেছেন তিনি।


করোনার সময় প্রবীণদের যত্ন নিন, তাদের সময় দিন

আমার বাবা-মায়ের বয়স ষাটের আশে-পাশে। শ্বশুর-শাশুড়ি সত্তরের কোঠায়। করোনার এই সময়ে আমি বা আমার স্ত্রী কেউই তাদের কাছে নেই। ফোন করে খোঁজ নেয়া ছাড়া তাদের জন্য আমাদের আর কিছুই করার নেই। তাদের জন্য বিধাতা আছেন।

আসুন, করোনার সময়টাকে আমরা একটা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। এই সময় আমরা আমাদের পরিবারের প্রবীণদের একটু সময় দেই। তাদেরকে একটু যত্ন নেই। করোনাতে প্রবীনরাই সবচেয়ে বেশি রিস্কে আছেন। তাই তাদের আলাদা যত্ন দরকার। তাদের মন ভালো রাখা দরকার। তাদের মনে সাহস রাখা খুবই জরুরী।

আমার এক গ্রিক বন্ধু আছে, নাম ইসিয়াস জেনিস। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। নিঃসন্তান। করোনার জন্য লকড ডাউনের পরে সে ফোন দিলো, বন্ধু, বিপদে আছি।

আমি বললাম – কী বিপদ, করোনা ধরছে?

বললো, করোনা কোন সমস্যা না। সারাদিন বউয়ের সাথে এক ঘরে থাকাটা করোনার থেকে অনেক বড় সমস্যা!

বুঝলাম, বেচারা মজা করছে।

বললাম, বাড়িতে কে কে আছে?

বললো, সেটাই তো টেনশান। বাড়িতে বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি চার প্রবীণ।

আমি বললাম, এক কাজ করো – চারজনকে জোকস বলতে শুরু করো। চারজনকে প্রতিদিন তুমি চারটা, তোমার বউ চারটা জোকস বলবে। দুই ঘণ্টা পর পর একটা করে জোকস বললে দিন কেটে যাবে।

তিন দিন পরে ইলিয়াস জানালো, বন্ধু, জোকসের আইডিয়াটা দারুণ কাজ করছে। বাড়ির চারজন বয়স্কই অনেক অনেক খুশি। তাদের মধ্যে জোস চলে এসেছে।

ইলিয়াসের বউ বললো, আমার শাশুড়ি যে এতো রসিক, সেটা আমি জানতামই না। আমি আর কি জোকস বলবো, এখন উনিই আমাকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় জোকস বলেন। আমাকে খুশি রাখতে উনি সারাদিন চেষ্টা করছেন। এটা-ওটা রান্নাও করছেন।

ইলিয়াস বললো, বউয়ের সাথে সারাদিন থাকতে এখন আর সমস্যা নাই। চারজন বুড়ো-বুড়িকে আমার বউ নিজের বাচ্চার মতো সময় দিচ্ছে। ঘরের পরিবেশই বদলে গেছে। পরিবারে পার্টি পার্টি ভাব।এখন আমার বাবা-মা এমন আনন্দে আছে যে – শত করোনাও তাদের কিছু করতে পারবে না। মনে হচ্ছে – আমরা সেই ছোটবেলায় ফিরে গেছি।

ইলিয়াসের ফোনটা রেখে আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। কয়েকটা মাত্র জোকস চারজন প্রবীণ মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। তাহলে – আমরা কি পারি না – একটু বেশি সময় দিয়ে আমাদের পরিবারের বয়স্কদের ভালো রাখতে। আমরা একটু বেশি সময় দিলে, একটু মজা করে কথা বললেন, ওনারা সাহস পাবেন। করোনা মোকাবেলার ভরসা পাবেন।

আসুন, প্রবীণদের সময় দেই। তাদের ইমপরটেন্স দেই। সারাদিন ফেইসবুকে করোনা নিয়ে আহাজারি না দেখে, বাবা-মা, দাদা-দাদীকে দুটো মিষ্টি কথা বলি। ভরসার কথা বলি। একটু লেবুর শরবৎ করে দেই।

তবে, সাবধান, প্রবীণদের মধ্যে ভয় ছড়ানো যাবে না। সচেতন করতে হবে, কিন্তু ভয় যেন না দেখাই। তরুণদের সময় এসেছে প্রমাণ করার – আমরা আমাদের সিনিয়রদের ভালবাসি।

একদিন করোনা ঠিকই চলে যাবে। ভ্যাকসিন চলে আসবে। এই সুযোগে বাবাকে খুশি করার চেষ্টাটা যদি আমাদের অভ্যাস হয়ে যায়, সেটা সারাজীবন আমাদের সুখে রাখবে। যেটা মনে মনে বলি, লজ্জার মাথা খেয়ে বাবাকে একবার বলে ফেলি, লাভ ইউ বাবা। সাহস করে শ্বশুরকে একটা জোকস বলে ফেলি। যে মজার ভিডিও বন্ধুদের পাঠাচ্ছি, সেগুলো তাদেরও পাঠিয়ে দেই।

আমরা আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদীকে ভালোবাসি – প্রবীণদের ভালোবাসি – এটা প্রমাণ করাই হোক করোনার সময়ের আমাদের শিক্ষা।

২১ মার্চ, এথেন্স

 

 

সুজন   দেবনাথ
Latest posts by সুজন   দেবনাথ (see all)