সক্রেটিসের শহর থেকে

সুজন   দেবনাথ

৩০ মার্চ, ২০২০ , ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ ; 1332 Views

সক্রেটিসের শহর থেকে সুজন দেবনাথ

লেখক সুজন দেবনাথ গ্রিসের এথেন্সে বাংলাদেশ দুতাবাসের কাউন্সেলর। সেখান থেকে মুগ্ধতা ডট কমের জন্য লিখেছেন তিনি।


লক-ডাউন নিয়ে সারা পৃথিবীতেই খুব যন্ত্রণা। কী করা যাবে আর কী যাবে না -সেটা বুঝতে জান খারাপ। অবস্থা এমন – ঘরে বাচ্চার খাবার নাই, বাইরে পুলিশ। কী করা! আসুন দেখি – ইউরোপে বিশেষ করে গ্রিসে কিভাবে লক-ডাউন এপ্লাই করা হচ্ছেঃ

১. গ্রিসে লক-ডাউনে আপনি বাইরে যেতে পারবেন, শুধু  চারটি কারণেঃ (i) খাবার ও ঔষধ কিনতে, (ii) কাউকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে, (iii) বয়স্ক বা শিশুর কোন প্রয়োজনে তাদের সাথে বের হতে, (iv) পোষাপ্রাণীকে হাঁটাতে নেয়ার দরকার হলে (পোষা প্রাণীর হাগু হবার জন্য হাঁটানোর দরকার আছে)। এই চার প্রয়োজনের বাইরে বের হলে, পুলিশ ধরলে সাথে সাথে ১৫০ ইউরো জরিমানা। যে কোন প্রয়োজনে বাইরে গেলে অবশ্যই আইডি কার্ড সাথে নিতে হবে।

২. মনে হচ্ছে – খুবই সহজ নিয়ম। আড্ডা মারতে বের হলাম, আর পুলিশ ধরলে মিথ্যা বলে দিলাম – খাবার কিনতে যাচ্ছি। এই চালাকি ঠেকাতে তিনটি ব্যবস্থাঃ (i) বাইরে বের হবার আগে কেন যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন সেটা লিখে একটা নম্বরে SMS করে তারপর বের হতে হবে। গ্রিসের জন্য এই নম্বর-১৩০৩৩। SMS ফ্রি। মোবাইল কোম্পানি এই নম্বরে SMS এর জন্য ফি নিতে পারবে না। যে মোবাইল থেকে SMS করা হচ্ছে সেটি সাথে নিয়ে বের হতে হবে। (ii) SMS করতে না  চাইলে – সরকারের একটা ফর্ম আছে, সেই ফর্মে নাম, আইডি, বাসার ঠিকানা, বাইরে কোথায়, কখন, কেন যাচ্ছেন – এসব লিখতে হয়। ফর্ম অনলাইনে দেয়া আছে। ফর্মটি পূরণ করে নিজের সাইনসহ সাথে নিয়ে বাইরে বের হতে হবে। (iii) এগুলোও যদি করতে না চান, তাহলে সাদা কাগজে আপনার নাম, আইডি, ঠিকানা আর বাইরে কোথায়, কখন, কেন যাচ্ছেন সেটি লিখে, নিজে সাইন করে সাথে নিয়ে বাইরে বের হতে হবে।

৩. যেসব দোকান বা অফিস খোলা, তাদের জন্য ফর্ম আছে। ফর্মে দোকান বা অফিসের নাম, ঠিকানা আর কাজের সময় লেখা আছে। অফিস প্রধান বা দোকানের মালিক এই ফর্ম পুরণ করে সই দিয়ে প্রত্যেক কর্মচারীকে দিবেন। কর্মচারীরা এই ফর্ম সাথে নিয়ে কাজের জন্য বের হতে পারবে। অফিস প্রধান বা দোকান মালিক নিজের জন্য এই ফর্ম নিজেই সই করে সাথে রাখবেন।

৪. পুলিশ কী করে? পুলিশ রাস্তায় কাউকে পেলে তার আইডির সাথে SMS অথবা উপরের ফর্ম বা সাদা কাগজ মিলিয়ে দেখে। ডকুমেন্টস ঠিক থাকলে বাইরে কতক্ষণ থাকবে তার একটা আনুমানিক সময় বলে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। ডকুমেন্ট না থাকলে সাথে সাথে আড়াইশ ইউরো জরিমানা। সাথে সাথে আদায়। সাথে টাকা না থাকলে, একাউন্ট থেকে কেটে নেবে, একাউন্ট না থাকলে আইডি কার্ডের সাথে জরিমানা লিখে নেয়, পরে জরিমানার চিঠি চলে আসে।

পুলিশ কখনোই কারো গায়ে হাত তোলে না। কোন সমস্যা হলে মাটিতে বসিয়ে দেয়, বা হাত উপরে রেখে দাঁড় করিয়ে চেক করে। দরকার হলে গ্রেফতার করতে পারে। এর বেশি কিছু করলে, পুলিশের নামে অভিযোগ করার ব্যবস্থা আছে।

৫. সুপার মার্কেট বা মুদি দোকানগুলো কী করে? সেখানে এক মিটার পরে পরে লাল দাগ দেয়া আছে। এই দাগের মধ্যে শুধু একজন থাকবে। দোকানে এক সাথে কতজন ঢুকতে পারবে সেটা নির্দিষ্ট করা আছে। সেজন্য দোকানের বাইরে লম্বা লাইন দিয়ে লোকজন দাইয়ে থাকে। একজন বের হলে আর একজন ঢুকতে পারে। দোকানে যে কোন পন্য আপনি যত খুশি কিনতে পারবেন না। দোকান মালিক যদি মনে করে, সে কেনার জন্য লিমিট ঠিক করে দিতে পারবে। যেমন, এখানে অনেক সুপার মার্কেটে একসাথে অনেক রুটি কিনতে দেয় না। ২/৩ টার বেশি কিনতে গেলে ম্যানেজার ভদ্রভাবে বলে – প্লিস অন্যকে কিনতে দিন।

৬. যে কোন প্রয়োজনে একসাথে দুই জনের বেশি বের হওয়া যাবে না।একটি গাড়িতে ড্রাইভারের সাথে মাত্র একজন, মানে মোট ২ জন চলতে পারবে। মানে গাড়িতেও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

৭. বিনা অনুমতিতে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা অফিস খুললে অনেক বড় টাকার জরিমানা। রেস্টুরেন্ট বন্ধ, শুধু হোম ডেলিভারি চালু। তবে অবশ্যই আগে যাদের হোম ডেলিভারির লাইসেন্স আছে, সেই রেস্টুরেন্টগুলোই হোম ডেলিভারি করতে পারপবে। বড় বড় সুপার মার্কেটের হোম ডেলিভারি চালু আছে।

এভাবে গ্রিসে গত সপ্তাহ থেকে লক-ডাউন কার্যকর করা হয়েছে।  মহামারী নিয়ে এথেন্সের চেয়ে পুরনো অভিজ্ঞতা কারো নেই। আড়াই হাজার বছর আগে সক্রেটিসের জীবিতকালে ভয়াবহ প্লেগে এথেন্সের তিন ভাগের একভাগ মানুষ মারা গিয়েছিল। মারা গিয়েছিলো তাদের গণতন্ত্রের এক নম্বর নেতা পেরিক্লিস। গ্রিক সাহিত্যে হোমার আর সফোক্লিস খুব করুণভাবেই মহামারীর কথা লিখেছেন। তাই মহামারী নিয়ে গ্রিকরা সচেতন। এরা ভয় পায়নি, কিন্তু খুবই সচেতন। এখন পর্যন্ত সফলই বলতে হবে। গতকাল (২৬ মার্চ) রাত পর্যন্ত গ্রিসে করোনা আক্রান্ত ৮৯২ জন, মারা গেছেন ২৭ জন। পাশের ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স এমনকি ধনী জার্মানির সাথে তুলনা করলেও গরীব গ্রিস এখন পর্যন্ত সফল।

বাংলাদেশেও ছুটিতে কাজ হয়েছে। মানুষ সচেতন হচ্ছে। আমরা এই ভয় কাটিয়ে উঠব শিঘ্রই। সেই দিনটির আশায় আছি, যেদিন – পাশের মানুষটির নিশ্বাঃস ছুঁয়ে নির্ভয়ে একটা হাসি দিতে পারবো।

২৭ মার্চ, এথেন্স, গ্রিস।

 

সুজন   দেবনাথ
Latest posts by সুজন   দেবনাথ (see all)

Leave a Reply

Your email address will not be published.