মুগ্ধতা.কম

৩১ মার্চ, ২০২০ , ৪:০০ অপরাহ্ণ ; 668 Views

সন্দেহ

করোনা বিষয়ক ছোটগল্প-সন্দেহ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কথাটা কঠিন গোপনীয় বলেই কলটা কেটে বিছানায় শুয়ে পড়ে জহির। শুয়ে শুয়ে জারার ফেরার অপেক্ষায় অধীর থাকে। শরীরের লোমশ গরমে বালিশ ঘেমে গেছে। ঘামের বিস্তৃতি বিছানা অব্দি গেছে। বিছানার কাছেই ক্ষুদ্র একটা জানালা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রতার ভাষায় বাইরের জগতকে জানান দিতে চায়। ও বার বার জানালার দিকে দৃষ্টি ছোড়ে। কী করুণ আর ক্লান্ত ওর  দৃষ্টি! কতো ক্ষুদ্র ওই জানালা। এর চেয়েও কতো ক্ষুদ্র  তার ছিদ্রতার ভাষা। আর ওই ভাষার অভিব্যক্তি। তার সঙ্গে কতো ক্ষুদ্র এই ঘর। ঘরের নাম ভালোবাসা। ভালোবাসার আরেক নাম জারা। জারার আরেক নাম জহির। হৃদয়ের বিশালতায় ক্ষুদ্রতাকে রূপ দিয়েছে বৃহত্তরে। বৃহৎ ওদের প্রাণ। প্রখর ওদেও প্রদীপ। বিশাল ওদের প্রণয়-সমুদ্র।

জারার সাথে জহিরের সাক্ষাৎ হয় কোনো এক কবিতা উৎসবে। ফাগুনের মাস। ঝিরিঝিরি বাতাসের বয়ান। অদ্ভুত ভালো লাগার প্রবাহ বয়ে যায়। সে প্রবাহে বদ্ধ হৃদয়ের অর্গল খুলে যায়। ভালোবাসা তার পাপড়ি মেলে ধরে। যেভাবে অলির স্পর্শে ফুলেরা তার গহন মেলে ধরে। জারার গহীনে ঢুকে যায় জহিরের সাপ। সাতদিন পর পালানোর পরিকল্পনা করে ওরা। আরো সাতদিন পর ওরা সত্যি সত্যি পালিয়ে যায়। বিয়ে নামক নতুন নকশা আঁকে শহরের শূন্য ক্যানভাসে।

এই বিয়েতে হ্যাঁ বলার মতো কোনো অভিভাবক ছিলো না বলেই কাজী সাহেব কিছুতেই বিয়ে পড়াতে রাজি হচ্ছিলেন না। জারা ও জহিরের করুণ কান্নায় পুরো কাজী অফিস যেন ভাসছিলো সেদিন। কিন্তু কাজী সাহেব ভাসেন নি। বার বার ধমক বর্ষিত করছিলেন এই নিরীহ যুগলের উপর। কান্নার প্রবাহ মন্থর করবার বিবিধ ব্যবস্থাও করছিলেন তিনি। পুলিশে মেসেজ সেন্ড করার সিচুয়েশনও তৈরি হয়েছিলো প্রায়। ওদের এমন দুঃসময়ে দেবদূতের মতো হাজির হলেন এক মুরুব্বি চাচা। তিনি ওদের বয়ান শুনলেন। তারপর ওনার বিবৃতি জানালেন। যেহেতু ওরা সাবালক। ওদের বয়স বিয়ের বৃত্তকে স্পর্শ করেছে। পরস্পর দেখে-শোনে এক সাথে থাকার সম্মত হয়েছে। সেহেতু ওদের শুভকাজে কোনো কালবিলম্ব করা শোভে না। সেদিন সেই মুরুব্বি চাচার  মুরুব্বিয়ানা চর্চাই কল্যাণেই আজ ওরা অভিন্ন। এক ছাদের নিচের অধিবাসী।

এরপর এক জোড়া অভিন্ন সত্তা এসে এই ঘরে ওঠেছিলো। এই ঘরের প্রতিটা ইটের প্রতি তাই এত টান। এত মায়া। টেলিভিশনে সংবাদগুলো শোনার পর থেকে নিজেকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে জহির। কেমন যেন একটা সন্দেহ জন্মেছে অজান্তেই অন্তরের অভ্যন্তরে। শরীর থেকে সেরকম এক রহস্যের গন্ধই টের পাচ্ছিলো কয়েকদিন থেকে। কোনো এক অজানা আতঙ্কে সংকোচিত হয়ে আসছে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস।

ও একবার দরজার দিকে তাকায়। আরেকবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। দরজা আর ঘড়ি। ঘড়ি আর দরজা। উভয়ে যেন কোনো এক অশুভর ইশারা বয়ে বেড়াচ্ছে ওর জীবনে। হঠাৎ করে কারো আঙুলের আঘাতে প্রকম্পিত হয় অন্ধ প্রহরীর মতো দাঁড়–ন্তক দরজাটা। ‘জারা না অন্য কেউ?’ পরিচয় নিশ্চিত হবার প্রয়োজনে জহিরের পা বিছানা ছেড়ে মেঝে স্পর্শ করে। দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কে-বাচক প্রশ্ন ছোড়ে ওপাশের আগন্তুকের উদ্দেশ্যে। ‘আমি জারা’, পলকের ভেতর একটা নরোম উত্তর ভেসে আসে ওর শ্রুতিতে। ও দরজা খুলে দেয়। জারা ঘরে ঢোকে। ওর মুখে মাস্ক। হাতে গ্লোভস। পড়নে নীল ইপিপি।

দুজনে মুখোমুখি বসে। জারা নরোম হাতে জহিরের কপাল স্পর্শ করে। ওর শরীর যেন পুড়ে যাচ্ছে। জারার হাতের আঙুলগুলোও যেন পুড়ে যাচ্ছে। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে অসহায় উদ্ভিদের মতো। এভাবে কেউ কারো প্রতি কখনো তাকায়নি আগে। প্রথম দেখাতেও না। ফুলশয্যা রাতেও না। বিয়ের তিন বছরের তিন দিনেও না।

সেই গোপন কথাটা বলতে  গিয়ে গুরুত্বর একটা কাশি এসে জহিরের গলায় ধাক্কা মারে। ও মুখে রুমাল চাপড়ে ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করে। জারা পানিভর্তি কাচের গ্লাসটা এগিয়ে দেয় জহিরের দিকে। ও পানি পান শেষে সেই গোপন কথাটা গোপনভাবেই বলে জারাকে।

জারার ভেতরের আতঙ্ক জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। হাঁসের ডিমের মতো বড় বড় চোখ নিয়ে জহিরের দিকে আবার তাকায়। দরজায় তাকায়। জানালায় তাকায়। ‘কেউ শুনেনি তো!’ জহির না-বাচক উত্তরে সন্ত্রস্ততা সংকোচিত করবার কসরত করে। জারা ফিসফিস করে বলে, ‘ওষুধ খেয়েছো?’ ট্যাবলেট শূন্য ওষুধের পাতাগুলোর দিকে ইশারা করে জহির তার জিজ্ঞাসার উত্তর বোঝাতে চায়। ‘আসছ ‘  বলেই প্রেসক্রিপশন পার্টসে পুরে জারা আবার বাসা থেকে বের হয়।

সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে নিচতলায় সেই মুরুব্বি চাচার সাথে সাক্ষাৎ হয় জারার। চাচার জেরা থেকে ত্রাণ পেতে দু এক কথা বলে এগুতে চায় ও। চাচার কৌতূহলের সমুদ্র তাতে ভরে না। বয়স বাড়লে মানুষ বুঝি এমন হয়। অল্প কথার জলে তাদের তৃষ্ণা মেটে না। চাচা জহিরের কথা জিজ্ঞেস করে। ‘জহির কোথায়? অনেকদিন হয়ে গেলো ছেলেটাকে দেখি না। চাকরি বাকরি করে নাকি ছেড়ে দিয়েছে?’

জারা প্রথমে আমতা আমতা ভঙ্গিমা করে। ওর ভঙ্গিমা দেখে চাচা কেমন যেন একটা সন্দেহের চোখে তাকায় ওর দিকে। ও একটু শক্ত হয়। ভঙ্গিমা পাল্টায়। ‘না চাচা। ও তো ঘরেই আছে। জানেনিতো, লকডাউনে সরকারি বেসরকারি সব ধরনের অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজন না থাকায় বাইরে বেশি বেরোয় না। আর এমনিতেও ও একটু লাজুক টাইপের। ‘খুব ভালো কথা, মা। একটু সতর্ক থেকো। প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে যেয়ো না। পৃথিবীর পরিস্থিতি সুবিধার না। কখন কী হয়ে যায় আল্লাহ ভালো জানেন। সবই তার ইচ্ছে। তিনি সকলের সহায় হউন। যাও মা। যাও।’

চাচার কাছে বিদায় নিয়ে জারা এসে রাস্তায় দাঁড়ায়। ধূধূ রাস্তা। একটি কাক-পাখিও নেই। খুব সন্ধ্যে। পাশের আমগাছটা অতল অন্ধকারে ডুবছে। বাসা থেকে ফার্মেসি আনুমানিক দেড় কিলোমিটার দূর হবে। ও এমনিতেই একা। তারপর এলাকাটা ভালো না। হেঁটে যাওয়া ঠিক হবে না। একটা অটো পেলে ভালো হতো। ও মনে মনে ভাবতে থাকে। হুট করে একটা অটোর আওয়াজ কানে ভাসে ওর। ও গলিগুলোর দিকে তাকায়। ওর ডানে-বাঁয়ে অনেক গলি। তিন নম্বর গলি থেকে শাঁত করে একটা অটো বেরোয়। ও হাত উঁচিয়ে ইশারা করে অটো চালকের প্রতি। অটোটা শাঁত করে এসে ওর বুকের সামনে এসে থামে। অটো চালক বেয়াহার মতো ওর বুকের দিকে তাকায়। ও গন্তব্য বলে। ‘জিরাবো বাজার যাবেন’?

অটোচালক মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানায়। ও কেমন একটা সন্দেহ সমেত অটোতে উঠে বসে। মা ফার্মেসিতে এসে অটো থামে। জারা পার্টস থেকে বঙ্গবন্ধু ছবি-সমেত বিশ টাকার নোট বের করে ভাড়া মিটিয়ে ফার্মেসিতে ঢোকে। মুখে মাস্ক পড়া ফার্মাসিস্টের কাছে প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দেয়। প্রেসক্রিপশন পড়ে ফার্মাসিস্ট হাঁসের ডিমের মতো বড় বড় চোখ করে ওর মাস্ক পড়া মুখের দিকে তাকায়। এখানেও একটা সন্দেহের গন্ধ টের পায় ও। ভেতরে ত্রস্ততা বোধ করে। ‘কী থেকে কী জিজ্ঞেস করে! হায় আল্লাহ!’ ভাবতে ভাবতে গলায় একটা খ্যাকারি দিয়ে ওঠে ও। কিছু বলার আগে বক্তা যেমন এক ধরনের আওয়াজ করে নিজের স্বর পরীক্ষা করে নেয়, ঠিক সেভাবে। ‘ভাই, ওষুধগুলো থাকলে দিন। আমার তাড়া আছে।’ বলেই আশপাশ তাকায় ও। ফার্মাসিস্ট ‘আছে’ বলে ওষুধগুলো বের করে প্যাকেট করে ওর গ্লোভস পড়া হাতের দিকে এগিয়ে দেয়। জারা ওষুধের বিল পরিশোধ করে আরেকটা অটোতে উঠে বসে।

দিনের দৈর্ঘ্য যেন কমে আসছে। জারার সেরকম মনে হয় আজকাল। এই সূর্য ওঠছে। এই সূর্য ডুবছে। জহিরের মনে হয় রাত সুদীর্ঘ হচ্ছে। দপ্ করে লাইট নিভে গেলে অন্ধকার আরো তীব্র লাগে ওর কাছে। লোর্ডশেডিংয়ে জারা একটু বিব্রত হয়। হৃদয়ের অন্ধকারেই বাঁচছি না, তার উপর সোডিয়াম অনন্ধকার! জহির অন্ধকারে টাচফোন হাতড়ায়। জারা চার্জার লাইট জ্বালিয়ে জহিরের সামনে এসে দাঁড়ায়।

কপালে নীল টিপ। গোলাপি লিপিস্টিকে রাঙানো ঠোঁট। পড়নে লাল শাড়ি। ভেজা চুল। ফুলে উঠা প্রশস্ত আর সটান বুক। চার্জারের রূপোলি আলোয় সুন্দরী জারাকে আরো আবেদনময়ী লাগছিলো। অসুস্থ্য জহিরের হৃদয়ে সে আবেদন ক্রমশ ছড়াতে থাকে। ওর লোমশ শারীরিক তাপমাত্রা হৃদপিণ্ডের ভেতর প্রবাহিত থাকে। জারাও আক্রান্ত হতে থাকে ওর ছোঁয়াচে অভ্যর্থনায়। জহিরের উষ্ণ আঙুলগুলো জারার নরোম আঙুলের ভেতর ডুবতে থাকে। কেমন একটা আতঙ্ক আর দ্বিধার ভেতরেও অদ্ভুত এক ইলেকট্রিক শকবোধ করে ওরা ওদের নাভির নিচে। এরপর ঠোঁটের ভেতর ঠোঁট ডুবতে থাকে। শরীরের ভেতর শরীর ভাসতে থাকে। শয়তানকে নরকে পুততে থাকে পরসস্পর। নরক জ্বলতে থাকে। শয়তান পুড়তে থাকে। জ্বলতে থাকে। পুড়তে থাকে। হুট করে জারা জহিরকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। জহির অবুঝের মতো জারার দিকে তাকিয়ে থাকে মেঝেতে বসে। জারা বিছানা থেকে তাকিয়ে থাকে সতর্ককারীর মতো।

প্রতিটি প্রত্যুষ আসছে যেন পাপের পালকে বিভ্রম ছড়াতে। শূন্য বারান্দায় ঝিরিঝিরি বয়ানে যেন বিষাদের বর্ষণ। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে কেউ বেরুচ্ছে না। অসুবিধা ছাড়া  কেউ জানালা খুলছে না। কেবল কাঁচের ভেতর দিয়ে পুরনো রোদেরা ঢুকে পড়ছে অবরুদ্ধ ঘরের ভেতর। জহির ও জারার জীবনে যেন নাভিশ্বাস ওঠেছে। যেন ওদের নৈঃশব্দ্য ফেটে ফেটে পড়ছে দীর্ঘশ্বাসের সমূহদিনলিপি। ওরা আজ অসহায়ত্বের কাছে সমর্পিত। যুদ্ধের ময়দানে যেভাবে পরাজিত বীর মৃত্যুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, ঠিক সেভাবে।

একদিকে স্বামী। আরেক দিকে নিজের জীবন। জারা কোন পথে হাঁটবে তা ঠিক করতে পাচ্ছে না। কেবল পায়ের পাতাগুলো যেন অবশ হয়ে আসছে ওর।

জহির হালুয়া-রুটির নাস্তা সেড়ে টেলিভিশনের সামনে বসে পড়ে। জারা সেভলনের পানি দিয়ে পুরা ঘর মপিংয়ে ব্যাস্ত হয়ে ওঠে। চেয়ার টেবিলগুলো সেভলনের পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মোছে। বাজারে জীবাণু নাশক সামগ্রীর খুব সংকোট চলছে। সামান্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার খুঁজতে খুঁজতে গত পরশু থেকে ক্লেদাক্ত হয়েছে ও। পরে ডিটারজেন্টের গুড়া আর পানির মিশ্রণে তার চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে। আর সারা ভাবী এক বোতল সেভলন দিয়েছিলো গতকাল। তা দিয়েই চলছে মপিংয়ের কাজ। মাঝেমধ্যেই সারা ভাবির কাছ থেকে জারা দুঃসময়ের দিনগুলিতে এমন সাহায্য পেয়ে থাকে। সারার সঙ্গে ওর সখ্যতা নাভির নিচ পর্যন্ত। অথচ এই দুঃসময়ের দিনে ওদের বিষয়টা সারার কাছে গোপন রেখেছে। কারণ আজকাল ওকেও সন্দেহ করে জারা।

সন্দেহ বাড়তে থাকে নিজের প্রতি। গলা থেকে উৎসারিত অন্তিম কাশির প্রতি। জহিরের উষ্ণ শরীরের প্রতি। এই বিজন সন্ধ্যায়ও জহির শুয়ে আছে। কারো মুখে কোনো হাসি নেই। কারো ডালে কোনো পাখির গুঞ্জন নেই। কেবল হাসিহীন গানহীন কেটে যাচ্ছে দিন। দরজা বন্ধ। জানালা বন্ধ। অবরুদ্ধ ঘরে নিদ্রাহীন- কেটে যাচ্ছে দিন। পাশের রুম থেকে আরেকটা কাশি ভেসে আসছে। ওদের সন্দেহ বাড়তে থাকে জানালার ছিদ্র বেয়ে উড়ে আসা ওই বেগানা কাশিটার প্রতি…

 

রেজাউল ইসলাম হাসু

তরুণ সাহিত্যিক।

প্রকাশিত বই দুইটা। এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ ও এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •