সাইকেল

সোহানুর রহমান শাহীন

১৪ জানুয়ারি, ২০২৩ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ ;

সাইকেল - সোহানুর রহমান শাহীন

মানুষ পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখেন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হবার পর থেকে। সে আলো গায়ে মেখে মেখে বেড়ে ওঠা শুরু হয়। সেই শুরু থেকে বাস্তবচিত্র ধারণ করে মনের ভিতর, মস্তিস্কে। তাকে কেউ কেউ স্মরণ করতে পারে আবার কেউ কেউ ভুলে যায় অনায়াসে। কেউ কেউ সময়ের হাত ধরে বদলাতে বদলাতে পূর্ব স্মৃতি মনে করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকেন। যাদের মনের মধ্যে কৃপণতা থাকে না মাঝে মাঝে তারাই স্মৃতির থলি হাতড়ায়। বের করে আনে কৈশর-শৈশব-যৌবনের বারো ভাজার খবর। বিশেষ করে শৈশবের জংধরা তালা খুলে যৌবনে হাজির করার মানুষের সংখ্যাও অনেক আছে। তবে শৈশবের চাবি হারানো তালায় তেল-মবিল না দিয়েই অনায়াসে তালা খুলে স্মৃতি মেলে ধরার দায় পড়েছে আমার। যেহেতু কিছু না হলেও শৈশব ফিরে পাবো সেই আশায়।

আমার শৈশবের স্মৃতির মধ্যে বাইসাইকেল চালানো শেখার কথা মনে পড়ে বারবার, কারণ হিসেবে এটা বলা যায় যে, বাইসাইকেল বহালতবিয়তে বিচরণ করছে কিশোর থেকে শুরু করে আশি বছর বয়সের বৃদ্ধর কাছে।

একটা সময় বাইসাইকেল চালানোর শখ মাথায় নিয়ে ঘুরছিলাম আর সব সময় ভাবছিলাম দুই চাকায় সাইকেল চলে! অনেকে আবার হাত ছেড়ে দিয়ে সাইকেল চালায় আবার লাফিয়ে লাফিয়ে সাইকেলে ওঠে, এটাও সম্ভব! তবে একটি মাত্র চাকা দিয়ে যে সাইকেল চালানো সম্ভব তা সার্কাস খেলা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। পরে অবশ্য বিভিন্ন ইলেকট্রনিক চ্যানেলের মাধ্যমে টিভির পর্দায় দেখানো হয়েছে এক চাকার সাইকেল খেলা।

আমাদের বাসায় সাইকেল ছিল না, পরিচিত তেমন কেউ নেই যাদের কাছে সাইকেল চালানোর জন্য চেয়ে পাওয়া যাবে। আবার দুয়েকজন আছেন যারা আমাকে সাইকেল চালাতে দিতে রাজি নয়। আমি ছোট ছেলে, যদি সাইকেল চালাতে গিয়ে আমার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। বিমুখ হয়ে যাই পরিচিতজনের কাছে গিয়ে, আবার আবদার করি, আবার ফিরিয়ে দেন তারা। তবে কি সাইকেল চালানো শেখা হবেনা! মনে বল রেখে চেষ্টা চালাতে থাকি, হাল ছেড়ে দেবার মতো ছেলে আমি নই, সে বিশ্বাস আছে নিজের উপর।

আমাদের পাড়ায় অনেক ছেলেদের দেখা যায় তারা ছোট ছোট সাইকেল চালায় দলবেঁধে, অথচ তাদের নিজেদের সাইকেল নেই, সেটা আমি ভালো করে জানি। তাদের কাছেও চেয়েছিলাম সেই ছোট বাইসাইকেল চালানোর জন্য। তারা ভাড়ায় সাইকেল এনেছে বলে আমাকে চালাতে দিতে রাজি নয়। অনেকটা অবাক হয়ে গিয়েছি, ভাড়াতেও সাইকেল পাওয়া যায়! অনেক ভাবনার পর এক পর্যায়ে ভাড়ার সাইকেল দিয়ে বাইসাইকেল চালানো শেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের পাশের বাড়ির সমবয়সী জাকির, পাপ্পু সিরাজ রেজ্জাককে ধরে ভাড়ায় সাইকেল এনে দিতে রাজি করাই, তবে জুড়ে দেয় শর্ত। তাদের শর্ত হলো- প্রতি ঘণ্টারসাইকেল  ভাড়া তিনটাকা, তারা ভাড়ায় সাইকেল এনে দিবে কিন্তু এজন্য আমার টাকায় তাদের একঘণ্টা সাইকেল চালাতে দিতে হবে। আমি তাতেই রাজি হয়ে যাই।
যাহোক আমার বাসায় রাখা টাকা জমানোর মাটির ব্যাংক সবার অগোচরে ভেঙে টাকা নিয়ে তাদের সাথে ভাড়ায় সাইকেল নিতে যাই। রংপুর স্টেশন রোডস্থ ঘোড়াপীর মাজারের কাছে  গোলাম রসুলের সাইকেল গ্যারেজে। গোলাম রসুল দীর্ঘদিন থেকে সাইকেল ভাড়া দিয়ে আমার মতো বয়সের ছেলেদের কাছ থেকে অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন, কারণ তিনি সবাইকে বিশ্বাস করে ভাড়ার বিনিময়ে সাইকেল চালাতে দেন। ছিপছিপে গড়নের লম্বা আর পান খেকো মানুষ গোলাম রসুল। দ্বৈত মেজাজের মানুষ। কারো সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলেন, কারো সঙ্গে দেখান নমনীয়তা। তিনিই রংপরে প্রথম ভাড়ায় চালিত সাইকেলের ব্যবসায়ী।

যা হোক সব শর্ত মেনে নিয়ে তিন ঘণ্টার জন্য সাইকেল আনা হলো। তাদের ভাগে যে একঘণ্টা দিতে চেয়েছিলাম সেটা তারা আগে চালিয়ে সাইকেল আমার হাতে তুলে দেয়। মহা আনন্দে সাইকেল হাতে নিয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাবার উপক্রম। কিন্তু প্রথমেই সাইকেলের চাকার দিকে চোখ যেতেই হতবাক! সামনের চাকা ছোট আর পিছনের চাকা সাইজে বেশ বড়, এই চাকা ছোটবড় হলে কোন্ ধরণের ক্ষতি হয় তা আমার জানা নেই। মরিচার প্রলেপে রিং দুটো অনেক মোটা আর বেশ ওজনদার মনে হয়েছে। সাইকেলের বেল তো দূরের কথা বিভিন্ন জায়গায় ওয়েল্ডিং করা হ্যান্ডেলের কানে ব্রেকের বার ও ব্রেক সু কিছুই নেই। যে কারণে ব্রেক ধরে সাইকেল থামানোর কোনো ব্যাবস্থা থাকবার কথা নয়। এবার সাইকেলের হ্যান্ডেল দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরে বিশাল এক মাঠের মাঝখানে নিয়ে তার উপর উঠতে চেষ্টা শুরু করি, এক সময় উপরে উঠে দু’পা মাটিতে স্পর্শ করে হাঁটতে থাকি, মাঝে মাঝে প্যাডেলে পা-দুখানা তুলে দেবার বৃথাচেষ্টা। আবার চেষ্টা- আবার চেষ্টা। এভাবে কিছুক্ষণ ব্যর্থ হবার পর আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে পাপ্পু। সাইকেলের পিছন দিকে ধরে আমাকে সাইকেল চালানো শিখতে সাহায্য করে। তার সহযোগিতা নিয়ে সিটে বসে যে বিড়ম্বনা আমাকে গ্রাস করে তা হলো- কাঠ দিয়ে তৈরি ফাটল ধরা ড্রাইভিং সিটের চিপায় আটকে চিমটি কাটতে থাকে প্যান্ট এবং… তবুও চিনচিনে ব্যথা নিয়ে প্যাডেল ঘুরাতে থাকি।
থাকি। পাপ্পু বেশ কিছুক্ষণ সাইকেল ধরে রাখার পর হাত ছেড়ে দেয়, আমি পড়ে যাবো এমন মুহূর্তে আবার ধরে রাখে, এমন ধরা ছাড়ার মধ্যে এক সময় ছেলেটি সাইকেলের পিছন থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে পিছু হটে। কাঁপাকাঁপা হাত, পায়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চালাতে থাকি সাধের বাইসাইকেল আর নান্টু ঘটক সিনেমার সেই আলোচিত গান ‘চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া, ঢাকা শহর দেখবো আজ দুইজনে ঘুইরা ঘুইরা, ও-হ-ও… পাবলিক ভাই সাইকেলের ব্রেক নাই’..

গানটি শেষ হতে না হতেই একদল কুকুরের আবির্ভাব হলো আমার সাইকেলের সামনে, কূল রাখি না মান রাখি অবস্থা শুরু হয়। কুকুরের গ্রুপটি দু দলে বিভক্ত হয়ে তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে আমার সাইকেলের সামনে, অবস্থার বেগতিক দেখে জোড়ে জোড়ে প্যাডেল চালানোর বৃথা চেষ্টায় এক সময় মুখ থুবড়ে মাটিতে পতিত হই সাইকেল সমেত। লজ্জা ও ভয় নিয়ে কোনোরকম উঠে গা থেকে ধূলা ঝাড়ছিলাম আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলাম কেউ আবার দেখে ফেলে নাকি। ধুলির সাথে সব লজ্জা আর ভয়কে ঝেড়ে আবার সাইকেলে চেপে বসে চালানো শুরু করি। 

এভাবে চালাতে চালাতে সারা মাঠ ঘুরছি আর ঘুরছি। মনে হয়-‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।’ গানের সাথে চলতে থাকে আমার হাওয়াই সাইকেল। অনেক্ষণ চালানোর পর সাইকেল থেকে নামব মনে করে গতি কমাতে থাকি, কিন্তু বিধিবাম! সাইকেলে তো ব্রেকই নেই! নামতে পারি না সাইকেল থেকে, কেনো নামতে পারিনা-কিভাবে নামতে হয় তা তো জানি না। সাইকেল থেকে নামার ভাবনায় আবারো হাত কাঁপতে শুরু হয়। হাত যখন কাঁপছেই কী আর করার, আবার চালাতে শুরু করি। কিন্তু নামতে যে হবে আমাকে, পিছন ফিরে দেখি আমার স্বজনরা কেউ নেই। মহাবিপদেও চালাই সাইকেল। এক সময় মাথায় হঠাৎ বুদ্ধির উদয় হয়, যেই বুদ্ধি সেই কাজ। মাঠের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছে গিয়ে সাইকেলসহ গা ঘেঁষে নামতে হবে। আর সেখানেই ঘটে আর এক বিড়ম্বনা- সাথে সাথে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যাই মাটিতে, তখন আমার টাকায় ভাড়া করা বাইসাইকেলটি আমারই গায়ের উপর অবস্থান করছিল। সাইকেলের নিচে থেকেও বুঝতে পারছিলাম প্যাডেলের মাথায় পা লেগে বেশ অনেক খানি জায়গা কেটে গিয়েছে। রক্ত ঝরছে কেটে যাওয়া স্থান থেকে। আঘাতের চোটে  কিছুক্ষণ পর দেখি কোত্থেকে যেন দৌড়ে এলো বন্ধুরা, তারা সাইকেলের রাহুগ্রাস থেকে আমাকে মুক্ত করে, দুজন আমার দুহাত তাদের কাধের উপর নিয়ে গাছের ছায়ায় বসায়। ক্ষতস্থানে দুর্বাঘাস চিবিয়ে লাগিয়ে দেয়। সেখানে কিছুক্ষণ চিকিৎসার পর আমাদের বাসার অদূরে রেখে তারা ভাড়ার সাইকেল নিয়ে চলে যায়। আহত আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাসায় যাই। পরে অনেকগুলো মিথ্যা কথা বলে সে যাত্রায় বাবার কাছ থেকে রক্ষা পেলেও মা ঘটনাটি বুঝতে পেরে অনেক শাসিয়েছিল এবং সাধারণ ক্ষমা করে সাবধান করে দিয়েছিলেন। এতো কিছুর পরও মাঝে মাঝে ভাড়ার সাইকেল চালিয়ে বাইসাইকেল চালানো শিখেছিলাম আমি…

Latest posts by সোহানুর রহমান শাহীন (see all)

Comments are closed.