মুগ্ধতা.কম

১৫ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৩৮ অপরাহ্ণ ; 431 Views

সুমাইয়ার একদিন

গল্প - সুমাইয়ার একদিন

এই সময়টা সুমাইয়ার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে খেয়াল করে দেখেছে প্রতিদিন ঠিক একই সময় তার এমন লাগে।

প্রতিদিন ঠিক ৩.৪৫ মিনিটে তার এমন লাগে। সকালে একটু দেরী করে ওঠার অভ্যাস সুমাইয়ার ছোটকাল থেকেই। এজন্য কতো সমস্যা হয়েছে। সকালের প্রথম ক্লাসটা খুব কমই করা হয়েছে।

বরাবরই মেধাবী ছাত্রী সুমাইয়া। প্রথম, দ্বিতীয় না হলেও ভালোভাবেই পাশ করেছে বোর্ডের সব পরীক্ষাগুলোয়। এখন মাষ্টার্স করছে শহরের একটা নামকরা কলেজে।

কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। বাড়িতে চলে আসতে হয়েছে।

এ শহর, এ কোলাহল ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। এ শহরে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, ঘুরা যায় ইচ্ছে মতো। এ শহরে তার প্রেমিক থাকে।

ঘুম থেকে উঠে সংসারের টুকটাক কাজে মাকে সাহায্য করা, ভাতিজা, ভাতিজির সাথে খেলা করা তারপর গোসল করে খাওয়া। সবাই যে যার ঘরে চলে যায়।

দোতলার উত্তরের ঘরটায় আসার পর আর সময় কাটে না।

শুয়ে মোবাইলে ফেসবুক চালাতে-চালাতে ঠিক ৩.৪৫ মিনিটে দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন জানলার পাশে দাঁড়াতে হয়।

অনেকদিন আগে তখন সুমাইয়ার বয়স নয় বছর। দাদাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সুমাইয়া। ঈদের ছুটি। সব চাচাতো ভাইবোনেরা দুপুরে বাড়ির পিছনে পুকুরে গেল গোসল করতে। মা কে না বলে সুমাইয়াও গিয়েছিল। সাঁতার না জানা সুমাইয়া কিছুক্ষণ পর টের পায় তার পায়ের নিচে আর মাটি নাই। একটা আতংক চেপে ধরে, মনে কোন চিন্তা নাই, চিন্তা নাই মায়ের কথা, প্রিয় জামা এসব কিছুই মাথায় আসছিল না। শুধু নিজের অজান্তে হাত- পা ছুঁড়তে থাকে। তার এমন হাত-পা ছোঁড়া দেখে চাচাতো বড়বোন লতা এগিয়ে আসে। ধাক্কা দিয়ে নিয়ে আসে পাড়ের কাছে।

৩.৪৫ মিনিটে সুমাইয়ার ঠিক একই অনুভূতি হয়। পানিতে পড়ার অনুভূতি।

ছোটবেলায় এই দমবন্ধ থেকে বাঁচানোর জন্য বড় বোন ছিলো আজ কেউ নেই। জানলার কাছে এসে দাঁড়ালে সুমাইয়ার ভালো লাগে।

জানলার ওপাশে সজনা গাছ। গাছটাতে একটা-দুটা পাখি সবসময় কিচিরমিচির করে। বড় ভালো লাগে। কিছুক্ষণ পর শ্বাসকষ্ট কমে যায়। তারপর কিছুক্ষণ গল্পের বই পড়া।

অনিকের সাথে গত কয়েকদিন ধরে মনোমালিন্য চলছে। বিষয়টা খুবই সাধারণ ছিল। যেদিন হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেল সেদিন অনিককে সুমাইয়া বলেছিল যেন সে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। অনিক কী একটা কাজের কথা বলে আর যায়নি। বিষয়টাকে হালকা ভাবে দেখলেও চলতো কিন্তু সুমাইয়ার মন খারাপ এজন্য যে অনিকের সাথে আবার কবে দেখা হবে তার নেই ঠিক। অনিক কি পারতো না রেখে আসতে?

বিকাল হয়ে এলো। বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে শিশু কন্ঠে আযান শোনা যাচ্ছে। হয়তো মাদ্রাসার ছাত্রের আযান দেবার হাতেখড়ি হচ্ছে। সুমাইয়া মন দিয়ে শোনে। কি কোমল আর মিষ্টি কন্ঠ! নামাজের জন্য ডাকছে কিন্তু কেউ যেতে পারছে না করোনার কারণে। সবাই ঘরে বন্দী।

কে কবে ভেবেছিল এমন হবে?

সুমাইয়ার ভালো লাগে না। রাতে মায়ের সাথে টিভি দেখার সময় ফোনটা এলো। কফিল চাচা অসুস্থ। কফিল চাচা গ্রামে থাকে। দুপুর থেকে বুকে ব্যথা। পল্লী চিকিৎসক গ্যাসের ঔষধ দিয়েছে কিন্তু একটুও কমে নি।

সন্ধ্যায় আর না থাকতে পেরে ফোন দিয়েছে শেফালি। কফিল চাচার একমাত্র সন্তান। সব শুনে সুমাইয়া কফিল চাচাকে হাসপাতালে আনতে বললো।

সন্ধ্যা ছয়টা, বাইরে বের হওয়া নিষেধ। তারপরও সুমাইয়া হাসপাতালে রওনা দিল। বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ। সুমাইয়া এসে দেখে কফিল চাচা ভ্যানে শুয়ে আছে।

শেফালি কেঁদে কেঁদে বললো, ডাক্তার সাহেব রংপুর মেডিকেল কলেজে রেফার্ড করেছেন। হার্টের সমস্যা। দ্রুত নিয়ে যেতে হবে। সুমাইয়া কী করবে বুঝতে না পেরে মোবাইলের লক খুলে সজলকে ফোন দেয়।

সজল রংপুর মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নি করছে। সজল সব শুনে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলে। এ্যাম্বুলেন্স নষ্ট বাধ্য হয়ে তিনগুন বেশী ভাড়ায় তারা দুই নারী আর তাদের আধিয়ার মানিক রওনা হলো মাইক্রোবাসে।

মাইক্রোবাসের সিটে কফিল চাচাকে কোনমতে শুইয়ে তারা গাদাগাদি করে বসে। মাঝপথে কফিল চাচার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। ড্রাইভার সাহেব আর একটু জোরে যান বলে সুমাইয়া চাতক চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো, হায় আজ হাসপাতাল এতো দূরে কেন?

 

ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ
চিকিৎসক ও লেখক রংপুর।

 

এই লেখাটি #মুগ্ধতা_সাহিত্য প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিযোগিতার নিয়ম জানতে ক্লিক করুন এখানে