স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি: কবি ভিস্লাভা শিমবরস্কা (১৯২৩ – ২০১২)

মাসুদ বশীর

২৪ আগস্ট, ২০২০ , ১:২২ অপরাহ্ণ ; 333 Views

স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি - কবি ভিস্লাভা শিমবরস্কা

কবি ও কবিতার এক মূর্ত প্রতিচ্ছবি নোবেলজয়ী পোলিশ কবি ভিস্লাভা শিমবরস্কা। প্রচার বিমুখ ও অন্তর্মুখি চরিত্রের কারণে বিশ্ব দরবারে তাঁর পরিচিতি তেমন একটা ব্যাপক নয়। শিমবরস্কার কবিতার বইও ইংরেজিতে তেমন একটা অনূদিত হয়নি। নোবেল কমিটি ১৯৯৬ সালে এই নিভৃতচারী কবিকেই নোবেল পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করে।

কবি ভিস্লাভা শিমবরস্কা

কবি ভিস্লাভা শিমবরস্কা

এই আধুনিক পোলিশ কবি ভিস্লাভা শিমবরস্কা’র জন্ম পোলান্ডের পোজনান শহরের কাছে কোরনিক গ্রামে- এ্যানা মারিয়া নি রোটেরমান্ড এবং ভিনসেন্ট শিম্বোরস্কী দম্পতির ঘরে ১৯২৩ সালের ২রা জুলাই। কবি’র বয়স যখন আট তখন তিনি পরিবারের সাথে ক্রাকাউ শহরে চলে আসেন। বিশ্ববিখ্যাত জাগোলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সমাজতত্ত্ব ও পোলিশ সাহিত্য নিয়ে।

পড়াশোনা করেন। বাইশ বছর বয়সে “I seek the word” শিরোনামে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ‘স্ট্রাগল’ নামক একটি পত্রিকায়। এরপর তাঁর শব্দসন্ধানের নিরন্তর সংগ্রাম আর থেমে থাকেনি। প্রথম জীবনে পূর্ব-ইউরোপীয় কবিদের মতোন তিনিও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা, শান্তিবাদী, যুদ্ধবিরোধী মানবিক বোধের কবিতাই বেশি লিখতেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতার বইয়ের প্রায় সবগুলো কবিতাই ছিলো এই ধারার। কিন্তু আস্তে আস্তে শিমবরস্কা নিজেকে ভাঙতে থাকেন এবং নিজেকে পাল্টিয়ে ফেলেন একদম সুনিপুণভাবে, তাই দেখা যায় তাঁর প্রথম জীবনের লেখা সব কবিতাকে তিনি নির্দ্বিধায় অস্বীকার করেন এবং ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর নির্বাচিত কবিতাগ্রন্থে প্রথম কবিতার বইয়ের একটি কবিতাও স্থান পায়নি। ভিন্ন মননে- রাজনীতি, সমাজনীতির বদলে তাঁর কবিতায় প্রবলভাবে স্থান করে নেয় মানবসম্পর্ক, স্বপ্নকল্পনাবোধ ও ভালোবাসা। সহজসরল সাবলীল ভাষায়- প্রকরণের উচ্চকন্ঠ, সহজ ভাষণের পরিবর্তে গভীর, গোপন ইঙ্গিতময় মিথকথনের অমায়িক উপস্থাপন লক্ষ্য করা যায় তাঁর লেখা পরবর্তী কবিতাগুলোতে এবং এর পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর “Calling out of Yeti” গ্রন্থে। এই গ্রন্থে দেখা যায় ভিস্লাভা একবারে স্বতন্ত্র ও মৌলিক।

ভিস্লাভা একজন আদ্যোপান্ত কবি। তিনি প্রথম জীবনে কিছু ছোটগল্প লিখলেও তা ছাপতে দেননি মোটেও এবং কখনো নাটক-নভেল লেখারও একদম চেষ্টা করেননি কোনদিনও। কবিতা লেখার বাইরে কবি আরও দুটো কাজ করেছেন একটি হলো অনুবাদ আর একটি গ্রন্থ সমালোচনা, অনুবাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র করেছেন কবিতার অনুবাদ।

ভিস্লাভার কবিতা অস্তিত্ববাদ সম্পর্কে গভীরভাবে প্রশ্ন করে থাকে, যা তার কবিতার ধরনের মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং এর শ্রেণীকরণ কোনখান থেকে ধার করা যায় না। তিনি কোনো একটি বিষয়কে প্রাণপণে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম স্থানে নিয়ে যান। তিনি বর্তমানের কোনো অভিজ্ঞতা ও উপকরণকে যন্ত্রের মতো বুনন করে রাখেন। যাকে ঘিরে  থাকে এখনকার ক্ষণস্থায়ী সময় এবং প্রতিদিনকার জীবনযাপন। চারিত্রিকভাবে তার কবিতাগুলো খুবই  সরল। তাঁর ব্যক্তিগত ভাষা ঠিক সমসাময়িক ভাষার মতোন নয় এবং কবিতায় চেতনা এবং সহানুভূতিগুলো প্রকাশিত হয় সামান্য ঘুরপাক খেয়ে। যার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় আধ্যাত্মিক চেতনার আকর্ষণীয় সমন্বয়।

শিমবরস্কার কবিতা সর্ম্পকে The New York Times Magazine -Gi EDWARD  HIRSCH  বলেছেন, শিমবরস্কা তার কবিতায় সামগ্রিক চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের একটি মর্যাদাপূর্ণ বিদগ্ধ যুক্তি দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছেন। সম্ভবত তার কবিতা পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারবে না। কিন্তু শিমবরস্কার কবিতা লেখার পরে এই পৃথিবীটা ঠিক আগের অবস্থায় থাকবে না। তিনি আমাদের শেখানোর চেষ্টা করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর যে নাম দিয়েছি তাকে কীভাবে এবং কোন কৌশলে উপেক্ষা করা যায়।’

এই মহান কবি দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন এবং ২০১২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ৮৮ বছর বয়সে পোল্যান্ডের ক্রাকোভ শহরে নিজ বাসভবনে নিদ্রারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বলেন, ‘শিমবরস্কা ছিলেন পোল্যান্ডের জাতীয় বিবেকের অভিভাবক। তার প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট ঘটনা ও কবিতায় রয়েছে বুদ্ধিদীপ্ত উপদেশ, যা বিশ্ববাসী ধীরে ধীরে অনুভব করবে।’

এই মহান কবি’র অম্লান স্মৃতির প্রতি রইলো আমার একরাশ বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।

_______________________________________________

ভিস্লাভা শিমবরস্কা’র কয়েকটি অনুদিত কবিতা

অনুবাদঃ আলম খোরশেদ 

ভোর চারটেয়

রাত ও দিনের সন্ধিক্ষণ,

এপাশ থেকে ওপাশ ফেরার মুহূর্ত।

ত্রিশোত্তরের সময়।

 

কাকের কর্কশ চিৎকারে দীর্ণ,

পৃথিবীর প্রতারণার কাল।

নির্বাপিত নক্ষত্র থেকে হাওয়া আসে।

মনে হয় এর-পর-আর-কিছুই-নেই।

 

ফাঁপা বেলা।

শূন্য, ফাঁকা।

আর সব ঘন্টার তলানি।

 

ভোর চারটেয় কেউ ভালো থাকে না।

পিঁপড়েরা যদি ভালো বোধ করে ভোর চারটেয়

তবে তাদের জন্য তিন উল্লাস।আমাদের যদি বাঁচতে হয়

তবে ঘড়িতে পাঁচটা বাজুক।

অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ

আমরা খুব ভালো ব্যবহার করি পরস্পরের সঙ্গে।

জোর দিয়ে বলি এত বছর বাদে দেখা হয়ে কী ভালোই না লাগছে।

 

আমাদের বাঘেরা দুধ পান করে।

আমাদের শকুনেরা মাটিতে হাঁটে।

আমাদের হাঙ্গরেরা নদীতে ডোবে।

আমাদের নেকড়েরা খোলা খাঁচার সামনে বসে হাই তোলে।

 

আমাদের সর্পেরা বিদ্যুচ্চমক খসিয়ে দিয়েছে,

বানরের প্রেরণা আর ময়ূরেরা পালক।

অনেক দিন হয় বাদুড়েরা উড়ে গেছে আমাদের চুল থেকে।

 

আমরা বাক্যের মাঝে চুপ হয়ে যাই,

হাসি পরিত্রাণের অতীত।

আমাদের লোকদের

কিছুই বলার নেই আর।

ভিয়েতনাম

কী নাম তোমার নারী?___বলতে পারি না।

কোথায় তোমার বাড়ি, জন্মেছিলে কবে?___বলতে পারি না।

মাটিতে খুঁড়েছ কেন এই গর্ত?___বলতে পারি না।

এখানে লুকিয়ে আছ কত দিন?___বলতে পারি না।

মিত্রের হাত কেন কামড়ে দিয়েছিলে তুমি?___বলতে পারি না।

আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করব না, জানতে না তুমি?___না।

তুমি কার দলে?___বলতে পারি না।

লড়াই চলছে, পক্ষ বেছে নিতে হবেই তোমাকে।___বলতে পারি না।

তোমার গ্রামের কী খবর, টিকে আছে আজো?___বলতে পারি না।

এরা কি তোমার ছেলেমেয়ে?___হ্যাঁ।

প্রত্যাবর্তন

সে বাড়ি ফেরে। কথা বলে না কোনো।

নিশ্চিত খারাপ কিছু ঘটেছে।

সে জামাজুতো নিয়েই শুয়ে পড়ে।

মাথা গুঁজে দেয় কম্বলের নিচে।

পা দুটো কুঁকড়ে নেয়।

বয়স তার চল্লিশ, যদিও এ মুহূর্তে নয়।

এখন তার অবস্থান মাতৃজরায়ুর

সপ্তম আবরণের এলাকার সুরক্ষিত অন্ধকারে।

কাল সে মহাকাশ নিয়ে বক্তৃতা দেবে।

 

আত্মসমালোচনার সমর্থনে

শকুন তার নিজের দোষ দেখে না।

কৃঞ্চচিতার কাছে বিবেক অপরিচিত।

সারমেয় তার কাজের ঔচিত্যকে সন্দেহ করে না।

ঘুঙুর সাপ বিনা ভাবনায় নিজেকে অনুমোদন করে।

 

আত্মসন্দিহান শৃগালের কোন অস্তিত্ব নেই।

কুমির, পঙ্গপাল, ঘাসফড়িং, ক্যাঙ্গারু

নিজের খুশিমতো বাঁচে এবং বেঁচে খুশি থাকে।

 

ঘাতক তিমির হৃৎপিণ্ডের ওজন এক শ’ মন,

তবে অন্য বিবেচনায় তা নিছকই হালকা।

 

সূর্যবলয়ের এই তৃতীয় গ্রহে

পরিচ্ছন্ন বিবেকের চেয়ে

পশুসুলভ আর কিছু নেই।

 

মাসুদ বশীর
Latest posts by মাসুদ বশীর (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •