আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২

জাকির আহমদ

১৩ মার্চ, ২০২০ , ৪:২৪ অপরাহ্ণ ; 953 Views

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২ 1

পর্ব – ২

‘মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা কর, তা কখনোই সম্ভব না। এতে তুমিও ডুবে মরবে।’ বলল ডাক্তার।

‘আপনি শুধু ভেসে থাকবেন। আপনাকে আমি হাত দিয়ে টেনে নিয়ে যাব।’ যেন অনুরোধ ঝরে পড়ল ছেলেটির কণ্ঠে। ছেলেটির কথা শুনে কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেলল ডাক্তার। অতি কষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘দয়া করে আমার কথা বোঝার চেষ্টা কর বাবা। তুমি অহেতুক আমার জন্যঅপেক্ষা করে নিজের শক্তি নিঃশেষ কর না। তুমি আমাকে নিয়ে সাঁতরে যেতে চাইলেও হয়তো শেষে দুজনেই ডুবে মরব। কারণ তোমার বাঁচার জন্য আরো শক্তির প্রয়োজন। দুজন বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে দুজনে মরার চেয়ে একজন বাঁচা ভালো। আর জন্ম-মৃত্যু সবই তো আল্লাহর হাতে। আমাকে টেনে নিয়ে যাবে কী, আমি তো আর ভেসেই থাকতে পারছি না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো ডুবে যাব। আমার শেষ অনুরোধ রেখ বাবা।’ বলে ছেলেটির হাতে তার সুস্থ ডান হাতটি রাখল। ‘তুমি চলে যাও। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য চেয়ে বাঁচার চেষ্টা কর। তুমি আমার সঙ্গে যে আচরণ করলে তাতে আল্লাহ্ তোমাকে অবশ্যই এ বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। আমি দোয়া করি।’ ছেলেটাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে একনাগাড়ে বলে গেল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত মানুষটি।

‘চলে যাও।’ ছেলেটির মধ্যে চলে না যাওয়ার ভাব দেখে বলল ডাক্তার, আমি নিয়ত করে ফেললাম, তুমি যদি চলে না যাও, তবে আমি এখনই আর ভেসে থাকার চেষ্টা না করে ডুবে যাব। আর তুমি চলে গেলে যতক্ষণ পারি ভেসে থেকে আল্লাহ্র দরবারে তওবা করে দোয়া-দরুদ পড়ব। তারপর হয়তো…।’ কথা শেষ না করে ছেলেটিকে টেনে নিয়ে কপালে স্নেহের চুমো দিয়ে ছেড়ে দিল। তারপর পরস্পর সালাম ও মুসাফাহা করার পর শেষবার লোকটির দিকে তাকিয়ে যেন বাধ্য হয়েই সামনের দিকে যাত্রা করল ছেলেটি অজানার উদ্দেশে। জানে না আর কতক্ষণ সে এভাবে এগোতে পারবে। বেশ ক্ষাণিকটা এগিয়ে এসেছে। এখন আর লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ করে খেয়াল হলো, ‘আমি কোনদিকে সাঁতরাচ্ছি?’ তাকিয়ে দেখে চাঁদ মাথার ওপরে। মহাসমস্যা হয়ে গেল। চাঁদ দক্ষিণ দিকে হেলে থাকায় উত্তর-দক্ষিণ বোঝা গেলেও পূর্ব-পশ্চিম বোঝা যাচ্ছে। অগত্যা অন্য উপায় না দেখে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।

অনেকক্ষণ সাঁতরানোর পর যখন চাঁদের দিকে তাকাল, তখন চাঁদ পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আর ভুলটা তখনই বুঝতে পেরে আঁতকে উঠল। এমনিতে সাঁতরিয়ে পূর্ব দিকে অজানার উদ্দেশে তারা পাড়ি জমিয়েছিল। তারা জানত না কোথায় যাচ্ছে। শক্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো আর সাঁতরাতে পারবে না। তার ওপর যেদিক থেকে এসেছে, সেদিকেই সাঁতরানো। ঠিক করতে না পেরে কী আর করা! সবই তো সেই মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। ঘুরে আবার রওনা দিল পূর্ব দিকে। কারণ পশ্চিমটা তার পরিচিত। সেদিকে যাওয়া বোকামি। পূর্ব দিকে যাচ্ছিল, সেদিকেই যাবে। কপালে যা থাকে থাকুক।

বারবার পেছন ফিরে তাকিয়ে মেয়েটিকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ডানে-বাঁয়েও তাকাচ্ছে কোনো দ্বীপের সন্ধানে। ফলে বেশ কষ্ট হচ্ছে। পা দুটো যেন আর নড়তে রাজি নয়। সারা দেহ ক্লান্তি ও উদ্বেগে প্রায় অবশ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এখনো কিছুই চোখে পড়ছে না। ‘ইস, আশপাশে যদি জাহাজ বা নৌকা দেখা যেত।’ পরমুহূর্তেই দমে গেল এই কথা ভেবে যে, একদম পাশ দিয়ে না গেলে কোনো লাভ নেই। কারণ অনেক দূর দিয়ে গেলে তাকে তাদের দেখতে পাওয়ার কথা নয়। সেও কোনো সাহায্য সঙ্কেত পাঠাতে পারবে না। ডাকলেও শুনতে পাবে না। না, বাঁচার কোনো আশা আপাতত নেই। এর মধ্যেই পা দুটো থেমে গেছে। কপাল ফেটে যাওয়া জায়গাটা থেকে অল্প অল্প রক্ত বের হলেও তা ধুয়ে যাচ্ছে লবণাক্ত পানিতে। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে, ফুলেও গেছে বেশ। বাচ্চাটা অনেকক্ষণ ধরে নড়াচড়াও করছে না। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে, থাক। শীতল পানি ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় যেন শরীরটা জমে যাচ্ছে। পা না নড়ালে তেমন এগোনোও যাচ্ছে না। আবার দিকও ঠিক রাখতে পারছে না । দিক ঠিক রাখা যেন আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। বারবার ঢেউয়ে জীবনতরী সরে যায় বা যেতে চাচ্ছে। অনেক সময় যেমন ঢেউয়ের কারণে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে পিছিয়েও যাচ্ছে। এর ফলে একটানা এগোতে পারছে না। তবু একবারও থামেনি বলে অনেকদূর এগিয়েছে। আর এগোতে পারছে না। গত কয়েক ঘণ্টায় এবারই প্রথম থামল। শেষ পর্যন্ত যখন কোনো ডাঙায় পৌঁছতে পারবে না, তখন অহেতুক কষ্ট না করে বিশ্রাম নিয়ে মরাই ভালো। তাতে খানিক শান্তি পাওয়া যেতে পারে।

বিমানে  বাচ্চা মেয়েটির সুমিষ্ট কথা, আপু বলে ডেকে এটা-ওটা সম্বন্ধে প্রশ্ন করার দৃশ্য খেয়াল হতেই পরমুহূর্তে আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে দৃঢ়সংকল্প নিয়ে ফেলল যে, শুধু এই শিশুটির জন্যই তাকে প্রাণপণ বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। তাই চিন্তা করতে লাগল, কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়। তারপর ধীরে ধীরে পা চালিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে তাকে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না। সেভাবেই সে সব শক্তি এক করে ধীরে ধীরে ঢেউ ভেঙে এগিয়ে যেতে লাগল। জানে না কোথায় যাবে, শুধু এতটুকু জানে, যতক্ষণ প্রাণ আছে, এগোতে হবে। পরিশ্রমে শরীরটা কিছুটা উষ্ণ হলেও বাচ্চাটির শরীর একদম ঠান্ডা হয়ে আছে। সেটাকে সে বিশেষ পাত্তা দিল না। মনে করল, ঠান্ডার জন্যই গা ঠান্ডা হয়ে গেছে। এগোতে লাগল প্রাণপণ চেষ্টা করে।

একসময় পূর্বাকাশ ফিকে হয়ে এলো। চাঁদের আলো কমে গেল। ভোরের দিকে চাঁদও অস্পষ্ট হয়ে এলো। এখনো অন্ধকার কাটেনি। এ অবস্থায় যাতে অন্যদিকে ঘুরে না যায়, সে জন্য সতর্ক অনুভূতি জাগ্রত রেখে বেশ কিছুক্ষণ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর অনেক দূরে একটা উঁচু অবয়ব দেখা যেতেই মনের জোর অনেকখানি বেড়ে গেল। তারপর সর্বশক্তি দিয়ে পা নেড়ে দ্রুত এগোতে লাগল। যখন সামনের দ্বীপের অবয়ব চোখে পরিষ্কার ভেসে উঠল, তখন পূর্বাকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। আরো কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখা গেল সূর্য। এখন ভালোভাবে দ্বীপটা দেখা যেতে লাগল। আরো কিছুক্ষণ এগোনোর পর দ্বীপের কয়েকশ’ গজের মধ্যে চলে এলো। কিন্তু তারপর আর এগোনো যাচ্ছে না। কারণ যে ঢেউ দ্বীপের তীরে আছড়ে পড়ছে তা আবার পেছনে ফিরে যাচ্ছে। ফলে সামনের দিকে এগোলেও আবার পেছনে ফিরে আসতে হচ্ছে।

কিছুতেই তীরে পৌঁছা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটাকে বাম হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে যতদূর সম্ভব পানি থেকে উঁচু করে দেহের সঙ্গে জড়িয়ে ডান হাত থেকে দরজাটা ছেড়ে দিয়ে গা ছেড়ে দিল পানিতে। একদম ডুবো ডুবো অবস্থা। কোনোরকমে মুখটা পানির ওপর ভাসিয়ে ডান হাত ও দুপা দিয়ে অতিকষ্টে সামনের দিকে এগোতে লাগল। এভাবে যখনই পেছন থেকে ঢেউ সামনে ঠেলে দেয়, তখন শুধু ভেসে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই যখন ঢেউ ফিরে আসে, তখন পূর্বক্ষণে সাঁতার না কাটার শক্তিটুকু দিয়ে প্রাণপণে সাঁতার কেটে সে জায়গায় টিকে থাকে, তেমন পিছিয়ে যায় না। পেছন থেকে ঢেউ আবার সামনে ঠেলে দেয়। এভাবেই একসময় তীরে এসে পৌঁছাল দুজন। অতিকষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে পানি থেকে একটু ওপরে ভেজা বালুতে বাচ্চাটাকে বুকের ওপর নিয়ে শুয়ে পড়ল মেয়েটি।

অত্যন্ত ধীরে ধীরে সাঁতার কেটে এগিয়ে যেতে লাগল ছেলেটি। এর ফলে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়বে না। মুখে আল্লাহকে ডেকেই চলল। কারো চেষ্টা সঠিক থাকলে আল্লাহ্ তাকে ঠিকই সাহায্য করেন। কতক্ষণ ধরে কীভাবে ক্লান্তিহীনভাবে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলেছে বলতে পারবে না। একসময় ভোর হয়ে গেল। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো একদম কমে যাওয়ায় তাকে আর ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। সোজাই সাঁতরিয়ে চলল আরো কিছুক্ষণ। দিক ভুল হচ্ছে কিনা সেদিকেও তেমন নজর নেই। কারণ পূর্বাকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। সূর্যোদয়ের আর অল্প বাকি। ফজরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত অজু অবস্থায় আছে। সাঁতরাতে সাঁতরাতে ইশারায় পূর্ব দিকে নামাজ সমাপ্ত করে নিল। একসময় সূর্য বেশ ওপরে উঠল। তারপরও সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে অনেক দূরে উঁচু কী যেন একটা দেখা যাচ্ছে উত্তর দিকে। কিন্তু চোখ ঝাপসা হওয়ার কারণে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। হাত দিয়ে চোখ কচলিয়ে আবার তাকাল, দেখল একটা পাহাড়ের অবয়ব। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা যেন আর নড়তে চায় না। তারপরও সামনে ডাঙা দেখায় দ্বিগুণ জোরে আরো অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর পাশাপাশি দুটো দ্বীপ দেখতে পেল। একটা অনেক বড়, লম্বা আরো দূরে। সেথায় পাহাড় ও জঙ্গল দেখতে পেল। পাহাড়-জঙ্গল, নারকেল বীথি দেখা না গেলেও কয়েকটা বড় গাছ ও নারকেল গাছ দেখা গেল। তীরের কিছু পর থেকেই ছোট সবুজ জঙ্গল দেখা গেল। অনেকটা দূর থেকে সবুজ কার্পেটের মতোই লাগছে। সিদ্ধান্ত নিল সামনের দ্বীপটাতেই উঠবে। কারণ শরীর আর কোনো কিছুর বিনিময়েই চলতে চাচ্ছে না।

সাঁতার কাটতে কাটতে ছেলেটি দেখল, সামনের দ্বীপটায় ঢেউ সোজা আছড়ে পড়ছে। আবার দ্রুত ঢেউয়ের সৃষ্টি করে ফিরে আসছে। ছেলেটা চিন্তা করে দেখল, ফিরতি ঢেউ সে হয়তো কিছুতেই ভাঙতে পারবে না। এখন কোন দিক দিয়ে ওঠা যায়, তা লক্ষ্য করতে গিয়ে একটা দিকে চোখ আটকে গেল ছেলেটির। সেটা হলো দক্ষিণ দিক। সেদিকে ঢেউ গিয়ে আর ফিরে আসছে না। ব্যাপারটা বেশ কৌতূহলী করে তুলল ছেলেটিকে। নিজের অজান্তেই যেন সেদিকেই এগিয়ে গেল। তারপর ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠল। দ্বীপটা পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। তবে পেছন দেখা না যাওয়ায় প্রস্থ বোঝা যাচ্ছে না। আর স্রোত বইছে দক্ষিণ-পূর্ব কোণ বরাবর। স্রোত দক্ষিণ কোণের নীচু পাশ দিয়ে সবেগে বের হয়ে তার আপন পথে চলে যাচ্ছে। সেই স্রোত সামনে কোনো বাধা পাচ্ছে না বলে আর ফিরে আসছে না। বুদ্ধিটা হঠাৎ করেই মাথায় এলো। দক্ষিণ-পূর্বের সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে দ্বীপের দক্ষিণ কোণ পার হয়ে দক্ষিণ পাশে চলে এলো। তারপর সে যা চিন্তা করেছিল, সে অনুযায়ী দেখতে পেল, তা হলো দক্ষিণের বেশ পূর্ব দিকে স্রোত নেই বলেই পানি অনেকটা শান্ত।

খুব ধীরে ধীরে ছেলেটি দক্ষিণ-পূর্বে সরতে লাগল। একসময় প্রায় শান্ত পানিতে এসে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে সাঁতার কেটে তীরে এসে পড়ল। বুক দিয়ে হেঁটে কিছুটা সামনে এগিয়ে পানির মধ্যে শুয়ে পড়ল ছেলেটি। হালকা ঢেউয়ে তার কোমর পর্যন্ত ভিজিয়ে দিতে লাগল। সারা দেহে যেন লবণ লেগে আছে, এমন এক অবস্থা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ বলে আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল ছেলেটি। সে পর্যন্ত আল্লাহ্ তাকে পানি থেকে বাঁচিয়ে ডাঙায় এনে ফেলেছেন। তখন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শরীরটাকে কিছুটা শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দিয়ে অতিকষ্টে উঠে দাঁড়াল সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে অজু করে জোহরের নামাজ পড়ার জন্য।

মেয়েটি অনেকক্ষণ পর বাচ্চাটাকে নিয়ে উঠে বসল। তারপর বাচ্চাটাকে পরিষ্কার বালিতে শুইয়ে দিল। কিন্তু বাচ্চাটা একটুকুও নড়ল না। অজানা আশঙ্কায় মেয়েটির বুক কেঁপে উঠল। ক্লান্ত শরীর নিয়েও মেয়েটি অতি দ্রুত বাচ্চাটির পালস পরীক্ষা করে যখন কোনো সাড়া পেল না, তখন হৃৎপিণ্ডে বারবার কান পেতে দেখল তা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। হাত-পা নেড়ে দেখল তা শক্ত হয়ে আছে। রোদে মেয়েটির গা গরম হয়ে উঠলেও বাচ্চাটির গা অত্যন্ত শীতল হয়ে আছে, যা বোঝার বুঝে গেল সে। দুহাতে বাচ্চাটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল বেশ জোরে। চোখের পানি যেন বাঁধ ভেঙে নামছে। বাচ্চাটির বিরহ যেন সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কতক্ষণই না সমুদ্রে মৃত এ শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে ছিল। বাচ্চাটিকে দীর্ঘক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। ততক্ষণে সূর্য অনেক ওপরে উঠেছে, হালকা উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

বাচ্চাটাকে মাটিতে শুইয়ে রেখে দুহাত দিয়ে চোখ মুছল। খানিক পরপর ফুঁপিয়ে উঠছে। এর মধ্যে জামা-কাপড়সহ বাচ্চাটির দেহ শুকিয়ে গেছে। বাচ্চাটির লম্বা চুল বেণি করে সুন্দর করে বেঁধে দিল। গায়ে লেগে থাকা বালু হাত দিয়ে ঝেড়ে দিল। তারপর নিজের ওড়নাটি দিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে দিল। তবে সুন্দর নিষ্পাপ মুখটি ঢাকল না। কোলে করে পানির কিনারে নিয়ে এসে কয়েক মুহূর্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে ঠেলে দিল স্রোতের দিকে। ঢেউ একবার কিছুটা কাছে আনে, আবার দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। এভাবে ধীরে ধীরে অনেক দূরে চলে গেল। মেয়েটি বিদায়সূচক হাত নাড়াতে থাকল। কিন্তু অন্যপক্ষ থেকে জবাব নেই। একসময় দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। তবুও হাত নাড়তে লাগল অবচেতন মনে। অনেকক্ষণ ধরে চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।

জোহরের নামাজ পড়ার পর প্রচণ্ড ক্ষিদে টের পেল ছেলেটি। ক্ষিদে আর ক্লান্তিতে যেন চোখে আঁধার দেখতে লাগল। অতিকষ্টে নারকেল তলায় গিয়ে খাওয়ার মতো ভালো নারকেল পেল না। তবে গাছে অনেক আছে। পেটে কিছু যে দিতেই হবে। কী দেয়া যায়? মাথায় কিছুই আসছে না। সামনে কিছু তরতাজা দূর্বা ঘাস দেখা যাচ্ছে। এটাই পেটে দেয়া সহজ। তাই কালবিলম্ব না করে ডান হাতে ঘাস ছিঁড়ে মুখে দিতে লাগল। চিবানোর পর তা বেশ রসালো হয়ে উঠল। তারপর গিলে খেল। বেশ খানিকটা ঘাস খেয়ে কিছুটা ক্ষিদে মিটল। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে মুখ মুছে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ্’। আল্লাহ্ যে তার এ পরিস্থিতিতে তরতাজা ঘাসটুকুর ব্যবস্থা করেছেন, তারই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। তারপর একটা ছায়াদার গাছের নীচে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠে আসরের নামাজ পড়ে নিল। শরীরের কিছুটা শক্তিও পেল। কোনোমতে গাছে উঠে চারটে নারকেল পাড়ল।

তার কাছে কাঁচিওয়ালা চাবির রিংয়ে লাগেজের চাবি ছিল। লাগেজ তো পানির নিজে। তাই রিং থেকে কাঁচি খুলে লাগেজের চাবি দূর সমুদ্রে ফেলে দিল। কাঁচিটা মুড়ালে আর তা কাঁচি মনে হয় না। তা দিয়ে ছাল তুলে ভেতরে যে পানি ছিল, তা তৃপ্তি সহকারে পান করল। এতক্ষণে তার পানির পিপাসা মিটল। তারপর আছড়িয়ে নারকেল ফাটিয়ে ভেতরের সুস্বাদু আঁশ খেল। এতে দেহে অনেকটা শক্তি পেল। তারপর দ্বীপটা ঘুরে-ফিরে দেখল। খুব বেশি বড় নয়। লম্বায় দুই ও প্রস্থে দেড় মাইল হবে। পাহাড় নেই। কোনো ঘন জঙ্গল আছে, তবে পাতলা। হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপের অপর পাড়ে চলে এলো। প্রায় এক মাইল দূরে বড় দ্বীপটা দেখতে পেল। ওই দ্বীপে নারকেল বীথি, গাছপালা জঙ্গল এমনকি পাহাড়ও আছে।

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবতে বসেছে। আজ আর ওই দ্বীপে পাড়ি দেয়ার মতো শক্তি নেই। তাই রাতটা এখানেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। পরদিন খুব ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর চারটা নারকেলের অবশিষ্ট একটা খেয়ে রওনা হলো সামনের বড় দ্বীপে। একসময় বড় দ্বীপের তীরে এসে উঠল সে। ততক্ষণে সূর্য উঠেছে। ঊষার আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারপরও সৈকত ধরে হেঁটে চলল উত্তর দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দূরে একটা গাছের নীচে একটা নারীমূর্তি দেখতে পেল। পা ছড়িয়ে গাছে হেলান দিয়ে বসে আছে। গাছের নিচটা এখনো আবছা অন্ধকার। মেয়েটিকে ছেলেটা চিনতে পারছে না। কারণ মেয়েটা মাথা নীচু করে রেখেছে। কিছুক্ষণ আগে মাথার ওপর একটা নাম না জানা পাখির কলতানে মেয়েটির ঘুম ভেঙেছে।

মেয়েটি বাচ্চাটাকে ভাসিয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ তীরে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে। তারপর একসময় এ গাছের নীচে এসে বসেছে। কিছুক্ষণ পরই ক্ষুধা টের পেল। এদিকে ক্লান্তিতে শরীর আর চলতেই চাইছিল না। কোনোরকমে দূরে কয়েকটা নারকেল গাছের তলায় দুটো নারকেল কুড়িয়ে পেয়ে নিয়ে চলে এসেছে। তারপর গাছে বাড়ি মেরে একটা নারকেল ভেঙে ভেতরের সাদা আঁশ খেয়েছে। পানি সব পড়ে গেছে, তাই তা খেতে পারেনি। বিকেল পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। বিকেলে সৈকতের ধার দিয়ে কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে হেঁটেছে। শেষ বিকেলে দূরের দ্বীপে একজন মানুষকে একবার মাত্র দেখেছে। সে চলে যাচ্ছিল। তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পরদিন সকালে ওই দ্বীপে যাবে। যদি বসতি থাকে, তাহলে খুব ভালো হবে। তবে কোনো বাড়িঘর চোখে পড়েনি। আর যদি তার মতো কোনো হতভাগা কোনোমতে বেঁচে ওই দ্বীপে উঠে থাকে, তবে দুজনে একসঙ্গে বাঁচার চেষ্টা করবে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই বাকি নারকেল খেয়ে ওই যে ঘুমিয়ে পড়েছে, আর এখন ঘুম ভাঙল। ক্লান্তির কারণে সারারাত টের পায়নি। পদ শব্দে মুখ ফিরে তাকাল। সৈকত দিয়ে এগিয়ে আসা ছেলেটিকে দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠল। খানিকক্ষণ নড়তেও যেন ভুলে গেল। ভাবল, এ ছেলেটি ওয়েটিং রুমে যা করেছে অনেক মানুষের সামনে, সে হিসেবে এখানে যতই বিপদে থাক, খারাপ কিছু ঘটানোর আশঙ্কাই বেশি। তাতে আবার তার সঙ্গে সেখানে রাগ করেছি। চিন্তাটাকে আর সামনের দিকে গড়াতে পারল না। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর উত্তর দিকে গাছের আড়াল ধরে দৌড়াতে শুরু করল। ছেলেটি অনেক কাছে এসে পড়েছে। আর পনের-বিশ হাত দূরে আছে। ছেলেটি ভাবছে, মেয়েটি যদি এ দ্বীপের বাসিন্দা হয়, তবে ভালো হয়। তার বাপ-ভাইয়ের সাহায্যে আল্লাহ্ উদ্ধার করতে পারেন। আচ্ছা, এখানকার বাসিন্দা হলে একাই এত সকালে এভাবে বসে আছে কেন? আছে হয়তো কারণ। আর মেয়েটি যদি তারই মতো একজন হয়, তাহলে…। মেয়েটি উঠে দৌড় দিতেই ভাবনায় বাধা পড়ল। মেয়েটির চেহারা ভালোভাবে দেখতেই পেল না।

‘এই, থামুন, আমার কথা শুনুন’ বলল ছেলেটি। তারপরই ভাবল, বাংলা তো বোঝার কথা নয়, ইংরেজি বুঝতে পারে। একই কথা ইংরেজিতে বলল। তাতেও মেয়েটি গতি কমাল না, বরং গতি আরো বাড়িয়ে দিল। ছেলেটিও তার পেছনে দৌড় দিল এই ভেবে যে, দ্বীপটা যে কত বড় তা তো সে জানে না, তাদের গ্রামটাইবা কোথায়, সব মেয়েটির কাছ থেকে জেনে নেবে।

মেয়েটি এর মধ্যে জঙ্গলের আড়াল পেরিয়ে খোলা আকাশের নীচে বেরিয়ে এসেছে। সামনে পাহাড়। আশপাশে লুকানোর মতো জায়গা চোখে পড়ল না। লুকাতে হলে আবার পেছনে ফিরে গাছপালার জঙ্গলে ঢুকতে হবে। তা আর সম্ভব নয়। কারণ পেছনের ছেলেটি দ্রুত ছুটে কাছে এসে পড়েছে। ছেলেটির হাত থেকে বাঁচার জন্য লুকানোর মতো কোনো জায়গা পেয়েও যেতে পারে, তাই পাহাড় বেয়ে দ্রুত উঠতে লাগল। হাঁপিয়ে উঠেছে। আর যেন পারছে না। অনেক কষ্টে ওপরে উঠে এলো। কিছুক্ষণ আগে থেকে শব্দ শুনছে না। তারপরও দ্রুত দৌড়াতে লাগল। পাহাড়ের ওপরটায় কিছুটা এবড়ো-খেবড়ো ও খানিকটা জায়গা অনেকটা সমান। অল্প সামনে এগিয়ে মেয়েটি দেখতে পেল, হঠাৎ করে যেন তার পথ খুব ঢালু হয়ে গেছে। নিজেকে থামানোর চেষ্টা করেও পারল না। পা দুটো আগে দিয়ে দ্রুত পিছলে নামতে লাগল নীচের দিকে। আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ‘বাঁচাও’ বলে আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল। এই পড়ার যেন শেষ নেই। মনে হচ্ছে নীচে পড়ে পাথরে মাথা ফেটে মারা যাবে। একসময় পড়া শেষ হলো। ‘আরে, এখনো বেঁচে আছি দেখছি’, নিজের অজান্তে মেয়েটি বলল। তবে হার্টবিট অত্যন্ত বেড়ে গেছে। যেন বুক ফুঁড়ে তা বের হয়ে আসবে।

মেয়েটিকে পাহাড় বেয়ে উঠে যেতে দেখল ছেলেটি। সে পাহাড়ের গোড়ায় এসে পড়েছে। হঠাৎ করেই একটা ব্যাপার খেয়াল হতেই থেমে দাঁড়াল। তা হলো, বিদেশি এক পুরুষ মানুষ দেখে যে কোনো মেয়েই আতঙ্কিত হতে পারে। সে অহেতুক মেয়েটিকে ভড়কে দিল। তারচেয়ে তার পেছনে না ছুটে যত বড় দ্বীপই হোক, তার গ্রাম সে খুঁজে বের করবে। ঘুরে অন্যদিকে যেতে উদ্যত হতেই মেয়েটির আর্তচিৎকার শুনে থমকে দাঁড়াল। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছে ‘বাঁচাও’ কথাটি শুনে। তাহলে মেয়েটি বাঙালি! তারই মতো অবস্থার একজন! তবে তাকে দেখে ছুটে পালাল কেন? এ দ্বীপেও কি কোনো জনবসতি নেই?

এর মধ্যে দৌড়ে পাহাড়ের অর্ধেক উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে কিছু ছোট পাথর আছে, আছে কিছু আগাছাও। তবে ঘন নয়। পাহাড়ের ওপরে চড়ল ছেলেটি। ওপরেও এক-দুটো গাছ দেখতে পেল। তবে গাছগুলো অনেকটাই পাতাবিহীন। থেমে চারদিকে তাকিয়ে মেয়েটিকে কোথাও দেখতে পেল না। ধীরপায়ে সামনে এগিয়ে ঢালুটা দেখতে পেল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে এগিয়ে গিয়ে বেশ নীচে মেয়েটিকে বসে থাকতে দেখল। তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে। ঢালুটার নীচে কিছুটা সমতল আছে। তারপর আবার বিপজ্জকভাবে ঢালু হয়ে নীচে গিয়ে ঠেকেছে। মেয়েটি ওই সমতল জায়গাটিতে আটকে গেছে। নিজেকে সামলানোর পর তাকিয়ে দেখে পরের ঢালুটা দিয়ে পড়লে হাত-পা না ভেঙে পার পাবে না। ডানে-বাঁয়ে প্রায় খাড়া পাহাড়, সেদিকেও যাওয়ার উপায় নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে তাকাল যেদিক দিয়ে পড়েছে সেদিকে। একরকম বন্দী হয়ে গেছে সে।

দুজনে চোখাচোখি হতেই ছেলেটি মেয়েটিকে চিনতে পারল। আর সঙ্গে সঙ্গে সব সঙ্কোচ এসে যেন তাকে ঘিরে ধরল। কিছু সময় ভাবার পর সব সঙ্কোচ ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি ওভাবে দৌড়ে চলে এলেন কেন?’ অতি সাবধানে ‘পালালেন’ কথাটি গোপন করল। কারণ মেয়েটি রেগেছে বলে মনে হচ্ছে। তাই সে কথা তুলে তাকে চটিয়ে দিতে চাইল না। তার ওভাবে দৌড়ানোর কারণটাও আঁচ করতে পারল। কিন্তু সে কথা প্রকাশ না করে বলল, ‘বাংলা জানেন, তারপরও ডাক শুনে থামলেন না!’ একসঙ্গে বলে থামল ছেলেটি।

‘আপনার জন্য, হ্যাঁ, শুধু আপনার মতো দুশ্চরিত্রের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে বাঁচতে গিয়ে বন্দী হয়ে পড়লাম। শুধু বাংলা কেন, ইংরেজিও জানি। আপনি…।’ ঝাঁজের সঙ্গে কথাগুলো বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলার কারণে আর মুখ দিয়ে কথা বেরোল না মেয়েটির।

মেয়েটির কথা শুনে একদম হতভম্ব হয়ে গেল ছেলেটি। অতি কষ্টে মুখ থেকে বের করল, ‘আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি অমন ভাবেন?’

‘হ্যাঁ, যে ছেলে অত মানুষের সামনে একটা মেয়ের সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করতে পারে, সে তাকে একটা নির্জন দ্বীপে কী করতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়।’

ছেলেটি এর মধ্যে মাথা নীচু করে কেঁদে ফেলেছে। মেয়েটি নিচ থেকেই তা দেখতে পেল। ‘আর মায়াকান্না কাঁদতে হবে না। চলে যান আমার কাছ থেকে, প্লিজ, চলে যান অনেক দূরে।’ আর বলতে পারল না মেয়েটি। কান্নায় কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল।

ছেলেটি ভাবল, তার প্রতি মেয়েটির যে ধারণা, তা শুধু তার মুখের কথায় দূর হবে না। প্রমাণের জন্য ওই ছেলে তিনটি বা ওই লোকগুলোর দরকার, যারা আসল ব্যাপারটা জানে। কিন্তু তারা তো এখানে নেই। আর কী দরকার তার কাছে ভালো হওয়ার চেষ্টা করে, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।

‘ঠিক আছে, আপনাকে ওপরে তোলার একটা ব্যবস্থা করে আমি চলে যাব আপনার কাছ থেকে।’ এ কথা কয়টি বলতে গিয়ে বারবার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যেতে চাইল।

‘আপনি চলে যান এখান থেকে। উদ্ধার পেয়ে আপনার হাতে পড়তে চাই না’ বলল মেয়েটি।

শেষ কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি সেখান থেকে পিছিয়ে এলো।

ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হলো। কয়েক পা এগোনোর পর একটা ব্যাপার খেয়াল হতেই থমকে দাঁড়াল। ভাবল, ওখান থেকে তো মেয়েটির বেরোনোর আর তো কোনো পথ নেই। যেহেতু তার কারণে মেয়েটি ওখানে পড়েছে, সুতরাং তার উচিত হবে, এখান থেকে তাকে তোলার ব্যবস্থা করে চলে যাওয়া। আবার ফিরে এলো ঢালুটার কাছে। নীচে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা বসে এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছে। হয়তো এ বন্দী দশা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে। আবার পিছিয়ে এসে চিন্তা করতে লাগল। শেষে একটি বুদ্ধি বের হলো, সে অনুযায়ী ছেলেটি তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাগড়ি বের করে খুলে ফেলল।

পাগড়িটা প্রায় সাড়ে ছ’হাত লম্বা। মেয়েটা আছে প্রায় পনের হাত নীচে। আরো লম্বা দড়ির মতো কিছু একটা দরকার। শেষে আর কিছু না পেয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাঁচি বের করে পাঞ্জাবি গা থেকে খুলে ফেলল। তারপর কাঁচি দিয়ে লম্বায় তা অনেকগুলো টুকরো করে ফেলল। এরপর দু-তিনটি লম্বা টুকরো একসঙ্গে করে রশির মতো পাকাল। এ রকম কয়েকটা তৈরি করে একটার সঙ্গে আরেকটা বেঁধে অনেক লম্বা করল। তারপর তার একমাথা পাগড়ির সঙ্গে বেঁধে ফেলল। এখন সব মিলে প্রায় বিশ হাতের মতো দীর্ঘ রশি তৈরি হলো।

ছেলেটা ভাবল, সে যদি একপ্রান্ত ধরে, অন্য প্রান্ত নীচে নামিয়ে দেয়, আর তা বেয়ে যদি মেয়েটা উঠে আসে, তাহলে তার সামনে পড়ে যাবে। তাহলে কী করা যায়? তৎক্ষণাৎ সমাধান হয়ে গেল। ঢালু যেখানে শুরু হয়েছে, তার কয়েক হাত দূরে কয়েকটা বেশ মোটা গাছ আছে। দড়ির একপ্রান্ত একটা গাছে শক্ত করে বাঁধল। তারপর মেয়েটি দড়ি বেয়ে উঠেই খুব তৃষ্ণার্ত বা ক্ষুধার্ত হয়ে পড়বে ভেবে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা নারকেল গাছ থেকে বেশ কয়েকটা নারকেল পেড়ে আনল। নিজেরও ক্ষুধা-তৃষ্ণা দুটোই পেয়েছে। নীচে মেয়েটি হয়তো বেশ অস্থির হয়ে পড়েছে ভেবে আর নারকেল খেতে বসল না।

রশির এক মাথায় একটা নারকেল বেঁধে দিল, ঢালুর মাথায় বাকি নারকেলগুলো রাখল। নীচে নামানোর আগমুহূর্তে খেয়াল হলো, নারকেল থেকে পানি বের করবে কীভাবে? এ চিন্তা মাথায় আসতেই কাঁচির দুটো অংশ হাত দিয়ে চেপে পৃথক করে ফেলল। এক অংশ নিজের কাছে রেখে অন্য অংশ বাঁধা নারকেলের ছালে গেঁথে দিল। তারপর ধীরে ধীরে নামিয়ে দিল নীচে। তখন মেয়েটি উদাস চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। মাথায় এ বন্দিদশা থেকে মুক্তির চিন্তা। ছেলেটি পাহাড় থেকে নেমে সামনের জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলল দ্রুতপদে।

অনেক্ষণ ধরে চিন্তা করেও কোনো উপায় বের হলো না। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে যেদিক দিয়ে পড়েছে, সেদিকে তাকাতে গিয়ে চোখে পড়ল, তার সামনে নারকেল বাঁধা লম্বা কাপড়ের দড়ি ঝুলছে। দড়ি থেকে নারকেল খুলে নিতেই নারকেল গাঁথা কাঁচির একটা ফলা দেখতে পেল। মুহূর্তে বুঝে ফেলল এসব কার কাজ। ছেলেটি তাহলে তাকে তোলার ব্যবস্থা করে ওপরে ওঁৎ পেতে বসে আছে। অত্যন্ত ক্ষুধা পেয়েছে। কাঁচির চোখা মাথা দিয়ে প্রথমে নারকেলের ছোলা তুলে ফেলল। তারপর ফুটো করে পানি খেল। এরপর আছাড় মেরে নারকেল ভেঙে তার দুধের মতো সাদা আঁশ খেয়ে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিল। এখানে এ বন্দী অবস্থায় থাকার চেয়ে ওপরে উঠে যা হয় হবে, এই ভেবে ওপরে ওঠার জন্য উঠে দড়িটা টান দিয়ে দেখল, ভালোভাবেই ওপ্রান্তে লাগানো আছে।

তারপর কাপড়ের দড়ি দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে দুপা দিয়ে ঢালু বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল। একটু পর ওপরে এসে দাঁড়াল। এটুকু পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে উঠল মেয়েটি। তারপরও চারদিকে তাকিয়ে ছেলেটির সন্ধান করল, ওঁৎ পেতে বসে আছে কিনা। কাউকেই দেখল না। যে গাছের সঙ্গে দড়ির অপর মাথা বাঁধা আছে, তার নীচে কয়েকটা নারকেল দেখতে পেল। গাছটা তো নারকেলের নয় যে ওপর থেকে পড়েছে। তবে এগুলো বুঝি ছেলেটি এনে রেখেছে তার জন্য। ছেলেটি ছাড়া আর কেইবা হবে? কারণ আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে এ দ্বীপে দেখেনি। তারপর কাপড়ের দড়ির জোড়াগুলো খুলে ফেলল। একটু দেখার পর বুঝল, ছেলেটি তার গায়ের কাপড় দিয়ে দড়ি তৈরি করেছে। এর মধ্যে ছেলেটির প্রতি মেয়েটির মন কোমল হয়ে উঠেছে। সে তার সম্পর্কে যা ভাবছে তা হয়তো সে নয়। তারপরও তাকে আশপাশে দেখতে না পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেল। কাপড়গুলো এমনভাবে টুকরো করা, তা আর কোনো কাজে লাগবে না, তাই সেগুলো নিল না।

নারকেলগুলো ওভাবেই রেখে একটা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বের হলো। এমন একটা আশ্রয়, যেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকবে। আবার ঝড়-বৃষ্টি এলে ভিজবে না। গত রাতে তো গাছের নীচে কাটিয়েছে। আর ওভাবে রাত কাটানো যাবে না। তাছাড়া ওই দ্বীপে একটা ছেলে আছে, যার সম্পর্কে সে সংশয়মুক্ত নয়। এ দ্বীপে যে কতদিন কাটাতে হবে, তারইবা কী ঠিক? পাহাড়ের ওপর থেকে তো কোনো গ্রাম বা মানুষের কোনো চিহ্নও চোখে পড়ছে না। কতক্ষণ ধরে খুঁজল হিসাব করে বলতে পারবে না। তার ঘড়ি পরার অভ্যাস নেই। তবে আর অল্প সময় পরই সূর্য মাথার ওপরে এসে পড়বে।

পাহাড়ের নীচে একটা জায়গা খুঁজে পেল মেয়েটি। লোকচক্ষুর একদম আড়াল না হলেও ঝড়-বৃষ্টিতে আশ্রয় নেয়ার মতো। সমতল থেকে উঁচুতে, তবে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনায়াসেই ওঠা যায়। পাহাড়ের গায়ে ছোট গুহা, তবে কৃত্রিম নয়। গুহাটা বেশ বড়। তিন-চারজন মানুষ ভালোভাবে থাকতে পারবে। ভেতরে বেশি লম্বা নয়। গুহামুখটা খুব বড় না হলেও ভেতরটা বেশ প্রশস্ত। মেঝে মুখের দিকে ঈষৎ ঢালু। ভেতরে পানি ঢুকলেও গড়িয়ে বেরিয়ে যাবে। সব মিলে চমৎকার একটা বাসস্থান। তবে পাহাড়ের ঠিক নিচ থেকে দেখা না গেলেও বেশ দূর থেকে দিনের বেলায় গুহার ভেতরে বসবাসকারীকে দেখা যাবে। গাছের গোড়া থেকে নারকেলগুলো কয়েকবার নিয়ে এসে গুহায় রেখে দিল। পেট কিছুটা ঠান্ডা হতেই পরিশ্রমের কারণে চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করল। শুয়ে পড়ল গুহার শক্ত মেঝেতে।

ছেলেটি বনের মধ্যে ঢুকল। একটা গাছের গোড়ায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে পড়ে তাকাল পাহাড়ের ওপরে, যেখানে মেয়েটির উঠে আসার কথা। মেয়েটিকে দেখতে পেলে এমন এক জায়গা বেছে নেবে, যেখানে মেয়েটি তাকে দেখতে পাবে না। সে মেয়েটির সামনে আর পড়তে চায় না। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। এখনো মেয়েটি উঠে এলো না দেখে ভাবতে লাগল। তাহলে কি কাপড়ের দড়িটি দেখতে পায়নি, নাকি উঠতে পারছে না। তবে কি উঠতে গিয়ে নীচে গড়িয়ে পড়ে আহত হয়েছে? এমনিতেই তার খারাপ লাগছে। মেয়েটির উঠতে দেরি দেখে খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। বনের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত হেঁটে কী ভেবে পাহাড়ের অপর পাশে চলে এলো। বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে প্রথমে ঢালু জায়গাটা, তারপর সমতল জায়গাটা দেখতে পেল। কিন্তু মেয়েটিকে দেখতে পাচ্ছে না।

এ পাশে বন একদম পাহাড়ের কাছে। স্পষ্ট সব দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের নীচেও কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে নীচে পড়ে আহত হয়নি। তবে কি উঠে চলে গেছে? তাই হয়তো হবে। এতক্ষণ একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটি। মেয়েটি ওপরে উঠতে পেরেছে মনে হতেই স্বস্তি পেল, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল আল্লাহ্র কাছে। তারপর ক্লান্তিতে বসে পড়ল সেই গাছের গোড়ায়। উদ্দেশ্য, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে। তারপর এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে মেয়েটি তাকে দেখবে না। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বলতে পারবে না। জাগল পরদিন দ্বিপ্রহরের খানিক আগে। চোখ ডলতে ডলতে সামনে তাকাল। হঠাৎ করে মেয়েটিকে একটা গহ্বর থেকে বের হতে দেখল। ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারল, ওটি গুহা। সে আরো স্বস্তি পেল এই ভেবে যে, মেয়েটি সুন্দর একটি আবাসস্থল পেয়েছে।

মেয়েটি অতি কষ্টে পাহাড় বেয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে। তার দুহাতে দুটি করে চারটি নারকেল নিয়ে একই পথে ফিরতে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল সে। উঠে দাঁড়াল। প্রথমে চিন্তা করল, পাহাড়ের মধ্যে অমন একটা গুহা খুঁজবে কিনা, তারপর চিন্তাটা বাতিল করে দিল। কারণ পাহাড়টা খুব বড় নয়। তাতে যদি গুহা থাকে, আর তাতে সে আশ্রয় নিলে তাকে অজু করার জন্য, নারকেল সংগ্রহের জন্য বের হতেই হবে। তাতে মেয়েটির সামনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করল, বনের ভেতর এমন একটা জায়গা বেছে নেবে, যেখানে সে থাকবে। আর মেয়েটিকে কাছে-পিঠে দেখলে দ্রুত লুকিয়ে পড়বে। এসব ভেবে সে ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। খুঁজতে শুরু করল তার কাক্সিক্ষত স্থান। জোহরের নামাজের সময় হয়ে আসছে। আরো দ্রুত খুঁজতে লাগল।

অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একটি জায়গা পছন্দ হলো। জায়গাটা আহামরি কিছু নয়। চারদিকে গাছপালায় ভরপুর। কয়েকটা গাছের গোড়ায় ঘন জঙ্গল। জায়গাটি দেখতে খুব সুন্দর। একটি বুদ্ধি বের হলো। তবে তা কাজে লাগানোর সময় এখন নেই। জোহরের নামাজের সময় আর বেশি নেই। সামনে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে দেখল, মেয়েটি গুহার মধ্যে হেলান দিয়ে আছে। চোখ বন্ধ কিনা তা এতদূর থেকে বোঝা গেল না। ছেলেটি ভাবল, দেখে ফেললে দেখবে, তাতে করার কিছু নেই। সময় কম, অজু করার গোপন স্থান খুঁজে বের করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই পশ্চিমে খোলা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলল। নামাজ শেষে প্রচণ্ড খিদে অনুভব করল। বেলা বেশি নেই। রাত নামার আগেই বাসস্থান তৈরির কাজ শেষ করতে হবে।

সময় নষ্ট না করে গাছ থেকে কয়েকটা নারকেল পাড়ল। মাত্র একটা খেয়েই কাজে লেগে গেল। চারদিকে জঙ্গল, বেশ ঘন। তবে ভেতরে যে পাতলা তা বাইরে থেকে অনুমান করা যায় না। ভেতরে ঢোকার উদ্দেশ্যে পথ তৈরির জন্য কিছু জঙ্গল তুলে ফেলেছে। হঠাৎ খেয়াল হলো, এ ধরনের জঙ্গলে সাপ থাকা স্বাভাবিক। জঙ্গলের ভেতরে বাসস্থান তৈরির কাজ এখানেই শেষ।

মেয়েটি গুহায় এসে কয়েকটা নারকেল খেল। তারপর ক্লান্ত দেহে দেয়ালে হেলান দিল। কখন ঘুমিয়েছে জানে না (টেরই পায়নি)। জেগে উঠল সন্ধ্যার একটু আগে।

দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে শরীর অনেকটা স্বাভাবিক লাগছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বাবা-মা ও ভাইয়ের কথা ভাবল। তারা কী জানে, তাদের মেয়ে-বোন এখনো বেঁচে আছে, কমপক্ষে এই অনিন্দ্যসুন্দর পৃথিবীতে শ্বাস নিতে পারছে, পারছে এ পৃথিবীর বাতাস গায়ে মাখতে? হয়তো জানে না, হয়তো বিমান দুর্ঘটনার খবর শুনে কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে গেছে। হয়তো মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে, তাদের নয়নমণিকে আর দেখতে পাবে না ভেবে। তাই তো, আসলে কি আর কোনোদিন তাদের সঙ্গে দেখা হবে? তারা কি পারবে জানতে যে, বিমান দুর্ঘটনায় মারা যায়নি তাদের সন্তান? আদৌ কি পারব আবার লোকসমাজে ফিরে যেতে? কীভাবে উদ্ধার পাব এই মৃত্যুপুরী থেকে? আবার পুরনো কথা খেয়াল হলো। ছেলেটি কি তারই জন্য অপেক্ষা করছে? তখন হয়তো তাকে ওপরে ওঠার সুযোগ দিয়ে বিশ্রাম নিতে চলে গিয়েছিল। সে জানে, তার এ দ্বীপ থেকে চলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আর ভাবতেই পারল না। ভয়ে প্রায় আধমরা হয়ে বসে থাকল।

এদিকে বিশাল সূর্য আশ্রয় নিচ্ছে সাগরের মাঝে। একসময় চারিদিকে আঁধার ঘনিয়ে এলো। অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকায় কোমরটা একটু ব্যথা করছিল, ভয়ও কমে আসছিল। উঠে বাইরে দাঁড়াল। চাঁদ উঠতে এখনো অনেক সময় বাকি। আকাশে তারকারাজি স্পষ্ট। গায়ে কাপড় বলতে মেয়েদের সুতি কালো পাঞ্জাবি আর জিন্সের প্যান্ট। বেশ ঠান্ডা লাগছে। তবুও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগছে। কিছুক্ষণ পর ঠান্ডায় মেয়েটি কাঁপতে লাগল। রাতের সমুদ্রের ঠান্ডা সহ্য হচ্ছে না। তাই অন্ধকার গুহায় এসে ঢুকল। গুহার গুমোট অন্ধকারও সহ্য হচ্ছে না, আবার ঠান্ডায় বাইরেও দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। আচ্ছা, ছেলেটির তো আরো বেশি ঠান্ডা লাগছে। তার গায়ের জামা ছিঁড়ে তো সে আমাকে ওপরে তোলার ব্যবস্থা করেছে। সে তো প্রতিশোধের অংশ হিসেবে আমাকে তোলার ব্যবস্থা না-ও করতে পারত। শুধু তোলার ব্যবস্থা করেই ক্ষান্ত হয়নি, খাওয়ার জন্য নারকেলের ব্যবস্থাও করেছে।

সে কি প্রকৃত অর্থে ভদ্র ছেলে? তবে সে ওয়েটিং রুমের দরজায় আমার সঙ্গে অমন করল কেন? এ মুহূর্তে এর কোনো সমাধান বের করতে পারল না সে। ছেলেটি খারাপ হলেও সান্ত¦না এতটুকু যে, এখন পর্যন্ত আর তাকে দেখা যায়নি। আচ্ছা এ পাহাড়ে তো আর কোনো গুহা বা আশ্রয় নেয়ার জায়গা চোখে পড়েনি। তবে কি পাহাড়ে আশ্রয় না নিয়ে বনে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে? আবার আগের চিন্তাটা গ্রাস করল মেয়েটিকে। আচ্ছা, ছেলেটির গায়ে কি আরো কাপড় আছে? তাহলে হয়তো ঠান্ডা একটু কম লাগবে। আর যদি গায়ে তেমন কোনো কাপড় না থাকে, তার ওপর যদি বনে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকে, তবে তো সে ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। সাগর থেকে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে আসছে। ছেলেটি যদি ঠান্ডায় কষ্ট পায়, তবে বলতে হবেÑ তার এ কষ্টের কারণ শুধু সে।

হঠাৎ একটি পাখির কর্কশ কণ্ঠ শুনে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটল মেয়েটির। হয়তো সেই নাম না জানা পাখিটি উড়ে গেল পাহাড়ের ওপর দিয়ে। বাইরে বের হয়ে এলো মেয়েটি। এখনো চাঁদ ওঠেনি বলে অন্ধকারে খুব বেশিদূর দেখা যাচ্ছে না। আবার গুহার ভেতরে ঢুকে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল মেয়েটি। কীভাবে এ দ্বীপ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় সে সম্পর্কে চিন্তা করতে লাগল, কিন্তু কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। আর তখন চাঁদ ওঠার কেবল প্রস্তুতি নিচ্ছে। এশার নামাজ শেষ হয়েছে। চাঁদও উঠেছে। তবে আলো-আঁধারির সৃষ্টি হয়েছে।

দুটো নারকেল সামনে নিয়ে খেতে বসল ছেলেটি। তারপর আর জঙ্গলে বাসস্থান তৈরির কাজ করেনি। আসরের পর মাগরিবের আর খুব বেশি দেরি ছিল না। মধ্যে সময়টুকু মাটিতে পড়ে থাকা নারকেল সংগ্রহ করে কাটিয়েছে। রাত নেমে এলে অন্ধকারে কিছু করা যায় না বলে একটা গাছের নীচে বসে ছিল। খাওয়া শেষ হলো। সামান্য একটু বিশ্রাম নিয়ে উঠে দাঁড়াল।

এগিয়ে চলল একটি নির্জন সমুদ্র সৈকত আবিষ্কারের জন্য। যেখানে অজু ও নিত্য ব্যবহারের পানি পাওয়া যাবে। নির্জন বলতে মেয়েটি যেন সহসা তাকে দেখতে না পায়। হেঁটে চলল পশ্চিম দিকে। বনের ধার ধরে হাঁটছে। কোনো কোনো জায়গায় বন থেকে সমুদ্রের দূরত্ব অনেক দূর, তা বাদ দিল। আবার কোনো কোনো স্থানে বন ও সমুদ্রের মধ্যকার দূরত্ব কম। চাঁদ উঠলেও খুব বেশি দূর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা হাড় কাঁপানো শীতল বাতাসে গায়ের কাঁপুনি শুরু হয়েছে। পরিধেয় বস্ত্র বলতে শুধু ওপরে পাতলা গেঞ্জি আর নীচে মোটা কাপড়ের পায়জামা। শুধু এই কাপড়ে ঠান্ডা ঠেকানোর উপায় নেই। অহরহ দাঁতে দাঁত বাড়ি লেগে ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর ছেলেটি তার কাক্সিক্ষত পানির উৎসের সন্ধান পেল। বনের ধারেই সমুদ্রের জলরাশি এসে বারবার আছড়ে পড়ছে। অনেক সময় বড় ঢেউয়ের ফলে তীরবর্তী গাছের গোড়া পর্যন্ত ভিজে যাচ্ছে। সবশেষে এটাকেই নির্বাচন করল।

সমুদ্রের পানি লবণাক্ত। মুখে দিলে মনে হয় যেন এক সের লবণ মুখে পড়েছে। তবে দিনের বেলায় দেখেছে, পানিগুলো নীল। হাতে নিলে তার সেই নীলবর্ণ কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যায়। তখন সেখানে আবির্ভাব হয় রংহীন টলটলে স্বচ্ছ পানি। আপাতত এই ঢের। ঠিক করল পরে সময়-সুযোগমতো এ দ্বীপে মিঠা পানির সন্ধান করতে হবে, যদি থাকে। বালিয়াড়ি ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল ছেলেটি। ঢেউয়ের পানি পা দুটি ভিজিয়ে দিতে লাগল। আরো খানিকটা এগিয়ে গিয়ে অজু করা শুরু করল। এদিকে ওই সুন্দরী রমণী যেন অল্প রাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার আগে ও পরে অনেকক্ষণ নানা জাতের পাখির ডাক শোনা গেছে। তারপর একসময় সব স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু বাতাসে গাছের পাতাগুলো নিঃশব্দে আস্তে আস্তে নড়ছে। শব্দ বলতে যেন এ পৃথিবীতে এখন একমাত্র সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ। অজু শেষ করে ঘুরে দাঁড়াল। সমুদ্রের বরফ শীতল পানি দেহের কাঁপুনি যেন আরো বাড়িয়ে দিল। বনের ভেতর ঢুকে পড়ল। সোজা পূর্ব দিকে খানিকক্ষণ হেঁটে একটা বেশ পরিষ্কার জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারত। তবে একটু কষ্ট হতো। হয়তো একটু ঘোরাঘুরি করতে হতো। তাছাড়া ওই জায়গাটা খুব একটা পরিষ্কার ছিল না। সামনের নারকেল গাছটার নীচে দুটো নারকেল পড়ে আছে। এদিকে নারকেল গাছের পরিমাণ অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে কোনো কোনো গাছের নীচে নারকেল কুড়িয়ে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সবদিক চিন্তা করে তাই আগের জায়গায় আর ফিরে গেল না। যাক শেষ পর্যন্ত রাত কাটানোর মতো একটা উপযুক্ত জায়গার দেখা পাওয়া গেল।

নীচে বালু, ঘাস নেই। যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে, তার চারিদিকে গাছপালা। ঘন কিনা ঠিক বুঝতে পারছে না। তবে মাঝে-মধ্যে গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যে আলো নীচে পড়ছে, তা রীতিমতো গা ছমছম করা পরিবেশ। তবে কোনো ভয় লাগছে না। তার আশপাশের বেশ খানিকটা জায়গায় চাঁদের মৃদু আলো পড়ছে। এছাড়া এ বনে এর চেয়ে উত্তম জায়গা খুঁজে বের করা আর এত রাতে সম্ভব নয়। তাই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে এখানেই রাত কাটানোর মনঃস্থ করল। এত তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো না। তাই চাঁদের অবস্থান দেখে কেবলা নির্ধারণ করে দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি মহান প্রভুর দরবারে। তবে কি সাহায্য কামনায়?

একটি শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটির। তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথায় গুহার পাথরের ছাদ যেন বাড়ি মারল। দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল। শব্দে হঠাৎ জেগে ওঠা, তারপর মাথায় বাড়ি লাগায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে খানিকক্ষণ বসে রইল মেয়েটি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারল আসলে কী ঘটেছে? ভয় কেটে গেছে। বাইরে তাকাল। দেখতে পেল সুন্দর রোদ উঠেছে। পেটটা বারবার মোচড় দিচ্ছে। খেয়াল হলো, রাতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমানোর আগে কিছু খায়নি। সামনে দুটো নারকেল দেখতে পেল। হাত-মুখ ধুতে হবে লবণাক্ত পানি দিয়ে। মিঠা পানি হয়তো এ দ্বীপে নেই। গুহা থেকে বের হয়ে পাহাড় বেয়ে নেমে এলো। এগিয়ে চলল প্রশস্ত সমুদ্রের দিকে। ফিরে এসে নারকেল খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল খাদ্যের সন্ধানে।

বেশ বেলা হয়েছে। সতর্ক আছে, যাতে ছেলেটির সামনে পড়ে না যায়। ছেলেটি সম্পর্কে ভালোভাবে না বুঝতেই তার সামনে পড়তে চাচ্ছে না সে। আশপাশ দেখে দ্রুত বনের ভেতর ঢুকে পড়ল। এরপর হাঁটার গতি কমিয়ে দিল। এখন নজর রেখেছে নীচের দিকে। ছেলেটার পায়ের ছাপ চোখে পড়ে কিনা দেখছে। তার ইচ্ছা দূর থেকে ছেলেটিকে পর্যবেক্ষণ করে তার সম্পর্কে বোঝা। সে বুঝতে পারছে, এ রকম নির্জন দ্বীপে একা বাস করা খুবই কষ্টকর। একজন সঙ্গী হলে ভালো হয়। তাকে অবশ্যই ভালো হতে হবে। কিছুদূর এগোনোর পর খোলা এক পাশে বের হয়ে এলো। অল্প দূরে বিশাল সমুদ্র। গাছের আড়ালে কিছুদূর এগিয়ে গেল। তারপর সামনে একটা বেশ বড় নারকেল বীথি দেখে এক মুহূর্ত কী মনে করে থমকে দাঁড়িয়ে আবার এগোল। কোনো কোনো গাছের নীচে নারকেল পড়ে আছে। দুহাতে যতগুলো পারা যায় নারকেল নিয়ে ফিরে চলল গুহার দিকে।

বেলা হয়েছে। সূর্য উঠেছে। ফজরের নামাজের পর মোনাজাত কেবল শেষ হয়েছে। উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। এখন চারপাশটা বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তাতে সে যা দেখল, আনন্দে মন ভরে গেল। রাতে যা দেখতে পায়নি, দিনে তা বেশ দেখতে পাচ্ছে। তা হলো সে যে জায়গাটায় আছে, তার চারিদিকে বেশ ঘন হয়ে গাছপালা জন্মেছে। মধ্যে একটু করে জায়গা ফাঁকা। গাছগুলো মোটামুটি ঘন হওয়ায় দূর থেকে এই ফাঁকা জায়গাটার চারিদিকে একবার চক্কর দিল ছেলেটি। সে যা ভেবেছে তা ঠিক প্রমাণিত হলো। ঠিক করল এ জায়গায় সে থাকবে। ভোরবেলা অজু করতে গিয়ে দেখেছে, পাহাড়ের কাছের এ জায়গাটা। ইচ্ছে করলে দুমিনিটে বন পার হয়ে পাহাড়ে পৌঁছা যাবে। এ জায়গায় থাকলে সহজে মেয়েটির চোখে পড়ার সম্ভাবনাও নেই। অজু করার জন্য সমুদ্র কাছে, আবার মেয়েটির দিকে নজরও রাখা যাবে। নজর রাখা দরকার এ জন্য যে, সে পাহাড়ের ওপরে প্রকাশ্য আছে। দূর থেকে যে কেউ তাকে দেখতে পাবে। এ মহাসাগরের মধ্যে জনবসতি থাকাই অস্বাভাবিক। তারপরও কোনো জেলে নৌকা দেখা গেলে বা দূরে কোনো সমুদ্রগামী জাহাজ দেখা গেলে, মেয়েটি যদি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেও এ দ্বীপ ছেড়ে যেতে পারবে। তাছাড়া মেয়েটি যে কোনো সময় বিপদে পড়তে পারে। তখন তার প্রয়োজন হতেও পারে। সবদিক চিন্তা করে সে ওখানে থাকার সিন্ধান্ত নিল। এখন কথা হলো নীচে শুয়ে ঘুমানো নিরাপদ কিনা?

গত রাতে যখন নামাজের পর মোনাজাত শেষ করেছে, তখন খুব সম্ভব গভীর রাত। একটা গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে রাতটা কীভাবে নিরাপদে কাটানো যায়, এ চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, বলতে পারবে না। খুব ভোর বেলা নাম না জানা কোনো পাখির মিষ্টি ধ্বনিতে তার ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুমের মধ্যে কোনো কিছুই ঘটেনি। তাই বলে এ দ্বীপে যে কোনো হিংস্র জীবজন্ত নেই তার নিশ্চয়তা কী? সর্পজাতীয় প্রাণী থাকতে পারে। আবার গাছের ডালেও শুয়ে ঘুমানো যাবে না। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে নীচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। গাছের ডালে যে মাচা বানাবে তার জন্য দা, রশি ইত্যাদি উপকরণও নেই। অগত্যা আপাতত নীচে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও সে বের করতে পারল না। এসব চিন্তা করতে করতে চারপাশে বেশ খানিকটা জায়গা হেঁটে দেখল। মাটিতে কোনো ধরনের গর্ত বা গাছে কোনো ফোকর বা জঙ্গল দেখা যায় কিনা, যার ভেতরে সাপ বা অন্য কিছু থাকতে পারে। না, তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। সবকিছুই তার কাছে পরিষ্কার লাগল। এর মধ্যে বেলা বেশ হয়ে গেছে। খিদেও পেয়েছে। অবশেষে নীচে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। তারপর নারকেলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।

দুপুর বেলায় নারকেল খেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে উঠল মেয়েটি। এ পাহাড়ের চারটি চূড়া আছে। তার মধ্যে পূর্ব দিকের দুটি পাশাপাশি, ছোট। পশ্চিমে আছে মধ্যম আকারের চূড়া। আর মধ্যখানে আছে সর্বোচ্চ চূড়াটি। সেটি এত উঁচু যে পূর্ব-দক্ষিণ-পশ্চিম সমুদ্র তীর চোখে পড়ে। দূর দিয়ে কোনো জাহাজ গেলে দেখা যাবে। তবে উত্তর দিকে অনেকদূর বনভূমি বিস্তৃত হওয়ায় সেদিকের সমুদ্র চোখে পড়ে না। এ পর্বতমালা খুব খাড়া নয়, বেশ ঢাল। চেষ্টা করলে চরা যায়। তবে প্রচুর পরিশ্রম হবে।

মেয়েটি মধ্যের চূড়ায় অনেক কসরত করে উঠে এলো। চূড়ার উপরিভাগে সামান্য একটুখানি জায়গা, মোটামুটি সমতল। চারজন লোক অনায়াসে থাকা যায়, তবে কখনোই ওখানে বসে বা শুয়ে ঘুমানো চলবে না। নীচে গড়িয়ে পড়লে সন্দেহাতীতভাবে জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে উত্তর দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের সমুদ্র ভালোভাবেই দেখা যায়। অগত্যা তিন দিকে চোখ রাখার সিদ্ধান্ত নিল। এ ধরনের অবস্থায় দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় পাবে সে দূরবীক্ষণ যন্ত্র?

হঠাৎ করেই খেয়াল হলো, জাহাজ দেখলেইবা কীভাবে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে? আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও নেই যে দিনে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে এবং রাতে শুধু আগুন জ্বালিয়ে তাদের দৃষ্টি কেড়ে নেবে। প্রাচীনকালে মানুষ পাথরে পাথরে ঘসে আগুন জ্বালাত। তারপর গাছের শুকনো ডাল দিয়ে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করত। প্রাচীনকালের সে পদ্ধতি এখন মানুষ ভুলেও ব্যবহার করে না। আজকাল বইপত্রে পাওয়া যায় শুধু সেসবের ইতিহাস। আজকের মানুষও কি পারে ওইভাবে আগুন জ্বালাতে? এত কষ্ট করে উঠে আবার নামতে মন সায় দিল না। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে চোখ রাখার দরকার নেই। কত ঘণ্টা, কত দিন, কত মাস যে চোখ রাখতে হবে তার ইয়ত্তা নেই। তাই বসে পড়ল মেয়েটি।

আবার আগের ভাবনায় ফিরে গেল। সঙ্গে একটি আয়না থাকলেও হতো। দিনের বেলায় সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত। তার আয়না ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। হাত ব্যাগে আয়না, চিরুনি, সাজসজ্জার সরঞ্জাম ছাড়াও অনেক কিছু ছিল, এখন সেসব মহাসমুদ্রে নিমজ্জিত। বিমান থেকে আসার আগে হাত ব্যাগটা জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি নয় মনে করে, তার ওপর বাঁচার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে ভেবে ফেলে রেখে এসেছিল। তা এখন জরুরি মনে হলেও করার কিছু নেই, যা ঘটার সে তো ঘটেই গেছে। যে সময় একবার অতীত হয়ে যায় তাকে আর কোনো অবস্থাতেই ফিরে পাওয়া যায় না।

আরো উপায় বের করার জোর চেষ্টা চালাল মেয়েটি। কয়েকটি উপায় মাথায় এলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকল না। মস্তিষ্কের কোষগুলোর সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করল যেন সে। অবশেষে একটা উপায় বের করল, যা খুব মনঃপূত না হলেও হয়তো তাতে কাজ হবে। তার জন্য তাকে এখন একটা লম্বা ডালের লাঠি জোগাড় করে এনে রাখতে হবে। শুধু লাঠির জন্য নামতে ইচ্ছে হলো না। নামলেও আজ আর ওঠার মতো শক্তি কুলোবে না। তাই একদম দিনের শেষে নামার সিদ্ধান্ত নিল। মনের ভার অনেকটা নেমে গেল। এখন শুধু জাহাজ দেখতে পাওয়ার অপেক্ষা।

দক্ষিণমুখী হয়ে বসেছে। শুধু মাথা ঘুরিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে লক্ষ্য রাখছে। অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকতে থাকতে পা ঝিঁঝিঁ লেগে গেল। সূর্য ডোবার বড়জোর ঘণ্টাখানেক বাকি থাকতে উঠে দাঁড়িয়ে পা নড়াচড়া করে ঝিঁঝিঁ দূর করল। কী মনে হতেই আর না বসে নামতে শুরু করল। অনেকক্ষণ ধরে খুঁজল। শেষ পর্যন্ত দুটো বড় পাথর খুঁজে পেল। সূর্য অস্তাচল গমনে উদ্যোগী হয়েছে। আঁধার নামতে আর বেশি বাকি নে

নেই। গুহা থেকে বেশ দূরে পাথর দুটি পেয়েছে মেয়েটি। একসঙ্গে দুটো নিয়ে যেতে পারবে না। একটা পাথর দুহাতে নিয়ে গুহাভিমুখে রওনা হলো।

নারকেল খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। এখানে দাঁড়ালে গাছপালার ফাঁক দিয়ে সর্বোচ্চ চূড়াটা দেখা যায়। তবে মেয়েটির গুহা দেখা যায় না। প্রথমে ঠিক করল লাঠি হাতে রাখবে, যা অস্ত্র হিসেবে বা যে কোনো ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। প্রথম থেকেই হাতে একটা লাঠি রাখা উচিত ছিল। কিন্তু আগে ব্যাপারটা মাথায় আসেনি। এর আগে নিজের থাকা, খাওয়া, নিরাপত্তা নিয়ে তেমন চিন্তা না আসায় হয়তো লাঠির কথাও খেয়াল হয়নি। অবশ্য প্রয়োজনও পড়েনি। লাঠির জন্য একটা ডাল খুঁজতে লাগল।

একটা গাছের কয়েকটা ডাল পছন্দ হলে তরতর করে গাছে উঠে পড়ল। আপাতত তার একটা মোটা ডালের প্রয়োজন। তাই তার মধ্য থেকে একটা ভাঙার চেষ্টা করতে লাগল। এটা মোটেও সহজ কাজ নয়। অনেকক্ষণ ধরে ডালটির সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে গাছ থেকে তা পৃথক করতে পারল। এর মধ্যে ঘেমে এক হয়ে উঠেছে ছেলেটি। গাছ থেকে নেমে আবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ডাল থেকে শাখা-ডাল-পাতা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে রোদে শুকাতে দিল। হঠাৎ খেয়াল হলো মেয়েটি কী অবস্থায় আছে দেখা দরকার। গুহার দিকে কয়েক পা এগিয়ে লাঠিটা নেয়ার জন্য আবার ফিরে এলো। লাঠিটা হাতে নিয়ে দেখল বেশ ওজন। শুকালে ওজন কমে যাবে। মাত্র দুমিনিটের পথ। ইনশাআল্লাহ কোনো বিপদ হবে না মনে করে লাঠি ছাড়াই এগোল। বনের ধারে এসে আড়ালে দাঁড়িয়ে গুহার দিকে তাকাল ছেলেটি। গুহায় মেয়েটিকে দেখা গেল না। গুহাটা নীচের দিকে সামান্য একটু ঢালু। দিনের সূর্যালোকে গুহার ভেতরটা বেশ আলোকিত। মেয়েটি যদি গুহার খুব ভেতরে গিয়ে না থাকে, তবে দেখা যেতই। খুব ভেতরে যাওয়ার তো দরকার নেই। তবে কি এর মধ্যে কোনো সমস্যা বা বিপদের মধ্যে পড়েছে? নাকি অন্য কিছু? হঠাৎ করে মেয়েটির জন্য শঙ্কিত হয়ে উঠল ছেলেটি।

পরক্ষণেই ভাবতে শুরু করল ছেলেটি, মেয়েটির জন্য আমি ভাবছি কেন? কেন এত উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছি? সে তো আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না। আমি এমনিতেই নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতাম। কিন্তু তার আগেই সে আমাকে তাড়িয়ে দিল। আমার উচিত তাকে এড়িয়ে চলা। সেটাই হবে তার পাওনা। আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তার উচিত ছিল আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করা। সে তো পারত, আমার কাছে জানতে চাইতে। তার তো বোঝা উচিত ছিল, এত মানুষের সামনে ওই ধরনের আচরণ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এও তো ভাবতে পারত, ওটা দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে। কিন্তু সে তার মতো করে বুঝে নিয়েছে। সহজ জিনিসগুলো গ্রহণ করেনি। সে যদি নিজেকে এমন ভেবে থাকে যে, সে একাই এ দ্বীপে চলতে-ফিরতে পারবে, তাহলে খুব ভালো কথা। তা না হলে আমার সঙ্গে অমন আচরণ করতে পারত না। তবে আমি কেন তার জন্য ভাবব? চুলোয় যাক।

ছেলেটি এসব ভাবতে ভাবতে রেগে গেছে। স্মৃতিতে ভাসছিল সেসব ঘটনা, যার জন্য সে রেগে গেছে। শেষ বাক্য দুটো মুখ দিয়ে মধ্যম আওয়াজে উচ্চারণ করে ফেলেছে। ছেলেটি হঠাৎ বুঝতে পারল, রেগে যাওয়ার ফলে তার বিবেক-বুদ্ধি অনেকটা লোপ পেয়েছে, যার ফলে সে ওসব ভাবছিল। রাগ থামানোর চেষ্টা চালাল ছেলেটি। নিজেকে উচ্চারণ করে প্রশ্ন করল, তবে কি আমি ইসলামি চেতনা থেকে দূরে সরে গেছি? মানুষ নামক জীবের কতগুলো স্বতন্ত্র আদর্শ মিলে হলো মনুষ্যত্ব, তবে কি আমি আমার মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি? আমি কি তবে বিসর্জন দিয়েছি আমার মানবতাবোধ? আমি কি পশুর পর্যায়ে নেমে এসেছি? ছিঃ! নিজেকে ধিক্কার দিল ছেলেটি। রাগ এর মধ্যে উধাও হয়ে গেছে। রাগ পড়ে গেছে মনে করে থামল ছেলেটি।

কয়েক মুহূর্ত ক্ষান্ত দিয়ে ছেলেটি আবার ভাবতে শুরু করল, মেয়েটি আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা হয়তো তার বিবেকের আদালতে যুক্তিসঙ্গতই। হয়তো আমি যা ভাবছি তা না, অন্য কিছু যা আমার জ্ঞানে ধরা পড়ছে না। সত্যিই তো, অত মানুষের সামনে কেউ অমন অবস্থায় পড়লে তার রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। আচ্ছা, আমি যদি এ ঘটনার শিকার হতাম, তবে আমিও কি রেগে যেতাম? আমিও কি অমন আচরণ করতাম? কিছুক্ষণ ভেবেও এর কোনো সঠিক উত্তর নিজের কাছে পেল না। আসলে নিজের অবস্থান থেকে অন্যের অবস্থা সহজে বোঝা যায় না। একজন মানুষকে বিপদের মধ্যে রেখে শুধু নিজের পরিত্রাণের চিন্তা করা, অন্যকে বাদ দিয়ে শুধু নিজের মঙ্গল কামনা করা স্বার্থপরতা। স্বার্থপর ব্যক্তির স্থান ইসলামে নেই। বরং মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতগণকে এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, ‘তোমাদের সামনে কেউ অসদাচরণ করলে তাদের সঙ্গে সদাচরণ করো।’ যে নবী তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও তায়েফবাসীকে ক্ষমা করার জন্য মহান আল্লাহ পাকের দরবারে ফরিয়াদ করেছেন, সে নবীর উম্মত হয়ে তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ করণীয় কী তা এক মুহূর্তে স্থির করে নিল ছেলেটি।

এসব ভাবতে ভাবতে কত সময় অতিবাহিত হয়েছে বলতে পারে না। আবার উৎকণ্ঠা গ্রাস করছে ছেলেটিকে। এতক্ষণ একটা গাছে হেলান দিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল ছেলেটি। মেয়েটিকে খোঁজার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়াতেই বেশ দূর থেকে মেয়েটিকে হাতে নারকেল নিয়ে গুহার দিকে ফিরে যেতে দেখল সে। বুঝতে পারল মেয়েটির গুহায় অনুপস্থিতির কারণ। মেয়েটিকে দেখামাত্র উল্টো দিকে ঘুরে নিজ আবাসের দিকে ফিরে চলল ছেলেটি।

হাঁটতে হাঁটতে আবার চিন্তা শুরু করল। সে মেয়েটিকে হিসাবের মধ্যে ধরেই এখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু মেয়েটি উদ্ধারের পথ পেলে তার কথা কি ভাববে? নাকি তাকে ফেলেই চলে যাবে? তাকে ফেলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সে হয়তো রাগের মাথায় আমার সঙ্গে এমন আচরণ করেছে; কিন্তু একটা নির্জন দ্বীপে একা ফেলে যাওয়ার মতো নির্দয় মেয়ে সে নয়। তবে কি তার অবস্থানটা মেয়েটিকে জানানো উচিত? না, তার দরকার নেই। যাওয়ার আগে নিশ্চয়ই মেয়েটি ডাকাডাকি করবে। তাতেই চলবে, সে শুনতে পাবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে আল্লাহ বিপদে ফেলেছেন, সে আল্লাহ তাকে অবশ্যই উদ্ধার করবেন। অতএব তার ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। তবে আপাতত মেয়েটির ওপর নজর রাখতে হবে, আর কাছে-পিঠে থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ বের করার চেষ্টা করতে হবে।

ছেলেটি তার আবাসস্থলে এসে পৌঁছাল। এখন তার হাতে একসঙ্গে দুটো কাজ। একটা হলো আবাসস্থানকে ঘিরে সজ্জিত করা, আর অপরটি হলো আশপাশের এলাকা ঘুরে-ফিরে দেখা। অবশেষে আবাসস্থানকে সজ্জিত করার দিকে মনোনিবেশ করল। নামাজ ও আহারের পর খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। দাঁড়িয়ে দেখতে পেল সর্বোচ্চ চূড়াটায় মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত ভেবে পূর্ব সিদ্ধান্ত পাল্টে আশপাশটা ঘুরে দেখার জন্য ঠিক করল। বিকেল পর্যন্ত আশপাশের অনেকটা জায়গা ঘুরে দেখল। মাঝে মধ্যে গাছপালার ফাঁক দিয়ে মেয়েটির দিকেও নজর রাখছিল। সে শুধু এতটুকু নিশ্চিত হতে চায় যে মেয়েটি চূড়ায় আছে। এতদূর থেকে মেয়েটিকে স্পষ্ট দেখার প্রশ্নই আসে না, শুধু আবছা দেখা যায়। ছেলেটি খানিকটা স্বস্তি পেল এই ভেবে যে, মেয়েটি হাল ছেড়ে দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে তার বুুদ্ধিকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। মেয়েটির পাহাড়ের চূড়ায় চড়ার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছে সে। ভাবল, হয়তো এটা কাজে লাগতে পারে। মেয়েটির নিষেধাজ্ঞার কারণেই তো সে প্রকাশ্যে বেরও হতে পারবে না।

চুপি চুপি অনেক কিছু করা সম্ভব নয়। ঠিক করল, যখন মেয়েটি চূড়ায় উঠবে, তখন সে দ্বীপাঞ্চলটা ঘুরে দেখবে। মেয়েটি যদি দিনের সিংহভাগ সময় চূড়ায় থাকে, তাহলে ভালোই হবে। ঘুরে দেখার জন্য সময় বেশি পাওয়া যাবে। মেয়েটিকে নীচে নামতে দেখে ফিরে এলো ছেলেটি। ছেলেটি আশপাশের অনেকখানি জায়গা ঘুরল বিকেল পর্যন্ত। নাম না জানা নানা ধরনের গাছপালা চোখে পড়ল। কোনো কোনো গাছের গোড়ায় লতা-গুল্ম জন্মে জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে। কোথাও বেশ খানিকটা জুড়ে জঙ্গল সজ্জিত আছে। হাতে সেই লাঠিটি আছে। আগের চেয়ে একটু পাতলা হয়েছে রোদ পেয়ে। লাঠি দিয়ে জঙ্গলগুলোতে বাড়ি মেরে দেখতে দেখতে এগোচ্ছে সে। নানা ধরনের পাখি চোখে পড়ল। আরো দেখল খরগোশ, কচ্ছপ, বনছাগল দুচারটা; সাপ, গিরগিটির দেখা মিলল না। ছেলেটির বিশ্বাস, এসব এ দ্বীপে না থেকে পারে না। ছেলেটি ফিরে এলো কয়েকটি নারকেল হাতে।

সূর্যাস্তের পর আঁধার নেমে এলো। চাঁদ উঠতে দেরি আছে। এ আঁধারে কিছু করা সম্ভব না। একটা গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে বসে আছে। ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছে। ইচ্ছে ছিল সমুদ্রের ধারে বসে এদিকে জাহাজ চলে কিনা জানার চেষ্টা করবে। দিনে নিচ থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা না গেলেও রাতে জাহাজ আলোকিত থাকার দরুন হয়তো বোঝা যাবে। পরে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু সমুদ্রের দিক থেকে শীতল বাতাস বয়ে আসে, যাতে হাত-পা বরফে পরিণত হয়ে যেতে চায়। এখানে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা কম। তবুও এ ঠান্ডায় শুধু গেঞ্জি পরা গায়ে অসহ্য ঠেকছে। চাঁদ উঠলে দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটি তার প্রভুর সামনে। মশা মাঝে মাঝে কামড়াচ্ছে, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। একসময় দুহাত তুলে মোনাজাত শুরু করল। মোনাজাতের একপর্যায়ে পাঠ করল ছেলেটি কোরআনের এ আয়াত, ‘তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর, যার কাছ থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নাও। ইচ্ছা করলে কাউকে সম্মানিত কর, আবার যাকে ইচ্ছা অপমানিত কর। সব ধরনের কল্যাণ তোমার হাতে।’ অন্য একপর্যায়ে বলল, ‘হে আল্লাহ, তোমার হুকুমে আজ বিপদে পড়েছি, তোমার সাহায্য ছাড়া মুক্তি নেই। তুমি ছাড়া আর কেউ মুক্তিদাতা নেই।’ এ সময় চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে দুগাল বেয়ে।

কিছুদূর পাথরটি নিয়ে যেতেই হাঁপিয়ে উঠল মেয়েটি। শরীর চলতেই চাচ্ছে না। বসে খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করল। যখন গুহায় পৌঁছল, তখনো আঁধার নামতে শুরু করেনি। ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে মেয়েটি। অপর পাথর আর আজকে আনবে না ভেবে পাথরে হেলান দিয়ে গুহার বাইরে বসে পড়ল। পশ্চিম আকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। সাদা খণ্ড খণ্ড মেঘগুলো নীল আকাশকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করেছে। বেশ উঁচু দিয়ে পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশের রক্তিম আভা সাগরের পানিকেও রক্তবর্ণ করে দিয়েছে। এসব চমৎকার দৃশ্য মেয়েটির ক্লান্তি অনেকখানি দূর করে দিল।

ঠান্ডায় একটু একটু করে কাঁপছে মেয়েটি। তবুও অন্ধকার না নামা পর্যন্ত বসে থাকল। অন্ধকার নামার পর দ্বীপটা কেমন জানি তার কাছে ভুতুড়ে মনে হলো। অজানা আতঙ্কে গা-টা ছমছম করছে। তাই গুহার ভেতরে গিয়ে ঢুকল মেয়েটি। চারদিকে সবকিছু নীরব-নিস্তব্ধ। অন্ধকারে হাতড়ে পাথরটা বের করে পাথুরে দেয়ালে ঘষতে শুরু করল। এ অন্ধকার থেকে বাঁচার জন্য আগুনের প্রয়োজন বিশেষভাবে অনুভব করল মেয়েটি। দেয়াল থেকে পাথর ঘষতে শুরু করবে। ঘষা বাদ দিয়ে বসে বিশ্রাম নিতে লাগল। বাইরের অন্ধকারের চেয়ে গুহার ভেতরের অন্ধকার আরো গাঢ়। তাই বের হয়ে পাথরটায় আবার হেলান দিয়ে বসল। বাইরের অন্ধকারটা কিছুটা ফিকে হলেও ঠান্ডা অত্যন্ত বেশি। সে তুলনায় গুহাটা বেশ গরম। তাই ঠান্ডা গ্রহণ না করে অন্ধকার গ্রহণ করে গুহায় ঢুকে বালির বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

ক্লান্তিতে কখন ঘুমে ডুবে গিয়েছিল মেয়েটি, তা বলতে পারবে না। তবে খিদেয় পেট মোচড় দেয়ায় যখন ঘুম ভাঙল, তখন আকাশে চাঁদ। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। দুটো নারকেল দ্রুত সাবাড় করে বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। আবার গুহায় ঢুকে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। অন্ধকারে ভাবতে শুরু করল। আচ্ছা, আমি না হয় গুহায় আশ্রয় নিয়েছি, বলতে গেলে মোটামুটি আরামে আছি। ছেলেটি কি পছন্দসই কোনো থাকার জায়গা পেয়েছে? নাকি পায়নি? না পেয়ে থাকলে তবে কি খোলা আকাশের নীচে গাছতলায় আশ্রয় নিয়েছে? নাকি অন্য কোথাও? সে কি এ দ্বীপে আছে? না অন্য কোনো দ্বীপে চলে গেছে? সে এ অবস্থা থেকে উদ্ধারের কি কোনো পথ পেয়েছে? পেলে তাকে ছেড়েই চলে যাবে নাকি…? দূরে কোনো কিছুর শব্দে ভাবনায় বাধা পড়ল মেয়েটির। কিছুক্ষণ পর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

বেশ বেলা হয়েছে। বসে বসে ছেলেটি চিন্তা করছে, হাতে ডাল ভাঙা অনেক কঠিন কাজ। তাছাড়া সময়সাপেক্ষও। হিসাব করে দেখল, চারদিকে গাছের মোটা ডাল পুঁতে বেড়া দিতে সারাদিন কাজ করেও কম করে দশ দিন লাগবে। চিকন ডাল দিয়ে বেড়া তৈরি করা অর্থহীন। কারণ একটা খরগোশ বা বেজিও তা ফাঁক করতে পারবে। তাছাড়া এখানে এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ বা হিংস্র প্রাণী চোখে পড়েনি। গাছের ডাল দিয়ে বেড়া তৈরি করলেও তা ঠান্ডা ঠেকাতে পারবে না। এখন বেশি প্রয়োজন মাথার ওপরে একটা চালা তৈরি করা। কিন্তু তা তৈরি করার মতো কোনো গাছের বড় পাতা চোখে পড়েনি। এভাবে আরো অনেক চিন্তাভাবনা করে বুঝল, থাকার জায়গা সুরক্ষিত করার চেয়ে এদিকটা ঘুরে দেখা বেশি জরুরি।

আশপাশে আরো দ্বীপ থাকতে পারে। সম্ভব হলে সেসবও দেখা দরকার, যার ফলে মুক্তির উপায় বের হতে পারে। তাই দেরি না করে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি। এ দ্বীপটা বর্গাকার, না আয়তাকার, নাকি গোলাকার তা জানে না সে। গত দিন ছেলেটি পশ্চিম দিকে সমুদ্র পর্যন্ত একটা বেশ বড় অংশ ও তার বাসস্থান ঘিরে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্বের সামান্য অংশ ঘুরে দেখেছে। আজ প্রথমে পূর্ব দিক ভালোভাবে দেখবে বলে সেদিকে চলল। এ দ্বীপে নারকেল গাছ সমুদ্রের ধার দিয়ে বেশি হলেও মধ্যাংশে নানা জাতের গাছপালায় ভরপুর, এটা সে আগেই ধরে নিয়েছে। হেঁটে হেঁটে দেখছে চারদিক। হাতে সেই লাঠিখানি।

দুপুর পর্যন্ত নাম না জানা গাছপালা দেখল, এছাড়া ঝোপ-ঝাড় তো আছেই, পশুপাখি বলতে ওই আগেরগুলোই। তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। তবে আজ একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে। কিছুদূর যাওয়ার পর থেকে আর পাহাড় বা তার চূড়াটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। এ ব্যাপারটা নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করল। মেয়েটি চূড়ায় আছে কিনা তা লক্ষ্য করছি এ জন্য যে, সে এ দ্বীপে এখনো আছে কিনা। উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা করে আমাকে ছেড়েই চলে গেল কিনা। অর্থাৎ উদ্ধার পাওয়ার জন্য আমি সম্পূর্ণ আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পারছি না। এটা আমার দুর্বল ঈমানের পরিচয়। আমাকে একমাত্র আল্লাহই এ বিপদ থেকে চূড়ান্ত মুক্তি দিতে পারেন। তাই তাঁরই ওপর আমার পূর্ণ নির্ভর করা উচিত। সেটা যদি মেয়েটির মাধ্যমেও হয়, তাও আল্লাহর ইঙ্গিতে…।

এভাবে অনেকক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে নিজের সঙ্গে নিজে তর্ক করে ছেলেটি তার আগের চিন্তায় একটা বিরাট পরিবর্তন আনল। তা হলো সে আর ইচ্ছাকৃত পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকাবে না। তাকে ছেড়ে মেয়েটি চলে গেল কি না তা নিয়েও মাথা ঘামাবে না। তবে সে কখনোই মেয়েটিকে এ অবস্থায় ফেলে একা যাবে না। ক্লান্ত হয়ে গেছে। বসে পড়েছে। জিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মনের এ ইচ্ছাকে কোনো পাত্তা না দিয়ে হেঁটে চলল। আরো খানিক হাঁটার পর আশ্চর্য এক জিনিসের সন্ধান পেল ছেলেটি। সামনে মধ্যম আকৃতির এক বিরাট পুকুর। অবাক হয়ে ধীরে ধীরে পুকুরে নামল ছেলেটি। দুহাতে আঁজলা ভরে পানি মুখে দিয়ে দেখল, সুপেয় স্বাদ পানির। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতাসূচক ধ্বনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আপনা-আপনি মুখ থেকে বের হয়ে গেল।

কালবিলম্ব না করে পানিতে ওই অবস্থায় নেমে পড়ল ছেলেটি। বহুদিন পর এমন মিঠা পানি পেয়েছে। আর সমুদ্রের লবণাক্ত পানি তো গোসলের বা পানের উপযোগী নয়। অনেকক্ষণ গোসলের পর ওপরে উঠে রোদে দাঁড়িয়ে কাপড় শুকাল। জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। অজু করে নামাজ পড়ে নারকেল সংগ্রহ করে আহার সমাধা করল। এরপর একটু খুঁজতেই পুকুরের পানির উৎস খুঁজে পেল। বেশ দূরে একটা ছোট পাহাড়। সেখানকার এক ঝরনার পানি নালা দিয়ে এসে পুকুরে পড়ছে। ঝরনার পানির ধারা খুবই ক্ষীণ। পূর্ব দিক এখনো সম্পূর্ণ দেখা হয়নি। হয়তো অনেক বাকি। কিন্তু ক্লান্তি আর দেখার ইচ্ছাকে পাত্তা দিল না। বাধ্য হয়ে ছেলেটি আবার পুকুরের পাড়ে একটি গাছের গোড়ায় ছায়ার মধ্যে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতে বসল। কখন চোখ বুজে এসেছে বলতে পারবে না সে। কিন্তু যখন জাগল, তখন কোমল রৌদ্রস্নাত দুপুর গড়িয়ে স্নিগ্ধ বিকেল এসে উপস্থিত।

খুব ভোরবেলা পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটির। বাইরে বের হয়ে দেখল, বেলা ওঠার অনেক বাকি। হিমশীতল আবহাওয়ায় বাইরে থাকা দুষ্কর। তাই আবার গুহায় ঢুকে অলসভাবে দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। সূয্যি মামা তার গাম্ভীর্য নিয়ে উঠে দাঁড়াল আকাশের বুকে। সমুদ্রের ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে এসে নারকেল দিয়েই ভোজ শেষ করল। তারপর নারকেল আনতে বের হলো। এত সকালে চূড়ায় চড়ল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকটা নারকেল হাতে নিয়ে ফিরে এলো। দ্রুত হাঁটার পরিশ্রমে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠল।

এখন প্রথম কাজ হচ্ছে একটা ডাল ভেঙে লাঠি তৈরি করা, তারপর…। সামনের গাছ থেকে একটা সোজা মধ্যম মোটা ডাল অনেক কষ্টে ভাঙল। তারপর তা থেকে শাখা-ডাল-পাতা ছিঁড়ে নিয়ে লাঠিতে পরিণত করে কী মনে করে গুহা থেকে দুটো নারকেল নিয়ে পাহাড় বেয়ে ওঠা শুরু করল। যখন পাহাড়ের ঢাল একটু বেশি খাড়া হয়ে উঠল, তখন একহাতে দুটো নারকেল ও লাঠি নিয়ে শুধু দুপা আর এক হাতে ওপরে ওঠা দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। একহাত উঠলে দেড় হাত পিছলে নেমে আসছে। আরো কিছুক্ষণ চেষ্টার পরও যখন কিছুতেই ওপরে উঠতে পারল না, তখন ধীরে ধীরে নেমে এলো।

পরিশ্রমে ঘেমে-নেয়ে উঠেছে। গুহা বেশি দূর নয়। বিশ্রাম নিয়ে গুহায় রেখে এলো নারকেল দুটো। রোদে থাকলে পরে খেতে মজা হবে না। তারপর একহাতে লাঠি নিয়ে অনেক কষ্টে পাহাড়ের ওপরে উঠল। নজর রাখতে শুরু করল সমুদ্রের দিকে। সূর্যের অবস্থা দেখে অনুমান করল হয়তো দশটা বাজে। অসহ্য লাগছে না। তার ওপর সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা বাতাসে ঠান্ডা শরীর পেছনের বনের দিকে তাকাল। গাছপালা, পাখপাখালি ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হলো না।

আবার চোখ রাখতে লাগল অথৈ সাগরের দিকে। হঠাৎ করে ছেলেটির কথা স্মরণ হতেই ভয় ঘিরে ধরল তাকে। ছেলেটি কি প্রতিশোধ হিসেবে আমাকে ছেড়ে লোকালয়ে চলে গেছে, নাকি এ দ্বীপেই আছে আমার অপমানের প্রতিশোধের অপেক্ষায়? কীভাবে প্রতিশোধ নেবে? তার মতো অত লোকের সামনে আমি অমন অপমানিত হলে সুযোগ পেলে আমিও তো প্রতিশোধ নিতে পিছপা হতাম না। আচ্ছা, সে যদি এ দ্বীপেই থাকে, তবে প্রতিশোধ নিতে এত দেরি করছে কেন? নাকি প্রতিশোধ নেবে না? কিছুই বুঝছি না। কী যে করি?

দুপুর হয়ে এলো। নীচে নেমে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার সমুদ্র পাহারা দিতে চূড়ায় উঠল। আজ তাড়াতাড়ি চূড়া থেকে নেমে অপর পাথরটি নিয়ে গুহাভিমুখে চলল। রাতে যেন আগুনের ধারে বসে থাকতে পারে, এ আশায় দুই পাথর খুব জোরে ঘষতে লাগল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, ঘষতে ঘষতে হাঁপিয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত শুধু আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছাড়া আর কিছুই বের হয়নি। পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর সঠিক পদ্ধতি না জেনে অহেতুক ঘষে শক্তি ক্ষয় করা অর্থহীন ভেবে পাথর ঘষা বাদ দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতে লাগল। আর ভাবতে লাগল, প্রাচীনকালের মানুষ কি আজকের দিনের মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান ছিল!

একটু পর আঁধার ঘনিয়ে আসবে। চাঁদ উঠতেও অনেক দেরি। অন্ধকারে খাওয়া-দাওয়া করা যাবে না। চাঁদ ওঠা পর্যন্ত জেগে থাকাও অনর্থক। তাই খেয়ে-দেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল। আর নারকেল খেতে ইচ্ছে করছে না। এছাড়া এখানে অন্য কোনো খাদ্যও মেলেনি। অগত্যা নারকেল দিয়ে মহাভোজের পর শুয়ে চোখ মুদল।

চারদিকে যেন অমাবস্যার অন্ধকার। চাঁদ উঠতে দেরি আছে। অনেক ভেবে-চিন্তে ঠিক করেছে মেয়েটিকে পুকুরটির সন্ধান কীভাবে দেবে। তার মতো মেয়েটিরও নিশ্চয়ই স্বাদু পানির প্রয়োজন। আর যদি এর মধ্যে সে এর সন্ধান পেয়ে থাকে তবে খুবই ভালো, তা না হলে দেয়া উচিত। অন্ধকারে চোখ সয়ে খুব কষ্ট করে পাহাড়ের কিনারে পৌঁছল ছেলেটি। গুহা ছেড়ে পাহাড়ের বেশ খানিকটা ওপরে উঠে দাঁড়াল। তার সামনে-পেছন দিয়ে পাহাড় চূড়া গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত ভেবে-চিন্তে গলার মূল স্বরকে চেপে রেখে খুব জোরে কৃত্রিমভাবে কেশে উঠল। ছেলেটিকে আশ্চর্য করে দিয়ে তার প্রতিধ্বনি ফিরে এলো।

এ জায়গায় দাঁড়িয়ে খুব জোরে শব্দ করলে যে প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হবে তা আগে মাথায় আসেনি। একটু ভেবে মনে মনে বলল, ‘ভালোই হলো’। তারপর মূল গলার স্বরকে যথাসাধ্য চেপে রেখে বাংলায় বলতে শুরু করল, ‘হে গুহাবাসিনী, এ পাহাড়ের সামান্য পূর্ব-উত্তরে একটা স্বাদু পানির পুকুর আছে। সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করাই হবে সর্বোত্তম। ‘দুবার বলল। প্রতিধ্বনির কারণে শেষে শোনা গেল তম-তম-তম। এক সময় প্রতিধ্বনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তারপর ধীর পদক্ষেপে ফিরে চলল আর মনে মনে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল যেন মেয়েটি এ পুকুরের সন্ধান পায়।

একটা শব্দের প্রতিধ্বনিতে চমকে উঠল মেয়েটি। ঘুমিয়ে ছিল বলে শব্দটা বুঝতে পারল না। আর তার প্রতিধ্বনি শুনেও পরিষ্কার কিছু বোঝা গেল না। প্রথমবারে কিছুই বুঝল না। কিছুক্ষণ পর ছেলেটির চাপা স্বরের প্রতিধ্বনি মিশ্রিত কথাগুলো মেয়েটির কর্ণগোচর হলো। ভয়ে মেয়েটি কুঁকড়ে গেল। এ দ্বীপে এই প্রথম তীব্র আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। আতঙ্কে যেন নড়াচড়া করতে ভুলে গেল। সামনে ভয়ঙ্কর দর্শন কাউকে দেখতে পারে ভেবে দুচোখ বন্ধ করে ফেলল।

এভাবেই কিছুক্ষণ কেটে গেল। হঠাৎ করেই খেয়াল হলো এ কাজ ছেলেটির ছাড়া আর কারো নয়। কারণ ছেলেটি তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেছে। ভয় অনেকখানি কেটে গেল এই ভেবে যে, আতঙ্কিত হওয়ার জন্য মানুষ দায়ী, ভূত-প্রেত নয়; যদিও সে ভূত-প্রেতে বিশ্বাসী নয়। যদিও ছেলেটির প্রতি তার হৃদয় খানিকটা কোমল হয়ে এসেছিল, কিন্তু এ ঘটনায় আবার মেয়েটি কঠিন হয়ে উঠল। তবে কি ছেলেটি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে ধীরে ধীরে? এটা কি তার প্রথম পদক্ষেপ? বাকিগুলো কীভাবে নেবে? আরো কঠিনভাবে? চোখ দুটো খুলে সামনে দৃষ্টি প্রসারিত করল। সামনে কাউকে দেখতে পেল না বলে ভয় আরো অনেকখানি কেটে গেল। খেয়াল হলো, ছেলেটি উত্তর-পূর্ব দিকে কী একটা পুকুরের কথা বলল। কাল সকালে খুঁজে দেখতে হবে। আরো নানান কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ১ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-২ 2
Latest posts by জাকির আহমদ (see all)
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •