আমাদের ধান এবং চিরাচরিত নবান্ন উৎসব প্রসঙ্গে

রানা মাসুদ

১৬ নভেম্বর, ২০২১ , ২:১১ অপরাহ্ণ ; 1632 Views

আজ পহেলা অগ্রহায়ণ। নতুন ফসল তথা নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দের মাস। ‘অগ্র’ অর্থ প্রথম আর ‘হায়ণ’ অর্থ ‘বছর’। এ থেকে ধারণা করা হয়, কোনো এক সময় অগ্রহায়ণ মাসই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস(১)। ফসল ঘরে তোলার এই আনন্দ উৎসবকে বলা হয় ‘নবান্ন’

উৎসব। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’।

সাধারণত অগ্রহায়ণের প্রথমদিনে এই ফসল বা ধান কাটাকে উপলক্ষ করে যে উৎসবের আয়োজন করা হয় তাকে নবান্ন বলে। যদিও বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব শিল্পায়ন ও নগরায়নের তীব্র যান্ত্রিক জীবন, আধুনিক ও পাশ্চাত্যবোধ এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি অজ্ঞতা, উন্নাসিকতার কবলে পড়ে আজ অনেকটাই ম্রিয়মান। তবুও গ্রামীণ জনজীবনের সহজ সরল মানুষের চেতনায় এখনও নবান্ন হারিয়ে যায়নি বাংলার গ্রামীণ জনজীবন থেকে।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণা অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ অব্দ থেকে ধান চাষ বঙ্গ জীবনের অঙ্গ বলে জানা যায় (২)। ধান Graminae গ্রোত্রের দানাশস্যের উদ্ভিদ Orayza sative। প্রাচীন চীনা ভাষায় Ou-liz শব্দটি আরবিতে Oruz ও গ্রীক ভাষায় Oryza হয়ে শেষে Ritz ও Rice হয়েছে (৩)। কিন্তু বাংলায় ধান বা ধান্য শব্দের উৎপত্তি অজ্ঞাত। ধান কিংবা ওরাইজা স্যাটিভা (Oryza sativa) প্রথম আবাদি ফসলে পরিণত হয় আজ থেকে প্রায় ১০,০০০(দশ হাজার) থেকে ১৪,০০০(চোদ্দ হাজার) বছর আগে ওরাইজা রুফিগোপন (Oryza rufipogon) নামে এক জংলি ঘাস প্রজাতি থেকে। এর দুই প্রধান উপ-প্রজাতি ইন্ডিকা ক্রান্তীয় অঞ্চলে এবং জাপানিকা উপ-ক্রান্তীয় এবং নাতিশীতোঞ্ষ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা এশিয়ার সকল ধানের প্রকরণ, ইন্ডিকা কিংবা জাপানিকা উভয়ই একইসাথে চাষযোগ্য হয়ে ওঠে প্রায় ৮২০০ থেকে ১৩,৫০০ বছর আগে চীনের পার্ল রিভার ভ্যালি অঞ্চলে। পরবর্তী ২০০০ বছরে তা আশেপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে (৪)। অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরেই সব বলার চেষ্টা করছি। এখন স্বভাবতই আমাদের আগ্রহ জন্মায় এই উপমহাদেশে এবং বঙ্গে কবে বা কখন থেকে ধানের চাষাবাদ সে সম্পর্কে তথ্য পেতে।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ধানের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০-৬০০০ সালে ইন্দো-গাঙ্গেও সমভূমিতে। তবে এখানেও কথা আছে। অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতায় ধানের প্রচলন প্রথম শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০- ২৫০০ অব্দে(৫)। এখন দেখা যাক এই অঞ্চলে ধানের প্রচলন প্রসঙ্গে। প্রাচীন করতোয়া- তীরবর্তী মহাস্থান বা পুণ্ড্রবর্ধনের প্রাপ্ত এক শিলালিপিখণ্ডে উতকীর্ণ তথ্যে থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় হতে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে কোনো এক অজ্ঞাত রাজা এক দুর্গতিতে প্রজাদের ধান্য বা ধান দিয়েছিলেন সাহায্য হিসেবে। উপাত্ত ধারণা দেয় কোনও মৌর্য সম্রাটের সময়ের এই ঘটনায় সে ধান খেতে না বীজ হিসেবে দেয়া হয়েছিল তা জানা যায় না (৬)। তবে এতদিন বাংলায় যে আদি ‘ইন্ডিকা’ জাতের ধান চাষের প্রমাণ ছিল তাতে আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে নরসিংদীর উয়ারী- বটেশ্বরে খননকৃত আদি নিদর্শন থেকে। এখানে আড়াই হাজার বছর আগের ‘জাপানিকা’ জাতের ধান চাষের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এ তথ্য প্রমাণ করে আড়াই থেকে তিন হাজার বছর আগে থেকে এই অঞ্চলের সাথে পূর্ব এশিয়ার মানুষের সরাসরি যোগাযোগ ছিল(৭)।

অনেক হলো ধান নিয়ে ধানাবাদ বা ধানালেখ্য। এবার একটু দেখি নবান্ন প্রসঙ্গ। ঠিক কবে থেকে নবান্ন চালু হয়েছে উৎসব হিসেবে তা জানা না গেলেও অনুমিত হয় যে,এটা আসলে বহমান একটা প্রথা। ধীরে ধীরে কৃষক সমাজ তথা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে এটা উৎসব হিসেবে চালু হয়েছে। পালন করা হয় বিভিন্ন সামাজিক আচার- অনুষ্ঠান।

ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী নবান্ন উৎসবের বিভিন্ন আয়োজনের, আনুষ্ঠানিকতায় পার্থক্য আছে। আছে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। বাংলার মুসলিম কৃষক সমাজ নতুন ফসল ঘরে ওঠার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে বাড়ি বাড়ি কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, মসজিদ ও দরগায় শিরনির আয়োজন করে থাকে(৮)। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নবান্ন উৎসবের প্রধান অঙ্গ নতুন চালে পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ করা। পরে দেবতা,অগ্নি,কাক, ব্রাহ্মণ ও আত্মীয়-স্বজনদের নিবেদন করে গৃহকর্তা ও তার পরিবারবর্গ নতুন অন্ন গ্রহণ করতেন। এ উপলক্ষে বাড়ির প্রাঙ্গণে আলপনা আঁকার প্রচলন চলে আসছে। পিঠা-পায়েসের আদান-প্রদান এবং আত্মীয়-স্বজনের আগমনে পল্লীর প্রতিটি গৃহের পরিবেশ মধুময় হয়ে উঠতো(৯)। এখন অবশ্য পূর্ব উল্লেখিত নানাবিধ কারণে এর প্রচলন কমে গেলেও একদম হারিয়ে যায়নি।

নানাবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এই নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামবাংলার প্রান্তিক জনপদ মুখরিত হয়ে ওঠে। লোকজ ঐতিহ্যের বিবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন, পালাগান, লোকগীতি, লালন গীতি, বাউলগান, সাপখেলা, বিভিন্ন লোকজ খেলা, জারি-সারি,কীর্তন, ছিলক, যাত্রাপালার আসর যেমন বসে তেমনি আধুনিকায়নের ফলে যুগপযোগী ধারার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়। কোথাও কোথাও গ্রামীণ মেলারও প্রচলনের কথা জানা যায়। আরেকটি বিষয় যা আমরা উৎসব হিসেবে ধরি না তা হচ্চে কেনাকাটা। নতুন ধান বিক্রির টাকা দিয়ে পল্লী বাংলার পুরুষ, নারী, শিশু সব বয়সীদের নতুন কাপড় যা আসলে বিলাসিতার জন্য না আসলে তা খুব প্রয়োজনীয় সেসব ক্রয় করার ধুম পড়ে যায়। বাংলার সব মানুষের অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবেই মূখ্যত নবান্ন সমাদৃত।

নবান্ন নিয়ে সাহিত্যিকদের আগ্রহের শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/ জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে—/ স্বর্ণ শ্যাম ডানা মেলি—‘। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘ ঋতু খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?/ নবীন ধানের অঘ্রানে আজি অঘ্রান হলো মাৎ—‘। এরকম পূর্ব, প্রাচীন কিংবা আধুনিক এমনকি নবীন কবি ও লেখকদের নানাবিধ লেখায় উঠে আসে নবান্নের অপরূপ বর্ণনা। লোকছড়ায় যেমন দেখতে পাই আমরা তেমনি আধুনিক ছড়াকারদের ছড়াতেও নবান্ন উঠে আসে। নবান্ন উঠে আসে নবীন, প্রবীণ, সৌখিন আলোকচিত্রীর ক্যামেরার চোখে। এমনকি চলতি ধারার মানুষের মোবাইল ফটোগ্রাফিতেও নবান্ন উঠে আসে ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে।

ধান বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি আমাদের সম্পদের প্রতীক। অর্থনৈতিক সূচকেও এর অবদান অনস্বীকার্য। দেশে তিনটি মৌসুমে আউশ, আমন ও বোরো ধান উৎপাদিত হয়। বোরো শীর্ষে আর আউশ অনুজ উৎপাদনের দিক থেকে। ৭২% জমিতে এদেশে ধান চাষ হয়। সারাবছরই এর চাষাবাদের ফলে প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এই ধানচাষ নির্ভর(১০)।*
রানা মাসুদ, সাহিত্যকর্মী, রংপুর।
পোস্টে ব্যবহৃত সকল ছবি লেখকের তোলা। অনুগ্রহ করে কপি পেস্ট করবেন না। শেয়ার করতে পারেন। ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্র:
(১) https:// www.ekushey.tv.vom>news ১৬ নভেম্বর ২০২০
(২) Vikaspedia
(৩) মাহামুদ নাসির জাহাঙ্গীরি, বাংলাপিডিয়া
(৪) roar. media/bangla/main.com
(৫) পূর্বোক্ত
(৬) বাঙালীর ইতিহাস ( আদি পর্ব), নীহাররঞ্জন রায়, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পৃষ্ঠা–২০৭
(৭) https:// www.prothomalo.com ৬ ডিসেম্বর ২০১৯
(৮) https:// www.ekushey.tv.vom>news ১৬ নভেম্বর ২০২০
(৯) মাহামুদ নাসির জাহাঙ্গীরি, বিংলাপিডিয়া, https://by.banglapedia.org>নবান্ন।
(১০) পূর্বোক্ত-বাংলাপিডিয়া।

225 responses to “আমাদের ধান এবং চিরাচরিত নবান্ন উৎসব প্রসঙ্গে”

  1. Bobbyscuro says:

    shoppers drug mart canada pharmacy online
    mexican pharmacies canadian drugs
    canadian pharmaceuticals https://swenqw.company.site/

  2. Bobbyscuro says:

    cialis generic pharmacy online online canadian pharcharmy
    generic viagra online discount pharmacy
    navarro pharmacy https://swenqw.company.site/

  3. Bobbyscuro says:

    canadian pharmacies canadian pharmacy
    best canadian online pharmacies international pharmacy
    discount pharmacy http://pamelaliggins.website2.me/

  4. Bobbyscuro says:

    medical pharmacy canadian drugs pharmacy
    canadian government approved pharmacies canadian pharmacies online
    canada pharmaceuticals online generic http://pharmacy.prodact.site/

  5. Bobbyscuro says:

    medical pharmacies canada pharmacy
    canadian pharcharmy online canadian pharmacy
    discount pharmacy http://pamelaliggins.website2.me/

মন্তব্য করুন

%d bloggers like this: