রেজাউল ইসলাম হাসু

Intro

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
শেখ মুজিব জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

Writter

Intro

রেজাউল ইসলাম হাসু

২ মে, ২০২০ , ৭:৫৪ অপরাহ্ণ

চলে যাওয়ার ভায়োলিন

আত্মহননের মতো স্বেচ্ছা ছুরিতে নিজেকে রক্তজবা করে কেউ কেউ চলে যায় কখনো সখনো ইডিপাসের মতো। অথবা কোনো এক অদৃশ্য আঙুলের অভ্যাগত ইশারায় মায়ার বিশালতা ছেড়ে কাউকে না কাউকে চলে যেতে হয় কোনো একদিন শূন্যের অভিমুখে।

এই শূন্যতার নাম না থাকা। এই শূন্যতার নাম চলে যাওয়া। আর এইসব প্রাচীনতম সত্যর মহত্তম মিথ মেনে নিশ্চিন্তে চোখভর্তি রাজহাঁসের স্বপ্ন-সমেত বেঁচে থাকার কৌশলের নাম হচ্ছে মানুষ, কসরতের নাম হচ্ছে প্রেম। অথচ মাঝে মাঝে মানুষ ভুলে যায় সে কথা। প্রেমিকের মনে থাকে না সেই মিথ। সেরকমই কোনো এক ভুলে যাওয়া মানুষের নাম হলো আয়মান। সেরকমই কোনো এক অন্ধ প্রেমিকের নাম হলো আয়মানের পিতৃপ্রেম। কোনো এক চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ওর ভেতরের সন্তানসুলভ মানুষটা।

হাবিলের হন্তারক হাতের লালপথ ধরে আদিমকাল থেকেই চলে যাবার মিছিলে নেমেছে  এইসব মানুষের দল। মানুষ কেনো চলে যায়? এই প্রশ্নবোধক দুঃখ তাকিয়ে থাকে চলে যাওয়া মানুষের শূন্যের অভিমুখে। সীমাহীন শূন্যতাও চেয়ে থাকে নিরুত্তর দুঃখের করুণ চোখের অভিমুখে। দুঃখ লজ্জা পায়। অচেনা আড়ালে মুখ লকায়। এই আড়ালের নাম হতাশা। এই আড়ালের নাম দুঃস্বপ্ন।

কোনো এক চলে যাওয়ার হতাশায় ডুবে আছে পঁচিশতম বসন্তে পা ছোঁয়া আয়মান। ওর সে চলে যাবার নাম বিকেলের ঠোঁট থেকে একটি অনিবার্য চুমু খসে যাওয়া। ওর সে চলে যাবার নাম হৃদয়ের অর্গল ফসকে যাওয়া কোনো এক সুখশ্বেতের নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি। ওর সে চলে যাবার নাম জীবনের বেষ্টনী ভেঙে সরে যাওয়া কোনো এক সহিষ্ণু ছায়া। ওর সে চলে যাবার নাম হলো পরম পিতা।

পিতার চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ও। কিছু কিছু চলে যাওয়া মাঝে মাঝে মেনে নেওয়া যায় না। কিছু কিছু চলে যাওয়ার জন্য থাকে না কোনো পূর্ব প্রস্তুতি। হুট করে চলে যাওয়া হারমোনিয়ামের সাদা কালো কিবোর্ডে ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি তুলে। সেরকমই এক চলে যাওয়ার নাম পিতা।  তবু ওকে অঘোষিত চলে যাওয়ার সনদে স্বাক্ষর করে স্বাগত জানাতে হয় ‘উনি চলে গেছেন’। সাক্ষাৎ না করেই বলতে হয় ‘বিদায় পিতা’। টেলিভিশনের প্রত্যেক চ্যানেলে সম্প্রচার করা হচ্ছে সেই বিদায় বিবৃতি। আর বিবৃতিকারীর বিষাদাচ্ছন্ন বিত্রস্ত মুখ।

এমন একজন মানুষের মুখটা শেষবারের মতো দেখতে চেয়েও সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় না দেখার আফসোসে বারবার ফেটে পড়ছে করুণ কান্নাসমেত ভঙ্গিমায় কতিপয় মুখমণ্ডল। এইসব মুখ কতো কাছের ছিলো, কতো প্রিয় ছিলো চলে যাওয়ার মুখের। এইসব মুখের হাসি পাতায় ছেয়ে থাকতো সেই বিস্মৃত মুখ।

স্মৃতির স্কেচ ঘষতে ঘষতে কাঁচ ও কংক্রিটের দেয়ালে ভেসে ওঠে কোনো এক সাঁটানো আলোকচিত্র। তার অপার আলোর দিকে তাকাতেই অচেনা অন্ধকার কেমন যেন হুঁহুঁ করে উঠে ওদের। সত্যি সত্যি লোকটা এভাবে চলে যাবেন কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি। হায় রে নিয়তি। নিয়তি একটি উত্তর না মেলা জীবনের কোনো এক কঠিন অঙ্ক। পিতার চলে যাওয়ার পর থেকে হিসাবের সঙ্গে নিয়তির কোথায় যেন একটা সংঘাত টের পেতে থাকে ওর পরিবার।

কী থেকে কী হয়ে গেলো কেউ হিসাব মিলাতে পারছে না। কোনো এক ফুরফুরে ছুটির বিকেলে আসরের নামাজ সেড়ে মসজিদ থেকে এসে আর জায়নামাজে দাঁড়াতে পারেন নি ষাটোর্ধ্ব লোকটা। কেমন জানি একটা অস্বস্তিবোধে বিছানায় শুয়ে বিব্রত গোঙানির গহনে ডুবতে থাকেন তুমুলভাবে। এই কেমন থেকে কতো কী হয়ে যাবে কেউ ভাবতেও পারে নি। কেবল হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে শেষমেষ আইসোলেশন থেকে আইসিইউ’র নৈঃশব্দ্যের কড়িডোরে এসেই জায়গা হলো ওনার। কেউই হিসাব মিলাতে পারছে না কোনোভাবে। না গাণিতিক, না রাজনৈতিক, না পারিবারিক, কোনোভাবেই হিসাব কষে উত্তরের কোনো আগামাথা পাওয়া যাচ্ছে না। এই হিসাব না মিলানোর মানেই কি হলো চলে যাওয়া? ঘোরের ঘোড়ায় ছুটে চলেছে যেন যাবতীয় যন্ত্রণা।

সরকারি লোকের গ্লোভসবন্দি আঙুল ধরে হাসপাতাল থেকেই চলে গেলেন লোকটা। শেষ মুহূর্তে একটি বারের জন্যেও এই বাড়িতে পা রাখতে পারলেন না এই শূন্যের অভিমুখী। আহা বাড়ি! মায়ার বিশালতায় ছোট্ট একটি বাড়ি। কতো শ্রম আর সঞ্চয়ে বানানো পিতাহীন বাড়িটা যেন দাঁড়িয়ে আছে শোকের তরঙ্গে প্রবাহিত সমুদ্রের উপর। পলেস্তরা যেন খসে খসে উড়ে যাচ্ছে কান্না ও করুণার পালক হয়ে বাড়ির চোহদ্দিতে। সুবিশাল আম, জাম, সুপুরিগাছগুলো যেন অন্তরঙ্গ আত্মীয়ের মতো আগলে আছে শোকগ্রস্ত বাড়ি ও বাড়ির অধিবাসীদের।

দুপুর বেলা সরকারি লোক এসে পুরো বাড়িটা সিলগালা করে লকডাউন ঘোষণা দিয়ে গেছে। আয়মান, ওর পাঁচ বছরের বাচ্চা তুবা আর একুশ বছরের যুবতী স্ত্রী আদিবা মিলে তিনজন প্রাণি কেবল এই নিস্তব্ধ বাড়ির নির্মম নৈঃশব্দ্যে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। জনসাধারণ থেকে শুরু করে সরকারি লোকজন সবসময় কড়া নজদারি রেখেছে এই একটি বাড়ির গতিবিধির উপর। এই একটি বাড়িই যেন অন্য বাড়িগুলোকে বিভক্ত করে ফেলছে ডিভিশনের মতো। এই একটি বাড়িই যেন সারা শহরে চাঞ্চল্যকর বিশেষ কিছু বহন করে যাচ্ছে। সমূহ সন্দেহের বন্দুক যেন তাক করে আছে সামরিক বাহিনী এই একটি বাড়ির দিকেই। আহা বাড়ি! মায়ার বিশালতায় যেন নিষ্ঠুর একটি সুঁড়ঙ্গ।

ওদের ফোন নাম্বার বার বার ট্রেস করে অবগত হচ্ছে যে ওরা বাইরে গেছে কিনা। বাড়ির বাইরে যাওয়া ওদের সরকারীভাবে সম্পূর্ণ নিষেধ। ঘরের ভেতরেও ওরা যেন পরস্পর থেকে একা। ভীষণ একা। এভাবে অবরুদ্ধতার নৈঃশব্দের ভেতর একা থাকতে হবে ওরা কেউ কস্মিনকালেও ভাবে নি। তিন মিটার সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। খুব একটা কথাবার্তা বলছে না কেউ কারো সঙ্গে। নেহাৎ খুব প্রয়োজন না পড়লে কেউ কারো কাছে যাচ্ছে না। সেভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে না। নিজেরাই নিজেদেরকে সাহায্য করছে। এটা বেঁচে থাকার নতুন কৌশল, কার্যকর কসরত। এভাবেই ওরা বেঁচে আছে। এভাবে বেঁচে থাকার নামও চলে যাওয়া হয়তো। হয়তো সেই অপেক্ষার আঙুল ধরে বেঁচে আছে ওদের বিপন্ন প্রানগুলো।

বাইরের পৃথিবী কেমন আছে? ঝিরিঝিরি হাওয়ায় উঠোনে কী আগের মতো ভোর নামে? পিতার স্বহস্তে লাগানো পারুল গাছে পানি সেচের দায়িত্বটা আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে দেয়া হয়েছে তো? জলপাই, আমলকি, হরতকি আর নিমগাছেরা ভালো আছে তো? বিরিশিরি বিকেলের টেবিলের অব্যক্ত গল্পগুলো কি বুঁদবুঁদি তোলে ধোঁয়া উঠা কবিতাক্যাফে? বিবিধ প্রশ্ন এসে ধাক্কা দিতে থাকে ওদের রুগ্ন হৃদয়ের অবরুদ্ধ দরজায়।

বাইর থেকে লোকজনের যাওয়া-আসা নিষেধ এই বাড়িতে। পিতার চলে যাওয়ার পর কোনো আত্মীয়ই এই বাড়িতে পা রাখেনি। ফোনে দু চারজনের সঙ্গে কথা হয়েছিলো ওদের। তাও দিন দুই তিনেক হবে হয়তো। সরকারি লোকজন চাল ডাল শাকসবজি না দিয়ে গেলে চুলায় কোনো হাড়ি উঠছে না। ফ্রিজে যা ছিলো তা ফুরিয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন আগেই। গতকাল দুপুরের পর থেকে পেটে পানি ছাড়া আর কোনো দাঁনা পড়েনি ওদের।

অসহায় মুরগির বাচ্চার মতো তাকিয়ে আছে তুবা। ওর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তুবা মানে আয়মানের প্রেম ও প্রদীপ। বারবার বাবা বাবা বলে কাছে আসতে চাচ্ছে সপ্তাহখানে থেকে। কতোদিন থেকে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ওর নরোম গালে চুমু খাওয়া হয় না আয়মানের। লাল নীল সাদা কালো কতো রকমের পরির গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হয় না কতো রাত ওকে। ওর কি ঘুম আসে আমাদের ছাড়া? আহা অতোটুকু বাচ্চার উপরও কি ঈশ্বরের দয়া হয় না। ঈশ্বরের উপর মনের ভেতর জন্মানো বিপুল বিতৃষ্ণার বিজ্ঞান থেকে বলে উঠে আয়মান।

তুবাকে নিয়ে তুমি তোমাদের বাড়ি চলে যাও। স্ত্রী আদিবাকে পিতার অসুস্থতার প্রথম দিনেই বলেছিলো আয়মান। মরলে এক সঙ্গে মরবো। আদিবার এরকমই এক বাক্যের সবুজে আয়মানের ধূসর মাঠ সেদিন সবুজে সবুজ হয়ে ওঠেছিলো। হয়তো কোনো এক মহৎ মায়ায় আচ্ছন্ন হয়েই আদিবা যেতে পারে নি সেদিন। মাঝে মাঝে মায়া মনে হয় দেয়াল ভেঙে এভাবেই একই ছাদের নিচে নিয়ে আসে মায়াশীল মানুষগুলোকে। ভিন্ন ভিন্ন আত্মাগুলোকে একত্রে করে গেয়ে উঠে অভিন্ন আত্মার কোরাস।

কিন্তু তুবা? ও তো কোনো পাপ করেনি। তাহলে ওর কী হবে? মৃতপ্রায় মাছের লাল কানকোর মতো প্রবল হাঁশফাঁশ তুলে আদিবাকে বলে আয়মান। আমি চলে না যাওয়া অব্দি তুবা ও তোমাকে সামলাবো। আর আমি চলে গেলে সরকারি লোক ওর দেখাশোনা করবে। চলে যাবার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে আদিবা। চলে যাবার আগে মানুষ কী সত্যিই এত শক্ত থাকে! এত স্বাভাবিক থাকে! আদিবার কথা শুনে সপ্তম আশ্চার্যের পাথুরে ভাস্করের মতো মূর্ত হয়ে ভাবতে থাকে চলে যাওয়া শূন্যের অভিমুখে চেয়ে থাকা আয়মান।

যে কোনো সময় যে কেউ চলে যেতে পারি। কথা বলতে গিয়ে গলাটা প্রচণ্ড ব্যথা করে ওঠে আয়মানের। কাশের ধাক্কা যেন কোনোভাবে সামলাতেই পারছে না ও। একটু পর পর সর্দি যেন মোমের মতো গলে গলে পড়তে চাইছে ওর নাকের সুঁড়ঙ্গ বেয়ে। টিস্যু পেপার যা ছিলো সব ফুরিয়ে গেছে। একটু চা খাবে সেই চিনিটুকু পর্যন্ত ঘরে নেই। আদিবা সরকারি লোককে ফোন করেছিলো কিছু চাল, ডাল, শাকসবজি, চাচিনি আর বাচ্চাটার জন্য এক লিটার দুধের জন্য। আসি আসি করে সন্ধ্যা হয়ে গেলেও তবু জিনিসপত্র নিয়ে কেউ আসে নি।

ল্যাম্পোস্টের নিচে আবছা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জানালার রেলিঙ ধরে অবচেতনে কখন যেন চোখের পাতা মুদে আসে আদিবার টের পায় না। অশ্রু ভেজা তেলচিটচিটে বালিশে জ¦রে পুড়ে যাওয়া মাথাটা রেখে বিছানায় পড়ে আছে আয়মানের নিস্তেজ দেহ। পঁচে যাওয়ার দুর্গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। একটু পর পর বমি করছে পাঁচ বছরের তুবা। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে মা…মা…আব্বু…আব্বু বাচক কান্না মেশানো করুণ আর অবুঝ ধ্বনিগুলো।

কেবল তখনও ল্যাম্পোস্টের নিচে আবছা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আদিবার দীর্ঘশ্বাসসমূহ। তখনও পলেস্তরার মতো খসে খসে উড়ে যাচ্ছে সুখশ্বেতের পালকসমূহ কোনো এক শূন্যের অভিমুখে…

 

লেখক : তরুণ সাহিত্যিক।
জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর।

প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

 

চলে যাওয়ার ভায়োলিন 5

রেজাউল ইসলাম হাসু

৩০ এপ্রিল, ২০২০ , ৬:৫১ অপরাহ্ণ

গল্পটা মে দিবসের

পক্ষঘাতগ্রস্তে বাবাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরতে প্রকৃতি এরতাজকে বাধ্য করেছিলো একরকম। শূন্যের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে করুণ ক্লেদাক্ততার অতল অন্ধকারে রায়হান নামের কোনো এক পরম করুণাময় প্রদীপ জ্বলে ওঠে।

আকাশ ছাড়া এই অচেনা শহরে ছাদহীন মানুষটার ফ্যাক্টরির হেলপারের চাকরিটা ছিলো বেঁচে থাকাকার অন্তিম আকুতি।

সারাদিন গাদাখাটুনির পর কবুতোরের খুঁপড়ির মতো ঘরটা তিনজনের সঙ্গে গাদাগাদি করে রাত কাটিয়ে দিতো দুটো ডাল-ভাত খেয়ে। মাস গেলে হাজিরা বোনাস আর অভারটাইম মিলে দশ-বারো হাজার টাকা মাইনে পেতো। রোজগারের সিংহভাগ টাকাই বিকাশের মাধ্যমে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতো। আমিকে ভুলে আমার ভেতর অসুস্থ মা আর একমাত্র ছোট বোন রাহেলার জন্য ছিলো এরতাজের অবারিত জায়গা।

গল্পটা মে দিবসের 6

কোনো এক সামারের সকালে ফ্যাক্টরির গুদামঘরে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় আবিস্কার করে সিকিউরিটি মমতাজ। ফ্যাক্টরির সকলেই খুব আশ্চর্য হয়েছিলো এই ভেবে যে, এরকম এক সোজা-সাপ্টা ছেলেকে কোন শিমরের বাচ্চা গুদামঘরে ঝুলিয়ে রাখলো। আর এভাবেই একটা অসহায় পরিবার আরও অসীম অসহায়ের মুখে পতিত হলো এবং তারপর…

রাবেয়া খাতুন

পক্ষঘাতগ্রস্ত স্বামী ও দুই ছেলেমেয়ের সংসারের ঘানি টানতে টানতে কখন যে, নিজের ডান কিডনিটা অকেজো হয়ে গেছে টেরই পাননি বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুন।

প্রত্যেক মে দিবসে রাবেয়া খাতুনের কবুতোরের খুপড়ির মতো ঘরটা শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজনের জোয়ারে ভেসে যায়। এরতাজের মৃত আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া খায়ের হয়। খিচুরি বিতরণ হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের উকিল মামলার তারিখের জন্য সরকারি নোটিশবোর্ডে ঝুলে থাকেন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো কয়েদির মতো।

পুলিশ কর্মকর্তারা জোড় গলায় উপস্থিত জনতার সম্মুখে জানান দেয় যে, আমাদের কাছে যেসব আলামত আছে তা দিয়েই হত্যাকারীকে ধরতে পারিনি। তবে অচিরেই ধরতে পারবো বলে আশা করছি। হত্যাকারী আইনের হাত ফসকে বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারবে না। মনে রাখবেন, আইন সবার জন্য।

টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সাংবাদিকরা বয়সের ভারে ন্যুব্জ রাবেয়ার শীর্ণ ছবি তুলে ভাঙা ভাঙা আকুতি রেকর্ড করে নিয়ে যায় সম্প্রচার করার জন্য।  সাত বছর ধরে তিনি একটিই দাবি করে আসছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রির কাছে,

‘মুই মোর ছাওয়ার খুনের বিচার চ্যাঁও।’

বলেই কাতান শাড়ির আঁচলে ক্লিষ্ট দৃষ্টি মোছেন। এই আঁচলে কতো পাথর জমেছে —এইসব সাংবাদিক অথবা শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজনরা আদৌ কী উপলব্ধি করতে পারে!

রাহেলা

পিএসসি পাশ করতে না করতেই সংসারের হাল ধরে জীবননৌকার মাঝি হয়েছে এরতাজের ছোট বোন রাহেলা। ঢাকার যে ফ্যাক্টরিতে এরতাজ হেলপারি করতো, সেই ফ্যাক্টরিতেই তার অপারেটর পদে একটা চাকরি হয়েছে।

অবিবাহিতা আর সুন্দরি হওয়ার সুবাদে কবুতোরের খুপড়ির মতো ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোলেই ইভটিজিংয়ের শিকার হয়। কোথাও নালিশ করার সাহস পায় না। মেয়েদের মনে হয় ব্যক্তিগত দুঃখ ছাড়া কারো কাছে অভিযোগপত্র ড্রপের বাক্স থাকে না।

ডানবাঁ থেকে কেবল কুত্তার মতো তাড়া করে প্রেমের অফার। রাহেলা জানে, এগুলো প্রেম না কাম। কাম না কামড়-ক্লেদ। দেহ নিয়ে জুয়া আর ফূর্তিবাজি। কলসি খালি হলেই পাখি ফুরুত। তাদের ফ্যাক্টরির প্রোকডাকশন ম্যানেজার মইজ্জুদ্দিন তাকে চোখের আড়ালে যেতে দেয় না। কয়েকবার জবরদস্তি করে নাভি অব্দি চলে গিয়েছিলো।

এ কথা রাহেলার শরীর ছাড়া আর কেউ জানে না।

মইজুদ্দিন

রাহেলাদের ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ম্যানেজার মইজুদ্দিন। উনি রাহেলাদের মতো মেয়েদের অসহায়ের সুযোগে জীবনযৌবনে ঢুকে পড়ে গিরগিটির মতো। সেবার নামে সেবন, দানের নামে দোহন করতে ওঁৎ পেতে থাকে ফুসরতের জানালায়। উদ্দেশ্য হাসিল হলেই টয়লেট পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে ময়ল্রা বাস্কেটে। এমনই এক ফাঁদ পেতে ওঁৎ পেতে আছে রাহেলার যৌবনজানালায়।

রাবেয়া খাতুন

মে দিবসে পড়ার জন্য পাশের বাসার রহিমন খালার কাছ থেকে হাওলাত করে আনা শাড়িটা খুলে পুরাতন ছিঁড়া একটা শাড়ি পড়ে বারান্দায় দাঁড়াতে গিয়ে কুঁকিয়ে ওঠেন বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুন। রাহেলা শবজি কাটা ফেলে মাকে ধরতে দৌড়ে কিচেন থেকে ছুটে আসে।

একদিন ওষুধ না খেলে রাবেয়া খাতুন কাহিল হয়ে পড়েন। সকালে রাহেলাকে ওষুধ আনার কথা বলা হলেও দোকানদার বাকি না দেয়ায় আনতে পারেনি রাহেলা। সে বলেছে, কাল বেতন দিলে নিয়ে আসবো।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাবেয়া খাতুন ক্যালেন্ডারের দিকে অশ্রুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এই ভেবে যে, এই ঘরে  আবার কবে মে দিবস আসবে।

রাহেলা

মাঝে মাঝে মধ্যরাতে কোনো এক দুঃস্বপ্নে রাহেলার ঘুম ভেঙে যায়। একবার ঘুম ভাঙলে তার আর ঘুম আসে না রোগ পেয়ে বসে। এই রোগের নাম সে বলতে পারে না। বড় ভাই এরতাজ বেঁচে থাকলে হয়তো আজকে সে তার সহপাঠি শারমিনের সঙ্গে ভার্সিটিতে পড়তো। অথচ একটি মৃত্যু তাদের সব উলটপালট করে দিয়েছে।

জীবিকার তাগিদে মায়াবতী গ্রাম ছেড়ে শেষমেষ ঢাকা নামক ডাকাতের নরকে নীড় বাঁধতে হয়েছে। বিয়ে নামের সোনার স্বপ্ন দেখতেও সাহসও পায় না অসুস্থ মায়ের করুণ মুখাবয়বে তাকিয়ে। বিয়ে হলে কে দেখবে এই মানুষটাকে?

প্রোডাকশন ম্যানেজার মইজুদ্দিনের নোংরা প্রস্তাবগুলো তাকে বিষমভাবে বিষিয়ে তুলেছে। ইচ্ছে করে তার খালাতো বোন পায়েলের মতো ঘুমের বড়ি খেয়ে সুইসাইট করতে। কিন্তু কোনো এক অসীম অপারগতার বেড়িতে আটকে থাকে তার সে অসহ ইচ্ছে। এই যাপিত দহনের ভেতরও ভালো লাগার রক্তজবা ফোটে। কেবল রায়হানের মতো কোনো এক সুদর্শনের একজোড়া চোখের মায়ায় তার ডুবতে ভালো লাগে।

রায়হান

কোনো এক শীতগ্রস্ত দিনে জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে রায়হানের মতো অচেনা প্রদীপের সাথে দেখা হয়েছিলো এরতাজের। যখন এরতাজ না খেয়ে খেয়ে একটা কাজের জন্য ফ্যাক্টরির পর ফ্যাক্টরির গেটে গেটে ঘুরছিলো। রায়হান প্রদীপের মতো এরতাজের অন্ধকার অরণ্যে আলো ছড়ালো

হেলপারের চাকরিটা নিয়ে দিলো। হাজিরা বোনাস ও অভারটাইম মিলে দশ-বারো হাজার টাকা মাস গেলেই মাইনে পাওয়া শুরু হলো। কবুতোর খুপড়ির মতো একটা ঘর তিনজনের সাথে শেয়ার করে তিন হাজার টাকায় থাকা-খাওয়ায় মাস চলে যেতো। রোজগারের সিংহভাগ টাকা বিকাশের মাধ্যমে বৃদ্ধা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতো।

এভাবেই এরতাজের জীবন শুরু হয়েছিলো রায়হানের আলোকিত হাত ধরে। রাহেলাকে প্রায় এরতাজ রায়হানের গল্প শোনাতো বাটনআলা ফোনালাপের মাধ্যমে।

মইজুদ্দিন

প্রোডাকশন ম্যানেজার মইজুদ্দিন অনেক ফলমূল, শাক-শবজি, মাছ ও ওষুধপত্র নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাহেলাদের বাসায় আসেন। রাবেয়া খাতুনের হাতে খাদ্যসামগ্রী গুঁজে দিতে দিতে বলেন, মনে করেন খালাম্মা আপনার ছেলে এরতাজ এনেছে। মৃত ছেলের দোহাই শুনে রাবেয়া মায়ের ভূমিকায় নেমে খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করেন।

মাঝে মাঝে মইজুদ্দিন এখানে আসে। রাবেয়া খাতুনের খোঁজ-খবর নেয়। ভালো-মন্দ জিগায়। এটা-ওটা দেয়। এসবই কেবল রাহেলাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য। কবে যে এই ময়না পাখিটা তার খাঁচায় ধরা দিবে…

রাবেয়া খাতুন

নিদানের দিনে ফলমূল, শাক-শবজি, মাছ ও ওষুধ সামগ্রী পেয়ে মইজুদ্দিনকে ফেরেশতার সাথে তুলনা করেন বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুন।

‘ভালা মানুষ রইচে বইলাই পৃথিবীডা এহনও ধ্বংস অয় নাই।’

দুপুরের লাঞ্চ সেড়েই ওষুধ খেয়ে শুয়ে ঘণ্টাখানেকের ভেতর একটু সুস্থতাবোধ করলে জায়নামাজে বসে বসে মইজুদ্দিনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন তিনি।

‘আল্লাহ, লোকডারে ভালা রাইখো তুমি!’

রাহেলা

রাহেলার ইচ্ছে করছিলো মইজুদ্দিনের মুখে থুথু ছিটিয়ে আসে। মোরা গরিব হইবার পারি বি ফকির না। হ্যার কাচে ভিক্ষা লমু কুনু।

প্রতিবেশীরা মুইজুদ্দিনের আসা-যাওয়া বাঁকা চোখে দেখে। কথা ফিসফাসের পথে হাঁটতে হাঁটতে চৌহদ্দি অব্দি ছড়ায়। আজেবাজে গল্প বিষ্ফোরিত হয় মইজুদ্দিন ও রাহেলাকে কেন্দ্র করে।

রাহেলা কেবল অসহায় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ক্ষোভ দমিয়ে রাখে। চাকরিটা না থাকলে কি করে খাবে তারা। সাত বছর ধরে ভাইয়ের হত্যার বিচার চাইতে চাইতে ক্লেদাক্ত।

সব কথা মাকে বলা যায় না। রাহেলা কেবল মুখে ওড়না চেপে বুকের ভেতর পাথর পুষে যায় দিনের পর দিন।

রায়হান

ইদানিং রায়হানের শিমুলটাও রাহেলার শীতঋতুতে শিশিরের মতো নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে। রায়হান মাঝে মাঝে বুকের মাঝখানে কোনো এক বেগানা স্পর্শ টের পেতে থাকে।

রোজ তাদের কতো কথা হয়। খালাম্মা কেমন রইচে? তর কুনু সমস্যা অইতেচে না তো? কিচু লাইগলে আমারে কইবি। এরতাজ খুব ভালা পোলা আচিলো। ওর হত্যার বিচার অ্যাকদিন অইবোই অইবো।

কিন্তু শত কথার ভিড়ে কেবল একটি কথা কোনোদিনও বলা হয় না তাদের। কখনো বলা হবে কি-না তাও জানে না তারা। দীর্ঘশ্বাসের ছিপি খুলে ঠাস করে বের হয় হাওয়াইমিঠাইর মতো মিশে যায় বাতাসের গর্ভাশয়ে। আর সেই না বলার নাম ‘আমি তুমারে ভালাবাচি।’

রাহেলা

অসুস্থ মাকে একটা সুস্থ পৃথিবী এনে দিতে ইচ্ছে করে রাহেলার। ডাক্তার বলেছেন, অপারেশন করলে আপনার মা ভালো হয়ে যাবেন। উনি আবার আগের মতো চলতে ফিরতে পাবেন। অনেক ব্যয়হুল হবার কারণে আজও তার অপারেশন করানো সম্ভব হয়নি ওয়ার্কার রাহেলার পক্ষে।

জীবনের রেলিঙ ধরে হুট করে এসে যায় রায়হানের প্রেম। প্রতিদিন কাজের ফাঁকে চোখাচোখি হয়। ইশারা বিনিময় হয়। চাঁদনি রাতে আসমানের দিকে তাকালেই রায়হানের জন্য রাহেলার গহীনগহন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

মইজুদ্দিন

অনেক দিন হয়ে গেলো রাহেলা। আমার আর ত্বর সইছে না। জানো তো, অপেক্ষা করতে আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি খালাম্মাকে সব খুলে বলো। আমি তোমাদের নতুন জীবন দেবো। উত্তরায় তোমার নামে ফ্লাট হবে। আমার মিরপুরের কাপড়ের দোকানটা তোমার নামে লিখে দেবো। আগের বউকে ডিভোর্স দিয়ে সোজা তোমার কাছে চলে আসবো। রাহেলা কিছু বলে না। কেবল বোবা কান্নার মতো মইজুদ্দিনের লোভার্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমারে আর কডাদিন সময় দেন।

দেখো, বেশি দেরি করতে করতে ততদিনে না তুমি ভাইরাল হয়ে যাও…

রাহেলা

রাহেলার ইচ্ছে করছিলো মুইজুদ্দিনের মুখের উপর জীবনের সমস্ত থুথু ছিটিয়ে দেয়।

ব্যাডা, লম্পট কোথাকার। বউ থাইকতে বিয়া কইরতে চায়। কতো মাইগো জেবন নষ্ট কইরছে তার কুনু হিশাব নাই।

রাবেয়া খাতুন

আরেকটা মে দিবসের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া খাতুন। কবুতোরের খুপড়ির মতো ঘরটা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে আসা লোকজনের জোয়ারে ভেসে যাবে। এরতাজের মৃত আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া খায়ের হবে। খিচুরি বিতরণ হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের উকিল মামলার তারিখের জন্য সরকারি নোটিশবোর্ডে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো কয়েদির মতো ঝুলে থাকবে মাসের পর মাস।

পুলিশ কর্মকর্তারা জোড় গলায় উপস্থিত জনতার সম্মুখে জানান দেবে যে, আমাদের কাছে যেসব আলামত আছে তা দিয়ে এখনও হত্যাকারীকে আমরা ধরতে পারিনি। তবে অচিরেই ধরতে পারবো বলে আশা করছি। হত্যাকারী আইনের হাত ফসকে বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারবে না। মনে রাখবেন, আইন সবার জন্য।

টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সাংবাদিকরা বয়সের ভারে ন্যুব্জ রাবেয়ার শীর্ণ ছবি তুলে ভাঙা ভাঙা আকুতি রেকর্ড করে নিয়ে যাবে সম্প্রচার করার জন্য। সাত বছর ধরে তিনি একটি দাবিই আবার জোড় দিয়ে করবেন,

‘মুই মোর ছাওয়ার খুনের বিচার চ্যাঁও।’

বলেই হাওলাত করা কাতান শাড়ির আঁচল দিয়ে অশ্রুত দৃষ্টি মোছবেন। এই আঁচলে কতো শোক জমে আছে এইসব সাংবাদিক অথবা শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজনরা আদৌ কী উপলব্ধি করতে পারবে!

রায়হান

রায়হানকে সবশেষ জামালের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে রাহেলা। এরপর থেকে তাকে আর কোথাও দেখা যায়নি। শোনা যাচ্ছে, আজ তিনদিন অব্দি তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে কোথাও হাওয়া হলো লোকটা কেউ বলতে পারে না। রাহেলার সন্দেহের ছুরি মইজুদ্দিনের দিকে ছুটতে থাকে…

রাহেলা

কোনো এক সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাহেলাকে কাজের অছিলায় বাসা থেকে নিয়ে যায় মইজুদ্দিন। এরপর তাকেও আর পাওয়া যায় না তিনদিন অব্দি। মইজুদ্দিনের ফোন সুইসঅফ। ফ্যাক্টরিতেও আসা না। প্রায় তিনদিন পর বৃষ্টিভেজা সকালে রাহেলাকে ঝুলন্ত অবস্থায় ফ্যাক্টরির গুদামঘরে আবিস্কার করে সেই সিকিউরিটি মমতাজ।

মনে হচ্ছে যেন একটি ময়না পাখি ভাঙা ডানার যন্ত্রণায় ছটফটাতে ছটঅটাতে কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো। বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুনের পৃথিবী জুড়ে নেমে আসে অসীম স্তব্ধতা!

রাবেয়া খাতুন

মে দিবস এসে গেছে রাবেয়া খাতুনের সেই কবুতোরের খুপড়ির মতো ঘরটাতে। শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজনের জোয়ারে ভেসে গেছে চৌকাঠ পেরিয়ে বারান্দা অব্দি। এরতাজ ও রাহেলার মৃত আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া খায়েরে উপচে পড়ছে সমূহ প্রাণোস্পন্দন। খিচুরি বিতরণের হিড়িক লেগেছে

রাষ্ট্রপক্ষের উকিল মামলার তারিখের জন্য সরকারি নোটিশবোর্ডে আজও ঝুলে আছেন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলোনো কয়েদির মতো।

পুলিশ কর্মকর্তারা জোড় গলায় উপস্থিত জনতার সম্মুখে এবারও জানান দিচ্ছে যে, আমাদের কাছে যেসব আলামত আছে তা দিয়ে এখনও হত্যাকারীকে আমরা ধরতে পারিনি। তবে অচিরেই ধরতে পারবো বলে আশা করছি। হত্যাকারী আইনের হাত ফসকে বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারবে না। মনে রাখবেন, আইন সবার জন্য।

টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সাংবাদিকরা অসহায়ের ভারে ন্যুব্জ রাবেয়ার শীর্ণ ছবি তুলে ভাঙা ভাঙা আকুতি রেকর্ড করছেন সম্প্রচার করার জন্য। আট বছর পর তিনি তার দাবিগুলো আরও জোড় দিয়ে বলছেন,

‘মুই মোর ছাওয়ালদের খুনের বিচার চ্যাঁও।

মুই মোর ছাওয়ালদের খুনের বিচার চ্যাঁও।’

বলেই হাওলাত করা কাতান শাড়ির আঁচল দিয়ে অশ্রুত দৃষ্টি মোছেন। এই আঁচলে কতো পাথর জমেছে —এইসব সাংবাদিক অথবা শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজনরা আদৌ কী উপলব্ধি করতে পেরেছে!

 

লেখক : তরুণ সাহিত্যিক।
জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর।
প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ।

গল্পটা মে দিবসের

রেজাউল ইসলাম হাসু

২০ এপ্রিল, ২০২০ , ৫:৩৯ অপরাহ্ণ

তুই  হাল্যায় নাস্তিকের বাচ্চা

গাড়িঘোড়া চইলচে না, ইতে কী অইচে! মাশাল্লাহ মার্কান ঠ্যাঙ দুইখান রইছে না। বাঘের হাইড্ডির লাহান কী ছইক্ত আর মইজবোত। হ্যার কুনু হ্যাঁছফ্যাঁছ নাই। হ্যায় টাট্টু ঘোড়ার লাহান টগবইগে। কাইতান শাঁতায়ের লাহান পাগইল্যা। হ্যার উপর ভর কইরা ঈশ্বর তুমারে এই পৃথিবীতে পাডাইচে।

হাল্যায়, পৃথিবী অ্যাকডা ছুয়োরের বাচ্চা। হাল্যায়, ঈশ্বর অ্যাকডা বাইন…। তওবা… তওবা… তওবা। হায় কী কইতাচি! কারে গালি দিতাচি? নাউযুবিল্লাহ! আছতাগফিরুল্লাহ! হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তর কুনু ধর্ম-কর্ম নাই। হাল্যায় নাস্তিুকের বাচ্চা। য্যামনেই হউক আইজকের মইধ্যে ঢাহা যাইতে অইবোই অইবো। ঠ্যাঙের প্যাডেলডা আরেকডু বাড়াইয়্যা দে।

আহা মাশাল্লাহ মার্কান ঠ্যাঙ দুইখান মোর…

আহা টাট্টু ঘোড়ার লাহান টগবইগে ঠ্যাঙ দুইখান মোর…

চোপ বি হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তুই কী মানুছ! মানুছ ত অইলো গিয়্যা হ্যাই রুবানা হকেরা। হ্যাই ওবায়দুল কাদের সাবরা। অ্যাছির হাওয়া ছাড়া যাগো ঘুম আহে না। যাগো হকালের কতা বিকাল আহনের আগেই বদলায়া যায়গা ম্যাঘের লাহান। যাগোর অ্যাকডা বিবৃতিতে ছারা দ্যাশ লকডাউন অইয়া যাইবার পারে। যাগোর ব্ইুড়া আঙ্গুলির অ্যাকডা তুড়িতেই কাকের লাহান মোরা উইড়া আইবার পারি ঝাঁকে ঝাঁকে এই ঢাহা শহরোত। তুই ত  হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। মাইনছের বাচ্চাগুলো ইংরেজিতে তোগো ওয়ার্কার কইয়া ডাহে।

তুই  হাল্যায় নাস্তিকের বাচ্চা 7

তুই হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা। ওয়ার্কারের মানে বুঝোস? বুঝোস না। হাল্যায় বুঝবা ক্যামনে মূর্খের বাচ্চা। তুই ত হ্যাগো লাহান ভার্সিটিত পড়োস নাই। লন্ডন, নিউইয়র্ক, ছিডনিতে যাইস নাই। ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদির লাহান নামিদামি  মাইনছের ছাথে হাত মিলাইস নাই।

তয় হুন হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা, ওয়ার্কার মানে অইলো, কাম কইরতে গিয়্যা তামান্না গাইরমেন্টসের আগুনে পুইড়া ঘরে ফেরা। পুঙ্গু অইয়া বাকিডা জেবন মরার লাহান বাঁইচ্যা থাহা। জেবনের ঝুঁকি লইয়া কাম কইরতে গিয়া রানা প্লাজার ইট-পাথরোত পিষ্ট হইয়া মইরা যাওয়া। বউরে বিধবা বানা। বাচ্চাদের ইতিম বানা। বাপমায়ের বুক খালি কইরা দ্যায়া। হেই মাসের মাইনে পরের মাসে লইতে লইতে বকেয়ার খাতা ভারি কইরা দ্যায়া। দোহানির ফকিরনির বাচ্চা…গরিবের বাচ্চা মার্কান গালি হুইনাও ফের বাকিবাট্টার লাগি গিয়্যা খাড়ন থাহা। ওয়ার্কার মানে অইলো, কুত্তার বাচ্চা…শুয়োরের বাচ্চা…গালি গুঁত্তা খাইয়্যাও বিশ্বস্ত কুত্তার লাহান মালিকরে প্রভুভক্ততা দেহানো।

তুই হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তুই হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা। তুই খালি অ্যাটোম বোমের লাহান বিশাল বিশাল কতা হুনবি অর গাধার লাহান হজম কইরবি। মাগার কুনু বমিটমি কইরতে পাইরবি না। পাগোইল্লা কুত্তার লাহান খিস্তি দিতি পাইরবি না। তুই খালি মইধ্যযুগের বাদছাহি ঘোড়াগো লাহান চাবুকের খিচুনি খাইবি মাগার খিচতে পাইরবি না। কুনু চুখ গরম কইরা খিচুনির প্রতিবাদ কইরতে পাইরবি না। মোনে কইরবি, তর কুনু চাবুক নাই। তর কাছোত কুনু চাবুক রাইখবার পাইরবি না। তুই কুনু চাবুক কিনতেও পাইরবি না, বানাইতেও পাইরবি না। মোনে কইরবি, চাবুকের মালিক হেই মাইনছের বাচ্চাগুলাই।

হুট কইরা মাইরা ফালাইলেও তর মরদেহ লইয়া মিচিল কইরতে পাইরবি না। কোর্টকাচারোত বিচার চাইবার পাইরবি না। কারণ দরিয়ার লাহান তর ম্যালা পাকস্থলি রইছে। খিদার লাহান আজব শয়তান রইচে। তৃষ্ণার লাহান নির্দয় পাপ রইচে। অভাবের লাহান পঁচা আবর্জনা রইচে।

উনাগো ঈশ্বর লাহান ঐশ্বর্য রইচে। উনাগো দেবতার লাহান দেমাগ রইচে। উনাগো ট্যাকার লাহান পুণ্য রইচে। আবর্জনার লাহান হেইসব নাই বইলাই উনারা আমগো থাইকা মহান। উনারা মাইনছের বাচ্চা। উনারা ঈশ্বর। উনারা দেবতা। উনাগো ছালাম কইরবি নি…উনাগো সেজদাহ কইরবি নি হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা।

ছ্যার, আমগো মাইনছের বাচ্চা কইয়া আপনাগো অপমান কইরেন না। হ্যার চাইতে বালা, কন শ্রমিকের বাচ্চা। ওয়ার্কারের বাচ্চা। তয় বালা হয় ছ্যার। তয় কন ছ্যার। হ ছ্যার, মোরা ত শ্রমিকের বাচ্চাই। মোরা ত ওয়ার্কারের বাচ্চাই। মাইনছের বাচ্চারা কি অ্যাদ্দুর হাঁইটা ঢাহায় আইবার পারে? হাইসা দিলিন নি ছ্যার। আপনাগো হাসন দেহিলে আমগোও হাসি পায়। মাগার মোরা হাইসবার পারি না। কারণ মোরা হাইসা দিলি নাহি পঁচা বাছির লাহান দুর্গন্ধ ছড়ায়। মাইনছের বাচ্চাগো হুন্দর পরিবেছটা নাহি নোংরা অইয়া যায়। ছ্যার গো! ও ছ্যার! মোরা ত আপনাগো লাহান হাইসতে পাইতাচি না। কিয়ামত পইরযন্ত কান্দির লাগিই নাহি আমগো জন্ম অইচে।

কী কইলেন ছ্যার, ছামাজিক দূরত্ব? হেইডা ফের কী জিনোস গো ছ্যার? খায় না মাখে? ঠ্যাঙে দ্যায় না মুখে দ্যায়? মোরা ত কুনুদিন দেহি নাই। কুনুদিন হ্যার নামডাও হুনি নাই। খালি মাইয়াডা যেইবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেইল করছিল, হেইবার ছোমাজবিজ্ঞান নামের কুনু অ্যাকডা বিষুই হুইনাছিলাম। অর বি অ্যাকখান কতা হুইনছিলাম যে, ছোমাজবিজ্ঞানের জনকের নাম না ল্যাইখবার ফলে মাইয়্যাডা মোর পাশ কইরবার পারে নাই। কারণ অ্যাকডাই, হেই যে কইলাম, মোরা মাইনছের বাচ্চা না। মোরা শ্রমিকের বাচ্চা। মোরা ওয়ার্কারের বাচ্চা। অয়তো হেইডাও অ্যাকডা কারণ অইবার পারে বৈ কী।

মাস্ক বানা শ্রমিকের বাচ্চা। অ্যাতো ভাবোস না। হেইগুলা তর কাম না। রাষ্ট্র রইচে না। রাষ্ট্রের চিন্তুকরা রইচে না। য্যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান লইয়া বিশাল বিশাল কিতাব ল্যাখে। য্যারা অর্থনীতি লইয়া বড় বড় বিবৃতি দ্যায়। য্যারা মাইনছের বাচ্চা ভাবে নিজেগো। য্যারা মানুছ বইলা দাবি করে নিজেগো। হেইগুলা হ্যাগো কাম। তুই হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তুই হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা। তর কাম মাস্ক বানা। তর কাম ইপিপি বানা। তর কাম হ্যাগো বউদের ব্রেছিয়ার বানা। তর কাম হ্যাগো মাইয়্যাদের ব্রা বানা।

রাষ্ট্রের এহন ম্যালা মাস্ক লাইগবো। ম্যালা ইপিপি লাইগবো। ম্যালা ব্রেছিয়ার লাইগবো। ম্যালা ব্রা লাইগবো। তোর কুনু ইপিপি লাইগবো না। তুই হাল্যায় রাষ্ট্রের কুচ নেহি। আদমশুমারিতে ভুইল কইরা তোগো নাম উইডা গ্যাছে। জাতীয় পরিচয়পত্রটা খালি জাতিছংঘকে দ্যাখায়া কোটি কোটি ডলারের অনুদান লইয়া আহনের লাগি তৈরি করা অইচে। চোপ বি হাল্যায়, তুই সরকারের কুন বালছিরার আব্দুল। তুই শ্রমিক। তুই হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তুই ওয়ার্কার। তুই হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা। তুই হাল্যায় বাইনচোদ… মাদারচোদ…! অর কুচ হুনবি?

চোপ বি হাল্যায়। নিরামেষী হ। তর আমিষ লাইগবো না। মাছের দোহান দিয়্যা হাঁইটবি মাগার ভুইল কইরাও হ্যার দাম হাঁকাইবি না। গোছতের দোহান দিয়্যা আহনের সুমুই ভুইলেও গোছতের দাম জিগাইবি না। কারণ তুই হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তুই হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা। তর মাইনে মাইনছের বাচ্চার মাইনে থাইকা যৎসামান্য। মাইয়্যাডার স্কুলের মাইনে দুইডা মাস বকেয়া রইচে ত কী অইচে! আরেকডা মিথ্যা কতা কইয়া চালাইয়্যা দিবি পরের মাসডাও। মিথ্যা কইলে তর পাপ অইবো না। চোপ বি হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। তর ফের বি পাপ-পুণ্য রইচে নি।

জানোস না। হেইডা বাংলাদ্যাশ। হেই দ্যাশে জিনসের দাম বানের জলের লাহান বাড়ে। অর  বি অ্যাকবার বাইড়লে হ্যারে নামানোর লাগি কুনু রুবানা হক পাইবা না, কুনু ওবায়দুল কাদের পাইবা না। হেই দ্যাশে হেইরকম কুনু নজির নাই, কুনু নমুনা নাই। খালি খালি না খাইয়া মরনের গাদি গাদি পাতায় ভরা ইতিহাসের কিতাব পাইবা গাঁও-গেরামের পাঠাগারগুলাতে। তুই হেরাডোটাসকে চিনোস? চিনবি ক্যমনে। তুই ত হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা, ওয়ার্কারের বাচ্চা।

হেই মাসের মাইনে পরের মাসে লইবি। বাছা ভাড়া বকেয়া রাইখবি। দিতি না পাইরলে বাড়িআলাগোর মাইর খাইবি। অ্যাকডু রক্তাক্ত অইবি। খুউব জোর বাছা থাইকা ঘাড় ধাক্কা খাইয়্যা ফুতপাতে দুই অ্যাকডা রাইত কাটাইবি। অ্যাকডু পুলিশের কিল গুঁত্তা খাইবি। তোর চুখের ছাইমনে নিজের বউ বাচ্চাদের বলাৎকারের ব্লু ফিলিম দেইখবি। হেইডা এমুন কী অছোমাজিক বিষুয়। না অয় কয়ডা দিন বউ বাচ্চার ছোকে কান্দিবি। কান্দিতে কান্দিতে শুইকা কাঁঠালকাঠ অইয়া যাইবি। অর বি জগদ্দল পাথর অইয়া যাইবি। হেইডা এমুন কী দুর্লভ ঘটনা। হেই দ্যাশে এইগুলা ত হরহামেশাই ঘইটা থাহে। হেইসব জানোস না হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা।

তোর কুনু ছুটি নাই। তোর কুনু ওগ নাই। তুই কাভি উগি হইবার পারোস না। তর লাগি হেই অধিকার বাংলাদ্যাশ সংবিধানে ল্যাখা বি নাই। তুই ত নাগরিক না। কাশোস ক্যালে। মুখখান চাইপা ধর। মাস্কে বালা কইরা ঢাইকা রাখ। কাশ চাইপা রাইখা কাম কর গা। জ¦রে কাপোঁস না। তর অ্যাকডু কাঁপুনিতে পৃথিবীতে ঘইটা যাইবার পারে স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্প। জানোস ত ভূমিকম্প আইলে কি অয় মোগো? মোগো বউ বিধবা অয়। বাচ্চারা ইতিম অয়। মোগো পরিচয় থাহে না। বেওয়ারিছ লাশগো লাহান ছাড়ে তিন হাত দ্যাশ যাইতে অয়। হেইহানেও হেইসব হয় নাহি?  অই আচমানের মালিক ছাড়া হেই কতা বি মাইনছের বাচ্চারা কইবার পারে না।

কপাল অ্যামনিতেই গরম বইলা কাম চালায়া যা গা। মাস্ক বানা। ইপিপি বানা। ব্রেছিয়ার বানা। ব্রা বানা। রাষ্ট্রের এহন খুউব দুঃসময়। মাইনছের বাচ্চারা এহন খুউব বিপদে রইচে। তুই রাষ্ট্রের দুঃসময়ে হামেছা আছিলি। এহনও থাইকবি। তর কাছে রাষ্ট্র হেইটাই আশা করে। তুই মাইনছের বাচ্চার বিপদে হামেছা আছিলি। এহনও থাইকবি। মাইনছের বাচ্চারা হেইটাই প্রার্থনা করে।

মইরলে মইরবি। চিন্তা করোস ক্যালে হাল্যায় শ্রমিকের বাচ্চা। হাল্যায় ওয়ার্কারের বাচ্চা। মাইনছের বাচ্চারা রইচে না। মানুষ রইচে না। ঈশ্বর রইচে না। দেবতা রইচে। উনারাই তর বেহেশত। উনারাই তর দোজখ। উনারাই তর পাপ। উনারাই তর পুণ্য। উনারাই তর বাড়িতে পাঠাইয়া দিবে হগগোল আমলনামা। তর জমানো চওয়াবে বাচ্চাগোর খালি থালা ভইরা দিবে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের লাহান অভাব মিটাইয়্যা দিবে। ছবই উনার ইচ্চা। উনি কেডা? য্যানি তুমারে শ্রমিকের বাচ্চা কইরা মাইনছের বাচ্চাদের কাছে পাঠাইছেন। আলহামদুল্লিাহ কইবি নি! সোবহানাল্লাহ কইবি না! তুই হাল্যায় নাস্তিকের বাচ্চা…

 

রেজাউল ইসলাম হাসু
জন্ম : ১৯৮৭ সাল, রংপুর

প্রকাশিত বই দুইটা।
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা (২০১৬) -শিশুতোষ
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে (২০১৭)-শিশুতোষ

 

তুই  হাল্যায় নাস্তিকের বাচ্চা

রেজাউল ইসলাম হাসু

১৬ এপ্রিল, ২০২০ , ৭:০২ অপরাহ্ণ

কটকটিআলা

ছেলেবেলায় লেখা প্রথম কবিতাবলির খাতার বদলে কোনো এক শীতে কটকটি কিনে দিয়েছিলাম ছেলেকে। তারপর তিন শ পয়ষট্টি রাত নির্ঘুম কেটে গেছে। তারপর তিনশ পয়ষট্টি ভোর কোনো একটা কবিতার সাথেও সাক্ষাৎ হয় নি। তারপর তিন শ পয়ষট্টি দিন সেই কটকটিআলাকে খুঁজতে খুঁজতে সংখ্যাতীত এপ্রিল হেঁটেছি।

হাঁটতে হাঁটতে কোনো এক এপ্রিলের কড়িডোরে কোনো এক অন্ধ বেহালাবাদকের সাথে সাক্ষাৎ হলে জানা যায়- ওই খাতার কবিতাবলিতে তিনি তার ছলেবেলাকার ঘ্রান খুঁজে পেয়েছিলেন বলে খাতাটি কারো কাছে বিক্রি না করে তার পুরনো ট্রাঙ্কে সংরক্ষণ করেছিলেন।

আর মাঝে মাঝে তুমুল বৃষ্টি নেমে এলে ট্রাঙ্ক থেকে বের করে একটি করে কবিতা শুনতেন কনিষ্ঠ ছেলের কাছে। এবং শাদা মেঘের রেইন কোট পড়ে উনি যেদিন গৃহত্যাগ করে বেড়িয়ে পড়ছিলেন বেগানা বর্ষার সন্ধানে কোনো এক অনন্তর অভিমুখে—সেদিনও শুনেছিলেন।

অবশেষ—সেই কটকটিআলাও ছেলেবেলার মতো কবিতায় ঢুকে হয়ে গেলো আরেক দীর্ঘশ্বাস…

ভূগোল

ভূগোল পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি মানুষের ছাঁচ থেকে উঠে আসা কোনো এক মানুষ।

সেই কখন থেকে নবীনগর—নবীনগর বলে স্বরগ্রাম ফাটিয়ে ক্লান্ত-ক্লেদাক্ত কোনো এক বালকের ভূগোল।

যার দুঃখের ভূগোলে কোন এক মা ডালভাতের স্বপ্ন সেলাই করতে করতে চোখের অসুখে ভুগছেন সুদীর্ঘকাল। আর কোন এক অন্ধ বাবা বিড়ির আগুনে পুড়িয়ে যাচ্ছেন ফেলে আসা পৃথিবীর অসুখ।

আমি আধুনিক থলে থেকে ভূগোল বই বের করে সেই ক্লান্ত বালক, অন্ধ বাবা আর দুঃখিনী মাকে খুঁজি  কী আশ্চার্য! কোথাও ওদের কোনো কথা লেখা নেই।

এই অভিমানে পরীক্ষা না দিয়ে ঘরে ফিরলে আমি আদৌ ভূগোল পরীক্ষায় পাশ করতে পারি নি….

 

রেজাউল ইসলাম হাসু 
তরুণ সাহিত্যিক, রংপুর।

 

এই লেখাটি #মুগ্ধতা_সাহিত্য প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিযোগিতার নিয়ম জানতে ক্লিক করুন এখানে

 

কটকটিআলা

Writter