গল্প Archives - মুগ্ধতা.কম

গল্প Archives - মুগ্ধতা.কম

মুগ্ধতা.কম

২৪ মে, ২০২১ , ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের গল্প

—আমি যে ঘরে থাকি সেখানে কোনো দরজা নেই, জানালা নেই। আপনার ঘরের দরজা, জানালাগুলো আমার অনেকদিন মনে থাকবে। বিশ্বাস করেন, এভাবে জানালা ভেঙে আমি আসতে চাই নি। দরজাটা খোলা পেলে অবশ্যই এই নাটকীয়তার কোনো দরকার পড়তো না।

তখন সন্ধ্যাটা বুড়ো হয়ে রাত্রির কোলে ঢলে পড়ছিল অর্থবের মতো। আমি ‘মধ্যপ্রাচ্যের নির্বাচিত গল্প’ এর পাতা উল্টাতে উল্টাতে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক পেরিয়ে ফিলিস্তিনে এসেছি। জিয়াদ খাদাশের ‘সেনা নির্দেশ অমান্যকারী এক গল্পকার’-এ অনিদ্রিত চোখের নুড়ি ছুঁড়েছি সবে। অমনি এমন একটা ঘটনা ঘটবে আমি পূর্বানুমানই করিনি। যাইহোক, জিয়াদ খাদাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে বিষ্ময়ভরে লোকটার কথা শুনি আমি।

লোকটা আমার দিকে খুব অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে। আমিও তাকাই। যেন আমরা একে-অপরকে হাজার বছর আগে থেকে চিনি। যেন অনেকদিন পর আমাদের দৈবক্রমে দেখা হয়ে গেছে। আমি তাকে অপ্রস্তুতভাবেই স্বাগত বলে আরামকেদারাটা এগিয়ে দিই। ‘মধ্যপ্রাচ্যের নির্বাচিত গল্প’টা সেলফের সেই জায়গায় পৌঁছে দিই, ঠিক যেই জায়গায় তার থাকবার কথা ছিল। তারপর আরেকটা আরামকেদারা ডাইনিঙ থেকে টান দিয়ে আমিও বসে পড়ি।

আমরা মুখোমুখি বসে। নীরব ও নির্বিকার। কীভাবে শুরু করব সেই যথার্থ শব্দবন্ধ যেন আমরা হাতড়ে ফিরছি। সমুদ্রডুবুরির ন্যায় হাতড়ে হাতড়াতে না-পেয়ে আমরা যেন যখন টেবিলের উপর ভেসে উঠছি, তখন আমাদের মুখগুলো যেন হতাশ্বাসের একেকটা প্রতিমূর্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠছে।

—আমার এই অনাকাঙ্খিত আগমনে আপনি বিব্রত হলে চলে যাই।

লোকটাই নীরবতা ভেদ করে এগিয়ে এলেন।

—যাই বলতে নেই। এত রাতে কোথায় যাবেন? দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলি। ঘড়ির পেণ্ডুলামগুলো যেন একেকটি যুদ্ধের দামামা হয়ে দোদুল্যমান।

—কোথায় যাব মনে করতে পারছি না। সত্যি কথা বলতে কী, আমার যাওয়ার মতো পৃথিবীতে কোনো জায়গাই নেই। পৃথিবীটা যেন কাঁটাতারের উদ্যান। আর আমরা যেন সেখানে রক্ত চিড়ে ফুটে ওঠা থোকা থোকা লাল গোলাপ।

যখন লিখতে বসে কলমে কোনো গল্প আসে না তখন আমি এরমকম মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে ভালোবসি। সেখানে তখন না থাকে সীমানা, না থাকে কাঁটাতার। পৃথিবীর সমূহ ঠিকানা ভুলে ওদের চোখে চোখ রাখি। ওদের হৃদয় পড়ি। চোখ পড়ি। ওদের রক্তের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে ওরা তখন আমার কাছে হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যের একেকটি মহৎ গল্প। আর এরকম বিষ্ময়ভরে ওদের কথা শুনি। যেভাবে শুনছি লোকটার।

—কথা শোনাটাও একটা আর্ট।

কালো বর্ণের কাপে কফি ঢালতে ঢালতে বলি। শূন্য কাপগুলো কফিতে উপচে কেমন যেন ধোঁয়াশাময় হয়ে উঠল। তারপর কুন্ডুলি পাকিয়ে জানালার রেলিঙ বেয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলো। দৃশ্যটা দেখবার মতোই ছিল। অবর্ণনীয়!

—কথাটি কি আপনার?

—কোন কথাটা? ইতোমধ্যে আমরা অনেক কথার সিঁড়ি ভেঙে গল্পছাদে উঠে এসেছি। সেহেতু আমি ভদ্রভাবেই লোকটাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম-কোন কথাটা?

—ওই যে ওই কথাটা। কথা শোনাও একটা আর্ট।

—এরকম কথা কবে যে আমার কলম থেকে বেরুবে জানি না। কথাটা ফরাসিদের। রুশ ফুকোর। বেশির ভাগ মানুষ যদি ফুকোর কথাটা শুনতো তবে দুনিয়ার দুঃখটা কিছুটা হলেও হালকা হতো।

—ফরাসিরা অনেক নরম মনের অধিকারী হয়ে থাকে। তাই না?

—আপনি একদম ঠিক বলেছেন। ওদের শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস অনেক গৌরবের। পৃথিবীতে রোমান্টিসিজমের জন্ম তো ওরাই দিয়েছে। কফি?

—আপনার আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ। এই মূহুর্তে আমি কফি কেন, পৃথিবীর কোনো কিছুরই স্বাদ গ্রহণ করতে পারব না। আমার এই অক্ষমতার জন্য আমি দুঃখিত। দয়া করে এটি ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

—আপনি তাহলে যাওয়া-আসা করেন কীভাবে?

—প্রশ্নটার পেছনের কথাটা বলুন। ইদানীং আমার স্মরণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগে কী বলেছি কিছুক্ষণ পর তাই মনে থাকে না।

—আপনি যে ঘরে থাকেন, সেখানে না কি কোনো দরজা নেই, জানালা নেই।

—নেই না। আসলে আমার লাগে না। তাই মিস্ত্রিরাও হয়তো নির্মাণের সময় আমার প্রয়োজন বুঝে রাখেনি। হয়তো ওদেরও তাড়াহুড়ো ছিল। কারোরই হাতে ফালতু সময় নষ্ট করবার ফুরসত নেই। সামান্য গোর খোদক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সামরিক, বেসামরিক সকলেই খুব ব্যস্ত ওখানে। আপনি একা কেন? আপনার বউ, ছেলেমেয়ে-ওরা সব কোথায়?

—ঈদের ছুটিতে বেরোতে গেছে।

—আপনি গেলেন না…

—বেরোতে আমার ভালো লাগে সত্যি কিন্তু ওভাবে না। সবখানে যাওয়া আমার পছন্দ নয়। লাতিন আমেরিকার কিছু হাইকু অনুবাদ করেছিলাম গত লকডাউনে। ওগুলো ড্রয়ারে জমে আছে অনেকদিন থেকে। ওদের একটা গতি দান করতেই আমার বেরোতে না-যাওয়া। কিন্তু ভ্রমণ করতে আমি কখনো ক্লান্ত হই না। এ মূহুর্তে আমি হয়তো আপনাকে বোঝাতে পারব না সেটা। সামনে বৃষ্টির ছুটি আছে। ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে আপনাকে পেলে আমি খুশি হতাম।

—আমি তো একটা ভ্রমণের ভেতরেই আছি। আপনাকে নিশ্চিত কথা দিতে পারছি না বলে আমি দুঃখিত। তবে কোনো একদিন আমি না হলেও আপনি আমাদের ভ্রমণসঙ্গী হবেই হবেন। আচ্ছা, ম্যানহাটনে আজকে একটা প্রতিবাদ সমাবেশ হবার কথা ছিল। ওটা কি ওরা করতে দিয়েছে?

—না। বাইডেন প্রশাসন সেখানে বাধ সেধেছে। সমাবেশকারীদের উপর টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ছোঁড়া হয়েছে। কেউ কেউ লাঠিচার্জের শিকার হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী। বার্লিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অনেকের বিশ্বাস ছিল জার্মানদের উপর। কিন্তু তারা সে বিশ্বাস কাঁচের মতো ভেঙে গুঁড়োগুঁড়ো করে দিয়েছে।

—অন্যান্য জায়গায় কী খবর?

—ওদিকে ডরমিটরি, সিডনি, লন্ডন, কেপটাউন, ইস্তাম্বুল, লাহোরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধবাজদের পতাকা পুড়িয়ে প্রবল প্রতিবাদ জানানোও হয়েছে। বলা যায়, যুদ্ধের বিরুদ্ধে মানুষের ঢল নেমেছে পৃথিবীর পথে পথে।

লোকটার উপস্থিতিতে নির্দয় নিঃসঙ্গতা কেটে উঠছি ভেতরে ভেতরে টের পেলাম। চাঁদের আলোক ছটায় ছাদটা যেন আরো গল্পময় হয়ে উঠছে। কিন্তু লোকটা যেন তাকে গোপন করবার চেষ্টা করছে। আমি তার কথাবার্তার ধরন থেকে আন্দাজ করি।

—ঢাকার আকাশটা অনেক অনিন্দ্য, তাই না?

—আমাদের আকাশে কতোদিন এরকম চাঁদ দেখিনি। আমাদের আকাশ থাকে মেঘ ও মৃত্যুতে আচ্ছন্ন। সত্যিই ঢাকার আকাশটা কী অনিন্দ্য! পৃথিবীর সব আকাশ যদি এরকম হতো…

যেন না পাওয়ার দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস লোকটাকে ঘূণপোকার মতো একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। তার দীর্ঘশ্বাসের মতো রাতটাও ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। দূরে কমলাপুর রেল স্টেশনটা মিটমিটিয়ে জ¦লছে। আধো আলো আধো ছায়ায় পুরনো ট্রেনের ভাঙাচোরা বগির ভেতর শান্তি লেপ্টে থাকা কয়েকটা নিদ্রাময় মুখচ্ছবি ঝলমল করছে। ছয় নম্বর সেক্টর থেকে সিকিউরিটি শফিকের বাঁশির বিপুল হুইসেল রক্ষাকবচের মতো অ্যাভিনিউ থেকে অ্যাভিনিউয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

—ডিনার করেছেন?

লোকটাকে দেখে খুব ক্ষুধার্ত মনে হলে ভদ্রতাসুলভ প্রশ্নটা করে বসি।

—আমি খুব ক্ষুধার্ত। কোনো এক ক্ষুরধার ক্ষুধা আমাদের তাড়িয়ে বেরোচ্ছে। আমরা সেই ক্ষুধা নিবারণের শৌর্য ও সঙ্গী খুঁজছি।

—ছাদের কার্নিশে একটা হাজার ওয়াটের এনার্জি লাইট আছে। আপনি চাইলে সেটা আমরা জ¦ালাতে পারি।

—না, আপনার ভদ্রতার জন্য ধন্যবাদ। সেটার প্রয়োজন হবে না। চাঁদের আলোক মেশানো ফিনফিনে অন্ধকারই আমার বেশ লাগছে। হাওয়াই স্পর্শটাও লা-জবাব। ছেলেবেলায় কতোদিন এরকম একটা দৃশ্য দেখার জন্য ভাঙা আস্তাবল থেকে পালিয়ে বোহেমিয়ান হয়েছি।

—আপনার ছেলেমেয়ে?

—এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটার পাঁচ। মেয়েটার আট।

—ওরা এখন কোথায়?

—ঘরে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি।

—ওদের মা?

—শাদাবা গতকাল সকালে ক্লাস নিতে গিয়ে আর ফিরেনি। শুনেছি ওদের স্কুলটা উড়ে গেছে। গার্ডিয়ান পত্রিকায় ওদের ধ্বসে যাওয়া স্কুলের চিত্রটা ছাপা হয়েছে।

—আমিও বিবিসির খবরে দেখেছি।

ঘরে ধুপ করে কিছু একটা পড়ার আওয়াজ হলে আমরা সাময়িক গল্প-বিরতি দিয়ে একে-অপর থেকে আলাদা হই। ঘরে এসে দেখি সেলফ থেকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের নির্বাচিত গল্প’টা উবু হয়ে অনাথের ন্যায় পড়ে আছে ফ্লোরে। আর তার উপর দিয়ে হেঁটে বেরোচ্ছে কয়েকটা ইঁদুর শাবক। আমার হন্তদন্ত ছুটে আসার ক্ষিপ্ততা আন্দাজ করতে পেরে শাবকগুলো লেজ গুটিয়ে পুরনো জিনিপত্র রাখা ঘরটার দিকে দৌড়ে লা-পাত্তা হয়ে গেলো। আমি তাকে ফ্লোর থেকে আমার নরম হাতে তুলে নিই। খুব যত্ন করে মুছেটুছে তার আগের জায়গা তাকে ফিরিয়ে দিই। ছাদে এসে দেখি লোকটা নিরুদ্দেশ। ইতিউতি তাকাই। কোথাও তার ছায়া দেখা গেলো না। এ যেন রোহের জাদুবাস্তব পৃথিবী। আস্তে আস্তে কালো রেখাবলি মুছে মুছে কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো প্রতিভাত হচ্ছে। ভাঙা জানালার রেলিঙ ছুঁয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে তারই ঘ্রান ঢাকার স্ট্রিট জুড়ে।

হয়তো দূরে কোথাও খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। আর সেই বৃষ্টির ভেতর ছাতাহীন একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে। যার থাকবার ঘরে কোনো দরজা নেই, কোনো জানালা নেই। সেই ঘরের দিকেই সে হেঁটে যাচ্ছে, নগ্ন পায়ে…কাল থেকে অনাদিকাল…

রেজাউল ইসলাম হাসু
জন্ম রংপরে, ১৯৮৭ সালে। হিসাববিজ্ঞানে সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করেছেন। পেশাজীবন শুরু করেন সহ-সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে একটা বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়ন-কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলা ভাষার সৃজনে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা বেলাভূমি সম্পাদনা করেন।
ৎবলধঁষরংষধসযধংযঁ১৯৮৭@মসধরষ.পড়স
প্রকাশিত বই তিনটা।

এক. একটি ছুরি অথবা কুড়িটা ঘুমের পিল [২০২১-–গল্পগ্রন্থ, বেহুলাবাংলা]
এক. ওকাবোকা তেলাপোকা [২০১৬-শিশুতোষ, প্রিয়মুখ]
দুই. এলিয়েনের দেশ পেরিয়ে [২০১৭-শিশুতোষ, প্রিয়মুখ]

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের গল্প - রেজাউল ইসলাম হাসু
558 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

অন্তিম আকাঙ্খা

মহিলাটির ফাঁসি হয়েছে।

জেলারের সঙ্গে অচেনাজনের কথাপোকথনে বাক্যটা বোমার মতো বিষ্ফোরিত হলে জেলের সেলগুলো সিটি স্ট্রিটের কোলাহলে রূপ নেয়। নীরব অন্ধকারের ভেতর থেকে গমগম আওয়াজ উদগত হতে থাকে, যেভাবে হাঁফরের টানে কয়লার ঘুম ভেঙে আগুনের স্ফূরণ জেগে ওঠে কামারশালায়।

কোনো এক সেলে হাঁটু মুড়ে বসে আছে সেই মহিলা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষ্ফোরণের বিদূষিত ধোঁয়ায় তারও মুখমন্ডল আরো কুয়াশময় হয়ে উঠেছে হয়তো। হয়তোবা তার বেঁচে থাকবার অন্তিম আকুতিটুকুও নিঃসঙ্গ বৃক্ষের একমাত্র হলদে পাতাটার মতো কান্নার মর্মরি তুলে ঝরে গেলো। হয়তোবা সে-ও তার ভেতর থেকে ভেঙেচুরে আরো নৈঃশব্দ্যের জোয়ারে হারিয়ে গেলো। আরো একা হয়ে গেলো তার থেকে। সে-দিকে কারো কোনো চোখ ও চুম্বন নেই। মন ও মমত্ব নেই। আছে কেবল থোকা থোকা কদর্য কফবৃষ্টি।

পৃথিবীতে দুপুর নেমেছে। দুপুর নামলে আমরা ক্লান্তে নেতিয়ে পড়ি। আরাম কেদারায় ক্লেদাক্ত জীবনগুলো ছড়িয়ে দিই। একটা মধ্যাহ্ন বিরতির পর জেলটা পুরনো জৌলুস ছড়ায়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শত ব্যস্ততায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নতুন কয়েদিরা আসে। শূন্য সেলসমূহ উছলে উঠে বিকেল হতে না হতেই।

সেই মহিলাকে কেন্দ্রীয় জেলে পাঠানোর অর্ডার এলো।

শোনো মহিলা, তোমার কাপড়চোপড়, প্রসাধনসামগ্রী ও অন্যান্য দ্রব্য গুছিয়ে নাও। এক ঘণ্টা পর তোমাকে নিয়ে যাওয়া হবে। ভারী আর কর্কশ গলায় বাক্যগুলোয় বিদ্ধ করে জেলের সবচেয়ে পুরনো প্রহরী দীর্ঘ করিডোর ধরে দপ্তরাভিমুখে হাঁটতে হাঁটতে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

পরনের একমাত্র শাড়ি ছাড়া তার আর কী কী আছে, অথবা আর কী কী থাকতে পারে মনে করবার চেষ্টা করল। প্রথমে সে সেলের আশপাশ তাকাল। কী অদ্ভত অন্ধকারে ডুবে আছে এক সেল! কতোদিন রোদের ক্লোরফিল পড়েনি, কেউ জানে না! দ্বিতীয়বার সে তার পরনের শাড়ির দিকে তাকাল। আঁচলে রক্ত ছড়িয়ে সাপাকৃতি ধারণ করে আছে তাকে। যাকে সে বয়ে বেড়াচ্ছে অহর্নিশ। সবষ্মিয়ে তাকিয়ে থাকে। তৃতীয়বার সে তার নিজের দিকে তাকায়। কী এক ওজনশীল আমিকে বয়ে বেড়াচ্ছে জন্মলগ্ন থেকে! যার নাম মহিলা…

এক ঘণ্টা পর জেলের আরেকজন প্রহরী এসে তাকে সেলের বাইরে নিয়ে এলো। বাইরে এসেই প্রথমে সে উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকাল। এমনভাবে তাকাল যেন সে কোনোদিন আকাশ দেখেনি। একেবারে পাঁচ-ছয় বছরের শিশু-সুলভ আচারণ প্রদর্শন করে ইতিউতি তাকাতে থাকল। আকাশ ঠিকরে রোদের ক্লোরফিল ঝরছে। সে ছুঁয়ে দেখতো চাইল সেই রোদ। অমনি বিকেলের বিপুল ছায়া সেই রোদকে গোগ্রাসে শুরু করল। তার রোদ ছোঁয়াও হলো না। এমনসময় তাকে একটা জলপাই রঙের জিপগাড়িতে তোলা হলো। পিচপথের পিঞ্জর বেয়ে ছুটে চলল সেই জিপগাড়ি।

ভেতরের যাত্রীরা লোহাজাত তারের ক্ষুদ্রাকৃতির ৬টা ছিদ্রসমূহ দিয়ে কিঞ্চিত পৃথিবীটাকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে দেখবার কসরত করছে। গাড়িটা এখন বিউটি বাজারের বুক ছুঁয়ে নিউ মার্কেটের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিউটি বাজার দেখে সে অনেক স্মৃতির জোয়ারে ভাসতে থাকে। বিউটি বাজার পেরিয়ে পুরুষ সরণি। সেইখানে তার শশুড়ালয়। শশুড়ালয়ে পা ফেলতেই কে যেন তাকে মহিলা বলে ডেকেছিল। ভীড়ের ভেতর সে তাকে চিনতে পারেনি। তবে সে একটা অনুমান করে নিয়েছিল কে হতে পারে সেই সম্বোধনকারী। হতে পারে তার শ^শুড় অথবা শাশুড়ী অথবা তার স্বামী। যাকে সে ভালোবেসেছিল অন্ধের মতো।

এখন আর সেই প্রেমের প্রদীপ কোনো বর্ষণমুখররাতে বিভা ছড়ায় না। আলোড়িত করে না তার যোনিসুড়ঙ্গ অথবা সুঠোল স্তুনযুগল। এবং তারপর থেকে সে সেখানে মানুষ হবার যুদ্ধ করেও এখন-অব্দি মানুষ হতে পারেনি। মেয়েরা মানুষ হয় কেমন করে সেই পদ্ধতি তার জানা নেই। কোথায় লেখা আছে তাও সে জানে না। কেবল জানে এখন সে কোথায় অগ্রসর হচ্ছে। কোনো এক অচেনা অন্ধকারগুচ্ছ তাকে ইশারা দিচ্ছে। আর সেও তার মায়ায় পড়ে পরাস্ত সৈনিকের মতো তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মায়া! খোলা আকাশে পাখিগুলো কোন মায়ায় ছুটে বেড়াচ্ছে দিগন্তের পর দিগন্ত? ছোটবেলায় সে পাখি হতে চেয়েছিল। মা বলেছিল, ভেঙে যাওয়া ডানার যাতনা যদি জানতে তাহলে এই আকাঙ্ক্ষা কখনোই করতে না। আজো সে পাখি হবার আকাঙ্ক্ষায় পুরুষের প্রার্থনা করে চলেছে।

নিউ মার্কেট পেরিয়ে কেন্দ্রীয় জেলের ফটকে জিপগাড়ি এসে থামল। কড়া প্রহরায় গাড়ি থেকে কয়েদিদের নামানো হলো। গাড়িতে পুরুষের ভিড়ে একমাত্র মহিলাটির নাভিশ্বাস উঠবার জো।

ভাই, আমি মহিলা, আগে আমাকে নামতে দিন। খুব অসহায় ভঙ্গিমা করে সে বলে উঠল। পুরুষগুলো যেন তাকে করুণা করে আগে নামতে দিলো। মহিলা শাড়ির আঁচল টেনে মুখের ঘাম মুছতে গিয়ে সেই সাপাকৃতি দেখে সবষ্মিয়ে তাকিয়ে থাকে। যাকে সে বয়ে বেড়াচ্ছে অহর্নিশি।

কেন্দ্রীয় জেলের সেলগুলো লোকাল জেলের সেলের চেয়ে বেশ বড়সড়। রাত্রে তাকে দুটো পোড়া রুটি ও আলুর সবজি খেতে দেয়া হলো। দুদিন থেকে খাবারে তার অরুচি। খেলেই উদগার ওঠে। খাবারগুলো যেভাবে দিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই মেঝেতে পড়ে রইল। জেলে আসার কতো মাস হলো সেই হিসেব কষতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল। কেবল মা ছাড়া তাকে তেমন কেউ দেখতে আসেনি, এমনটিই মনে হলো তার। মাঝখানে হীরা এসেছিল বোধহয়। এটা তার এক ধরনের কল্পনাজাত। হীরাকে সে প্রত্যাখান করেছিল তার পাখিবেলায়। সেদিন পরষ্পরের সঙ্গে কোনো বাক্য বিনিময় হয়নি। কেবল দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পরষ্পরের দিকে পরষ্পর তাকিয়ে ছিল নিবিড় নৈঃশব্দ্যে। শ্বশুড়ালয় থেকে কেউ আসেনি তার একাকীত্বে শান্ত্বনার হিম ছড়াতে।

একদিন সে স্বামীর ঘর ছাড়ে মানুষের দাবি নিয়ে। স্বাধীন নামক বাসে উঠে তার আসন হয় সংরক্ষিত মহিলা আসনে। সেদিন থেকে সে রক্ষিতার মতো নিজেকে উদযাপন করে আসছে। আজো স্বাধীন হতে পারেনি পুরুষপ্রবাহ থেকে। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নেয় সে। ভাবে, এবার পাখি হবার আকাঙ্খা পূরণ হবে তার। অচেনা বিভায় উড়াবে তার সোনালি ডানা। ঘুরে-ফিরে দেখে নেবে অদেখা সমুদ্র। যে সমুদ্র অপেক্ষমান অজস্র গোলাপের ঘ্রাণে। কোনো এক নিশুথি রাতে সে তার সোনালি ডানাগুলোও হারিয়ে ফেলে কোনো এক পুরুষপ্রাসাদে। তারপর শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে সকাল আসে তার করিডোরে। দাঁত কেলিয়ে সেকেলে হাসি হাসে পৃথিবী। মাথার উপরে অসীম আকাশ, কেবল ঈশ্বরের মতো হিম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ডানাহীন পাখিদের মতো কেবল করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।

এই মহিলা, শোনছো? শোনছো মহিলা? কেন্দ্রীয় জেলের একজন প্রহরী তাকে কর্কশ গলায় ডাকে। সে আস্তে আস্তে চোখের পাতা মেলে ধরবার কসরত করে। খাকি ইউনিফরম পরিহিত পুরুষ মানুষটার দিকে নিরীহ ভঙ্গিতে তাকায় সে। ‘কিছু বলবেন ভাই?’ রুগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে তারপর।

কিছু বলবেন না, বলেছি। তোমাদের মতো মহিলাদের এই এক সমস্যা। এক কথা দুবার করে না বললে তোমাদের কানে ঢোকে না! বিরক্তির শ্লেষ ঝেরে পুরুষ প্রহরীটা বলে। সে প্রাইমারির বাচ্চাদের মতো চুপচাপ সেলের অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়েই পুরুষ প্রহরীটার কথা শোনে।

জেলার সাহেব পাঠিয়েছেন। কালকে তোমার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। যদি তোমার কোনো অন্তিম আকাঙ্খা থেকে থাকে, তবে তা জানাতে পারো।যেকোনোভাবেই হোক, জেল কর্তৃপক্ষ তোমার সেই অন্তিম আকাঙ্খা পূরণ করবে। প্রহরী বলল।

দয়া করে আমাকে একটা এ ফোর আকারের শাদা পাতা ও কালো কালির বলপেন এনে দেবে? সে বলল।

প্রহরী স্টোররুম থেকে একটা এ ফোর আকারের শাদা পাতা ও কালো কালির বলপেন এনে তাকে দিলো। সে শাদা পাতায় তার অন্তিম আকাঙ্খার কথা লিখে পাতাটা বর্গক্ষেত্রের মতো ভাঁজ করে প্রহরীর হাতে তুলে দিলো অশ্রুসিক্ত চোখে। আর খুব করে বোঝালেন এই চিঠির গোপনীয়তা কতোখানি। তারপর সেই চিঠি ডানাহীন পাখির মতো প্রহরীর হাত ধরে জেলার সাহেবের হাতে গিয়ে পৌঁছুলো। চিঠিটা পড়ে তিনিও অশ্রুসিক্ত চোখে একবার জানালার দিকে তাকালেন। তারপর পিনপতন নীরবতা পালনের মতো বাইরের পৃথিবীটাকে দেখলেন। তখন আকাশ ভেঙে মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। থেকে থেকে ঝড়ো হাওয়ায় ওক গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল।

কী অপরাধে তার ফাঁসি হচ্ছে আমরা জানি অথবা জানি না। তবে যেটা সে করেছে তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সে-ও তাই করত। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাকে জেল থেকে শাদা রঙের নতুন শাড়ি দেয়া হয়েছে। ভালো খাবার দেওয়া হয়েছে। পরনের শাড়িটা আঁচল টেনে খুলতে যাবার কালেও সেই এলোমেলোভাবে রক্ত পড়ে সাপাকৃতির সাথে তার শেষবারের মতো সাক্ষাৎ হয়ে গেলো। যাকে সে বয়ে বেড়াচ্ছে পাখিবেলা থেকে। আজ তাকে সে নিসংশয়ভাবে ছুড়ে মারে ময়লার বাস্কেটে। তারপর শাদা রঙের শাড়ির ভেতর নিজেকে সে নতুনভাবে আবিস্কার করে শিহরিত হয়। এক ধরনের স্বাধীনতার ঘ্রাণ অনুভব করে। মঞ্চে উঠবার সময় সে একবারও ভীত হয় না।

আনুষ্ঠানিকভাবে ফাঁসির কার্যক্রম শেষ হলো। তার শবদেহ নেবার জন্য একজন পুরুষের আগমন ঘটেছে। মহিলার শবদেহ আমি নিতে এসেছি। খুব জোর গলায় লোকটা উচ্চারণ করল। জেলার তার গালে কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে বললেন, মহিলা নয়, বলো মানুষের শবদেহ নিতে এসেছি। আর এই-ই ছিল তার অন্তিম আকাঙ্খা। যেন তার নামের আগে অথবা পরে এই শব্দাটা ব্যবহার না করা হয়। আর আমি তোমাকে একজন মানুষের শবদেহ হস্তান্তর করছি, যে বেঁচে থাকতে কখনোই মহিলা ছিল না। মৃত্যুর আগে সে এটাই চেয়েছিল।

অন্তিম আকাঙ্খা - রেজাউল ইসলাম হাসু
508 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

আকাশের ঠিকানা

১.

মেয়েলোকের ওই একটাই সমস্যা, সব কিছুকেই নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করে। আমার ভাবীকে দেখেছি বিয়ে হতে না হতেই, মার ৩০ বছরের সংসারের চাবির গোছাটা সে ৩ মাসের মধ্যে নিজের করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, এ বাড়ির আরো দুটো রুম, কিচেন এমনকি আমার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয়ার রুমটাও সে নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করে নিজের করে নিয়েছে। মিতুর স্বভাবটাও অনেকটা ভাবীর মতো। ( মিতু আমার বান্ধবী।) আমার কোন বই বা নোট নিলে দেবার নাম নেই। বাপের সম্পত্তি মনে করে সিন্দুকে তুলে রাখে। মেয়েদের এ ধরণের স্বভাব আমার একদমই পছন্দের না।

আজকের ব্যাপারটাই ধরা যাক, তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বাসের টিকিটটা কাটলাম। ঈদের সময় বাসে ট্রেনে এত  ভিড় থাকে যে, জার্নি করাটা এক ধরনের যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করার মত। চারদিন ফিরে গিয়ে আজকে লম্বা লাইনে ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থেকে টিকেটটা কাটলাম যে, একটু আয়েশ করে জানালার পাশে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে বাড়ি যাব। কিন্তু তার আর ভাগ্যে জুটল না। সবার আগে বাসে উঠে দেখি আমারও আগে এক  তন্বী ললনা আমার সিটটা দখল করে বসে আছেন। মেজাজটা বিগড়ে গেল। সুন্দরী টুন্দরী কিছু আর মানলাম না। কাছে গিয়ে কড়া গলায় বললাম,“চোখে কী কোন সমস্যা আছে নাকি? টিকেট দেখে বুঝতে পারেননি, সিটটা যে আমার?”

মেয়েটি বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শান্ত স্বরে বলল,“ জী জানালার পাশে বসাটা আমার ভীষণ দরকার ছিল।”

“ইশ! জানালার পাশের বসাটা ওনার দরকার ছিল! মনে হচ্ছে উনি একজন মহাকবি। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে উনি যেন মহাকাব্য লেখে ফেলবেন। যত্তসব !

মেয়েটি এবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,“ আপনি আমার পাশের সিটটায় বসুন। ওটা আমার সিট।”

“ওটাতে আপনি বসলে ক্ষতি কী? আমি কেন আপনার সিটে বসতে যাব।” বিড় বিড় করে বললাম।

“ কিছু কী বললেন?”

“ না না বলছিলাম কী আপনি যাবেন কোথায়?”

“পলাশবাড়ী।”

আপন মনে আঁতকে উঠে বললাম,“ওহ মাই গড! পলাশবাড়ী ! সে তো রংপুরের কাছাকাছি। আমাকে তাহলে এতটা পথ এই অহংকারী মেয়েটার পাশে বসে যেতে হবে? ইশ! শালা কপালটাই মন্দ। আজ যে কার মুখ দেখে বাসা থেকে বেরিয়েছি। আর কথা না বাড়িয়ে মুখের উপর একটা পেপার মেলে বসলাম। খুব অসহ্য লাগছে। এতটা পথ যাবো কী ভাবে?

২.

গাড়ি ছুটে চলল সাঁ সাঁ করে। যমুনা সেতুর কাছে এসে দেখি লম্বা লাইন। মনে হচ্ছে বিকেলে কেন আজ রাত ১২টায় পৌঁছাতে পারব কি না খোদাই জানেন। প্রায় ৫৫মিনিট ধরে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। আশে পাশে কোন দোকানপাট নেই। তবু নামলাম যদি কিছু পাই। দেখলাম একটা ভাঙ্গা চায়ের দোকান। ছুটে গেলাম। কিছুই নেই। তবুও নদীর তীরে দাঁড়িয়ে খানিকটা ঠাণ্ডা বাতাস খেলাম। দেখি, দেরির কারণে বাস থেকে সবাই একে একে নেমে পড়ল। কিন্তু নবাব নন্দিনী ওনার সিট থেকে এক চুলও নড়লেন না। আশ্চর্য! মানুষের মন এত সংকীর্ণ হয় কী করে? আমার ভয়ে সে নিশ্চয় সিট  ছেড়ে উঠছে না ? ছিঃ এত ছোট মন। আমি ওর মতো নাকি? আপন মনে বক বক করতে করতে আবার এসে সিটে বসলাম। আমার সিটে বসেছে বলে আমার কোন আপত্তি নাই। একদিন জানালার পাশে না বসলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একজন অকৃতজ্ঞ মানুষের পাশে বসে যেতে আমার অসহ্য লাগছে। সে এতটাই অকৃতজ্ঞ যে, আমার সিটে বসে আমাকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলো না। হোক সে অপূর্ব সুন্দরী। তবুও তার পাশে বসে যেতে আমার সত্যি খুব অসহ্য লাগলো।

৩.

বাসটা ছেড়ে দিলো। সাঁ সাঁ করে আবার ছুটে চলল বাসটা। পথে আরো দু’তিন জায়গায় বাসটা থামল। ভাবলাম একবার যদি সে কোথাও দুমিনিটের জন্য নামে, তাহলে চট করে আমি আমার জায়গায় বসে পড়ব। মেয়েলোক বলে খাতির করব না। কিন্তু হায় কপাল ! পলাশবাড়ী এসে গেল, তবু ম্যাডাম ফুলি কোথাও নামলেন না। মনে হচ্ছে রংপুর চলে এলেও ম্যাডাম কোথাও নামবেন না। আজ উনি বাসের ভেতরই রাত্রি যাপন করবেন। বাসটা ২৫মিনিট হলো থেমেছে। কিন্তু ওনার নামার কোন তাগিদ দেখছি না। আর সহ্য না করতে পেরে বলেই ফেললাম,“ আপনি কি  আজ নামবেন না। আপনার জন্য কি বাস এখানে একঘন্টা লেট করবে?”

আবারো সেই শান্ত কন্ঠস্বর, “আমাকে নেবার জন্য মামা আসবেন?”

দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,“কচি খুকি! ঢাকায় থেকে একাই এল। আর বাড়ির কাছে এসে ওনার পালকির দরকার পড়ল। ঢং দেখলে গা জ্বলে যায়।” মেয়েটির আচরণে সবাই খুব বিরক্ত।

একজন তো বলেই ফেলল,“আরে ম্যাডাম নামুন তো; আপনার জন্য কি আমরা সবাই বাসে ঈদ করব? নামুন বলছি।”

কিন্তু ম্যাডাম এক চুলও নড়লেন না।

এমন সময় লক্ষ করলাম, দুজন লোক বাসের দরজার কাছে একটা হুইল চেয়ার এনে রাখলেন। একজন বয়স্ক লোক বাসে উঠে মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে কোলে নিয়ে নিচে নেমে গেল। মেয়েটি যাওয়ার সময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে গেল,“আমার আসলে কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ, তাই তো এতক্ষণ উঠতে পারি নাই। কিছু মনে করবেন না।”

এই মুহূর্তে নিজেকে একটা থার্ডক্লাস ছেলে মনে হলো। মনে হতে লাগল আমি চিড়িয়াখানার কোন ছোট্ট একটা প্রাণি। এতক্ষণ ধরে মেয়েটির পাশে বসে ছিলাম। অথচ বুঝতেই পারলাম না, সে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। সত্যি নিজেকে মানুষ ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। না জেনে আমরা কত সহজে অন্যের সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করে ফেলি। এই স্বভাব গুলো আমাদের বদলাতে হবে। বাকি পথটা সিটটা ফাঁকায় পড়ে থাকলো। আমি ফাঁকা সিটটায় মেয়েটির পরশ অনুভব করলাম। বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। আমার মনটাও আজ এক অজানা বৃষ্টিতে  ভিজে গেলা।

আকাশের ঠিকানা - নাহিদা ইয়াসমিন
401 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

কবির হত্যা ও এ্যস্ট্রে

আজ বৃহস্পতিবার! ভোর ৪ টায় কবিকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল বেলা টং দোকানের ছোট্ট ফরহাদ কবির জন্য চা নিয়ে যায়।  জানালা দিয়েই দেয়া – নেয়া হতো চা – বিস্কুট, সিগারেট আর খোশ গল্প। মাঝে মাঝে কবি যখন ঘুমের মধ্যে থাকত তখন চায়ের কাপ জানালা দিয়ে ভেতরে রেখেই চলে যেতো ফরহাদ। অলটাইম – ই খোলা থাকত কবির জানালা!

আজ ফরহাদ হাসতে হাসতে কবিকে চা দিতে যাচ্ছিলো। কবির নামমাত্র বাড়ির জানালার কাছে যেতেই ফরহাদ তীব্র ভয়ে আঁতকে উঠলো। সে দেখলো ফ্লোরে চিত হয়ে পরে আছে কবির লাশ। চায়ের কাপ ফেলে দিয়ে ফরহাদ চিৎকার করতে  করতে রাস্তার মাঝ বরাবর দৌড়ে গেলো! জানালা থেকে প্রায় সাত – আট মিটার দূরে একটা পেয়ারা গাছ আছে। সেখানে রোমান্টিক মুডে বসে থাকা যুগল চড়ুই দু’টি ফরহাদের চিৎকার শুনে খুবই কনফিউজড হয়ে পরেছে। তাদের লিটল ব্রেইনে কিছুই ঢুকছে না। সকালের রহস্যটা বোঝার জন্য তারা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কবির ঘরের দিকে।

মূহুর্তে লোকজনে ভরে উঠলো চারপাশ। ছোট্ট ফরহাদ অনেক বড় একটা শক খেয়েছে। পুলিশ ও এসেছে ইতিমধ্যে। ঐ এলাকার ওসি জাহিদ সাহেব খুব মনোযোগের সাথে ডেথ স্পোর্ট এনালাইসেস করছেন। কিন্তু,  সদ্য বিয়ে হওয়া কন্সট্যাবল হারুনের কাজে মন নেই।  তার বিবাহিত জীবনের বয়স মাত্র তিনদিন। এই তিনদিনে কেবল স্ত্রীর কাছে যাওয়ার সাহস কোনোমতে জুটিয়েছে সে। আর তার ই মাঝে এমন ক্রিটিকাল একটা কেছ এসে, তার ছুটির বারোটা বাজিয়ে দিল।

নেটিভ টাইলসের ফ্লোর। ফ্লোরে কবির রক্তাক্ত দেহ। দেহ থেকে ফরেন পারফিউমের সুবাস আসছে। যথাসম্ভব পারফিউমটা ম্যাড ইন ফ্রান্স। রক্ত শুকিয়ে চটচটে হয়ে গেছে। ওসি জাহিদ সাহেব হাতে গ্লোভস পরছেন আর  কন্সট্যাবল হারুনকে বলছেন কবির শার্টের বোতাম খুলতে।  আট – নয় ইঞ্চি লম্বা ও তিন – চার ইঞ্চি গভীর ক্লিভার নাইফের পনেরোটা ক্ষতর দাগ কবির শরীর জুড়ে। ফ্লোরে আরও পরে আছে ড্রিম অফ দা রেড  চ্যাম্বার বইটি আর কবির এ্যাসট্রে।

ওসি জাহিদ সাহেবকে বেশ চিন্তিত লাগছে। ডেথ স্পোর্ট থেকে তিনি কোনোই এভিডেন্স পেলেন না। শরীর থেকে আসা পারফিউমের গন্ধ থেকে তিনি ধারণা করলেন, রাতে কবির বাসায় পরিচিত কেউ এসেছিলো এবং তার সাথে কবির বাইরে কোথাও যাওয়ার কথা ছিল হয়তো।

সকাল পেড়িয়ে দুপুর হলো। আসপাশের লোকজনও কমে যেতে লাগলো ধীরে ধীরে। মেয়ে চড়ুই টা ভাবুক চোখে ছেলে চড়ূই টার দিকে তাকিয়ে আছে আর বলছে,

” আচ্ছা, আজ কবি  সকাল সকাল আমাদের গুড মর্নিং লাভলি কাপল বলল না ক্যানো? আজ কি হচ্ছে ওখানে? ”

ছেলে চড়ূইটা ম্যাটার টা বোঝার জন্য জানালার কাছে উড়ে গিয়ে বসল। মেয়ে চড়ূইটা প্রেগন্যান্ট। দৌড় – ঝাপ তার সম্পূর্ণ নিষেধ।

এদিকে কনস্ট্যাবল হারুন ওসি জাহিদ সাহেবকে কোনোমতে কনভিন্স করে ফেলেছে, বউকে নিয়ে তার মামা শশুরের বাড়িতে রাতের দাওয়াতে যাবে বলে। কবি শহরের বিত্তবানদের লিস্টে ছিলেন না। এই আর কি ক’জন মানুষ চেনেন এতটুকুই। ধীরে ধীরে ওসি জাহিদ সাহেব আর অন্যান্য স্টাফ গুলোও ক্লান্ত হয়ে পরল। ওসি জাহিদ সাহেবের মাথায় আবার অনেক টেনশন। তার হাতে গত পরশু শহরের এক বিরাট নেতার মেয়ের পালিয়ে যাওয়ার কেছ ফাইল এসেছে । এই কেছ টা তাড়াতাড়ি স্লোভ করতে পারলে তার প্রোমোশন নিশ্চিত।

প্রায় সাড়ে তিন মাস ইনভেস্টিগেশন চলল। ডেথবডির পোস্টমর্টেম হলো, কবির বাড়ি সাত থেকে আটবার তল্লাশি হলো। তার সাথে কন্টাক্ট এ থাকা সকালের ইন্টারোগেশনও সুসম্পন্ন হলো। কিন্তু কোনো ব্রেকথ্রু মিলল না। ধীরে ধীরে গা ছাড়া হয়ে গেলো কেছ টা। পরে থাকা ফাইলের স্তুপের সবার উপরে জায়গা করে নিলো কবির মাডার কেছের খয়েরী কালার ফাইল। ধীরে ধীরে সব মুছে যেতে শুরু করল। ফরহাদ এখন নরমাল আর বেশ ফুর্তিতে থাকে। চড়ূই দুটার ফ্যামিলিতে এসেছে আরেকটা বাচ্চা চড়ূই। এক ভাংড়ির দোকানে শেষ দেখা গেছে ড্রিম অফ দা রেড চেম্বার সহ কবির প্রিয় বইগুলো আর এ্যাস ট্রেটা। এ্যাস ট্রে’তে তখনও ছিলো খুনীর খাওয়া দামি সিগারেটের ফিল্টার। আর তখনও এ্যাস ট্রেতে থাকা ফিল্টারে ছাপ ছিলো কড়া লাল লিপস্টিকের!

কবির হত্যা ও এ্যস্ট্রে - আহমেদ নাফি
473 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

পোড়া কপাল 

এক.

ধরি, মেয়েটির নাম এক্স।নাদুস-নুদুস শ্যামলা চেহারা।শেপ-সাইজ সুন্দর।কথা বলে অল্পস্বল্প।কারও সাথেপাছে নেই।একদম নির্মোহ স্বভাবের।বিড়ালের মতো হাঁটে।কোন সাড়াশব্দ হয় না।কোনদিন তার কাশির শব্দও শুনিনি।কাশি হলে বোধহয় সে বালিশে মুখ গুঁজে কাশে।কেউ কোনদিন তার কোন দোষ দেখেছে বলে মনে হয় না।তবে তার দোষ আমি যেটা জানি, তা হল পাঠ্যবই ছাড়া দুনিয়ার কিছু সে চিনে না।পড়ার টেবিলে বইয়ে মুখ গুঁজে বুজে থাকে।এমনকি টিভি দেখতেও বই নিয়ে বসে।এটা তার পক্ষে সম্ভব।

হানিফ সংকেতের ইত্যাদিতে নানা-নাতির পর্ব।সবাই হাসতে হাসতে একাকার।সে নির্লিপ্ত।আজব মেয়ে।আমাদের টিভি খারাপ হওয়ায় মাসহ তাদের বাড়িতে দেখতে গিয়ে তাকে ফলো করে তার কাণ্ড দেখেছি।তাকে বলতে চেয়েও বলতে পারিনি কিসে তার কতশত দু:খ, কেন সে এমন অসহায়ভাবে থাকে, চলে।কিন্তু সাহস করে বলতে পারিনি।

সে আমার এক বছরের জুনিয়র।

সে ফার্স্ট ইয়ার, এখানকার কলেজে।

আমি সেকেন্ড ইয়ার, এইচএসসি দিব শহরের কলেজ থেকে।

একদম পাশাপাশি বাড়ি আমাদের।

মুখোমুখি গেট।

এ বাড়ির মহিলা-ও বাড়ির মহিলাদের নিয়মিত এবাড়ি-ওবাড়ি যাতায়াত আছে ।মহিলা বলতে আমার মা, তার মা আর তার এক ভাবী।দরকারে বা খোশগল্পে যাতায়াত।সময় কাটানো আরকি!তো সেই পাশের বাড়ির এক্স-কে আমার খুব ভাল লাগে।ইনিয়ে-বিনিয়ে টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করি।কিন্তু পাত্তা দেয় না সে। দায়সারা গোছের জবাব দেয়।

যদি বলি, খাওয়া-দাওয়া হল ?

:হুম।

ব্যস, এটাই।ভদ্রতা বশত বলবে না সে, আপনি খেলেন?

বা আজকে চাচী কি রান্না করেছে?

যেচে কোনদিনও কথা বলেনি সে।আবার অহংকার ভাববেন না কেউ।সে এমনই।আর এজন্যই তাকে ভাল লাগে কিনা জানি না।

পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় এক্স-র সাথে দুয়েকবার দেখা হয় দিনে।যেন রাতেও দেখা হয় সেজন্য ওর ছোট ভাইকে কায়দা কৌশলে বন্ধু বানালাম।

ধরি, তার সেই ভাইয়ের নাম জেড।

জেড এবার এসএসসি দিবে।সে আগে ছিল পাড়াত ভাই, এখন বন্ধুুর মতো, কিন্তু বন্ধু নয়।সে ছাত্র হিসেবে একদম নিরস।তার সামনে ভুলভাল ইংরেজি বাক্য বলি ফটরফটর করে যেন সে বাড়িতে এক্স-র সামনে আমার প্রসঙ্গ তুলে বলতে পারে আমি ছাত্র হিসেবে বাঘমারা।

বাকিসব চুনোপুঁটি, ইন্দুর, বিড়াল।

জেড গণিতের সরল অঙ্ক বুঝে না।বলি, চল্ , তোদের পড়ার ঘরে বসে দু’মিনিটে তুড়ি বাজিয়ে শিখিয়ে দিবো।একদম সোজা অঙ্ক।বুঝিয়ে দিলে পানির মতো মনে হবে।জলবৎ তরলং।ডাজিন্ট ম্যাটার।সে গদগদ হয়ে তাদের বাড়িতে এক্স-র পড়ার টেবিলে আমাকে নিয়ে যায়।খেয়াল করলাম, এক্স তখন বাংলা বই পড়ছিল।জেড একটা চেয়ার টেনে দিয়ে পাশে টেবিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়।আমি চেয়ারে বসি ঠিক কিন্তু তপ্ত উনুন মনে হয় চেয়ারটাকে।আড়ষ্ট হয়ে আড়চোখে এক্স-কে দেখি।আমার বুকের ভেতর পেণ্ডুলামের ঠকাস ঠকাস শুনতে পাই।গ্রামের জুম্মার ভেতর থেকে বড়সড় দেয়াল ঘড়িতে বারটার ঘণ্টা বাজে যেমন।ভয় হচ্ছে, সেকি আমার বুকের সে শব্দ শুনতে পাচ্ছে ?তার পাশে বসে নিজেকে সম্রাট শাহজাহান মনে হচ্ছে।আমার মমতাজ আমার একদম পাশে, খুব কাছে।ইচ্ছে করলে হাত ছুঁতে পারি, তার পায়ে পা দিয়ে ঠেস দিতে পারি।কিন্তু ঐ ভাবনা পর্যন্ত।

বাস্তবে তা সম্ভব নয়।

অসম্ভব।

এই অসম্ভব শব্দটা কানে বারবার বাজে।

মন থেকে কানে।

প্রতিধ্বনিত হয়।

খসখস করে একটা সরল অঙ্ক জেড-কে বোঝাতে চেষ্টা করি, মানে জেড কতটুকু বুঝল, কতটুকু শিখল তা না ভেবে এক্স-র দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলাম কিনা তাই আড়চোখে খেয়াল করি।

এখানে ধরে নিন, আমার নাম ওয়াই।

জেড এতক্ষণ হু হুম হ্যাঁ বলে অঙ্ক বুঝছিল।এবার মুখ খুলল।

তার এক্স আপাকে ইঙ্গিত করে বলল সে, দেখছিস, আপা, ওয়াই আমাকে মাত্র দু’মিনিটে কঠিন একটা সরল অঙ্ক কত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল।আর কখনও আমার ভুল হবে না, আপা।ওয়াই কিন্তু হেব্বি ইংরেজি জানে।ইংরেজি ছাড়া কথাই বলে না।তার কাছ থেকে টুকটাক ইংরেজি শিখছি ঘুরতে ফিরতে।

এক্স: এই গাধা, ওয়াই কিরে? ওয়াই কি? বল, ওয়াই ভাই।বড়ভাই বা ভাইজান।তোর সিনিয়র তিনি।তিনি এবার ইন্টারমিডিয়েট দিবেন।তুই এসএসসি।লম্বায় বড় বলে তুই তার নাম ধরে বলবি?

চোখমুখ চটকিয়ে সে তার ভাইকে থ্রেটিং করে বলল।

আহা, কী সম্মান!মনটা ভরে গেল।আনন্দে বুকের ভেতর একটা টেনিস বলটা দাপাদাপি করে।আমার হবু বৌয়ের  আর হবু শ্বশুরবাড়িতে আমার একটা অবস্থান তবে তৈরি হল।

রাতটা গেল এপাশ ওপাশ করে।কত কি ভেবে ভেবে।তার একদম কাছাকাছি বসার আমেজ, আবেশ।

দুই.

গাধা জেড এখন তুই-তোকারি করে নিয়মিত।কিচ্ছু বলতে পারি না।যদি চটে যায়।তার মেজাজ একরোখা।সব বন্ধু বান্ধব থেকে সরে এসেছি।কাউকে পাত্তা দিই না, বাল্যবন্ধু, শ্রেণীবন্ধু সবাইকে ছেড়ে, ভুলে সারাদিন সারাসময় জেডের সাথে মিশছি।সেও তার খালাত বোনকে ভালবাসে।তার সে ভালবাসার গাঁজাখুরি গল্প শুনতে শুনতে বমি আসে।এক্স-র জন্য কিছু বলি না।এক্স-কে পেলে এ শালার পাছায় লাত্থি দিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দিব।কাল সে আমার কাছে রঙিন প্যাডে চিঠি লিখে এনেছে।লিখেছে:

প্রাণের জানু,

তারপর যত আজেবাজে কথা।চিঠিতো নয় চটিগল্প যেন।তাতে সেন্ট মেখেছে।ফুলের পাপড়ি রেখে সুন্দর করে ভাঁজ করেছে।বলল, আজ সকালে তার সে খালাতো বোনের সাথে একাকী পেয়ে কোলাকুলি করেছে সে।শালার যা অবস্থা, পারলে পরীক্ষায় না বসে বিয়ের পিড়িতে বসে।কী আর করার, এক্স-র জন্য সব সহ্য করছি।দায়িত্বশীল হবু দুলাভাই হিসেবে তাকে বোঝাই, এটা তোর লেখাপড়া করার বয়স।ভবিষ্যত তৈরির বয়স।লেখাপড়া শেষ কর, আমি তোদের বিয়ে দিব।আর মনে মনে বলি, শালা, তোর কপালে অনেক দু:খ আছে।তোকে ভিক্ষে করে খেতে হবে।বদমাশ একটা।কৈ রে, আমি তো তোর বোনরে ভালবাসি, কোনদিনতো টাচও করার সুযোগ নিই না।কত পবিত্র আমার ভালবাসা।যদিও তা একপেশে।

তিন.

আস্তে আস্তে তাদের বাড়িতে যাতায়াতটা বাড়ল।চাচীও জেড-র ব্যাপারে আমার ওপর ভরসা করতে লাগলেন।প্রায় তিনি বলেন, বাবা, ওয়াই, ওকে একটু বোঝাও।বুদ্ধিসুদ্ধি কম ওর।লেখাপড়ে শিখে মানুষ হতে না পারলে ওর বাবা খুব কষ্ট পাবে।ভাইয়েরা কদ্দিন ওকে দেখবে, বল?

বলি, চাচী চিন্তা করবেন না।আমি নিয়মিত তাকে শেখাচ্ছি, বোঝাচ্ছি।নিশ্চয় পরীক্ষায় ভাল করবে সে। এপাশে আমার দিক থেকে ভালবাসা বাড়তে লাগল।বুকের বা পাশে চিনচিন করে।একটা ভাল্লাগা কাজ করে।অন্যপাশের কী অবস্থা বুঝি না।কোন রেসপন্স নেই।হয়ত বোঝে, হয়ত বোঝে না।

দীর্ঘদিন মনে মনে পুষে রাখি সে ভালবাসা।হঠাৎ “আশিকী” নামে একটা হিন্দি সিনেমা ভিসিআরে দেখে মনটা তোলপাড় হল।থামতে পারি না।বুকের ভেতর আবেগ উথলে উঠছে।সিদ্ধান্ত নিলাম এক্স-কে বলতে হবে যে করেই হোক “তোমাকে ভালবাসি”।

তো সুযোগ খুঁজি।কিন্তু সুযোগ পেলেও বলতে পারি না।গা কাঁপে থরথর করে।বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম হাতুরী পেটা শব্দ হয়।সিদ্ধান্ত নিলাম চিঠি দিব।হাফ দিস্তা কাগজ নষ্ট করে একটা চিঠি দাঁড় করালাম।

সেটি চুপচুপ করে পড়ি,

বারবার পড়ি।

হ্যাঁ, ঠিক আছে।প্যাণ্টের পকেটে রেখে বারবার হাত ঢুকিয়ে দেখি, আছে কি নেই!

পরেরদিন সুযোগ বুঝে ওর বাংলা বইয়ে ঢুকিয়ে দিলাম।সারাদিন ভয়ে বাড়ি থেকে বের হই না।সবাই বুঝি দেখেছে।সবাই বুঝি জেনেছে।বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ।সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি।কখনও মনে হয় এক্স বোধহয় বাড়ির সবাইকে বলেছে।এই বুঝি তার বাড়ির লোকরা লাঠি নিয়ে মারতে আসে।কান খাঁড়া করে শোনার চেষ্টা করি।বারবার বাথরুমে যাই।মাথা চাড়া দিয়ে তাদের বাড়ি দেখার চেষ্টা করি।না, কোন শব্দ নাই।জেডও নেই কেন জানি।শালা আজ একবারও খোঁজ করতে আসল না।আমি ভয়ে মরি আর তার পাত্তা নেই।নিশ্চয় সে তার খালার বাড়ি গেছে।

খুব কঠিন দিন গেল একটা।

পরেরদিন শালা জেড-র দেখা পেলাম।কোন হেলদোল নেই।বুঝলাম, সমস্যা নেই কোন।তবে কি সে চিঠি পায়নি নাকি পড়ে রেখে দিয়েছে নাকি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে?আমার ভালবাসা সেকি গ্রহন করেছে, নাকি করেনি?

এটা ওটা কত কি ভাবি।

কখনও ভয়ে মরি তো কখনও আনন্দে  পুলকিত হই।দু:খ তাড়াতে সারাদিন গুণগুণ করে গান গাই।মাথার চুল টানি।শার্টের বোতাম খোলা রেখে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে দিন পার করি।

চার.

চিঠির ব্যাপারে কিছু বুঝলাম না।আবার দেখা হয়।ওদের বাড়িও যাই।কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারি না।এবার সিদ্ধান্ত নিলাম সরাসরি বলব।শীঘ্রই সুযোগও হল।সে বাঁধের রাস্তায় একা একা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছে।আমিও বাইসাইকেলে বাঁধের রাস্তায় আসছি।

পথে হল দেখা।

সাইকেল থেকে নেমে তার কাছাকাছি হয়ে বললাম, কেমন আছো?

এক্স: ভাল।আপনি?

ভাল।বলে, এদিক সেদিক দেখে তাকে সাহস করে বললাম, এক্স, একমিনিট থামো।

সে থামল।

আর আমার দম বন্ধ হল।

বাতাসে অক্সিজেনের বড় অভাব দেখা দিল।ঠোঁট মুখ শুকিয়ে কাঠ।

মরে যাচ্ছি মনে হচ্ছে।

এক্স: বলুন, ওয়াই ভাই, কি বলবেন?সে ওড়না ঠিক করতে করতে বলল।

ওড়না সরলে তার বুকে দেখি পাথর।

ঠোঁট চেটে হরহর ফরফর করে বললাম তাকে, এক্স, তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলাম, পড়েছো নিশ্চয়?

তার দিক থেকে কোন উত্তর নাই।

শোন, তোমাকে আমার খুব ভাল লাগে।তোমাকে আমি ভালবাসি।

পাত্তা দিল না সে।হনহন করে হাঁটতে লাগল।আবার তার সামনে দাঁড়ালাম।

না, সে কোন উত্তর দিচ্ছে না।বুকের পাথরগুলো মুখে এসেছে। তার চোখ,মুখ কঠিন।কোন অনুভূতি নেই।

হনহন করে চলে গেল সে।

না, এ মুখ তাকে দেখাবো না।ছি, ছি, ছি, যার জন্য দিন মাটি, ঘুম নষ্ট, পড়াশোনা লাটে উঠেছে-সেই কিনা কোন পাত্তা দিল না?ভেবে কিনারা পাই না কী করব।

নির্ঘুম রাত।

নিত্য বিছানায় এপাশ-ওপাশ।

শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম আর একবার ট্রাই করব যা হয় হোক।

এটাই শেষ।

কিন্তু হাঁদা গাধা জেড-র জন্য বলতেই পারি না।সারাক্ষণ লেপ্টে থাকে শালা।যাক, সিদ্ধান্ত নিলাম ওর কলেজে গিয়ে বলব।তো পরেরদিন এক্স-র কলেজে গেলাম।চেনাশোনা এর ওর চোখ ফাঁকি দিয়ে, কারও কারও সাথে ভাব করে আশায় আশায় ঘুরছি।এভাবে অনেক ঘোরাঘুরি করে সময় সুযোগ মিলল।ডাকলাম, এই এক্স, এক্স!

সে কাছে আসল।

কাঁপতে কাঁপতে বললাম, কোন রেসপন্স পেলাম না।বাধ্য হয়ে এখানে দেখা করতে এসেছি।প্লিজ মাইণ্ড কর না।এতদিনে নিশ্চয় জেনেছো, বুঝেছো তোমাকে আমার খুব পছন্দ, সত্যিই তোমাকে আমি ভালবাসি।কিন্তু তোমার দিক থেকে কোন সাড়া পাই না।

তুমি কিছুই বল।

প্লিজ কিছু বল।

হ্যাঁ বল, প্লিজ।

আপনি এখানে আসা আপনি ঠিক করেননি।অনেকেই দেখছে।কে কি ভাবে।বাড়ি পর্যন্ত খবর যাবে। মরা গলায় আরও বলল সে, বুঝি সব।কিন্তু ওয়াই ভাই, আমার পক্ষে এটা অসম্ভব।

তাই কোন জবাব দিইনি।

:কেন অসম্ভব?বল, শুনি?

:কারন, আমি আপনাকে সেভাবে ভাবি না।

:মানে?

:আপনাকে ভাই ভাবি।

বললাম, নিজেরতো নই।

আমি পড়ে যাব বোধহয়।পায়ের তলায় মাটি নেই।

বলল সে, নিজের মতো ভাবি।সেই ছোটবেলা থেকে তাই ভেবে বড় হচ্ছি।অযথা আমাকে ভেবে কষ্ট পাবেন না।ভুল বুঝবেন না।

বলে সে হনহন করে চলে যায় তার কমন রুমের দিকে।

আমার বুকের ভেতরের টেনিস বলটা থেমে যায়।ঘড়ির পেণ্ডুলামটা আর ঠকাস ঠকাস করে না।

পোড়া কপাল - মাসুম মোরশেদ
657 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ২:২০ পূর্বাহ্ণ

পদ্মবিল ও বেকারের গল্প

বাবু স্নাতকোত্তর শেষ করে খুলনা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসেছে।সে চাকরির জন্যে নিজ বাড়ি থেকে প্রাণপণ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।কিন্তু,সে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারছে না। ইতিমধ্যেই সে সাত-আটটা দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির ভাইভা দিয়েছে। কোনভাবেই চূড়ান্তভাবে মনোনীত হতে পারছে না।এদিকে গাও গেরামের অজপাড়া গাঁয়ের মূর্খ অশিক্ষিত কিংবা কিছু নামমাত্র শিক্ষিত অতি-শিক্ষিত পণ্ডিতগণেরা আদা-জল খেয়ে বাবুর বাবার ঘাড়ে লেগে গেছে।অশিক্ষিত লোকের চেয়ে শিক্ষিত লোকেরা বেশি হিংসে করে। ছেলেকে ক্যানো শিক্ষিত করতে গেলে।শিক্ষিত করে কোনো লাভ নেই। শিক্ষায় কোন ভাত নেই।ক্যানো টাকা-পয়সা,জায়গাজমি  বিনষ্ট করে ফেললে? ক্যানো সন্তানের জন্য এতো বড় ক্ষতি করতে গেলে? ইত্যাদি ইত্যাদি??পারলে ছেলেকে কোনো কোম্পানিতে দাও।আলী প্রত্যুত্তরে বলেন, বেশ তো! তাহলে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দাও। তখন তারা নিস্তব্ধ নিথর হয়ে যায় । কোনো কথা না বলে প্রস্থান করে। অথচ যারা বড় গলায় কথাগুলো বলছে তাদের ছেলেমেয়েরা হয়তো কৃষিকাজ করছে, গাথার খাটুনি খাটছে, না হয় প্রবাসে চুরি ছ্যাচড়ামো করে কাজ করছে।কেউ কেউ সরকারি ভিসায় গেছে যারা একটু বোকাসোকা টাইপের। তারা একটা  পোস্ট-গ্রাজুয়েট ছেলেকে মাঠের হালচাষ শেখানোর কথা বলে বাবুর বাবার সাথে।কী হৃদয় বিদারক! কী হিংসা!কী করুণ! এরা কী সোনার বাংলার মানুষ!

এখানে চাকরি করতে গেলে টাকা লাগে, লবিং লাগে, রাজনীতি লাগে, তদবির লাগে, কোটা লাগে, মামা-খালু লাগে। হায়রে আলী তোমার তো কিছুই নেই তোমার ছেলের চাকরি হবে না।এভাবে এলাকার মানুষ বাবুর বাবার মনটা ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু,আলী তার ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ছেলে একদিন ঠিক-ঠাকই চাকরি ব্যবস্থা করে নেবে।নানা মুনির নানা মত।পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকেই চন্দ্র-সূর্যের মতো প্রবর্তিত হয়ে আসছে। ‘লোকের কথায় কান দেবার কোনো দরকার নেই তোর’- আলী ছেলেকে বললো।আলী ছেলেকে আরো বললো তোর চেষ্টা তুই করে যা তোর বাবা-মা যতদিন জীবিত আছে।তোর বাবা-মার দোয়ায় দেখিস তোর গন্তব্যে তুই ঠিকই পৌঁছে যাবি।বাবার তুলনা তো বাবাই! বাবা অতুলনীয়, বাবা অসামান্য, বাবা সন্তানের জন্য পুরো জ্যোতিষ্কমণ্ডলী! বাবা খোলা আকাশ। মা-তো মমতাময়ী, জনমদুখিনী, গর্ভধারিণী, সুখ-দুঃখের দিনগুলোর চিরসাথী।মা জননী মানে তো সমস্ত সত্তা, বেঁচে থাকার মহাত্মা!

শিক্ষায় যে জাতির উন্নতির মহাসোপান সেটা কী আর অশিক্ষিত লোকরা বোঝে।শিক্ষাই অগ্রসরমান না হলে যে দেশের উন্নয়ন অসম্ভব সেটা ঐসব হাবাগোবা বোকা অশিক্ষিত মূর্খ লোকেরা আর কী করে বুঝতে। তারা তো অ,আ, ক, খ’র কিছুই বোঝে না।বোঝে কাটি দিতে। ক্ষুদ্র সুক্ষ্ম ছিদ্রপথটাকে একটা বিরাটকার গর্ত বানাতে পারে। দর্শনার্থীদের টানে তেমন কোনো আলোচিত-সমালোচিত আলুটিলার গুহা তৈরি করতে পারে না। তবে কিছু কিছু অশিক্ষিত ব্যক্তিও শিক্ষিত ব্যক্তির ঊর্ধ্বে! টাকা-পয়সয়া, ধনসম্পত্তি অভাব না থাকলেই ঐসব শিক্ষিত লোক কিন্তু তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করতে পারিনি।হয়তো সেজন্য হিংসাত্মক তৎপরতা বিস্তৃত প্রসারের কাজে ব্যতিব্যস্ত রাখে সেটা আর কেনা জানে! তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত তো করতেই পারিনি অন্যের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত হওয়াও তাদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাবুর বাবা হলেন আলী।তিনি অত্যন্ত সৎ, বিচক্ষণ, সাদাসিধা,ধার্মিক,বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন নীতি নৈতিকতা আর মিশুক প্রকৃতির মানুষ।তিনার মানবিক মর্যাদা বীরোচিত এবং দৃঢ়হৃদয়ের অধিকার মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। স্বাধীনতাত্তোর ক্লাস টু পর্যন্ত কোনো রকম লেখাপড়া শিখেছিলেন খুব কষ্ট করে।তিনি মুখে মুখে বড় বড় অঙ্কের হিসেব করে দিতে পারেন।বলা যায় খুবি মেধাবী ও আলোকিত মানুষ। তখন মানুষের অনেক অভাবনীয় অভাব অনটন ছিলো।নুন আনতে পানতা ফুরাতো।তিনি তার বাবার পিতৃ সম্পদ খুব সামান্যই পেয়েছিল।খুব কষ্টকেলেশ করে প্রায় তিন একর জায়গায় জমি কিনেছিলেন।কিন্তু, ভুল মানুষের প্ররোচনায় তিনার সম্পত্তি শেষমেশ টিকিয়ে রাখতে পারিনি।তবে কাজের কাজ ঠিকই করেছেন। ছেলেকে এম.এ পাস করিয়েছেন। যেটা নিয়ে তিনি অহংকার করতেই পারেন। এমন কোনো পিতামাতা নেই যিনি তার সন্তানদের নিয়ে গৌরব করেন না? সবাই সন্তারদের নিয়ে অহংকার করেন।বাবুর বাবাও তার ব্যতিক্রম নয়।তিনি বেশি শিক্ষিত না হলে খুবই শিক্ষানুরাগী ছিলেন। বাবুর বাবার ইচ্ছে ছেলে সু-শিক্ষাই শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে।সেই প্রচেষ্টা  বাবুর বাবার সার্থকতা পেয়েছে। বাবু ছোটবেলা থেকে শিক্ষার প্রতি মনোযোগী ছিল।বাড়িতে কোনো কাজ এলে বাবুর স্কুল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও স্কুলে চলে যেতো কিংবা পড়ায় ব্যস্ত হয়ে যেতো।বাবু শৈশবকাল থেকেই স্বপ্ন দেখেছে সে একটি সরকারি চাকরি করবে।বেসরকারি, প্রাইভেট, এনজিওর কোনো সংস্থা, ন্যাশনাল বা মাল্টি-ন্যাশনাল কোনো কোম্পানির চাকরি, ভার্চ্যুয়াল, ব্লগার, ফ্রিলান্সারের আউটসোর্সিং, মার্কেটিং, ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার, ফেসবুক, ইউটিউব,গুগল এর মতন দামী দামী কোনো প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করতে নারাজ। আসলে চাকরির বর্তমান বাজার দ্রব্যমূল্যের মতন খবই ঊর্ধ্বগামী। যা উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে চাকরির বাজার। চাকরি নাকি সোনার হরিণ!! আসলে চাকরির বাজার কোনো সোনার হরিণ নয়! চাকচিক্যময় সোনা ঢালতে পারলেই সহজে হরিণ ধরা দেয় সুজলা সুফলা সোনার বাংলায়।বাবু সোনার হরিণের পেছনে ছুটে চলেছে প্রায় পাঁচ বছর ধরে।হায়রে সোনার হরিণের বাড়ি কী চাঁদের দেশে? নাকি মঙ্গলগ্রহে! চাকরির বাজার সংকট, দুর্নীতি, অসদুপায় অবলম্বন, স্বজনপ্রীতি, তদবিরে মেধাবীবের বঞ্চিত করে অযোগ্য, অ-মেধাবী,অদক্ষ যারা চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা থেকে একছিঁটকে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে তারা অনেকে সরকারি চাকরি করছে। এ লজ্জা কার? বাকস্বাধীনতা তুমি কোথায়, তুমি আজ কতো দূর!

বাবুদের বাড়ি ছিলো বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায়। বাড়ি উঠোন পেরুলে বিশাল একটা বিল।

এই বিলকে কেন্দ্র করে তার চতুর্দিকে ন্যূনতম দশটি গ্রাম গড়ে উঠেছে।যে বিলটি পদ্মবিল, চান্দার কুড়ির বিল বা কারো কারো কাছে বলির বিল নামে পরিচিত। যেখানে একসময় অধিকাংশ জমিই অনাবাদি পড়ে থাকতো।আবাদি জমি তেমন ছিলো না।যতটুকু আবাদিজমি ছাড়ানো ছিটান দেখা যেতো ভালোভাবে ফসল চাষাবাদের তেমন কেউ ছিলো না।গভীর বনজঙ্গলে শ্বাপদসংকুলে পরিপূর্ণ ছিলো পুরো বিলটি। মেলে ঘাস, কলমিলতা গাছ, শামা ঘাস, দূর্বাঘাস আর কচুরিপানায় পরিপূর্ণ ছিলো বিলটি। বর্ষাকাল এলে মুষলধারে বৃষ্টি হলেই পানিতে টইটম্বুর হয়ে যেতো; মনে হতো যেন বিশালাকৃতির একটি হাওড়! বর্ষা মৌসুম এলে প্রায় ছয়মাস পানিতে থইথই করতো এই বিলটি।আবার গ্রীষ্মের সময় বিলটি ফেটে ফালিফালি হয়ে যেতো।ফাড়ার ফাঁকফোকরের মধ্যে যে কেউ অনাসয়ে ডুকে যেতে পারতো।কী  একটা বিশ্রী অবস্থা!চৈত্রের খাঁ খাঁ দুপুরে তৃষ্ণার ক্লান্তিতে পিপাসিত কাকটাও একফোঁটা জল পেতো না কোথাও।

আবার  যখন পানিতে টইটম্বুর করতো তখন হরেকরকমের মাছ এখানে পাওয়া যেতো।কই, শিং, টাকি, বোয়াল-মৃগেল,জাপানি পুঁটি, সর পুটি, গ্লাস কার্প, চেঙ্গু পাছসহ বাটা জাতীয় নানাবিধ মাছ পাওয়া যেত।হরেকরকমের পাখিদেরও আনাগোনা ছিলো এ বিলে।বিলের পূর্বদিকে বিলের কোল ঘেঁষে বনবাদাড় ছিলো।প্রচুর বাঁশঝাড় ছিলো, শিমুল গাছ, শ্রেষ্ঠবৃক্ষ, আম্রকানন, নাটা গাছ, প্রচুর খেজুরের গাছ  দেখা যেতো যেখানে হাজারো প্রজাতির পাখপাখালি এসে কিচিরমিচির গানে সুর তুলতো।প্রাণজুড়নো গান করতো সন্ধেবেলা কিংবা ফজরের আজান থেকে প্রায় সূর্যোদয় পর্যন্ত। এখানে দূরদূরান্তর থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ মাছ ধরতে আসতো, পাখি ধরতে আসতো, চুরি করতে আসতো। তখন সিঁধকাটার একটা চরম প্রবণতা ছিলো।কারণ তখন ইটের বাড়ি, পাকা বাড়ি, কিংবা অট্টালিকার দালানকোঠা পাওয়া দূরুহ ব্যাপার ছিলো। বনজঙ্গলের ঘেরা বাগানের মধ্যে দু একটি মাটির বাড়ি দেখা যেতো।যা মাটি কাঁদা করে একটু আঠালো হলে কোদাল দিয়ে মাটির দুধারে দু কোপ দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে ওয়াল তৈরি করে। কেউ আটচালা, কেউ চৌচালা কিংবা কেউ বাঁশের টাইট দিয়ে ঘিরে নেয়। চাল কুটো, নাড়া বা বিচালি দিয়ে ছাওনি করে নিতো।আহা কি আরাম-ই না ছিলো ঘরের ভেতর। মনে হতো আধুনিকতার ছোঁয়া বা ডিজিটাল যুগের আরাম আয়েশ এসে ভর করেছে।যেখানে এয়ারকন্ডিশনে মতন সব শীততাপনিয়ন্ত্রক কিংবা

শীতের সময় কি আর গ্রীষ্মের সময় কি নাতিশীতোষ্ণ ভাব অনেকটা। শান্তি আর আরামের সুখ ঠিকানা ছিল অসুখ ঠিকানার বালাই ছিলো না।

পদ্ম বিলকে ঘিরে যে গ্রামগুলো বেড়ে উঠেছে তন্মধ্যে বাঁশবাড়ীয়া,গোপসেনা, মেহেরপুর, গোবিন্দপুর ধর্মপুর, ফতেপুর, কাস্তাসহ আরো আনেক গ্রাম। মূলত পদ্ম বিলকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র প্রবাহিত হয়েছে প্রবহমান তটিণী-র মতন।জীবনমান নির্ধারিত সময়ের কথা বলে, কালের কথা, দুঃখের কথা বলে, সুখের কথা বলে এমনকি ইতিহাসের কথা বলে। পদ্মা বিলের বুক চিরে এখন সড়ক থেকে মহাসড়ক, তার বুক কেটে খাল হয়েছে, সংযোগ পেয়েছে কপোতাক্ষ নদের।

এখানে একসময় দুঃখের অন্ত ছিল না কিন্তু সুখের-ও কোনো ঘাটতি ছিলো না।

বাবুর শৈশব স্মৃতিবিজড়িত এই বিলটির প্রচণ্ড দুঃখ আছে৷ তবে বাবু শৈশবে অনেক মাছ ধরেছে, বিলের জলে সাঁতার কেটেছে। সেই বিলটি বাবু স্মৃতিতে এখনো জ্বাজ্জল্যমান। মনে করে এইতো সেদিন দেখলাম, শুনলাম পদ্মবিলের কতকথা। যে বিলে

চেঁচোগাছ যার মূল তুলে ছেলেমেয়েরা খেতো,মুসড়তিগাছ যে-টা চেঁচোগাছের চেয়ে একটু বড়,শলাগাছ ইত্যাদি ঘাস পাওয়া যেত। দরকুমবির, ছিলুটি, মাছরাঙা, ছিরুটি, গামভীর, জয়লা, চরুভাটেল, রাজাশৈল, নড়ুই, সমরা, কপ্পুরাজ যার পাখনা ছিলো, পানুটে, কটকতারা ধান, মুর্শিদাবাদ ধান, লক্ষ্মীকাজল নামে বাহারি ধান চাষ হতো।বড় বড় দানাযুক্ত ছিলো। খেতে বড়-ই স্বাদ ছিলো। বড় দুঃখজনক গরীবরা সেগুলো খেতে পারতো না।জোতদারের কাছ থেকে, ধনীদের কাছ থেকে, বিগার খাটার বিনিময়ে কিছু পেতো। অনেকে অনেকের বাড়ি থেকে ফ্যান আমানি চেয়ে এনে এনে তাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করতো। তন্মধ্যে করিমন্নেছা ছিলেন অন্যতম।তিনি তার ছেলেমেয়েদের ফ্যান আমানি খাইয়ে তাদের ক্ষুধা নিবারন করার চেষ্টা করত।তার সাত ছেলেমেয়ের এভাবেই বড় করে তুলেছে৷ নিজে না খেয়ে খাইয়েছে নাড়িছেঁড়া ধনদের।ওদের মধ্যেই কনিষ্ঠ সন্তান ছিল আলী।আলীর জীবনও বড় রহস্যময়। সেটা থাক। যা বলছিলাম যে ধান চাষাবাদ করা হতো তাতে কোনো প্রকার রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার ছিলো না।অসুখ বিসুখ আজকালকার মতো এত ছিল না। কিন্তু, তা এখন আর পাওয়া যায় না যেন কালের বিবর্তনে তা আজ হারিয়ে গেছে।

বাগজামা, ভদ্যু, শিলা, মেলেঘাস, বাজু, খড়ঘাস, ভাদলাঘাস, শ্যামাঘাস, কুটোঘাস, কাশেঘাস, শুশমীঘাস,দূর্বাঘাস, কলমিলতা,  জুয়েঘাতা, শানচিঘাস, ঢেকিঘাসসহ কতো সবুজ ঘাসে বিলটি একাকার হয়ে যেতো। শিয়ালের আশ্রয়ের অনন্য ঠিকানা ছিলো।গভীর নিশি রাত্রে সেই হুক্কাহুয়ার শব্দ আজ আর তেমন শোনা যায় না।

কাটানটি ঘাস শরীরের জন্য উপকারী, ব্যথানাশক,

কুলকীশাক, যার সারা গাঁয়ে কাটা হতো তাও আজ আর পাওয়া যায় না।কারণ, বিলটির তলা পর্যন্ত এখন আউশ, আমন ধান আর পাট চাষ করা হয়।কপোতাক্ষ নদ খননের ফলে বিল এখন জলাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ থাকে না।পদ্মবিলের চতুর্দিকের মানুষের এখন খাবারের অভাব নেই কিন্তু শান্তি জাদুঘরে চলে গেছে।

কাকশেল, বাইলে, শৈল,  খস্কুরুল, ঘুটুচিঙড়ি, নয়না, বোয়াল-মৃগেল,  গইতি, গচি, পাইটুবান, সাইলবান, পাতাড়ি যেটা এখন ভেটকিমাছ, মাগুর, ছকটা চিংড়ী যেটা ধরতে গেলে উপরের দিকে ছটকে যেতো যার ঠ্যাং ছিলো লম্বা লম্বা, জিয়েল,বাজি ট্যাংরামাছ, মরুল্লমাছ যেটা বজরামাছ বা মায়ামাছ, হরেকরকম পুটিমাছ পাওয়া যেত।পদ্মা বিলের পার্শ্ববর্তী পশ্চিম দিকে মেহেরপুর-গোপসেনা ভেতর দিয়ে খাল খনন করা হয়।খাল খনন  করার ফলে কপোতাক্ষ নদের সাথে পদ্মবিল খালের পারস্পরিক সংযোগ পেয়েছে।তৎকালীন সময়ে কোন খাল ছিল না।কপোতাক্ষ নদের দিকে পদ্মবিলের পানি গড়িয়ে গেলে উজানে পূর্বোল্লেখিত মাছগুলো এ বিলে পাওয়া যেত।

বাবু ছোটবেলায় তার বাবার সাথে আলো বাইতে যেত মাছ ধরতে।বড় লাইট কিংবা মাটির হাড়ির ভেতর বড় পিদিম জ্বালিয়ে নিয়ে যেতো সাথে একটা বড় কোচ! কোচটা তৈরি হতো সরু সরু লোহারদণ্ড একসাথে পনের বিশটি যুক্ত করে যা একটা শক্ত লাঠির আগায় বাধা হতো তার দিয়ে।

সেদিন রাতে খাবার সময় বাবু তার আব্বার কাছে জিজ্ঞেস করলো, ‘ আব্বা তোমার মনে আছে একবার আলোর মাছ ধরতে গিয়ে জ্বিনে ধরচলছিলো?” বাবুর বাবা বললো সে কথা আর বলতে!

আলী বললো মনে আছে তো। শোন আমি বলছি, আলোর মাছ বাইতে গেলে একা একা যেতে হয় না।একা গেলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। কারণ, মাছ ধরার নেশা গাজা, হুইচকি,বাংলা, ভতকার চেয়ে বড় নেশা। এমনকি নারী লোকের চেয়েও বড় নেশা! সে কারণে বড় বড় মাছের রুপ ধরে গভীর জলের দিকে নিয়ে পানিতে চুবিয়ে মেরে দিতে পারে খারাপ জ্বীনেরা।

তা না হলে সেবার আতি তো মারায় যেতো। আমরা একসাথে আলোর মাছ বাইতে গেছি আতি, মোজাফফর সহ অনেকে। দেখি আতি বড় মাছের লোভে লোভে গভীর পানির দিকে চলে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলে আলীকে আতি বলছে দ্যাখ বিশাল একটা মাছ। আসলে তেমন কিছু ছিলো না। ওটা জ্বীনে ছোল ধরে আসছিলো।

আলোর মাছ বাইতে গেলে বাইম মাছ, ট্যাংরামাছ, শোলমাছসহ গোছা পানিতে মাঝে মাঝে জাপানি পুঁটি, সরপুঁটি পাওয়া যেত। বাবুকে আলী রাত্রের  খাবার খেতে খেতে কথাগুলো বলছিলো।

পদ্মবিলের বুকে বিরাট দুটি ঢিবি আছে যা আঞ্চলিক ভাষায় মাইদি নামে পরিচিত। আটাশি সালের বন্যা কিংবা দুই হাজার সালের পরবর্তীতে যে বন্যা আসছিলো চারিদিকে পানিতে ডুবে গিয়েছিলো কিন্তু ঢিবি দুটিতে কোনো পানি ওঠেনি।কারণ ওখানে নাকি একসময় পীর পয়গম্বরের বাস ছিলো।ঢিবি দুটি গহীন অন্ধকারে বিরাজমান থাকে।বিভিন্নরকম গাছগাছালির আড়ালে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারতো না মাইদির ভেতর। এখনো মাইদি দুটো অক্ষত আছে। শুধু গাছগাছালির অভয়ারণ্যে ফুরিয়ে গেছে। তবু আজো পাখপাখালির কিচিরমিচির শোনা যায়। শিয়াল, বেজি, সাপ সেখানে এখানো আছে।শুধু সেই সৌন্দর্যের প্রতীকটা আজ আর নেই।

যা-ই হোক বাবুর দূর থেকে অপলকভাবে তাকিয়ে দেখে সড়কের ধার থেকে। কালেভদ্রে সেখানে যায়  তার ছায়ায় হিমেল হাওয়ায় হৃদয় ভেজায়।

যে কথাটা না বললেই নয়, গৌরাঙ্গ ঘোষ নামে এলাকায় এক দাদা ছিলো বাবুর। তিনি অত্যন্ত ভদ্রলোক। মাস্টার্স শেষ করেছে দশ বছর হলো।ভগবান তার ভাগ্যে প্রত্যাশানুযায়ী কোন সরকারি চাকরি লেখেনি।তাই ভাগ্যকে পুঁজি করে এখন হোমিওপ্যাথি ঔষধ বিক্রি করে করে রিজিকের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। কিন্তু হৃদয়বিদারক ও রোমহষর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে বাবু অশ্রুসিক্ত নয়নে কপাল ভিজিয়েছে।গ্রামের কিছু শয়তান লোক তাকে পাগল বানিয়ে ফেলেছে। তিনার মাথার উপর দিয়ে নাকি সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইট উড়তে থাকে।দেশ বিদেশের বড় বড় মন্ত্রী-মিনিস্টার কে কি বলে সে বলে দিতে পারে! মানুষ এমন হয় ক্যানো? মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হলো কেমন করে??

একেক গ্রামের একেক মৌজা নাম্বার থাকে।ঠিক মৌজার শেষ প্রান্তে বৃটিশরা নাকি পিন পুতে রাখছিলো।যেটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে। পিনটি ছিলো কলার মোচাকৃতি। পিনটি বসানো হয়েছিলো চারটি কাচের বোতলের উপর যার নিচে ছিলো কয়লার স্তূপ।বজ্রপাত থেকে বিশেষত মুক্তি পাওয়া যেতো। কিন্তু আজ তার বিপরীত হচ্ছে।কারণ এখন আর সেই পিনগুলো নেই। কে কা কারা যেন মাঠ থেকে তুলে নিয়ে গেছে।

পদ্মবিলের দক্ষিণ পূর্বকোণে স্বাধীনতার সময় রাজাকার ক্যাম্প বসানো হয়েছিলো।সাধারণ মানুষগুলোকে যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল তাদের নির্বিচারে গুলি করে মেরেছে পাকিস্তানের গোলাম কিছু কুচক্রী রাজাকার সদস্যরা। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো দ্বীন মোহাম্মদ, আমিনুদ্দিন রাজাকার। তারা আজ আর নেই।মারা গেছেন।

কিন্তু আজো বাংলার আনাচে কানাচে হাজারো রাজাকার রয়ে গেছে যারা বেকারদের নিয়ে খেলছে।

সেই খেলার পাত্র হয়ে লাখ লাখ বাবু বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দিনযাপন করছে।প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন পাচ্ছে না।

আলী আজো স্বপ্ন দেখে তার বাবু একদিন তার স্বপ্ন ঠিক-ই পূরণ করবে।

পদ্মবিল ও বেকারের গল্প - গোলাম রববানী 
590 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ২:১২ পূর্বাহ্ণ

বিনিময় 

১.

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।দুঠৌঁটের মাঝে চেপে রাখা সিগারেটে একটা জোরে টান দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে।সানোয়ারদের ফাকলপুরের এই জায়গাটা অসাধারণ।লোকালয়ের ভেতরেই,তবে প্রকৃতির অদ্ভুত একটা টান আছে।সুবিধামত দামে পেয়ে ফার্ম হাউজটা কিনেছিলেন সানোয়ারের বাবা।ভার্সিটির সময়কার বন্ধু আমার সানোয়ার।এখন চাকরির সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায়।আশ্চর্যজনকভাবে এখনো ভালই যোগাযোগ আমার সাথে

ফেসবুক ইন্টারনেটের এই বোধয় একটা বড় সুবিধা।হৃদ্যতা নাই থাকুক,যোগাযোগ থাকে অন্তত।ফাকাই থাকে ফার্ম-হাউজটা।তবে এবার বেশ কিছুদিন থাকব শুনে সানোয়ার কিছুটা অবাক।কেয়ারটেকার জহির ছেলেটা সব ঠিকঠাক করে রাখে।পরেরদিনই চলে এলাম।

আসার আগে ঢাকার কাউকে জানিয়ে আসিনি।কতদিন থাকব নিজেও জানিনা।আগে ছুটি কাটাতে প্রায়ই আসতাম।এবার কোন ছুটি ছাড়াই চলে এলাম।

পেছন থেকে জহির ডাকল,

-দাদাভাই বাইরে থাকবেন না।শীতের বৃষ্টি।ঠান্ডা লেগে যাবে।চা দিয়েছি।ঘরে চলে আসুন।

আমি বল্লাম,আসছি।

আসলেই প্রচন্ড শীত করছে।বৃষ্টির পানি গায়ে কাটা দিচ্ছে।ভেতরে চলে এলাম।জহির টেবিলে চা,বিস্কুট দিয়েছে।টাওয়েল নিয়ে দাড়িয়ে আছে।জিজ্ঞেস করলাম,রাতের খাবার কি?

-দেশি মুরগি,পালং শাক আর সেদ্ধ ডিম আছে দাদাবাবু।

আমি আসার পর জহির ছেলেটা ব্যস্ত থাকে সারাদিন।প্রায় প্রতিবেলাই ভিন্ন ভিন্ন খাবারের জোগাড় করছে।বেপারটা ভালই উপভোগ করছি আমি।ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে চায়ের কাপটা হাতে নিলাম।পাশে রাখা সেলফোনে টুং করে একটা ম্যাসেজের শব্দ পেলাম।ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেজ নোটিফিকেশনে ক্লিক করলাম।মোবাইল স্ক্রিনে যা ভেসে উঠল তা দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম।

২.

গত একমাস যে আমি ঢাকায় নেই,নজরে এসেছে তাহলে বিন্তির।একবছর হয়ে গেল যোগাযোগ নেই আমাদের।দুজনেই খোঁজ রাখি দুজনের।যদিও কথা হয়না আর।

ছোট্ট ম্যাসেজ পাঠিয়েছে বিন্তি,

‘শৃঙ্খলদা,

ঢাকা কি ছেড়েই দিলেন নাকি?আমি কিন্তু আর পারছি না।লম্বা ছুটি নিয়ে নিয়েছি।আগামীকাল আসছি আপনার কাছে।খুব ঝগড়া করব।তাড়িয়ে দিলে চলে আসব।’

সেলফোনটা টেবিলে রেখে একটা সিগারেট জ্বালালাম।লাইটারের আগুনের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম,ঝাপসা লাগছে আগুনটা।চোখ ভিজে গেছে আমার।অসুস্থ শরীরের জন্যই বোধয়।এই শরীর নিয়ে আবেগ সহ্য করার শক্তি নেই আমার।

এরকমই কি হয়?আমি একজনকে ভীষণ চেয়েছিলাম।তার সবকিছু,তার সমস্ত।শুধুমাত্র তখন তার দায়িত্ব নেবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।চলে গিয়েছিল।

এতদিন পর,একটা বছর পর,আবার কেন ফিরতে চাইছে বিন্তি?যোগাযোগ টুকুও তো রাখেনি।কোন আশ্চর্য শক্তিতে কি বিন্তি বুঝতে পেরেছে,আমার মনে কি হয়?আমার মন যে চিরদিনের জন্য সবার থেকে ছুটি চায়।সে কি বুঝে নিল?

৩.

সকালবেলা নিজে বাজার করতে গেলাম।বাজার থেকে মুরগি কিনে এনেছিলাম।এর মধ্যে বিন্তির আরেকটা ম্যাসেজ পেয়েছি।সে বিকেলে আসবে।ঢাকা থেকে ফাকলপুরে বিকেলে পাঁচ টার পর গাড়ি আসে।আমি একটু তাড়াতাড়িই বাসস্টান্ডে চলে এসেছিলাম।

বাস আসল ছটার আগে আগে।বিন্তি নামল।ফাকলপুরের এই পড়ন্ত বিকেলের আকাশটা যেন ঝলমলিয়ে উঠল।ওকে যেন স্বাগত জানাচ্ছে পুরো পরিবেশটা।

বিন্তি প্রায় ছুটে এল আমার দিকে।ঠোঁটে এক ঝলক হাসি খেলে উঠল ওর।সাথে কেপে উঠল আমার পুরো শরীর।

-কী শীতরে বাবা।এখানে যখন আসতে পেরেছেন।হিমালয়ে গেলেই পারতেন।বেশ সাধু সন্নাসের একটা এক্সপিরিয়েন্স হত ভাল।

বিন্তির চোখে স্পষ্ট ছেলেমানুষি খেলা করছে।আমি বিনীত হাসি হেসে বল্লাম,চলো এগোনো যাক।ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে।বল্লাম,হাতে হাত রাখো,হাতটা গরম হবে।

বিন্তি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।তারপর বলল, না।

একটু পরে আস্তে করে বলল,

শৃঙ্খলদা,আমার সব শীতের দিনে আপনিই উষ্ণতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।এখন বোধয় আপনার ঠান্ডা হাতকে আমার উষ্ণ করার সময় এসে গেছে।আমার হাতে আপনার হাত রাখুন,বলে হাতটা বাড়িয়ে দিল বিন্তি।

অনেক দিন পর বিন্তির হাতে হাত রাখলাম।ভালবাসা বলতে কি বোঝায় আমি জানিনা।তবে অনেকদিন পর বিন্তির হাতের এই উষ্ণতা আমাকে এক অদ্ভুত ভাললাগায় মুড়িয়ে নিল।

বিনিময় - মুনেম শাহরিয়ার মাহিব
564 Views

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ২:০৫ পূর্বাহ্ণ

মুহিতের বাড়ি ফেরা

“এবার বাড়িতে আসবি না বাবা” এমন আকুতির পত্র পড়েই মুহিতের মন গলে যায় চোখে অশ্রু ভরে ওঠে।

গ্রাম থেকে তার মা চিঠি লিখেছেন, সে যেন এবার ঈদটা তাদের সাথে পালন করে।

মুহিত শহরে থাকে প্রায় ৭ বছর হলো।এতো বছরে মাত্র দু-একবার পরিবারের সাথে ঈদ পালন করেছে সে।অভাবের সংসার যত দায়িত্ব ওর ঘাড়ে।

নিজে বাড়ি না আসলেও মাসে মাসে মাইনেটা ঠিকি বাড়িতে পৌঁছে যায়।

সে একটা ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করে।সেখানে ছুটি নেই বললেই চলে।আর যাও দু- একদিন থাকে ওটাও অফিসের কাজের জন্যই দিতে হয় বাসায় বসে।বাড়িতে আসার ফুসরত খুব কম।

কিন্তু এবার মায়ের চিঠি পাওয়ার পর থেকে সে ছটফট করছে বাড়িতে ফেরার জন্য।কতদিন চেনা মুখগুলো দেখা হয় না।আর গ্রামের মেঠো পথ,মাঠ বন আর নদী।

ঈদের আর বেশি দিন দেরি নেই।সপ্তাহ দু-এক রয়েছে প্রায়।রোজার ঈদ একটু বেশিই আনন্দ সবার মনে।এক মাসের রোজার মুক্তি মিলবে সাথে গুনাহ্ও মাফ হবে আল্লাহ্ চাইলে।

মুহিত সময় নষ্ট না করে অফিসের “বসের” কাছে ধরনা দেয়।এবার ১০দিনের ছুটি চাই তার।”বস” প্রথমে নারাজ কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না।পরে মায়ের কথা শুনে তার হৃদয়ও নরম হয়।

মায়ের কথায় যেন পাষাণেরও মন গলে।

এদিকে ঈদের দিন ঘনিয়ে আসছে।ঈদের আমেজ যেন লেগে গেছে সবার প্রাণে।পৃথিবীটা কেমন মুখর হয়ে উঠেছে,সবার ভেতরে আনন্দের ছাপ।

অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরে থাকে।এদিক – ওদিক থেকে বাড়ি যাওয়ার খবর আসে মুহিতের কানেও।তার মধ্যেও একটা চঞ্চল ভাব কোন কাজেই মন দিতে পারছে না সে ভাল মত।

অবশেষে তার কাঙ্ক্ষিত সময় আসে।সে ঈদের একদিন আগে রওনা দেয় বাড়ির পথে।যেন যুদ্ধ জয় করে ঘরে ফিরছে বিজয়ী বেশে।

ওইদিকে পথ চেয়ে আছেন মা।বাবার মনও পুলকিত ছোট বাচ্চার মত ছটফট করছে।ছেলে আজ বাড়ি ফিরবে তার।ভাই বোনো তীর্থের কাকের মত হয়ে আছে।এতোদিন পর ভাইকে কাছে পাবে তারা।

মুহিত ভোরের  ট্রেনে রওনা হয়েছিল। বাড়ি আসতে রাত হবে তার।অনেক দূরের পথ গ্রামটা তাদের অজপাড়া গাঁয়ে।

সে ট্রেনে বসেই কল্পনা করে নেয় মনে মনে এবার ঈদে কি কি করবে সে।

সে চোখ বুজে মায়ের মুখ দেখে।আব্বা শুয়ে আছেন বারান্দায় জাজিমে।ছোট বোনটা উঠোনে খেলছে মাটির হাড়ি পাতিল দিয়ে।আর ভাইটার হাতে লাল রং এর ঘুড়ি।মনে পড়ে বন্ধু আব্দুল্লাহর কথা।আর স্কুল জীবনের সেই শেফালির কথা।এসব ভাবতে ভাবতেই  ঘুমিয়ে পড়ে মুহিত এক সময়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। ঘুম ভেঙে যায় তার।আরর ঘণ্টা ২ এর পথ।তারপর বাড়ি ফিরবে সে।

গোধূলীবেলা সন্ধ্যার আকাশ।ডুবে যাচ্ছে সূর্যটা।বাতাসের সাথে ফিরছে বলাকারা।জানালার ফাঁক দিয়ে দেখছে মুহিত।আর বাড়ি ফেরার আনন্দটা অনুভব  করছে সে।

রাত ৭ টা হবে তখন। থেমে যায় ট্রেনের ইঞ্জিন। ট্রেনের বাইরে থেকে জানালায় আসছে মানুষের শোরগোল।মুহিত লাফিয়ে ওঠে তারপর ব্যাগ কাঁধে চঞ্চল পায়ে এগিয়ে যায় ট্রেনের দরজার দিকে।

ট্রেন থেকে নেমেই এক স্বস্তির শ্বাস ফেলে সে।তারপর চেনা পথটা ধরে হাটতে থাকে নিজের ঘরের দিকে নিজের জননীর দিকে।

মুহিতের বাড়ি ফেরা - বায়েজিদ বোস্তামী
528 Views