অন্তিম আকাঙ্খা

রেজাউল ইসলাম হাসু

১৩ মে, ২০২১ , ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ ; 444 Views

অন্তিম আকাঙ্খা - রেজাউল ইসলাম হাসু

মহিলাটির ফাঁসি হয়েছে।

জেলারের সঙ্গে অচেনাজনের কথাপোকথনে বাক্যটা বোমার মতো বিষ্ফোরিত হলে জেলের সেলগুলো সিটি স্ট্রিটের কোলাহলে রূপ নেয়। নীরব অন্ধকারের ভেতর থেকে গমগম আওয়াজ উদগত হতে থাকে, যেভাবে হাঁফরের টানে কয়লার ঘুম ভেঙে আগুনের স্ফূরণ জেগে ওঠে কামারশালায়।

কোনো এক সেলে হাঁটু মুড়ে বসে আছে সেই মহিলা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষ্ফোরণের বিদূষিত ধোঁয়ায় তারও মুখমন্ডল আরো কুয়াশময় হয়ে উঠেছে হয়তো। হয়তোবা তার বেঁচে থাকবার অন্তিম আকুতিটুকুও নিঃসঙ্গ বৃক্ষের একমাত্র হলদে পাতাটার মতো কান্নার মর্মরি তুলে ঝরে গেলো। হয়তোবা সে-ও তার ভেতর থেকে ভেঙেচুরে আরো নৈঃশব্দ্যের জোয়ারে হারিয়ে গেলো। আরো একা হয়ে গেলো তার থেকে। সে-দিকে কারো কোনো চোখ ও চুম্বন নেই। মন ও মমত্ব নেই। আছে কেবল থোকা থোকা কদর্য কফবৃষ্টি।

পৃথিবীতে দুপুর নেমেছে। দুপুর নামলে আমরা ক্লান্তে নেতিয়ে পড়ি। আরাম কেদারায় ক্লেদাক্ত জীবনগুলো ছড়িয়ে দিই। একটা মধ্যাহ্ন বিরতির পর জেলটা পুরনো জৌলুস ছড়ায়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শত ব্যস্ততায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নতুন কয়েদিরা আসে। শূন্য সেলসমূহ উছলে উঠে বিকেল হতে না হতেই।

সেই মহিলাকে কেন্দ্রীয় জেলে পাঠানোর অর্ডার এলো।

শোনো মহিলা, তোমার কাপড়চোপড়, প্রসাধনসামগ্রী ও অন্যান্য দ্রব্য গুছিয়ে নাও। এক ঘণ্টা পর তোমাকে নিয়ে যাওয়া হবে। ভারী আর কর্কশ গলায় বাক্যগুলোয় বিদ্ধ করে জেলের সবচেয়ে পুরনো প্রহরী দীর্ঘ করিডোর ধরে দপ্তরাভিমুখে হাঁটতে হাঁটতে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

পরনের একমাত্র শাড়ি ছাড়া তার আর কী কী আছে, অথবা আর কী কী থাকতে পারে মনে করবার চেষ্টা করল। প্রথমে সে সেলের আশপাশ তাকাল। কী অদ্ভত অন্ধকারে ডুবে আছে এক সেল! কতোদিন রোদের ক্লোরফিল পড়েনি, কেউ জানে না! দ্বিতীয়বার সে তার পরনের শাড়ির দিকে তাকাল। আঁচলে রক্ত ছড়িয়ে সাপাকৃতি ধারণ করে আছে তাকে। যাকে সে বয়ে বেড়াচ্ছে অহর্নিশ। সবষ্মিয়ে তাকিয়ে থাকে। তৃতীয়বার সে তার নিজের দিকে তাকায়। কী এক ওজনশীল আমিকে বয়ে বেড়াচ্ছে জন্মলগ্ন থেকে! যার নাম মহিলা…

এক ঘণ্টা পর জেলের আরেকজন প্রহরী এসে তাকে সেলের বাইরে নিয়ে এলো। বাইরে এসেই প্রথমে সে উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকাল। এমনভাবে তাকাল যেন সে কোনোদিন আকাশ দেখেনি। একেবারে পাঁচ-ছয় বছরের শিশু-সুলভ আচারণ প্রদর্শন করে ইতিউতি তাকাতে থাকল। আকাশ ঠিকরে রোদের ক্লোরফিল ঝরছে। সে ছুঁয়ে দেখতো চাইল সেই রোদ। অমনি বিকেলের বিপুল ছায়া সেই রোদকে গোগ্রাসে শুরু করল। তার রোদ ছোঁয়াও হলো না। এমনসময় তাকে একটা জলপাই রঙের জিপগাড়িতে তোলা হলো। পিচপথের পিঞ্জর বেয়ে ছুটে চলল সেই জিপগাড়ি।

ভেতরের যাত্রীরা লোহাজাত তারের ক্ষুদ্রাকৃতির ৬টা ছিদ্রসমূহ দিয়ে কিঞ্চিত পৃথিবীটাকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে দেখবার কসরত করছে। গাড়িটা এখন বিউটি বাজারের বুক ছুঁয়ে নিউ মার্কেটের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিউটি বাজার দেখে সে অনেক স্মৃতির জোয়ারে ভাসতে থাকে। বিউটি বাজার পেরিয়ে পুরুষ সরণি। সেইখানে তার শশুড়ালয়। শশুড়ালয়ে পা ফেলতেই কে যেন তাকে মহিলা বলে ডেকেছিল। ভীড়ের ভেতর সে তাকে চিনতে পারেনি। তবে সে একটা অনুমান করে নিয়েছিল কে হতে পারে সেই সম্বোধনকারী। হতে পারে তার শ^শুড় অথবা শাশুড়ী অথবা তার স্বামী। যাকে সে ভালোবেসেছিল অন্ধের মতো।

এখন আর সেই প্রেমের প্রদীপ কোনো বর্ষণমুখররাতে বিভা ছড়ায় না। আলোড়িত করে না তার যোনিসুড়ঙ্গ অথবা সুঠোল স্তুনযুগল। এবং তারপর থেকে সে সেখানে মানুষ হবার যুদ্ধ করেও এখন-অব্দি মানুষ হতে পারেনি। মেয়েরা মানুষ হয় কেমন করে সেই পদ্ধতি তার জানা নেই। কোথায় লেখা আছে তাও সে জানে না। কেবল জানে এখন সে কোথায় অগ্রসর হচ্ছে। কোনো এক অচেনা অন্ধকারগুচ্ছ তাকে ইশারা দিচ্ছে। আর সেও তার মায়ায় পড়ে পরাস্ত সৈনিকের মতো তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মায়া! খোলা আকাশে পাখিগুলো কোন মায়ায় ছুটে বেড়াচ্ছে দিগন্তের পর দিগন্ত? ছোটবেলায় সে পাখি হতে চেয়েছিল। মা বলেছিল, ভেঙে যাওয়া ডানার যাতনা যদি জানতে তাহলে এই আকাঙ্ক্ষা কখনোই করতে না। আজো সে পাখি হবার আকাঙ্ক্ষায় পুরুষের প্রার্থনা করে চলেছে।

নিউ মার্কেট পেরিয়ে কেন্দ্রীয় জেলের ফটকে জিপগাড়ি এসে থামল। কড়া প্রহরায় গাড়ি থেকে কয়েদিদের নামানো হলো। গাড়িতে পুরুষের ভিড়ে একমাত্র মহিলাটির নাভিশ্বাস উঠবার জো।

ভাই, আমি মহিলা, আগে আমাকে নামতে দিন। খুব অসহায় ভঙ্গিমা করে সে বলে উঠল। পুরুষগুলো যেন তাকে করুণা করে আগে নামতে দিলো। মহিলা শাড়ির আঁচল টেনে মুখের ঘাম মুছতে গিয়ে সেই সাপাকৃতি দেখে সবষ্মিয়ে তাকিয়ে থাকে। যাকে সে বয়ে বেড়াচ্ছে অহর্নিশি।

কেন্দ্রীয় জেলের সেলগুলো লোকাল জেলের সেলের চেয়ে বেশ বড়সড়। রাত্রে তাকে দুটো পোড়া রুটি ও আলুর সবজি খেতে দেয়া হলো। দুদিন থেকে খাবারে তার অরুচি। খেলেই উদগার ওঠে। খাবারগুলো যেভাবে দিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই মেঝেতে পড়ে রইল। জেলে আসার কতো মাস হলো সেই হিসেব কষতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল। কেবল মা ছাড়া তাকে তেমন কেউ দেখতে আসেনি, এমনটিই মনে হলো তার। মাঝখানে হীরা এসেছিল বোধহয়। এটা তার এক ধরনের কল্পনাজাত। হীরাকে সে প্রত্যাখান করেছিল তার পাখিবেলায়। সেদিন পরষ্পরের সঙ্গে কোনো বাক্য বিনিময় হয়নি। কেবল দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পরষ্পরের দিকে পরষ্পর তাকিয়ে ছিল নিবিড় নৈঃশব্দ্যে। শ্বশুড়ালয় থেকে কেউ আসেনি তার একাকীত্বে শান্ত্বনার হিম ছড়াতে।

একদিন সে স্বামীর ঘর ছাড়ে মানুষের দাবি নিয়ে। স্বাধীন নামক বাসে উঠে তার আসন হয় সংরক্ষিত মহিলা আসনে। সেদিন থেকে সে রক্ষিতার মতো নিজেকে উদযাপন করে আসছে। আজো স্বাধীন হতে পারেনি পুরুষপ্রবাহ থেকে। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নেয় সে। ভাবে, এবার পাখি হবার আকাঙ্খা পূরণ হবে তার। অচেনা বিভায় উড়াবে তার সোনালি ডানা। ঘুরে-ফিরে দেখে নেবে অদেখা সমুদ্র। যে সমুদ্র অপেক্ষমান অজস্র গোলাপের ঘ্রাণে। কোনো এক নিশুথি রাতে সে তার সোনালি ডানাগুলোও হারিয়ে ফেলে কোনো এক পুরুষপ্রাসাদে। তারপর শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে সকাল আসে তার করিডোরে। দাঁত কেলিয়ে সেকেলে হাসি হাসে পৃথিবী। মাথার উপরে অসীম আকাশ, কেবল ঈশ্বরের মতো হিম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ডানাহীন পাখিদের মতো কেবল করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।

এই মহিলা, শোনছো? শোনছো মহিলা? কেন্দ্রীয় জেলের একজন প্রহরী তাকে কর্কশ গলায় ডাকে। সে আস্তে আস্তে চোখের পাতা মেলে ধরবার কসরত করে। খাকি ইউনিফরম পরিহিত পুরুষ মানুষটার দিকে নিরীহ ভঙ্গিতে তাকায় সে। ‘কিছু বলবেন ভাই?’ রুগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে তারপর।

কিছু বলবেন না, বলেছি। তোমাদের মতো মহিলাদের এই এক সমস্যা। এক কথা দুবার করে না বললে তোমাদের কানে ঢোকে না! বিরক্তির শ্লেষ ঝেরে পুরুষ প্রহরীটা বলে। সে প্রাইমারির বাচ্চাদের মতো চুপচাপ সেলের অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়েই পুরুষ প্রহরীটার কথা শোনে।

জেলার সাহেব পাঠিয়েছেন। কালকে তোমার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। যদি তোমার কোনো অন্তিম আকাঙ্খা থেকে থাকে, তবে তা জানাতে পারো।যেকোনোভাবেই হোক, জেল কর্তৃপক্ষ তোমার সেই অন্তিম আকাঙ্খা পূরণ করবে। প্রহরী বলল।

দয়া করে আমাকে একটা এ ফোর আকারের শাদা পাতা ও কালো কালির বলপেন এনে দেবে? সে বলল।

প্রহরী স্টোররুম থেকে একটা এ ফোর আকারের শাদা পাতা ও কালো কালির বলপেন এনে তাকে দিলো। সে শাদা পাতায় তার অন্তিম আকাঙ্খার কথা লিখে পাতাটা বর্গক্ষেত্রের মতো ভাঁজ করে প্রহরীর হাতে তুলে দিলো অশ্রুসিক্ত চোখে। আর খুব করে বোঝালেন এই চিঠির গোপনীয়তা কতোখানি। তারপর সেই চিঠি ডানাহীন পাখির মতো প্রহরীর হাত ধরে জেলার সাহেবের হাতে গিয়ে পৌঁছুলো। চিঠিটা পড়ে তিনিও অশ্রুসিক্ত চোখে একবার জানালার দিকে তাকালেন। তারপর পিনপতন নীরবতা পালনের মতো বাইরের পৃথিবীটাকে দেখলেন। তখন আকাশ ভেঙে মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। থেকে থেকে ঝড়ো হাওয়ায় ওক গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল।

কী অপরাধে তার ফাঁসি হচ্ছে আমরা জানি অথবা জানি না। তবে যেটা সে করেছে তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সে-ও তাই করত। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাকে জেল থেকে শাদা রঙের নতুন শাড়ি দেয়া হয়েছে। ভালো খাবার দেওয়া হয়েছে। পরনের শাড়িটা আঁচল টেনে খুলতে যাবার কালেও সেই এলোমেলোভাবে রক্ত পড়ে সাপাকৃতির সাথে তার শেষবারের মতো সাক্ষাৎ হয়ে গেলো। যাকে সে বয়ে বেড়াচ্ছে পাখিবেলা থেকে। আজ তাকে সে নিসংশয়ভাবে ছুড়ে মারে ময়লার বাস্কেটে। তারপর শাদা রঙের শাড়ির ভেতর নিজেকে সে নতুনভাবে আবিস্কার করে শিহরিত হয়। এক ধরনের স্বাধীনতার ঘ্রাণ অনুভব করে। মঞ্চে উঠবার সময় সে একবারও ভীত হয় না।

আনুষ্ঠানিকভাবে ফাঁসির কার্যক্রম শেষ হলো। তার শবদেহ নেবার জন্য একজন পুরুষের আগমন ঘটেছে। মহিলার শবদেহ আমি নিতে এসেছি। খুব জোর গলায় লোকটা উচ্চারণ করল। জেলার তার গালে কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে বললেন, মহিলা নয়, বলো মানুষের শবদেহ নিতে এসেছি। আর এই-ই ছিল তার অন্তিম আকাঙ্খা। যেন তার নামের আগে অথবা পরে এই শব্দাটা ব্যবহার না করা হয়। আর আমি তোমাকে একজন মানুষের শবদেহ হস্তান্তর করছি, যে বেঁচে থাকতে কখনোই মহিলা ছিল না। মৃত্যুর আগে সে এটাই চেয়েছিল।

[wpdevart_facebook_comment curent_url="http://yourdomain.com/page-url" order_type="social" title_text="Facebook Comment" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]