পদ্মবিল ও বেকারের গল্প

গোলাম রববানী 

১৩ মে, ২০২১ , ২:২০ পূর্বাহ্ণ ; 490 Views

পদ্মবিল ও বেকারের গল্প - গোলাম রববানী 

বাবু স্নাতকোত্তর শেষ করে খুলনা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসেছে।সে চাকরির জন্যে নিজ বাড়ি থেকে প্রাণপণ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।কিন্তু,সে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারছে না। ইতিমধ্যেই সে সাত-আটটা দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির ভাইভা দিয়েছে। কোনভাবেই চূড়ান্তভাবে মনোনীত হতে পারছে না।এদিকে গাও গেরামের অজপাড়া গাঁয়ের মূর্খ অশিক্ষিত কিংবা কিছু নামমাত্র শিক্ষিত অতি-শিক্ষিত পণ্ডিতগণেরা আদা-জল খেয়ে বাবুর বাবার ঘাড়ে লেগে গেছে।অশিক্ষিত লোকের চেয়ে শিক্ষিত লোকেরা বেশি হিংসে করে। ছেলেকে ক্যানো শিক্ষিত করতে গেলে।শিক্ষিত করে কোনো লাভ নেই। শিক্ষায় কোন ভাত নেই।ক্যানো টাকা-পয়সা,জায়গাজমি  বিনষ্ট করে ফেললে? ক্যানো সন্তানের জন্য এতো বড় ক্ষতি করতে গেলে? ইত্যাদি ইত্যাদি??পারলে ছেলেকে কোনো কোম্পানিতে দাও।আলী প্রত্যুত্তরে বলেন, বেশ তো! তাহলে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দাও। তখন তারা নিস্তব্ধ নিথর হয়ে যায় । কোনো কথা না বলে প্রস্থান করে। অথচ যারা বড় গলায় কথাগুলো বলছে তাদের ছেলেমেয়েরা হয়তো কৃষিকাজ করছে, গাথার খাটুনি খাটছে, না হয় প্রবাসে চুরি ছ্যাচড়ামো করে কাজ করছে।কেউ কেউ সরকারি ভিসায় গেছে যারা একটু বোকাসোকা টাইপের। তারা একটা  পোস্ট-গ্রাজুয়েট ছেলেকে মাঠের হালচাষ শেখানোর কথা বলে বাবুর বাবার সাথে।কী হৃদয় বিদারক! কী হিংসা!কী করুণ! এরা কী সোনার বাংলার মানুষ!

এখানে চাকরি করতে গেলে টাকা লাগে, লবিং লাগে, রাজনীতি লাগে, তদবির লাগে, কোটা লাগে, মামা-খালু লাগে। হায়রে আলী তোমার তো কিছুই নেই তোমার ছেলের চাকরি হবে না।এভাবে এলাকার মানুষ বাবুর বাবার মনটা ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু,আলী তার ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ছেলে একদিন ঠিক-ঠাকই চাকরি ব্যবস্থা করে নেবে।নানা মুনির নানা মত।পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকেই চন্দ্র-সূর্যের মতো প্রবর্তিত হয়ে আসছে। ‘লোকের কথায় কান দেবার কোনো দরকার নেই তোর’- আলী ছেলেকে বললো।আলী ছেলেকে আরো বললো তোর চেষ্টা তুই করে যা তোর বাবা-মা যতদিন জীবিত আছে।তোর বাবা-মার দোয়ায় দেখিস তোর গন্তব্যে তুই ঠিকই পৌঁছে যাবি।বাবার তুলনা তো বাবাই! বাবা অতুলনীয়, বাবা অসামান্য, বাবা সন্তানের জন্য পুরো জ্যোতিষ্কমণ্ডলী! বাবা খোলা আকাশ। মা-তো মমতাময়ী, জনমদুখিনী, গর্ভধারিণী, সুখ-দুঃখের দিনগুলোর চিরসাথী।মা জননী মানে তো সমস্ত সত্তা, বেঁচে থাকার মহাত্মা!

শিক্ষায় যে জাতির উন্নতির মহাসোপান সেটা কী আর অশিক্ষিত লোকরা বোঝে।শিক্ষাই অগ্রসরমান না হলে যে দেশের উন্নয়ন অসম্ভব সেটা ঐসব হাবাগোবা বোকা অশিক্ষিত মূর্খ লোকেরা আর কী করে বুঝতে। তারা তো অ,আ, ক, খ’র কিছুই বোঝে না।বোঝে কাটি দিতে। ক্ষুদ্র সুক্ষ্ম ছিদ্রপথটাকে একটা বিরাটকার গর্ত বানাতে পারে। দর্শনার্থীদের টানে তেমন কোনো আলোচিত-সমালোচিত আলুটিলার গুহা তৈরি করতে পারে না। তবে কিছু কিছু অশিক্ষিত ব্যক্তিও শিক্ষিত ব্যক্তির ঊর্ধ্বে! টাকা-পয়সয়া, ধনসম্পত্তি অভাব না থাকলেই ঐসব শিক্ষিত লোক কিন্তু তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করতে পারিনি।হয়তো সেজন্য হিংসাত্মক তৎপরতা বিস্তৃত প্রসারের কাজে ব্যতিব্যস্ত রাখে সেটা আর কেনা জানে! তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত তো করতেই পারিনি অন্যের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত হওয়াও তাদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাবুর বাবা হলেন আলী।তিনি অত্যন্ত সৎ, বিচক্ষণ, সাদাসিধা,ধার্মিক,বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন নীতি নৈতিকতা আর মিশুক প্রকৃতির মানুষ।তিনার মানবিক মর্যাদা বীরোচিত এবং দৃঢ়হৃদয়ের অধিকার মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। স্বাধীনতাত্তোর ক্লাস টু পর্যন্ত কোনো রকম লেখাপড়া শিখেছিলেন খুব কষ্ট করে।তিনি মুখে মুখে বড় বড় অঙ্কের হিসেব করে দিতে পারেন।বলা যায় খুবি মেধাবী ও আলোকিত মানুষ। তখন মানুষের অনেক অভাবনীয় অভাব অনটন ছিলো।নুন আনতে পানতা ফুরাতো।তিনি তার বাবার পিতৃ সম্পদ খুব সামান্যই পেয়েছিল।খুব কষ্টকেলেশ করে প্রায় তিন একর জায়গায় জমি কিনেছিলেন।কিন্তু, ভুল মানুষের প্ররোচনায় তিনার সম্পত্তি শেষমেশ টিকিয়ে রাখতে পারিনি।তবে কাজের কাজ ঠিকই করেছেন। ছেলেকে এম.এ পাস করিয়েছেন। যেটা নিয়ে তিনি অহংকার করতেই পারেন। এমন কোনো পিতামাতা নেই যিনি তার সন্তানদের নিয়ে গৌরব করেন না? সবাই সন্তারদের নিয়ে অহংকার করেন।বাবুর বাবাও তার ব্যতিক্রম নয়।তিনি বেশি শিক্ষিত না হলে খুবই শিক্ষানুরাগী ছিলেন। বাবুর বাবার ইচ্ছে ছেলে সু-শিক্ষাই শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে।সেই প্রচেষ্টা  বাবুর বাবার সার্থকতা পেয়েছে। বাবু ছোটবেলা থেকে শিক্ষার প্রতি মনোযোগী ছিল।বাড়িতে কোনো কাজ এলে বাবুর স্কুল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও স্কুলে চলে যেতো কিংবা পড়ায় ব্যস্ত হয়ে যেতো।বাবু শৈশবকাল থেকেই স্বপ্ন দেখেছে সে একটি সরকারি চাকরি করবে।বেসরকারি, প্রাইভেট, এনজিওর কোনো সংস্থা, ন্যাশনাল বা মাল্টি-ন্যাশনাল কোনো কোম্পানির চাকরি, ভার্চ্যুয়াল, ব্লগার, ফ্রিলান্সারের আউটসোর্সিং, মার্কেটিং, ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার, ফেসবুক, ইউটিউব,গুগল এর মতন দামী দামী কোনো প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করতে নারাজ। আসলে চাকরির বর্তমান বাজার দ্রব্যমূল্যের মতন খবই ঊর্ধ্বগামী। যা উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে চাকরির বাজার। চাকরি নাকি সোনার হরিণ!! আসলে চাকরির বাজার কোনো সোনার হরিণ নয়! চাকচিক্যময় সোনা ঢালতে পারলেই সহজে হরিণ ধরা দেয় সুজলা সুফলা সোনার বাংলায়।বাবু সোনার হরিণের পেছনে ছুটে চলেছে প্রায় পাঁচ বছর ধরে।হায়রে সোনার হরিণের বাড়ি কী চাঁদের দেশে? নাকি মঙ্গলগ্রহে! চাকরির বাজার সংকট, দুর্নীতি, অসদুপায় অবলম্বন, স্বজনপ্রীতি, তদবিরে মেধাবীবের বঞ্চিত করে অযোগ্য, অ-মেধাবী,অদক্ষ যারা চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা থেকে একছিঁটকে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে তারা অনেকে সরকারি চাকরি করছে। এ লজ্জা কার? বাকস্বাধীনতা তুমি কোথায়, তুমি আজ কতো দূর!

বাবুদের বাড়ি ছিলো বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায়। বাড়ি উঠোন পেরুলে বিশাল একটা বিল।

এই বিলকে কেন্দ্র করে তার চতুর্দিকে ন্যূনতম দশটি গ্রাম গড়ে উঠেছে।যে বিলটি পদ্মবিল, চান্দার কুড়ির বিল বা কারো কারো কাছে বলির বিল নামে পরিচিত। যেখানে একসময় অধিকাংশ জমিই অনাবাদি পড়ে থাকতো।আবাদি জমি তেমন ছিলো না।যতটুকু আবাদিজমি ছাড়ানো ছিটান দেখা যেতো ভালোভাবে ফসল চাষাবাদের তেমন কেউ ছিলো না।গভীর বনজঙ্গলে শ্বাপদসংকুলে পরিপূর্ণ ছিলো পুরো বিলটি। মেলে ঘাস, কলমিলতা গাছ, শামা ঘাস, দূর্বাঘাস আর কচুরিপানায় পরিপূর্ণ ছিলো বিলটি। বর্ষাকাল এলে মুষলধারে বৃষ্টি হলেই পানিতে টইটম্বুর হয়ে যেতো; মনে হতো যেন বিশালাকৃতির একটি হাওড়! বর্ষা মৌসুম এলে প্রায় ছয়মাস পানিতে থইথই করতো এই বিলটি।আবার গ্রীষ্মের সময় বিলটি ফেটে ফালিফালি হয়ে যেতো।ফাড়ার ফাঁকফোকরের মধ্যে যে কেউ অনাসয়ে ডুকে যেতে পারতো।কী  একটা বিশ্রী অবস্থা!চৈত্রের খাঁ খাঁ দুপুরে তৃষ্ণার ক্লান্তিতে পিপাসিত কাকটাও একফোঁটা জল পেতো না কোথাও।

আবার  যখন পানিতে টইটম্বুর করতো তখন হরেকরকমের মাছ এখানে পাওয়া যেতো।কই, শিং, টাকি, বোয়াল-মৃগেল,জাপানি পুঁটি, সর পুটি, গ্লাস কার্প, চেঙ্গু পাছসহ বাটা জাতীয় নানাবিধ মাছ পাওয়া যেত।হরেকরকমের পাখিদেরও আনাগোনা ছিলো এ বিলে।বিলের পূর্বদিকে বিলের কোল ঘেঁষে বনবাদাড় ছিলো।প্রচুর বাঁশঝাড় ছিলো, শিমুল গাছ, শ্রেষ্ঠবৃক্ষ, আম্রকানন, নাটা গাছ, প্রচুর খেজুরের গাছ  দেখা যেতো যেখানে হাজারো প্রজাতির পাখপাখালি এসে কিচিরমিচির গানে সুর তুলতো।প্রাণজুড়নো গান করতো সন্ধেবেলা কিংবা ফজরের আজান থেকে প্রায় সূর্যোদয় পর্যন্ত। এখানে দূরদূরান্তর থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ মাছ ধরতে আসতো, পাখি ধরতে আসতো, চুরি করতে আসতো। তখন সিঁধকাটার একটা চরম প্রবণতা ছিলো।কারণ তখন ইটের বাড়ি, পাকা বাড়ি, কিংবা অট্টালিকার দালানকোঠা পাওয়া দূরুহ ব্যাপার ছিলো। বনজঙ্গলের ঘেরা বাগানের মধ্যে দু একটি মাটির বাড়ি দেখা যেতো।যা মাটি কাঁদা করে একটু আঠালো হলে কোদাল দিয়ে মাটির দুধারে দু কোপ দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে ওয়াল তৈরি করে। কেউ আটচালা, কেউ চৌচালা কিংবা কেউ বাঁশের টাইট দিয়ে ঘিরে নেয়। চাল কুটো, নাড়া বা বিচালি দিয়ে ছাওনি করে নিতো।আহা কি আরাম-ই না ছিলো ঘরের ভেতর। মনে হতো আধুনিকতার ছোঁয়া বা ডিজিটাল যুগের আরাম আয়েশ এসে ভর করেছে।যেখানে এয়ারকন্ডিশনে মতন সব শীততাপনিয়ন্ত্রক কিংবা

শীতের সময় কি আর গ্রীষ্মের সময় কি নাতিশীতোষ্ণ ভাব অনেকটা। শান্তি আর আরামের সুখ ঠিকানা ছিল অসুখ ঠিকানার বালাই ছিলো না।

পদ্ম বিলকে ঘিরে যে গ্রামগুলো বেড়ে উঠেছে তন্মধ্যে বাঁশবাড়ীয়া,গোপসেনা, মেহেরপুর, গোবিন্দপুর ধর্মপুর, ফতেপুর, কাস্তাসহ আরো আনেক গ্রাম। মূলত পদ্ম বিলকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র প্রবাহিত হয়েছে প্রবহমান তটিণী-র মতন।জীবনমান নির্ধারিত সময়ের কথা বলে, কালের কথা, দুঃখের কথা বলে, সুখের কথা বলে এমনকি ইতিহাসের কথা বলে। পদ্মা বিলের বুক চিরে এখন সড়ক থেকে মহাসড়ক, তার বুক কেটে খাল হয়েছে, সংযোগ পেয়েছে কপোতাক্ষ নদের।

এখানে একসময় দুঃখের অন্ত ছিল না কিন্তু সুখের-ও কোনো ঘাটতি ছিলো না।

বাবুর শৈশব স্মৃতিবিজড়িত এই বিলটির প্রচণ্ড দুঃখ আছে৷ তবে বাবু শৈশবে অনেক মাছ ধরেছে, বিলের জলে সাঁতার কেটেছে। সেই বিলটি বাবু স্মৃতিতে এখনো জ্বাজ্জল্যমান। মনে করে এইতো সেদিন দেখলাম, শুনলাম পদ্মবিলের কতকথা। যে বিলে

চেঁচোগাছ যার মূল তুলে ছেলেমেয়েরা খেতো,মুসড়তিগাছ যে-টা চেঁচোগাছের চেয়ে একটু বড়,শলাগাছ ইত্যাদি ঘাস পাওয়া যেত। দরকুমবির, ছিলুটি, মাছরাঙা, ছিরুটি, গামভীর, জয়লা, চরুভাটেল, রাজাশৈল, নড়ুই, সমরা, কপ্পুরাজ যার পাখনা ছিলো, পানুটে, কটকতারা ধান, মুর্শিদাবাদ ধান, লক্ষ্মীকাজল নামে বাহারি ধান চাষ হতো।বড় বড় দানাযুক্ত ছিলো। খেতে বড়-ই স্বাদ ছিলো। বড় দুঃখজনক গরীবরা সেগুলো খেতে পারতো না।জোতদারের কাছ থেকে, ধনীদের কাছ থেকে, বিগার খাটার বিনিময়ে কিছু পেতো। অনেকে অনেকের বাড়ি থেকে ফ্যান আমানি চেয়ে এনে এনে তাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করতো। তন্মধ্যে করিমন্নেছা ছিলেন অন্যতম।তিনি তার ছেলেমেয়েদের ফ্যান আমানি খাইয়ে তাদের ক্ষুধা নিবারন করার চেষ্টা করত।তার সাত ছেলেমেয়ের এভাবেই বড় করে তুলেছে৷ নিজে না খেয়ে খাইয়েছে নাড়িছেঁড়া ধনদের।ওদের মধ্যেই কনিষ্ঠ সন্তান ছিল আলী।আলীর জীবনও বড় রহস্যময়। সেটা থাক। যা বলছিলাম যে ধান চাষাবাদ করা হতো তাতে কোনো প্রকার রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার ছিলো না।অসুখ বিসুখ আজকালকার মতো এত ছিল না। কিন্তু, তা এখন আর পাওয়া যায় না যেন কালের বিবর্তনে তা আজ হারিয়ে গেছে।

বাগজামা, ভদ্যু, শিলা, মেলেঘাস, বাজু, খড়ঘাস, ভাদলাঘাস, শ্যামাঘাস, কুটোঘাস, কাশেঘাস, শুশমীঘাস,দূর্বাঘাস, কলমিলতা,  জুয়েঘাতা, শানচিঘাস, ঢেকিঘাসসহ কতো সবুজ ঘাসে বিলটি একাকার হয়ে যেতো। শিয়ালের আশ্রয়ের অনন্য ঠিকানা ছিলো।গভীর নিশি রাত্রে সেই হুক্কাহুয়ার শব্দ আজ আর তেমন শোনা যায় না।

কাটানটি ঘাস শরীরের জন্য উপকারী, ব্যথানাশক,

কুলকীশাক, যার সারা গাঁয়ে কাটা হতো তাও আজ আর পাওয়া যায় না।কারণ, বিলটির তলা পর্যন্ত এখন আউশ, আমন ধান আর পাট চাষ করা হয়।কপোতাক্ষ নদ খননের ফলে বিল এখন জলাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ থাকে না।পদ্মবিলের চতুর্দিকের মানুষের এখন খাবারের অভাব নেই কিন্তু শান্তি জাদুঘরে চলে গেছে।

কাকশেল, বাইলে, শৈল,  খস্কুরুল, ঘুটুচিঙড়ি, নয়না, বোয়াল-মৃগেল,  গইতি, গচি, পাইটুবান, সাইলবান, পাতাড়ি যেটা এখন ভেটকিমাছ, মাগুর, ছকটা চিংড়ী যেটা ধরতে গেলে উপরের দিকে ছটকে যেতো যার ঠ্যাং ছিলো লম্বা লম্বা, জিয়েল,বাজি ট্যাংরামাছ, মরুল্লমাছ যেটা বজরামাছ বা মায়ামাছ, হরেকরকম পুটিমাছ পাওয়া যেত।পদ্মা বিলের পার্শ্ববর্তী পশ্চিম দিকে মেহেরপুর-গোপসেনা ভেতর দিয়ে খাল খনন করা হয়।খাল খনন  করার ফলে কপোতাক্ষ নদের সাথে পদ্মবিল খালের পারস্পরিক সংযোগ পেয়েছে।তৎকালীন সময়ে কোন খাল ছিল না।কপোতাক্ষ নদের দিকে পদ্মবিলের পানি গড়িয়ে গেলে উজানে পূর্বোল্লেখিত মাছগুলো এ বিলে পাওয়া যেত।

বাবু ছোটবেলায় তার বাবার সাথে আলো বাইতে যেত মাছ ধরতে।বড় লাইট কিংবা মাটির হাড়ির ভেতর বড় পিদিম জ্বালিয়ে নিয়ে যেতো সাথে একটা বড় কোচ! কোচটা তৈরি হতো সরু সরু লোহারদণ্ড একসাথে পনের বিশটি যুক্ত করে যা একটা শক্ত লাঠির আগায় বাধা হতো তার দিয়ে।

সেদিন রাতে খাবার সময় বাবু তার আব্বার কাছে জিজ্ঞেস করলো, ‘ আব্বা তোমার মনে আছে একবার আলোর মাছ ধরতে গিয়ে জ্বিনে ধরচলছিলো?” বাবুর বাবা বললো সে কথা আর বলতে!

আলী বললো মনে আছে তো। শোন আমি বলছি, আলোর মাছ বাইতে গেলে একা একা যেতে হয় না।একা গেলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। কারণ, মাছ ধরার নেশা গাজা, হুইচকি,বাংলা, ভতকার চেয়ে বড় নেশা। এমনকি নারী লোকের চেয়েও বড় নেশা! সে কারণে বড় বড় মাছের রুপ ধরে গভীর জলের দিকে নিয়ে পানিতে চুবিয়ে মেরে দিতে পারে খারাপ জ্বীনেরা।

তা না হলে সেবার আতি তো মারায় যেতো। আমরা একসাথে আলোর মাছ বাইতে গেছি আতি, মোজাফফর সহ অনেকে। দেখি আতি বড় মাছের লোভে লোভে গভীর পানির দিকে চলে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলে আলীকে আতি বলছে দ্যাখ বিশাল একটা মাছ। আসলে তেমন কিছু ছিলো না। ওটা জ্বীনে ছোল ধরে আসছিলো।

আলোর মাছ বাইতে গেলে বাইম মাছ, ট্যাংরামাছ, শোলমাছসহ গোছা পানিতে মাঝে মাঝে জাপানি পুঁটি, সরপুঁটি পাওয়া যেত। বাবুকে আলী রাত্রের  খাবার খেতে খেতে কথাগুলো বলছিলো।

পদ্মবিলের বুকে বিরাট দুটি ঢিবি আছে যা আঞ্চলিক ভাষায় মাইদি নামে পরিচিত। আটাশি সালের বন্যা কিংবা দুই হাজার সালের পরবর্তীতে যে বন্যা আসছিলো চারিদিকে পানিতে ডুবে গিয়েছিলো কিন্তু ঢিবি দুটিতে কোনো পানি ওঠেনি।কারণ ওখানে নাকি একসময় পীর পয়গম্বরের বাস ছিলো।ঢিবি দুটি গহীন অন্ধকারে বিরাজমান থাকে।বিভিন্নরকম গাছগাছালির আড়ালে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারতো না মাইদির ভেতর। এখনো মাইদি দুটো অক্ষত আছে। শুধু গাছগাছালির অভয়ারণ্যে ফুরিয়ে গেছে। তবু আজো পাখপাখালির কিচিরমিচির শোনা যায়। শিয়াল, বেজি, সাপ সেখানে এখানো আছে।শুধু সেই সৌন্দর্যের প্রতীকটা আজ আর নেই।

যা-ই হোক বাবুর দূর থেকে অপলকভাবে তাকিয়ে দেখে সড়কের ধার থেকে। কালেভদ্রে সেখানে যায়  তার ছায়ায় হিমেল হাওয়ায় হৃদয় ভেজায়।

যে কথাটা না বললেই নয়, গৌরাঙ্গ ঘোষ নামে এলাকায় এক দাদা ছিলো বাবুর। তিনি অত্যন্ত ভদ্রলোক। মাস্টার্স শেষ করেছে দশ বছর হলো।ভগবান তার ভাগ্যে প্রত্যাশানুযায়ী কোন সরকারি চাকরি লেখেনি।তাই ভাগ্যকে পুঁজি করে এখন হোমিওপ্যাথি ঔষধ বিক্রি করে করে রিজিকের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। কিন্তু হৃদয়বিদারক ও রোমহষর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে বাবু অশ্রুসিক্ত নয়নে কপাল ভিজিয়েছে।গ্রামের কিছু শয়তান লোক তাকে পাগল বানিয়ে ফেলেছে। তিনার মাথার উপর দিয়ে নাকি সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইট উড়তে থাকে।দেশ বিদেশের বড় বড় মন্ত্রী-মিনিস্টার কে কি বলে সে বলে দিতে পারে! মানুষ এমন হয় ক্যানো? মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হলো কেমন করে??

একেক গ্রামের একেক মৌজা নাম্বার থাকে।ঠিক মৌজার শেষ প্রান্তে বৃটিশরা নাকি পিন পুতে রাখছিলো।যেটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে। পিনটি ছিলো কলার মোচাকৃতি। পিনটি বসানো হয়েছিলো চারটি কাচের বোতলের উপর যার নিচে ছিলো কয়লার স্তূপ।বজ্রপাত থেকে বিশেষত মুক্তি পাওয়া যেতো। কিন্তু আজ তার বিপরীত হচ্ছে।কারণ এখন আর সেই পিনগুলো নেই। কে কা কারা যেন মাঠ থেকে তুলে নিয়ে গেছে।

পদ্মবিলের দক্ষিণ পূর্বকোণে স্বাধীনতার সময় রাজাকার ক্যাম্প বসানো হয়েছিলো।সাধারণ মানুষগুলোকে যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল তাদের নির্বিচারে গুলি করে মেরেছে পাকিস্তানের গোলাম কিছু কুচক্রী রাজাকার সদস্যরা। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো দ্বীন মোহাম্মদ, আমিনুদ্দিন রাজাকার। তারা আজ আর নেই।মারা গেছেন।

কিন্তু আজো বাংলার আনাচে কানাচে হাজারো রাজাকার রয়ে গেছে যারা বেকারদের নিয়ে খেলছে।

সেই খেলার পাত্র হয়ে লাখ লাখ বাবু বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দিনযাপন করছে।প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন পাচ্ছে না।

আলী আজো স্বপ্ন দেখে তার বাবু একদিন তার স্বপ্ন ঠিক-ই পূরণ করবে।

[wpdevart_facebook_comment curent_url="http://yourdomain.com/page-url" order_type="social" title_text="Facebook Comment" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]