বিনিময় 

মুগ্ধতা.কম

১৩ মে, ২০২১ , ২:১২ পূর্বাহ্ণ ; 505 Views

বিনিময় - মুনেম শাহরিয়ার মাহিব

১.

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।দুঠৌঁটের মাঝে চেপে রাখা সিগারেটে একটা জোরে টান দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে।সানোয়ারদের ফাকলপুরের এই জায়গাটা অসাধারণ।লোকালয়ের ভেতরেই,তবে প্রকৃতির অদ্ভুত একটা টান আছে।সুবিধামত দামে পেয়ে ফার্ম হাউজটা কিনেছিলেন সানোয়ারের বাবা।ভার্সিটির সময়কার বন্ধু আমার সানোয়ার।এখন চাকরির সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায়।আশ্চর্যজনকভাবে এখনো ভালই যোগাযোগ আমার সাথে

ফেসবুক ইন্টারনেটের এই বোধয় একটা বড় সুবিধা।হৃদ্যতা নাই থাকুক,যোগাযোগ থাকে অন্তত।ফাকাই থাকে ফার্ম-হাউজটা।তবে এবার বেশ কিছুদিন থাকব শুনে সানোয়ার কিছুটা অবাক।কেয়ারটেকার জহির ছেলেটা সব ঠিকঠাক করে রাখে।পরেরদিনই চলে এলাম।

আসার আগে ঢাকার কাউকে জানিয়ে আসিনি।কতদিন থাকব নিজেও জানিনা।আগে ছুটি কাটাতে প্রায়ই আসতাম।এবার কোন ছুটি ছাড়াই চলে এলাম।

পেছন থেকে জহির ডাকল,

-দাদাভাই বাইরে থাকবেন না।শীতের বৃষ্টি।ঠান্ডা লেগে যাবে।চা দিয়েছি।ঘরে চলে আসুন।

আমি বল্লাম,আসছি।

আসলেই প্রচন্ড শীত করছে।বৃষ্টির পানি গায়ে কাটা দিচ্ছে।ভেতরে চলে এলাম।জহির টেবিলে চা,বিস্কুট দিয়েছে।টাওয়েল নিয়ে দাড়িয়ে আছে।জিজ্ঞেস করলাম,রাতের খাবার কি?

-দেশি মুরগি,পালং শাক আর সেদ্ধ ডিম আছে দাদাবাবু।

আমি আসার পর জহির ছেলেটা ব্যস্ত থাকে সারাদিন।প্রায় প্রতিবেলাই ভিন্ন ভিন্ন খাবারের জোগাড় করছে।বেপারটা ভালই উপভোগ করছি আমি।ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে চায়ের কাপটা হাতে নিলাম।পাশে রাখা সেলফোনে টুং করে একটা ম্যাসেজের শব্দ পেলাম।ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেজ নোটিফিকেশনে ক্লিক করলাম।মোবাইল স্ক্রিনে যা ভেসে উঠল তা দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম।

২.

গত একমাস যে আমি ঢাকায় নেই,নজরে এসেছে তাহলে বিন্তির।একবছর হয়ে গেল যোগাযোগ নেই আমাদের।দুজনেই খোঁজ রাখি দুজনের।যদিও কথা হয়না আর।

ছোট্ট ম্যাসেজ পাঠিয়েছে বিন্তি,

‘শৃঙ্খলদা,

ঢাকা কি ছেড়েই দিলেন নাকি?আমি কিন্তু আর পারছি না।লম্বা ছুটি নিয়ে নিয়েছি।আগামীকাল আসছি আপনার কাছে।খুব ঝগড়া করব।তাড়িয়ে দিলে চলে আসব।’

সেলফোনটা টেবিলে রেখে একটা সিগারেট জ্বালালাম।লাইটারের আগুনের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম,ঝাপসা লাগছে আগুনটা।চোখ ভিজে গেছে আমার।অসুস্থ শরীরের জন্যই বোধয়।এই শরীর নিয়ে আবেগ সহ্য করার শক্তি নেই আমার।

এরকমই কি হয়?আমি একজনকে ভীষণ চেয়েছিলাম।তার সবকিছু,তার সমস্ত।শুধুমাত্র তখন তার দায়িত্ব নেবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।চলে গিয়েছিল।

এতদিন পর,একটা বছর পর,আবার কেন ফিরতে চাইছে বিন্তি?যোগাযোগ টুকুও তো রাখেনি।কোন আশ্চর্য শক্তিতে কি বিন্তি বুঝতে পেরেছে,আমার মনে কি হয়?আমার মন যে চিরদিনের জন্য সবার থেকে ছুটি চায়।সে কি বুঝে নিল?

৩.

সকালবেলা নিজে বাজার করতে গেলাম।বাজার থেকে মুরগি কিনে এনেছিলাম।এর মধ্যে বিন্তির আরেকটা ম্যাসেজ পেয়েছি।সে বিকেলে আসবে।ঢাকা থেকে ফাকলপুরে বিকেলে পাঁচ টার পর গাড়ি আসে।আমি একটু তাড়াতাড়িই বাসস্টান্ডে চলে এসেছিলাম।

বাস আসল ছটার আগে আগে।বিন্তি নামল।ফাকলপুরের এই পড়ন্ত বিকেলের আকাশটা যেন ঝলমলিয়ে উঠল।ওকে যেন স্বাগত জানাচ্ছে পুরো পরিবেশটা।

বিন্তি প্রায় ছুটে এল আমার দিকে।ঠোঁটে এক ঝলক হাসি খেলে উঠল ওর।সাথে কেপে উঠল আমার পুরো শরীর।

-কী শীতরে বাবা।এখানে যখন আসতে পেরেছেন।হিমালয়ে গেলেই পারতেন।বেশ সাধু সন্নাসের একটা এক্সপিরিয়েন্স হত ভাল।

বিন্তির চোখে স্পষ্ট ছেলেমানুষি খেলা করছে।আমি বিনীত হাসি হেসে বল্লাম,চলো এগোনো যাক।ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে।বল্লাম,হাতে হাত রাখো,হাতটা গরম হবে।

বিন্তি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।তারপর বলল, না।

একটু পরে আস্তে করে বলল,

শৃঙ্খলদা,আমার সব শীতের দিনে আপনিই উষ্ণতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।এখন বোধয় আপনার ঠান্ডা হাতকে আমার উষ্ণ করার সময় এসে গেছে।আমার হাতে আপনার হাত রাখুন,বলে হাতটা বাড়িয়ে দিল বিন্তি।

অনেক দিন পর বিন্তির হাতে হাত রাখলাম।ভালবাসা বলতে কি বোঝায় আমি জানিনা।তবে অনেকদিন পর বিন্তির হাতের এই উষ্ণতা আমাকে এক অদ্ভুত ভাললাগায় মুড়িয়ে নিল।

মন্তব্য করুন