মজনুর রহমান

৯ মার্চ, ২০২১ , ১২:২৬ অপরাহ্ণ

আনিসুর রহমানের কবিতা: উপলব্ধি

শুনেছি, তোমার নাকি
গোলাপ ফুলের চাইত পলাশ ফুল বেশি পছন্দ;
মঞ্জুর করে রেখেছি,বাড়ির পেছনের জায়গাটাতে পলাশ ফুলের গাছ রোপণ করবো।

শুনেছি,তোমার নাকি
নিভৃতে সময় কেটে যায় সাগর কিংবা পাহাড়ে।
নৈশব্দ্যে প্রবুদ্ধ করে রেখেছি,
তোমার পথের সঙ্গী হয়ে
কবিদের মতো কথার স্বরে প্রমোদ দেবো তোমায়।

জেনেছি, তোমার নাকি
লোহমর্ষক মন নিয়ে
প্রতিদিন ভোরের রবি দেখতে ইচ্ছে করে।
কখনো বা ভোরে
রিক্ততার মন নিয়ে
আনাগোনা পাখিদের গান শুনতে ভালো লাগে।

জেনেছি, তোমার নাকি
অর্বাচীন যুগে এসেও চিঠি পড়ার সাধ জাগে।
সঙ্গে গল্প বলার মানুষ থাকলে,
আমন্ত্রণ করে রাখো কবিতা আবৃত্তি করতে।

জেনেছি, তোমার নাকি
বৃষ্টির দিনে,জীবনের আর্তনাদ
বৃষ্টির পানিতে,আর্দ্রতা করে রাখতে।

শুনেছি,তুমি নাকি
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় প্রেমিক খুঁজো।

আনিসুর রহমানের কবিতা: উপলব্ধি 2

মুগ্ধতা.কম

৯ মার্চ, ২০২১ , ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

পাঠকপ্রিয় লেখা: ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আমাদের ঘোষণা অনুসারে আজ প্রকাশ করা হচ্ছে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ এর সেরা পাঠকপ্রিয় তিনটি লেখা ও লেখকের নাম। পাঠকের পঠন, মতামত ও গুগলের হিসাব অনুসারে এই তালিকা করা হচ্ছে। প্রতি মাসেই তিনটি লেখা ও লেখকের নাম ঘোষণা করা হবে। মুগ্ধতায় লিখুন, লেখাটি ছড়িয়ে দিন চারদিকে।


ফেব্রুয়ারি, ২০২১ এর পাঠকপ্রিয় তিনটি লেখা ও লেখকের নাম:
১. একটি ফুলের গল্প (কবিতা), লেখক: আহমেদ অরণ্য
২. চোখ (গল্প), লেখক: ফেরদৌস রহমান পলাশ
৩. গুচ্ছ কবিতা (কবিতা), লেখক: দীন মোহাম্মদ উৎপল

সম্মানিত লেখকগণকে আন্তরিক অভিনন্দন। আপনাদের জন্য আমাদের উপহারসামগ্রী পৌঁছে যাবে আপনাদের ঠিকানায়।

পাঠকপ্রিয় লেখা: ফেব্রুয়ারি, ২০২১ 3
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস ২০২১
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি
পদাবলি

লেখক

উপন্যাস

লেখক

মুগ্ধতা.কম

১৬ মার্চ, ২০২০ , ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ছড়া পত্রিকা ছররা’র মোড়ক উন্মোচন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর শতবর্ষ উপলক্ষে রংপুরে ছড়া সাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা ছররা’র মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১৪ মার্চ শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ মিলনায়তনে ছররা’র মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ এর সাধারণ সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন, সাহিত্যের কাগজ মৌচাকের প্রধান উপদেষ্টা প্রাবন্ধিক রেজাউল করিম মুকুল, ইতিহাস সম্মিলন রংপুরের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মোঃ রফিক হাসনাইন, অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার শিরিন, শিল্পপতি ও সমাজসেবক রবিউল ইসলাম রবি। সভাপতিত্ব করেন ছররা’র সম্পাদক এস এম খলিল বাবু। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ছররা’র সহকারী সম্পাদক ডাঃ ফেরদৌস রহমান পলাশ। বক্তব্য দেন ছড়া সংসদ রংপুর এর সিনিয়র সহ-সভাপতি মতিয়ার রহমান, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ এর সাহিত্য সম্পাদক রানাা, বিভাগীয় লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জাকির আহমদ, হাই হাফিজ, এটিএম মোর্শেদ, অভিযাত্রিক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন, এস এম শহিদুল ইসলাম, এস এ অপু, বিলকিস, শ্রাবন বাঙ্গালী, বিমলেন্দু রায়। সঞ্চালনা করেন সোহানুর রহমান শাহিন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ছররা প্রকাশনার ২০ বছরে ছড়া ও ছড়া সাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। প্রকাশনাটির ধারাবাহিকতায় সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়।

মুগ্ধতা.কম

১৪ মার্চ, ২০২০ , ১২:৪৩ অপরাহ্ণ

ভুল

মেয়েটির চোখের পাতা যেন কিছুতেই নামতে চাইছে না, কেমন বেহায়া মেয়ে গো বাবা, এমন ভাবে কেউ অপরিচিত কারো দিকে তাকিয়ে থাকে নাকি? কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নাহ, ঠিক তেমনভাবে মনেও পড়ছে না যে, কোথায় দেখা হয়েছিল তার সাথে! আজকালকার মেয়েদের স্বভাবেই মনে হয় এমন! আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিকের দিকে ধাবিত হচ্ছে আর ইচ্ছেগুলিকে লালন করছে একা একা। আচ্ছা, সে কি আমাকে চেনে? নাকি এমন ভাবে দেখে দেখে চিনবার চেষ্টা করছে যে, গত জন্মে পাখি হয়ে এসেছিলাম আর সেই পাখির লালনকর্তা ছিল এই মেয়েটি। মাঝে মাঝে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উদাস হচ্ছে, যেন কতো কালের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সে।

অপরিচিত মানুষের এমন তাকিয়ে থাকা দেখে মাথাটা আরো ভন্ভন্ করতে থাকে রুদ্রের। রুদ্র, অবসরপ্রাপ্ত পিতার মধ্যবিত্ত পরিবারে মাস্টার্স করা বেকার ছেলে। চাকরি নামে হরিণের কস্তুরি খুঁজতে প্রতিনিয়ত ঢাকা যেতে হয় চিড়িয়াখানার টিকিট হাতে নিয়ে। নিরাশ হয়ে ফিরে আসে, আবার যায়, আবার…।

নিরাপত্তার জন্য বাসের চেয়ে ট্রেনে যাতায়ত করে বেশি, তাছাড়া ভাড়াও কম, এই আর কি। তবে বৃটিশ নিয়মের ভিতর আজো সময়কে বন্দি করে রেখেছে ট্রেন, অর্থাৎ দুই ঘণ্টা থেকে ট্রেনের অপেক্ষা। স্টেশনে ঝুলানো সময়সূচী মতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ছেড়ে যাবে ট্রেন কিন্তু রাত ন’টার কাঁটা ছুঁইছুঁই করছে ট্রেনের খবর নেই রংপুর স্টেশনে। প্লাটফার্মের পিলারের নিচে সানবাঁধানো গোল বেঞ্চে বসে আছে সেই মেয়েটি। এবার সে আরো গভীরভাবে তাকাতে শুরু করেছে। ভালো মতো লক্ষ্য করে দেখার জন্য চোখে চোখ রাখতেই চোখ ফিরিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে যায় মেয়েটি। সেই সুযোগে দূর থেকে ভালো করে দেখে নেয় রুদ্র। নাহ্ তার পাশে তেমন কাউকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যারা আছেন, তারা কেউ আপন বলে মনে হলো না। যে যার মতো যাত্রী হয়ে আপন খেয়ালে অপেক্ষা করছে ট্রেন আসার জন্য। বাদাম বিক্রেতা এসে রুদ্রের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে-‘স্যার বাদাম খাইমেন?’ ‘না’, সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে সামনের দিকে এগিয়ে যায় বাদাম বিক্রেতা। হঠাৎ করে বসে থাকা মানুষগুলো আড়মোড় ভেঙে উঠে দাঁড়াতে উদ্যাত, মনে হয় ট্রেন আসার খবর হয়েছে। রুদ্র নিজেও মানুষিকভাবে প্রস্তুতি নিতে নিতে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন বাবাজি চলে আসে স্টেশনে। অপেক্ষার প্রহর থেকে মুক্ত হয় যাত্রীরা। গোল বেঞ্চের দিকে এগিয়ে এসে চোখ আটকে যায় রুদ্রের। আর দেখা যাচ্ছে না মেয়েটিকে, মনে হয় বগির দিকে চলে গেছে। যাক বাঁচা গেল।

ট্রেনে উঠে নিজ সিটে কার যেন হাতব্যাগ লক্ষ্য করে রুদ্র। কোনো নারীর ব্যাগ নিশ্চয়ই। পাশের সিটে বসে মাথা নিচু করে মোবাইল ফোনে কারো সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে এক সুন্দরী মেয়ে। ‘ব্যাগ কার’, বাতাসে কথা ছুড়ে দিয়ে টিকিট হাতে রুদ্র আবার সিট নাম্বার মিলিয়ে নিশ্চিত হয়- এই সিটই হয়। কোনো সাড়া না পেয়ে আবার বলে- ‘ব্যাগ কার, এই সিটটা আমার’। মোবাইলের ভিতর থেকে আস্তে করে মাথা তুলতে তুলতে মেয়েটি বলে- ‘সরি, এটা আমার ব্যাগ’।

ব্যাগটি নিজের আয়ত্বে নিয়ে আবার ডুবে যায় মোবাইল মোহনায়। মেয়েটি তার মাথা পুরোটা তুলতেই অবাক হয়ে যায় রুদ্র। আরে, এ তো সেই মেয়ে! যে আমাকে নিরলস ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো প্লাটফর্মে। কি যে আবিস্কার করলো আমাথেকে এখনো তো বুঝতে পারিনি। তার উপর পাশের সিটে সিট পড়েছো ট্রেনের। জানিনা আজ কপালে কি আছে। আরো কতো কি যে আবিস্কার করবে আমায় দেখে দেখে। কবি, নাকি চিত্রশিল্পী। আমাকে দেখে দেখে কবিতা লিখবে- নাকি ছবি আঁকবার পাঁয়তারা! আমায় দেখে যদি তার মনে এমন মন-ভাবনা জাগে তাহলে অনায়াসে সে পাগল, নয়তো এই লাইনে নতুন এসেছে। কারণ, তার আবিস্কারের জন্য মনে হয় আমার মতো বেকার বালক যথেষ্ট নই। সিগন্যালম্যানের সবুজ পতাকার ইশারায় ট্রেন ছেড়ে দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। লোহার চাকাগুলো রেল লাইনের উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ঘুরতে শুরু করে। একটু একটু করে গতি বাড়ে, গতি বাড়তে বাড়তে দ্রুত চলতে থাকে ট্রেন।

‘হ্যালো বাবা। হ্যাঁ, বাবা তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছো না? বাবা এইমাত্র ট্রেন ছেড়েছে, আমি আসছি বাবা, না তেমন কোনো সমস্যা নেই, তুমি কোনো চিন্তা করবে না। রাখছি বাবা, ট্রেন থেকে নেমে তোমাকে ফোন দেবো।’ মেয়েটি তার বাবার সাথেই ফোনে কথা বলেছে বলে মনে করে রুদ্র। ছুটে চলা ট্রেনের সাথে সাথে ছুটছে গাছপালা খাল-বিল, ফসলি জমি। যেন ট্রেনের সাথে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে সব কিছুকে। ট্রেনের ভিতরে যার যার মতো আসনে বসে যাত্রীরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, কেউ পত্রিকা মেলে নিজেকে আড়াল করে নিজ মনে পত্রিকা পড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ ঝিমোচ্ছে অভ্যাসের বসবর্তী হয়ে। কারো কোলের সন্তানকে আঁচলের ভিতর মাথা ঢুকিয়ে দুগ্ধপান করাচ্ছেন মা।

কাকে যেন ভালোবেসে প্রায়শ্চিত্বের অন্ধকার গিলে খাচ্ছে চাঁদ। সম্ভবত আজ পূর্ণিমা। রুদ্রর পাশে বসে থাকা মেয়েটিও জানালা দিয়ে চাঁদের আলোয় বিচ্ছুরিত প্রকৃতির চলমান সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত। তার ছেড়ে দেয়া রেশমী দীঘল চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় নৃত্য করতে করতে রুদ্রর শরীর স্পর্শ করে। কথনো কখনো বেওয়ারিশ বাতাসে ওড়না উড়ে এসে ছুঁয়ে যায় মুখাবয়ব। রুদ্র এক প্রকার বিরক্ত বোধ করে। মেয়েটি জানালার বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে, রুদ্রের দিকে আড় চোখে তাকায় বারবার। অন্যমনস্ক রুদ্র বুঝতে পারে তাকেই দেখছে, কিছু বলে না, ধীরে ধীরে চিনবার চেষ্টা করে আবারো। হঠাৎ মেয়েটির হাত ফসকে মোবাইল ফোন পড়ে যায় সিটের নিচে। মোবাইল ফোন তুলতে নিচে ঝুঁকে পড়ে মেয়েটি। সিটের নিচে অস্পষ্ট আলোয় হাতড়াতে থাকে। মোবাইল ফোন খুঁজে না পেয়ে মাথা তোলে মেয়েটি, ’ইস্কুজমি, আমার মোবাইল ফোন হাত থেকে নিচে পড়ে গেছে, খুঁজে পাচ্ছি না, আপনার কাছে কি টর্চ হবে, অথবা এজাতীয় কিছু?’ মেয়েটির কণ্ঠে বেশ অনুযোগ। রুদ্র কোনো কথা না বলে মোবাইল ফোনের টর্চ জ¦ালিয়ে মেয়েটির মোবাইল ফোন খুঁজে দেয় সিটের নিচ থেকে। ‘ধন্যবাদ’ বলে মোবাইল হাতে নিয়ে মেয়েটি ঝুঁকে পড়ে মোবাইলের স্ক্রীনে। বেশ কিছুক্ষণ পর মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে সরাসরি রুদ্রকে প্রশ্ন করে বসে- ‘আপনি আজব মানুষ তো! সেই রংপুর স্টেশনের প্লাটফার্ম থেকে আপনাকে চিনবার চেষ্টা করছি, বারবার তাকাচ্ছিলাম আপনার চোখের দিকে অথচ কিছুতেই আপনার পরিচয় জানাতে আমাকে সাহায্য করছেন না’। হঠাৎ মেয়েটির এমন কথা শুনে হকচকিয়ে ওঠে রুদ্র।‘জ্বী, মানে, আমাকে বলছেন?’

‘জ্বী, আপনাকে বলছি। আপনি ছাড়া আমার পাশে আর কে আছে? দেখছেন না সামনের সিট দুটি খালি।’ চটপট জবাব দিয়ে আগের প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় থাকে মেয়েটি। রুদ্র পুরাই ‘থ’ হয়ে যায়। মেয়ে তো নয় যেন কাঁচালঙ্কা। তার পরও ভদ্রতার খাতিরে পরিচয়টুকু দেবার কথা ভাবে, ‘আমি রুদ্র, রংপুর শহরে থাকি, ঢাকায় যাচ্ছি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে। আপনি আমাকে চিনবার চেষ্টা করছেন! কেন, বলবেন কি?’

‘কেনো আবার, মনে হলো কোথায় যেনো দেখেছিলাম, তাই আবিস্কার করার চেষ্টা, এই আর কি। আবার কাকতলীয় ভাবে পাশাপাশি সিটও মিলে গেছে। কোথায় দেখেছি ঠিক মনে করতে পাচ্ছিনা। মেয়েটির কথা শুনে হতবাক রুদ্র- ‘আপনি বলবেন কি? আপনাকে কোথায় দেখেছিলাম? কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনতে পাচ্ছিনা আর ভাবছিও না, যে কোথায় আমাকে দেখেছেন।’ কারণ আপনার ভাবনা আপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ভাবতে থাবেন, আমি আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারছি না।’ রুদ্র একটানা কথাগুলো বলে চাঁদের আলো দেখতে দৃষ্টি নিয়ে নিয়ে যায় জানালার বাইরে।

‘আপনি তো আজব লোক জনাব!

‘কেনো?’ এবার সরাসারি মেয়েটির দিকে তাকায় রুদ্র।

‘কেনো আবার, জানতেও চাইলেন না আমি কে, কোথা থেকে এসেছি কোথায় যাবো, কি করি। আপনি জানতে না চাইলেও আমাকে বলতে হবে কারণ, আপনি যেহেতু আপনার পরিচয়টা বলেছেন। ‘আমি নিশীথা, ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ি, বাড়ি ঢাকাতেই, রংপুর এসেছিলাম আপার বাসায় বেড়াতে।’ নিজ থেকে কথাগুলো বলে রুদ্রকে।

মেয়েটির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ব্যাঙ্গ করে রুদ্র বলে- ‘আজ চলে যাচ্ছেন, তাই তো? আর কিছু বলার আছে আপনার?’

‘হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। দেখুন, পাশাপাশি সিটে বসে যেহেতু ঢাকা পর্যন্ত যেতে হবে, সেহেতু মাঝপথে ছোট্ট করে একটা বন্ধুত্ব করাই যায়, কী বলেন? জার্নি বাই ফ্রেন্ডস। তাছাড়া সেই সময়ের মধ্যে যদি আপনাকে চিনে ফেলতে পারি, তাহলে তো আরো ভালো। তাই নয় কী?’

মেয়েটি, অর্থাৎ নিশীথার কথা শুনে রুদ্রের মনে হলো- এতো করে যখন বলছে, তাছাড়া যদি বের করা যায় যে, নিশীথা সত্যিই কারো সাথে আমাকে মিলানো বৃথা চেষ্টা করছে। ‘আচ্ছা নী- মানে…’

‘নিশীথা, আপনি আমার নাম ধরে ডাকতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই। বলুন কি বলতে চাইছেন।’

‘আসলে যদি খোলাখুলি ভাবে বলতেন- কার খোঁজে আমাকে রিমান্ডে নিলেন? কে সেই মহাপুরুষ, কি নাম তার, কোথায় থাকেন, কি করেন, কবে-কোথায় তাকে দেখেছেন, কিভাবে হারিয়ে ফেলেছেন, কথা হয়েছে কি না, কথা হলে- কি ধরনের কথা বলেছেন এবং কেনো খুঁজতে চাইছেন তাকে। আচ্ছা, আপনি কি তার প্রেমে পড়েছিলেন?’ ‘কেনো বলুন তো’, প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় নিশীথা। ‘না, বলতে চাইছিলাম আপনার সেই মানুষকে চিনছেন না কেনো ।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, সেবার চট্টগ্রাম মামার বাসা থেকে ফেরার সময় ট্রেনে আপনার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। কথা হয়েছিল, কতোভাবে আমাকে জেনে নিলেন, বগিতে আলো কম থাকার কারণে ঠিক মতো আপনাকে মনে রাখতে পারিনি, তবে কথা বলার ভঙ্গি, বাড়ি ঠিকানা, বেকার, চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটছেন দিগি¦দিক, আপনার শহরে এলে দেখা করতে বলেছিলেন, আবার ঢাকায় আমার সাথে দেখা করার জন্য কথা দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবসতঃ সেদিন আপনার নামটা আমার জানা হয়নি, তার আগেই তো ট্রেন লইনচ্যুত হয়ে আমাদের বগিসহ চারটি বগি উল্টে গিয়েছিল, সেই যে হারিয়ে গেলেন আর খোঁজ পেলাম না আপনার। সেই থেকে অনেক অনেক খুঁজেছি আপনাকে। দুর্ঘটনায় আপনার কিছু হলো কিনা তা জানার জন্য। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি। আর আজ কাকতলীয় ভাবে পেয়ে গেলোম আপনাকে। প্রকৃতির কি এক মায়ার খেলায় হারিয়ে যাবার আড়াই বছর পর আপনাকে পেলাম ষ্টেশনের প্লাটফার্মে। আবার একই ট্রেনে পাশাপাশি যাত্রী হয়ে ঢাকা যাচ্ছি। আপনি যাচ্ছেন চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে আর আমি যাচ্ছি বাসায়, কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না?’ রুদ্রের দিকে না তাকিয়ে খুব সহজ ভাবে ফিরিস্তি দিয়ে গেলো নিশীথা, যেন হারিয়ে যাওয়া কতো আপন মানুষকে খুঁজে পেয়েছে। তাকে কিভাবে বোঝাবো যে, তার গল্পের চরিত্রে এই রুদ্র ছিল না। তবুও পরিষ্কার করা দরকার। নিশিথাকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়ে যায় রুদ্র। ‘দেখুন আপনি কোথাও ভুল করছেন হয়তো। সেই ভুল থেকে ভুলভাল বলে যাচ্ছেন, তাও আবার আমাকে নিয়ে। আপনার নাম না জানা সেই মানুষ আসলে আমি নই। আমি তো আপনার সাথে কেনো- কোনো নারীর সাথে একই ট্রেনে করে পাশাপাশি বসে যাত্রা করিনি। কখনো ট্রেন দুর্ঘটনায় পরিনি, আর সব চেয়ে বড় কথা হলো, আমার জীবনে আমি কখনো চট্টগ্রাম যাইনি। এবার বুঝতে পেরেছেন?’

‘দেখুন আমার কোনো ভুল হচ্ছে না, ভুল আপনি করছেন রুদ্র। যে স্মৃতি আড়াই বছর থেকে বয়ে নিয়ে চলছি তা কেমন করে ভুল হয়। তাছাড়া আমি তো আপনার কাছে অধিকার নিয়ে আসিনি যে, আপনার সেই দিনের কথা মতো আমাকে গ্রহণ করতেই হবে। আপনি বলেছিলেন সম্পর্ক করা যায় কিনা, আমি ভবতে চেয়েছি, ক্যাম্পাসে দেখা করতে চেয়েও দেখা করেননি। ট্রেন দুর্ঘটনার পর আপনাকে না দেখে ভেবেছিলাম…। তারপর অপেক্ষা করেছি, এই বুঝি পিছন থেকে কেউ নিশীথা বলে ডাক দিয়ে বলবে- আমি সেই, ট্রেনে পরিচয় হয়েছিল! কিন্ত না, আজ আপনি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসলেন! যাক, আপনাকে দেখলাম, আপনি বেঁচে আছেন, ভালো আছেন তাতেই আমি তৃপ্ত’। বলেই দু’হতে মুখ লুকিয়ে ফোঁপতে থাকে নিশীথা।

রুদ্র এবার বাকরুদ্ধ। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে যায় তার। হাসবে না কাঁদবে তারও হিসাব ঠিক মিলাতে পারে না। ‘নিশীথা, আপনি শান্ত হোন প্লীজ, আমি কথা দিচ্ছি ঢাকায় আমার চাকরিটা হয়ে গেলে নাম না জানা আপনার সেই লোকটিকে খুঁজে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করবো। আমাকে নিয়ে অযথা ভুল ভাবনায় নিজেকে আর জড়াবেন না। আমি অত্যন্ত নিরীহ এবং অবসরপ্রাপ্ত বাবার বেকার ছেলে।’

কথাগুলো বলে জনালার বাইরে ছুড়ে দেয় আপন দৃষ্টি। চাঁদ ঢলতে শুরু করেছে তার ঝলকিত আলো বিলিয়ে দিয়ে। আগের মতো আলো আর দেখা যাচ্ছে না, বাইরের রূপ-সৌন্দর্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে আসছে, বনভূমিতে নেমে আসতে চাইছে অন্ধকারের থাবা, ভোর হয়ে আসার পাঁয়তারা চালায় নির্ঘুম রাত। হালকা বাতাস ঢুকছে জানালা ভেদ করে, সেই বাতাস থেকে একটু একটু ঠণ্ডা বোধ হতে থাকে রুদ্রের, তাই জানালা বন্ধ করে দিয়ে নিশীথার দিকে তাকায়, এখনো ঠিক আগের মতো দু’হাতে মুখ ঢেকে সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমার কথায় মনে হয় বেশি কষ্ট পেয়েছে মেয়েটি। হঠাৎ নিশীথার মোবাইল থেকে রিংটোন বেজে উঠে, তড়িঘড়ি করে সাইটব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে রিসিভ করে, জড়ানো কণ্ঠে কথা বলার ধরণ শুনে মনে হলো, তার বাবা ফোন করেছে। হয়তো কোথায় আছে তার কুশলাদি জানার জন্যই ফোন করে থাকতে পারে। তবে পথ যে আর বেশি নেই জানালা খুলে বাইরে দেখে তার বাবাকে জানান দেয়ার মাধ্যমে বুঝতে কষ্টহলো না।

নিশীথা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। ছুটে চলা ট্রেনের ভিতর ডালিম ফোটা ভোরের কুশমিত আলো ফেলেছে নতুন সূর্য। হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনের গতি একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। আবারও হুইসেল। দীর্ঘ যাত্রা শেষ করে কমলাপুর রেল ষ্টেশনে প্রবেশ করে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি। ততক্ষণে আড়মোড় ভেঙেছে অনেক যাত্রী। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে নিশীথা। তার চোখ দুটি ফুলে উঠেছে, হয়তো রাত জেগে ট্রেনে জার্নি করার কারণে হতে পারে হয়তো, নয়তো ভুলের ভারে কেঁদেছে কিছু সময়। রুদ্র প্রস্তুতি নিতে নিতে নিশীথা কোনো কথা না বলে কানে ফোন লাগিয়ে হন্ হন্ করে নেমে যায় ট্রেন থেকে।

নিশীথার পিছু নিয়ে ষ্টেশনের প্লাটফার্মে নেমে আসে রুদ্র। ততক্ষণে এক বয়ষ্ক ভদ্রলোকের পাশে দাঁড়িয়েছে নিশীথা। রুদ্রকে দেখে রেগে যায়, বলে- ‘আপনি, এই আপনি একটা স্বার্থপর মানুষ, মানুষকে মূল্যায়ন করতে জানেন না। এতোদিন পর দেখেও আমাকে সারাসরি অস্বীকার করেছেন। আপনি কথা দিয়ে কথা রাখেননি, উল্টো আমাকে টেনশনে রেখেছেন আড়াই বছর থেকে। বাবা, এই সেই ছেলে। ট্রেন দুর্ঘটনার পর থেকে যাকে অনেক খুঁজেছি, এই ছেলেকেই খুঁজে দিতে বলেছিলাম তোমাকে। আজ ট্রেনে দেখা হবার পর সে বলছে, সে নাকি আমাকে চেনেই না’। নিশ্চুপ রুদ্রের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, ভদ্রলোকেই নিশীথার বাবা। মেয়ের কথা শুনে ভদ্রলোক মুখখোলেন। ‘আপনি কে বাবা? কি হয়েছে নিশীথার সাথে, নিশীথা আমারই মেয়ে।’

‘আমি রুদ্র, রংপুর থেকে চাকরির পরীক্ষা দিতে এসেছি, তাকে আমি কখনো দেখিনি কিংবা নাম পর্যন্ত জানতাম না, অথচ কার সাথে যেন বর্ণনায় মিলিয়ে আমাকে জড়ালেন, আমি খুবই বিব্রত বোধ করেছি’।

‘দেখেন বাবা, আমি সব বুঝতে পেরেছি, আপনার সাথে এমন করাটা মোটেও ঠিক হয়নি। মেয়েটা আমার এমন ছিলো না, পড়াশুনায় অনেক ভালো ছিল। সেবার ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হবার এক সপ্তাহ পরে, অর্থাৎ দেড় বছর আগে প্রচন্ড জ্বর হয়েছিল, প্রতিদিন নিয়ম মতো ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর কিছুতেই নামছিলো না, সপ্তাহ পেরিয়ে দশদিন যায় অথচ জ্বর কমানোর কোনো নাম নেই, বড় ডাক্তার দেখিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করার পর টাইফয়েড ধরা পরে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।’ বাবার কথাগুলো শুনে নিশীথা চুপসে যেতে থাকে ঘঁষা খাওয়া বেলুনের মতো। রুদ্র মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে বলে- ‘তারপর’। ‘তারপর সব শেষ। তারপর, মাথায় আঘাত হানে টাইফয়েড। সেই থেকে মাথা এলোমোলো। যখন মনে যা আসে তাই বলে, তখন তাই করে। তবে সব কিছুই গুছিয়ে বলতে পারে- করতে পারে,। যেখানে যাবে সেখানকার গল্পই সে তৈরি করে বলতে পারে। অপরিচিত কারো বুঝবার উপায় নেই যে, সে এমন রোগ বহন করে চলছে দীর্ঘদিন থেকে। আর এই এলোমেলো মাঝেমাঝে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। অল্প কিছু দিনের জন্য আবার আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, কিন্তু তখন আগের কোনো কিছু মনে করতে পারেনা। অনেক চিকিৎসা করানোর পরও কোনো কাজ হয়নি। পথে আপনাকে এমন বিভ্রান্ত করার জন্য সত্যি আমি লজ্জিত। ওর হয়ে আপনার কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’ চোখ বেয়ে জল নেমে আসতে চাইছে ভদ্রলোক- অর্থাৎ নিশীথার বাবার। ‘না, না ঠিক আছে, ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। তাছাড়া সবই যখন জানলাম, তখন দুঃখিত হওয়া ছাড়া আমারই বা আর কি করার আছে।’ বাবা পারলে পাগল মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিবেন।’ বলে নিশীথার হাত ধরে প্লাটফার্মের বাইরে বড় রাস্তার দিকে পা বাড়ায় দু’জনে। তাদের দিকে অপলক তাকিয়ে চলে যাওয়া দেখে রুদ্র। দেখতে দেখতে এক সময় রাজধানীর হাজরো মানুষের ভীরে মিলিয়ে যায় তারা।

গল্পঃ ভুল

মুগ্ধতা.কম

১৩ মার্চ, ২০২০ , ১২:৩৩ অপরাহ্ণ

শিশুদের সর্দি কাশি

ফাগুন আকাশে বাতাসে। রং এ সেজেছে প্রকৃতি। শীত চলে যেতে গিয়েও ফিরে তাকাচ্ছে শীতল পরশ নিয়ে। দিনে মৃদু গরম রাতে শীত। আবহাওয়া পরিবতনের সাথে সাথে শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা যায়। বড়রা আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও শিশুরা পারে না। আবহাওয়া পরিবর্তন জনিত একটি রোগ হলো শিশুদের সর্দি কাশি। যদিও সারাবছর ভাইরাসজনিত এ রোগ হয় তবুও বসন্তের শুরুতে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের বাবা-মা ডাক্তারের চেম্বারে ভীড় করে। আর বর্তমানে করনা আতংকে সবাই আতংকিত। তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে করনায় সাধারণতঃ সর্দি হয় না। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্বারা যদি শিশু আক্রান্ত হয় তবে শুরুতে জ্বর সাথে নাক দিয়ে পানি পরে কাশি হয়। অনেকসময় জ্বর-সর্দি কাশি একসাথেই চলতে থাকে। জ্বর অনেকসময় ১০৩ডিগ্রী পযন্ত হয়। শিশু খেতে চায় না। সারাক্ষণ বিরক্ত আর কান্না করে। মায়েরা এসে বলে আমার বাবু কাশির জন্য সারারাত ঘুমাতে পারে না। কাশতে কাশতে দম বন্ধ হয়ে আসে।

চিকিৎসা :
সাধারণ সর্দি কাশির জন্য তেমন কোন চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। ভাইরাসজনিত এ কাশি ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। শিশুরর জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়াতে হবে,জ্বর বেশী হলে কুসুম গরম পানিদ্বারা শরীর মুছিয়ে দিতে হবে।সর্দির জন্য নাক পরিস্কার রাখার জন্য বাজারে solo,norsol নামক নাকের ড্রপ পাওয়া যায়,যা দ্বারা কটনবাডের সাহায্যে নাক পরিস্কার করে দিতে হয়। কাশির জন্য লাল চা,আদা চা,মধু,তুলসীপাতার রস বেশ উপকার দেয়। মনে রাখতে হবে, সাধারণ সর্দি কাশির জন্য অযথা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে কোন লাভ নেই। বাজারে কাশির সিরাপ পাওয়া যায় সেসব কখনই দেয়া যাবে না। এসব কাশির সিরাপ শিশুর মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। ঘরের সাধারণ যত্নই শিশুকে সুস্হ্য করে তোলে।

 

ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ

সহযোগী অধ্যাপক, প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর।

চেম্বার: প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর। সিরিয়াল: 01723672651

বদরগঞ্জ চেম্বার: হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বদরগঞ্জ, রংপুর।

 

শিশুদের সর্দি কাশি 21

মুগ্ধতা.কম

১২ মার্চ, ২০২০ , ৩:৩৫ অপরাহ্ণ

করোনাভাইরাস: ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে গেলেন

বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কোয়ারেন্টিনে আছেন বলে নানা সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে।

এর আগে নিশ্চিত করা হয়েছে রোনালদোর ক্লাব জুভেন্তাসের সতীর্থ ডেনিয়েল রুগানির করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে।

রুগানি, ক্লাব ও দেশ ইতালির হয়ে রক্ষণভাগে খেলেন।

জুভেন্তাসের ওয়েবসাইট নিশ্চিত করেছে ৩৫ বছর বয়সী রোনালদো তার জন্মস্থানে অবস্থান করছে।

করোনাভাইরাস: ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে গেলেন 22

জুভেন্তাস ওয়েবসাইট বলছে, “বর্তমানে যে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা চলছে তা বিবেচনায় এনে রোনালদো স্বেচ্ছায় মাদেইরায় অবস্থান করছেন।”

মূলত ঝুঁকি কমানোর জন্যই রোনালদোর এই অবস্থান।

ফুটবলের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট গোল ডট কম বলছে, জুভেন্তাস অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রোনালদো যোগ দেননি।

করোনাভাইরাস যাতে সংক্রমণ না হয় সেজন্যই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছেন রোনালদো।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রেয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্তাসে খেলেছেন রোনালদো

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রেয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্তাসে খেলেছেন রোনালদো

সম্প্রতি রোনালদোর মা স্ট্রোক করার পর তাকে দেখতে যান এই পর্তুগিজ তারকা। এরপর সরাসরি পর্তুগালে নিজের বাড়ি মাদেইরায় যান রোনালদো।

সোমবার ইতালিয়ান লিগ বন্ধ ঘোষণার আগে রোববার ইন্টার মিলানের বিপক্ষে একটি ম্যাচে জুভেন্তাস ২-০ গোলের জয় পায়। এই ম্যাচটিতে রোনালদো ও রুগানি একই ড্রেসিং রুমে ছিলেন।

রুগানি অবশ্য ওই ম্যাচে মাঠে নামেননি।

করোনাভাইরাস: ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে গেলেন 23

জার্মানির হ্যানোভারের ডিফেন্ডার টিমো হুবার্সের পর দ্বিতীয় পেশাদার ফুটবলার হিসেবে রুগানির করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে।

নিজের টুইটার পাতায় রুগানি লেখেন, “আপনারা খবরে জেনে থাকবেন কী হয়েছে, আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি ভালো আছি।”

সবাইকে নিয়ম মানার আহ্বান জানিয়ে রুগানি বলেন, “আমরা নিজেদের ও কাছের মানুষদের জন্য সচেতন থাকি।”

করোনাভাইরাসের কারণে আগামী তেসরা এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের ক্রীড়া ইভেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি।

দেশটির সরকার আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, শীর্ষ ফুটবল প্রতিযোগিতাসহ সব ধরনের ক্রীড়া ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে খালি মাঠে।

Banner image reading 'more about coronavirus'

করোনা ভাইরাস: রক্ষা কবচ নিজের কাছে

নভেল করোনা ভাইরাসঃ নিজেকে ও অন্যকে সুরক্ষিত রাখার উপায়

করোনা ভাইরাস: যা জানতেই হবে

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত, জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ

Banner

ক্রীড়াঙ্গণে করোনাভাইরাসের প্রভাব

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই ও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের মধ্যকার ম্যাচটিতে দর্শক ছিল না গত রাতে, তবে প্যারিসে পিএসজির ২-০ গোলে জয়ের পর প্রচুর মানুষ পার্ক দে প্রিন্সেসে জড়ো হয়ে উল্লাস করে।

আজ রাতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, রেঞ্জার্সের ইউরোপা লিগের ম্যাচগুলো দর্শক ছাড়াই আয়োজিত হবে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ ওলে গুনার সোলশার বলছেন, এবার যদি মৌসুমের সব ম্যাচ না হয় তবে সেটাও বোধগম্য হবে।

স্প্যানিশ ফুটবল লিগের সকল খেলা আগামী দুই সপ্তাহের জন্য দর্শক ছাড়া খেলা হবে বলে মঙ্গলবার জানা গেছে।

২০২০ সালের ইউরোর প্লে অফের টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে।

 

সৌজন্যেঃ বিবিসি বাংলা

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রেয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্তাসে খেলেছেন রোনালদো

মুগ্ধতা.কম

১১ মার্চ, ২০২০ , ৬:২৩ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস: যা জানতেই হবে

আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে এটা প্রায় সকলেই জেনে গেছেন। এখন প্রশ্ন হলো এটা নিয়ে আমাদের কতটুকু চিন্তিত হওয়া উচিত এবং প্রতিরোধ করার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া দরকার এবং আমাদের লাইফস্টাইলটা কেমন হলে আমরা করোনা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হব ইন শা আল্লাহ্ঃ

১. আমাদের প্রথম কাজ হলো এটা নিয়ে গুজব না ছড়ানো, অতিরিক্ত আতংকিত না হওয়া। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র ১-২%। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অন্যান্য অনেক রোগ আছে যেসবের মৃত্যুর হার করোনার চেয়ে বেশি। সুতরাং উল্টোপাল্টা গুজব না ছড়িয়ে ধৈর্য ধরে ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. করোনা ভাইরাস আকৃতিতে বড়। এটা সাধারণত বাতাসে ভাসে না৷ তাই বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর সম্ভাবনা কম৷ এটা মূলত ছড়ায় Droplet তথা হাঁচি, কাশি, সর্দির মাধ্যমে। এ কারণে আমাদের যতটা না মাস্ক ব্যবহার করা দরকার তার চেয়ে বেশি দরকার হাত ধোয়া। মাস্ক ব্যবহার করতে গিয়ে আবার হিতে বিপরীত হতে পারে৷ কারণ বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানে না। আমাদের উচিত বারবার হাত ধোয়া, খাবার আগে, টয়লেটের পরে, সন্দেহজনক কিছু ধরার পরে। মোট কথা যত বেশি পারা যায় হাত ধোয়া।

৩. বেশি বেশি ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাওয়া যেমনঃ আমলকি, লেবু, কাঁচা মরিচ ইত্যাদি। চায়নাতে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা করার জন্য শিরাপথে ভিটামিন সি ব্যবহার করে বেশ ভালো রেজাল্ট পাওয়া গেছে।
রেফারেন্সঃ
https://clinicaltrials.gov/ct2/show/NCT04264533

ভিটামিন সি শরীরে প্রদাহ কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এতে প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে৷ তাই বেশি করে ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খান।

৪. ফাস্টিং তথা না খেয়ে থাকা। আমরা অনেকেই জানি ফাস্টিং আমাদের ইমিউনিটি তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আমাদের উচিত বেশি বেশি ফাস্টিং করা এতে করোনা ভাইরাস আমাদের আক্রমণ করার সুযোগ পাবে না ইন শা আল্লাহ্।

৫. যাদের অন্য রোগ আছে যেমনঃ ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, এজমা ইত্যাদি এবং যারা বয়স্ক তাদের অধিক সতর্ক থাকতে হবে। করোনা সাধারণত এনাদেরই বেশি আক্রমণ করে৷ কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, খুব সতর্ক থাকবেন।

আরো পড়ুনঃ করোনা ভাইরাস: রক্ষা কবচ নিজের কাছে

৬. রোগ দেয়ার মালিক আল্লাহ্, সুস্থ করার মালিকও তিনিই৷ তাই আমাদের সবচেয়ে জরুরী যে কাজ তা হলো আল্লাহর কাছে দুয়া করা৷ তিনি যেন এই মহামারী থেকে আমাদের রক্ষা করেন।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু গুলার মতই। জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি। এই লক্ষণগুলো যদি দেখা দেয় তাহলে প্রথমে ধৈর্য ধরে সাধারণ ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে। ৭-১০ দিন পরেও যদি ভাল না হয় এবং যদি শ্বাসকষ্ট সহ রোগের অবনতি হয় তবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে পরীক্ষা করার জন্য IEDCR এ যোগাযোগ করতে হবে। রোগীগণ নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

মাস্ক ব্যবহার প্রসঙ্গে

করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে আসার পর হুট করে মাস্কের দাম বেড়ে গেছে। ১৫০ টাকায় যে বক্স বিক্রি হত তা এখন ১৫০০-২০০০ টাকা! কিন্তু করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে আসলেই কি মাস্ক পরার প্রয়োজন আছে?

করোনা ভাইরাস একটি বড় আকৃতির ভাইরাস। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। এটা ছড়ায় respiratory droplets অর্থাৎ হাঁচি, কাশি, সর্দি ইত্যাদির মাধ্যমে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কারো এই ড্রপলেটগুলোর সাথে আপনারা যদি সরাসরি কন্টাক্টে আসেন তথা স্পর্শ করেন তখন আপনার শরীরে এই ভাইরাস ঢুকতে পারে।

World Health Organisation (WHO) এর গাইডলাইন অনুযায়ী কোনো সুস্থ মানুষের করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কোনো মাস্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। তাহলে মাস্ক কারা ব্যবহার করবে? যারা অসুস্থ হয়েছেন তারা। যাদের সর্দি, কাশি, হাঁচি হচ্ছে তারা মাস্ক পরে থাকবেন যেন এগুলো বাইরে না ছড়ায়৷ হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় টিস্যু ব্যবহার করা উচিত৷

কিন্তু টিস্যু যদি না থাকে তখন কী করবেন? আপনার হাতের কনুই ব্যবহার করবেন। হাত ভাঁজ করে কনুইটা মুখের কাছে এনে তারপর হাঁচি বা কাশি দিবেন। হাতের মধ্যে দিবেন না কিন্তু!

সুতরাং করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই৷ বরং পরিষ্কার পানি দিয়ে বারবার হাত ধুয়ে নিন ও প্রচুর ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খান।

এছাড়া আরও কিছু নরমাল এটিকেট মেনে চলা দরকারঃ

১. কারো জ্বর, সর্দি, কাশি হলে সেটা সাধারণ ফ্লু ই হোক না কেন সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাসা থেকে বের হবেন না।
২. কোনো ব্যক্তির যদি হাঁচি, কাশি থাকে তার থেকে তিন ফিট বা ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখুন।
৩. যত বেশি পারা যায় হাত ধুয়ে নিন। প্রতিবার নামাজ পড়ার আগে ওযু করার চেষ্টা করুন।
৪. কোনো রকম গুজবে কান দিবেন না। কোনো জড় পদার্থের উপর করোনা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না৷ তাই চীন বা করোনা আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আনা কোনো জিনিস ব্যবহার করাতে কোনো সমস্যা নেই। রসুন খাওয়া শরীরের জন্য ভালো। তবে রসুন, করোনা প্রতিরোধে তেমন কিছু করতে পারে না।

নিজে জানুন, অন্যকে জানান। ভয় পাবেন না, ভরসা রাখুন আল্লাহর উপর।

আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের করোনার আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন।

 

প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন আইইইডিসিআর এর সাথে

IEEDCR

 

ডা. শাফায়াত হোসেন লিমন

চিকিৎসক, লাইফ স্টাইল মডিফায়ার।

ফেসবুক পেজ: fb.com/dr.shafayat.hossen.limon

করোনা ভাইরাস: যা জানতেই হবে

মুগ্ধতা.কম

১১ মার্চ, ২০২০ , ৫:৫৯ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস: যা জানতেই হবে

আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে এটা প্রায় সকলেই জেনে গেছেন। এখন প্রশ্ন হলো এটা নিয়ে আমাদের কতটুকু চিন্তিত হওয়া উচিত এবং প্রতিরোধ করার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া দরকার এবং আমাদের লাইফস্টাইলটা কেমন হলে আমরা করোনা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হব ইন শা আল্লাহ্ঃ

১. আমাদের প্রথম কাজ হলো এটা নিয়ে গুজব না ছড়ানো, অতিরিক্ত আতংকিত না হওয়া। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র ১-২%। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অন্যান্য অনেক রোগ আছে যেসবের মৃত্যুর হার করোনার চেয়ে বেশি। সুতরাং উল্টোপাল্টা গুজব না ছড়িয়ে ধৈর্য ধরে ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. করোনা ভাইরাস আকৃতিতে বড়। এটা সাধারণত বাতাসে ভাসে না৷ তাই বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর সম্ভাবনা কম৷ এটা মূলত ছড়ায় Droplet তথা হাঁচি, কাশি, সর্দির মাধ্যমে। এ কারণে আমাদের যতটা না মাস্ক ব্যবহার করা দরকার তার চেয়ে বেশি দরকার হাত ধোয়া। মাস্ক ব্যবহার করতে গিয়ে আবার হিতে বিপরীত হতে পারে৷ কারণ বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানে না। আমাদের উচিত বারবার হাত ধোয়া, খাবার আগে, টয়লেটের পরে, সন্দেহজনক কিছু ধরার পরে। মোট কথা যত বেশি পারা যায় হাত ধোয়া।

৩. বেশি বেশি ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাওয়া যেমনঃ আমলকি, লেবু, কাঁচা মরিচ ইত্যাদি। চায়নাতে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা করার জন্য শিরাপথে ভিটামিন সি ব্যবহার করে বেশ ভালো রেজাল্ট পাওয়া গেছে।
রেফারেন্সঃ
https://clinicaltrials.gov/ct2/show/NCT04264533

ভিটামিন সি শরীরে প্রদাহ কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এতে প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে৷ তাই বেশি করে ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খান।

৪. ফাস্টিং তথা না খেয়ে থাকা। আমরা অনেকেই জানি ফাস্টিং আমাদের ইমিউনিটি তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আমাদের উচিত বেশি বেশি ফাস্টিং করা এতে করোনা ভাইরাস আমাদের আক্রমণ করার সুযোগ পাবে না ইন শা আল্লাহ্।

৫. যাদের অন্য রোগ আছে যেমনঃ ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, এজমা ইত্যাদি এবং যারা বয়স্ক তাদের অধিক সতর্ক থাকতে হবে। করোনা সাধারণত এনাদেরই বেশি আক্রমণ করে৷ কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, খুব সতর্ক থাকবেন।

আরো পড়ুনঃ করোনা ভাইরাস: রক্ষা কবচ নিজের কাছে

৬. রোগ দেয়ার মালিক আল্লাহ্, সুস্থ করার মালিকও তিনিই৷ তাই আমাদের সবচেয়ে জরুরী যে কাজ তা হলো আল্লাহর কাছে দুয়া করা৷ তিনি যেন এই মহামারী থেকে আমাদের রক্ষা করেন।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু গুলার মতই। জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি। এই লক্ষণগুলো যদি দেখা দেয় তাহলে প্রথমে ধৈর্য ধরে সাধারণ ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে। ৭-১০ দিন পরেও যদি ভাল না হয় এবং যদি শ্বাসকষ্ট সহ রোগের অবনতি হয় তবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে পরীক্ষা করার জন্য IEDCR এ যোগাযোগ করতে হবে। রোগীগণ নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

মাস্ক ব্যবহার প্রসঙ্গে

করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে আসার পর হুট করে মাস্কের দাম বেড়ে গেছে। ১৫০ টাকায় যে বক্স বিক্রি হত তা এখন ১৫০০-২০০০ টাকা! কিন্তু করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে আসলেই কি মাস্ক পরার প্রয়োজন আছে?

করোনা ভাইরাস একটি বড় আকৃতির ভাইরাস। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। এটা ছড়ায় respiratory droplets অর্থাৎ হাঁচি, কাশি, সর্দি ইত্যাদির মাধ্যমে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কারো এই ড্রপলেটগুলোর সাথে আপনারা যদি সরাসরি কন্টাক্টে আসেন তথা স্পর্শ করেন তখন আপনার শরীরে এই ভাইরাস ঢুকতে পারে।

World Health Organisation (WHO) এর গাইডলাইন অনুযায়ী কোনো সুস্থ মানুষের করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কোনো মাস্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। তাহলে মাস্ক কারা ব্যবহার করবে? যারা অসুস্থ হয়েছেন তারা। যাদের সর্দি, কাশি, হাঁচি হচ্ছে তারা মাস্ক পরে থাকবেন যেন এগুলো বাইরে না ছড়ায়৷ হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় টিস্যু ব্যবহার করা উচিত৷

কিন্তু টিস্যু যদি না থাকে তখন কী করবেন? আপনার হাতের কনুই ব্যবহার করবেন। হাত ভাঁজ করে কনুইটা মুখের কাছে এনে তারপর হাঁচি বা কাশি দিবেন। হাতের মধ্যে দিবেন না কিন্তু!

সুতরাং করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই৷ বরং পরিষ্কার পানি দিয়ে বারবার হাত ধুয়ে নিন ও প্রচুর ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খান।

এছাড়া আরও কিছু নরমাল এটিকেট মেনে চলা দরকারঃ

১. কারো জ্বর, সর্দি, কাশি হলে সেটা সাধারণ ফ্লু ই হোক না কেন সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাসা থেকে বের হবেন না।
২. কোনো ব্যক্তির যদি হাঁচি, কাশি থাকে তার থেকে তিন ফিট বা ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখুন।
৩. যত বেশি পারা যায় হাত ধুয়ে নিন। প্রতিবার নামাজ পড়ার আগে ওযু করার চেষ্টা করুন।
৪. কোনো রকম গুজবে কান দিবেন না। কোনো জড় পদার্থের উপর করোনা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না৷ তাই চীন বা করোনা আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আনা কোনো জিনিস ব্যবহার করাতে কোনো সমস্যা নেই। রসুন খাওয়া শরীরের জন্য ভালো। তবে রসুন, করোনা প্রতিরোধে তেমন কিছু করতে পারে না।

নিজে জানুন, অন্যকে জানান। ভয় পাবেন না, ভরসা রাখুন আল্লাহর উপর।

আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের করোনার আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন।

 

প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন আইইইডিসিআর এর সাথে

IEEDCR

 

ডা. শাফায়াত হোসেন লিমন

চিকিৎসক, লাইফ স্টাইল মডিফায়ার।

ফেসবুক পেজ: fb.com/dr.shafayat.hossen.limon

করোনা ভাইরাস: যা জানতেই হবে

সিরাজুম মনিরা

৯ মার্চ, ২০২০ , ৭:৫০ অপরাহ্ণ

পজেটিভ প্যারেন্টিংঃ সন্তান লালন-পালনের ইতিবাচক কৌশল

পর্ব-১

বর্তমান সময়ের সকল পিতা মাতার (Parent) একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা হলো কীভাবে সন্তান লালন-পালন করবো? কী করলে সন্তানটি একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে? এ ধরণের নানান প্রশ্ন বর্তমান সময়ের সব পিতা-মাতার মনে ঘুরপাক খায়।

সমস্যা হলো আমরা যে সময়ে এবং সমাজ ব্যবস্থায় বড় হয়েছি এবং যেভাবে আমাদের পিতা মাতা আমাদের লালন পালন করেছে সেই সময়ের থেকে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়া সন্তান লালন পালনের মত একটি জটিল বিষয় সম্পর্কে আমাদের কোন পড়াশোনা নেই বললেই চলে। আমরা মূলত শিখছি কীভাবে আমাদের লালন পালন করা হয়েছে, অন্যের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের মত করে একটি উপায় বের করছি। এই উপায় কখনও সফল হচ্ছে কখনও আবার ব্যর্থ হচ্ছে।

এখন যদি আমরা জানতে চাই কীভাবে ইতিবাচক উপায়ে আমার সন্তানকে পালন করবো? তবে তার আগে জানতে হবে আমি কোন ধরণের প্যারেন্ট বা পিতামাতা।

সাধারণত ৪ ধরণের প্যারেন্ট বা পিতামাতা রয়েছে।

১। কর্তৃত্ববাদী/ কঠোর পিতামাতা (Authoritration)

২। যত্নশীল পিতামাতা (Authoritative)

৩। অনুমতিমূলক পিতামাতা (Permissive)

৪। উদাসীন পিতামাতা (Neglectful)

এই চার ধরণের পিতা মাতার বৈশিষ্ট্য এবং এর প্রভাব সম্পর্কে অন্য একটি লেখায় লিখবো।

আজ মূলত কিছু টিপ্স দেব সন্তান লালন পালনের ইতিবাচক কৌশল বিষয়ে।

১. আপনার সন্তানকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করুন। তার চাহিদাগুলো কী কী তা জানার চেষ্টা করুন।

২. তার সাথে খোলামেলা কথা বলা চেষ্টা করুন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

৩. সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।

৪. একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সন্তানের জন্য কিছু নিয়মনীতি ঠিক করে দিন।

৫. সন্তানের সাথে গুণগত সময় কাটান। তার সাথে খেলাধুলা করুন, ঘুরতে যান, গল্প করুন।

৬. মনে রাখতে হবে সন্তানকে ভালো আচরণ শেখাতে চাইলে আগে নিজেকে ভালো আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।তাকে ভালো আচরণে উদ্বুদ্ধ করুন, মনোযোগ দিন, প্রশংসা করুন এবং পুরস্কার দিন।

৭. কোন কারণে সন্তান খারাপ আচরণ করলে সেদিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে শান্তভাবে বোঝান। কখনোই যেন সে খারাপ আচরণে পুরস্কার না পায়।

৮. বর্তমান সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্তানের জন্য মোবাইল ফোন চালানো, টেলিভিশন দেখা, ল্যাপটপ চালানোর সময় নির্ধারণ করুন।

মোট কথা, আপনার সন্তানকে ভালোবাসুন, উৎসাহ দিন, প্রশংসা করুন এবং সন্তানের সামনে তার রোল মডেল হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুন।

 

সিরাজুম মনিরা,

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর।

চেম্বার: রিদম ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার (ধাপ আট তলা মসজিদের পশ্চিমে)

সিরিয়াল: ০১৭৭৭৩৩৭০৮৯

monosamajik pramorsho

মুগ্ধতা.কম

৯ মার্চ, ২০২০ , ৭:৪০ অপরাহ্ণ

কলাবাগানে গেল বানর আর হাতি

বানরটা মাথা নিচু করে বনের ভিতর হাঁটছে। যে কেউ দেখলে বুুঝবে বানরের খুব মন খারাপ। যে বানর সারাদিন এ ডাল ও ডাল করে। হৈ চৈ করে মাতিয়ে তোলে পুরো বন। সেই বানর মাথা নিচু করে যাচ্ছে বনের ভিতরে। পথে যেতে যেতে দেখা হলো শেয়ালের সাথে। শেয়াল বানরকে দেখে চমকে উঠলো। শেয়াল এলো বানরের কাছাকাছি। বলল, কি হয়েছে বানর ভায়া ? তোমার কী মন খারাপ ?

বানর ওর হাঁটা থামাল শেয়ালের দিকে তাকাল একবার। পরক্ষণে আবার মাথা নিচু করল। আর চুপ করে থাকল। কিছুই বলল না।

শেয়াল আবার জিজ্ঞেস করল,কেন তোমার মন খারাপ?

জবাব দিলো না বানর। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদল আর কাঁদল।

– কি হলো? বলবে না?

বানর মুখটা এবার উচু করল। বলল,আমার চাষ করা গাছটা শেষ।

– তোমার চাষ করা গাছ?

– হু। কলাগাছ।

– কে শেষ করল?

– হাতি। হাতি কচ কচ করে খেল। কদিন হলেই কলা ধরতো।

– হাতি খেয়ে ফেলেছে?  বলল শেয়াল।

– হু।

– হাতি জানতো না ওটা তোমার গাছ?

বানর বলল,জানলে বা কী হতো?

শেয়াল বলল,না কোন কিছু হয়তো হতো না। তবে এই হাতিটা অতটা খারাপ না।

– খারাপ না হলে আমার কলা গাছ খায়।

– এর আগে যে হাতিটাকে আমার বাবা বুদ্ধি করে পানিতে ডুবিয়ে বন ছাড়া করেছিল। সেটার চেয়ে ভালো। ঐ হাতিটা হিংস্র ছিল। ছিল বদমেজাজী। হুংকার দিলেই পুরো বন থর থর করে কেঁপে উঠতো। বনের বাঘও ভয় পেত। হাতিটা নিজেকে রাজা মনে করতো। তাই তার আচরণে বনের অন্য প্রাণীরা মিলে পানিতে ফেলে দিয়েছিল। আর পানিতে ফেলে বন ছাড়া করেছিল। এরপর অনেকদিন বনে হাতি নেই। হঠাৎ এই হাতিটা কোথাত থেকে যেন আবার বনে ঢুকলো।

বানর বলল,এই হাতি খালি খায় আর খায়। ভয়ে তো কোন কিছু বলাও যায় না। বটগাছের মতো লম্বা শুঁড় দিয়ে যদি আছাড় মারে আমি তো একবারে শেষ।

– অত ভয় পেলে কি আর চলে। চলো তো দেখি হাতির কাছে যাই।

– না, না । তার দরকার নাই। আমার কলা গাছ খেয়েছে খাক। মোটু হাতির সামনে যাওয়ার আমার কোন ইচ্ছে নাই।

– আরে চলোই না বানর ভায়া। এই হাতিটা কিন্তু হিং¯্র না। গলা ফাটিয়ে চিৎকারও করে না।

– সাহস দেখিয়ে পাছে – – -। কথা শেষই করলো না বানর।

শেয়াল বলল,চলো। কিছুই হবে না।

বানর আর শেয়াল হাঁটতে শুরু করল। হাতির কাছে যাওয়ার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে একসময় হাতির সামনে হাজীর হয়ে গেল ওরা। তখনো হাতিটা মুখ নাড়াচ্ছে। কলাগাছ কচ কচ করে চিবুচ্ছেও।

বানর যেন আবার ফুপিয়ে কাঁদবে এমন ভাব করলো। শুধু ভাব করলো না। কান্নাও শুরু  করল।

হাতিটা মুখ তুলে দেখল বানরকে। বলল, কী হয়েছে?

বানর কথাই বলল না। কাঁদতেই থাকল।

– আহ্!  কী হয়েছে? কী হয়েছে বানর ভাই আমাকে বলো।

হাতির মুখে বানর ভাই শুনে শেয়াল সাহস পেল। বলল,তুমি কলাগাছ খাও তাই।

– ওমা! খাব না?  কলাগাছ আমার প্রিয়।

– আর কলা বানরের প্রিয়। যেটা কলাগাছেই ধরে। আর যেটা খাচ্ছ সেটা ওরই।

হাতি বলে, মানে?

– ঐ কলাগাছ বানর চাষ করেছিল।

হাতি শুনে সাথে সাথে বলল,সরি। সরি বানর ভাই। আরও বলল,মন খারাপ করো না। তোমায় থোকায় থোকায় কলা নিয়ে এসে দেব।

– কোথাত থেকে?

– কলাবাগান থেকে। দুজন মিলে চলে যাব কলাবাগানে।

– কলাবাগান তো অনেক দূর। বলল শেয়াল।

– সমস্যা কী তাতে? আমি বানরকে আমার পিঠে তুলে নিয়ে যাব।

– তাই। মূহুর্তেই মন ভালো করলো বানর।

– হু। তুমি চাইলে আমরা বন্ধুও হতে পারি।

– বন্ধু! অবশ্যই হবো। চলো তাহলে আমরা এক্ষুণি কলবাগানে যাই।

– আচ্ছা। বলল হাতি।

বানর পিঠে উঠলো হাতির। পিঠে নিয়ে হাঁটতে থাকল হাতিটা। শেয়ালকে না ডাকলেও পিছু নিল ওদের।  হাঁটতে হাঁটতে গেল একটা বড় কলাবাগানে। কলাবাগানে ঢুকে নাঁচ জুড়ে দিলো বানর আর হাতি। নাঁচের তালে হাতির কান নড়ে। নড়ে পা আর চোখও। বানর ছাগল ছানার মতো তিড়িং বিড়িং করতে থাকলো। আর মনের আনন্দে দু’বন্ধু খেতে থাকল। ওদের প্রিয় খাবার। একজন কলাগাছ। অন্যজন কলা।

 

[২০২০ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে শিশু সাহিত্যিক মোকাদ্দেস-এ-রাব্বীর গল্পগ্রন্থ ‘পাঁচটি হাতির গল্প’।গল্পটি এই বই থেকে নেয়া। বইয়ের নাম : পাঁচটা হাতির গল্প লেখকের নাম : মোকাদ্দেস-এ-রাব্বী প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : সাইফ আলী মূল্য : ১৮০ টাকা প্রাপ্তিস্থান একুশে বইমেলা শিশুচত্বর ৭৭৭-৭৭৮ চট্টগ্রাম বইমেলা ২০৬]

কলাবাগানে গেল বানর আর হাতি

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

৯ মার্চ, ২০২০ , ৫:৫৫ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস: রক্ষা কবচ নিজের কাছে

বর্তমানে যে রোগ নিয়ে বিশ্ব আলোড়িত তা হলো করোনা ভাইরাস, এখন যাকে বলা হচ্ছে COVID-19. চীন থেকে উৎপত্তি হয়ে এ রোগ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপি।

বিশ্বের ১০৩ টি দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৭০ জনই মারা গেছে চীনে। অন্য ১০ টি দেশে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪২১ জন।

ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১ লাখেরও বেশি মানুষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে উচ্চ মাত্রার সতর্কতাও জারি করেছে। দেশে দেশে হাসপাতাল, হোটেল, বিমানবন্দর এমনকি পুরো প্রদেশকে কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে। অচল হয়ে পড়ছে দেশগুলো।

মিডিয়ায় বিষয়টি থাকছে লিড আইটেমর। ফলে মানুষজন দরকারের চেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে আমাদের দেশে তিনজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রুগীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে অন্য আড়াইজন লোককে সংক্রামিত করতে পারে।

গত বছর শেষের দিকে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে এ ভাইরাসটি ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। চীন এ রোগ সীমাবদ্ধ রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে সাংহাই, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইরান, ইতালি এবং কানাডায়। বন্য পশুপাখি আর সামুদ্রিক মাছের মাধ্যমেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

লক্ষ্মণগুলো কী কী?

১.জ্বর ১০০ ডিগ্রি বা তার বেশি

২. কাশি

৩. সর্দি

৪. গলাব্যাথা

৫. মাংসপেশী বা গাঁটের ব্যথা

৬. মাথা ব্যথা

৭. যেসব দেশে এ রোগ দেখা দিয়েছে সেখান থেকে ১৪ দিনের মধ্যে আসার তথ্য।

৮. বয়স্ক ব্যক্তিরা এবং যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে তাদের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী।

COVID-19

কীভাবে ছড়ায়?

কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস যার শরীরে আছে অর্থাৎ রোগে আক্রান্ত তার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সুস্থ মানুষের শরীরে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে সেই জীবাণু সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

মৃত্যুঝুঁকি কতখানি?

শিশুদের যাদের বয়স ১০ থেকে ৩৯ বছর তাদের কম মাত্র ০.২%, মধ্যবয়সে ৪০ থেকে ৪৯ বছর মাত্র ০.৪%। ৮০ বছর বা তার বেশী হলে মৃত্যঝুঁকি ১৪.৮%।

সব জ্বরই করোনা নয়

জ্বর কোন রোগ নয়। রোগের লক্ষ্মণ। সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর হলে সর্দিকাশি থাকবে কিন্ত করোনাভাইরাস জ্বরে সর্দি হয় না। জ্বর ১০৩ /১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে সাথে কাশি। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো এই জ্বর। সাধারণত মানব শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এরচেয়ে বেশী তাপমাত্রাকে জ্বর বলে। যেহেতু জ্বর শরীরের রোগ প্রতিরোধের একটা অংশ তাই জ্বর আসলেই আতংকিত হবেন না।

যা করণীয়

১. ভালোভাবে ঘনঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।

২. করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে নাকে, মুখে আঙ্গুল বা হাত দেয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, মানব শরীরে জীবাণু ঢোকার সদর দরজা হলো নাক-মুখ-চোখ। ৩. জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলতে হবে।

৪. হাঁচি-কাশির সময় টিসু পেপার বা রুমাল ব্যবহার করতে হবে।

৫. মাস্ক পরা জরুরী তবে আমরা যে পাতলা মাস্ক ব্যবহার করছি এটা দিয়ে হবে না। লাগবে বিশেষ ধরণের মাস্ক। যার কোড N95

৬. হাত মেলানো(হ্যান্ডশেক), কোলাকুলি থেকে বিরত থাকতে হবে।

৭.হাত না ধুয়ে চোখ, মুখ ও নাক স্পর্শ করা যাবে না।

চিকিৎসা কী?

ভাইরাসজনিত রোগ বলেই এর তেমন কোন চিকিৎসা নেই। জ্বর, সর্দি কাশি হলে আপনার নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আতংকিত না হয়ে চিকিৎসা সেবা নিন ভালো থাকুন।

ভয় নাই, ওরে ভয় নাই

করোনাকে যতটা আত্মঘাতী বলে প্রচার করা হচ্ছে বাস্তবে তা কিন্ত নয়। এরচেয়ে প্রাণঘাতি ছিল ইবোলা ভাইরাস, নিপা ভাইরাস, মার্স ভাইরাস। আমরা কিন্তু সেসব ভাইরাসকে মোকাবেলা করেছি, অতএব অযথা আতংকিত হবেন না।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে চলে গিয়েছে। বাকি আক্রান্ত লোকেরাও চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। কথা পরিস্কার, শিশুরা এই রোগ থেকে অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত এবং যারা মারা গেছে তাদের প্রায় সবারই অন্য রোগের ইতিহাস ছিলো অথবা তারা বয়স্ক মানুষ। সুতরাং অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বা গুজব না ছড়িয়ে সতর্ক হোন।

প্রয়োজনে সাহায্য নিন:

নিজের অথবা পরিবারের কারো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে বাংলাদেশ সরকারের ‘ইনস্টিটিউট অব এপিডেমোলোজি ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ’ বা আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করুন।

IEEDCR

এছাড়াও প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা আইসোলেটেড ওয়ার্ড প্রস্তুত আছে। সাধারণ জ্বর সর্দি হলে সুস্থ তো হবেনই, এমনকি করোনায়ও যদি আক্রান্ত হয়ে যান তবুও ভয়ের কিছু নেই। সাধারণ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ শেষে বাড়ি যেতে পারবেন।

 

ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ

সহযোগী অধ্যাপক, প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর।

চেম্বার: প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর। সিরিয়াল: 01723672651

বদরগঞ্জ চেম্বার: হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বদরগঞ্জ, রংপুর।

 

corona virus

মুগ্ধতা.কম

৮ মার্চ, ২০২০ , ২:৫৮ অপরাহ্ণ

শিশুর খাদ্যে অনিহা

মিতুর বয়স ৩ বছর। বাবা – মায়ের একমাত্র সন্তান। মা সারাক্ষণ মিতুর খাবার নিয়ে চিন্তিত।

খাবার নিয়ে সকালবিকাল, রাত ছুটাছুটি। চোর পুলিশ খেলা। খাবারের বাটি দেখলেই মিতু পালিয়ে যায়, পিছু পিছু মিতুর মা।প্রতিদিনের রুটিন কাজ।

মিতুর না খাওয়া পরিবারে অশান্তি ডেকে এনেছে।

শুধু মিতুর মা না,বেশিরভাগ মায়েদের একই অভিযোগ, আমার বাবুটা কিছুই খায় না।

এর সমাধান করতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, আমরা খাই কেন? উত্তর সহজ, ক্ষিধা লাগে তাই খাই।

তাই যদি হয় তাহলে শিশুদেরও ক্ষিধা লাগে বলেই খায়। ক্ষিধা না লাগলে খাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো,শিশুদের ক্ষিধে লাগার সময়টুকুও দেওয়া হয় না।

প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় মা শিশুকে কিছু না কিছু খাওয়াচ্ছে, এর ফলে শিশুর ক্ষিধা আর পায় না। ফলে পেট ভরে খায় না।

একবার খাওয়ানোর পর অন্যবার খাওয়ানোর জন্য ন্যুনতম ব্যবধান ৪-৬ ঘন্টা হওয়া উচিত। এতে করে শিশু আগ্রহ করে খাবে।

আর একটা বড় সমস্যা হলো জাংক ফুডের সহজলভ্যতা। এখন রাস্তার পাশে ছোট দোকানে দোকানে ঝুলছে চিপসের প্যাকেট, চানাচুর, বিস্কুট। শহরজুড়ে ফাস্ট ফুডের দোকান।

মা- বাবা, আত্মীয় স্বজনরাও খুশি মনে শিশুকে চিপস, কোল্ড ড্রিংক কিনে দিচ্ছেন। আমরাও কারো বাড়িতে বেড়াতে গেলে চিপস নিয়ে যাচ্ছি। এসব খেয়ে শিশু কিছুটা এনার্জি পেলেও পুষ্টি পাচ্ছে না। ফলে শিশুর খাদ্যে অনিহা দেখা দিচ্ছে, ফলে শিশুর স্বাস্থ্য খারাপ ও মেজাজ খিটমিটে হয়ে যাচ্ছে।

করণীয়:
১. শিশুকে পুষ্টিকর বাড়ির তৈরি হাঁড়ির খাবার খাওয়াতে হবে।

২. বাইরের চিপস, চানাচুর, বিস্কুট খাওয়ানো যাবে না।

৩. প্রতিদিন একই খাবার না খাইয়ে, একেকদিন ভিন্ন স্বাদের খাবার খাওয়াতে হবে।

৪. খাবার নিয়ে জোরাজুরি করা যাবে না।

৫. প্রতিদিন কিছু ফল খাওয়ানো অভ্যাস করুন।

৬. প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর চিকিৎসকের পরামর্শমতো কৃমির ঔষধ খাওয়াবেন।

এরপরও যদি অবস্থার উন্নতি না হয় তবে শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

 

ডাঃ ফেরদৌস রহমান পলাশ

সহযোগী অধ্যাপক (শিশু বিভাগ), প্রাইম মেডিকেল কলেজ, রংপুর।
★ রংপুর চেম্বার: প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর। সিরিয়াল: 01723672651
★ বদরগন্জ চেম্বার: হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বদরগঞ্জ, রংপুর

শিশুর খাদ্যে অনিহা 24

মুগ্ধতা.কম

৮ মার্চ, ২০২০ , ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত, জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ

বাংলাদেশে তিনজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইন্সটিটিউট আইইডিসিআর।

এদের মধ্যে দুইজন সম্প্রতি ইতালি থেকে এসেছেন।

রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, ”তিনজনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে”

আক্রান্তদের বয়স বিশ থেকে পয়ত্রিশ বছরের মধ্যে বলে জানানো হয়েছে।

করোনাভাইরাস: কীভাবে শনাক্ত করছে বাংলাদেশ?

করোনাভাইরাস গাইড: আপনার প্রশ্নের উত্তর

করোনাভাইরাসে হওয়া রোগের নতুন নামকোভিড১৯

করোনাভাইরাসের উৎপত্তি কোথায়, কেন এতো প্রাণঘাতী

কিভাবে শনাক্ত

আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, এই তিনজনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে শনিবার।

“আক্রান্তদের মধ্যে যে দুইজন ব্যক্তি দেশের বাইরে থেকে এসেছেন, দেশে আসার পর তাদের যখন লক্ষ্মণ ও উপসর্গ দেখা গেছে, তখন তারা আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করেছেন। তার ভিত্তিতে সংস্থাটি থেকে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর করোনাভাইরাস ধরা পড়ে।”

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত, জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ 25

ইতালি থেকে আসা দুই ব্যক্তি ভিন্ন পরিবারের সদস্য।

তবে তাদের নমুনা সংগ্রহের সময় দুই পরিবারের আরো চারজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

“চারজনের মধ্যে একজনের পরিবারের একজন নারী সদস্যের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। বাকি তিনজন নেগেটিভ।”

আক্রান্তরা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, কিন্তু কোথায় সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

আক্রান্ত ব্যক্তিরা বাদে আরো তিনজনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই‘ – শেখ হাসিনা

আজই প্রথমবারের মত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস নিয়ে কথা বলেছেন।

ঢাকায় নারী দিবসের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে, উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই।”

একই আহ্বান জানিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাও।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত, জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ 26

তিনি বলেন, “এর আগে সরকার প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট করা হয়েছিল, এখন আইসোলেটেড হাসপাতাল চিহ্নিত করা হচ্ছে। এগুলো ঢাকার বাইরেও চিহ্নিত করা হচ্ছে।”

“পরবর্তীতে যদি রোগী আরো বৃদ্ধি পায়, যদি স্কুল কলেজ বা কমিউনিটি সেন্টারে হাসপাতাল করার প্রয়োজন হয়, তাহলে সে প্রস্তুতিও সরকারের আছে।”

সদা পরিবর্তনশীল করোনাভাইরাস কতটা বিপজ্জনক?

নতুন করোনাভাইরাস কত দ্রুত ছড়ায়? কতটা উদ্বেগের?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত, জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ 27

এর বাইরে বেসরকারি হাসপাতালেও আইসোলেশন ইউনিট করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

জনসমাগম এড়িয়ে চলুন

সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তিনজন আক্রান্ত হয়েছে।

এতে করে সারা বাংলাদেশে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এমন কিছু বলা যাবে না। স্কুল-কলেজ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।

তবে সাধারণ মানুষকে জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এজন্য বাড়িতে থাকা পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

করণীয় হিসেবে সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও কাশি শিষ্টাচার মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

এজন্য গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

আইইডিসিআর এর এই পরিচালক বলেন, সবাইকে মাস্ক পরে ঘুরতে হবে বিষয়টা এমন না।

“আক্রান্ত রোগী ও রোগীকে যিনি সেবা দিবেন তারা মাস্ক পরবেন। সবার পড়ার প্রয়োজন নাই।”

তথ্যসূত্র: বিবিসি

coronavirus

মুগ্ধতা.কম

৬ মার্চ, ২০২০ , ৬:১৭ অপরাহ্ণ

ফিরে দেখা

রতন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। ঠিক এখানেই তো নদী ছিল।এখন যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা একটা সরু লেইসফিতার মতো খাল। এখানেই তো নদীটা ছিল। নৌকা চলতো।মাঝিরা নৌকা নিয়ে এখানে মাছ মারতো। সেই মাছের বেশীর ভাগই বিক্রি হয়ে যেত নৌকাতেই।

আশেপাশের মানুষের সাথে রতনও কতদিন এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে গেছে।

ট্যাংরা মাছ সূর্যের আলোয় কেমন চকমক করতো। একটা হলুদ আভা,যেন হলুদ সোনা। সাত মিশাল মাছের সাথে একটা- দুটা খলসে মাছও আসতো। চট করে মাছগুলো আলাদা করে হরলিক্সের কাঁচের বোতলে রেখে দিত রতন। কি সুন্দর রঙীন মাছগুলো। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। খাবার দেয়া হতো,মুড়ি,খইল কিন্তু কিছুই মুখে নিত না। তিনদিনের বেশী একটাও বাঁচে নি।

সেই নদী আজ খাল হয়ে গেছে।

আজ সাতাশ বছর পর রতন তাকিয়ে থাকে ছোটবেলার নদীর দিকে। নদীর উপর একটা সরু ব্রীজ হয়েছে। একটা রিকসার বেশী পার হতে পারে না। রতন ব্রীজ পার হয়ে মুন্সির চালকলের দিকে যায়।ছেলেবেলায় এ চালকল চালু ছিল। সকাল ৭ টায় সাইরেন বাজতো।শ্রমিকরা পড়িমরি করে ছুটতো কাজে।

এখন সেটা পরিত্যক্ত।

পাশে বড়বড় দালান উঠেছে। উপজেলায় এখন সাততলা বিল্ডিং। রতন অবাক হয়ে পরিবর্তন দেখে।

সাতাশ বছর আসলে কমতো না।

বৈকুন্ঠপুর যখন ছাড়ে তখন রতনের বয়স তের,চোদ্দ। বৈকুন্ঠপুর বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। বাবা বেঁচে ছিলেন।

বড় ভাই করিম চাচার মুদি দোকানে কর্মচারী।

বড় বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে বিরামপুর।

পড়াশুনায় মন ছিল। মা বলতো রতন বড় হয়ে ডাক্তার হবে। রতনের নানী বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিল।

নানীর হাঁপানি ছিল। শ্বাসকষ্ট উঠলো,ডাক্তারের কাছে যাবার মতো টাকা না থাকায় কষ্ট পেয়ে মরে গেল। ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করতে করতে।

ডাক্তার হওয়া হয়নি রতনের।

বাবা কাজ করতো আমজাদ কাফ্রিয়ার কাপড়ের দোকানে।

একদিন রাতে দোকান থেকে এসে ভাত খেয়ে সবে এক খিলি পান মুখে দিয়েছে ওমনি দুম করে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। সেই যে পড়লেন আর উঠে দাঁড়ালেন না।

বাবার মৃত্যুর পর অকূল সাগরে পড়ে রতনের মা। বড় ছেলে একা আর কতটুকু করবে।

রতন কাজ করতে চলে গেল গাজীপুর।

বহুজাতিক এক জুতা ফ্যাক্টরির এমডির বাসায় কাজ। এমডির বাসায় সাংসারিক কাজে সহায়তা করা।

এমডির দুই ছেলে তন্ময় আর সঞ্জয়।

তন্ময়ের সমবয়সি হবে রতন।

তন্ময় এর স্কুলে যাওয়া আর পড়া দেখে রতনের মনেও ইচ্ছে জাগে।

এমডির স্ত্রী শিল্পি তা দেখে পাশের এক স্কুলে রতনকে ভর্তি করায় দেয়।

দিনে স্কুলের সময়টুকুবাদে রতন সংসারের কাজ করে জান লাগিয়ে।

সময়ের নৌকায় দুলতে-দুলতে এসএসসি পাশ করে রতন। এরপর আর পড়া হয়নি।

এমডি চলে গেলেন বদলি হয়ে চট্টগ্রাম।

এতদিনে রতন এমডির বাসার বাবুর্চির কাছে দেশী-বিদেশী সব রান্না শিখে নেয়।

চাকরি নেয় গুলশানের এক চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে। প্রথমে বাবুর্চির সহকারী পরে হেড বাবুর্চি।

ঢাকায় চাইনিজ হোটেলের অভাব নাই তাই চাকরিও অনেক।

বিয়ে করেছিল এক গার্মেন্টস কর্মীকে বিয়ে টিকে নাই।

এরপর নিয়মিত এক বাড়িতে যাতায়াত। নিত্যনতুন মেয়েদের সংস্পর্শ।

মা যে কদিন বেঁচে ছিলেন নিয়মিত টাকা পাঠিয়ে গেছে রতন।

কতদিন বলেছে, ঢাকায় আসো মা- ব্যাটা একসাথে থাকি।

মায়ের সেই এককথা, নারে বাবা নিজ ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবনা।

মা মারা যান সাত বছর আগে তখন এসে দুদিন ছিল। এরপর আর আসা হয়নি।

মা ছিল ঘুড়ির নাটাই।সুতা কেটে গেলে ঘুড়িকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না।

সাতাশবছরে কত পরিবর্তন।

মুন্সির চালকলের পিছনে এক জঙল ছিল। দিনেরবেলাতেও কেমন অন্ধকার হয়ে থাকতো। ওপাশটা কেউ সহজে যেত না।

একবার এক লোক গাছ কাটতে গিয়েছিল,গাছের গায়ে একটা কোপ দেবার সঙ্গে -সঙ্গে নাকমুখদিয়ে রক্ত আসা শুরু হয়। তারপর নাকি আর বাঁচে নি।

সেইথেকে জঙল বেড়ে উঠেছে অবাধ্য সন্তানের মতো।

একদিন এই জঙলে মনির সাথে এসেছিল রতন।

মনি হ্যাংলাপাতলা দুরন্ত মেয়ে। পাশের বাড়ির,দুবছরের ছোট।

বাড়িতে কি এক কারনে বকা দেবার জন্য দুঃখে রতন মুন্সির জঙ্গলের দিকে রওনা দেয়।

পিঁছুনেয় মনি।

ভয় দেখিয়ে, ধমক দিয়েও বিদায় না করতে পারায় সঙ্গে নেয়।

সারাদিন সে জঙ্গলে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে। খিদে পেলে আতা গাছের ফল খেয়েছে। তারপর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে পিটুনি খেয়েছে।

আজ সব স্মৃতি চোখে ভেসে ওঠে রতনের। বাসায় আসতে – আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয় রতনের।

ভাবী বললো মনি এসেছে। চমকে উঠে রতন।

বসার ঘরে সোফার এককোনে মাথা নিচু করে বসে আছে মনি।

মনির বিয়ে হয়েছে একই এলাকার সাজেদের সাথে।

এসব জানা ছিল রতনের।

সাজেদদের পারিবারিক ব্যবসা আছে। ওদের পছন্দের বিয়ে।

দূরে থেকেও এসব খবর কানে এসেছিল রতনের। কথা শুরু হয় দূরত্বের পর্দা সরিয়ে।

জানা যায় পরনারী আর নেশায় আসক্ত সাজেদ। সংসার জীবনে সুখি না মনি। মনির যাবার সময় হয়ে যায়। চোখে-চোখ রেখে মনি বলে,সেদিন মুন্সির জঙ্গলে আমাকে আদর করেছিলেন মনে আছে রতন ভাই? এরকম আনন্দদায়ক অনুভূতি আর কখনও আমার হয়নি। রতনের চকিতে মনে পড়ে যায় সেই দিনের কথা। যে দিনের কথা ইচ্ছে করেই ভুলে গিয়েছিল রতন।

ফিরে দেখা 28

জাকির আহমদ

৬ মার্চ, ২০২০ , ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১

(পর্ব – ১)

সময়টা বসন্তের মাঝামাঝি। চৈত্রের এক সকাল। সেই সকালটা কাছে টানার মতো। মায়ের মনের মতো সেই সকালের আকাশটাও পরিষ্কার। বাতাস মুক্ত ও নির্মল। কোনো ক্লান্ত দেহকে প্রশান্তি দিতে এর জুড়ি নেই। বসন্তের নানান ফুল তাদের পাপড়ি মেলে দিয়ে প্রকৃতিকে অপরূপ করে তুলেছে। কোকিলের কুহুকুহু ডাক মোবাইলের কৃত্রিম রিংটনের বিরক্তি নয়, কৃষ্ণের বাঁশির মতো পাগল করা।

এসব মিলে বেঁচে থাকাটাকে সার্থক করে তুলতে চায় প্রকৃতি। বোঝা যায় প্রকৃতি বরাবরই নিষ্ঠুর! প্রকৃতি বরাবরই সুন্দর-মমতাময়ী।

প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন যে আলোর দেবতা সূর্যের কোমল আলো পৃথিবীর মুখে এসে পড়েছে তা টের-ই পাইনি। দূরে দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীর মুখ দেখি আস্তে আস্তে দিনে রূপ নিচ্ছে।   আরো দূরে চেয়ে দেখি ইতোমধ্যে নতুন এই দিনে সবাই কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়েটিং রুমে অনেক মানুষ অপেক্ষা করছে। সবাই কিছু না কিছু করে অপেক্ষার সময় পার করছে। কেউ দৈনিক পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ছে। কেউ সহযাত্রীর সঙ্গে গল্প করছে। আপন মনে বাচ্চারা মৃদু হইচই করছে বা খেলছে, আবার কেউ কিছু চেয়ে পায়নি বলে কাঁদছে। এয়ার কন্ডিশনারের মধ্যে থেকেও কেউবা অহেতুক ঘামছে।

বিমানবন্দরের বিস্তৃত আঙিনায় বিশালাকার একটি বিমান সুদূর আকাশে ডানা মেলার পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছে। একটু পরেই মাটির মায়া ত্যাগ করে আকাশের দিকে ছুটবে। হঠাৎ ওয়েটিং রুমের দেয়ালে বসানো স্পিকার থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘সম্মানিত লন্ডনগামী যাত্রী মহোদয়…।’ বাংলায় বলার পর একই কণ্ঠ ইংরেজিতে বলল, ‘ওয়েলকাম লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…।’

এর মাঝে যাত্রীদের কেউ কেউ সঙ্গে থাকা হালকা ব্যাগসহ নির্ধারিত দরজার দিকে হাঁটা শুরু করেছে। মায়েরা তাদের সন্তান সামলাতে যেন মহাব্যস্ত। দুজন লোক যাত্রীদের পথ দেখিয়ে দিতে সাহায্য করছে। তাদের পরনে নির্ধারিত পোশাক। দরজায় হালকা ভিড় জমে গেছে। অনেকে আগে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। পেছন থেকে অনেকেই সামনের জনকে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে। ফলে সামনের জন তার সামনের জনকে একইভাবে ধাক্কা দিচ্ছে। নয়তো ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে গায়ের ওপর পড়ছে। বিরক্তিতে অনেকের মুখ কালো হয়ে গেছে। কিন্তু বলার কিছু নেই।

ভিড়ের মাঝে শ্মশ্রুমণ্ডিত, পাজামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরা এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যেমন লম্বা-চওড়া তেমন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ তার শরীর। দেখলে সহজে চোখ ফেরানো যায় না। এমন সুদর্শন যুবকের মুখে অদ্ভুত সারল্য ফুটে উঠেছে। কিন্তু তার বাহ্যিক বেশভূষা দেখে অতোটা বোঝা যাবে না যে তার ভেতরে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

যুবকের ঠিক সামনে অষ্টাদশী, অনিন্দ্যসুন্দর এক মেয়ে হাতব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ডাগর চোখের চঞ্চল চাহনি ঘুরে ফিরছে এপাশ-ওপাশ। হয়তো সামনে এগোনোর পথের সন্ধানে। নয়তো অন্যকিছু। কে জানে তার চাহনির রহস্য কী!

অনেকে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। অবশেষে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অনেক কষ্টে। কেউ কেউ তার শরীর থেকে পারফিউমের সুগন্ধ পাচ্ছে। আর ফিস ফিস করে ‘কী দারুণ সুগন্ধ’ বলে একে অপরের কাছে বলাবলি করছে। কেউ আবার চোখ বন্ধ করে পারফিউমের সেই গন্ধ শুকতে শুকতে স্বপ্ন রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

যুবকের পেছনে আরো তিজন দাঁড়ানো। তারাও পরস্পর নীচু গলায় কী যেন আলাপ করছে আর হাসছে। তবে সামনের ছেলেটির সে সম্পর্কে কোনো আগ্রহ নেই। সে তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে। বিমান ছাড়ার এখনো বিশ মিনিট বাকি। পেছন থেকে হঠাৎ কে যেন ছেলেটাকে কাঁধ দিয়ে বেশ জোরে ধাক্কা দিল। এমন ধাক্কায় নিজেকে সামলাতে না পেরে মেয়েটির গায়ে গিয়ে পড়ল। মেয়েটি এ ধাক্কার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সেও ভারসাম্য হারিয়ে সামনের লোকটির কাঁধ ধরে শেষ পর্যন্ত সামলে নিল। ছেলেটিও সোজা হয়ে দাঁড়াল অপরাধীর ভঙ্গিতে।

‘ইস! শেষ করে দিলো আমার পা-টা।’ মেয়েটি ঘুরে ছেলেটির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, ‘পায়ে পাড়া দিয়ে হলো না, আবার গায়ে এসে পড়লেন, ছি!’ স্যান্ডেল খুলে পা-টা ভাঁজ করে তুলে হাত দিয়ে পায়ের আহত জায়গাটা ম্যাসাজ করল।

তার এমন কথায় যুবকের চেহারা লাল হয়ে গেল, কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। ‘দেখেন, আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি।’ এক মুহূর্ত পর আমতা আমতা করে বলল ছেলেটি।

‘তবে কি আপনার ইচ্ছে পূরণ করতে কেউ আপনাকে ধাক্কা দিয়েছে!’ রাগের সঙ্গে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল মেয়েটার মুখ থেকে। লজ্জায় তার গোলাপি ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। দুজনের কথাবার্তায় এরই মধ্যে আশপাশের অনেকেই দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ব্যাপারটা কী আঁচ করতে পেরে মুখ টিপে হাসছে।

পরের কথাতেও আগের কথার সঙ্গে স্পষ্ট মিল থাকায় ছেলেটি এমন বিব্রত হয়ে পড়ল যে, মেয়েটাকে দেয়ার মতো সন্তোষজনক উত্তর মাথায় তৈরি করে নিলেও মুখে এলো না। অনেক কষ্টে শুধু বলতে পারল, ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

মেয়েটা হয়তো ভদ্র ঘরের সন্তান, তাই আর কিছু না বলে ঘৃণামিশ্রিত দৃষ্টিটা ফিরিয়ে নিল। ততক্ষণে সে স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে একটু বেকায়দা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে।

এতক্ষণে ছেলেটি পেছনের তিনজনের দিকে তাকানোর সুযোগ পেল। তাকিয়ে বুঝল, তারাও বিব্রত মুখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি তাদের দিকে তাকাতেই একজন বলল, ‘আমরা মাফ চাইছি ভাই, একটু ছেলেমি করতে গিয়ে আপনাকে অনেকের সামনে ছোট করে ফেললাম, আর কখনো এমন দুষ্টুমি…।’

ছেলেটি অপ্রস্তুত হয়ে কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, এ আর এমনকি, আমি কিছু মনে করিনি।’ ‘সত্যি, আপনাকে ওই অবস্থায় ফেলে আমরা বেকুব বনে গেছি। মেয়েটির রাগ দেখে কিছু বলতেও ভয় পাচ্ছিলাম।’ বলল আরেকজন।

‘এই যে ভাই, আপনারা যাবেন না? সময় আর মাত্র পনের মিনিট’, বলল ইউনিফর্ম পরা একজন। ছেলেটা তাকিয়ে দেখে তারা চারজনসহ আরো জনাকয়েক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারা এদের পরবর্তী কথা শুনে শ্মশ্রুমণ্ডিত ছেলেটার দিকে এবার সুনজরে তাকিয়ে আছে। গাইডের কথায় ইতোমধ্যে সবাই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখে বাকি সবাই অনেক সামনে গেছে। ছেলেটি দেখল, সেই মেয়েটিও অনেক সামনে চলে গেছে। সে যে দোষী নয়, তা হয়তো সে জানল না। বাকি সবাই দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। এরপর কারো সঙ্গে কারো কথা হলো না।

বিমানের পেটের ভেতরে ঢুকেই ছেলেটির মনে হতে লাগল, এরই মধ্যে যেন সে মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্বদেশ ত্যাগের কষ্ট সে উপলব্ধি করতে লাগল। বিমানের ভেতর ছেলেটি প্যাসেজ ধরে হাঁটছে আর নিজের সিট খুঁজছে। হাঁটতে হাঁটতে সে বিমানের মাঝামাঝি চলে এলো। সিট খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ করেই মেয়েটার দিকে চোখ পড়ল ছেলেটির। দেখল, মেয়েটি তার দিক থেকে ঝট করে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। মেয়েটি এক বাচ্চাসহ মহিলার সঙ্গে বসেছে। মেয়েটার সিটের একসারি পেছনে সে তার সিট পেয়ে গেল। কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। সে ওয়েটিং রুমের ওই ঘটনার পর থেকেই কামনা করছিল যেন তার সিটটা এমন জায়গায় হয়, যেন মেয়েটাকে চোখে না পড়ে। এক মিনিট পরই সহযাত্রী এসে তার পাশে বসল এবং তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

‘ওয়েটিং রুমে তো বিশ্বসুন্দরীর সঙ্গে দারুণ এক ঘটনার জন্ম দিলেন, মুখরোচক হিসেবে ভালোই, কী বলেন?’ হাসি আরো বেড়ে গেল লোকটার। খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল ছেলেটি।

‘বিশ্বসুন্দরী বলা কি ভুল হলো? আমার অনুমান ক্ষমতা ভোঁতা না হলে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় সেরা সুন্দরীর খেতাবটা সে-ই পাবে।’ এক মুহূর্ত থামল লোকটি।

‘আচ্ছা, ওই সুন্দরীর কথায় কি আপনি মন খারাপ করেছেন?’ ছেলেটির চোখের দিকে চোখ রেখে বলল লোকটি। ছেলেটির কাছে লোকটির কথা ব্যঙ্গাত্মক মনে হলো। ফলে তার অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল। ‘না মানে, ব্যথা কেন পাব, ওই অবস্থা হলে যে কোনো শান্ত-ভদ্র মেয়েই এসব কথা রাগের মাথায় বলে ফেলবে, আর অত লোকের সামনে যে কারোরই ওই অবস্থায় রাগ হওয়া স্বাভাবিক।’ দুজনেই কথা বলছে নীচু স্বরে, যাতে পাশে কেউ শুনতে না পায়।

‘আপনি হয়তো আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করছেন, আসলে আমি অমন…’ বাকিটুকু শেষ করতে পারল না ছেলেটি। ‘আপনি হয়তো খুব অস্বস্তিবোধ করছেন’, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল লোকটি। ‘আপনি যে ও রকম করেননি তা আমি জানি।’

‘জানেন?’ খানিকটা বিস্মিত কণ্ঠে বলল ছেলেটি।

‘পরে আপনি যখন পেছনের ছেলে তিনটির দিকে ফিরে কথা বলছিলেন, ততক্ষণে মেয়েটি সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ সে জানতে পারল না যে, আপনি নির্দোষ, তবে আমার মতো আরো কয়েক অধম সত্য ঘটনাটা জানে।’

‘ও, তাহলে আপনারা ছেলে তিনটির সঙ্গে আমার কথাবার্তা শুনেছেন?

‘জি, হ্যাঁ।’ আন্তরিক হেসে জবাব দিল লোকটি।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল ছেলেটি। মনে মনে আল্লাহর প্রশংসা তো করলই।

‘আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।’

‘মানে?’, বুঝতে না পেরে বলল ছেলেটি।

‘আপনি অমন এক পরিস্থিতিতে যে ধৈর্য ও নম্রতার পরিচয় দিয়েছেন, অন্য কারো পক্ষে তা কঠিন হতো।’

‘থাক, থাক আর প্রশংসা করতে হবে না’, লজ্জিত হয়ে বলল ছেলেটি। ‘ইসলাম তো মানুষকে সব ধরনের পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছে, সর্বদা বিনয়ী ও নম্র হতে বলেছে।’

এর মধ্যে দানব আকারের আকাশযানের ইঞ্জিনগুলো গর্জে উঠেছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে তার আওয়াজ। বিমানের ভেতরে যদিও আসল আওয়াজ ঢুকছে না, তারপরও যতটুকু ঢুকছে তাই ঢের। আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোচ্ছে বিমান তার বিশাল দেহটা নিয়ে। বিমানের লাউড স্পিকার থেকে ভেসে এলো ক্যাপ্টেনের ইংরেজি কণ্ঠ, ‘ওয়েলকাম লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান…’। তারপরের কথাগুলো বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘এরই মধ্যে আমরা যাত্রা শুরু করেছি সুদূর লন্ডনের দিকে। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বাংলার মাটির স্পর্শ ত্যাগ করে আকাশে ডানা মেলব, আপনিও আমন্ত্রিত, তাই অনুগ্রহ করে আপনাদের সিটে সংযুক্ত সিটবেল্ট বেঁধে ফেলুন, আপনাদের যাত্রা আনন্দময় ও শুভ হোক, ধন্যবাদ’, একনাগাড়ে বলে থামল গমগমে কণ্ঠটি। যাত্রীরা তাদের দেহকে সিটের সঙ্গে বাঁধতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিমানের গতি এর মধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। আশপাশের সবকিছু দেখতে দেখতে দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে। দূরের সবকিছুই যেন বিমানের সঙ্গে ছোটার প্রতিযোগিতা করছে। তবে তারা হেরে যাচ্ছে। বিমানের ছোট্ট জানালা দিয়ে বাংলার অতি পরিচিত কিছু দৃশ্য চোখে পড়ছে। আকাশে ডানা মেলার সঙ্গে সঙ্গে সেসব হারিয়ে যাবে ধীরে ধীরে।

বিমানের গতি চূড়ান্তভাবে বেড়ে গেছে। এর মধ্যে বিমানের সুন্দরী, স্মার্ট এয়ার হোস্টেসরা যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে দেখে গেছে, সবাই সিটবেল্ট বেঁধেছে কিনা বা কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। যারা বাঁধতে পারছে না, তাদের দেখিয়ে দিচ্ছে বা বেঁধে দিচ্ছে। হঠাৎ মৃদু একটি ঝাঁকি দিয়ে মাটি ছেড়ে শূন্যের দিকে যাত্রা করল বিশাল প্রজাপতি তার প্রকাণ্ড ডানা মেলে। বেশ কিছুক্ষণ আড়াআড়িভাবে উড়ে একসময় সোজা হলো তার বিশাল দেহ।

খানিকক্ষণ পরই স্পিকার থেকে ভেসে এলো ক্যাপ্টেনের কণ্ঠস্বর, ‘ওয়েলকাম লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমরা এর মধ্যেই মাটি ছেড়ে আঠার হাজার ফুট ওপরে চলে এসেছি। আপনারা সিটবেল্ট খুলে স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারেন, আমরা পাকিস্তানের করাচি অভিমুখে এগোচ্ছি, ওখানে আমরা আধাঘণ্টা বিরতি করব, তারপর দুবাই বিমানবন্দরে বিরতির মধ্য দিয়ে যাত্রাবিরতি শেষ করে রওনা হব লন্ডনের দিকে। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের স্ন্যাক্স দেয়া হবে, আপনাদের যে কোনো অভিযোগ এয়ার হোস্টেসকে জানাবেন। আপনাদের যাত্রা আনন্দময় ও শুভ হোক, ধন্যবাদ। একনাগাড়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থামার পর বিমানের ভেতরটা বড় বেশি নীরব হয়ে এলো। সামনে বড় স্ক্রিনে বিমানের গ্লোবাল পজিশন দেখানো হচ্ছে নিয়মিত।

কথামতো কিছুক্ষণের মধ্যে যার যার পছন্দমতো স্ন্যাক্স এলো। সেই সঙ্গে নানান ড্রিংকস। সবার খাওয়া শেষ হলো এক সময়। বাংলাদেশের আকাশসীমা ছেড়ে ভারতের আকাশ সীমানায় ঢোকার ও আটত্রিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার খবরটা ক্যাপ্টেন জানিয়ে দিল। পাশের জানালা দিয়ে অনেক নীচে দেখা যাচ্ছে বাংলার সবুজ প্রান্তর, বাড়ি-ঘর সেখানে অস্পষ্ট, মাঝে মাঝে সাদা রঙের মেঘের ভেতর দিয়ে বিমানের যাওয়া, সব মিলে এক অপূর্ব দৃশ্য। ক্যাপ্টেনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ভারতের একই দৃশ্যের ওপর। অতি পরিচিত বাংলার আকাশ ছেড়ে ভারতের আকাশে উড়ছে বিমান। খাওয়া শেষ করে অনেকেই সিটে হেলান দিয়ে ঝিমাচ্ছে। অনেকে পেপার, ম্যাগাজিন বের করে পড়ছে। কেউবা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে, অনেকে সামনের সিটের পেছনে লাগানো মিনি মনিটরে দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখছে। সেই মেয়েটি এরই মধ্যে ঘুমিয়ে গেছে। আর ছেলেটি ইংরেজি কাগজ পড়ছে।

‘আপনি ইংরেজি পত্রিকা পড়েন!’ এতক্ষণ পাশের লোকটিও ইংরেজি ম্যাগাজিনের মধ্যে ডুবে ছিল। হঠাৎ পাশে চোখ পড়তেই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

লজ্জিত হাসি হেসে ছেলেটি বলল, ‘জি, আল্লাহর রহমতে পারি।’ এরপর দুজনের আর কারোরই পড়া হলো না। গল্পের আসর জমিয়ে ফেলল দুজনে। ভদ্রলোকের আগ্রহে ইংরেজিতেই কথা হলো যতক্ষণ না ক্যাপ্টেনের কণ্ঠে শোনা গেল, ‘ওয়েলকাম, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমরা পাকিস্তানের করাচিতে ল্যান্ড করার জন্য প্রস্তুত, আপনারা দয়া করে সিটবেল্ট বেঁধে নিন…।’

প্রথমে পরিচয়পর্ব শেষ হলো। জানা গেল, ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ লেকচারার, সরকারিভাবে পিএইচডি করার জন্য লন্ডনে যাচ্ছেন অর্থাৎ ছেলেটির অর্ধেক পথের যাত্রী। দুজনে নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করল। যখন ক্যাপ্টেন তাদের আলোচনায় বাধা দিল, তখন তারা পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে কথা বলছিল।

করাচির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আধাঘণ্টা দেরি করে আবার ডানা মেলল বিমান। জোহরের নামাজের সময় হলে দুজনেই সিটে নামাজ পড়ে নিল। অজু আগেই করে রেখেছিল। কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার পরিবেশন করল এয়ার হোস্টেসরা। এয়ার হোস্টেসের আন্তরিক আতিথেয়তায় তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শুরু করল সবাই। খাওয়া শেষে সফট কোল্ড ড্রিংকস। খেয়ে-দেয়ে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল। আর সেই মেয়েটি বসে ম্যাগাজিন পড়া শুরু করল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। প্রথমে লোকটির ঘুম ভেঙে গেল। বাথরুম সেরে অজু করে দুজনেই আসরের নামাজ পড়ে নিল। বেশ কিছুক্ষণ পর দামি বিস্কুটসহ বিকেলের চা পরিবেশন করা হলো। দুবাই বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল বিমান। এখানে বিমানে  ফুয়েল ভরা হবে বলে বিরতি সোয়া এক ঘণ্টা। এতক্ষণ বিমানে বসে থাকা কষ্টকর। তাই সব যাত্রীকে বিমান থেকে নামিয়ে নিয়ে টার্মিনালের লাউঞ্জে বসানো হলো।

ছেলেটি যেখানে বসেছে তার থেকে বেশ দূরে বসেছে মেয়েটি। মুখের সামনে তুলে ধরা একটা ম্যাগাজিন। অপেক্ষার সময় কখনোই দ্রুত ফুরায় না। এ ধরনের সময় যেন এগোয় শামুকগতিতে। এশার নামাজের সময় হলে দুজনেই বিমানবন্দরের নামাজ ঘরে নামাজ পড়ে নিল। নামাজ পড়ে ফিরে জানতে পারল কোনো কারণবশত বিমান নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর রওনা দেবে। কী আর করা! অপেক্ষা করতে হবে যেন আরো দুশো বছর।

আবার যখন সবাই বিমানে  উঠল তখন বেশ রাত হয়েছে। খিদেয় চোঁ চোঁ করছে পেট। তবে যাত্রীদের পেটের খবর বুঝি ভালো করেই রাখেন বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানের উচ্চতা চল্লিশ হাজার ফুটে আসতেই রাতের খাবার দেয়া হলো। খেয়ে-দেয়ে সবাই লম্বা ঘুম।

ক্যাপ্টেনের কণ্ঠ শুনে যখন প্রায় সবার ঘুম ভেঙে গেল, তখন বিমান লন্ডনের হিথ্রো বন্দরে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন দিনের আলো ফুটতে তখন আর বেশি দেরি নেই। একসময় বিমানবন্দরের আঙিনায় স্থির হলো বিমান। পাশের ভদ্রলোক নামার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন। ছেলেটিও উঠে দাঁড়াল। তবে তাকে অন্য বিমানে  চেপে পাড়ি জমাতে হবে নিউ ইয়র্কের পানে। লাউঞ্জে পৌঁছে ছেলেটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে যখন বিদায় নিচ্ছিল ইংলিশ লেকচারার, তখন বাংলায় ছেলেটিকে বলল, ‘আপনি কিন্তু খুব সুন্দর করে ইংরেজি বলেন।’

‘কী যে বলেন…।’ স্বলজ্জ হেসে বলল ছেলেটি।

‘চলি, আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ্। বলে সালাম দিয়ে ছেলেটির দিকে আর একবার তাকিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল ছেলেটি, ‘এত অল্প সময়েই মানুষের মাঝে কত আন্তরিকতা জন্ম নেয়।’

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নিউ ইয়র্কগামী সবাই জানতে পারল, যে বিমান ধরে তাদের আকাশপথে পাড়ি দেয়ার কথা, সেই বিমানের এয়ার রুট পারমিট বাতিল হয়েছে। বিমান ছাড়বে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। মেয়েটিকে দেখতে পেল ছেলেটি। একটা লম্বা সোফায়, একাই চোখ বন্ধ করে বসে আছে। হঠাৎ মনে হলো, মেয়েটির ভুল ধারণা ভেঙে দেয়া যায়। পরক্ষণেই মনে হলো, কী লাভ হবে মেয়েটির কাছে ভালো মানুষ হয়ে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। মেয়েটি অপেক্ষা করছে কেন? সেও কি তবে পাড়ি দেবে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বিমানে?

===========================

বিমানের করিডোর ধরে নিজের সিট খুঁজছে ছেলেটি। সারাদিন লন্ডনের দুটি হোটেলে তাদের সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল বিমান সংস্থা। ছেলেটি যে হোটেলে উঠেছিল, মেয়েটি সে হোটেলে ছিল না। বার ঘণ্টারও বেশি সময় হোটেলে অপেক্ষা করাটা যেন অসহ্য হয়ে উঠেছিল। বিমানের সামনের দিকে এক সারিতে বসেছে মেয়েটি। তার পাশে বাচ্চাসহ সেই মহিলাটি। মাঝের দিকে নিজের সিট পেল ছেলেটি। দুই মিনিট পরই তার পাশে এসে বসল এক ইংরেজ ভদ্রলোক।

একসময় বিমান আবার আটত্রিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে পশ্চিমে ডানা মেলল। এরপর বাকি পথটুকুর সিংহভাগ উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর থাকতে হবে। এশার নামাজের সময় হয়ে এলো। কিন্তু বিমান এখন একটু দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হয়ে ছুটছে। অর্থাৎ নামাজ পড়তে হলে পাশের ভদ্রলোককে তুলে দিতে হবে। একান্ত তুলে দিতে না পারলে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যে পাশের লোকটির সঙ্গে দু-চারটি কথা হয়েছে। লোকটি অমিশুক না। ছেলেটা প্রথমে বেশ অস্বস্তি প্রকাশ করতে শুরু করল। নড়াচড়া করছে, পেপার-ম্যাগাজিন ঘাঁটছে, কোনোটাতেই যেন স্বস্তি পাচ্ছে না এমন ভাব। একপর্যায়ে পাশের ভদ্রলোক ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কোনো সমস্যা? আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি?’

‘নামাজের সময় হয়েছে, নামাজ পড়ব, কিন্তু বিমানটা একটু দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হয়ে যাচ্ছে…।’

ইংরেজ ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা বুঝে নিলেন।

‘আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি। আপনি ততক্ষণে নামাজ পড়ে নিন’, বলে উঠে চলে গেলেন।

ছেলেটি ধন্যবাদ জানাল ভদ্রলোককে। কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এলো। এর মধ্যে নামাজ পড়া হয়ে গেছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর রাতের খাবার পরিবেশন করা হলো। খেয়ে-দেয়ে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়ল। মেয়েটি একটি ম্যাগাজিন নিয়েছে। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়বে। তবে ছেলেটি দুপুরে ঘুমিয়েছে। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসবে না, তাই একটা পত্রিকা হাতে নিল।

দীর্ঘ রাত। বিমানের ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। আকাশে চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের স্নিগ্ধ আলো পৃথিবীপৃষ্ঠে যেন তার কোমল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো সময় মেঘের আড়ালে চাঁদ হারিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ একটা এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলছে। একটা বিশাল অঞ্চল অন্ধকারে ঢাকা আর একটা অঞ্চল চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে পৃথিবীতে যেন এক রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করছে।

বিমান একটা নির্দিষ্ট আওয়াজ সৃষ্টি করে উড়ছে। সবকিছুই যেন ছন্দের সঙ্গে চলছে। শুধু ছন্দের পতন ঘটেছে আকাশ পরীদের মধ্যে। একজন এয়ার হোস্টেস ককপিট থেকে বের হয়ে এসে তার সহকর্মীর কানে কী যেন বলতেই তার চেহারায় আতঙ্ক ফুটে উঠল। তার পরেরজনকে বলতেই তারও ভাবান্তর ঘটল। এভাবে প্রত্যেকের চেহারায় পরিবর্তন ঘটল। তারা করিডোরের টহল বাদ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ককপিটের দিকে।

এদিকে, যাত্রীদের কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। অনেকে দিনে বেশ ঘুমানোর কারণে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুম পাচ্ছে না। তাদের কেউ কেউ রিডিং লাইট জ্বেলে পেপার-ম্যাগাজিন পড়ছে। কেউ হেডফোন কানে লাগিয়ে অডিও ক্যাসেট জ্যান্ত করে দিয়েছে, কেউবা সহযাত্রীর সঙ্গে হালকা গল্প করছে। অনেক মহিলা তাদের সন্তানদের ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত। কেউ বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে প্যাসেজ ধরে হাঁটছে। কেউ বাথরুম সারতে গেছে। কেউবা ঘুমের ঘোরে ডুব দিয়েছে। এভাবে একেকজন একেকভাবে মগ্ন আছে।

আরো পাঁচ মিনিট পর বেরসিকভাবে জ্যান্ত হয়ে উঠল বিমানের প্রতিটি লাউড স্পিকার। সেখান থেকে ভেসে এলো ক্যাপ্টেনের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর, ‘হ্যালো, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…।’ এবার ওয়েলকাম বলল না ক্যাপ্টেন। ‘আমরা উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যখান দিয়ে উড়ে চলেছি। আমাদের নীচে আশপাশে বিমান নামানোর মতো অর্থাৎ ল্যান্ড করার মতো কোনো দ্বীপ নেই, যেসব ছোট দ্বীপ আছে, ওপর থেকে সেসব সহজে চোখে পড়ে না।’ ক্যাপ্টেন তার উত্তেজিত কণ্ঠকে স্বাভাবিক রেখে কথা বলার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। যারা জেগে ছিল তারা প্রথম থেকেই কান খাড়া করে শুনছে। যারা ঘুমন্ত ছিল তারাও এর মধ্যে জেগে উঠে এই অস্বাভাবিক কথাবার্তায়…

‘তার ওপর দ্বীপগুলোয় পাহাড় আছে, আছে ঘন জঙ্গল। পাহাড়ে ধাক্কা লাগলে কারো বাঁচার সম্ভাবনা একদম কম, সে জন্য সে চেষ্টা না করে পানিতে নামার চেষ্টা করাই অপেক্ষাকৃত শ্রেয়। কারণ সাঁতরিয়ে এক-দুজন বেঁচেও যেতে পারে।’

এসব কথাবার্তায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে গেছে। আসল বিষয় জানতে পারছে না। না থেমেই বলে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন, ‘আমার এসব কথাবার্তায় অনেকে হয়তো অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। তিক্ত হলেও সত্য, আপনাদের জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে। দুঃসংবাদ দেয়ার আগে পরিস্থিতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম, যেন তা শুনে প্রথমেই অস্থির হয়ে না পড়েন। এবার মনকে শক্ত করে দুঃসংবাদটি শুনুন।

‘প্রায় আধা ঘণ্টা আগে প্রথম ধরা পড়ে, আমাদের বিমানের ফুয়েল অস্বাভাবিকহারে কমে গেছে। তারপর থেকে দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিকের তুলনায় ফুয়েল অতি দ্রুত কমছে। মাত্র আর বিশ মিনিট ওড়ার মতো ফুয়েল আছে। ফুয়েল যে হারে কমছে সেই অনুপাতে এই হিসাব করা হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিমান ল্যান্ড করানোর মতো কোনো দেশে পৌঁছানো যাবে না। আমাদের জানামতে নীচের বিস্তীর্ণ এলাকা বিরান ভূমি। মানুষের বসবাস নেই। ফুয়েল এত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে, হয়তো ফুয়েল ট্যাংকের কোথাও ছিদ্র হয়েছে। বুঝতেই পারছেন, আমরা আর আঠার মিনিট ভেসে থাকতে পারব। আরো কিছুক্ষণ ভেসে থাকার জন্য চারটা ইঞ্জিনের দুটো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে আমরা মাত্র বার হাজার ফুট উঁচুতে রয়েছি। পাঁচ মিনিট আগে কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছি না। আমরা ব্যর্থ, আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাদের কয়েকটা প্যারাসুট আছে, কিন্তু আমরা তা ব্যবহার করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরাও আপনাদের পরিণতির সঙ্গী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে আপনাদের মধ্যে কেউ যদি তা ব্যবহার করতে পারেন, তবে এখনই ককপিটে চলে আসুন, ভাগ্য ভালো হলে কোনো দ্বীপে ধীরে ধীরে নেমে যেতে পারবেন। আকাশে চাঁদ আছে। তবে পানিতে নেমে লাভ নেই, প্যারাসুট নিয়ে পানিতে ভেসে থাকা যাবে না।’

এর মধ্যে কম-বেশি সবাই তীব্র আতঙ্কে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কেউ কেউ মৃত্যুর আগে চোখ বুজে আছে। কেউবা সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু জেনে দোয়া-কালাম পড়ছে, তওবা করছে আল্লাহর কাছে। সবমিলে এক করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যেন মৃত্যুর আগেই সবার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কেউ প্যারাসুটের জন্য ককপিটের দিকে এগিয়ে গেল না, কারণ প্যারাসুট নিয়ে বাঁচার সম্ভাবনা একদম কম।

ক্যাপ্টেন আবার শুরু করলেন, ‘আমরা গতি ও উচ্চতা দুটোই দ্রুত হারাচ্ছি। আমরা কোনো দ্বীপের কাছাকাছি ল্যান্ড করার চেষ্টা করছি, যাতে কেউ না কেউ বাঁচতে পারে। কিন্তু আশপাশে কোনো দ্বীপও চোখে পড়ছে না, অথচ থাকার কথা। যেন আমাদের বিপদ দেখে সব উধাও হয়ে গেছে। তবে আমরা এখন পাঁচ হাজার ফুটে নেমে খুঁজে যাচ্ছি। এখনো কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।’

‘আর বড়জোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা পানির ওপরে আছড়ে পড়ব। তাতে বিমানের লাফানোর সম্ভাবনা আছে। আপনাদের মধ্যে যারা শেষ পর্যন্ত বাঁচার জন্য লড়তে চান, তাদের জন্য সামনে-পেছনে উভয় দরজা পানিতে পড়ার আগে খুলে দেয়া হবে। অবস্থা বুঝে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করবেন। যারা ভেসে থাকতে বা সাঁতরাতে পারবেন না, তারা অহেতুক শেষ সময়ে কষ্ট না করে সিটে বসে সিটবেল্ট বেঁধে শেষ প্রার্থনা করতে থাকুন। আমরা আপনাদের সঙ্গী হতে পেরে মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও আনন্দিত। আপনারা যারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছুক, তারা দুই দরজার যে কোনো দরজার সামনে দাঁড়ান। শক্ত করে কিছু ধরুন। তা না হলে আহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। আবার বলছি, দরজা খুলে যাওয়ার পর অবস্থা বুঝে পানিতে ঝাঁপ দেবেন। সময় আর নেই। তিন মিনিটের মধ্যে বিমান পানিতে আছড়ে পড়বে। এ নির্মম পরিণতির জন্য আমরা আবারো আপনাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি ও ক্ষমা চাচ্ছি। সম্মানিত যাত্রীগণ বিদায়!’ বলে ককপিট থেকে বের হয়ে এলেন কেবিনে। স্পিকার থেমে যেতেই কান্নার শব্দ বেশি করে কানে বেজে উঠল।

ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ইংরেজ ভদ্রলোকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে পেছনের দরজায় গিয়ে শক্ত হাতল ধরে দাঁড়াল। এর মধ্যে সে আল্লাহর দরবারে তওবা করে নিয়েছে। তার আগে দুজন একইভাবে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর আরো তিনজন কাঁদতে কাঁদতে একদম দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে সবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। আর কোনোদিন তাদের দেখতে পাবে না। যারা উঠে আসছে না, তারা এ অথৈ সমুদ্রে ভেসে থাকতে বা সাঁতার কাটতে পারবে না বলেই নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষায় বসে আছে।

এয়ার হোস্টেসরা অনেকক্ষণ ধরে যাত্রীদের পানি খাওয়াতে ব্যস্ত। যারাই চাইছে তাদের দিকেই এগিয়ে ধরছে পানি ভর্তি গ্লাস। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা শেষ সময়ে যাত্রীসেবা করে চলেছে, তাদের দায়িত্ব পালন করছে। ক্যাপ্টেনও এসে সে সময় যাত্রীসেবায় যোগ দিল, মুখে তার কোনো ভাবান্তর নেই। মৃত্যু যেন তার কাছে খেলা। তার মুখে কোনো আতঙ্ক ফুটে ওঠেনি। সব যাত্রীই যেন মৃত্যুর আগে পানি খেয়ে মরতে চায়। আরো দুই পাইলট ককপিট থেকে বের হয়ে এসে যাত্রীদের দিকে বিদায়সূচক হাত নাড়তে লাগল। এর মধ্যে সেই মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকে মায়ের কোল থেকে ক্রন্দনরত মেয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। সামনের দরজায় দুজন ক্রন্দনরত মেয়ে শক্ত কিছু ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে যেতে উদ্যত হতেই সিট থেকে মহিলাটি দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট সোনামণিকে চুমো খেল বেশ সময় নিয়ে। তারপর নিজের সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করে মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বলল, ‘যদি দেখ একে বাঁচাতে গিয়ে তোমার জীবন বিপন্ন, তখন একে ছেড়ে নিজের জীবন বাঁচিও, এটা আমার অনুরোধ।’ আর বলতে পারলেন না মহিলা, সিটে বসে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

এদিকে এয়ার কন্ডিশনের মধ্যেও মৃত্যুর আতঙ্কে সবাই ঘেমে উঠেছে। যারা সিটে বসে আছে তারা প্রত্যেকে তাদের আপনজন, প্রিয়জন বা সহযাত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মায়েরা তাদের বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কয়েকজন শ্মশ্রুমণ্ডিত মানুষ দুহাত তুলে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করছে। সব মিলে হাহাকার পড়ে গেছে।

মেয়েটা যখন বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে সামনের দরজায় অপেক্ষমাণ মেয়ে দুটির দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে এগোচ্ছে, তখন অনেকে তাদের দুজনকে তাকিয়ে দেখছে। সবার মনেই যেন একই প্রশ্ন, যেখানে নিজের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় নেই, সেখানে এ অবুঝ বাচ্চাসহ মেয়েটা বাঁচতে পারবে তো? দরজার দুপাশে লাগানো হাতলের একপাশে একহাতে ধরল, অন্য হাতে বাচ্চা মেয়েটাকে জড়িয়ে রইল। অন্য পাশের হাতল মেয়ে দুজন আগেই দখল করেছে।

তারপরই স্পিকার দুই সেকেন্ডের জন্য সচল হলো। ভেসে এলো ককপিটে অবস্থানরত একমাত্র পাইলটের কণ্ঠ, ‘আর মাত্র এক মিনিট। সঙ্গে সঙ্গে কান্নার শব্দ ভরে উঠল বিমানের ভেতরটা। ককপিট থেকে বের হয়ে আসা পাইলট দুজন ককপিটে অবস্থানরত তাদের সহকর্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়েই এসেছে। শেষ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তারা দুজনেই ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে তাদের কায়দায় অভিবাদন জানাল। ক্যাপ্টেনও তার জবাব দিলেন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, যেন কিছুই ঘটবে না। শেষদিকে দুজন লোক সামনের দরজায় মেয়েদের পাশে গিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াল। ধরার মতো আর কিছুই সেখানে নেই। সময়ও হাতে নেই। সিটে বসে থাকা সবাই সিটবেল্টে এর মধ্যেই নিজেদের বেঁধে নিয়েছে। তা নাহলে মৃত্যুর আগে ঝাঁকুনিতে আহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। হঠাৎ করে ‘রেডি’ বলে একদম নীরব হয়ে গেল স্পিকার। দুটো দরজাই খুলে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়ল বিমান সাগরের বুকে। তারপরই আবার বিমানটা প্রায় পঁচাত্তর ফুট লাফিয়ে উঠল, আবার আছড়ে পড়ল; আবার প্রায় পঞ্চাশ ফুট লাফিয়ে উঠল, আবার আছড়ে পড়ল উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে। আর লাফিয়ে উঠল না।

তিনবারই প্রচণ্ড শব্দ হলো। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার তুলনামূলক কম হয়েছে। পানি অনেকদূর ছিটকে গেছে। বিমানের ভেতরে সবাই ভয়ে প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠল। প্রত্যেকবার আছাড় খাবার সময় সিটবেল্ট থাকা সত্ত্বেও কম-বেশি সবারই আঘাত লাগল। অধিকাংশ মায়ের কোল ফাঁকা হয়ে গেছে। কারণ তাদের বাচ্চা কোনদিকে ছিটকে পড়েছে তার ঠিক নেই। প্রথমবার আছড়ে পড়ার পরই সব আলো নিভে গিয়ে যেন অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছে বিমানের ভেতরে। বাচ্চারা ছিটকে পড়ে যাওয়ায় আহত হয়েছে। তাদের গগনভেদী আর্তচিৎকার যে কোনো পাষাণ হৃদয়ও গলে যাবে। নরক গোলজার অবস্থা। এর মধ্যে বিমানে  পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ভরে যাবে অথৈ পানিতে। সামনের দরজায় দণ্ডায়মান লোক দুজন প্রথমবার আছড়ে পড়ার আগেই লাফ দেয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; এর মধ্যে বিমানটা খানিক এগোনোর ফলে বিমানের ডানা এসে তাদের ওপর আছড়ে পড়ল। ফলে তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়ে তলিয়ে গেল। প্রথমবার আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাসহ মেয়েটি ছিটকে কেবিনের দেয়ালে কপালে বাড়ি খায়। যে হাত দিয়ে হাতল ধরে ছিল, তা খুলে গেছে। হাত খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটাকে সে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেই আছড়ে পড়েছে বলে বাচ্চাটা তেমন কোথাও আঘাত পেল না। দ্বিতীয়বার আছড়ে পড়তেই মেয়ে দুজন লাফিয়ে পানিতে নামে কিন্তু বিমানের আছড়ে পড়াতে যে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, তার কবলে পড়ে দুজনেই তলিয়ে যায়। দ্রুত ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দুজনেই দম হারিয়ে ফেলে। ফলে অক্সিজেনের জন্য মুখ খুলতেই দ্রুত লবণাক্ত পানি গিলে ফেলে। নাকে-মুখে পানি ঢোকায় প্রচণ্ডভাবে হাত-পা ছুড়তে শুরু করে। তাতে দ্রুত শক্তি নিঃশেষ হয়ে চূড়ান্তভাবে তলিয়ে যায় সমুদ্রগর্ভে।

দেয়ালে বাড়ি লাগায় মেয়েটার কপাল খানিকটা ফেটে গিয়ে রক্তের ধারা পড়া শুরু করেছে। তবুও বাচ্চাটাকে সে শক্ত করে ধরে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে বাচ্চাটাও যেন কাঁদতে ভুলে গেছে। ককপিট থেকে কেবিনকে যে দেয়ালটা পৃথক করেছে, তার মাঝখানে একটা দরজা আছে। দরজাটা খোলাই ছিল। প্রথমবার আছড়ে পড়াতে দরজার কব্জাগুলো একদম নড়বড়ে হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার আছড়ে পড়াতে তা দেয়াল থেকে খুলে মেঝেতে মেয়েটার পাশে পড়ল। আছড়ে পড়ার শব্দে মেয়েটা চমকে উঠল। বিমানের ভেতরে অন্ধকার থাকায় কিছু দেখাও যাচ্ছে না; তবে চাঁদের ম্লান আলো দরজা গলে কিছুটা ভেতরে আসছে। প্রায় একই অবস্থা ঘটল ছেলেদের বেলায়ও। প্রথম যে দুজন এসে দাঁড়িয়েছিল, তারা দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল। আর দরজা খুলে গেছে পানিতে বিমান পড়ার ঠিক তিন সেকেন্ড আগে।

প্রথম দুজনের মধ্যে একজন প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে মাথা নীচের দিকে হয়ে পড়ে গেল। অথৈ পানিতে তার ওপর বিমান আছড়ে পড়ায় সৃষ্টি হওয়া বিশাল ঢেউয়ে একদম তলিয়ে গেল। দম ফুরিয়ে যাওয়ায় আর ভাসতে পারল না। দ্বিতীয়জন লাফ দিতে গিয়ে বুকের পাশ পানিতে পড়ে যায়। বুকে পানির প্রচণ্ড চাপে অজ্ঞান হয়ে ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল। বাকি চারজনের মধ্যে একজনকে কেউ বাধা দেয়ার আগেই দ্বিতীয়বার আছড়ে পড়ার আগে লাফিয়ে পানিতে পড়ল। সেই ছেলেটা পূর্ববর্তী দুজনের পরিণতি চাঁদের আলোয় আবছাভাবে দেখতে পেয়ে তাকে বাধা দিতে চেয়েছিল; কিন্তু সুযোগ পেল না।

ছেলেটা পানিতে পড়তেই বিমান দ্বিতীয়বার আছাড় খেল এবং বিমানের খুলে যাওয়া দরজাটা তার মাথায় প্রচণ্ড বাড়ি মেরে ডুবে যাওয়ার আগেই তার মৃত্যু ঘটল। বাকি চারজনের প্রত্যেকেই যখন পূর্বগামীদের করুণ পরিণতি দেখে পানিতে ঝাঁপ দেয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই তৃতীয়বার পানিতে আছাড় খেয়ে অনেকটা স্থির হয়ে গেল বিমান। বিমান স্থির হওয়াতে হাতঘড়ির লাইট জ্বেলে সময় দেখে নিল ছেলেটি। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। আছাড় খাওয়ার প্রত্যেকবারই যারা দরজার হাতল প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে ছিল, তাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি লেগেছে। কিন্তু যারা বিমান আছড়ে পড়ার আগেই ঝাঁপ দিয়েছে, তাদের তেমন লাগেনি; তবে করুণ পরিণতি তাদের দ্রুত মুক্তি দিয়েছে। বিমান স্থির হয়ে যাওয়াতে সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে চারজনই পানিতে লাফ দিল। চারজনই বাঙালি। চারজনেরই অপ্রকাশিত উদ্দেশ্য হলো একটু দূরে ভেসে থাকা বিশাল দরজাটা। চারজনের মধ্যে দুজন মাঝবয়সী, বাকি দুজন যুবক। শ্মশ্রুমণ্ডিত মাঝবয়সী একজন। সে দরজা থেকে লাফিয়ে অনেক দূরে পড়ল। বাকি তিনজন বেশ কাছে লাফিয়ে পড়ল। তারা তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে দরজাটা আঁকড়ে ধরল। উৎকণ্ঠায়-পরিশ্রমে হাঁপাতে লাগল তিনজনই। সাঁতরিয়ে এগিয়ে আসছে লোকটা। ভাসমান দরজাটা আঁকড়ে ধরে তিনজন লোকটার জন্য অপেক্ষা করছে, বিশ্রামও নিচ্ছে। তিনজনেরই নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি ঢোকায় হাঁচি আসছে। তাতে শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে যাচ্ছে। ঢেউয়ের তালে তালে দরজাসহ তিনজনই একবার ঢেউয়ের মাথায় উঠছে, আবার নীচে নামছে। লোকটা সাঁতরিয়ে অনেক কাছে এসে পড়েছে, আর অল্প একটু বাকি। বিপরীত দিক থেকে হঠাৎ করেই এক বিশাল ঢেউ এসে অপ্রত্যাশিতভাবে দরজাসহ তিনজনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিল। শেষ মুহূর্তে লোকটা সম্মুখে যমদূতকে দেখতে পেল; কিন্তু ততক্ষণে সময় শেষ হয়েছে। ইস্পাত মোড়া দরজাটা প্রচণ্ড জোরে লোকটার মাথায় ঠুকে গেল। মাথা ফেটে যাওয়ায় গা শিউরে ওঠা একটা শব্দ হলো। পরমুহূর্তে লোকটা হাত-পা ছেড়ে দিয়ে তিনজন মানুষের সামনেই তলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। তিনজনের মুখেই শোকের এক নীরব ছায়া ফুটে উঠল। আর কারো জন্য অপেক্ষা করার নেই। ভাসমান দরজাটা ধরে তিনজনই বাঁচার আশায় কোনো একদিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

তৃতীয়বার আছড়ে পড়ার পর বিমান খানিকটা স্থির হতেই ভেতরে পানি ঢোকা শুরু হলো। বিমানের ভেতরে অন্ধকারে মানুষের আর্তচিৎকারে এক নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি হলো। তারা ধীরে ধীরে ডুবে যাবে সাগরের তলদেশে। মৃত্যু যেন তাদের সঙ্গে আলিঙ্গন করতে সদা প্রস্তুত। আর্তচিৎকার ছাপিয়ে ক্যাপ্টেনের গম্ভীর গলা শোনা গেল, ‘আপনারা প্রত্যেকেই এই অন্ধকারে সিটবেল্ট খুলে মুক্ত হউন; তাতে বিমান যখন পানিতে ভরে উঠবে, তখন আপনারা হয়তো বাঁচার জন্য হাত-পা ছুড়তে পারবেন, এতে মৃত্যুকষ্ট কিছুটা হলেও কম হতে পারে। কমপক্ষে বন্দী অবস্থায় তো মৃত্যু হবে না। আমি আপনাদের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে নেয়ার জন্য বিমানের ভেতরেই থেকে গেলাম।’ শেষের বাক্যটা যাত্রীদের কিছুটা হলেও সান্ত¦না দেয়ার জন্য বলল ক্যাপ্টেন। ‘বিদায় বন্ধুগণ, বিদায়।’ এর মধ্যে মেয়েটি বাচ্চা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বিমানটা দরজার পাশে খানিকটা হেলে গেছে। হাঁটু পর্যন্ত পানিতে মেঝে ডুবে গেছে। দ্রুত পানি ঢুকছে, সেই সঙ্গে একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে বিশাল কাঠামো।

পানিতে কাঠের দরজাটি ভেসে উঠেছে। দরজা দিয়ে পানি ঢোকার স্রোতে দরজাটি বিপরীত দিকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। দরজাটি ভাসতে দেখে হঠাৎ করে মেয়েটির মাথায় একটা বুদ্ধি চাপল। বিপদে পড়লে অনেকের মাথা থেকে এমন সব বুদ্ধি বের হয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয় না। মেয়েটা পানি ভেঙে গিয়ে বাচ্চাটাকে দরজার মাথায় বসিয়ে দিয়ে নিজে শুয়ে পড়ল তার ওপর। যখন দেখল, দরজাটা তাদের নিয়ে কোনোরকমে ভেসে থাকল, একদম তলিয়ে গেল না, তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল মেয়েটার মুখে। তারপর মেঝেতে পা ঠেকিয়ে এগোতে লাগল। দরজার কাছাকাছি এসে আর কিছুতেই সামনের দিকে এগোতে পারছে না, দুটো বাধার জন্য। প্রথমত দরজা দিয়ে পানি ঢোকার স্রোতের জন্য, দ্বিতীয়ত ভেতরের পানি বেশ বেড়ে যাওয়ায় দরজাসহ বেশ ওপরে ভেসে উঠেছে। ফলে মেঝেতে মেয়েটার পা আর নাগাল পাচ্ছে না। সাঁতরাতেও পারছে না ভালোভাবে, কারণ একহাতে বাচ্চাটাকে দরজার গায়ে আটকে রাখছে, আর একহাতে নিজেকে অতিকষ্টে দরজার ওপর ধরে রাখছে। ধীরে ধীরে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের ম্লান আলোতেও বেশ দূর থেকে তাদের এই দুরবস্থা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবে।

‘তুমি ওকে ফেলে দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা কর।’ মেয়েকে বিদায় দিয়ে মা বসে পড়লেও বিমান স্থির হতেই সিটবেল্ট খুলে দাঁড়িয়ে তাদের দুরবস্থা দেখছেন। প্রায় কোমর পর্যন্ত পানি উঠেছে। এ অবস্থায় হেঁটে তাদের কাছে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব। ‘ওর জন্য তোমার মারা যাওয়ার দরকার নেই।’ ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন মহিলা। মহিলার চিৎকার শুনে তাদের দিকে ফিরে তাকালেন ক্যাপ্টেন। এক মুহূর্ত লাগল মেয়েটির উদ্দেশ্য ও সাধনের পথে বাধা হওয়ার কারণ বুঝতে। তিনি দেখলেন পানি অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় হাঁটা প্রায় অসম্ভব। তবে তিনি ওই মহিলার চেয়ে অনেক কাছে আছেন। কালবিলম্ব না করে তিনি তাদের দিকে সাঁতরানো শুরু করলেন।

ততক্ষণে অনেক পিছিয়ে গেছে মেয়েটা বাচ্চাসহ। পানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই। ‘ওর জন্য তোমার মারা যাওয়ার কোনো অর্থ নেই।’ আবার চেঁচিয়ে বললেন মহিলা। সবার কান্নার শব্দ ছাপিয়ে তার কথা সবাই শুনতে পেয়ে কেউ কেউ তাকাল। ‘ওকে ফেলে চলে যাও, দোহাই তোমার।’

‘না, আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব।’ চেঁচিয়ে জবাব দিল মেয়েটি। তীব্র আতঙ্কে সুন্দর মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেছে। এয়ার হোস্টেসরা খালি সিটগুলোয় বসে আছে, তাদের কর্তব্য শেষ হয়েছে। কিন্তু ক্যাপ্টেনের কর্তব্য যেন এখনো বাকি আছে। তাই তিনি এর মধ্যে পৌঁছে গেছেন ভাসমান দুই মানবীর কাছে।

‘ম্যাডাম, আমি আপনার সাহস ও বুদ্ধির প্রশংসা করছি। আমি আমার সর্বশেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আপনাদের দুজনকে এই বিমান থেকে বের করে দেব, তারপর ঈশ্বর আপনাদের ফয়সালা করবেন।’ বলতে বলতে মধ্যবয়স্ক স্মার্ট ক্যাপ্টেন দুহাতে দরজার পেছনে ধরে সাঁতরিয়ে দরজার দিকে টলতে লাগলেন। ‘আপনি মা মণিকে নিয়ে স্থির হয়ে শুয়ে থাকুন, যা করার আমি করছি।’ কিন্তু সাঁতরিয়ে তিনি তাদের বেশি সামনে নিয়ে যেতে পারলেন না। কারণ পানি দরজা দিয়ে দ্রুত ঢুকে বিপরীত দিকে ঠেলছে। এভাবে হবে না ভেবে পা দুটি মেঝেতে নামালেন অর্থাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। ক্যাপ্টেন লম্বা মানুষ, তার বুক পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। এরই মধ্যে অতি কষ্টে প্রায় সবটুকু শক্তি দিয়ে পানি ভেঙে হেঁটে দুহাত দিয়ে ভাসমান জীবনতরীটিকে দরজার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই কাজটুকু করতে সমুদ্রের ঠান্ডা পানিতেও ঘেমে যাচ্ছেন। দরজার পাশে বিমান বেশি হেলে যাওয়ায় এখানে ক্যাপ্টেনের গলা বরাবর পানি হয়েছে, প্রায় এগোনোই যাচ্ছে না। তীরে এসে তরী ডুববে ভেবে ক্যাপ্টেন তার সমস্ত মনোবল ও শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা পার করে দিয়ে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন এই ভেবে যে, শেষ সময়েও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়েছেন।

দরজা থেকে বেরিয়েই মেয়েটা দেখতে পেল, ক্যাপ্টেন দরজার একটা হাতল একহাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে তাদের উদ্দেশে বিদায় জানাচ্ছে। দুজন মানব সন্তানকে এই নরককুণ্ড থেকে খোলা সাগরে জীবনতরীসহ বের করে দিতে পারার আনন্দে ক্যাপ্টেনের চোখে পানি এসে গেছে। কিন্তু সে অশ্রু তাদের দেখতে পারার কথা নয়, দেখার দরকারও নেই।

‘ক্যাপ্টেন, আপনিও আসুন।’ চেঁচিয়ে বলল মেয়েটি। ‘এটা ধরেই আমরা ভেসে বাঁচতে পারব।’ ইঙ্গিতে দরজাটা দেখাল সে। এ মুহূর্তেও চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় তাকে পরীর মতো রূপসী লাগছে।

‘আমি যাব না, দেরি না করে চাঁদের সাহায্যে দিক ঠিক রেখে পূর্ব দিকে চলে যান, কারণ চাঁদ এখনো পূর্ব দিকেই আছে। বিদায়।’ শেষবার হাত নেড়ে সাঁতরে ভেতরে ঢুকে গেলেন ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টেনের শেষ উক্তিটা সামনের কয়েকজন যাত্রী শুনতে পেয়েছে। একজন জোরে বলল, ‘ক্যাপ্টেন, আপনি চলে যান, বাঁচার চেষ্টা করেন।’ কয়েকজন যেন ওই একই কথার প্রতিধ্বনি তুলল। ‘হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন, আপনি চলে যান।’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, ‘আমি আপনাদের এ অবস্থায় ফেলে চলে যেতে পারি না। আমিও আপনাদের অবস্থার শিকার হব বলে থেকে গেলাম। তাছাড়া আমি বেশিক্ষণ সাঁতরাতে পারব না।’ বলতে বলতে তিনি কেবিনের মধ্য দিকে সাঁতরানো শুরু করলেন। এর মধ্যে অনেকেই অন্ধকার কেবিনে সাঁতরানো শুরু করেছে। যারা সাঁতরাতে পারে না, তারা সিটের ওপরে দাঁড়িয়ে পড়েছে, যাতে বিলম্বে মৃত্যু হয়। এ পৃথিবীর মায়া বড় ভয়ানক জিনিস। বিমান অর্ধেকের বেশি পানিতে তলিয়ে গেছে। বড় জোর আর দশ-পনের মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণটা পানিতে নিমজ্জিত হবে।

এখন প্রায় সবাই ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অনেকেরই কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে। অল্পসংখ্যক লোক এখন কাঁদা বাদ দিয়ে শেষ প্রার্থনা করছে। ছোট বাচ্চাদের মা-বাবারা শেষবারের মতো তাদের সন্তানদের আদর করে মাথার ওপরে তুলে ধরছে। তাদের বুক বা গলা পর্যন্ত পানি উঠেছে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা ডুবে যাবে, তখন মৃত বাবা-মার হাত থেকে তারাও পানিতে পড়ে মারা যাবে। বিমানের ভেতর অনেকদিন পর হয়তো তাদের লাশ অথবা কঙ্কাল পাওয়া যাবে। এ কথা ভাবতেই অনেকের মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে।

খোলা আকাশের নীচে ভাসতে ভাসতে মেয়েটা দেখল, ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। পরক্ষণেই তার মনে হলো, কেন আমিও তাদের মৃত্যুর সঙ্গী হলাম না, কেন আমি মৃত্যুর ভয়ে পালাতে চাচ্ছি। তারপর বিবেক থেকে সঠিক উত্তর পাওয়া গেল। এ মেয়েটির মা আমার হাতে তাকে দিয়েছে এ আশায় যে, আমি যেন তাকে বাঁচাই। যেন সে আরো অনেকদিন পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে পারে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুধু এই বাচ্চাটাকে বাঁচানোর জন্যই আমার বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং আর দেরি নয়। এখনই আমাকে রওনা দিতে হবে। ক্যাপ্টেন বলেছেন, চাঁদের সাহায্যে দিক ঠিক রেখে পূর্ব দিকে যেতে। কারণ চাঁদটা এখনো পূর্ব দিকেই আছে। তাতে দিক ঠিক রাখার সুবিধা হবে। পূর্ব দিকে না গেলে দ্বীপ পাওয়া যাবে, সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। পূর্ব দিকে কত দূরে দ্বীপ আছে, সে এসব ভাবতে চাইল না। কারণ, তাহলে আর বাঁচার চেষ্টা করতে ইচ্ছে হবে না। অবশেষে পূর্ব দিকেই যাওযার সিদ্ধান্ত নিল। পেছনে তাকিয়ে দেখল, বিমান ডুবতে আর অল্প বাকি আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা হারিয়ে যাবে পানির মধ্যে। ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখার জন্য দেরি করে লাভ নেই। তাই এখনই রওনা দেয়ার জন্য মনস্থির করল।

নিজে দরজার ওপরে শুয়ে পা দুটো পানিতে ঝুলিয়ে রাখল মেয়েটি, যাতে পা দিয়ে পানিতে বাড়ি মেরে সবসহ এগোতে পারে। বাচ্চাটাকে একহাত দিয়ে বুকের কাছে শক্তভাবে চেপে ধরে রাখল। অন্য হাত দিয়ে দরজার সঙ্গে লাগানো হাতল চেপে ধরল, যাতে দরজা ছুটে চলে না যায়। মাথা উঁচু করে রাখল, যাতে নাকে-মুখে লবণাক্ত পানি তেমন না ঢোকে। আর সামনের দিকটা যাতে দেখা যায়। বাচ্চাটার বয়স চার বছরের বেশি হবে না, বেশ চঞ্চল। কিন্তু কোলে নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারও কাঁদেনি, এমনকি কোনো কথা পর্যন্ত বলেনি, যেন বোবা হয়ে গেছে। হয়তো এ পরিস্থিতি তাকে এমন নিশ্চুপ করে দিয়েছে। বাচ্চাটাও দুহাতে মেয়েটার গলা আঁকড়ে ধরেছে, আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটা পা পানিতে বাড়ি মেরে পূর্ব দিকে ফিরল। তারপর শেষবার নিমজ্জিতপ্রায় বিমানটাকে একনজর দেখে পানিতে পা বাড়ি মেরে যাত্রা শুরু করল পূর্ব দিকে।

পূর্ব দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কিছুক্ষণ কেউই তেমন নড়ল না। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বিমানের দিকে। ‘আপনারা কি এখানেই থাকবেন, না বাঁচার চেষ্টা করবেন?’ বলল অপর ছেলেটি। এর মধ্যে অল্প কিছুক্ষণ আগে মৃত কয়েকটা নারী-পুরুষের লাশ ভেসে উঠেছে। তার মধ্যে কোনো কোনোটা থেকে রক্ত বের হয়ে নীল দরিয়াকে লাল দরিয়ায় পরিণত করছে। সেদিকে তাকিয়ে সেই ছেলেটি বলল, ‘আমার আর এখন এ মৃত্যুপুরী থেকে পালাতে ইচ্ছে করছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে, এ পাপ-পঙ্কিলময় দুনিয়ায় বেঁচে থেকে শুধু পাপের বোঝাই বাড়বে, পুণ্য আর কতটুকু বাড়বে! ‘আমি কিছুক্ষণ আগে তওবা করেছি। তারপর আমার মনে হয় আর কোনো পাপ কাজ এখন পর্যন্ত স্বজ্ঞানে করিনি। এ অবস্থায় মরতে পারলে হয়তো আল্লাহ্ মাফও করতে পারেন।’

‘আমার মনে হয়, তোমার মা আছেন।’ কথায় বাধা দিয়ে বলল মধ্যবয়স্ক শ্মশ্রুমণ্ডিত লোকটি।

‘জি, আমার বিধবা মা আছেন।’ বলল ছেলেটি।

‘নবী করিম (সা.) মায়ের কথা তিনবার বলেছেন, মায়ের পদতলেই সন্তানের বেহেশত। মায়ের সেবা করার নিয়তে তোমার বাঁচার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহর সাহায্য কামনা কর, তুমি বেঁচে যাবে ইনশাআল্লাহ্।’ উদাস কণ্ঠে বলল লোকটি। ‘আমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই, তবে আমাদের বাঁচার চেষ্টা করাই উচিত। তা নাহলে ভুল হবে। আল্লাহ্ই জানেন, তিনি কার কতটুকু হায়াত রেখেছেন।’ বলে থামল লোকটি।

এর মধ্যে বিমানের প্রায় সিংহভাগ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সবটাই নিমজ্জিত হবে। ‘ওই দেখেন, দরজায় ক্যাপ্টেন, আর পানিতে ভাসমান একটা বাচ্চাসহ মেয়ে।’ বলল অপর ছেলেটি। ফিরে তাকাল বাকি দুজন। ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছে বলে তাকে চেনা যাচ্ছে।

‘আচ্ছা, বাচ্চাসহ মেয়েটা কে?’ আবার বলল যুবক।

‘অত মানুষের মধ্যে কয়জনের চেহারা চিনে রাখা যায়! আর এতদূর থেকে ভালোভাবে দেখাই যাচ্ছে না।’ বলল সেই ছেলেটি।

‘ওই দেখ, ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে ডুবে যাচ্ছে।’ বলল মধ্যবয়সী লোকটি। ‘উনি যাবেন না। দেখেন, আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ডুবে যাবে।’ তিনজনই বিমানের দিকে তাকিয়ে আছে। তন্ময় হয়ে দেখতে থাকল বিমানের ডুবে যাওয়ার করুণ দৃশ্য। ভেতর থেকে শোনা যেতে লাগল আর্তচিৎকার।

কতক্ষণ কেটে গেছে কেউ বলতে পারবে না। হয়তো পাঁচ মিনিট বা দশ মিনিট। সজাগ হলো তখন, যখন ভুশ করে একদম তলিয়ে গেল বিমানটা অথৈ সাগরে। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল সব ক্রন্দন, আর্তচিৎকার। হঠাৎ করেই চারদিক সব নীরব হয়ে গেল, যেন এখানে কিছুই ঘটেনি। তিনজনেরই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা।

‘আর এখানে থেকে লাভ নেই। এবার যাত্রা শুরু করা যায়। তাতেই অনেক দেরি হয়ে গেল।’ বলল অপর ছেলেটি। ঘড়ি দেখল সেই ছেলেটি, প্রায় পৌনে বারটা বাজে। ‘কোনদিকে যাওয়া যায়?’ অনেকক্ষণ পর কথা বলল অপর লোকটি। ‘চাঁদের হিসাব অনুযায়ী চাঁদ এখনো পূর্ব দিকে আছে। ভোর পর্যন্ত তা আকাশে থাকবে। আর চাঁদের আলোয় তারাগুলো ম্লান হয়ে গেছে। তাই আমার মনে হয়, চাঁদের সাহায্যে দিক ঠিক রেখে পূর্ব দিকে যাওয়া যায়। কোনো দ্বীপ পাওয়া যেতে পারে।’ একনাগাড়ে কথা বলে থামল শ্মশ্রুমণ্ডিত লোকটি। যেন সে পুরো বিষয়টা বিশ্লেষণ করল।

বাকি দুজন মাথা নেড়ে সায় জানাল। ‘আচ্ছা, আমরা তো পূর্বে যাচ্ছি। মেয়েটা বাচ্চাসহ কোনদিকে গেল?’ সামনে তাকিয়ে বলল অপর ছেলেটি। ‘তাই তো’ বলে সামনে তাকাল বাকি দুজন। কিন্তু তিনজনই চারপাশে চোখ বুলিয়ে আশপাশে মৃত লাশ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। শেষ পর্যন্ত খোলা আকাশের নীচে পূর্ব দিকে রওনা হলো তিনজনের কাফেলা।

ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল দুই মানবীর ছোট্ট কাফেলা। মহাসাগরের ঢেউ এসে বারবার ভিজিয়ে দিচ্ছিল দুজনকে। পানি অত্যন্ত ঠান্ডা, ইতোমধ্যে দুজনেরই কাঁপুনি ধরে গেছে। দুজনে ঢেউয়ের তালে তালে ঢেউয়ের মাথায় উঠছে, আবার নামছে। কখনো বড় বড় ঢেউ গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তখন নাকে-মুখে পানি ঢোকায় প্রচণ্ড কাশি-হাঁচি হচ্ছে। হাঁচি হওয়াতে শরীর অনেকটা সতেজ হচ্ছে। বাচ্চাটা মেয়েটার ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে চুপ করে আছে। গলা জড়িয়ে ধরে আছে। মেয়েটা বুঝতে পারছে তার মতো বাচ্চাটাও ঠান্ডায় ও আতঙ্কে কাঁপছে। নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে তাকে কিছুটা হলেও উষ্ণতা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। খানিক পরপর পা নেড়ে এ মহাতরীর গতি ও দিক ঠিক রাখতে মেয়েটা হিমশিম খাচ্ছে। পায়ে জুতা ছিল। বাচ্চাটাকে বিমানে  কোলে নেয়ার সময় তা খুলে রেখে এসেছে। তা না হলে এখন তা খুলে সমুদ্রে ফেলে দিতে হতো, নচেৎ কিছুতেই পা বেশিক্ষণ নড়ানো যেত না। শরীরের কাপড় নিজেকে অনেকখানি ভারী করে ফেলেছে। তবে তা খুলে ফেলে দেয়া যাবে না। কারণ কোনো দ্বীপে পৌঁছতে পারলে কাপড় অপরিহার্য। মানুষের মৌলিক চাহিদা বস্ত্র।

মেয়েটা ভালোই সাঁতার কাটতে পারে। নদীতে সে দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কেটেছে। তবে সমুদ্রে এ এক আলাদা অভিজ্ঞতা। সে জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের সঙ্গে মহাযুদ্ধ করে চাঁদের দিকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্লান্তি এসে যাচ্ছে, কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। মনোবল ঠিক রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে।

মনে মনে ভাবছে, মেয়েটির মা তার সহযাত্রী হওয়ায় শুধু আপনি আপনি করে সম্বোধন করে গেছে, নাম জানা হয়নি। ঠিকানাও জানা হয়নি। এসব জানার প্রয়োজন পড়েনি। যখন সে তার বাঁচার চেষ্টা করার ইচ্ছাটা জানাল মহিলাকে, তখন তিনি তাঁর বাচ্চাকে সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ জানান। তাঁর বাচ্চা বাঁচলেই যথেষ্ট। তবে এ কথাও জানিয়ে দেন, বাচ্চার কারণে যদি মেয়েটির নিজের জীবন বিপন্ন হয়, তবে যেন বাচ্চাটিকে বাদ দিয়ে নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে। বাচ্চাটা বাঁচলে কাকে দেবে সে সম্পর্কেও কিছু বলেননি। যদি বাচ্চাটা বলতে পারে, তাহলে তো ভালোই হয়। তা নাহলে ঠিক করল পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবে। বাচ্চার বাবা বা আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ পাওয়া গেলে তখন তাদের কাছে বাচ্চাটাকে ফেরত দেবে। তা না হলেও কোনো অসুবিধা নেই। সে ক্ষেত্রে সে নিজেই বাচ্চাটার লালন-পালনের দায়িত্ব নেবে, নিজের হাতে তাকে মানুষ করবে। বাচ্চাটাকে কাছে পেলেই সে বেশি খুশি হবে। কারণ এর মধ্যেই যে সে তাকে আপন করে নিয়েছে। সময়ের হিসাব না রেখেই এসব ভেবে চলল মেয়েটি।

এর মধ্যে চাঁদ প্রায় মাথার ওপরে এসে গেছে। এ রকম অবস্থায় দিক ঠিক রাখা কঠিন। এখন কী বুদ্ধি করা যায়, ভাবতে লাগল মেয়েটি। চাঁদ পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যাওয়ার সময় দক্ষিণ দিকে হেলে থাকে। তাহলে হাতের ডানে দক্ষিণ। যেহেতু চাঁদ পূর্ব-পশ্চিমের মাঝামাঝি জায়গায়, এমতাবস্থায় এ জীবনতরী হঠাৎ ঘুরে গেলে উত্তর-দক্ষিণ বোঝা না গেলেও পূর্ব-পশ্চিম বোঝার উপায় নেই। তাই সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজাগ রাখতে হবে, যাতে হঠাৎ ঘুরে গেলেও দিক বোঝা যায়। এভাবে ইন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে অত্যন্ত সংশয় নিয়ে অনেকক্ষণ ভেসে চলল। তারপর চাঁদের হেলে পড়া বোঝা যেতে লাগল। এখন পূর্ব দিক চেনা খুব কঠিন হবে না। বারবার পেছনে ফিরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে দিক ঠিক রাখতে হবে।

এদিকে পালাক্রমে তিনজনই পানিতে পা নেড়ে পূর্ব দিকে এগোতে লাগল। গতি অত্যন্ত মন্থর। তিনজনের কারো মুখেই অনেকক্ষণ থেকে কোনো কথা ফুটছে না। সবাই কেমন যেন আনমনা হয়ে গেছে।

‘বিমানে  আপনাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন ছিল?’ অনেকক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘না, আমি একাই যাচ্ছিলাম।’ একসঙ্গে দুজনেই জবাব দিল। মধ্যবয়স্ক লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কেউ ছিল?’ ছেলেটি বলল, ‘না।’ তারপর অনেকক্ষণ কোনো কথা হলো না।

এভাবে এগিয়ে চলল অনেকদূর। প্রত্যেকেই পালাক্রমে একটা আনুমানিক সময় পা নেড়ে চলছে। কখনোবা ঢেউয়ের তোড়ে কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছে। একবার ঢেউয়ের মাথায় চড়ছে, পরক্ষণেই নেমে যাচ্ছে। কখনো বড় বড় ঢেউ গায়ের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। সামনে যতদূর চোখ যায়, আশার আলো হিসেবে কিছুই দেখা যায় না। শুধু চারদিকে পানি আর পানি। হঠাৎ করে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনে থেকে পাহাড়সমান বিশাল এক ঢেউ এসে দরজাটাকে সামনের দিক থেকে উল্টে পেছনের দিকে ফেলে দিল।

সেই ছেলেটি আর মধ্যবয়স্ক লোকটি দুপাশের কিনার আঁকড়ে ছিল। উল্টে যাওয়ার সময় উভয় হাত থেকে দরজাটা ছুটে গেছে। কিন্তু অপর ছেলেটি দরজার মধ্যখানে হাতল আঁকড়ে ধরে ছিল। দরজাটার পিঠ পাশ দিয়ে স্থির হতেই দুজনেই মাথা তুলে ছেলেটিকে খুঁজতে লাগল। কোথাও তাকে দেখা গেল না। উপায় না দেখে ছেলেটি ‘এই, তুমি কোথায়? সাড়া দাও’ বলে ডাকল। দুজনের কেউই তার নাম জানে না। কয়েকবার ডেকেও সাড়া মিলল না দেখে দুজনে মিলে দরজাটা সরাতে লাগল। একটু পরেই ভুশ করে একটা দেহ ভেসে উঠল। ভেসে ওঠার ভঙ্গি দেখেই বোঝা গেল, মৃত। তারপরও মধ্যবয়স্ক লোকটি পরীক্ষা করে দেখে বলল, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না…।’

‘আপনি নিশ্চিত? ওর তো কোথাও জখম হয়নি দেখা যাচ্ছে’, বলল ছেলেটি। যেন ওই ছেলেটির মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না।

‘আমি ডাক্তার, এর বেশি তোমাকে আর কী বলব’, বলল লোকটি। ‘হয়তো প্রচণ্ড ধাক্কায় তার মৃত্যু ঘটেছে। ইন্নালিল্লাহি…’, বলল ছেলেটি। চোখের পানি আটকাতে পারল না। ডাক্তারের চোখও ভিজে গেল। লাশটাকে ওভাবেই পানিতে রেখে আবার দরজাটা আঁকড়ে ধরে ভেসে যাত্রা শুরু করল পূর্ব দিকে। কিছুক্ষণ আগেই ছেলেটি তাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। আর এখনই তাদের ফেলে চলে গেল বলে আর কারো মুখে কথা ফুটছে না। অনেকক্ষণ কেটে গেল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছেলেটি দেখল, মাথার ওপরে আসার আর অল্প কিছুক্ষণ বাকি। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, কালো নম্বরগুলো উধাও হয়েছে। দাঁত দিয়ে খুলে পানিতে ফেলে দিল ঘড়িটি। ওটা আর দরকার হবে না তার। ‘এই শুনছ? একটা দুঃসংবাদ আছে। খেয়াল করেছ? দরজাটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে’, বলল ডাক্তার। সামনের দিক থেকে চোখ ফেরাল ছেলেটি। বুঝতে না পারার ইঙ্গিতে তাকাল ডাক্তারের দিকে।

‘এ ইস্পাতের দরজার ভেতরে যে ফাঁকা জায়গায় বাতাস ছিল, উল্টে যাওয়ায় এটির ভেতরে দ্রুত পানি প্রবেশ করছে। কারণ আগে এটির পিঠ ছিল পানির ওপরে, সেদিকে ছিদ্র ছিল। তার ওপর দিয়ে ঢেউ বয়ে গেলেও তাতে ভেতরে খুব বেশি পানি ঢোকেনি। কিন্তু ওখানে উল্টে যাওয়াতে পিঠ নীচের দিকে গেছে। ফলে খুব দ্রুত পানি ঢুকেছে। এখন আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে। আর দুই মিনিটের মধ্যেই পুরোটা ডুবে যাবে। আমি আগেই এ ব্যাপারটা টের পেলেও তোমাকে বলিনি। কারণ তুমি আগেই আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পার। এখন বলার সময় হয়েছে, তাই বললাম। এখন যতক্ষণ পারা যায়, সাঁতরাতে হবে। এছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই।’ দীর্ঘক্ষণ ধরে ব্যাখ্যা করে থামল ডাক্তার।

ছেলেটি প্রথম দিকেই বুঝে গেল। তার মুখে কথা ফুটছিল না। তন্ময় হয়ে শুনে যাচ্ছিল। ‘ছেড়ে দাও, ডুবে যাচ্ছে।’ বলে লোকটিও ছেড়ে দিল তাদের দীর্ঘক্ষণের সঙ্গী ভেলাটি। দুজন মানুষের চোখের সামনে দরজাটা ডুবে গেল দ্রুত। দুজনেই ভেসে আছে পানিতে। বাম হাত নাড়াতে গিয়ে কঁকিয়ে উঠল ডাক্তার। বাম ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথার উদয় হলো। ‘কী হলো?’ বলে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি। মনে হয় দরজাটা উল্টে যাওয়ার সময় আঘাত পেয়েছিলাম, তখন উত্তেজনায় অতটা টের পাইনি। তারপর দরজা ধরে থাকাকালে তেমন হাত নাড়াতে হয়নি বলে বুঝতে পারিনি। এখন হাত আর নাড়াতে পারছি না।’ গলা স্বাভাবিক রেখে বলল ডাক্তার।

‘আমাকে ধরুন। তারপর দুজনে একসঙ্গে যতদূর পারি এগিয়ে যাব’ বলে হাত বাড়িয়ে দিল ছেলেটি ডাক্তারের দিকে। ‘না, তা হয় না বাবা।’ খানিক বিরতি নিয়ে আবার শুরু করল ডাক্তার। ‘তুমি আমার জন্য অপেক্ষা না করে চলে যাও, এতে তোমার দেরি হচ্ছে।’

‘না, আপনাকে এ অবস্থায় ফেলে আমি কিছুতেই যাব না।’ দৃঢ়স্বরে বলল ছেলেটি।

‘ঠিক আছে, যতদূর পারি তোমার সঙ্গে এগোচ্ছি।’ বলে সাঁতরাতে শুরু করল ডাক্তার। পাশে সাঁতরিয়ে চলল ছেলেটি। দুজনে অনেকক্ষণ সাঁতরালো। যখনই লোকটি পিছিয়ে পড়ছে, ছেলেটি থেমে তাকে এগিয়ে আসার সময় দিচ্ছে। একসময় লোকটি একদম থেমে গেল, আর এগোলো না। ছেলেটি একটু সামনে এগিয়ে ছিল, আবার তার কাছে ফিরে এলো।

‘তুমি ফিরে এলে কেন?’ বলল ডাক্তার।

‘আপনি পিছিয়ে পড়েছেন যে।’ বলল ছেলেটি।

‘আমি আর যেতে পারব না, তুমি চলে যাও।’ বলল ডাক্তার।

‘আপনাকে এভাবে ফেলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।’ জবাব দিল ছেলেটি।

‘শোন, পাগলামী কর না, আমার জন্য অপেক্ষা করে নিজের মৃত্যু ডেকে এনো না। তুমি চলে যাও। সাঁতরানো দূরের কথা, আমি আর ভেসেও থাকতে পারছি না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো ডুবে যাব।’ থামল লোকটি।

‘আপনি আমার হাত ধরুন। আমি আপনাকে টেনে নিয়ে যাব।’ বলে আবার হাত বাড়াল ছেলেটি।

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ২

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৩ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৪ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৫ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৬ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৭ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৮ 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, পর্ব – ৯

আমি ক্ষমাপ্রার্থী, শেষ পর্ব

 

 

 

 

 

ঘোষণা- ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ উপন্যাসটির ১০ টি পর্ব শেষ হলে পুরো উপন্যাস থেকে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা হবে। অংশগ্রহণকারী পাঠকদের সর্বোচ্চ সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।

-নির্বাহী সম্পাদক

 

আমি ক্ষমাপ্রার্থী-১ 29

মুগ্ধতা.কম

৫ মার্চ, ২০২০ , ৭:১৫ অপরাহ্ণ

কিটোডায়েটের মূল কথা

ডায়াবেটিস, হাই প্রেশারের ওষুধ খেয়ে ভালো আছেন? মনে করছেন ভালোই তো আছি কোনো পরিবর্তনের দরকার কী? ভাবছেন ভাত ছাড়া কি থাকা যায়? কোনো ডাক্তারই তো ভাত খেতে মানা করে না, ভাত ছাড়া চলবো কিভাবে?

আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, আমরা প্রচুর পেশেন্ট দেখেছি, দেখছি যারা ওষুধ ঠিকমত খেয়েও অসুস্থ হচ্ছেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই, কিডনির সমস্যা, হার্টের সমস্যা, লিভারের সমস্যা হয়ে গেছে। নিয়মিত প্রেশারের ওষুধ খেয়ে ও স্ট্রোক করছে! এগুলোর কারণ কী? কারণ হলো যে ওষুধগুলো দেয়া হয় সেগুলো কিন্তু রোগের আসল চিকিৎসা না। জাস্ট লক্ষণগুলো দমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা৷ ডায়াবেটিস (টাইপ টু), হাই প্রেশার, ফ্যাটি লিভার এগুলো সবগুলোকে আমরা একসাথে বলি মেটাবোলিক সিন্ড্রোম এবং এই রোগগুলো হওয়ার জন্য প্রধানত দায়ী আমাদের খাদ্যাভ্যাস। আমরা অধিক পরিমাণে ইনসুলিনোজেনিক অর্থাৎ শর্করা জাতীয় খাদ্য খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে। এই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সই মেটাবোলিক সিন্ড্রোমের মূল কারণ। আপনি যদি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ঠিক করতে পারেন তবে আপনার রোগ ঠিক হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ্।

এখন প্রশ্ন হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কি ঠিক করা সম্ভব? জ্বী সম্ভব ইন শা আল্লাহ্। আপনি খাবার পরিবর্তন করার মাধ্যমে এবং না খেয়ে থাকার মাধ্যমে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে মুক্তি পেতে পারেন। আপনাকে শর্করা জাতীয় খাবার অর্থাৎ ভাত, রুটি, আলু, চিনি, নুডুলস, পাস্তা, ছোলা, সিরিয়ালস, ওটস, মিষ্টি ফল ইত্যাদি এগুলো বাদ দিতে হবে এবং এর বদলে ভালো চর্বিযুক্ত খাবার খেতে হবে যেমনঃ বাদাম, ঘি, মাখন, নারকেলের তেল, ডিম, মাছ, মাংশ ইত্যাদি খেতে হবে। সাথে প্রচুর পরিামাণে সবুজ শাক-সবজি আপনাকে খেতে হবে। এটাকে আমরা বলছি কিটোডায়েট। আপনি যখন কিটোডায়েট এবং সাথে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (একটি লম্বা সময় যেমনঃ ১৬ ঘন্টা না খেয়ে থাকা) করবেন তখন আস্তে আস্তে আপনার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ঠিক হওয়া শুরু করবে, আপনার শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমে যাবে। আপনি অনেক এনার্জেটিক এবং ভালো অনুভব করবেন ইন শা আল্লাহ্।

তাই দেরি না করে প্রকৃত সমাধানের জন্য কাজে নামুন৷ তবে অবশ্যই একজন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী করার চেষ্টা করবেন। যিনি আপনাকে কিটোডায়েট এবং ফাস্টিংয়ের একটা প্ল্যান দিতে পারবেন এবং আপনাকে নিয়মিত ফলোআপে রাখতে পারবেন৷

আমাদের অনলাইন কন্সাল্টেন্সি নিতে চাইলে ইনবক্স করতে পারেন।

 

ডা. শাফায়াত হোসেন লিমন

চিকিৎসক, লাইফ স্টাইল মডিফায়ার।

ফেসবুক পেজ: fb.com/dr.shafayat.hossen.limon

 

কিটোডায়েটের মূল কথা 30

সিরাজুম মনিরা

৫ মার্চ, ২০২০ , ১২:২৭ অপরাহ্ণ

মানসিক স্বাস্থ্য-সচেতনতার শুরুর কথা

স্বাস্থ্য বলতে এক কথায় আমাদের মনে প্রথমেই শারীরিক সুস্থতা বা অসুস্থতার কথাই ভেসে ওঠে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যের সংজ্ঞায় কেবল রোগ বা দূর্বলতার বিষয়কে গুরুত্ব দেয় নি বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার একটি সুষ্ঠু অবস্থার কথা নির্দেশ করা হয়েছে।

কিন্তু আমাদের কাছে মানসিক অবস্থা বা মানসিক স্বাস্থ্য একটি উপেক্ষিত বিষয়। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে মোটেও সচেতন নই। এই অবহেলা বা অসচেতনতা থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নানা ভ্রান্ত ও নেতিবাচক ধারণা।

কেউ মানসিক সমস্যার কথা ভুল করে বলে ফেললে আমরা তাকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করি বা কখনও এমনও বলে থাকি যে, সেই ব্যক্তি নাটক/অভিনয় করছে। তাকে নানাভাবে হেয় করে থাকি। আমরা ভুলেই যাই যে, মানসিক মানসিক স্বাস্থ্যও স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তবে আশার কথা হলো, দিন দিন মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা বাড়ছে এবং আমরা এই বিষয়ে বলতে চাই।

এখন যদি আমরা বুঝতে চাই আসলে মানসিক স্বাস্থ্য বলতে কী বুঝায়? মানসিক স্বাস্থ্য বলতে আমরা এমন একটি অবস্থাকে বুঝি যেখানে একজন ব্যক্তি নিজস্ব দক্ষতার বিকাশ ঘটিয়ে দৈনন্দিন জীবনের চাপসমূহ যথাযথভাবে মোকাবেলা করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে ও সমাজে ফলপ্রসূ অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

শারীরিক সমস্যাসমূহ সহজেই আমাদের চোখে পরে কিন্তু মানসিক সমস্যা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় আমরা এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করি না। এর ফলে সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মদক্ষতা কমে যেতে থাকে। এমনকি পাশাপাশি নানা ধরণের শারীরিক লক্ষণও দেখা যায়। আমরা সাধারণ দৃষ্টিতে মানসিক সমস্যার প্রকোপ সম্পর্কে অতটা আন্দাজ করতে পারি না। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের একটি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে শতকরা ১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এবং শতকরা ১৮ জন শিশু কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

এছাড়া আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ৯০ জন তাদের মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করতে চায় না এবং চিকিৎসা করাতে চায় না।

এ অবস্থায় আমরা যদি সুখি সমৃদ্ধ দেশ ও জাতি গঠণ করতে চাই তবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে কখনোই তা করতে পারব না। এমনকি আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও সম্ভব নয়।

তাই আসুন, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হই, এ বিষয়ে কথা বলি।

সিরাজুম মনিরা  ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর

 

monosamajik pramorsho

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ৭:৩৪ অপরাহ্ণ

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ৭:৩৩ অপরাহ্ণ

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ৭:৩২ অপরাহ্ণ

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ৩:৪৬ অপরাহ্ণ

নভেল করোনা ভাইরাসঃ নিজেকে ও অন্যকে সুরক্ষিত রাখার উপায়

২০১৯-এনকোভি – যা নভেল করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত – সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এশিয়ার বিভিন্ন অংশ এবং এর বাইরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করে আপনি এই ভাইরাসটির সংক্রমণ ও বিস্তারের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারেন।

কতটা ভয়ংকর এই ভাইরাস?

শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য অসুস্থতার মতো নাক দিয়ে পানি পরা, গলা ব্যথা, কাশি এবং জ্বরসহ হালকা লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে এই ভাইরাস। কিছু মানুষের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। খুব কম ক্ষেত্রেই এই রোগ মারাত্মক হয়। তবে, এই ভাইরাস সংক্রমণের ফলে বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আমার কি মেডিক্যাল মাস্ক পরা উচিত?

করোনা ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগের বিস্তার সীমিত পর্যায়ে রাখতে মেডিক্যল মাস্ক সাহায্য করে। তবে এটার ব্যবহারই এককভাবে সংক্রমণ বন্ধ করতে যথেষ্ঠ নয়। নিয়মিত হাত ধোয়া এবং সম্ভাব্য সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে মেলামেশা না করা এই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করার সর্বোত্তম উপায়।

শিশুরা কি ঝুঁকিতে?

যে কোন বয়সের মানুষই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। প্রধানত: আগে থেকে অসুস্থ বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস মারাত্মক হতে পারে। তবে শহরাঞ্চলের দরিদ্র শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। এসব প্রভাবের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, যা সম্প্রতি মঙ্গোলিয়ায় দেখা গেছে। এ ব্যাপারে ইউনিসেফ নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন- “এই করোনাভাইরাসটি ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের উপর এই ভাইরাসের প্রভাব বা এতে কতজন আক্রান্ত হতে পারে- সে সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানি না। কিন্তু নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। সময় আমাদের সাথে নেই।”

ইউনিসেফ এক্ষেত্রে কি করছে?

নভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে সহযোগিতা করতে প্রতিরোধক মাস্ক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রতিরক্ষামূলক স্যুট নিয়ে ইউনিসেফের একটি চালান জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে চীনের সাংহাইয়ে পৌঁছেছে। ছয় মেট্রিকটনের এই চালানটি কোপেনহেগেনে ইউনিসেফের বৈশ্বিক সরবরাহ হাব থেকে পাঠানো হয়েছে এবং এটি চীনের ইউহানে প্রেরণ করা হবে। আগামী দিনগুলিতে ইউনিসেফ আরও জরুরী সরবরাহ পাঠাবে। এই ভাইরাস সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট WHO website ভিটিজ করুন।

[সূত্র: ইউনিসেফ এর ওয়েবসাইট]

coronavirus

মুগ্ধতা.কম

৪ মার্চ, ২০২০ , ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

রক্তঝরা উত্তাল মার্চঃ রংপুরের দিনগুলো ৩

৪ মার্চ ১৯৭১। ৩ মার্চের ঘটনার পর শহরজুড়ে অস্বাভাবিক থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। সান্ধ্য আইন যথারীতি আজ সন্ধ্যা থেকে পুনরায় বলবদ থাকবে। শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের টহল অব্যাহত রয়েছে।

মানুষ জেগেছে পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে। জেগেছে বীর রংপুরবাসী। প্রশাসনের টহল কিংবা রক্তচক্ষু তাঁদের কি এতো সহজে দমাতে পারে !

এ প্রসঙ্গে কথা বলি বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেনের সাথে। জনাব আকবর একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে নিয়ে আমার ‘আলোর দ্বীপ ‘সিরিজে বিস্তারিত লেখা আছে। তিনি ৪ মার্চ ১৯৭১-এ রংপুর শহরের অবস্থা নিয়ে জানান,পাকিস্তান প্রশাসনের রক্তচক্ষু দমাতে পারেনি রংপুরের বীর মানুষদের। শহরের বিভিন্ন এলাকায় যে যেভাবে সম্ভব মিছিল করতে থাকে। কোন নির্দিষ্টভাবে বা কেন্দ্রীয়ভাবে নয় এলাকায় এলাকায় স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে এসব মিছিল বের হয়েছিল। কয়েকটি জায়গায় বক্তব্য রাখার খবরও তিনি জানতে পেরেছিলেন।

কথা হলো রংপুরের বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক জনাব আবদুস সাহেদ মন্টু ভাইয়ের সাথে । তিনি তখন পি পি আই- এর রংপুর প্রতিনিধি ছিলেন। মন্টু ভাই জানালেন, ৪ মার্চ রংপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে খন্ড খন্ড মিছিল চলছিল। শহরের পরিস্থিতি থমথমে এবং কড়া প্রশাসনিক তৎপরতার পরেও শহরের সি ও বাজার থেকে লালবাগ পর্যন্ত বিভিন্নস্থানে হুট-হাট করে মিছিল হচ্ছিল।

রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুর গ্রন্থের ২৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘ ৩ মার্চের ঘটনার পর শহরের অনেক বিহারী পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি পরিবার ইতিমধ্যে সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য অবাঙালি সেনা কর্মকর্তারা খুব বিচলিত হয়ে উঠলো। এই কাজে তাদের কারো কারো উদ্বেগ ও ব্যতিব্যস্ততা কখনও কখনও প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে গেল। তারা রেজিমেন্টের খাদ্য ভান্ডার থেকে আশ্রিত বিহারী পরিবারগুলোর জন্য রেশন সরবরাহের ব্যবস্থা করলো।

‘( যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা- মেজর নাসির উদ্দিন)# [লেখক: সাহিত্যিক ও ইতিহাস গবেষক]

রক্তঝরা উত্তাল মার্চঃ রংপুরে এই দিনে