মুগ্ধতা ব্লাড ব্যাংকে আপনার দেওয়া তথ্য বাঁচাতে পারে একটি জীবন। আপনার তথ্য দিন, প্রয়োজনে রক্ত খুঁজুন এখানে।

ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ , ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

এ কাহিনি অভিজিৎ সেনের। কিছুটা কিছুটা জেনেছি তাঁর ডায়েরি থেকে। আমি তাঁর মুখেই শুনেছি।

অনেক নাম এবং জায়গাগুলিও বদলাতে হবে। সংশ্লিষ্ট পাত্র-পাত্রীরা অনেকেই বেঁচে আছেন। এখনও। অভিজিৎ সেন গোপনীয়তার তোয়াক্কা করতেন না। কিন্তু আমি কেন খামোকা ফ্যাসাদে পড়তে যাব।

অভিজিৎ সেন নিজেই আমাকে বলেছিলেন, যদি পারিস আমার জীবনের এই ঘটনাটা লিখিস। তাতে লোকশিক্ষা হবে।

কাহিনির শুরু বম্বে মেলের ফার্স্ট ক্লাসের কামরায়।

তার আগে বলে নিই, বিখ্যাত অভিজিৎ সেন আমাদের কাছে অভিদা। আমার চেয়ে বয়েসে অন্তত পনেরো বছরের বড়। বেশ সুঠাম, তেজি চেহারা। অনেকদিন পর্যন্ত যৌবন ধরে রেখেছিলেন।

আমার সঙ্গে পরিচয় পাড়ার ছেলে হওয়ার সুবাদে। তখন উত্তর কলকাতার রাজবল্লভ পাড়ায় থাকি। কিছু কিছু বাড়ির সামনের রকে আড্ডার আসর বসাবার রেওয়াজ ছিল। এখন সেইসব আচ্ছা রক ছেড়ে বৈঠকখানায় স্থানান্তরিত হয়েছে, রকগুলো ভেঙে হয়েছে দোকানঘর। কিন্তু রকের আড্ডা আর বৈঠকখানার আড্ডার চরিত্রের তফাত আছে। রকের আড্ডায় রাস্তা দিয়ে। যেতে-যেতে যে-কোনও লোক ভিড়ে যেতে পারে। যার যখন ইচ্ছে উঠে গেল, আবার নতুন কেউ এসে বসল।

বিভিন্ন রকে বিভিন্ন বয়সিদের আড্ডা। কোনওটা বুড়োদের কোনওটা মাঝবয়েসিদের, আর কোনওটা ছেলে-ছোকরাদের।

কোনওটাতেই মেয়েদের যোগ দেওয়ার অধিকার ছিল না। ইংল্যান্ডে বা আমেরিকাতেও অনেক ক্লাবে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। আমাদের কলকাতাতেও এখনও অনেক ক্লাবে মেয়েরা মেম্বার হতে পারে না।

পাড়ার রকে গোঁফ গজাবার আগে কোনও ছেলে বসতে চাইলে তাকে ধমকে বিদায় করে দেওয়া হত। আমার তখন সদ্য গোঁফ গজিয়েছে।

প্রত্যেক পাড়াতেই গর্ব করার মতন কয়েকজন লোক থাকে। আমাদের ওই পাড়ায় যেমন নুটুদা আর অভিদা। নুটুদা ক্রিকেট খেলোয়াড়, রঞ্জি ট্রফিতে দুবার চান্স পেয়েছিল। ওয়ান ডে ক্রিকেট চালু হওয়ার আগে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের এত রমরমা ছিল না, শীতকাল ছাড়া অন্যসময়। তাদের নাম শোনা যেত না। কিন্তু অভিদার নাম প্রায় সারা বছরই দেখা যেত খবরের কাগজে। গায়ক হিসেবে নাম ছাড়াবার পর ততদিনে মুম্বই থেকে তাঁকে ডাকাডাকি করছে। নমিতা সিংহ নামে একজন ফিলমের অভিনেত্রীকেও এ-পাড়ার মেয়ে বলে গণ্য করা হত। যদিও নমিতা সিংহ মাত্র সাড়ে চার মাস একটা ভাড়া বাড়িতে ছিল, তারপর চলে যায় নিউ আলিপুরে। তবু রাজবল্লভ পাড়া তার ওপর দাবি ছাড়বে না।

এ-পাড়ায় অভিদাদের তিন পুরুষের পুরোনো বাড়ি। যৌথ পরিবার, অনেক নারী-পুরুষে জমজমাট। বাড়ির মধ্যে একটা ছোট মন্দির, তার মধ্যে রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ, সকাল-সন্ধে আরতি হত, সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনে আমরা সময় বুঝে নিতাম। সন্ধ্যারতির সময়ই আমাদের আড্ডা ভেঙে বাড়িতে ফিরে পড়তে বসতে হত।

মুম্বই বাড়ি দেওয়ার পরেও অভিদা মাঝে-মাঝেই কলকাতায় আসতেন। তখন তিনি টালিগঞ্জে নিজস্ব একটা ফ্ল্যাট নিয়েছেন বটে, কিন্তু দু-চারদিন এ-পাড়ায় পৈতৃক বাড়িতে কাটিয়ে যেতেন। অন্তত যতদিন তাঁর মা বেঁচেছিলেন।

অত বিখ্যাত মানুষ, খবরের কাগজে ছবি বেরোয়, অথচ অহঙ্কার ছিল না একেবারে। ক্রিকেট খেলোয়াড় নুটুদা বরং কলার উচিয়ে গম্ভীরভাবে হেঁটে যেতেন রাস্তা দিয়ে, বিশেষ কাউকে পাত্তা দিতেন না। কিন্তু অভিদা মিশতেন সব বয়েসিদের সঙ্গে।

আমাদের রকের আড্ডায় সাহিত্য-শিল্প-সিনেমা-পরনিন্দা-পরচর্চা সবই চলে। কথায়-কথায় রাজা-উজির মারি। অল্প বয়েসে সব কিছুতেই আঘাত করার একটা প্রবণতা থাকে। আধুনিক গায়ক-গায়িকাদের আমরা নস্যাৎ করে দিতাম, অভিদাকেও বড় গায়ক মনে করতাম না। তবে গলার আওয়াজ জোরালো, আধুনিক গান না গেয়ে তাঁর ক্লাসিকাল গানে টিকে থাকা উচিত ছিল।

আমরা মুগ্ধ ছিলাম অভিদার ব্যক্তিত্বে।

বয়েসের অনেক তফাত থাকলেও আমাদের মতন অর্বাচীনদের আড্ডায় তিনি এসে বসতেন মাঝে-মাঝে। অমন বিখ্যাত হয়েও পোশাকের কোনও আড়ম্বর ছিল না, পাজামা আর গেঞ্জি পরে রাস্তার ধারে বসতে দ্বিধা করতেন না। চওড়া বুক, ফরসা রং, তখনও পর্যন্ত একটাও চুল পাকেনি, চোখে পড়ার মতন চেহারা।

হাতে সবসময় সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার। অকৃপণ সিগারেট বিলোতেন। আমরা প্রথম প্রথম সঙ্কোচ বোধ করতাম, তিনি হাসি মুখে বলতেন, নে, নে অত লজ্জা কীসের। আমি ষোলো বছর বয়েস থেকেই বিড়ি টানতে শিখেছি।

উলটোদিকে নিবারণদার চায়ের দোকান। অভিদা হাঁক দিয়ে বলতেন, নেবাদা, এখানে এক রাউন্ড চা দিয়ে যাও। ঠিক আধঘণ্টা অন্তর চা দিয়ে যাবে।

তারপর আমাদের জিগ্যেস করতেন, এ পাড়ার লেটেস্ট খবর কী বল! কেউ কারুর বউকে নিয়ে ভাগেনি? ওই কোণের বাড়িটায় নতুন ভাড়াটে এসেছে, দুটো ডবগা-ডবগা ছুঁড়িকে দেখলুম, তোরা কেউ প্রেম করিসনি?

উত্তর কলকাতায় সেসময়ে মুখের ভাষায়, শালা, মাগি বেজন্মা এইসব শব্দ অনায়াসে মিশে থাকত। কেউ খুব আদর করে তার বন্ধুকে ডাকত। এই শুয়োরের বাচ্চা এদিকে আয়।

একদিনের কথা মনে আছে। আমার বন্ধু মানস বরাবরই পেটরোগা। কথা বলতে-বলতে হঠাৎ বাথরুমের দিকে ছুটত। তার মা তারকেশ্বরে পুজো দিয়ে মন্ত্র পড়া ফুলপাতা মুড়ে একটা বড় রুপোর মাদুলি বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা সবসময় তাকে গলায় পরে থাকতে হত। সেদিন রুপোর মাদুলিটা তার জামার বাইরে বেরিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অভিদা জিগ্যেস করলেন, এটা কী রে?

মানস তারকেশ্বর,, পেট খারাপ এইসব বলতেই অভিদা ঝুঁকে এসে হ্যাঁচকা টানে সেটা ছিঁড়ে নিলেন।

তারপর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে-দেখতে বললেন, এতে সত্যি কাজ হয়?

মানস বলল, অনেকটা কমেছে।

অভিদা বললেন, ভালো কথা, আমাদের বাড়িতে নেপু নামে একটা বাচ্চা চাকর আছে, সেটা যখন-তখন পেটব্যথায় ছটপট করে। তাকে পরিয়ে দেব, যদি তার সারে…তোর মাকে বলিস তোর জন্য আর-একটা গড়িয়ে দিতে।

মানস কাঁচুমাচু হয়ে গেল। তাদের বাড়ির অবস্থা সচ্ছল, ওইটুকু রুপোর জন্য কিছু যায় আসে না, কিন্তু মন্ত্রঃপূত মাদুলি কি অন্যকে দেওয়া যায়? বাড়িতে খুব বকাবকি করবে।

অভিদা কিন্তু মাদুলিটা ফেরত দিলেন না। তাঁর এই ব্যবহারটা খুব অদ্ভুত লেগেছিল।

যাই হোক, এবার আসল গল্পে আসা যাক।

সেদিন আমার বম্বে মেল ধরার কথা। হাওড়া ব্রিজে দারুণ জ্যাম, ট্যাক্সি আর নড়েচড়ে না। আমার কাছে শুধু একটা বড় ব্যাগ ছিল, একসময়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে প্ল্যাটফর্মে যখন পৌঁছলাম, তখন ট্রেন নড়াচড়া শুরু করেছে।

হুড়মুড় করে উঠে পড়ে, আমার কিউবিকল খুঁজে ভেতরে ঢুকে দেখলাম, তলার একদিকের বাঙ্কে বসে আছে দুজন যাত্রী, অন্য বাঙ্কে পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে আর-একজন।

সবে কলির সন্ধে, এসময় কারও শুয়ে থাকার কথা নয়। হয়তো লোকটি অসুস্থ, তাই ভালো করে লক্ষ করিনি। ব্যাগটা সিটের তলায় রেখে, অন্য দুজনের পাশে বসার পর দেখি, সেই শুয়ে থাকা ব্যক্তিটি আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, মাথায় সামান্য টাক, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।

সিগারেট দেশলাই পকেটে নেই, ব্যাগে ভরা আছে। আবার ব্যাগটা টেনে বার করে, সিগারেট দেশলাই নিয়ে একটা জ্বালাবার পর দেখি, তখনও শুয়ে থাকা যাত্রীটি চোখ ফেরায়নি। অন্য। দুজন দক্ষিণ ভারতীয়, তারা গল্প করছে নিজেদের ভাষায়।

কয়েক মুহূর্ত পরে সেই লোকটি বলল, তুই সুনীল না?

সঙ্গে-সঙ্গে গলার আওয়াজে চেনা গেল। অভিদা।

আশ্চর্য, আমি অভিদাকে চিনতে পারিনি, আর উনি আমাকে মনে রেখেছেন?

এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় বছরদশেক। আমি রাজবল্লভ পাড়া ছেড়ে চলে গেছি দমদম। অভিদার ছবি নিয়মিত পত্রপত্রিকায় দেখি, অনেক খবর থাকে তাঁর সম্পর্কে। এখন তিনি আর শুধু গায়ক নন, অনেক হিন্দি ফিলমের সার্থক সুরকার।

আগে চশমা পরতেন না। মাথা ভরতি চুল ছিল। অভিজিৎ সেনের মতন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি এরকম খোঁচা-খোঁচা দাড়ি নিয়ে ট্রেনে যাচ্ছেন, এটাও কি ভাবা যায়? সবাই খানিকটা সাজগোজ করে। আর ফিলম সংক্রান্ত লোকজনদের কিছুটা ঝলমলে উকট পোশাক পরাই রেওয়াজ।

অভিদা জনপ্রিয়তার শিখরে, তাঁর কথা তো আমি জানবই। কিন্তু আমার নামটা তিনি দশ বছর পরেও মনে রেখেছেন, স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর, তা মানতেই হবে।

প্রাথমিক উচ্ছাসের পর অভিদা জিগ্যেস করলেন, তুই এখন কী করছিস রে সুনীল? সাকসেসফুল হয়েছিস তো বোঝাই যাচ্ছে, ট্রেনে ফার্স্টক্লাসে ট্রাভল করছিস। চাকরি, না বিজনেস?

না, নিজের পয়সায় টিকিট কেটে ফার্স্টক্লাসে যাওয়ার মতন অবস্থা আমার হয়নি। তখন পর্যন্ত আমি শুধু কবিতাই লিখি। কবিতা লিখে কিছু নামটাম হলে টাকা পয়সার দিক থেকে কোনও সুবিধে হয় না বটে, তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে কবি সম্মেলন বা সাহিত্যবাসরে আমন্ত্রণ পাওয়া যায়, গল্প-উপন্যাস লেখকরা বরং এদিক থেকে খানিকটা বঞ্চিত। আমি ভ্রমণ-ক্ষ্যাপা, দূরের কোনও জায়গা থেকে ডাক পেলেই ছুটে যাই।

আমার গন্তব্য মুম্বই নয়, আমেদাবাদ। একটি গুজরাতি প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। তারাই ফার্স্টক্লাসের টিকিট কেটে দিয়েছে। মুম্বইতে এক রাত্রি বাস করে পরদিন আমেদাবাদের ট্রেন ধরতে হবে।

একটু পরে জিগ্যেস করলাম, অভিদা, তোমার শরীর খারাপ নাকি? এখন থেকেই শুয়ে পড়েছ?

অভিদা বললেন, দুদিন ধরে গা-টা ম্যাজম্যাজ করছে। তা ছাড়া পায়ের যা অবস্থা বসতে গেলে পা-টা একেবারে সোজা সামনে মেলে থাকতে হয়। সেটা ভালো দেখায় না।

তলার দিকে চাদরটা একটু সরালেন অভিদা। তাঁর একটা পায়ের অনেকখানি প্লাস্টার করা। খুব নতুন নয়, তার ওপরে কিছু মানুষের সই রয়েছে।

কোনও মানুষের পা ভাঙা দেখলেই কৌতূহল হয়, কী করে ভাঙল?

অভিদা হাসতে-হাসতে বললেন, ভগবান ভেঙে দিয়েছে।

সবসময় ঠাট্টা-মস্করা করা অভিদার স্বভাব। এটা কী ধরনের মস্করা? আমি বললাম, ভগবান। নিজে এসে ভেঙে দিলেন? তুমি তাঁকে দেখতে পেয়েছিলে?

অভিদা বললেন, নারে, দেখতে পাইনি। পেছন দিকে ছিল। ওই যে কথা আছে না, ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঠেলা, সেই রকমই। ভূতের বদলে ভগবান আমায় পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিল।

আমার চোখে তখনও কৌতূহল দেখে অভিদা বললেন, তোকে ব্যপারটা পরে বলব। এখন একটা কাজ কর তো, তোকে যখন পাওয়াই গেছে, একটু খাঁটিয়ে নিই। এই বাঙ্কটার তলায় দ্যাখ আমার বড় ব্যাগটার পাশে একটা শান্তিনিকেতনি ঝোলা আছে, সেটা ওপরে নিয়ে আয়।

সেই ঝোলাটার মধ্যে একটা স্কচ হুইস্কির বোতল। লুকোবার কোনও চেষ্টাই নেই, ওপরের দিকটা বেরিয়ে আছে। একটা জলের ফ্লাক্স, আর একটি কাচের গেলাস।

অভিজিৎ সেনের জীবনযাত্রার কাহিনিও সুবিদিত।

ইচ্ছে করলে হয়তো ফিলমের নায়কও হতে পারতেন। কিন্তু অত আলো ও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার এককথা বলা তাঁর পছন্দ নয় বলে, কয়েকজন পরিচালক আগ্রহ দেখালেও অভিদা রাজি হননি। কিন্তু তাঁর অনেক কীর্তি-কাহিনি অনেক নায়ক-নায়িকাকেও হার মানিয়ে দেয়।

মুম্বইতে পাকাঁপাকি যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে এক উঠতি অভিনেত্রীর বিয়ে হয়। সে বিয়ে ভেঙেও যায় দেড় বছরের মধ্যে। তারপর আর বিয়ে করেননি, গুজব ছড়িয়েছে নানা রকম। কিছুদিন স্মিতা পাটিলের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। কোনও একটা পার্টিতে মদ খেয়ে নাকি মারামারি করেছিলেন, রাজ বব্বরের সঙ্গে। এক গায়িকাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ইউরোপ। এই তো কিছুদিন আগে মদ খেয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে পুণে শহরে এক ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়, অভিদা মাথা গরম করে সেই পুলিশকে চড় মেরে বসেছিলেন। সেজন্য আদালতে গিয়ে তাঁকে জরিমানাও দিতে হয়েছে।

এসবই আমার কাগজে পড়া বা লোকমুখে শোনা। হয়তো এর বাইরেও আরও অনেক কিছু ঘটেছে। হিন্দি ফিলম আমি প্রায় দেখিই না। অভিদার গাওয়া বা সুর দেওয়া অনেক গানই আমার শোনা হয়নি। তবে পুজো প্যান্ডেলের অনেক গান বাধ্য হয়ে শুনতে হয়, হঠাৎ অভিদার গলায় আওয়াজ চিনতে পারলে মন দিই। মানুষটিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি বলেই। অভিদা বাংলা গানও কিছু-কিছু রেকর্ড করেছে, সেগুলো বিশেষ সুবিধের না, অন্তত আমার রুচির সঙ্গে মেলে না।

তবে, এরই মধ্যে একটা ভাটিয়ালি খুবই ভালো লেগেছিল। স্বীকার করতেই হবে, এরকম দরাজ গলা এখন আর কারও নেই।

অভিদা জিগ্যেস করলেন, তোর কাছে গেলাস আছে?

আমি বললাম, না তো।

—এই তো মুশকিলে ফেললি। মোটে একটা গেলাস এনেছি। ঠিক আছে, ফ্লাস্কের ঢাকনাটা ব্যবহার করা যাবে। এসব খাস-টাস তো?

—যদি একটু প্রসাদ দাও।

—প্রসাদ কণিকা মাত্র। একটুই পাবি, বেশি না। আগে আমারটা ঢাল। মুম্বইতে কোথায় রাত কাটাবি?

—দাদারে একটা ছোটখাটো হোটেল চিনি।

—মুম্বইতে যাচ্ছিস, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিসনি কেন?

—তুমি বিখ্যাত লোক, আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তা ছাড়া অনেকদিন যোগাযোগ নেই।

অভিদা অন্য সহযাত্রীদের দিকে গেলাস তুলে জিগ্যেস করলেন, ডু ইউ মাইন্ড?

দুজনেই ভদ্রতা করে বললেন, নো নো নো।

অভিদা আবার বললেন, উড ইউ লাইক টু জয়েন আস? দেখা গেল, দক্ষিণ ভারতীয় দুজনই সাত্বিক প্রকৃতির। মদ স্পর্শ করে না। তবে আমাদের ব্যাপারে আপত্তি নেই।

অভিদা আমাকে বাংলায় বললেন, এত লম্বা জার্নি, মদ না খেয়ে লোকে কী করে যায়, আমি বুঝতেই পারি না। তোর কাছে বোতল আছে?

–না।

—সঙ্গে রাখিস না? তার মানে এখনও নেশা ধরেনি।

—আমি শুধু অন্য কেউ খাওয়ালে খাই।

—ওইভাবেই শুরু হয়। নেশাখোর হবি কিনা এখন থেকে ঠিক কর। যদি না হতে চাস, এখন থেকেই আর ঠুবি না। আর নয় তো আমার মতন অবস্থা হবে।

—তুমি রোজ খাও?

—রোজ খাদ্য খেতে হয় না? আমার খাদ্যের সঙ্গে পানীয়ও লাগে। আগে মা-র কাছে গেলে খেতাম না। এবার মা-র কাছেও পারমিশান নিয়ে নিয়েছি। মুম্বইতে খুব কাজ ছিল, মাকে। দেখতেই কলকাতায় এসেছিলাম তিন দিনের জন্য।

—তোমার মা…এখন ভালো আছেন?

—আমাকে দেখেই তো ভালো হয়ে গেলেন। প্লেনে এসেছিলাম, কিন্তু এই পা নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে বেশ ব্যথা লাগে। তাই ফেরার সময় মনে হল, ট্রেনই ভালো।

—টিকিট পেলে কী করে? অনেকদিন আগে তো কাটতে হয়।

—কত দালাল আছে। আমার ভক্তও তো আছে রে। তারা জোগাড় করে দেয়। তুই আমার গান শুনিস?

—তেমন শোনা হয়নি। একটি ভাটিয়ালি খুব ভালো লেগেছিল। এইরকম গান আরও বেশি গাও না কেন?

—ওতে কি আর পয়সা আসে? এখন ফিলমে ঝিং চ্যাক ঝিং চ্যাক ছাড়া চলে না। ফাস্টবিট। লাউড। সারা পৃথিবীতে প্রায় একরকম। আমার টাকার দরকার, তাই ওই সব চ্যাংড়া গান গাই। আমরা নাকি রাজা রাজবল্লভের বংশ, তুই জানিস?

—ও-পাড়ায় থাকতে শুনেছি।

—সত্যি কি না কে জানে! বাবা-টাবাদের কাছে শুনেছি। হয়তো লতায়-পাতায় কিছু একটা একটা সম্পর্ক ছিল। সে যাই হোক, সাহেবদের পা চেটে আমাদের কোনও পূর্বপুরুষ টাকা করেছিল অনেক। কলসির জল গড়াতে-গড়াতে শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কিছু নেই। ওই যে অত বড় বাড়ি, তার চোদ্দোজন শরিক। তবু বনেদিয়ানাটা রয়ে গেছে। দেখিসনি, আমার বাবা-কাকারা কুচোনো ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি ছাড়া পরত না। সব ফোতো কাপ্তেন! পেটে ভাত নেই, মুখে পান। অল্প বয়েস থেকেই আমি বুঝেছিলুম, ওসব নকলিবাজি আমার দ্বারা পোষাবে না। আমার টাকা চাই, আমি ভোগী লোক, আমার অনেক টাকা দরকার। চাকরি-বাকরি করা আমার দ্বারা পোষাত না। নেহাত গলাটা আছে, তাই গান গেয়ে টাকা পাই।

—তুমি কারও কাছে গান শেখোনি?

—কার কাছে শিখব? ধৈর্য ছিল না। মহম্মদ রফি-কে নকল করতাম। রফি সাহেব আমার গুরু। দূর থেকে, মানে আমি একলব্য শিষ্য। দু-একটা পাড়ার জলসায় গান গেয়ে বেশ হাততালি। পেতাম। ব্যস, বুঝে গেলুম, এই লাইনটাই ধরতে হবে। প্রথম দিকে স্রেফ বড়-বড় গায়কদের নকল করে পপুলার হয়েছি। মুম্বইতে আসার পর হেমন্তবাবু আমায় খুব সাহায্য করেছিলেন। উনিই প্রথম বলেছিলেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার নিজের গলাটা খোলো!

—তোমার গলাটা সত্যিই ভালো।

—তুই প্রশংসা করছিস? গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। মুম্বইতে নাম করেছি বটে, কলকাতার লোক এখন আর আমায় তেমন পছন্দ করে না জানি! তুই কবিতা-টবিতা লিখিস বললি, আমি কিছুই পড়িনি। একসময় খুব পড়ার নেশা ছিল, এখন আর বিশেষ সময় পাই না। তুই গান লিখিস না? দে, দু-চারখানা গান লিখে দে। হিন্দিতে ট্রানস্লেট করে কোনও ফিলমে লাগিয়ে দেব। তুই কিছু পয়সা পাবি।

—না, অভিদা, গান লেখার ক্ষমতা আমার নেই। আমি দুর্বোধ্য আধুনিক কবিতা লিখি, যা অনেক লোকই বোঝে না।

—কেন, ওরকম লিখিস কেন?

—কেউ-কেউ তো খেয়াল তারানাও গায়, অনেকে বোঝে না।

—হুঁ!

এর মধ্যে আমাদের রাত্তিরের খাবার এসে গেল। আমি ঢাকনা খুলে হাত দেওয়ার আগেই অভিদা ধমক দিয়ে বললেন, রেখে দে। আগে মালের নেশা না জমলে কেউ খায় নাকি?

ফ্লাস্কের ঢাকনায় আমি একটুখানি নিয়ে বসে আছি, অভিদা প্রায় আধবোতল উড়িয়ে দিলেন। তাতেও কথা একটু জড়ায়নি, মাথা ঠিক আছে।

পায়ের ওপর থেকে চাদরটা সরে গেছে। ডান পায়ের গোড়ালি থেকে ঊরু পর্যন্ত মোটা প্লাস্টার। আমি ঝুঁকে পড়ে তার ওপর নাম সইগুলো পড়বার চেষ্টা করলাম। মাত্র তিন চারটে নামই চেনা, দিলীপকুমার, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, আশা ভোঁসলে আরও অনেক নাম আছে।

অভিদা বললেন, তুই বুঝি ভাবছিস, আমি ফাঁট দেখাবার জন্য ওই সব হিরো-হিরোইনদের নাম সই করিয়েছি? কদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, তখন অনেকে দেখতে এসেছে, নিজেরাই সই করেছে। গুড উইশ করার মতন। সুরকারদের সবাই খাতির করে, গান হিট হওয়ার ওপর ছবি হিট হওয়া নির্ভর করে অনেকখানি। তবে এগুলো আমি মুছিনি ইচ্ছে করে, কলকাতায় আমার ভাইপো-ভাগ্নিরা দেখে মজা পাবে বলে। এখন মুছে ফেললেই হয়।

অভিদা হাতের গেলাস দিয়ে সেই নামগুলোর ওপর ঘষতে লাগলেন।

আমি আবার জিগ্যেস করলাম, তুমি সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়েছিলে?

অভিদা বললেন, হ্যাঁ, তবে মদ খেয়ে গড়াইনি। দিনের বেলা, সুস্থ অবস্থায়। তখন বললুম না, ভগবান আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। ভগবান সবসময় আমার পেছন-পেছন ঘোরে। হয়তো, এই কামরাতেও অদৃশ্য হয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।

এটাকে মাতালের প্রলাপ মনে করে মুখ ফেরাতেই অভিদা হা-হা করে হেসে উঠলেন।

তারপর আমার একটা হাত ধরে টেনে বললেন, বিশ্বাস করলি না তো? আমি পাগল না, মাতালও হইনি। তবে শোন, তোকে গোড়া থেকে ঘটনাটা বলি। তবে, যতদিন না আমি অনুমতি দেব, তুই আর কারওকে বলতে পারবি না। তাতে রাজি আছিস?

আমি মাথা ঝোঁকালাম।

অভিদা এক বিচিত্র কাহিনি বলতে শুরু করলেন।

সেটা অভিদার জবানিতেই শোনা যাক।

[সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায়। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৫৩ সাল থেকে তিনি কৃত্তিবাস নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ একা এবং কয়েকজন এবং ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ প্রকাশিত হয়। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হল আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি, যুগলবন্দী (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), হঠাৎ নীরার জন্য, রাত্রির রঁদেভূ, শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, প্রথম আলো, সেই সময়, পূর্ব পশ্চিম, ভানু ও রাণু, মনের মানুষ ইত্যাদি। শিশুসাহিত্যে তিনি “কাকাবাবু-সন্তু” নামে এক জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজের রচয়িতা। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য আকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশুকিশোর আকাদেমির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।]