বিশেষ রচনা Archives - মুগ্ধতা.কম

বিশেষ রচনা Archives - মুগ্ধতা.কম

রবীন জাকারিয়া

২ মে, ২০২২ , ৫:১৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে ঈদ উৎসব

ভূমিকা: ঈদ (প্রমিত বানান ইদ) শব্দটির অর্থ উৎসব। ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলোকে ঈদ বলা হয়।

ঈদুল ফিতর (আরবি: عيد الفطر অর্থাৎ “রোজা ভাঙার দিবস”) ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি।[১] দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আযহা। ধর্মীয় পরিভাষায় একে ইয়াওমুল জায়েজ (অর্থ: পুরস্কারের দিবস) হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্যপালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকে।[২] عيد الفطر

মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সারা বিশ্বে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত জাঁকজমক ও ধুমধামের সঙ্গে এই ধর্মীয় দিবস দুটি পালিত হতে দেখা যায়। ঈদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- প্রথম ঈদ পালিত হয় দ্বিতীয় হিজরির ০১ শাওয়াল মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ মদিনায়। আর মক্কায় প্রথম ঈদ পালিত হয় অষ্টম হিজরি মোতাবেক ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর প্রায় ১১ দিন পর। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয় ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। বাংলাদেশে প্রথম কোথায় ঈদ পালিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা যায় সন্দ্বীপ অঞ্চলে প্রথম ঈদের জামায়াত হয়েছিল। ঢাকায় সম্ভবত প্রথম ঈদ উদ্যাপিত হয় সুলতানি আমলে (১৩০০-১৫৩৮ খ্রি.) মোটামুটি দুই শত বছরের বেশি সময়ে নগরকেন্দ্রিক ঈদ উৎসবের কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে এখন যেভাবে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে, ১০০ বছর আগেও কি এভাবে হতো? সাধারণ মানুষ কি আজকের মতো অধীর আগ্রহ, উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন ঈদের চাঁদের দিকে? ঈদের ধুমধামের দিকে? ইতিহাস বলে ‘না’। তবে সে আমলে কীভাবে বাংলাদেশে ঈদ উৎসব পালিত হতো?

আমাদের সবারই স্মরণ রাখতে হবে বিশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞাসা মেলে না। জ্ঞান আহরণের উৎসই জিজ্ঞাসা। রাসূল (সা.) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনেও যাও।” সুতরাং এই প্রবন্ধে বর্তমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কারও ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আঘাত দেওয়ার জন্য আমার এ লেখা নয়। প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার জন্য আমার এই অবগাহন। আমি একজন মুসলমান হয়ে নিজেকে অত্যন্ত গৌরবান্বিত মনে করি।

রমজান মাস মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস এবং কোরআনে একমাত্র এ মাসের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। এ মাসেই নাজিল হয়েছে কোরআন শরিফ। প্রথম ওহি পেয়েছিলেন মুহম্মদ রাসূল (সা.)। গিয়েছিলেন তিনি মেরাজে। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার আগে রমজানের সঙ্গে পরিচয় ছিল না মুসলমানদের। এর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল হিজরতের পরেই। রমজান শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে আগত। রমজান মানে দাহ, তাপ বা পোড়ানো। চন্দ্রবর্ষই নিয়ন্ত্রিত করে করে মুসলমানদের উৎসব। অনেক আগে প্রাচীন কালে গরমের মৌসুমে এই মাস পড়ত বলে এর নাম হয় রমজান। রমজানের সঙ্গে উপবাসের প্রতি শব্দের ধ্বনিগত কোনো মিল নেই। উপবাসের আরবি নাম হচ্ছে ‘স ও ম’। এর অর্থের সঙ্গে উপবাস ব্রতের কোনো মিল নেই। এর আভিধানিক অর্থই হলো আরাম বা বিশ্রামে থাকা। রমজান শেষে ঈদুল ফেতর। ঈদের অর্থ হলো উৎসব এবং আভিধানিক অর্থ হলো বারবার ফিরে আসা। ঈদ শব্দটি মূলত সিরিয়ার। ঈদ শব্দটির আদি অর্থ ও তার আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম নিরীক্ষণ করে দেখে মনে হয় হয়তো এককালে এ ধরনের এক সামাজিক উৎসবের সঙ্গে পরিচিত ছিল সিরিয়ার দামেস্কের জনগোষ্ঠীর অধিবাসীরা। হয়তো সিরিয়ার দামেস্কের কৃষিজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল এই আজকের ঈদ উৎসব এবং তাদের কাছ থেকেই আচার-অনুষ্ঠান জ্ঞাপক শব্দের মতোই আরবরা আমদানি করেছেন বর্তমান এই ঈদ উৎসব ও তার প্রকৃতিকে। ঈদ উৎসব মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস বিশ্লেষণ করলে আমাদের মনে রাখতে হবে এদেশে মুসলমানরা ছিল বহিরাগত। কারণ যেভাবে অতীতে পালিত হতো এই ঈদ উৎসব তাতে লোকায়ত বিশ্বাস আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে হিন্দু রীতিনীতি প্রভাবই ছিল বেশি।

ইসলাম প্রচারের শুরুতে অর্থাৎ আদি বাঙালি মুসলমানরা কীভাবে ঈদ উৎসব পালন করত তা রীতিমতো গবেষণার বস্তু। তবে বলা যেতে পারে আদিতে প্রচার করা আরবের উদ্যাপিত ঈদের আদি রূপই হয়তো তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু কালের গর্ভে সময়ের বিবর্তনে সে রূপ চিরতরে হারিয়ে গেছে। কখনো ধর্ম নেতারা মূল অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তাদের নিজের গড়া নতুন অনুষ্ঠান। কখনো শাসক শ্রেণির নির্দেশে যুক্ত হয়েছে বিশেষ বিশেষ ক্রিয়াকর্ম। কখনো বা লৌকিক ধর্মের প্রভাব এসেছে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে। সে জন্য আবারও বলতে হয় বাংলাদেশে যেভাবে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে তাতে সেখানে প্রভাব ফেলেছে কৃষিজীবী মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস।

শাসক ইংরেজরা স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের ঈদকে গুরুত্ব দেয়নি। এজন্য সরকারি ছুটিও বরাদ্দ ছিল কম। তা ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে ঈদকে সে আমলে উৎসবে পরিণত করা সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। কারণ গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মুসলমান ছিল বিত্তহীন ও নিরক্ষর।

‘তাবাকাৎ-ই-নাসিরি’র লেখক ঐতিহাসিক মিনহাজ উস-সিরাজ সেকালের ঈদ উৎসব সম্পর্কে জানিয়েছেন, “বাদশাহ ধর্মীয় আলোচনায় ব্যস্ত থাকতেন, ঈদের নামাজ পড়ানোর জন্য নিয়োগ করতেন ধর্মীয় ইমাম। শহরের বাইরে উন্মুক্ত জায়গায় অথবা গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব স্থানকেই ঈদগাহ নামে অভিহিত করা হতো।”

আগেই বলা হয়েছে ঈদ সম্পর্কে আমরা সেকালে যে বিবরণ পাই তা থেকে ধরে নেওয়া যায় রমজান মাস থেকেই শুরু হতো ঈদের প্রস্তুতি। এ উৎসব শুরু হতো রমজানের চাঁদ দেখা থেকে। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না।

আবুল মনসুর আহমেদ সেকালে ঈদের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে আরও বলেছেন, “এই অঞ্চলে কোনো মসজিদ বা জুমার ঘর ছিল না। বছরে দুইবার ঈদের জামায়াত হইতো বটে কিন্তু তাতে বড়রাই সামিল হইতো। তাই জামাতে খুব অল্প লোকই দেখা যাইতো। সাধ্যমতো নতুন কাপড় চোপড় পরিয়া লোকেরা বেদম গান বাজনা করিত। সারারাত ঢোলের আওয়াজ পাওয়া যাইতো। প্রায়ই বাড়ি বাড়ি ঢোল-ডাগর দেখা যাইতো। ঈদের জামাতেও লোকেরা কাছা, ধুতি পরিয়াই যাইত। নামাজের সময় কাছা খুলিতেই হইতো। সে কাজটাও তাহারা নামাজে দাঁড়াইবার আগেতক করিত না। প্রথম প্রথম নামাজের কাতারে বসিবার পর অন্যের অগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলিয়া নামাজ শেষ করিয়া কাতার হইতে উঠিবার আগেই আবার কাছা দিয়া ফেলিত।”

অজ্ঞতা ও কুসংস্কার তখন বাঙালি মুসলমান সমাজকে নিদারুণভাবে গ্রাস করে। তারা সহজ-সরল ইসলাম ভুলে গিয়ে রমজানে ও ঈদ উৎসবের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বহু কুপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস, ইসলামবিরোধী আচার-অনুষ্ঠানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সে সময় সত্যিকারের ইসলাম হারিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে কুসংস্কার ও অনৈসলামিক কার্যকলাপে লিপ্ত থেকে অন্ধকারের অতল তলে হারিয়ে যায়। তখনকার মুসলমানদের সমাজে এই অধঃপতন দেখে সে সময়ে ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তুলস্নাহ (১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। জেমস ওয়াইজ আরও লিখেছেন দীর্ঘকাল হিন্দুদের সংস্পর্শে থাকার ফলে ঈদ উৎসবের ধর্মীয় ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের মতো যেসব কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস প্রবেশ করে তার বিরুদ্ধে হাজী শরীয়তুলস্নাহ সর্বপ্রথম আন্দোলন আরম্ভ করেন। তিনি ইসলাম ধর্মের বহু দেব-দেবী, ভ্রান্ত অলীক বিশ্বাসও পাপপূর্ণ নতুন প্রথাগুলোর উচ্ছেদের জন্য আন্দোলন করেন। এভাবে হাজী শরীয়তউলস্নাহ দীর্ঘকাল ধরে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজ থেকে বহু অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করেন।

এ শতকের তৃতীয় চতুর্থ দশকের গ্রামাঞ্চলে ঈদ পালনের কয়েকটি বর্ণনা পাই খন্দকার আবু তালিবের নিবন্ধ থেকে -“রোজার পনেরো দিন যাওয়ার পর হতেই গৃহবধূরা নানা রকম নকশি পিঠা তৈরি করতে শুরু করত। এদের মধ্যে ফুল পিঠা, পাপর পিঠা, ঝুরি, হাতে টেপা সেমাই ইত্যাদি উলেস্নখযোগ্য। শবেকদরের রাতে মেয়েরা মেহেদী এনে তা বেটে হাতে নানা রকম চিত্র আঁকত। ফুল পিঠা তৈরি করার সময় বউয়েরা ‘প্রিয় স্বামী’, আর অবিবাহিত মেয়েরা ‘বিবাহ’ ও ‘প্রজাপতি’ এঁকে রাখত। ঈদের দিনে যুবক-যুবতী বন্ধু-বান্ধবীদের পাতে দেওয়ার জন্যই এ ধরনের ফুল পিঠা তৈরি করা হতো।”

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আগেও যেমন বঞ্চিত ছিলেন ঈদের আনন্দ থেকে এখনো বঞ্চিত আছেন তদ্রূপ, প্রতিনিয়ত, মোগল আমলের ইতিহাসে আমরা দেখেছি বিত্তবানরা ঈদের দিন ছুড়ে দিচ্ছেন রেজগি পয়সা আর সাধারণ, নিরন্ন, বঞ্চিত মানুষ তা কুড়িয়ে নিচ্ছেন কাড়াকাড়ি করে। এখনো তার এ আমলে কোনো হেরফের হয়নি বরং বঞ্চনা আরও বেড়েছে। আমরা চোখের সামনে দেখেছি বাংলাদেশে ধনীর গৃহে জাকাতের কাপড় নেওয়ার জন্য ছিন্নমূল মানুষের হুটোপুটি লাইন তা আমাদের হতভাগ্য, বঞ্চিত, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের চেহারাই তুলে ধরে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের আনন্দ সাধারণ মানুষের মনে আজ আর কোনোই রেখাপাত করে না। ঈদুল ফিতরের জামাতের আগে থেকেই বিত্তবানদের ফেতরার অর্থ ও সাহায্য নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় শত শত ছিন্নমূল মানুষকে। উৎসব সর্বাঙ্গীণ আনন্দময়, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে তখনই যখন আসে বিত্ত বণ্ঠনের সামঞ্জস্য। তা নাহলে ধর্মীয় উৎসব (ঈদুর ফিতর) মূল আবেদন হ্রাস পায়।

ফরায়েজী আন্দোলন এবং পরবর্তী ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনগুলো পাল্টে দিতে পেরেছিল বাংলাদেশের এই মুসলমানদের মনমানসিকতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও লৌকিক, স্থানীয় উপাদানগুলো বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হয়েছে ঈদের সঙ্গে।

এই শতকের শুরু থেকেই যখন রাজনৈতিকভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে ঈদ। বাংলাদেশের দুটি ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

দেড়শ দুশো বছর আগে ঢাকা ছিল নিতান্ত অস্বাস্থ্যকর, অসুন্দর নোংরা এক শহর; নিরানন্দ তো বটেই। তবুও প্রতিবছর বিশেষ বিশেষ সময়ে হঠাৎ দু-একদিনের জন্য বদলে যেত ঢাকা শহরের চেহারা। মেলা, রঙিন নিশান, লোকজনের ব্যস্ত চলাফেরায় ঢাকা পড়ে যেত শহরের নোংরা চেহারাটা। নিরানন্দ শহর দু-একদিনের জন্য হলেও ঝলমল করে উঠত, জমকালো সব মিছিল দেখতে সাড়া পড়ে যেত। এর মূলে ছিল কয়েকটি উৎসব– ঈদ, মুহররম ও জন্মাষ্টমী।

ঊনিশ শতক পর্যন্ত বর্তমান বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে এ তিনটি উৎসবই ছিল প্রধান উৎসব। এ কথা ঠিক, মূলত তিনটি উৎসবই ধর্মীয়, কিন্তু মুহররম ও জন্মাষ্টমী ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেকাংশে পরিণত হয়েছিল সর্বজনীন উৎসবে। ঈদ বা ঝুলন সে অর্থে ধর্মের গণ্ডি ছাড়াতে পারেনি। মুহররম বা ঈদ বাংলাদেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হলেও অজস্র লোকায়ত উপাদান এদের আমদানিকৃত কঠোর শুদ্ধ চরিত্র বদলে দিয়েছিল। ফলে, এক সম্প্রদায়ের লোকের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল আরেক সম্প্রদায়ের উৎসবে যোগ দেওয়া। এখানে একটি কথা উল্লেখ্য, ঈদ, মুহররম এবং জন্মাষ্টমী, এই তিনটি উৎসবেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মিছিল। জমকালো, উল্লাসমুখর সে মিছিল এখন স্মৃতি।

এখানে ঢাকার উৎসব ও ঝুলন-এর কথাই প্রধানত আলোচনা করব; আলোচনা সীমিত থাকবে ঢাকা শহরের মধ্যেই। আলোচনার শুরুতে ঈদ উৎসবের উৎস, তারপর ঢাকায় এর বিকাশ এবং স্থানীয়, সামাজিক ও লোকায়ত উপাদান কীভাবে সৃষ্টি করেছিল আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের, তা তুলে ধরার চেষ্টাি করব।

মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উৎসব হচ্ছে ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা। আমাদের দেশে এ দুটি ধর্মীয় উৎসব পালিত হয় যথেষ্ট ধুমধামের সঙ্গে। ঈদ-উল-ফিতর আবার যুক্ত মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস রমজানের সঙ্গে। আর ঈদ-উল-আজহা যুক্ত পবিত্র হজব্রতের সঙ্গে। এখানে, এখন যেভাবে ঈদ পালিত হচ্ছে, একশ বা দেড়শ বছর আগেও কীভাবে পালিত হত ঈদ? এ দুই উৎসবের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল কৃষিজীবী মানুষের লোকায়ত বিশ্বাস?

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বিশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞাসা মেলে না; জ্ঞানের উৎস জিজ্ঞাসা। আর রসূল (দ:) নিজেও বলেছেন, জ্ঞানার্জনের জন্যে প্রয়োজন হলে সুদূর চীনেও যেতে। সুতরাং বর্তমান আলোচনা সে পরিপ্রেক্ষিতেই, কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়।

সম্প্রতি ‘ইসলামি পার্বণের সামাজিক নৃতত্ত্ব’ নামক এক প্রবন্ধে বাহারউদ্দিন সামগ্রিকভাবে ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন তিনি রমজান, হজ সম্পর্কেও, মূলত প্রাচীন লোকবিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে।

প্রবন্ধকার জানিয়েছেন, ‘‘ঈদ, সওম এবং রমজানের মূল অর্থ তাদের উৎসভূমির ভিত্তিতেই। অনুমান হয় রোজার উপবাস জন্ম দিয়েছে কৃষিনির্ভর সমাজে, হয়তো-বা প্রাচীন সিরিয়ায়। রমজান মাস মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস এবং কোরানে একমাত্র এ মাসের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। এ মাসেই নাজেল হয়েছিল কোরান, প্রথম অহী পেয়েছিলেন মুহম্মদ (দ:), গিয়েছিলেন তিনি মেরাজে। বাহারউদ্দিনের মতে, মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার আগে রমজানের সঙ্গে পরিচয় ছিল না মুসলমানদের। এর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল হিজরতের পরেই। এ অনুমানের ভিত্তি– ‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে আগত। রমজ মানে দাহ, তাপ। পুরনো আরবি শব্দতাত্ত্বিকদের ধারণা, চান্দ্রমাস চালু হওয়ার [চন্দ্রবর্ষই নিয়ন্ত্রিত করে মুসলমানদের উৎসব] অনেক আগে, প্রাচীনকালে গরমের মওসুমে এই মাস পড়ত বলে এর নাম হয় ‘রমজান’।’’

‘‘রমজানের সঙ্গে উপবাসের আরবি প্রতিশব্দের ধ্বনিগত কোনো মিল নেই। উপবাসের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সওম’। এর অর্থের সঙ্গেও উপবাসব্রতের কোনো মিল নেই। এর অর্থ হল আরাম বা বিশ্রামে থাকা। হিজরতের পরেই সম্ভবত ইহুদি সিরিয়াক সূত্র থেকে উপবাসের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সওম’ শব্দটি গ্রহণ করেন মুহম্মদ (দ:)। কোরানের ১৯ নং সূরা মরিয়মের ২৭ নং আয়াতে ‘সওম’ শব্দটি আছে।’’

‘‘দ্বিতীয় হিজরিতে নির্দেশ এসেছিল অবশ্য কর্তব্য হিসেবে রজমান পালনের এবং এ উপবাসের সঙ্গে মিল আছে আবার পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিস্টানদের, যারা নির্দিষ্ট সময়ে চল্লিশ দিন পালন করেন উপবাস। রমজান শেষে ঈদ-উল-ফিতর। ঈদের অর্থ উৎসব। তবে আভিধানিক অর্থ ‘পুনরাগমন’ বা বারবার ফিরে আসা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানজ্ঞাপক অধিকাংশ শব্দের মতো ঈদ শব্দটি মূলত সিরিয়াক।’’

আরও লিখেছেন তিনি, ‘‘ঈদ শব্দটির অর্থের সঙ্গে আজকের অর্থের কোনো যোগাযোগ নেই, কিন্তু সামাজিক উৎসবের প্রকৃতিকে অর্থবহ করে তোলে তার আদি অর্থ। সামাজিক উৎসব বারবার ফিরে আসে আর ঈদ শব্দের আদি অর্থেও আছে তার ইঙ্গিত।

ঔপনিবেশিক আমলে যে উৎসব সবচেয়ে ধুমধামের সঙ্গে পালিত হতো এবং যে ধর্মীয় উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি ছুটি বরাদ্দ ছিল, তা হল ক্রিসমাস। এর কারণ স্বাভাবিক। ইংরেজরা ছিল শাসক। সুতরাং তাদের উৎসব যে শুধু জাঁকালো হতো তা নয়, এ নিয়ে মাতামাতিও কম হতো না। স্থানীয় ভদ্রলোকেরাও যোগ দিতেন ক্রিসমাসে। তৎকালীন বাংলার কলকাতা ছিল ক্রিসমাস উৎসব পালনের প্রধান কেন্দ্র। কারণ, কলকাতা ছিল রাজধানী এবং শাসকগোষ্ঠী ও শহরের সম্পন্ন ভদ্রলোকদের বেশিরভাগ সেখানেই থাকতেন। তবে গ্রামাঞ্চলের কথা দূরে থাক, শহর বা মফস্বলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না।

ওই সময় বিত্ত-বিদ্যার দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের থেকে হিন্দুরা সম্প্রদায় হিসেবে এগিয়ে ছিলেন অনেক। ফলে ক্রিসমাসের পর সরকারিভাবে তো বটেই, সম্প্রদায়গত আধিপত্য এবং ঐতিহ্যের কারণেও এ অঞ্চলের দুর্গাপুজা হয়ে উঠল সবচেয়ে জাঁকালো এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। সরকারি ছুটির পরিমাণ ঈদের থেকেও পুজোর জন্য ছিল বেশি। পুজোর ছুটিতে সম্পন্ন ভদ্রলোকরা বেরিয়ে পড়তেন ভ্রমণে। চাকরিজীবীরা ফিরতেন গ্রামের বাড়িতে; আসতেন জমিদাররা শহর থেকে প্রজাদের খোঁজখবর নিতে। বিত্ত ছিল তাদের। সুতরাং ধুমধামের সঙ্গে উৎসব পালনে বাধা ছিল না।

ইংরেজ আমলের মুসলমান চাকুরেদের আবেদনপত্রে দেখা যায়, তাঁরা আবেদন জানাচ্ছেন ঈদে ছুটি বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু কর্ণপাত করা হয়নি তাতে। আর ছুটি বৃদ্ধি করলেই-বা কী হতো? বড়জোর গ্রামের বাড়িতে ফিরে পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে কয়েকদিন কাটিয়ে যেতে পারতেন। ঈদকে উৎসবে পরিণত করা সম্ভব ছিল না তাঁদের পক্ষে। কারণ গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মুসলমান ছিলেন বিত্তহীন।

ঈদ মুসলমানদের প্রধান উৎসব হিসেবে পালিত না হওয়ার আরেকটি কারণ, বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। ফারায়েজী আন্দোলনের আগে গ্রামাঞ্চলে মুসলমানদের কোনো ধারণা ছিল না বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে। ইসলাম ধর্মে লোকজ উপাদানের আধিপত্য ছিল বেশি৷

১৮৮৫-এর দিকে জেমস ওয়াইজ লিখেছিলেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সরল অজ্ঞ কৃষক। ইসলাম ধর্মে যেসব বিজাতীয় রীতিনীতি প্রবেশ করেছিল তারা এখন তা উৎপাটন করতে চাইছে। কিন্তু এরপর ওয়াইজ যে উদাহরণ দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে, কৃষকরা এর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। লাক্ষ্য নদীর তীরে, কোরবানির ঈদের সময় গ্রামবাসীরা জমায়েত হয়েছেন ঈদের নামাজ পড়বেন বলে। কিন্তু জামায়েতের একজনও জানতেন না কীভাবে ঈদের নামাজ পড়তে হয়। তখন নৌকায় ঢাকার এক যুবক যাচ্ছিলেন। তাকে ধরে এনে পড়ানো হয়েছিল নামাজ।

অন্যদিকে, মুকুন্দরাম আবার চণ্ডীকাব্যে লিখেছিলেন, মুসলমানরা বড়ই ধার্মিক এবং প্রাণ গেলেও ‘রোজা নাহি’ ছাড়ে–

‘ফজর সময়ে উঠি, বিছানা লোহিত পাটি
পাঁচ বেরি করয়ে নামাজ।
সোলেমানি মালা ধরে জপে পীর পয়গম্বরে
পীরের মোকামে সেই সাজ।
দশবিশ বেরাদরে বসিয়া বিচার করে,
অনুদিন কিতাব কোরান।
বড়ই দানিসমন্দ, কাহাকে না করে ছন্দ
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ে।’

মনে হয়, মুকুন্দরাম এ বর্ণনা লিখেছিলেন বহিরাগত মুসলমানদের দেখে।

মির্জা নাথানও বহিরাগত মুসলমানরা কীভাবে রমজান এবং ঈদ পালন করতেন তার বর্ণনা রেখে গেছেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতিনিধি সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেছিলেন ১৬১০ সালে। নাথান ছিলেন তাঁর একজন সেনাপতি। বাংলাদেশের মুঘল অভিধানের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন নাথান তাঁর গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান ই-গায়বী’তে। রমজান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন–

‘‘রমজান মাসের শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত প্রতিদিন বন্ধুবান্ধবরা পরস্পর মিলিত হত পরস্পরের তাঁবুতে। এটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ এক রীতি।’’

ঢাকার ঈদ প্রতিপালন সম্পর্কে সবচেয়ে পুরোনো তথ্যটি পাই আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর ‘নওবাহারই মুর্শীদ খান’ গ্রন্থে। ঐতিহাসিক আবদুর রহিম সে গ্রন্থ অবলম্বন করে লিখেছেন–

‘‘মুসলমানরা সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা করে ঈদগায় যেত। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা উৎসবের সময় মুক্ত হস্তে অর্থ ও উপহারাদি পথে ছড়িয়ে দিতেন।’’

এ বর্ণনা থেকে মনে হতে পারে, দু-তিনশ বছর আগে ঢাকায় বোধহয় খুব ধুমধামের সঙ্গে ঈদ পালিত হতো। আসলে তা ঠিক নয়। এ বর্ণনাটির পরিপ্রেক্ষিত সঠিক নয়। আর এত ধুমধামের সঙ্গে ঈদ পালিত হলে অন্যান্য উৎসবের মতো ঈদের বর্ণনা থাকত বিভিন্ন গ্রন্থে। মূল ব্যাপারটি ছিল এ রকম [যদুনাথ সরকারের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে]–

‘‘দ্বিতীয় মুর্শীদ কুলি খাঁর সময় (১৭২৯) জয় করা হয়েছিল ত্রিপুরা। ২৯ রমজান নবাব এ খবর পেয়ে এত উল্লসিত হলেন যে, তিনি যেন দুটি ঈদ পালন করছেন। ঈদের দিন, এ কারণে তিনি মীর সৈয়দ আলী ও মীর মোহম্মদ জামানকে আদেশ দিলেন গরিবদের মধ্যে এক হাজার টাকা বিতরণ করতে। ঢাকা কিল্লা থেকে এক ক্রোশ দূরে ঈদগা যাবার পথে রাস্তায় ছাড়ানো হয়েছিল মুদ্রা।’’

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, ঈদের দিন যে হইচইটুকু হতো তা বহিরাগত উচ্চপদধারী বা ধনাঢ্য মুসলমানদের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। এ সবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ছিল যোজনব্যাপী ব্যবধান। আর রইসরাও ঈদের দিন ‘পথে প্রচুর পরিমাণ টাকাকড়ি ছড়িয়ে দিতেন’ না [একবার দেওয়া হয়েছিল বিশেষ কারণে]। তবে, কিছু দান-খায়রাত হয়তো করতেন।

এরপর এ শতকের আগের ঈদের বর্ণনা তেমন আর পাই না। তবে, মুঘলরা ঈদের গুরুত্ব দিতেন। তা বোঝা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা [যেমন, ঢাকা, সিলেট] শাহী ঈদগাহের ধ্বংসাবশেষ দেখে। এ রকম একটি ঈদগা আছে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায়, যার কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি।

ধানমণ্ডির ঈদগাহটি মাটি থেকে চার ফুট উঁচু একটি সমতলভূমি। দৈর্ঘ্য এর ২৪৫ ফুট, প্রস্থ ১৩৭ ফুট। বিস্তৃত তিনদিকে। পশ্চিমে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর, যেখানে রয়েছে মেহরাব বা মিম্বর। পাশ দিয়ে তখন এর বয়ে যেত পাণ্ডু নদীর একটি শাখা। এই শাখা নদী জাফরাবাদের সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে মিলিত হত বুড়িগঙ্গার সঙ্গে।

শাহ সুজা যখন বাংলার সুবাদার তখন তাঁর আমাত্য মীর আবুল কাসেম ১৬৪০ সালে নির্মাণ করেছিলেন ঈদগাহটি। সুবাদার, নাজিম ও অন্যান্য মুগল কর্মকর্তারা নামাজ পড়তেন এখানে। ইংরেজ আমলে জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় ছিল ঈদগাহটি।

ঐতিহাসিক তায়েশের বিবরণ থেকে জানা যায়, তবুও উনিশ শতকে [খুব সম্ভব শেষের দিকে] শহরের মুসলমানেরা ঈদের নামাজ পড়তেন এই ঈদগাহে এবং এখানে আয়োজন করা হত একটি মেলার। অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে, ঈদ উপলক্ষে এখানে হত মেলা, যেখানে যোগ দিতেন শহর ও আশেপাশের এলাকার লোকজন।

এখানে বলে রাখা ভালো, যে, মুঘল আমলে ঈদের দিন ঈদগাহে যেতেন মুঘলরাই, সাধারণ মানুষের স্থান সেখানে ছিল কিনা সন্দেহ। তবে, তায়েশ উল্লিখিত মেলার বর্ণনা থেকে অনুমান করে নিতে পারি, উনিশ শতকের শেষে এবং এ শতকের গোড়ায় ঈদের দিন আনুষঙ্গিক আনন্দ হিসেবে সাধারণ মানুষ যোগ করেছিলেন একটি লোকায়ত উপাদান– মেলা। তায়েশের বর্ণনা ছাড়া [তা-ও সম্পূর্ণ নয়] মেলার কথা আত্মজীবনীতে অবশ্য তেমন পাওয়া যায় না। বয়োবৃদ্ধদের কাছে শুনেছি, ছেলেবেলায় ঈদ উপলক্ষে তাঁদের কোথাও কোথাও মেলা বসার কথা মনে পড়ে।

সম্প্রতি, আশরাফউজ্জামান তাঁর আত্মজীবনীমূলক এক নিবন্ধে এই মেলার কথা উল্লেখ করেছেন–

‘‘ঈদের মেলা হত চকবাজারে এবং রমনা ময়দানে। বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসত নানা রকমের। কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসত সুন্দর করে সাজিয়ে। কাবলীর নাচ হত বিকেল বেলা।’’

আবদুস সাত্তারও প্রায় একই কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা যে সময়ের কথা লিখেছেন তা সম্ভবত ত্রিশ-চল্লিশের দশক। চকবাজার, কমলাপুরে এখনও হয়তো সেই মেলার রেশ ধরে মেলা বসে।

ঈদ সম্পর্কে যে স্বল্প বিবরণ পাওয়া যায়, তা থেকে ধরে নেওয়া যায়, রমজান মাস থেকেই শুরু হত ঈদের প্রস্তুতি। এ উৎসবের শুরু হত রমজানের ঈদের চাঁদ দেখা থেকে। মনে হয়, এটি মুঘল প্রভাবের কারণ এবং তা সীমাবদ্ধ ছিল শহরে বিশেষ করে ঢাকার এবং মফস্বল বা গ্রামের সম্পন্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে।

১৯৪৭-এর আগে, বাংলাদেশে একমাত্র ঢাকাতেই ঈদ যা একটু ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত। ঢাকা ছিল পূর্ববঙ্গের প্রধান ও মুঘল শহর। তাই মুঘল ঈদের প্রভাব ছিল বেশি। তাছাড়া, এখানে থাকতেন নওয়াব ও অন্যান্য মুসলমান ধনাঢ্য ও শরীফ ব্যক্তিরা। ফলে ঈদ পেত পৃষ্ঠপোষকতা।

ঢাকার উপরের স্তরে যে রীতিনীতি চালু ছিল, তা হল খোসবাস বা সুখবাস সমাজ প্রভাবিত। হাকিম হাবিবুর রহমান লিখেছেন–

‘‘ঢাকার সমাজ ব্যবস্থা ও তাহযীব তমুদ্দন মূলত আগ্রারই সমাজব্যবস্থা ও তখনকার তাহযীব-তমুদ্দন। কিন্তু এই সমাজ কাঠামোতে ইরানিদের আধুনিক তমুদ্দন যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। এদের মাধ্যমে শিয়া মত-সংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যেও প্রবেশ লাভ করেছে। এই ধর্মীয় মতবাদটি অজ্ঞাতসারে উর্দুভাষী সুন্নীদেরকেও প্রভাবিত করেছে।’’

উনিশ শতকের শেষার্ধে ও এ শতকের প্রথম দু-তিন দশকের পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্তব্য করেছিলেন হাকিম হাবিবুর রহমান। এর রেশ ঢাকা শহর থেকে এখনও মিলিয়ে যায়নি।

খোসবাস সংস্কৃতির একটি উদাহরণ ছিল ঢাকার ঈদের মিছিল। এ ধরনের মিছিল বাংলাদেশের কোথাও বেরোত না। এ সম্পর্কে জানা যায় আলম মুসাওয়ারের এক চিত্রমালা থেকে।

আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পী, খুব সম্ভব উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার ঈদ ও মুহররম মিছিলের ৩৯ টি ছবি এঁকেছিলেন, যা রক্ষিত আছে জাতীয় জাদুঘরে। এ চিত্রমালা দেখলে বোঝা যায়, নবাবি আমলের ঢাকার মুহররম ও ঈদ মিছিলের বর্ণাঢ্য রূপ ও ব্যাপকতা। ছবিগুলো দেখে অনুমান করে নিতে পারি, নায়েব নাযিমদের বাসস্থান নিমতলি প্রাসাদের ফটক থেকে [বর্তমান এশিয়াটিক সোসাইটির পেছনে] বিভিন্ন পথ ঘুরে, চকবাজার, হুসেনি দালান হয়ে সম্ভবত মিছিল আবার শেষ হত মূল জায়গায় এসে।

মিছিলে থাকত জমকালো হাওদায় সজ্জিত হাতি, উট, পালকি। সামনের হাতিতে থাকতেন নায়েব নাযিম। কিংখাবের ছাতি হাতে ছাতি বরদার, বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ছিল কাড়া-নাকড়া শিঙা। রঙবেরঙের নিশান মিছিলের রূপ দিত আরও খুলে। দর্শকরা সারি বেঁধে থাকতেন রাস্তার দু’পাশে, ছাদে। এঁদের মধ্যে ছিলেন দেশীয়, মুঘল। [বহিরাগত], ইংরেজ সাহেব, মেম। রাস্তায় রাস্তায় ফকির যেমন ছিল, তেমনি ছিল খেলা-দেখানেওয়ালা।

এ মিছিল কবে শুরু হয়েছিল, তা জানা যায়নি। খুব সম্ভব নায়েব নাযিমরা যখন থেকে নিমতলি প্রাসাদে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন [অষ্টাদশ শতকে], তখন থেকেই এই মিছিলের শুরু।

ঈদের মিছিল আবার কবে ঢাকা থেকে মিলিয়ে গিয়েছিল, তাও জানা যায়নি। খুব সম্ভব উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকার নায়েব নাযিমদের বংশ লুপ্ত হয়ে গেলে, সমাপ্তি ঘটেছিল এ মিছিলের। কারণ, ধনাঢ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত এ ধরনের মিছিল সংগঠিত করা দুরুহ।

এ শতকের বিশ-ত্রিশের দশকে ঢাকায় রমজানের শুরুতে ঘরবাড়ি মসজিদ সব সাফ সুতরো করে রাখা হত। রমজানের চাঁদ দেখার জন্য বিকেল থেকেই বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, হুসেনি দালানের ছাদে ভিড় জমে যেত। ‘‘চাঁদ দেখা মাত্রই চারিদিক হইতে মোবারকবাদ, পরস্পর সালাম বিনিময় এবং গোলাবাজি ও তোপের আওয়াজ হইতে থাকিত।’’

ঢাকার রমজান ও ঈদের বড় আকর্ষণ ছিল খাবার। রোজায় ঘরে অনেক রকম ইফতারি থাকলেও সবাই একবার চকে ছুটে যেত। চক সেই মুঘল আমল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য, খাবার-দাবার, আড্ডার কেন্দ্র। চকের ইফতারির কিছু বিবরণ রেখে গেছেন আবু যোহা নূর আহমেদ। খাবারগুলো ছিল– শিরমাল, বাকেরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কাকচা কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হাড্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোফতা, শামি ও টিকা কাবাব, পরোটা, বোগদাদি রুটি, শবরাতি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল। চক এখনও প্রায় সে ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।

উপসংহার: এদেশে স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে ঈদ এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে আগের অজ্ঞতাও তেমন নেই এখনকার মুসলমানদের মধ্যে। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমপ্রধান দেশে ঈদ এখন নিজের গৌরবোজ্জ্বল, ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থান করে নিয়েছে এবং আমাদের বাংলাদেশেও তা বিরাট গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। মুসলমানদের ধর্মীয় তামুদ্দনিক জাগ্রত করেছে এই ঈদুল ফিতর, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কবির ভাষায় বলতে গেলে-

“এসো মুসলিম তসলিম নাও,/নাও এ তোহফা বেহেশতের/তশতরী ভরে শীরনি বিলাও/নির্মল ইনসানিয়াতের।”

সবাইকে ঈদ মোবারক।

তথ্যসূত্র:

১| মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : কলাম লেখক
২| দৈনিক যায় যায় দিন৷
৩| মুনতাসীর মামুন, ইতিহাসবিদ। 
৪| আবুল মনসুর আহমেদ৷
৫| দৈনিক জনকণ্ঠ৷
৬| মো. জোবায়ের আলী জুয়েল৷
৭| crimebarta.com
৮| ফেসবুক৷
৯| উইকিপিডিয়া৷
১০| অন্যান্য

রবীন জাকারিয়া 
লেখক, রংপুর। 
 

ঈদ সংখ্যা - ২০২২
282 Views

মুগ্ধতা.কম

২ মে, ২০২২ , ৫:১৫ অপরাহ্ণ

ইদ : অধিকারের অন্নেষণ

উৎসব বিষয়ে বয়সাক্রান্ত যে কেউ অতিবেশি আবেগাক্রন্ত। সুখের ধারাবর্ণনায় অনেকটা বাঁধভাঙা। অতীতমুখী ধারাবাহিকতা মন্দ নয়। তবে বর্তমান জনগোষ্ঠীর মনোভঙ্গির পরিবর্তন, অতীতের সাথে পার্থক্য বাড়ায় শুধু। উৎসব গোত্রীয় যে কোনো বিষয়ই এক ধরনের নিরপেক্ষ, সমতাভিত্তিক ভাবনা তাড়িত করে আমাদের। ইদ উৎসব বিষয়টি এ ক্ষেত্রে অতিবেশি স্পর্শকাতর। ধর্মীয় নির্দেশনাবলী, সামাজিক দায়, সাংস্কৃতিক বোধ সব মিলিয়ে নৈতিক নিষ্ঠার পর্যায়ে ফেলা যায় ইদ উৎসবকে। স্বত:স্ফুর্ত আনন্দ, নিকট যোগসূত্র, ব্যবধানহীন মুক্ততা, সর্বোপরি মানবিক সাম্যের দাবী প্রধান হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু হিসাব মেলে না বাস্তব দৃষ্টান্তে। যে সূত্রেই প্রশ্ন জাগে ইদ উৎসব কি অধিকারের নাকি করুণার?

ইসলামের সাম্য নির্দেশনা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার রীতি বৈজ্ঞানিক অবশ্যই। মানুষ মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, অর্থনৈতিক সমতার বিধানও স্পষ্ট। দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রবল বিধি নিষেধ, বর্ণ-গোত্র, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সবার মর্যাদার স্বীকৃতি সমান। যে কোনো উৎসবে সব মানুষ সমভাবে আনন্দ ভোগ করবে  এ বিষয়েও দ্বিমত নেই। গণতন্ত্র প্রত্যাশী রুশো, আব্রাহাম লিংকন, কাজী নজরুল ইসলাম বলিষ্ঠ কন্ঠে সাম্য বাণীর ঘোষণা দিয়েছেন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ে স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করে। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ(স.) অনেক আগেই জানান দেন ‘মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। সকল মানুষের ধমনীতে একই পিতা-মাতার শোনিতধারা প্রবাহিত।’ ইসলামে রাজা-প্রজা, দাস-দাসি, পুরুষ-নারী, গরির-ধনি সবার অধিকার সমানভাবে স্বীকৃত। তারপরও যখন ইসলামধর্মে বিশ্বাসী মানুষদরে সংকীর্ণ স্বার্থ অর্জনে অতিবেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তখন সবার অধিকার সমান থাকে না। অধিকারহারা মানুষরা করুণার পাত্র হয়েই পরমুখাপেক্ষি প্রহর গোণে। অথচ ইদ উৎসব নিয়ে কবির অনুভব

‘ঈদ মানে নয়তো শুধু

নতুন জামা পরা

ঈদ মানে গরীর দু:খীর

যতœ সেবা করা।

ঈদ মানে নয়তো শুধু

একলা বসে খাওয়া,

ঈদ মানে দুখীর পানে

একটুখানি চাওয়া।’

ঊাস্তবতা হলো ইদ উৎসবও এখন সর্বজনীন আনন্দমাখা থাকছে না। এর কারণ বহুবিধ। উল্লেখ করা যায় মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অতিমাত্রায় আত্মস্বার্থকেন্দ্রিকতা, আদর্শচ্যুতি, দান-খয়রাত, যাকাত, ফেতরা বিধান যথাযথ অনুসরণ না করার বিষয়গুলোর কথা। এর বাইরেও আছে ক্ষমতার দর্প, বিত্তবানের খেয়াল খুশির মানসিকতা, মানুষকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। এমন অবস্থায় ইদ আনন্দ অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে কেমন করে? তাই তো রমজান শুরু হবার পর থেকে অসহায় মানুষের শংকা বাড়ে. বিত্তবানদের বাড়ে জৌলুশ। প্রতিযোগিতার অসম মাত্রা বিত্তহীনদের অধিকার করে খর্বিত। আমাদের সমাজ ভাবনায় গরিবরা প্রাধান্য পায় না কখনও। ইদকে ঘিরে সামাজিক শুভ চিন্তাার বিকাশ কতটা জোরালো – তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।
রোজা-ইদ আসলেই চাঁদাবাজী, ছিনতাই, চোরাচালান, ঘুষ, প্রতারণা, দ্রব্রমূল্য পালা দিয়ে বাড়ে। আশ্বাস থাকে কিন্তু থাকে না বাস্তবায়ন। সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বোধের জায়টা কোথায় পত্রিকাগুলো তা তুলে ধরলেও নীতি-নৈতিকতার বৃক্ষ বনসাই হয়েই থাকে। প্রায়োগিক কোনো সুফল সমাজ পায় না।

এবার হাওড়ের মানুষ বিপর্যস্ত। আগাম বন্যা হাওড়ের মানুষের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। সোনালি ফসলের বদলে অমানিশার ঘোর আঁধার তাদের সংসারে। প্রকৃতির বিরূপতার বিরুদ্ধে কষ্টময় সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকা এখন তাদের। সে প্রভাবে যতটা বাড়ার কথা তার চেয়ে অনেকগুণ বাড়ানো হয়েছে খাদ্যপণ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য। ক্ষুদ্ধ পরিকল্পনা মন্ত্রী একবার বলেছিলেন ‘এ দেশে সূর্য উঠলেও দাম বাড়ে, সূর্য ডুবলেও দাম বাড়ে।’ এমন আক্ষেপ যে পরিবেশেই হোক না কেন তা পুরোটাই সত্য। ব্যবসায়ীদের আত্মস্ফীতির মনেবৃত্তি সামাজিক কল্যাণী চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করতেই থাকে আর বাড়তেই থাকে পণ্যমূল্য। পণ্যমূল্য শুধু কেন? নির্বিঘ ঈদ যাত্রাও মানুষের অধিকার। এবার যাত্রা নির্বিঘ হলেও টিটিক প্রাপ্তিতে ছিল ভোগান্তি। বাসের টিকেটের আসল মুল্য নিশ্চিত কারাই কঠিন। বেশী নেয়াটাই যেনো পূণ্যের কাজ।

রোজা ও ইদেকে কেন্দ্র করে ত্যাগের যে পতাকা তুলে ধরার কথা তা কখনই হয় না আমাদের দেশে। ভোগের স্বপ্ন বিভোর বিত্তবানদের আরও চাই আরও চাই তৃষ্ণা মেটে না কখনও। এক্ষেত্রে রোজা, ইদ,পহেলা বৈশাখ নানা উৎসবে মাত্রারিক্ত মূল্য নেবার জন্যই জাল পেতে বসে থাকে। ধর্র্মীয় বিধি নিষেধ লোভের কাছে হার মানে। রোজা ও ইদে ভ্ক্তোারা সহনীয় মূল্যে পণ্য কিনে স্বচ্ছন্দে রোজা রাখবে, পরিবার পারিজনসহ ইদ আনন্দে যোগ দেবে এমনটাই কাম্য। এ তাদের অধিকার। কিন্তু কারও কিছু করার নেই।

সত্য হলো বিত্তবানদের সম্পদে আছে বিত্তহীনদের অধিকার। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিত্তবানদের সংকীর্ণতার পথ থেকে বেরিয়ে আসার আহŸান জানিয়েছেন। প্রবল প্রতাপে অধিকার আদায়ে বলিষ্ঠ হতে বলেছেন সবহারাদের।

‘মোদের হিস্যা আদায় করিতে ঈদে
দিলে হুকুম আল্লাহ-তা’আলা।
..আল্লাহর ঋণ শোধ কর, যদি বাঁচিবার থাকে সাধ
আমাদের বাঁকা ছুরি আাঁকা দেখ
আকাশে ঈদের চাঁদ।’ (ঈদের চাঁদ)

নজরুল নিজস্ব প্রত্যয়ে ইদ উৎসবকে যথার্থ অধিকার হিসেবে বিচার করেছেন । বঞ্চিতদের বঞ্চনার মূলে আঘাত হেনেছেন নিঃসংকোচে। যাকাত ফতরা করুণার দান নয়। এ মেহনতী মানুষের অধিকার। যারা সম্পদের পাহাড় গড়েÑ যথাযথ হিস্যা দিতে কুণ্ঠিত তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে হবে। ইদের চাঁদকে অধিকার আদায়ের বার্তাবাহক হিসেবে তুলে ধরেছেন কবি নজরুলÑ

‘ডাকাত এসেছে যাকাত লইতে , খোলো বাক্সের চাবি

আমাদের নয়, আল্লাহর, দেওয়া ইহা মানুষের দাবি।’

বঞ্চিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নজরুলের উচ্চ কণ্ঠ

‘প্রজারাই রোজ রোজা রাখিয়াছে আজীবন উপবাসী

তাহাদেরই তরে এই রহমত, ঈদের চাঁদের হাসি।

শুধু প্রজাদের জমায়েত হবে আজিকার ঈদগাহে

কাহার সাধ্য, কোন ভোগী রাক্ষস সেথা যেতে চাহে?’

মনুষ্যতের বর্তমান বিনাশী চিন্তায় নজরুলের বাণী কাঁদে নিরবে নিভৃতে। অনেকক্ষেত্রে যাকাত, ফেতরাসহ অন্যান্য দান করুণা ও দয়ার পর্যায়ে বিবেচিত হয়। গার্মেন্টস কর্মীসহ অনেক শ্রমজীবী মানুষকে ঠিকমত বোনাস বেতন দেয়া হয় না। সরকার প্রদত্ত চাল, টাকাও গরিবরা পুরো পায় না। আত্মাসাত করেন বিতরণে দায়িত্ববানগণ। সরকারের সদিচ্ছা লোভীদের কারণে পূর্ণতা পায় না। অন্যদিকে দিনান্ত পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরী না পাওয়া, সরকারি সহায়তা বঞ্চিত মানুষরা ইদ আনন্দে শরীক হতে পারে না। অধিকার কেড়ে নায়া দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকারী অসৎ মানুষদের তেমন শাস্তিও হয় না, বিবেকও জাগে না।

আমাদের অনুদার মানসিকতার প্রতাপে দরিদ্ররা ইদ আনন্দ পুরোটা উপভোগ করতে পারে না। এ অবস্থার পরিবর্তনে শুধু অতীত সুখের স্মৃতি তর্পণ নয়, প্রয়োজন অধিকার আদায়ের মনেবৃত্তি। নিজ অধিকার আদায়ে অবহেলিতরা জোটবদ্ধ না হলে বর্তমান ধারাবাহিকতায় ছেদ আসবে না। পাশাপাশি মনুষ্যত্বের কল্যাণময় চিন্তা, দরদবোধ জাগ্রত করা দরকার স্বাবলম্বীদের। ইদের সাম্য চিন্তা, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব নিছক বিবরণের না হয়ে আচরণীয় হওয়া উচিৎ। গরিবদের আনন্দ উপভোগের বিষয়টি করুণার দৃষ্টিতে না দেখে অধিকার হিসেবে বিচার করা সময়ের অন্যতম দাবী। সরকার, ধর্মবেত্তা, সুশীল সমাজ, সাংস্কৃতিককর্মীগণ যদি বিত্তবানদের দায়বদ্ধতা বিষয়ে সচেতন করতে থাকেন, নিজেরাও যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন, তা হলে বিবেকের জাগরণ আসবে, ঘটবে মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন, ইদের আনন্দ আর সীমাবদ্ধ থাকবে না বিত্তবানদের আঙিনায়, তা হবে সবার, কেউ অধিকারহারা হবে না, ইদ হবে সবার।

(লেখক বিশিষ্ট সাহিত্যিক, ভূতপূর্ব অধ্যাপক, বাংলা , কারমাইকেল কলেজ,রংপুর)

ঈদ সংখ্যা - ২০২২
176 Views

মাসুদ বশীর

২ মে, ২০২২ , ৫:১২ অপরাহ্ণ

নজরুলের কালজয়ী গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ এর ইতিহাস ও অন্যান্য

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ও সুরারোপিত এই কালজয়ী গানটি ছাড়া বাঙালি মুসলমানের ঈদ উৎসব যেন পরিপূর্ণতা পায় না। গানটি যেন মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় আনন্দ উৎসব ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের  একদম অত্যাবশকীয় অংশ হয়ে গেছে, আছে। সেই ১৯৩১ সালে কবি নজরুল রচিত এই গানটির ৯১বছর হয়ে গেলেও, গানটি আজও তুমুল জনপ্রিয় এবং এখনও সর্বমহলে সমানভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত।

কবি নজরুলের এই জনপ্রিয় গানটি রচনার একটি ইতিহাস আছে। একদা শ্যামা সংগীতের রেকর্ডিং শেষে কাজী নজরুল ইসলাম বাড়ি ফিরছিলেন, যাত্রাপথে হঠাৎ তাঁর পথ আগলে ধরেন সুর সম্রাট ও কবির একান্ত প্রিয় শিষ্য আমাদের কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন আহমদ। কবিকে তিনি ‘কাজীদা’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি কবিকে বললেন- কাজীদা একটা আবদার ছিল আমার। নজরুল তৎক্ষনাৎ বলেন- বলো দেখি কী তোমার আবদার। “কাজীদা, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এনারা তো কী সুন্দর সুন্দর উর্দু কাওয়ালী গান করছেন। শুনেছি তাদের গান অসম্ভব রকমের বিক্রিও হচ্ছে। কথা হলো কী কাজীদা, আমাদের বাংলা ভাষায় তো তেমন ইসলামি গান নেই। বাংলায় ইসলামি গান রচনা করলে কেমন হয়? কাজীদা, আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার পরিচয় গানের জগতে  একটা ভিন্নমাত্রা যোগ করবে এবং আপনার জয়গানও হবে।“

তৎকালীন সময়ে বাজারে ট্রেন্ড ছিলো শ্যামা সংগীতের। অনেক শিল্পীই শ্যামা সংগীত গেয়ে রীতিমতো তখন বিখ্যাত হয়েছিলেন। শ্যামা সংগীত মুসলিম নামে গাইলে বাজারে গান চলবে না। তাই সেই একই স্রোতে গা ভাসিয়ে অনেক মুসলিম শিল্পীও হিন্দু নাম ধারণ করে শ্যামা সংগীত গেয়েছিলেন। যেমন মুনশী মোহাম্মদ কাসেম হয়ে গিয়েছিলেন ‘কে. মল্লিক’, তালাত মাহমুদ হয়ে গিয়েছিলেন ‘তপন কুমার’। তখন নজরুল নিজেও শ্যামা সংগীত লিখতেন, সুর দিতেন। তখনকার গানের বাজারের যখন এমন অবস্থা তা ভেবে আব্বাস উদ্দীনের এমন আবদারের জবাবে নজরুল কী উত্তর দেবেন তা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবেন। কবি’র মনেপ্রাণে ‘ইসলাম’ শব্দটার সাথে তো একটা আলাদা আবেগ মিশে আছে। ছোটবেলায় তিনি মক্তবে পড়েছেন, কুর’আন শিখেছেন এমনকি তাঁর নিজের নামের সাথেও তো ‘ইসলাম’ যুক্ত রয়েছে। কিন্তু আব্বাস উদ্দীনকে তো এই মুহূর্তে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলাও যাচ্ছে না। স্রোতের বিপরীতে সুর মেলানোটাও তো সহজ কথা নয়। আবেগে গা ভাসালে চলবে কী করে? গান রেকর্ড করতে হলে তো অনেক বিনিয়োগ করতে হবে, সরঞ্জামাদি লাগবে। এগুলোর জন্য আবার যেতে হবে ভগবতী বাবুর কাছে। সেসময় গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইন-চার্জ ছিলেন শ্রী ভগবতী বাবু। নজরুল আব্বাস উদ্দীনকে বললেন- আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজী করাতে পারো কিনা। আব্বাস উদ্দীন মনেমনে ভাবলেন- এইতো, কাজীদার কাছ থেকে একটা সবুজ সংকেত পেলাম, এবার দেখি ভগবতী বাবুকে কিভাবে রাজী করানো যায়। গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইন-চার্জ ভগবতী বাবুর কাছে গিয়ে আব্বাস উদ্দীন বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন। কিন্তু, ভগবতী বাবু কিছুতেই ঝুঁকি নিতে রাজী নন। তিনি সরাসরি আব্বাস উদ্দীনকে বলেন- মার্কেট ট্রেন্ডের বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ করলে ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে পারে, এ রিস্ক নেওয়া একদম সম্ভব নয়। আব্বাস উদ্দীন যতই তাঁকে অনুরোধ করেন, ততই ভগবতী বাবু বেঁকে বসেন। আবার আব্বাস উদ্দীনও নাছোড়বান্দা। এত বড় সুরকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভগবতী বাবুর পিছু কিছুতেই ছাড়ছেন না। অনুরোধ করেই যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয়মাস চলল এই অনুরোধ প্রয়াস। এ যেন পাথরে ফুল ফুটানোর প্রাণপণ একটা চেষ্টা! হঠাৎ একদিন ভগবতী বাবুকে আব্বাস উদ্দীন বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখে বললেন- একবার না হয় একটা এক্সপেরিমেন্ট করেই দেখুন না দাদা, যদি বিক্রি না হয় তাহলে আর রিস্ক নেবেন না। ক্ষতি কী, তাই না? ভগবতী বাবু আর ‘না’ করতে পারলেন না। এবারে তিনি হেসে আব্বাস উদ্দীনকে বললেন- নেহাতই আপনি ভীষণ নাছোড়বান্দা মানুষ। ঠিক আছে যান, করব। গান নিয়ে আসুন। আব্বাস উদ্দীনের তখন খুশিতে চোখে পানি আসার উপক্রম! যাক, এখন সবাই রাজী। এবারে শুধু একটা গান যোগাড় করতে হবে।

কাজী নজরুল ইসলাম  চা আর পান বেশ পছন্দ করতেন। আব্বাস উদ্দীন এক ঠোঙা পান আর চা নিয়ে নজরুলের রুমে ঢুকলেন। সেই পান মুখে নজরুল খাতা কলম হাতে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে পড়লেন। ভেতর থেকে দরজাও বন্ধ করে দিলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আব্বাস উদ্দীন শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। প্রায় আধ ঘন্টা সময় এরই মধ্যে কেটে গেল। বন্ধ দরজা খুলে নজরুল এবার বের হলেন। পানের পিক ফেলতে ফেলতে আব্বাস উদ্দীনের হাতে তিনি একটা কাগজ তুলে দিলেন। এই কাগজ তাঁর আধ ঘন্টার সাধনা আর আব্বাস উদ্দীনের ছয় মাসের পরিশ্রমের ফসল।

আব্বাস উদ্দীন তৎক্ষনাৎ কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন-
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।”

আব্বাস উদ্দীনের চোখ পানিতে ছলছল করছে। একটা গানের জন্য কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে। সেই গানটি এখন তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি কি জানতেন, তাঁর হাতে বন্দী গানটি একদিন বাংলার ইথারে ইথারে পৌঁছে যাবে? ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে রেডিও-টিভিতে বেজে উঠবে- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে…?

কাজী নজরুল ইসলাম গানটি নিয়ে বেশ এক্সাইটেড ছিলেন। আর দুই মাস পরেই রোজার ঈদ। গানটা বাজারে চলবে কি না তা নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানিও শঙ্কার মধ্যে ছিলো। আবার শিল্পী আব্বাস উদ্দীন এর আগে কখনোই ইসলামি গান রেকর্ডও করেননি, তাছাড়া গানটি তাঁর তখনো মুখস্তও হয়নি। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই হারমোনিয়ামের উপর আব্বাস উদ্দীনের চোখের সামনে গানের কাগজটি ধরে রাখলেন, কীভাবে তাতে সুর দিতে হবে তা দেখিয়েও দিলেন। এভাবে গান লেখার চারদিনের মধ্যেই গানের রেকর্ডিংসহ শুরু হয়ে গেল গানটি সম্পাদনের সকল কাজ। অবশেষে সুর সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের বিখ্যাত কণ্ঠ থেকে বের হয়ে এলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…“।

সবাই তখন ঈদের ছুটিতে। অবশেষে রমজানের রোজার পর এলো সেই বিখ্যাত গান সংক্রান্ত কাঙ্ক্ষিত ঈদ। আব্বাস উদ্দীন বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটালেন। তিনি কখন কলকাতায় যাবেন সেই চিন্তায় তাঁর মন আর মোটেও যেন তর সইছে না যেহেতু গানটির কী অবস্থা তিনি তা তখনো জানেন না। তাই তাড়াতাড়ি ছুটি কাটিয়ে আব্বাস উদ্দীন কলকাতায় ফিরে আসলেন। যেদিন ঈদের ছুটির পর প্রথমবারের মতো তিনি ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছেন, যতো পথ এগুচ্ছেন, ততোই বুকটা তাঁর ধ্বকধ্বক! ধ্বকধ্বক! করছে। ভাবছেন, অফিসে গিয়ে তিনি কী দেখবেন? গানটা কি ফ্লপ হয়েছে? গানটা যদি সত্যিই ফ্লপ হয় তাহলে তো আর কখনোই ইসলামি গানের কথা শ্রী ভগবতী বাবুকে বলতেও পারবেন না। আর শুধু ভগবতী বাবু কেন, কোনো গ্রামোফোন কোম্পানিই এমন রিস্ক নিতে কখনোই রাজী হবে না। সুযোগ তো জীবনে একবারই আসে। আব্বাস উদ্দীন যখন এই চিন্তায় মগ্ন, তখন ট্রামে তাঁর পাশে বসা এক যুবক গুনগুনিয়ে গাওয়া শুরু করলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”। তিনি ভাবছেন এই যুবক গানটি কোথায় শুনলো? নাকি তিনি ভুল শুনছেন? না তো…। তিনি আবারো শুনলেন যুবকটি ঐ গানটিই গাচ্ছেন। এবারে তাঁর মনের মধ্যে যেন এক শীতল বাতাস বইতে শুরু করলো। অফিস থেকে ফিরে বিকেলে যখন তিনি গড়ের মাঠের দিকে গেলেন তখন অন্য আরেকটা দৃশ্য দেখে এবারে তাকে আরো দ্বিগুণ অবাক করল। তিনি দেখলেন কয়েকটা ছেলে দলবেঁধে মাঠে বসে আছে এবং তারমধ্য থেকে একটা ছেলে জোর গলায় গেয়ে উঠলো- “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”। আব্বাস উদ্দীন এতো আনন্দ আর একা সইতে পারলেন না। তিনি ছুটে চললেন তাঁর কাজীদার কাছে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন কবি নজরুল দাবা খেলছেন। আর নজরুল যখন দাবা খেলা শুরু করেন তখন যেন দুনিয়া ভুলে যান। আশেপাশে কী হচ্ছে সেদিকে তাঁর কোনো খেয়ালই থাকে না। অথচ আজ একদম ব্যতিক্রম, আব্বাস উদ্দীনের গলার স্বর শোনার সাথে সাথেই নজরুল দাবা খেলা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন- “আব্বাস, তোমার গান কী যে হিট হয়েছে!” অল্প কয়দিনের মধ্যেই গানটির হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রি হয়ে গেছে। ভগবতী বাবুও দারুণ খুশি হয়েছেন। একসময় যিনি ইসলামি সংগীত করার প্রস্তাবে একবাক্যে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন, আজ তিনিই কি না নজরুল-আব্বাসকে বলছেন- “এবার আরো কয়েকটি ইসলামি গান রেডি করে গাও না!“ এভাবেই শুরু হলো নজরুলের রচনা ও সুরে আর আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামি গানের নতুন জাগরণ। গানের বাজারে এবারে উল্টো একটা নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়ে গেলো ইসলামি সংগীতের। যে ট্রেন্ড শুধু মুসলমান শিল্পীকেই স্পর্শ করেনি, স্পর্শ করেছে তখনকার দিনের নামকরা হিন্দু শিল্পীদেরও। একটা সময় মুসলিম শিল্পীরা শ্যামা সংগীত গাইবার জন্য নাম পরিবর্তন করে হিন্দু নাম রাখতেন। এবারে হিন্দু শিল্পীরা ইসলামি সংগীত গাইবার জন্য মুসলিম নাম রাখা শুরু করে দিলেন। এভাবেই ধীরেন দাস হয়ে গেলেন গণি মিয়া, চিত্ত রায় হয়ে গেলেন দেলোয়ার হোসেন, গিরিন চক্রবর্তী হয়ে গেলেন সোনা মিয়া, হরিমতি হয়ে গেলেন সাকিনা বেগম, সীতা দেবী হয়ে গেলেন দুলি বিবি, ঊষারাণী হয়ে গেলেন রওশন আরা বেগম। তবে, তখন বিখ্যাত অনেক হিন্দু শিল্পী স্ব-নামেও নজরুলের ইসলামি গান গেয়েছিলেন। যেমন- মনোময় ভট্টাচার্য, অজয় রায়, ড. অনুপ ঘোষল, আশা ভোঁসলে, রাঘব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন অনন্য কবি। বিশেষ করে ইসলামি গান, কবিতা লেখায় তাঁর ছিলো অসাধারণ সহজাত প্রতিভা। যদি কেউ খাতা কলম দিয়ে তাঁকে বলতো- একটা গান লিখে দিন, তিনি তৎক্ষনাৎই তা লিখে দিতেন। আবার সবচেয়ে বড় অভাগা কবিও ছিলেন এই কাজী নজরুল ইসলাম। এমনই একটা করুণ ঘটনা নজরুলের জীবনে  ঘটেছিল, যা থেকে তাঁর একটি অনন্য সৃষ্টিও হয়েছিল। ঘটনাটি ছিল এমন:

কবি কাজী নজরুল ইসলামের চার বছরের শিশু সন্তান ‘বুলবুল’ যে রাতে মারা গিয়েছিল সে রাতে কবির পকেটে একটা টাকাও ছিল না। এদিকে তাঁর সন্তানকে কাফন-দাফন করানো, বুলবুলের মৃতদেহ গাড়িতে করে নেওয়া, গোরস্থানে কবরের জমি ক্রয়ের জন্য নজরুলের দরকার ছিল তখন প্রায় দেড়শত টাকা। আর সে সময়ের দেড়শত টাকা মানে এখনকার দিনের অনেক টাকা। কিন্তু এত টাকা নজরুল কোথায় পাবেন? কবি বড় চিন্তিত হয়ে পড়লেন! তিনি বিভিন্ন লাইব্রেরিতে লোক পাঠালেন কিন্তু টাকার তেমন কোনো ব্যবস্থাই হলো না। শুধুমাত্র ডি. এম লাইব্রেরি কবিকে দিয়েছিল পয়ত্রিশ টাকা। কিন্তু আরো এখনো অনেক টাকার দরকার। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রিয় সন্তান বুলবলের মৃতদেহ ঘরে রেখে তিনি গেলেন এক প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক তখন একটা শর্ত দিলো। বললো- এই মুহূর্তে একটা কবিতা লিখে দিতে হবে তাঁকে। অতঃপর টাকা।

কবি তাঁর মনের নীরব কান্না, যাতনা লিখে দিলেন কবিতায়। যা পরবর্তীতে নজরুলের বিখ্যাত গানে রূপান্তরিত হয়:

“ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি
করুণ চোখে চেয়ে আছে
সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি!”

আব্বাস উদ্দীন একদিন নজরুলের বাড়িতে গেলেন। নজরুল তখন কী একটা কাজে যেন ব্যস্ত ছিলেন। আব্বাস উদ্দীনকে হাতের ইশারায় নজরুল বসতে বলে আবার লেখা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে যোহরের আযান মসজিদ থেকে ভেসে আসলো। আব্বাস উদ্দীন বললেন- “কাজীদা, আমি নামাজ পড়বো। আর শুনুন কাজীদা, আপনার কাছে একটা গজলের জন্য আসছি।“ নজরুল আব্বাস উদ্দীনকে একটা পরিস্কার জায়নামাজ বিছিয়ে দিয়ে বললেন- “আগে নামাজ পড়ে নাও“। আব্বাস উদ্দীন নামাজ পড়তে লাগলেন আর নজরুল ইসলাম খাতার মধ্যে চালতে লাগলেন কলম। শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের নামাজ শেষ হলে নজরুল তাঁর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন- “শিল্পী এই নাও তোমার গজল!“ গজল লেখা কাগজটি হাতে নিয়ে আব্বাস উদ্দীন অবাক হলেন! এই সামান্য সময়ের মধ্যে নজরুল কী করে লিখে ফেলছেন গজল? তা-ও কিনা তাঁর সেই নামাজ পড়ার দৃশ্যপট নিয়ে লেখা? গজলটি ছিলো এমন:

“হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ,
দিলাম তোমার চরণতলে হৃদয় জায়নামাজ।“

 

কবি কাজী নজরুল ইসলাম অমর হয়ে আছেন তাঁর রচিত নাতে রাসূল ও ইসলামি গানের জন্য।

১) “তাওহিদেরই মুর্শিদ আমার মুহাম্মদের (সাঃ) নাম”, ২) “তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে”,

৩) “আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়”,

৪) “শোন শোন ইয়া ইলাহি, আমার মুনাজাত শোন আমার মুনাজাত”,

৫) “ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়, আয় রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয়”,

৬) “মুহাম্মদ নাম জপেছিলি, বুলবুলি তুই আগে, তাই কি রে তোর কন্ঠের গান, এমন মধুর লাগে”,

৭) “আমি যদি আরব হতাম মদীনারই পথ, আমার বুকে হেঁটে যেতেন, নূরনবী হজরত”,

৮) “হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়, সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে যায়, সে যে আমার কামলিওয়ালা, কামলিওয়ালা”,

৯) “দুখের দিনের দরদী মোর, নবী কামলিওয়ালা, নবী কামলিওয়ালা”,

১০) “আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান। কোথা সে আরিফ, অভেদ যাহার জীবন-মৃত্যু-জ্ঞান”।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত উপরোক্ত গানগুলো ক্লাসিক্যাল মর্যাদায় উন্নীত এবং এখনো যথেষ্ট জনপ্রিয় ও সমাদৃত। গানগুলো রচনার প্রায় নব্বই বছর পেরিয়ে গেলেও, মানুষ আজও গুনগুনিয়ে গানগুলো গেয়ে থাকেন। বাংলা ভাষায় ইসলামি গান সৃষ্টির যে অনন্য নবজাগরণ কাজী নজরুল ইসলাম সূচনা করেছিলেন, সেই সুন্দর পথ ধরে পরবর্তীতে একই পথের পথিক হয়েছিলেন- কবি জসীম উদ্দীন, কবি ফররুখ আহমদ, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি গোলাম মুহাম্মদ, কবি মুহিব খান, কবি মতিউর রহমান মল্লিক প্রমুখ।

তথ্যসূত্র:

১) যুগান্তর, “নজরুল এবং ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে”, শামস আরেফিন,

২) যুগান্তর, “হামদ-নাতে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন নজরুল”, আদিল মাহমুদ,

৩) আব্বাসউদ্দীনের আত্মজীবনী– “দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা”, 

৪) Roar Media, “বাংলা ইসলামি গান ও কাজী নজরুল ইসলাম”,

৫) Risingbd, “সুরের আকাশে উজ্জল নক্ষত্র আব্বাসউদ্দীন”, 

৬) paathok.news, “নজরুলের সেই ঐতিহাসিক গান”, এ এম জিয়া হাবিব আহসান ও মোহাম্মদ রিদুয়ান করিম নাভিল।

 

 

মাসুদ বশীর
কবি, রংপুর।

ঈদ সংখ্যা - ২০২২
144 Views

জাকির আহমদ

২ মে, ২০২২ , ৫:০৯ অপরাহ্ণ

ঈদে নতুন পোশাক : সেকাল একাল

আমার সোনামায়ের জীবনের প্রথম ঈদে নতুন পোশাক পেয়েছিলো ৪৮টা! অথচ আমার এই জীবনের সব ঈদের নতুন পোশাক মিলে এখনও ৪৮ টা হবে না! এখন ঈদে প্রতিবছরই সবাই নতুন জামা পরে। সে গরীব হোক কিংবা ধনী। শুধু পার্থক্য থাকে নতুন জামার কোয়ালিটি ও সংখ্যার। ধনীরা নতুন জামা নিজেরাই কিনতে পারেন, তারপরও তাদের বিভিন্ন স্বজনদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পায় অনেক অনেক নতুন জামা। শুধু যে ধনীদের অনেক নতুন পোশাক হয় তা কিন্তু নয়, আমার মতো মধ্যবিত্তের ঘরেও কয়েক সেট করে নতুন পোশাক চলে আসে ঈদ উপলক্ষে। গরীবের ঘরেও এখন ঈদে নতুন পোশাক আসে। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দেখি বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি গরীবদের মাঝে ঈদের পোশাক বিতরণ করেন। গরীবরা শুধু যে অন্যের কাছ থেকেই নতুন পোশাক পায় এমনটিও না, নতুন পোশাকের সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই নিজেরাও কিনে থাকেন।

আজ থেকে কয়েক বছর আগেও ঈদের নতুন পোশাকের এমন প্রচলন ছিল না। ধনীরা ঈদে নতুন পোশাক পরতেন ঠিকই তবে এখনকার মতো এতো বেশি না। এখন যেমন, একজনের জন্যই ঈদের দিন সকালের জন্য আলাদা, বিকালের জন্য আলাদা, ঈদের দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন, চতুর্থ দিনের জন্য আলাদা আলাদা পোশাক কেনেন, আগে তেমন ছিল না। এখন যেমন পরিবারের সদস্যদের বাইরেও বিভিন্ন স্বজনদের নতুন পোশাক উপহার দেওয়া হয় আগে তেমনটাও ছিল না। সাধারণত নতুন জামাইয়ের জন্য ঈদের নতুন পোশাক উপহার হিসেবে দেওয়া হতো-অন্য কাউকে না।

এখন যেমন আমার সোনামায়ের ঈদের নতুন পোশাক মানেই-বাবা দিবে, মা দিবে, মামা দিবে, নানুমা দিবে, বড়বাবা দিবে, মেজো বাবা দিবে, খালামনি দিবে, ফুপি দিবে অথচ আমার ছেলেবেলার ঈদের নতুন পোশাক মানেই ছিলো কুদ্দুস খান চাচার দোকানের থানকাপড়ের পাজামা-পাঞ্জাবি, তাও কমপক্ষে দুইতিন বছর পর পর। বাবার ঈদের নতুন পোশাক আরো বেশি সময় পর পর কিনতেন। আরো আগে আমার দাদা বা তার বাবাদের সময় হয়তো ঈদের নতুন পোশাকের এমন ব্যবহারও ছিল না।

ঈদ সংখ্যা
247 Views

ডা.ফেরদৌস রহমান পলাশ

২ মে, ২০২২ , ৫:০৮ অপরাহ্ণ

ইদ আসে, ইদ যায়

আনন্দ করতে উপলক্ষ লাগে কি? নাকি উপলক্ষ ছাড়াও আনন্দ করা যায়? তা যায় বৈ কি। ধরুন আপনার আজ হুট করে মন ভালো হয়ে গেল। আপনি এ খুশিতে গায়ে সেন্ট মেখে বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। কিন্তু এই আনন্দ পাশের বাড়ির ইমনের না। তার  আজ মন খারাপ কারণ তার পোষা বিড়ালটা মারা গেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে একেক জনের জন্য আনন্দ একেকদিন। সবার মাঝে সেই আনন্দ নিয়ে আসে ইদ। একমাত্র বলব না,পহেলা বৈশাখ, নিউ ইয়ারও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে একই দিনে সমান আনন্দের বারতা নিয়ে আসে। ইদ বছরে দুটো। এক মাস কঠিন সিয়াম সাধনার পর ইদ-উল-ফিতর আর ত্যাগের মহিমা নিয়ে ইদ-উল-আযহা। সিয়াম বা রোজা পালন শারীরিকভাবে সুস্থ সকল মানব সম্প্রদায়ের জন্য ফরজ করা হয়েছে। কিন্তু কেন?

বিষয়টা এক সময় ভাবা হতো, আমিও শুনেছি মুরুব্বিরা বলেছে, আমাদের মাঝে অনেকে অনাহারে থাকে, রোজা আসলে আমরাও তাদের মতো অনাহারে থাকি ফলে তারা যে কষ্টটা ভোগ করে আমরাও সেটা অনুভব করি, ফলে এক ধরনের সহমর্মিতা গড়ে ওঠে। আবার অনেকে বলে, মুসলমানরা যোদ্ধা জাতি, যুদ্ধের সময় দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হতে পারে আবার ধর্ম প্রচারের জন্য সফরেও খাদ্য প্রাপ্তির অনিশ্চিয়তা। তাই তার যদি এই ট্রেনিং থাকে তবে সে সহজেই কাবু হবে না। বর্তমান বিজ্ঞান অবশ্য ভিন্ন কথা বলছে, জাপানি বিজ্ঞানী প্রফেসর ইয়োশিনোরি ওহসুমি অটোফ্যাজি( Autophagy)  প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। এটা বুঝতে হলে বুঝতে হবে অটোফ্যাজি আসলে কী?

অটোফ্যাজি আসলে কোষের নিজেই নিজেকে ধ্বংস করা, যা অন্তর্বর্তী উপবাস দ্বারা বৃদ্ধি পায়। মানব বিবর্তনের মাধ্যমে একটি সংরক্ষিত মৌলিক সেলুলার ফাংশন যেখানে কোষের মধ্যে উপস্থিত লাইসোসোমগুলি তার নিজস্ব ক্ষয় এবং পুনরুদ্ধার করে। কোষের ভিতরের  (ক্ষতিগ্রস্ত অর্গানেল, মিউট্যান্ট এবং অসুস্থ প্রোটিন ইত্যাদি) এবং বহিরাগত জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি)। এই জাতীয় প্রক্রিয়াগুলির শেষে ক্ষতিকারক পণ্যগুলি নিরীহ সহজ অণুতে ভেঙে যায়, দরকারি পদার্থগুলি ধরে রাখা হয় এবং পুনরায় ব্যবহার করা হয়। এর ফলে শরীরের ক্ষতিকর বস্তু, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস শরীর থেকে দূরীভুত হয় এবং উপকারী বস্তু শরীরে থেকে যায়। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর এক হাদিসে বলেছেন, “মাতৃগর্ভ থেকে শিশু যেমন নিষ্পাপ হয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, রমজানের রোজা পালন করলে মানুষ ঠিক তেমনি নিষ্পাপ হয়ে যায়।”

 

রমজানের উপহার হিসেবে মুসলমানদের ঘরে আসে ইদ। গ্রামে এখনও বড় ময়দানে ইদের নামাজ হয় বলেই মাঠগুলো, ইদগাহ মাঠ নামেই সমাদৃত। সেই মাঠে থাকে বড়বড় বট-পাকুড় গাছ। তারই ফাঁকে বিছানো হয় সাদা লম্বা-লম্বা কাপড়। সেখানে দাঁড়িয়ে সবাই নামাজ পড়ে। পাশেই বসে ছোটখাটো মেলা। মাটির খেলনাপাতি, বাদাম, চানাচুর, জিলাপি, পাপড়ভাজির পশরা নিয়ে বসে প্রধানত হিন্দু ধর্মাবলম্বী দোকানদারেরা। শিশুদের পোয়াবারো। নামাজ না পড়ে, মেলায় চক্কর দিতেই তাদের আনন্দ। শহরের ইদ যদিও অনেক জায়গায় মানে জেলা শহরগুলোতে ইদগাহ মাঠেই হয় তবে ঢাকা শহরে মাঠ কোথায় পাবে, সব তো দখলদারদের দখলে ফলে ইদ হয় মসজিদে। গম্ভীরমুখে হাতে জায়নামাজ, পরনে দামি পাজামা পাঞ্জাবি পরে তারা নামাজ পড়তে যায় আবার গম্ভীর মুখেই বাসায় ফিরে আসে। তাদের দেখে বোঝার উপায় নাই যে, এটা কোনও আনন্দের দিন। ইদের কথা ভাবলেই আসে কোলাকুলির কথা। কোলাকুলি করা সুন্নত। এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে?

গবেষণায় দেখা গেছে কোলাকুলি করলে মানসিক চাপ হতে রক্ষা পাওয়া যায়। ক্লান্তি দূর হয়। অক্সিটোসিন হরমন নিঃসরণের কারণে  মন আনন্দে ভরে ওঠে। ডোপামিন নিঃসরণের কারনে পারকিন্সনিজম রোগ হবার সম্ভাবনা কমে যায়। কোলাকুলিতে সেরোটোনিন হরমন নিঃসরণ বাড়ার কারনে মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়, মন আনন্দে ভরে থাকে। এজন্য বলা হয় দিনে অন্তত আট বার কোলাকুলি করা প্রয়োজন। ইদ ছাড়া সে সুযোগ কই? রমজানের ফলে শরীর থেকে অতিরিক্ত মেদ ঝরে পড়ার কারণে শরীর থাকে চনমনে।

 

ইদের দিন গ্রামে গরীব বড়লোক সবার বাড়িতেই সেমাই হয়। সে সেমাই খাওয়া হয় চালের আটা দিয়ে। সুস্বাদু সে রুটির স্বাদ জিভে লেগে থাকে সারাজীবন। সাধারণত মা-বোনেরা গোল হয়ে বসে এ রুটি কেউ বানায় কেউ সেকে নেয়। রুটি সেমাই অথবা মুড়ি সেমাই খেয়ে সবাই ইদগাহ মাঠের দিকে যায়। ইদগাহ মাঠ হয়ে ওঠে দেখা সাক্ষাতের স্থান। পেটের দায়ে গ্রামের বহু লোক ঢাকার গার্মেন্টসে কাজ করে। ইদ তারা গ্রামের বাড়িতে করতে চায় পরিবারের সাথে। খুবই নির্মল চাওয়া কিন্তু সেই সাধারণ চাওয়াটাও রাষ্ট্র পূরণ করতে পারছে না। টিকিটের মূল্য দ্বিগুণ, পথে পথে যানজট। রংপুর থেকে ঢাকা আসতেই সময় লাগে পনেরো-ষোলো ঘন্টা। দেশে দূর্নীতি যে কি পরিমাণ বেড়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন দেখি রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং এ জড়িত সহজ অনলাইনের একজন ভাই বছরে দুই-তিন হাজার টিকিট সরিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করেন। সুখের কথা দুই একটা চুনোপুঁটি ধরা পরছেন তবে রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তারপরও ইদ আসে। বাংলাদেশের বাঙালিদের অধিকারবোধ কম থাকায় তারা মেনে নিয়ে হাসিমুখে ইদের নামাজ আদায় করে। বাড়ি ফিরে যাওয়া আবার সেই একই কাহিনি। যুগযুগ ধরে এই চলে আসছে।রাজনৈতিক নেতার আসর গরম করা বক্তৃতায় চেয়ারে বসে নিতম্ব গরম হওয়া ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন হয় না। তবুও ঠিক উনত্রিশ রোজার দিন ইফতারের পর আমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকব পশ্চিম দিকে,হয়তো ভেসে উঠবে ইদের বাঁকা চাঁদ। হয়তো—–।

 

ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ

লেখক ও চিকিৎসক, রংপুর।

 

ঈদ সংখ্যা - ২০২২
207 Views

মুগ্ধতা.কম

২ মে, ২০২২ , ৫:০৮ অপরাহ্ণ

ঈদ মুবারাক 

ঈদ মুবারাক। প্রতিবারের মতো এবারও রংপুর ফুল বাজার থেকে ফুল কিনলাম। চারদিকে কি আনন্দ ! কি উল্লাস ! বাজারে আসার পথে দেখলাম শিশুদের হাতে বেলুন আর ফটকা। মনে হচ্ছে আজ শিশুরা সারারাত ফটকা ফুটাবে। তাদের আনন্দিত মুখ আমাদের সব দু:খ ভুলিয়ে দেয়। ফুলের বাজারে দেখলাম প্রেমিকরা গোলাপ ফুল কিনে প্রেমিকাকে বলছে – আস, তোমার খোপায় ফুলটা গুজে দেই। মেয়েদের মুখভর্তি হাসি। সেজেগুজে তারা বাইরে বের হয়েছে। দেখতে ভাল লাগছে। একটা মেয়েকে দেখলাম হাতে মেহেদি দিয়ে প্রেমিকের সাথে রিকসায় করে যাচ্ছে। মেয়েটির হাতের মেহেদি এখনও শুকায়নি। দুই হাত বন্ধ। প্রেমিক ছেলেটি তাকে কি সুন্দর করে বেবি বেবি বলে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে। বেশীরভাগ ছেলেকে দেখলাম আমার মতো বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে সিগারেট টানছে। আমার মনে হলো আজ রাতে বাংলাদেশের কোথাও কোন দুঃখ নেই। আজ কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা ঝগড়া করবে না। স্ত্রীরা বেছে বেছে তাদের স্বামীদের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করবে। চাকরিসূত্রে যারা বাড়ির বাইরে দেশে অথবা বিদেশে থাকেন তারা ইতিমধ্যে নিজেদের বাড়িতে চলে এসেছেন। বাড়িভর্তি মানুষ। চলছে জম্পেশ আড্ডা। মায়েরা যেন ঈদের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। বাবারা ছেলে / মেয়ের কাছ থেকে গিফট পেয়ে বেজায় খুশি। সেই খুশি মনের মধ্যে চেপে রেখে যথাসম্ভব গাম্ভীর্য ধরে রেখে মুখে বলছেন- কী দরকার ছিল। তোরা এতদূর থেকে কষ্ট করে এসেছিস। আমি তাতেই খুশি। চারদিকে মাইকিং শুরু হয়েছে। ঈদের জামাত কোথায় কয়টায় শুরু হবে সেটা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথায় সবচেয়ে দেরিতে নামাজ শুরু হবে সেদিকে মনোযোগ দিলাম। কারণ গত কয়েকদিন ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছি। অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে।  ঈদ উদযাপনের এসব প্রস্তুতি দেখে হঠাৎ কেন জানি আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেল। একটা বিশেষ সমস্যাকে ঘিরে মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। এখন মনে হচ্ছে সবকিছুই ভালো, সব সমস্যার সমাধান আছে এবং বেঁচে থাকার একটা বিস্ময় আছে যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো বিস্ময়ের তুলনা হয় না।

ঈদ নিয়ে একটি গল্প বলে আজকের লেখাটি শেষ করব।  আবারও আপনাদের জানাই ঈদ মুবারাক।

গরিব পুত্র তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করল- বাজান ঈদ জিনিসটা কী?

বাবা উত্তর দিল-বড়লোকের আনন্দ-ফুর্তির দিন।

ছেলে বলল-আমাদের তাইলে কী?

আমাদের জন্যও দিনটা ভালো রে ব্যাটা।  এই দিনে ধনীর সাথে কোলাকুলি করণ জায়েজ আছে।

 

কামাল পারভেজ পাভেল 

লেখক, রংপুর

 

ঈদ সংখ্যা - ২০২২
182 Views