গল্প Archives - মুগ্ধতা.কম

গল্প Archives - মুগ্ধতা.কম

প্রমথ রায়

১৫ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১১:৩৬ অপরাহ্ণ

বিজয়ের পাখি ঘরে ফিরে না

ভোট গণনা চলছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা বনাম একজন রাজাকার। দুজনই স্বতন্ত্র। মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী জনাব জনিবুর রহমান মোটরসাইকেল প্রতীক। অন্যজন আব্দুল মোতালেব আনারস প্রতীক। জনশ্রুতি আছে আব্দুল মোতালেবের পিতা আবু তালেব মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীদের পক্ষে কাজ করে। কিন্তু মোতালেবের চাচা আবু তালহা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। শ্রীলংকার হাইকমিশনার হিসেবেও দীর্ঘ দশ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালীন তিনি বেশ কিছু প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করেন। এই প্রভাব এবার কেওচালা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও পড়েছে।

জনগণ অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে যে কেওচালা ইউনিয়ন পাকিস্তান দোসর থেকে মুক্ত হতে পারেনি; হয়তোবা বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে তা হতে চলেছে।
এবার মানুষের মুখে মুখে ছিলো মোটরসাইকেল প্রতীকের কথা। নির্বাচনী প্রচারণায়ও ছিলো দেখার মতো জনঢল। প্রতিটি ভোটারের ছিলো ঐকান্তিক সহযোগিতা। আজকেও ভোট দেওয়ার সময়ও ছিলো একই কলরব মোটরসাইকেল।
নয়টি ভোট কেন্দ্রের ছয়টিতে মোটরসাইকেল ও দুইটিতে আনারস বিজয়ী। আবু মোতালেবের কেন্দ্র। একজন পুলিশ কর্মকর্তা কেন্দ্রের বাইরে এসে প্রথমে সদস্য বিজয়ীর নাম ঘোষণা করলেন, এরপর সংরক্ষিত মহিলা সদস্য। টান টান উত্তেজনায় তিনি ঘোষণা দিলেন চেয়ারম্যান বিজয়ী উপজেলায় ঘোষণা করা হবে।

উপজেলায় আবু মোতালেবকে ১৬১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষণা করা হলো। জনাব জনিবুরের বিজয়টা ছিলো অনেক কাম্য। তিনি এ অপ্রত্যাশিত ফলাফল মেনে নিতে পারলেন না। হার্ট অ্যাটাক করলেন। সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। দায়িত্বরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করলেন।

গল্প - বিজয়ের পাখি ঘরে ফিরে না - প্রমথ রায়
262 Views

মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ্

১৫ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১১:৩৫ অপরাহ্ণ

ভালোবাসা- ১৯৭১

১৫ ই ডিসেম্বর। যুদ্ধ শেষ। সবাই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। শুধু সেতারা বানু একজনের অপেক্ষায় আছে। তার স্বামী সাইফুল কথা দিয়েছিল যুদ্ধ থেকে ফিরে আসবে। তাই সেতু সাইফুলের জন্য বসে আছে খেয়া ঘাটের পাড়ে।

গ্রামের চেনা পরিচিত সবাই এসেছে। সাইফুলের বন্ধু আশরাফের একটা পা উড়ে গেছে মিলিটারির গুলিতে। সেতু আশরাফের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সাইফুলের খোঁজ করতে। ওরা এক সাথেই যুদ্ধে গিয়েছিল।

সেতুকে দেখে আশরাফ কাঁদতে লাগল। এ কিসের কান্না? এটা ভাবার সময় এই মুহূর্তে সেতুর নেই। কাছে গিয়ে বলল,

—আশরাফ ভাই! সাইফুল কই? মানুষটা ক্যানবা এলাও নাই। তোমরা ওমার দ্যাখা পাইছিলেন?

আশরাফ চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

—কি আর কইম সেতু বু! হামরাগুলা উয়াক এত আটকাইনু তাও থাম্বার পাইনু না । ওয় আর বাঁচি নাই রে সেতু বু! ওয় শহীদ হইছে।

আশরাফের কান্নায় দক্ষিণ পাড়ার আকাশ মুহূর্তের মধ্যেই ভারী হয়ে উঠল। বর্ষাকাল হলে এতক্ষণে ঝরো হাওয়ায় বৃষ্টি শুরু হয়ে যেত।

সেতু এসব কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ যে মানুষটা সারাজীবন কথার বরখেলাপ করেনি। আজ সে এত বড় অপরাধ করতে পারে না। সাইফুল তো কথা দিয়েছিল তাকে। তাহলে ও ঠিকই বাড়ি ফিরে আসবে।

আবারও খেয়া ঘাটের পাড়ে বসে আছে সেতু। রাত তখন ১০টা। বিয়ের আগের দিনগুলো ওরা এখানেই বসে থাকত। তাদের ভালবাসা দেখে বাঁদরগুলো চুপ হয়ে যেত। তাদের হাসির শব্দে মুগ্ধ হতো পুকুরের মাছ। এতোটাই গভীর ছিল তাদের প্রেম। ওদের বিয়েটা বেশ ধুমধামেই হয়েছিল। বাবার একমাত্র মেয়ে ও। তাই কমতি রাখেনি আয়োজনের।

সেতুর চোখে পানি। কেন জানি সাইফুলের মুখটা বারবার চোখে ভাসছিল। তার চাপ দাঁড়ি আর মিষ্টি হাসি পাগল করে তুলত সেতুকে। সবসময় মানুষটা হাসত। মাঝে মাঝে সেতু রাগও হত। কারণ ওর ভয় করত, যদি ওই হাসিটা আর কোনদিন আর দেখতে না পায়।

সকাল হয়েছে। ভোরের কুয়াশার ভিড়ে সূর্যের আলোটা আজ একটু বেশীই ফুটে উঠেছে।আশরাফের বউ পানি আনতে গেছে খেয়া ঘাটে। অনেকদিন পর বাড়িতে আজ রান্না হবে। কিন্তু এসেই তার হাত থেকে কলস পড়ে ভেঙ্গে গেল। খেয়া ঘাটের পাড়ের আম গাছটায় সেতুর ঝুলন্ত শরীর দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করছে না।

এমন কেন করল!

সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে চলেছে। দক্ষিণ পাড়ায় বাড়ছে মানুষের ভিড়। সবাই সেতুকে দেখে যাচ্ছে আর দু’এক ফোটা চোখের পানি রেখে যাচ্ছে। সবার প্রার্থনা! আল্লাহ যেন অবুঝ মেয়েটাকে মাফ করে দেয়।

গল্প - ভালোবাসা- ১৯৭১ - মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ্
255 Views

মুগ্ধতা.কম

১৫ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১১:৩৩ অপরাহ্ণ

সৈনিক

আচ্ছা তারা কি জানে আমার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক? তার চেয়েও বড় কথা তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা? জানলে নিশ্চয় এই আচরণ তারা আমার বৃদ্ধ বাবার সাথে করতে পারতেন না। আমি বাবার ছোট মেয়ে ছোট বলতে সবার ছোট। মা কয়েকবছর আগে গত হয়েছেন। তিনি গত হয়ে ভালোই হয়েছে। বাবা এখন একজন রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষক। আগের মতো আয়-রোজগাড় তার নেই। আমাদের বাবা-মেয়ের চলতেই কত কষ্ট হয়। আমি জানি মা বেচে থাকলে মায়ের আরো কষ্ট হতো। তিনি আবার বেশি কষ্ট সইতে পারেন না। সইতে পারলে কি আর এতো তাড়াতাড়ি ওপারে যাওয়ার টিকেট কাটতেন? ভাবীর সাথে সেদিন মায়ের একটু তর্ক লেগেছিল। মা-বাবার প্রেমের বিয়ে না তবুও মা বাবাকে খুব ভালোবাসতো। বাবা তার সারাটা জীবন পার করলেন মানুষকে শিক্ষা দিয়ে। সেই বাবাকে কেউ যদি লেখাপড়ার বিষয়ে জ্ঞান দেয় তা কি বাবার ভালো লাগবে নাকি মায়ের? বাবা ধৈর্যশীল মানুষ তাই তিনি সয়ে গেছেন কিন্তু মায়ের তো আর অত ধৈর্য নেই। তাই ভাবীর সাথে তর্কটা লেগে যায়। ভাইয়া রাতে ফিরলে ভাবী  ভাইয়াকে কি যে বলল, তা শুনেই ভাইয়া সেকি রাগ মায়ের উপর। মায়ের বড় ছেলে ভাইয়া। খুব আদর করত মা ভাইয়াকে। ভাইয়া নাকি বাবা-মার কত সাধনার ধন। বিয়ের সাত বছর পরও যখন সন্তান হচ্ছিল না তখন কত তাবিজ-কবজ করে নাকি ভাইয়াকে পায়। যাহোক ধান ভাঙতে আর শিবের গান না গাই। সেদিন ভাইয়া মাকে অনেক কথা শুনিয়েছিল। ওইযে বললাম মায়ের আমার ধৈর্য কম ছিল। তাই ছেলের কথাগুলো বোধ হয় তার খুব লেগেছিল। কোথায় লেগেছিল কে জানে। মা রাতে ঘুমিয়ে পরলেন কিন্তু পরদিন সকালে আর তার ঘুম ভাঙল না। চিরতরে ঘুমিয়ে গেলেন আমার মা সেই থেকে আমার বাবার একমাত্র চিন্তাও আমি ভরসাও আমি। অন্য ভাই-বোনরা যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমার তো আর সংসার নেই তাই আমি সারাদিন বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমার সংসার থাকবেই বা কি করে? কাকসুন্দরী মেয়েদের কি কেউ বিয়ে করতে চায়? কেউ চাইলেও তাদের বাড়তি চাওয়া পূরণ করার সাধ্য যে বাবার নেই।

বাবাকে  নিয়ে আমি এখন আমাদের জেলার সরকারী মেডিকেলে আছি। বাবার শ্বাসকষ্টটা অনেক বেড়ে গেছে। শীতে মেডিকেলে রোগীর সংখ্যা বেশি। তাই বাবার ¯থান হয়েছে ফ্লোরে। আমি কর্তব্যরত একজন নার্সকে বললাম একটা বেডের ব্যব¯থা করে দিতে। তিনি আমাকে বললেন-আপনারা কি এমন ভিআইপি লোক যে বেড না হলে আপনাদের চলবেই না। বেশি অসুবিধা হলে কেবিন ভাড়া নিন। অনেক আরামে থাকবেন।
আমি বলতে চাইলাম, আমার বাবা একজন………

কিন্তু বাবা আমাকে ইশারা করে নিষেধ করলেন। বাবার কথা -যুদ্ধ করেছি আমার দ¦ায়বদ্ধতা থেকে, দেশ মাতৃকাকে রক্ষা করতে। এখানে সেখানে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য নয়।আর দশজন লোক যেভাবে বাঁচে আমিও সেভাবেই বাঁচতে চাই।

বাবা একটু সুস্থ হলে আমি বাবাকে নিয়ে গ্রামে যাওয়ার জন রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। কিন্তু কি এক কারনে পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। আমাদের রিক্সাটা ছিল সবার সামনে। রিক্সাওয়ালা ওহেতুক বেল বাজিয়ে চলেছেন। ডিউটিরত পুলিশটা এসে রিক্সাওয়ালাকে কষে একটা চড় দিলেন। ট্রাফিক পুলিশ না থানার পুলিশ। বাবা রিক্সাওয়ালার পক্ষ নিয়ে পুলিশকে বললেন, বাবা ধাপ্পড়টা না দিলেও পারতেন। পেশায় না হোক আপনার থেকে তো বয়সে বড়, তার গায়ে হাত তোলা কি ভালো কাজ?

পুলিশটার আত্মসম্মানবোধ হয় একটু বেশি। উনি আমার বাবার কলার টেনে ধরে রিক্সা থেকে নামালেন। “আমাকে আইন শেখাও বেটা, আমাকে আইন শেখাও? এবার দেখ কেমন লাগে।”

আমি বাবাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু উনি আমাকেও একটা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিল। বাবা তার স্বভাব সূলভ উত্তর দিলেন- আমিতো আইন নিয়ে কিছু বলিনি।আপনি যে কাজটা করলেন সেটা না করলেও পারতেন তাই বলেছি। ক্ষমতা হাতে পেয়ে তো রীতিমতো তার অপব্যবহার করছেন আপনি।একজন রিক্সাওয়ালা বেল বাজালে তার গায়ে হাত তুলতে হবে এটা কোন আইনে আছে বলেন তো।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড। আমার বাবা তার উচু মাথা নিচু করে ফেললেন। অথচ জীবনে কখনো আমি বাবাকে মাথা নিচু করে হাটতেও দেখিনি। মাথা নিচু করে নাকি ভীতুরা হাটাচলা করে। অথচ আজ আমার সাহসী বাবা মাথা নিচু করে আছে আমার সামনে। চুপচাপ বাবা রিক্সায় উঠে এল। কিছুক্ষণ পর রাস্তা খুলে দেওয়া হল। আমরা চলে এলাম। বাড়িতে এসে বাবা সবসময় চুপচাপই থাকত। মেয়ের সামনে ধাপ্পড় খাওয়া কোন কাপুরুষ বাবাও সহজে হজম করতে পারবে না। আর আমার বাবা তো সাহসী বাবা, একাত্তরের বীর সৈনিক তিনি কিভাবে এই লজ্জা হজম করবেন। একসপ্তাহও কাটল না। এই লজ্জা নিয়ে আমার বাবার পক্ষে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা কতটা অসম্ভব ছিল তা একমাত্র আমি জানতাম। তাই তিনিও মায়ের পথ অনুসরণ করলেন। কাউকে কিছু বুঝতে দিলেন না। নিঃশব্দে চলে গেলেন। বাবা মারা যাওয়ার কথা শুনে সেনাবাহিনীর লোকজন এসেছিল আমার বাবাকে সম্মান জানাতে। আমি তাদের তা করতে দেইনি। এতে আমার অন্যান্য ভাইবোন এমনকি গ্রামবাসীও আমার উপর চরম ক্ষেপেছিল। কেন করতে দিব? যে সম্মান আমার বাবা বেচে থাকতে পায়নি মরে গিয়ে সেই সম্মান সে কি করবে? কি লাভ সেই সম্মান পেয়ে? সবাই জানে আমার বাবা বার্ধক্য কিংবা শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা গেছে। কিন্তু আমি তো জানি বাবা কেন মারা গেছে। বাবার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, উদাস চাহনি আমাকে বারবার শিহরিত করত, আমাকে ভাবাতো, আমাকে ভয় পাইয়ে দিত। একজন মানুষ কিভাবে তিলে তিলে শেষ হয়ে যায় আমি আমার বাবাকে দেখে তা বুঝেছি।

একজন  সাহসী যোদ্ধা যিনি যুদ্ধ করে  দেশের জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন কিন্তু জীবন যুদ্ধে তিনি পরাজিত সৈনিকের মতো মাথা নত করে চলে গেলেন এই পৃথিবীর মায়াজাল ছিন্ন করে।

গল্প - সৈনিক - অঙ্কনা জাহান
338 Views