নিবন্ধ Archives - মুগ্ধতা.কম

নিবন্ধ Archives - মুগ্ধতা.কম

মজনুর রহমান

১৫ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১১:২৭ অপরাহ্ণ

একাত্তরের রংপুর অঞ্চলের সাংবাদিকতা  ‘রণাঙ্গণ’, ‘সোনার বাংলা’ ও ‘অগ্রদূত’ প্রসঙ্গ

বিভিন্ন সূত্রের হিসাব একসাথে মেলালে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান, বিশেষত মুক্তাঞ্চল থেকে মোট ৬৪ টি বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিলো। উইকিপিডিয়ায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশ, মুক্তাঞ্চল ও মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত এরকম ২৩ টি পত্রিকার নাম ও সম্পাদকের নাম উল্লেখ আছে। অধিকাংশ পত্রিকাই সাইক্লোস্টাইলে ও হাতে লিখে প্রকাশিত হতো। প্রায় সবগুলো পত্রিকাই ছিল অনিয়মিত। এগুলোর মধ্যে ছিল দৈনিক, সাপ্তাহিক, অর্ধ সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা। এসবের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত পত্রিকা ছিল আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকাটি। স্বাধিনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনন্য প্রেরণার উৎস ছিল পত্রিকাগুলো। সেময় এসব পত্র-পত্রিকা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী বস্তুনিষ্ঠ খবর পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। এসব নিয়ে পড়াশোনার সময় আমার আগ্রহ ছিল শুধুমাত্র রংপুর অঞ্চলের সাংবাদিকতার হাল-হকিকত। দেখা গেল যা আমরা সবাই জানি, সেগুলোই সামনে এলো আগে। অর্থাৎ রণাঙ্গণ নামে বহুল আলোচিত পত্রিকা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কথা সব সূত্রই জানাচ্ছে আগে। সেই সাথে আমার আগ্রহ ছিল ‘সোনার বাংলা’ নামের পত্রিকাটি নিয়ে। দু’টি পত্রিকার পাশাপাশি অনুসন্ধানকালে ‘অগ্রদূত’ নামে আর একটি পত্রিকার নামও জানা যায়। এইসব পত্রিকা এবং সেই উত্তাল সময়ে রংপুর অঞ্চলের সাংবাদিকতার কী অবস্থা ছিল তা জানতে সচেষ্ট ছিলাম এই লেখা তৈরির সময়।

রণাঙ্গণ : রংপুর অঞ্চলের শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় পুরো দেশের একটি আলোচিত পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গণ’। বর্তমানে রংপুরের বর্ষিয়ান সাংবাদিক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল সম্পাদিত এই পত্রিকাটি সবচে আলোচিত হয় ২ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখের একটি শিরোনামের কারণে। সেদিন পত্রিকাটির ব্যানার হেড করা হয় ‘ডিসেম্বর বাংলা মুক্ত’  শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে আভাস দেয়া হয়েছিল, ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করতে পারে। এই শিরোনামের কারণে সেসময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা পত্রিকার সম্পাদককে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে।

‘রণাঙ্গণ’ পত্রিকা সপ্তাহিক আকারে প্রথম প্রকাশ হয় ভারতের ময়নাকুড়ি নামক স্থান থেকে একাত্তরের ২৭ মে। ততদিনে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছে। ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব সরকারের কাছে। কাজেই মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক গোলাম মোস্তফা এবার ভিন্ন কিছু করার চিন্তা করেন। সে সময় তার সহযোগী ছিলেন সৈয়দ ওয়াজেদুল করিম, স্বদেশ চক্রবর্তী (বর্তমানে), খন্দকার বদিয়াজ্জামান (শহীদ), নুরুল ইসলাম ঢালী (শহীদ), নুরুজ্জামান আহমেদ দুলাল সহ বেশ কিছু উৎসাহী তরুণ। সে সময়ের পরিস্থিতিতে অর্থবিত্ত দিয়ে সহযোগিতা করার মত কেউ ছিলেন না। তবে ২০ জনের একটি ফ্রি রেশন কার্ড পেয়েছিলেন তারা। সেই রেশন তুলে তা বিক্রি করে মেটানো  হতো পত্রিকা প্রকাশের খরচ। সম্পাদকের নাম মুস্তফা করিম ছদ্মনামে ছাপা হতো। এর শ্লোগান ছিল ‘মুক্তিকামী জনতার মুখপত্র’। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বের করতে হয়েছে একেকটি সংখ্যা। প্রতি সপ্তাহে বের করা যায় নি। কিন্তু সুযোগ এলেই বের হতো একেকটি সংখ্যা।

সাপ্তাহিক 'রণাঙ্গন

সাপ্তাহিক ‘রণাঙ্গন’র তৎকালীন সংখ্যার একাংশ।

‘রণাঙ্গন’ পত্রিকার আর একটি করুণ ইতিহাস হলো এর সাথে সংশ্লিষ্ট দু’জন পত্রিকা বিলি করতে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হন। কুড়িগ্রাম অঞ্চলে পত্রিকা বণ্টনের দায়িত্বে ছিলেন খন্দকার বদিয়াজ্জামান। এই কাজে এসে নাজিমখাঁ এলাকার রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে নির্মমভাবে শহীদ হন তিনি। অন্যদিকে নুরুল ইসলাম ঢালি পত্রিকাসহ রংপুর এলে তার বাড়িতে হানা দেয় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। সেখানে পত্রিকাসহ ধরা পড়েন ঢালি। তিনিও শহীদ হন পত্রিকার কারণেই।

‘ডিসেম্বরে বাংলা মুক্ত’ শিরোনামের পেছনের কথা হলো, সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সাক্ষাৎকার গ্রহন করে ‘রণাঙ্গন’ এর টিম। তখন উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তাঁদের হাতে আসে। এতে তাদের মনে হয়েছে, ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার মতো একটি প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে। তখন উল্লেখিত শিরোনাম করা হয়। এভাবে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজেদের মেধা, মনন, ও অদম্য দেশপ্রেম দিয়ে কতিপয় সাংবাদিক তৈরী করেন ইতিহাস। পত্রিকার সম্পাদক খন্দকার গোলাম মোস্তফা পত্রিকা প্রকাশের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে এখনও একই কাজ করে চলেছেন। স্বাধীনতার পর ‘রণাঙ্গন’ পত্রিকাটি কিছুদিন ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’ নামে এবং পরে ‘দৈনিক দাবানল’ নামে অদ্যাবধি প্রকাশিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘রণাঙ্গন’ নামে আরো দু’টি পত্রিকা প্রকাশিত হতো বলে কোন কোন সূত্রে পাওয়া যায়। এর একটির প্রকাশক টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকী হলেও অন্যটির প্রকাশক গোলাম মোস্তফা বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন কাদের সিদ্দিকীর রণাঙ্গন-এর অস্তিত্ব স্বীকার করলেও গোলাম মোস্তফা ও মুস্তফা করিমই আমাদের আলোচ্য খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলে রায় দিয়েছেন।

সোনার বাংলা : ‘রণাঙ্গন’ খুব আলোচিত হলেও তারো আগে রংপুরেরই একজন সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ফুলু সরকার বের করেছিলেন ‘সোনার বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক। এই তথ্য সাধারণ পাঠকের অনেকেরই অজানা। কৌতুহলের ব্যাপার হলো, প্রথমে এই পত্রিকার সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। কয়েকটি সংখ্যা বের হওয়ার পরে নানা কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি ‘রণাঙ্গন’ প্রকাশের কথা ভাবেন। অন্যদিকে ‘সোনার বাংলা’ সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। সম্পাদক ফুলু সরকার আওয়ামীলীগের একজন নেতা। এখন ঢাকায় বসবাস করছেন। অনেকভাবে চেষ্টা করেও তার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয নি। তবে রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংশ্লিষ্ট প্রায় সব গ্রন্থেই উল্লেখ আছে যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ‘সোনার বাংলা’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছেন।

কিন্তু মোস্তফা তোফাফেল হোসেন রচিত ‘বৃহত্তর রংপুর জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে একটি ভিন্ন তথ্য। সেখানে লেখক বলেছেন, ফুলু সরকার ‘স্বাধীন বাংলা’ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন যার সম্পাদকের ছদ্মনাম ছিলো সরকার কবীর। এ প্রসঙ্গে একই গ্রন্থে ‘স্বাধীন বাংলা’র একটি সংখ্যার ছবিও দেয়া হয়েছে। বিভ্রান্তি ঘোচাতে আমি লেখকের সাথে কথা বলি। তিনি জানান, ফুলু সরকারের সেই পত্রিকাটি সম্ভবত একাধিক নামে একাধিক সংখ্যা বের হয়েছিল। সবাই ‘সোনার বাংলার’ নাম জানলেও মোস্তফা তোফায়েল সাহেবের হাতে আসে ‘স্বাধীন বাংলা’ নামীয় সংখ্যাটি। ছবিতে দেখা যায়, পত্রিকার স্লোগান হিসেবে লেখা রয়েছে, ‘স্বাধীন বাংলা মুক্তিবাহিনীর সাপ্তাহিক মুখপত্র’।

অগ্রদূত : এ অঞ্চলের কুড়িগ্রাম থেকে প্রকাশিত আরেকটি পত্রিকার সন্ধান পাওয়া যায়। ‘অগ্রদূত’ নামে সেই পত্রিকাটি ছিল স্বাধীন বাংলার মুক্তাঞ্চলের সাপ্তাহিক মুখপত্র। আগস্ট মাসে রৌমারীর মুক্তাঞ্চল থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন আজিজুল হক। পত্রিকাটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ওই অঞ্চলের মুক্তিফৌজের অধিনায়ক জে. রহমান নামের উল্লেখ রয়েছে। ধারণা করা হয়, তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান।

বস্তুত, পত্রিকা কে কোথায় থেকে কবে প্রকাশ করেছিলেন, এসব ইতিহাসের প্রয়োজনে এখন আমাদের লিখে রাখতে হয়। কিন্তু সে সময় যারা জীবনবাজী রেখে এগুলো বের করতেন, তাদের সবার অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল একটাই। দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে অকুতোভয় মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা দেয়া। সরকারের নানা খবর, বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের খবর ইত্যাদি সরবরাহের জন্য এসব পত্র-পত্রিকার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। একই ভাবে রংপুর তথা উত্তরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধে ‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গন’ ‘সোনার বাংলা বা স্বাধীন বাংলা’ এবং ‘অগ্রদূত’ পত্রিকাগুলোর গুরুত্বও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। এর বাইরে সেই উত্তাল সময়ে যারা রংপুরের সাংবাদিক ছিলেন, তাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি বা গেরিলা যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। কেননা রংপুর থেকে দেশের পক্ষে সাংবাদিকতার সে সময় ছিল ভয়ংকর।

তথ্যসূত্র:
১। মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুর: রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ।
২। রংপুর জেলার ইতিহাস: জেলা প্রশাসন, রংপুর।
৩। বৃহত্তর রংপুর জেলার ইতিহাস: মোস্তফা তোফায়েল হোসেন
৪। দৈনিক দাবানল: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা, ২৭ মে, ২০১৪।
৫। দৈনিক প্রথম আলো: ৬ মার্চ, ২০১২।
৬। মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র-৪৬: মুনতাসীর মামুন (জনকন্ঠ, ৩ মার্চ, ২০১০)।
৭। সাক্ষাৎকার: খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল, মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন, মোস্তফা তোফায়েল হোসেন প্রমুখ।
৮। উইকিপিডিয়া।

একাত্তরের রংপুর অঞ্চলের সাংবাদিকতা  ‘রণাঙ্গণ’, ‘সোনার বাংলা’ ও ‘অগ্রদূত’ প্রসঙ্গ
369 Views

রবীন জাকারিয়া

১৫ ডিসেম্বর, ২০২১ , ১১:২৭ অপরাহ্ণ

গ্যাদা এবং গণতন্ত্র

আশির দশকে গোটা বিশ্বে বিশেষ করে বাংলাদেশের ন্যায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য উঠে পড়ে লাগলো৷ যেভাবেই হোক জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন করতে হবে৷ এ জন্য বড় বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হলো৷ সকল মিডিয়ায় এমনকি সরকারী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির কাজ পুরোদমে চালু করা হলো৷ ফল পেতে খুব দেরী হলো না৷ জনগণ সাড়া দিতে থাকলো৷ মূলত দুই শ্রেণির লোকের একাত্বতা অভিভূত করবার মতো৷ একটি শ্রেণি হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী৷ যারা দুইয়ের অধিক সন্তান নেয়ার পর কিছু আর্থিক মুনাফার লোভে স্থায়ী বন্ধ্যাত্বকরণ কার্যক্রমে নিজের অন্তর্ভূক্তি করলো৷ আর অন্যটি হলো সমাজের শিক্ষিত, বিচক্ষণ ও নাগরিক সমাজ৷ যারা নিজেরাই স্বতস্ফুর্তভাবে নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে থাকলো৷

এদিকে আশির দশকে কৃষি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে শিল্প নির্ভর সমাজে আমাদের যাত্রার ফলে ভৌত অবকাঠামো, নতুন নতুন পেশার সামাজিকিকরণ ও লাইফ স্টাইল পরিবর্তিত হতে থাকলো৷ পাশাপাশি আকাশ আগ্রাসন আর রাতারাতি ধনী হওয়ার নির্লজ্জ রেসের দৌড়৷ ফলে  নাগরিক সমাজ তাদের সন্তানদের করে ফেললো “ব্রয়লার মুরগি”তে৷ যারা নিত্য বেড়ে উঠতে থাকলো ফ্ল্যাট নামক একটি আধুনিক কয়েদখানায়৷ বিজ্ঞানের জিনগত তথ্য অনুসারে নাগরিক সমাজের নিকট থেকে আরো মেধাবী প্রজন্ম পাওয়ার পথ হয়ে গেলো সংকুচিত৷ আবার তথাকথিত সীমাবদ্ধ গন্ডির ভেতর লালিত হতে থাকলো আগামীর ভবিষ্যৎ৷ পিতা-মাতার অধরা স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য এরা হয়ে গেল মানুষরুপী গিনিপিগ৷ নিজস্ব ইচ্ছে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবার সক্ষমতা আর শ্রেণি বিভাজনের শিক্ষায় এরা হয়ে উঠতে থাকলো এক পরনির্ভরশীল এক আজব প্রাণি৷ এরা এমন এক প্রজন্মে পরিণত হলো যে বাদল দিনের এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি, গ্রীস্মের রৌদ্রাত্তাপ কিংবা শীতের হিমেল বাতাশ এদেরকে অসুস্থ্য করে ফেলে৷ এরা প্রতিবাদ নয় পলায়ন করতে শিখেছে৷

অন্যদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের বংশ বিস্তার রোধ না করে বরং বহু বিবাহ, বাল্য বিবাহ আর সন্তান জন্মদানের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিকার৷ এদেরকে দোষারোপ করে লাভ নেই৷ কেননা এরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী৷ ব্যতিক্রম ছাড়া বলা যায় বিজ্ঞানের জিনগত তথ্য অনুসারে এ সমাজের নিকট থেকেও সে ধরণের প্রজন্ম পাওয়ার পথ হয়ে গেলো উম্মুক্ত৷ তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্যাদার সন্তানেরা আরো অসংখ্য গ্যাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়লো সমাজে-দেশে৷ শ্রেণি বৈষম্য দৃশ্যমান হলো প্রকটভাবে৷ কিন্ত একটা জায়গায় তারা সুবিধাভোগী নাগরিক সমাজের সমতূল্য৷ সেটি হলো ভোট৷ নির্বাচন৷ সকলের ভোটের মূল্য সমান৷ যদিও ষোড়শ শতকে জে.এস মিল একটা থিউরি দিয়েছিলেন যে, “নাগরিকদের একাধিক ভোট দেয়ার ক্ষমতার কথা৷” কিন্ত তা ধোপে টেকেনি৷ ফলশ্রুতিতে নাগরিক সমাজ আর গ্যাদা একই ক্ষমতার অধিকারী রয়ে গেল৷ করবার কিছু না থাকলেও সমাজ বুঝতে পারলো জন্ম নিয়ন্ত্রনের কূফল৷ এদিকে দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নির্বাচনের বিকল্প নেই৷ তাই নির্বাচন এলে সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত করে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে৷ পচে যাওয়া, দলছুট নেতৃত্বের ছদ্মবেশি, সাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ আর মুখরোচক গল্পে এরা আকৃষ্ট হয় সহজেই৷ নতুবা কিছুটা নতুন স্বপ্নের মোহে ও তাৎক্ষণিক আর্থিক মুনাফায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ফেলে সহজেই৷ চাই সেটা প্রাচ্যে কিংবা পাশ্চাত্যে৷ দৃশ্যপট প্রায় একই৷ তবে দুঃখজনকভাবে “দক্ষিণ এশিয়ায়” এর প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক৷ আর এজন্য এসব দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা প্রকট৷ এবং এই বিভাজনকে খুব সহজেই কাজে লাগায় মিষ্টভাষী পচে যাওয়া নেতৃত্ব৷ ফলশ্রুতিতে দেখা যায় গ্যাদাদের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে কিছু গ্যাদা৷ নির্বাচিত গ্যাদারাই ক্ষমতায় আরোহণ করে মনে করেন তিনি ব্যতিত সমাজের সকলেই গ্যাদা৷ তখন আর বিভাজিত হয় না কে নাগরিক সমাজ আর কেইবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী৷ সকলে মিলে মিশে একাকার৷ যেন সাম্যবাদী গ্যাদা সমাজ! তখন সম্মিলিতভাবে একটি গান প্যারোডি হিসেবে মনে করে৷ “আমরা সবাই গ্যাদা৷ আমাদেরই গ্যাদার রাজত্বে৷” এটাই বোধ হয় Beautiness of democracy.

গ্যাদা এবং গণতন্ত্র - রবীন জাকারিয়া
326 Views