উপভাষা-গল্প Archives - মুগ্ধতা.কম

উপভাষা-গল্প Archives - মুগ্ধতা.কম

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:২৬ অপরাহ্ণ

ন্যাম্পোত ত্যাল নাই

—১—

আইজক্যা মফিজের মনট্যা খুপ ভাল৷ ম্যালাদিন পর আইজক্যা একখান ভাল যাত্রা পালা দেখতোছে৷ এলা আর সেই দিনগুল্যা নাই৷ কী দিনগুল্যা ছিলোরে বাবা৷ আহ্! মনখান ভরি গেইতো৷ এলা বলে কায়ো আর যাত্রা দ্যাখে না! ক্যানে বাহে! ইয়ার চ্যায়্যা কি টকিজ দেখিয়া মজ্যা পান? আসলে সগারগুলার একন্যা ঢগ হইছে৷ মুই কী হনুরে!

আইজক্যার পালার নাম হইল “গরীব ক্যানে কান্দে”৷ সগায়গুল্যা ভালই পাঠ করতোছে৷ তয় নায়িক্যাট্যা সব্যার চ্যায়্যা ভাল পাঠ করে৷ চেংরিকোনার নাম বলে লাইলি৷ দেখপ্যারো সুন্দর৷ আইজ ধরা পরাপর চাইরদিন ধরি মফিজ পালাট্যা দেখতোছে৷ জানা কতা শ্যাষদিন পয্যন্ত অয় এই পালাট্যা দেখপে৷ এটা উইয়ার পুরান্যা ব্যারাম৷ এই কয়দিনে মফিজ লাইলির পিরিতত পড়ি গেইছে৷ গেরামের সবায় জানে শ্যাষ পয্যন্ত মফিজ লাইলিক নিয়্যা কয়দিন রাইত কাটাইবে৷ কায়ো কিছু কবান্নায়৷ উইয়্যার যেমন আছে ট্যাকা তেমন ক্ষমত্যা৷ গেরামের মোড়ল৷

মফিজের মেজাজটা বিগড়ি গেইসে৷ কয়দিন ধরি চেষ্টা করিয়াও লাইলির সাথোত এলাও ভাব জমাবার পায়নাই৷ পালার মালিক পাইস্যা নিতোছে৷ আর কইতোছে হইবে হইবে৷ ধুর শাল্যা কিছুই হবোন্যায় কইতে কইতে মফিজ বাড়ির ঘাটা ধরিল৷

—২—

পইস মাস৷ এব্যার ক্যানব্যা জার পইড়ছে বেশি৷ কী আর করিম৷ তাওতো বিয়ানবেলা উঠপ্যার নাগবে৷ বাড়ির কী আর কামের অভাব আছে? গায়োত একনা পুরান কাপড়া ভাঁজ করি আলোয়ানের নাকান পরিয়া চকিত থাকি নামি পড়িল ওকেয়া৷ কইতর, হাঁস, মুরগি ছাড়ি দিয়্যা কয়ল্যা দিয়্যা দাঁত মাজিয়া হাত মুখ ধুইল৷

এক সানকি পান্তা ভাত আর নুন-আকালি নিয়্যা সোয়ামিক ডাকে তুলিল৷ বিয়ান বেলা উঠি খাবার না পাইলে এই ম্যানশেটা এলা চিল্লাচিল্লি করবে৷ খারাপ খারাপ গাইলাইবে৷

সোয়ামি দোলা বাড়ি গেইলে ওকেয়া ধান উশা শুক্যা করবে৷ সেইগল্যা ফির উরুন গাইন দিয়্যা চাউল বানেয়া দোপরের ভাত আন্না করা নাগবে৷ ওকেয়া জানে ম্যানশেটা দোলাবাড়ি থাকি আসিয়্যা ভাত না পাইলে বাপ-মাও ধরি গাইলাইবে৷ হালুয়্যা পেন্টি দিয়া মাইরাবারো পারে৷ ওমাক খুব ডর লাগে৷

ওকেয়া ওমার ছোট বউ৷ বড় সতীন মরি গেইছে৷ তামারগুল্যার চাইরট্যা ডাঙ্গর ডাঙ্গর ব্যাটা আছে৷ সগায়গুল্যা ওকেয়ার চায়্যা বয়সে বড়৷ সগায় বিয়্যা করিয়্যা মাইয়া, ছাওল-পোল নিয়্যা আলদা খায়৷ ওকেয়া এই বুড়্যা সোয়ামিক নিয়্যা পড়ছে এক জ্বালাত৷ ম্যানশেটার চরিত্রটা যেমন ভাল না তেমন বদমেজাজী৷ কতক সময় সোগ কিছু থুয়্যা পালে যাবার মন চায়৷ কিন্ত যাইবে কোনটে৷ উইয়ারতো কায়ো নাই৷ ফির ম্যানশেটার জন্যে মায়া হয়৷ যতই মারুক৷ গাইল্যাক তাওতো সোয়ামী৷

ওকেয়া জানে বাইরের দুনিয়্যাটা কত খারাপ৷ এই প্যাটটার জন্যে কতনা কিছু করতে হইছে ওয়্যাক৷ কায়ো কোনকিছু ছাড়া এক আনাও হেলেপ করে নাই৷ সারা গতরে এলাও ঐ পাপ নাগি আছে৷ শ্যাষে একটা সার্কেস পার্টিতে ঢুকি যায়৷ স্যাটে থাকি যাত্রা পার্টিত৷ তখন দেখতে শুনতে ছিল মাশাআল্লাহ্৷ উইয়ার জন্যেই লোকজন যাত্রা দেইখপার আসতো বেশি৷ ওকেয়ার দাম আর ঢক দুইটায় বাড়ি গেইল৷ সেই যাত্রা পালা দেখিয়াই ওই ম্যানশেটা পিছ পিছ লাগিল৷ শ্যাষে বিয়্যা করিল৷ ওকেয়াও মাথা গোঁজার একনা জায়গা পাইল৷

হায়রে জনম৷ হায়রে কপাল৷ মাইয়্যা হয়্যা জনমিবার শাস্তি৷

ওকেয়া এইটাকেই মানি নিছে৷ তাছাড়া ম্যানশেটা যে একনাও পিরিত করে না তাও নোয়ায়৷ এলাও মাঝে মাঝে চুড়ি, গয়না, শাড়ি নিয়্যা আসি দ্যায়৷ ত্যাল-সাবুনের কথা না হয় না-ই ধরনু৷

গঞ্জত শুননু যাত্রা নাকছে৷ ম্যানশেটা পতিদিন স্যাটে যায়৷ নয়া ধান নামছে৷ এমার কোন চিন্তা নাই৷ খালি বস্তায় বস্তায় ধান বেচতোছে৷ আর পাইস্যা নষ্ট করতোছে৷ কুনদিন যে হায়্যা হইবে আল্লাহ্ই জানে৷

আইজ সাঁজের ব্যালা ম্যানশেটা একখান নয়া পিরান আর নয়া তবন পরি ব্যাড় হইছে৷ গায়োত আঁতরও লাগাইছে৷ ভাবসাব একনা অন্য রকম৷ কী জানো! কী করতোছে এই বুড়্যা বয়সোত ওকেয়া ভাবে৷

অনেক রাইত পর্যন্ত ওকেয়া বসি থাকিল৷ ম্যানশেটা যদি আইসে৷ ঐ অবস্থায় কখন যে নিন্দ আসছে টের পায় নাই ওকেয়া৷

—৩—

দুয়ারোত জোরে জোরে আওয়াজ শুনিয়া ওকেয়া ধরপর করি উঠি বসিল৷ জারের রাইতেও ওকেয়া ঘামবার লাগিল৷ দুয়ারোত ন্যাদাই দিতোছে আর চিল্লি চিল্লি গাইলাইতোছে ওইয়ার সোয়ামি৷ কইতোছে ওই হারামজাদী৷ শশুরের বেটি৷ মাগীর বেটি তুই কি মরণের নিন্দ পারতোছিস৷

ওকেয়া ধরপর করি উঠিয়্যা ন্যাম্পোটা জ্বলাইল৷ আইজক্যা ক্যানবা ন্যাম্পোটা ক্যামন ভুকুত ভুকুত করতোছে৷ এলায় বুঝি নিভি যায় নাকি! ওকেয়া ডর ডর ভাব নিয়্যা দুইয়্যারটা খুলি দ্যায়৷ ঘরোত ঢুকিয়ায় মফিজ চিল্লি চিল্লি গাইলা গাইলি শুরু করি দেইল৷ ওকেয়া কোন কতা না কয়া পাক ঘরোত থাকি ভাত আইনব্যার গেইল৷ ওয় জানে এলা কতা কইলে মাইরব্যার পারে৷

মফিজ চুয়ার পাড় থাকি হাত মুখ ধুয়্যা আসিল৷ চোকির এক কোনাত ওকেয়া সানকি, খোরা, মগ দিয়্যা কইল আইসো ভাত খায়্যা ন্যাও৷ মফিজ ভাত খাইতে খাইতেও চিল্লাইতোছে৷ থামতোছে না৷ ওকেয়া শাড়ির আঁচলটা দিয়্যা মুখ ঢাকি হাসতোছে৷ এই চিল্লাচিল্লির মানে ওয় বুঝপ্যার পায়৷ কারণ ওয় একজন মাইয়্যা মানুষ৷

ভাত খাওয়া শ্যাষ হইলে ওকেয়া থালি-খোরা চোকি থাকি সারে ফ্যালে৷ বিছন্যাটা ঠিক করে৷ ন্যাম্পোটা গচার উপর থুয়্যা দ্যায়৷ ন্যাম্পোটা এলাও ভুকুত ভুকুত কোরতোছে৷

মফিজ চোকির উপর আগ হয়্যা এলাও বসি আছে৷ ওকেয়া মুখোত একনা হাসি নিয়্যা চিৎ হয়্যা শুয়্যা পড়ে৷ তারপর সোয়ামির দিকে চায়্যা ফিশফিশ করি কয়্যা উঠিল ‘তোমরা কী করমেন করো, ন্যাম্পোত ত্যাল নাই৷’

 

লেখক: কবি ও গল্পকার, রংপুর।

298 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:২৩ অপরাহ্ণ

স্বপ্নঘড়ি

১) বাহিরে কনকনে ঠাণ্ডা । সেই সাথে বইছে হিমেল হাওয়া। এই ঠাণ্ডায় যেখানে ঘরের ভিতরে থাকা দায় সেখানে শিউলি বাহিরে যাচ্ছে কী কারণে? মা বললেন- কিরে শিউলি, এই ঠাণ্ডার দিনোত কোটে কোনা যাওছিস? শিউলি বাজারের ব্যাগ হতে নিয়ে বললো – মা, এ্যানা কাম আছে, যাইম আর আসিম ।

-কলেজত যাবু না, ১০ টা তো বাজি গেছে ।

-আইজ মনে হয় কলেজত যাওয়া হবার নয় । মা মোক ছয়শোটা টাকা দে তো ।

মা চোখ আসমানে তুলে বললেন – ওমা ওমা, এটা তুই কি কওছিস শিউলি ? এত টাকা মুই কোটে কোনা পাইম। এতগুলা টাকা কি মুই কোন দিন চোখে দেখছোও । তাছাড়া আজই শাবানা আইসবো জামাই নিয়ে । উমরা গুলার জন্য হাট থাকি মুরগি, তেল, চিনি আইনবার লাগবার নয়?

-সগেই এ্যালা হবে মা, মোক আগে টাকা দে তো । মুই দেখ কি নিয়া আইসম। শিউলি জোর জবরদস্ত করে মায়ের আচল থেকে টাকা বের করে নিয়ে একটা শাল গায়ে জড়িয়ে বাহিরে চলে যায় ।

২) পোস্ট অফিসের সামনে অনেক ভিড়। আজ সোমবার , টিসিবির মাল দেওয়ার কথা আছে এখানে । তাই তো শিউলি কলেজ বাদ দিয়ে এত ঠাণ্ডা শীত উপেক্ষা করে এখানে এসেছে । ভালই হলো, খুব একটা লোকজন নেই আজ । এর আগের দুইদিন এসেছিল শিউলি কিন্তু এত ভীড় ছিল তাকে লাইনের শেষ সীমায় দাঁড়াতে হয়েছিল । তার সিরিয়াল আসতে আসতে তেল, ডাল, পিয়াজ সব শেষ হয়ে গিয়েছিল । বাকি  ছিল শুধু চিনি । শিউলি সেদিন শুধু চিনি নেয়নি । আজ সে লাইনের প্রথমে দাঁড়িয়েছে । তার পিছনে মাত্র পাঁচ সাত জন । কিন্তু ট্রাক কোথায় ? সময়ের সাথে সাথে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে । অনেক লোকজন এসে তার পিছনে দাঁড়িয়েছে । সবার মুখে বিরক্তির ভাব । বেলা বাজে আটটা । এখনো ট্রাক আসার নাম নাই । আস্তে আস্তে  লোকজন কমতে থাকে । শিউলি পণ করেছে আজ সে টিসিবির মাল নিবেই নিবে । বাবা অসুস্থ, কামাই রোজার বন্ধ । তাছাড়া তার বুবু শাবানা অনেক দিন পর আজ বেড়াতে আসছে । টিসিবির তেল, পিয়াজ, চিনি পেলে দুই তিনশ টাকা বাচানো যাবে । বাজারে তেল চিনির যা দাম, তাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের বাজার থেকে এসব কিনে খাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে । শিউলির ভাবনার মাঝে কার যেন একটা হাত এসে তার ঘাড়ে পরে । সে চমকে পিছনে তাকায় । দেখে তার বন্ধু মনিরা । মনিরা বললো- কিরে শিউলি, এটিকোনা যে ?

শিউলি বললো, তেল ডাল নিমরে । তার দেখিস এলাউ কোনা ট্রাক আসপ্যার নাকছে না । কলেজ বাদ দিনু কয়টা টাকা লাভের আশায়, তাক বুছি আর হইল ন্যা । মোর কথা বাদ দে, তুই ক, তুই এটি ক্যা ?

–         মুই আসচোম পোষ্টপিসো একখান চিঠি দিব্যার । তোক দেখি এটিকোনা আনু ।

–         কলেজোত গেছিলু ?

–         হ, গেছুম। শামীম স্যার তোর কথা জানবার  চাইলো ।

শামীম স্যারের কথা শুনে শিউলির মুখটা খুশিতে চকচক করে উঠলো । সে মৃদু হেসে বললো  – শামীম স্যার মোর কথা কি কইলোরে মনিরা ? মনিরাও হাসে । হেসে বলে  – শামীম স্যার কইল, তুই ব্যান কোনদিন লেখাপড়া বাদ দেইস না । লেখাপড়া করি তুই যেন একদিন বড় চাকরি করিস।

–         শামীম স্যার মোক নিয়া খুব ভাবে, তাই নারে মনিরা ?

–         ভাবিয়া আর কি করবি ক । তেলে জলে তো আর কোনদিন মিশ খাবার নয় । শিউলি এবার মনিরাকে ধাক্কা দিয়ে বললো – কি এগুলা কওছেস মনিরা, বাদ দে তো । তুই তেল চিনি নিবু নাকি ?

–         হ, নেওয়ার তো ইচ্ছা আছিল, কিন্তু ট্রাকতো আইসপার নাগছে না । তাদের কথার মাঝে ট্রাক চলে আসে । ট্রাক ভর্তি মালামাল । শিউলি আর মনিরা তাদের ইচ্ছামতো মালামাল নিয়ে খুশিতে হেঁটে হেটে বাড়িতে আসে ।

৩)      টিসিবির মাল দেখে মা খুব খুশি । তিন চারশ টাকার মতো বাচলো আজ । শাবানা এসেছে। শাবানাকে আজ তেল পিঠা বানিয়ে খাওয়াবে শিউলি । চারশ টাকা বাচাতে পেরে তাদের খুশি আর ধরে না । এই টাকা সাথে আরো কিছু টাকা যোগ করে শিউলি তার ছোট ভাই রানাকে নিয়ে বাজারে মাছ মাংশ আনতে গেল ।

রাত বাজে এগারোটা । শাবানা খেয়ে দেয়ে শিউলির বিছানায় এস বসলো । শিউলি বললো  – বুবু কিছু   কবু ? মোর না খুব ঘুম পাইছে ।

শাবানা বোনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বললো  – তোর জন্য একটা সমন্ধো আনছোম শিউলি, খুব ভাল চ্যাংরা । সৌদিত থাকে । ম্যালা টাকা পয়সা । বিয়া করার জন্য আসছে ।

শিউলি বিস্মিত স্বরে বললো  – এটা তুই কি কওছিস বুবু ? মোক বিয়া দিবু মানে ? মোর তো এ্যালাও আঠার বছর হয় নাই । তাছাড়া মুই এ্যালাই বিয়া করবার নও । মুই মাষ্টারনি হইম । কলেজোত চাকরী করিম । তুই এ কথা আর মুখোত আনিস না বুবু ?

শাবানা বললো  – আঠার হয় নাই, হইবে । এমন ভাল চ্যাংরা আর জীবনে পাবু না । শুনছোম সৌদি থাকি দশ ভরি সোনা আনছে । সগেই বউক দিবে ।

–         মিছা কথা বুবু, সউব মিছা কথা । যামরা বিদেশোত চাকরী করে তামার চরিত্র ভাল হয় না। তাছাড়া মুই পড়ব্যার চাও । শামীম স্যার কইছে লেখাপড়া ছাড়া নারীর মূল্যায়ন কেউ করে না । লেখাপড়া হলো প্রত্যেক মেয়ের জন্মগত অধিকার ।

শাবানা এবার মুখ বিকৃতি করে বললো – তুই দেখম শুদ্ধ করে কথা কওছিস শিউলি। আর শামীম স্যারটা কেটা ? তোর মাষ্টার ?

শামীম স্যার যাই হয় হোক, তুই এ্যালা এটি থেকি যা । শিউলি একরকম জোর করে বোনকে ঘর থেকে বের করে দেয় ।

৪)       শিউলি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে । কিন্তু ঘুম আসেনা । তার বুকটা ধক ধক করে কাঁপতে থাকে,  বুবু এটা কি শুনালো ? বিয়ে !! না না, বিয়ে সে করবে না । সে লেখাপড়া করবে । এই মুহূর্তে তার শামীম স্যারে কথা খুব মনে পড়ে । একমাত্র শামীম স্যারই তাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে । তার ভাবনার মাঝে বালিশের পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো । শিউলি ফোনটা হাতে নিতেই অপর প্রান্ত থেকে শামীম স্যারের সুমধুর কন্ঠ ভেসে আসে – হ্যালো, শিউলি কেমন আছো, আজ যে কলেজে এলে না ?

– শিউলি হুরমুড় করে বলে উঠলো  – স্যার ভাল নেই স্যার ।

– কেন কি হয়েছে ?

– স্যার মোর বুবু মোক বিয়া দিবার চাওছে । মোক বাচান স্যার । মুই লেখাপড়া করবার চাও।

– শিউলি শুদ্ধ করে কথা বল এবং আমাকে পরিষ্কার করে বল বিষয়টা কি ।

– স্যার কোন বিষয় নাই স্যার । আমি বিয়া করবো না । আপনি কি আমার দায়িত্ব নিতে পারবেন স্যার ?

– দায়িত্ব নিতে পারব কিনা জানি না, তবে তোমার লেখাপড়ার যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেদিকে জোড়ালো নজর রাখব । দরকার হলে থানায় যাব তোমার জন্য একটা ডায়রী করতে । দেখি তোমার মতের বিরুদ্দে কে তোমাকে বিয়ে দেয় ? স্যারের কথা শুনে শিউলির মনের স্বপ্ন ঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে ওঠে । সে একটা স্বস্তির নিঃশ^াস ছেড়ে বলে  – স্যার পৃথিবীতে এখনো ভাল মানুষ আছে । আপনাদের মতো কয়েকজন ভাল মানুষ থাকলেই এদেশের মেয়েদের এগিয়ে যেতে কোন সমস্যা হবে না । আপনি ভাল থাকুন স্যার, বলেই শিউলি ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করে ।

 

লেখক: গল্পকার, রংপুর।

267 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:২২ অপরাহ্ণ

ছুঁয়ে দেখা জীবন

গভীর রাত নিঝুম প্রকৃতি কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার সুনসান নীরবতা। মাঝে মাঝে দু’একটি ঝিঝি পোকা ডাকছে। বাঁশবাগানের ভেতরে দলবেঁধে জোনাকিগুলো মিটি মিটি করে জ্বলছে। গোটা আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে আছে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাল, দরজার জানালার কপাটগুলো থরথর করে কেঁপে উঠল। কোথা হতে একটা দমকা হাওয়া এসে উঠানের আমগাছটার ডালে আঁচড়ে পড়ল। অমনি মড়মড় করে বিরাট একটা ডাল ভেঙ্গে পড়ল উঠানে। ভাঙ্গা চিমনির ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকে হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলোর সাথে যুদ্ধ করছে, তারপর একসময় পরাজিত হয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। দিয়াশলাইটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। অন্ধের মতো হাত-পা বাড়িয়ে কোন রকমে বিছানাটা খুঁজে পেলাম। তারপর বিছানার উপরে উঠে হাত পা গুটিয়ে ঝড়-বাদল সেরে যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকলাম। মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে, কি অদ্ভুত রকমের বৃষ্টি অঝর ধারায় ঝরছে, যেন গোটা পৃথিবীকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে আজ। বৃষ্টির ঝাপটার ভারী যবনিকা ভেদকরে বাহিরে কিছু দেখা যাচ্ছেনা। জানালার ওপারে অশান্ত বর্ষণ আর মেঘের গর্জনে সব কিছু কেঁপে উঠছে বারবার। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে হচ্ছে, যেন হাজার বছরের নিঃশ্বঙ্গতা নিয়ে আমি নেপোলিয়নের মতো সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দি হয়ে আছি।

ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে প্রকৃতিটা একটু ঝিমিয়ে পড়ে, চারিদিকটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অনেক দূর থেকে ক্ষীণস্বরে একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আমার বুকের ভিতরটা কেমন ধক্ধক্ করে উঠল। প্রচ- ঝড়ের তা-বে ভেঙ্গে পড়া ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে কেউ হয়তো মরে গেছে। কি আশ্চর্য এ মৃত্যু, পলকে সবকিছুকে একেবারে নেই করে দেয়। কান্নার শব্দে মনটা কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠল, তাই ঘর থেকে বের হয়ে এক পা-দু’পা করে হাঁটতে শুরু করলাম। একটু সামনে এগিয়ে গেলে শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে আসে, আর বুঝতে বাকী রইলো না যে, আব্দুল্লাহর বাড়ি থেকেই কান্নার শব্দটা আসছে। আমার উদ্বিগ্নতা আরো বেড়ে গেল, আমি একটু জোর কদমে এগিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে উপস্থিত হলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি আব্দুল্লাহ পেটের ব্যথায় বিছানায় গড়া-গড়ি দিচ্ছে, আর মুখ দিয়ে আবোল তাবোল বকছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে- গানের সুরে সুরে সে তার স্ত্রী-সন্তানদের ডাকছে-

“আবিয়া, ছাবিহার মা, বেল্লাল উদ্দিন জালালরে, সকলে দেখিয়া যাও আমারে। নিজের দোষে বান্দা মরে আল্লাক দেয়রে দোষ”

আবিয়া, ছাবিহা, বেলাল ও জালাল আব্দুল্লাহর সন্তানদের নাম। বাবার বুকে মাথা রেখে আদরের মেয়ে আবিয়া-ছাবিহা কাঁদছে। আবিয়ার মা কুলসুম আব্দুল্লার মাথায় বালতির পর বালতি পানি ঢালছে। আজ তার নিজের আবিষ্কৃত ঔষধ “খাওয়ার সোডা” তেমন কাজ করছে না। পেটের ব্যথাটা আজ কেন জানি তার সাথে ভীষণ গাদ্দারি করছে, এতোক্ষণ কোন দিনই তাকে জ্বালায় না। যা হোক অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে আব্দুল্লাহ চোখ বন্ধ করে একটু ঝিমিয়ে পড়ল। একটা দীর্ঘম্বাস ছেড়ে কুলসুম নিজের আঁচলের এক প্রান্ত দিয়ে তার মাথা ও মুখ ভালো করে মুছে পানির বালতিটা সেখান থেকে সরিয়ে নিল। আব্দুল্লাহর ভেজা মাথা মুছে দিয়ে তাকে ঠিকঠাক ভাবে শুয়ে দিল।

আব্দুল্লাহর বউ কুলসুম বললো- গতরাতে “প্যালকা“(সজনে পাতা, পুঁইশাক, চালের গুড়ো ও খাওয়া সোডা দিয়ে রান্না করা এক প্রকার মজাদার তরকারি) খ্যায়া তার এ্যামন প্যাটের বিষ হইচে। বাবা মুই এ্যাতো করি কনু- আবিয়ার বাপ তোমার প্যাটের বিষ! তোমাক প্যালকা খাবার না নাগে, কায় শোনে কার কথা।

বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে মানুষের বাড়িতে কাজ কর্ম করতে গিয়ে কখন যে শরীরে তার মরণ ব্যাধী বাসা বাঁধে, সেটা  নিজেও টের পায় না আব্দুল্লাহ। শুধু পেটের ব্যথাটা তাকে মাঝে মাঝে একটু কাবু করে ফেলে। যখন এই পেটের ব্যাথা তীব্র আকার ধারণ করে আর সহ্য হয় না, তখন সে প্রতিষেধক হিসেবে এক মুঠো খাওয়ার সোডা খেয়ে ঢোক-ঢোক করে দু’এক গ্লাস ঠা-া পানি খেয়ে নেয়, এতে সাময়িক কালের জন্য হলেও ব্যাথা খানিকটা উপশম হয়। পেটের ঝিম-ঝিম ব্যথা নিয়ে সে সারাদিন কাজ করে মানুষের ক্ষেতে খামারে। আর কাজ না করলে পেটের জোগানই বা আসবে কোথা থেকে? সংসারে চার-পাঁচ খানা মুখ হাঁ-করে চেয়ে আছে তার দিকে। এমতাবস্থায় কী বা করার আছে তার?

প্রিয় পাঠক এখানে একটু বলে রাখা দরকার, আব্দুল্লাহর জন্ম যে গ্রামে তার নিজের মতো সেটিও একটি আবহেলিত গ্রাম, যার নাম দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা। চারিদিকে ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের একটি ছোট্ট ভুখ- তারও অর্ধেকটা গ্রাস করেছে তিস্তা নদী। এই গ্রামটি গোটা বিশ্বের কাছে “দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল” নামে পরিচিত। একটি স্বাধীন দেশের মূল ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি স্বাধীন  দেশের মূল ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখ-। এখানে যেতে হলে অন্য দেশের ভুমির  উপর দিয়ে যেতে হয়। এ ভুখ-টি সম্পূর্ণরূপে নিজদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানকার নাগরিকরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে নিজেস্ব স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পঁচা কাষ্ঠখ-ের ভিতরে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকা পোকার মতো নিষ্প্রাণ জীবন-যাপন করে। পূর্ব পুরুষদের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে তারা এখানে বসবাস করে।

ভারত সরকার তিস্তা নদীর উজানে জলপাইগুড়ি জেলার ‘গজলডোবা’ নামক স্থানে এই নদীর উপর ‘গজলডোবা বাঁধ’ নির্মাণ করেন। ফলে নদী তার গতিবিধি হারিয়ে ফেলে। অথৈ বর্ষায় ভারত সেই বাঁধের সুইস গেইট খুলে দিলে নদী বেসামাল হয়ে পড়ে, বয়ে যায় দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার অর্ধাংশের ওপর দিয়ে। আব্দুল্লাহর ঘর-বাড়ি, জমি-জমা, বিষয়-সম্পত্তি নিমিষে বিলিন হয়ে যায় নদীর বুকে।

আব্দুল্লাহর বউ কুলসুম, মাঝে মধ্যে আমির মাষ্টারের বাড়িতে টুকি-টাকি কাজ কর্ম করে। মজুরি হিসেবে যা পায় সেটা আঁচলে পোটলা বেঁধে শক্ত করে কোমরে গুজে রাখে। তারপর কাঁচা রাস্তা, জমির সরু আইল হাটু পর্যন্ত কাদা পানি পারি দিয়ে বাড়িতে আসে। গতদিনে সেই বাড়িতে মেহমান আসায় অনেক কাজ বাড়ে, শরীরের উপর খুব ধকল যায়। তাই কুলসুমের চোখে যেন রাজ্যের সব ঘুম এসে জড়ো হয়, সে কিছুই টের পায়না। আব্দুল্লাহ ঘুম থেকে ওঠে কাজে যাবার জন্য, হাত-মুখ ধুঁয়ে এসে হাড়ি-পাতিল গুলোর দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে, হাড়ির তলায় সামান্য একটু দলাপাঁকা ভাত, সেটুকুও যদি সে খেয়ে যায় তাহলে অবুঝ বাচ্চা গুলো কি খাবে? সারাদিন তাদের না খেয়ে যে থাকতে হবে। এই ভেবে সে কুয়ো থেকে একবালতি পানি তোলে, বালতিতে মুখ লাগিয়ে ঢোক ঢোক করে অর্ধেক বালতি পানি গিলে ফেলে। তারপর খক্-খক্ করে দু’তিনবার কাশি দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় কাজের সন্ধানে।

বেলা অনেক হয়ে গেছে শরীরটাও খুব ম্যাচ ম্যাচ করছে, সারাগায়ে ব্যথা, তবুও যেতে হবে অনেক থালা বাসন হয়তো তার জন্য এখনও পড়ে আছে। সে গুলো পরিস্কার করতে হবে, ঘর-উঠান ঝাড়– দিতে হবে, রান্না করতে হবে আরোও কতকাজ তার পড়ে আছে। আবিয়া স্কুলে যাওয়ার জন্য জামা কাপড় পড়ছে, মাকে ঘুম থেকে উঠতে দেখে বলে-

মা, তুমিও কি কাজে যাবে?

হ্যাঁ যাওয়া নাগবে-রে মা।

তোমার না শরীর খারাপ? একদিন কাজে না গেলে কি এমন ক্ষতি হবে?

নারে মা, কাইল ম্যালা কাজ থুইয়া আচ্চি। আর আইজ যদি কাজে না যাঁও, তাহলে আপার খুব কষ্ট হইবে। রাগ করি আর কোন দিন মোক কাজে ডাকবার নয়। ছোট হাড়িটায় অল্প একনা ভাত আছে, দুই বোইনে ভাগ করি খাও।

মা তুমি তো কিছুই খাও নাই, একটু খাও?

অল্প একনা ভাতই আছেরে মা, তোমরা খাও। মুই এ্যালা আপার বাড়িত কিছু একটা খ্যায়া নিম।

রাতে আবিয়ার মা কুলসুম, মেঝেতে একটা মাদুর পেতে আবিয়া, ছাবিহা ও তার বাবাকে খেতে দেয়। আবিয়া তার মাকে তাদের সাথে খাওয়ার জন্য টানা টানি করে, কিন্তু কুলসুম খেতে বসে না। আবিয়া খুব বেশী পিড়া-পিড়ি করলে, কুলসুম বলে- মারে তুই বুঝবু না, তোর বাপক ভালো করি না খাওয়াইলে মোর প্যাটত (পেটে) ভাত যাইবে না।

কুলসুমের বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস আসে তার দুই ছেলের একটিও কাছে নেই, তারা যে কোথায় আছে, কি খাইতেছে, মায়ের মন সন্তাদের চোখের সামনে না দেখলে সায় দেয় না। অভাবের তাড়ণায় বড় ছেলে বেলাল ভারতে যেয়ে কাজ করে। আর ছোট ছেলেটা মানুষের বাড়িতে বাৎসরিক চুক্তিতে কাজ-কর্ম করে, মালিকের বাড়িতেই খায়, সেখানেই থাকে। অনেকদিন বাড়িতে আসে না, মালিক নাকি ছুটি দেয় না।

আজকের দিনটা কোন রকমে আধপেটে পার হলে আবার কালকে কি হবে এই ভেবে রাতে আব্দুল্লাহর ঘুম আসে না। এ পাশ ওপাশ করে কখনো চোখের পাতা দু’টো এক হলে পরোক্ষণে আবার গা ঝিমিয়ে ওঠে। হাত-পায়ের শিরা গুলো টন-টন করে। শিরার ভেতর দিয়ে ক’ফোটা রক্ত যায়-আসে, সেটাও বলতে পারে সে। তার একমাত্র সম্পদ দু’টো বকরি, শত কষ্টের মধ্যেও সে বিক্রি করে নাই কিন্তু এবার বুঝি আর রক্ষা করা গেল না। বাচ্চা কাচ্চা যদি তার না খেয়ে মরে যায়, তবে বকরি দিয়ে কি হবে? তাছাড়া অনাহারে থেকে তার শরীরের অবস্থাও দিনদিন কাহিল হয়ে পড়ছে।

চরের বসত যেমন আজ আছে, কাল নেই। নদীর খেয়াল-খুশির উপর নির্ভর করে এর আয়ুস্কাল। নদীর খুশিতে তার বুকে চর জাগায় আবার ইচ্ছে হলে মুহুর্তের মধ্যে সব কিছুকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। মানুষের  কতো দুঃখ, কষ্ট, হাহাকার, বুক ভাঙ্গা আর্তনাদ কোন কিছু তাকে নূন্যতম বিচলিত করতে পারে না। আপন জঠরে টেনে নিয়ে স্বগর্বে প্রবাহিত হয় আপন ঠিকানায়। কোন কিছু ভ্রুক্ষেপ করার সময় তার নেই। আব্দুল্লাহ আর জেলহকের মতো হাজারো পরিবার ঘর-দোর ভেঙ্গে, পরিবার পরিজন, গরু-বাছুর, ছাগল-ভেরা, হাঁস-মুরগী নিয়ে রাস্তার ধারে কিংবা কারো পতিত জমিতে মাথা গোজার ঠাঁই করে। তারপর আস্তে আস্তে দু’চারদিন পর সেই ঘরগুলোকে খুঁটি দিয়ে খাড়া করে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে। শুরু হয় আবার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা করে। শরীরে দিকে নজর দেয়ার সময় এখন নাই। পেট নামক যে ভয়ঙ্কর দোজখ সর্বা দাউ-দাউ করে জ্বলে তার তো খোরাক জোগান দিতে হবে?

এত বড় গেরস্তের ছেলে হয়ে নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করা তার আত্মসম্মানে বাজে, খুবই নিন্দার কাজ বলে মনে হয়। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনেরা দেখলে কি মনে করবে, তার ভীষণ লজ্জা লাগে। কিন্তু পেটের ক্ষুধায় তো আর না খেয়ে থাকা যায় না। দিনের পর দিন কতো অভাব-অনটনের ভেতর দিয়ে সংসার চলছিল তারপরেও সে মাছ বেচার কথা কোন দিন স্বপ্নেও ভাবেনি আব্দুল্লাহ। বউ বাচ্চা নিয়ে দিন-রাত না খেয়ে, ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আব্দুল্লাহ জাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যায়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় অনেক মাছ ধরা পড়ে তার জালে। একবার মনে হয় মাছগুলো রান্না করে বড় মাছ দু’টো বাচ্চারা খাবে ছোট গুলো এখন আমরা খাব। কিন্তু শুধু মাছ খেয়ে কি বাচ্চাদের ক্ষুধা মিটবে? কাল থেকে তারা শিঁকায় তোলা এতোটুকু চালের ভাজা খেয়ে আছে। আত্মসম্মানের দিকে তাকালে আমার বউ-বাচ্চা না খেয়ে মরবে। কাজেই এই মুহুর্তে আত্মসম্মানের চেয়ে নিজের জীবনের দাম অনেক বেশী। শুধারাম জেলে মাছ ধরা শেষ করে বালুচরে জালখানা রোদে বিছিয়ে দিয়ে এদিক-ওদিক টানা-টানি করে তাড়াতাড়ি শুকানোর চেষ্টা করছে।

আব্দুল্লাহকে এদিকে আসতে দেখে শুধারাম জিজ্ঞাসা করে- কি আব্দল্লাহ দা আজি কতোগুলা মাছ পাইলেন? তোমার খলাই (মাছ রাখার পাত্র) যে ক্যানে নড়েই না।

হ্যাঁরে শুধা, ভালোই পাইছি আর মাছও বেশ বড় বড়, দুইটা আইড় মাছও পাইছি-রে। সবে সেইজনের ইচ্ছা, গরিবের ওপর দয়া। নইলে যে গরিবের ঘর না খ্যায়া মারি যাবে।

তোমা ঠিক কথাই কইছেন দাদা। ভগবান কাউকে না খ্যায়া মারে না। দাদা তোমা যে কার মুখ দেখি আইসেন, তা কায় জানে। নিত্যদিন তো ভাল-ভাল মাছগুলা তোমায় পান। তা, বাড়ি যাবার নন দাদা?

হ্যাঁরে শুধা তোর সাথে এ্যাকনা কথা কবার জন্য আসিনু।

কি কথা দাদা? তাড়াতাড়ি কয়া ফেলাও? বাজারের বেলা শ্যাষ হয়া যাবার নাকছে। মাছগুলা ব্যাচেবার নাগবে না?

শুধা, তুইতো জানিস, মোর আর আগের দিন নাই। সংসারে আয়-রোজগার নাই, কেমন করি বাঁচা যায় ক’? এখন মান সম্মানের কথা চিন্তা করিলে মোক বউ-ছওয়া নিয়া না খ্যায়া মরা নাগবে।

সামান্য কয়েকটা পুটি, খলসে আর ট্যাংরা মাছ নিয়ে যখন আব্দুল্লাহ বাড়িতে আসে, তখন কুলসুম তার হাতে এ কয়েকটা মাছ দেখে মনে মনে ভীষণ রাগ হয়, কাল থেকে বাচ্চারা না খেয়ে এক রকম উপস করে আছে আর আজও যদি রান্নার কোন ব্যবস্থা না হয়, তাহলে তারা বাঁবে কিভাবে? অনাহারে থেকে থেকে মেজাজটাও কেমন রুক্ষ খটখটে হয়ে যায়। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে-

হা আবিয়ার বাপ আইজ যে শিঁকার কৌটাগুলাও খালি হয়া পড়ি আছে। আর যে কোন উপায়ও নাই, আইজ কি হইবে?

আব্দুল্লাহ মনে মনে একটু ভাব নেয়, যেমন পৃথিবীর সব পুরুষেরাই বউয়ের উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য নিজেকে বীরপুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করে। সেও এমন ভাব যে বউয়ের কোন কথাই এখন পর্যন্ত তার কানে পৌছায় নি। আব্দুল্লাহ বলে-বউ বাজারের ব্যাগটা এ্যাকনা দেও তো? তাড়াতাড়ি কর, দেরি কর না।

কুলসুম ব্যাগ নিয়ে এসে বলে-এই নাও তোমার ব্যাগ। চাল-ডাল কেনার টাকা কোনটে পাবেন এ্যালা? খালি হাতে যে বাজার যাবার নাগছেন?

বউরে আল্লাহ আইজ হামার ভিত্তি মুখ তুলে তাকাইছে, নদীতে অনেকগুলা মাছ পাইছি। শুধারাম’ক বেচার জন্য দিনু, এতোক্ষণে তায় ব্যাচেও ফেলাইছে মনে হয়। মুই তাড়াতাড়ি য্যায়া, বাজারটা করি আসিবার নাগচু।

কুলসুম চুলা থেকে ছাই বেরকরে মাছগুলো মেখে কুটতে শুরু করে। এমন সময় পাশের বাড়ির এরফান খাঁর বউ হাতে একটা পোটলায় কেজি দুয়েকের মতো চাউল নিয়ে আসে। কুলসুমকে বলে-চাচি এই এগুলো একনা থনতো।

ও-গুলা কি বউমা?ক্যান চাচি তোমার মনে নাই? শুক্রবার হামার বাড়িত সাগাই আসছিল সেইজন্য না  তোমার কাছে  চাউল ধার নিছিনু?

না বউমা, মোর একনাও মনে নাই। আইজকাল যে কি হইছে বউমা, কোন কিছুই মোর মনে থাকে না। কুলসুমের নিজের উপর ভীষন রাগ হলো, তার চাল মানুষের ঘরে আর সে কি না চালের অভাবে কাল থেকে বাচ্চা-কাচ্চা সহ না খেয়ে আছে?

ভাতের থালা নিয়ে বসে আব্দুল্লাহ ভাবে- কি সুন্দর পরীর মতো মেয়ে দু’ইটা তার, কাল থাকি না খ্যায়া আছে অথচ একবারের জন্য খাবার চায় না। ক্ষুধার জ¦ালায় নিস্পাপ মুখগুলো লাল হয়ে আছে। হায় খোদা! কোন পাপের শাস্তি মোক দিবরি নাগচিস। মাছের ঝোল মাখা এক লোকমা ভাত মুখে তুলে দেবে এমন সময় পিছন থেকে জালাল এসে ডাকে- মা, ও মা?

এক লাফ দিয়ে কুলসুম উঠে দাঁড়ায়, অনেক দিন পর ছেলেকে দেখে তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। জালালকে বলে,-

হ্যাঁরে বাবা, এতোদিন  পর তোর মায়ের মায়ের কথা মনে পড়িল?

মা, -মালিক মোক ছুটি না দিলে বাড়ি আইসো ক্যামন করি?

সেটা অবশ্য ঠিক কইছিস বাবা। গরিবের কপাল, যা বাবা হাত-মুখ ধুইয়া আয় সবাই মিলে একসাথে বসি খাই।

ছাবিহা ভাতের থালা ছেড়ে উঠে চুপি চুপি ক’য়োর পারে যেয়ে জালালের কানের কাছে মুখ লাগিয়ে দিয়ে বলে-এই ভাইয়া, মোর জন্য কি আনছিস?

জালাল আর হাসি আটকাটে না পেরে হো হো করে হেসে ওঠে। তারপর ছাবিহাকে কোলে নিয়ে ভাত খেতে আসে।

আবিয়া আর ছাবিয়ার মাঝখানে বসে জালাল। আবিয়া কানে কানে বলে-ভাইয়া, ছাবিহা তোক কি কইলোরে ?

জালাল আবার হোঃ হোঃ করে হেসে ওঠে বলে- আচ্ছা আগোত ভাতটাতো খাবার দে, তারপর কবার নাগচু।

অনেক দিন পর ভাই-বোনের মুখে হাসি দেখে আবারো কুলসুমের চোখের কোণে অশ্রু এসে গেল। আজ তার মনে হলো, ছোট্ট এই ভাঙা কুঁড়ে ঘরে যেন স্বর্গ নেমে এসেছে। এখন শরৎকাল আকাশে ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। চারিেিক অম্লান জোছনা। সেই চাঁদের আলোয় তার তিন সস্তানের মুখগুলো যেন তিনটা চাঁদের মতো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে দক্ষিণা বাতাস ঝিরিঝিরি করে বইছে। অনেকদিন পর জীবনটাকে তার অন্যরকম মনে হচ্ছে। ছেলে তার যে কয়েকদিনই থাকুক না কেন সবাইকে যেন বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে থাকে।

 

লেখক: শিক্ষক ও লেখক, লালমনিরহাট।

263 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:২০ অপরাহ্ণ

নাল পিরান

বৈশাখের শেষের কয়দিন। কিশোরীর মনের মতো আকাশের রূপ।ইচ্ছে হলেই বরিষণ আবার দিনের বেলায় আলোর মারাত্বক ঝলকানি।সন্ধার পরই প্রায়শ শুরু হয় বজ্রপাত, দমকা বাতাস,ঝড়,বৃষ্টি যেন নৈমিত্তিক ভীতিকর রজনী।গত কয়েক দিনের ঝড়ের তাণ্ডবে উপড়ে পড়ে গাছপালা, ভেঙে যায় কাঁচা বাড়ি, লণ্ডভণ্ড হয় বিদ্যুৎ সংযোগ। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পর বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া জাওরানী গ্রামের মানুষ সামান্য বৃষ্টি হলে অন্ধকারেই থাকে।বৃষ্টির সাথে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলার সাথে মানিয়ে নিয়েছে ভুক্তভোগীরা। কর্তৃপক্ষের প্রতি আঙুল তোলা দূরের থাক টু শব্দও করে না।দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপদাহ আর রাতে ঠাণ্ডা এমন বিরূপ আবহাওয়ার সাথে পরিচিত নয় এখানকার সাধারণ মানুষ।

এ গ্রামের উত্তর পূর্বে বড়দল বিল।বিল দিয়ে বর্ষার পানি  গড়িয়ে প্রতিবেশি দেশ ভারতে ঠাঁই নেয়।বিলে রকমারি জলজ প্রাণী বাস করে।প্রতিদিনের মতো রাখী ও রাহী বিকেলে হাঁসের ছানা ঘরে আনার জন্য বিলের ধারে গিয়ে পানকৌড়ির মাছ শিকার ও জলকেলি দেখে ভুলে যায় বাড়ি ফেরার কথা।আকাশ মেঘলা হলেও সেদিকে লক্ষ্য থাকে না তাদের। মা রহিমা ডাকতে ডাকতে নাকাল হয়ে অবশেষে বিলের কাছ থেকে আদরের সন্তানকে নিয়ে এসে স্বস্থি পায়।রাখী  পঞ্চম ও রাহী তৃতীয় শ্রেণিতে পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। মা গৃহিণী বাবা প্রান্তিক কৃষক।

বাবা রহিম সন্ধার পূর্বে বাড়ি ফিরেই নিয়ম করে দুকন্যার মুখ দেখে শান্তি পায়।আজ স্বভাবজাত হাসি দিয়ে রাহীর হাতে চকলেট আর রাখীর হাতে লাল কাঁচের চুরি তুলে দেয়।রহিমার হাতে দেয় বাজারের ব্যাগ আর পলিথিনের প্যাকে ইফতারি আর কাগজে মোড়ানো পানেরখিলি।দু’ বোন খুশি মনে হাসতে হাসতে পড়ার টেবিলে চলে যায়।পড়ার ফাঁকে দু’ বোনের খুনসুটি,গল্প, এবং আগামি ইদে বাবার কাছে বায়না  ঠিক করে।এবার তারা  একই রকম লাল জামা ও নুপূর  নিয়েই ছাড়বে। রাখী রাহীকে বলে-

আহী, এবার রিদোত বাবার কান্ঠ্যাত নাল পিরান আর নূপুর নেঈম কিন্তু।দু’ জনে এক্টে হয়া বায়না ধরমো।আর তুই বায়নাটা আগোত ধরবু।বাবা তোক বেশি ভাল্বাসে।ফম থুইস বইনো?
-ঠিকি ফম থাইকপে বুবু।

মাইকে এশার আযান হয়ে গেল।বাবা- মা দু’ জনেই রোযা ছিল বলে রাতের খাবার নামাযের আগেই সেরে ফেলতে চায়।রহিম দম্পতির দু’ কন্যা দুনয়নের মতো প্রিয়। তাদের স্বপ্ন কন্যাদ্বয় ঘিরে। তারা রান্নাঘরে কাঁচা মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে এক সাথে খাওয়া করে। যথারীতি কন্যাদ্বয়কে নিয়ে বাবা-মা মাদুরে বসলেন। রাহী বাবার কোলে বসে গলা ধরে বলতে থাকে-
– বাবা, ওযা বেড়াইলে রিদ। এইবার হামাগুলাক একে মতোন নাল পিরান আর নূপুর গড়ে দিবার নাগবে।হামা রিদের দিন পরি বেড়ামো। বাবা বলে-
– মা রে মোর তো কস্টে কোন মতোন দিন চলে।তোমা গুলার মুখের ভিতি চ্যায়া বায়নাকোনা পুরন করিম, মাওও। দুই দোন জমির ধান পাকি গেইছে।ধান কাটি বাজারোত বেচে কিনি আনমো।তোমার গুলা চিন্তা না করেন,মাও,ভাল্ করি পড়া পড়েন।

রহিম -রহিমা কর্মঠ দম্পতি। রহিমা  ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েই পাঠ চুকে যায়।তাকে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। সে রান্নার কাজ করেও হাঁস- মুরগী পালন এমনকি ফাঁকা যায়গায় সবজি চাষ করে।নিজের চাহিদা পুরণ করেও বাজারে মাঝেমধ্যে বিক্রি করতে পারে।তবে বিলের ধারে থাকলেও মাছ ধরার সুযোগ নেই।কারণ বিল এখন উন্মুক্ত নয়, বিলের মালিকরা ইজারা দিয়ে থাকে।চোখর সামনে মাছের খেলা দেখলেও উদরপুর্তি করার কোন সুযোগ নেই।যদ্বরুন দু’ কন্যার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে  বাবা- মা কে হিমশিম খেতে হয়।

পুরোদিন পরিশ্রম ও কাজের ক্লান্তি শেষে সন্ধার পর স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে খোশগল্প,সাংসারিক পরামর্শ,ভালোলাগা,ভালোবাসা ভাগাভাগি হয়।রহিমা স্বামীকে বলে-
– আখির বাপ,ছাওয়াগুলা তরতর করি বড় হবার নাকছে।দুই বইনে কাজে কামে মোক মেল্লা সাহায্য করে।সকাল সইন্ধাত পড়ির বইসে।ছাওয়া দুইকনা খিব ভাল্।আরেকখান কতা,সামনের রিদোত তোমা মোক কি দিমেন?
রহিমা স্বামীর কাছে বায়না ধরতে ধরতে তার পছন্দের পান -জর্দা   মুখে পুরে দেয়।স্বামী- স্ত্রীর মুচকি হাসিতে ঘরটাই আলোকিত হয়ে পরে।রহিম অভ্যাস বশত রহিমাকে আলতো করে কাছে টানতে চাইলে সরে গিয়ে বলে-
– তোমার স্বভাব ভাল্ হইল না।এ্যালা ছাওয়া পাওয়া বড় হইছে, অমতোন না করেন তো।এ্যকনা ভাল্ হন।আচ্ছা,তোমাক যা কইনে শুনির পাইছেন কি?
– কি?
– রিদোত মোক কি কিনি দিমেন?
– শোনেক বউ,ভাল্ করে জানিস মোর হাউস থাকলেও টাকা পাইসা তেমন নাই।মন তো চায় ম্যল্লা কিছু কিনি দিবার।দেখিস না পাশের বাড়ির পুলিশের বউ দেখতে তোর মতো সুন্দরীও নোমায় ওই ভাবি নয়া দামী শাড়ি আর গয়না পিন্দিয়া কেমন করি ঘুরি বেড়ায়। মোরও তো মন চায়।

– ওরে মোর ওইল্যা কতা থোন তো।তোমা মোক ভালবাসেন তাতেই মোর চইলবে।মোর কিছু নাগবে না। ঐ ভাবি ভাল্ শাড়ি গয়না পিন্দিলে কি হইবে উমার দিনাং কাজিয়া।শুনছুং আইতোত বেগল থাকে,ছাওয়া পাওয়াও নাই।
– মাইনসের ভিতি দেখার হামার টাইম নাই। হামাক দিছে আল্লায় দুইকোনা মাই ছাওয়া মুই বাচি থাকতে মানুষ করিম।হামার সময় বাড়ির কাইন্ঠাত ইশকুল কলেজ না আছলো।হামা খেলা খেলাছি আর ঘুরি বেড়াছি।বাপ মাও হাল চাষোত নাগে দিছে।এ্যালা থিত পাছুং না পড়ি কি বিপদ।পদে পদে ঠগা নাগে।আর শোনেক,ঐ যে মদাতি ইউনিয়ন কাউন্সিলের কাদের চেয়ারম্যনের বেটি দুইকোনা, শুনছুং মেল্লা বড় অপিছার।কিসের বলে ম্যজিস্টেট।মুইও বাচি থাকলে বেটি দুইকনাক মানুষের মতো মানুষ করিম।
– তোমার যত স্বপন।হামা গরীব মানুষ।হামার বেটি কি ওমার মতো হইবে?
– ক্যা না হইবে? মুই চেস্টা করিম।সরকার তো টাকা পাইসা দেয়, সমইস্যা কী?
-আরেকখান কতা, সামনের সেমাই খাওয়া রিদোত মুই সেমাই কিনিম না। হামার সিয়ামের বাপ কলেজের মাস্টার ওমরা কইছে সেমাইয়োত ভেজাল বেড়াইছে।ফমে নাই আরো মেল্লা কিছোত ভেজালের কতা কইছে।মুই তো নেকাপড়া জানংনা কোনটা ভেজাল আর কোনটা ভাল্ বুজির পাইম না।ছাওয়া গুলার ভবিষ্যতের ভিতি চ্যায়া ওইল্যা  সেমাই আনমো না টাকাও নস্ট করমোনা। বাড়িত হাতের সেমাই গড়ে থুইস, বউ।
– তোমা চিন্তা না করেন।মোর মাও আলো চাইল দিয়া পাঠাইছে।উরুন- গাইনোত আটা কুটি হানে সেমাই আর পিঠা বানে থুইম।-
– ম্যল্লা কতা কইনেন।এ্যলা ছাওয়া গুলাক নিয়া খেয়া শুতি পরি নিন যাই,,,

সন্তানদের ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে রহিম- রহিমা।সব পরিশ্রমের ক্লান্তি দূরীভূত হয় দু’ কন্যার চাঁদবদন দেখে। ওদের স্কুল যাবার বেলায় নিজ হাতে সাজিয়ে দেয় এবং  টিফিনটা সাথে দিতেও ভুলে না রহিমা।যাবার বেলায় যতক্ষণ দেখা যায় পথপানে তাকিয়ে থাকে।আবার ফেরার সময় হলে অপেক্ষার প্রহর গুণে।

রাখী -রাহীর ইদের আব্দারের কথা ভুলে যায় নি স্নেহময়ী পিতা।নিত্য ধানক্ষেতে যাওয়া আসা করে আর ভাবে কবে সোনালি বরণ ধারন করবে।এই সোনালি ধানের সাথে প্রিয় সন্তানের আব্দার পুরণ যেন একাকার হয়ে মিশে আছে।ধানী জমির চারিদিকে পায়-চারি করে আর বিড়বিড় করে বলতে থাকে তার মনোবাসনার কথা।মনে হয় ধানক্ষেত তৃতীয় সন্তানের মতো পরম মমতায় ঘিরে রেখেছে রহিম দম্পতিকে।

ধীরে ধীরে ধানের সোনালি আভা চলে আসে।খুশিতে পুলকিত হয় রহিম।বাড়িতে ধান পাকার গল্প করে রহিমার  কাছে। রহিমা স্বামীকে দরদমাখা কণ্ঠে বলে-

– আখির বাপ,বোশেক মাসের দেয়ার ঠিক ঠিকানা নাই।কখন যে তুফান আর ঝড়ি আইসে।তোমা ২/৩ জন লোক নিয়া ধান কোনা কাটি ফেলান।আর ধনতলা পুলের কাইন্ঠাত পাকা আস্তাত তুলেন।মেশিনোত ডাংগেয়া ওটেই শুকির দিমো।
– শোনেক বউ,আরেকনা ভাল করি পাকুক।অংকোনা ভাল্ হইলে বাজারোত বেচাইতে সুবিদা হইবে।শুনবার নাকচং  এবারে ধানের দাম খুপ কম।
–  মুই আর কি কং।তোমরা যা ভাল্ বোজেন,,,,,।

সন্ধা ঘনিয়ে আসতেই উত্তর আকাশর ঘনকাল মেঘের আনাগোনা।মেঘ আকাশের গায়ে নয় ঠিক যেন রহিম- রহিমার গায়ে।ঝোড়ো হাওয়া মেঘমালা তাদের স্বপ্নের সলিল সমাধী দিতে আসবে।এমনিতে ধানক্ষেত নিচু জমিতে হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে তলিয়ে যাবে।তাদের চিন্তার অন্ত নাই।

কিছুক্ষণেরর মধ্যেই ভারী বর্ষণ আর ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল।প্রতিটি বিজলি চমক যেন রহিম রহিমার বুকে সেলের মতো বিঁধতে লাগল।রাখী ও রাহীকে বুকে জড়িয়ে ঘুম পারালেও তাদের দু’ জনের নির্ঘুম রাত যেন স্বপ্ন হত্যার নিরব স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হল।সেহরীর সময় বাইরের ঝড় থামলেও রহিম- রহিমার ঝড় কবে থামবে উপরওয়লাই জানেন।

ভোরের আলো ফুটতেই দু’ জনেই ছুটে চলে সন্তানসম লালন করা ধানক্ষেতে।ক্ষেতের কিনারে দাঁড়িয়ে দেখে ধানক্ষেতের কোন আলামত নেই যেন থৈ থৈ জলে ভড়া নদী।।ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা কারো মুখে টু শব্দও নেই,শুধুই দীর্ঘশ্বাস! রাখী ও রাহী হাঁসের ছানা নিয়ে ভাবলেশহীন পিতা- মাতার মুখপানে তাকিয়ে। অমন করুণ মুখ তারা কোন দিন দেখে নি।হাঁসের ছানা বৃষ্টির জলে যতটা আনন্দে নাচতে থাকে অপরদিকে ততটা নিরানন্দ তারা।অনেকক্ষণ চুপ থেকে রহিম বলতে থাকে-

– হায়রে মেঘের পানি! মোর ছাওয়ার রিদের নাল পিরান আর নুপূর ভাসে নিলু? মুই ক্যংকরি ছাওয়া দুইকনার বায়না পুরণ করিম।সরকার তো মেল্লা উন্নয়ন করিল।মোক কি কিছু দিবে?

 

লেখক:
সহকারী অধ্যাপক
দইখাওয়া আদর্শ কলেজ
হাতীবান্ধা, লালমনিরহাট।

239 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১২:১৬ অপরাহ্ণ

ময়নার বাপ

-আইজ ভেষণ জার নাগোছে বউ!

— বিয়ান বিয়ান তোমার আরও যা কতা, শেতেরদেনোত জার নাগবে নাতো কী গরম নাগবে?

-ধুর…ও, তোক্ কোনো কতা কওয়ায় যায় না। একান কতা কইলে খালি ঠাসঠাস করি আরেকটা ওত্তর দেইস।

— হয়…। তা মোর সাথোত কতা না কইলেই পারেন। মোর মোখোত কোনো মধু নাই। আছেন তো সোখোত কী বোজমেন। সেই সক্কালে উঠি কাম করতোছি, ঠাণ্ডাত হাতপাও বরপ হওয়া গেইছি, মুই এলা কাক্ কও? হইচে, এলা ওটো…। উঠি মোক এনা উদ্ধার করো।

মাও ময়না…. কোনটে গেইনেন মাও, এদি মোর কাছোত এনা এস্কা মোছা কপড়াখান ধরি আইসোতো মাও, মেলা বেলা হয়া গেইছি টপকরি শহরোত এস্কা ধরি কামাইত যাওয়া নাগবে, আইজ বুঝি আর স্কুলের ভড়া ধরির পাইম না, মেলা নেট হয়া গেইছি আইজ।

-বাজান অংপুর গেইলে মোর বোদে একান ফাইভের নয়া বাংলা ব্যাকরণ বই আর যে জার পইরচে তার বাদে একান মোর জামপাটও ধরি আইসেন তো।

— ক্যানে মাও সেদিনে না বই আনি দিনু?

– ছার কইছে এলা বোলে ওটা বই আর চইলবার নোয়ায়, নয়া নয়া কী কী বলে দেছে নয়া বইয়োত।

— কায় জানে বা… কী যে নয়া নয়া ভেজাল হয়ছে! ঠিক আছে মাও আনিম এলা।

-ময়নার বাপ বেটিক ধরি কী আও করেনছেন এতকন হাতে?

— তুই থামলু এলা। এই বেটিছওয়ার জবানোত কোনোই অসকষ নাই, সোগসময় খালি খাসাউ খাসাউ…।

-হয়… মুই কতা কইলে তো, তোমার খালি আগ চরি যায়! বেটিক অতো পড়ানেকা করায়া কী কইরমেন শোনো? সেই তো ব্যাচে খাওয়ায় নাইগবে। মাইনসির বাড়িত যায়া কাম করি খাওয়ায় নাইগবে।

— তুই চুপ হলু ময়নার মাও! (শালির বেটিছওয়া)।

— মাও… তাইলে থাকেন, মুই আসনু। মন দিয়া পড়া পড়েন, তোমার মাকো এনা কাজোত আগেটাগে দ্যান। বাইরোত কিন্তু এক্কেবারে বেড়াইমেন না, সাবধানে থাকেন মাও!

-আইচ্ছা বাজান। বই আনির কতা ভোলেন না ফির।

— ঠিক আছে মাও, ভুলিম না, আনিম… আনিম।

 

লেখক: কবি, রংপুর।

252 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সাত সতেরো

অ শম্পার বাপ। নিন্দাইচেন নাকি বাহে ।

নোয়ায়। কি কবার চাইস।

থ্যাইক এলা কবার নঁও।

আউ এত আইতত উটি কোন্টে যাইস।

এই এলায় আসম্।

ঘরত্ এ্যাকনাও নিদ আসিচ্ছল না। কি করম। ক্যাংকা করি এই দরিয়া সাঁতরাইম। কুল কিনারা খুঁজি পাং না বাহে। আগিনা খুলিত এ্যানা ঘোরাফেরা করং। মনটা হালকা হবার বাদে যায়া শুতিম আলা।

আউ আউ দেকচেন বাহে চরাই গোরার দুয়ারের হুরক্যা ক্যাঁও দেয় নাই। এইটা কতা হইল। মুই না দেখলে কিচু হবার নয়। এ্যানা ইতি উতি হইলে হয়, সউগ এক্কেরে ভাসি যাইবে। একে তো শরীল পারে না তার উপরোত মাইয়াক নিয়া এ্যাংক্য অবস্তা আর পাঁরো না।

উদিনক্যা মাসদের বাপ ঘটোকক্ কনু তোমরা যদিক্যাল এইং করেন , হামরা আউগাইম ক্যাংকা করি । হামাক এ্যানা চিন্তা ভাবনার সময় দিবার নন বাহে।

বেটিটা মোর কলেজ পাশ করিল। আরো পড়িবার বাদে  ক্যাচাল করোচ্ছল। হামরা গেরামের মানুষ আরকতো উপরোত যাঁও। তাতে মোর মনটা কয় বেশি দূর গেইলে অন্যটা যদিক্যাল হয়।  মাইয়ার মুখোত চৌপরদিন আইত, ভাসান ভাসান কতা উগলে উগলে পরে। ভয়োতে মুই এ্যক্কেরে সিটকি যাঁও।

শম্পা মোর একেনাই বেটি  , দেখতে শুনতেও অপছন্দের নোয়ায় । কিন্তুক ভাবনার কথা হইল ঘটক আনচে চ্যযারম্যনের ব্যটার সম্বন্ধ । আক্কেলখ্যান দ্যাখো দেখি । অমার ব্যাটা বোলে হামার বেটির তাকি নেকাপড়াত কম । তা এক্কেরে যে কম বাহে । খালিবোলে স্বাক্ষর  দিবার পারে ।  হামার ভাবনার বিষয় হইল এটি । বাড়ি ঘর সমন্ধ সউগ ঠিক আছে । এটি আসি থামি গেঁইচু ।

পাড়াপরশি কয়ছোল শম্মার বোলে বিযার বয়স পার হইচে। এলা কি করং। তারবাদে কি  বেটির থাকি কম পড়াজানা ছোয়ালোক জামাই করিম । বাপের টাকা পইসা জমি জিড়াত আবাদ সুবাদ তামান হামার থাকি ম্যালা বেশি। ছইলের মোর কোন অভাব হবার নোয়ায় ।

মোর কতা হইল বাপের আছে তাত কি । বাপের ধুইয়া সারা জেবন চইলবে  । বাপের নামে গগন ফাটাইলে হইবে। নিজে কি তাক দাখার ন্যাগবার নোয়ায় । বাপের জমি আছে ,খামার আছে , বাপে এলকার পত্তন দিছে , বপোক সগলায় চেনে — হামার এলকার রাজা , ভালো কতা কিন্তুক তার বেটাক যখন জামাই করিম মাইনষে পুচলে কি কইম । না পড়া না সম্পদ । এগলা চিন্তা ভাবনাত ফমও থাকেনা ।

অ পারুল পারুল ঘুমাইচিস মাইও । দিগিবাতাত টাপোত শুটকির ক’ল্যাখান নামাচিস মা

হু ।

অ শম্পার মাও ব্যাড়ালুতে ব্যাড়ালু । এত আইতোত খুলিত কি কামখান করিস ক’দেখি । আয় তো শোতেক । কাইল মাসদের বাফ  আইসপে হামরা কি কইম শুনবার বাদে ।

তোমরা কি কন ঐ ছইলোক জামাই করা যায় । বাপোক ব্যাচে খাওয়া ছইল।

 

লেখক: সাহিত্যিক ও শিক্ষক, রংপুর।

254 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

উপহার 

খুব- ই হিয়াল ৷ ওশ, ঠাণ্ডা বাতাস ৷ পাঁচ হাত দূরের ঘাটায় দেখা না যায় ৷ সূয্যের মুখ কয়দিনে দেখা যাইবে কাঁয় জানে ৷ অমিজল কেংকা করি গাড়ি ধরি যাইবে এলা  ৷ মমতাক ওমরা রাইতোতে কয়া থুইচে , ‘ সকালে গরম ভাত আন্ধিবু মমতা ৷ খায়া গাড়ি ধরি অমপুর  যাইম ৷ মহাজনের মাল আনা নাইগবে ৷ ‘

ওমাক ফির মানা করাও যাবার নয়  ৷ কতা একবার দিলে হয় , হাকিম নইড়বে আর ওমাক নড়ায় কাঁই ৷ কোনো কূলকিনারা করবার পায় না মমতা ৷ ঘুম থাকি উঠিয়া ওমরা কলের পাড়ত গাঁও ধুয়ায় তো কইবে মমতা হইচে তোর আন্ধাবাড়ি ৷ এই ঠাণ্ডাত সাবান দিয়া ঘষিঘষি মজিমজি গাঁও ধুইবে ৷ মোকো কইবে গাঁও গোসল করি আন্ধাবাড়ি চড়াচিস নাকি ছুয়া গায়ে চুলার পাড়ত নটরঘটর করিস  ৷ হুকুমমতো না চললে মুখখান থাকি ভালো কতা বাড়ায়ে না ওমার ৷

বিয়ার পর থাকি ওমার এইদোন ব্যবহার দেখি আইসে মমতা ৷ বিয়া হইচে বছরখানিক হইল ৷ সংসারত অমিজল, ওমার মাও আর ছোটো একনা বইন ৷ খুবে আদর করে বইনকোনাক ৷ কোনো জায়গা থাকি আসি বাড়িত ঢুকলে হয় বইন কোনার জন্যে কিছু ধরি আইসায় চাই ৷ অমিজল উয়াক

অহনা , কোনসমায় ছোট ‘ বু করি ডাকায় ৷

অহনা উয়ার মাও শুদ্ধায় এক ঘরত আর মমতা ,অমিজল আর এক ঘরত ৷ বিয়ার পর পর অমিজল উয়ার ঘরকোনা ডিমডাম করি একনা খাট, আলনা , আয়না নাগা আলমারী বানেয়া কোনোমতে ঘরকোনা সাজাইছে ৷ মনোত ভর্তি আশা ৷ মাথায় ঘনচুলে সিঁথি করা , চ্যাপ্টা শরীরে শ্বশুরের দেওয়া নাল শার্টকোনা অমিজলক খুবেই মানায় ৷ কোনোঠাই যাবার হইলে জামা, প্যান্ট কোনা পিন্দিয়া আয়নার বগলোত যায় আর ঘুরি ঘুরি দ্যাখে ৷ একসময় মমতাক কয় ,

‘ মমতা তুই মোক পায়া খুসি তো ? ‘

‘ তোমার শরম নাই ! ‘তোমরা মোর স্বামী ৷ আল্লাহর দোয়ায় তোমাক নিয়া মুই খুবেই খুসি ৷ আল্লাহ দিলে হামারো বালবাচ্চা হইবে ৷ সংসার বড় হইবে ৷ ‘ আর কবার  পায় না মমতা ৷ শরমে নাল হয়া গেল একেবারে ৷

‘ শরম পালু  মমতা ? -ঠিকই তো কচিস ৷

কয়দিন থাকি তোমাক একটা কতা কবার চাঁও ৷ মনে কিছু করবার নন তো ৷

ঐযে তোমার বলে কিসের বাল্য বন্ধু হেকমত উয়ার আও বোঝেন তোমরা ? উয়ার ভাবভাষা ভালো নোয়ায় ৷ সেদিন মোক কয় ‘  ভাবি , হাঁটো পুকুর পাড় থাকি আসি ৷ ‘

‘ মুই ক্যান সাঁনজোত পুকুর পাড়োত যাও অবিয়া চেংরাটার সাথে ! কিসের বা ঐ গায়োত ট্যাংলে ট্যাংলে কতা কয় ৷ ক্যা এমনি  আও কইরলে মুই বোঝোম তো ৷ ভোটের সমায় ঐ পত্তায় এবেলা ওবেলা ৷ আর কইবে ভাবি, এককাপ চা হইবে ৷ না থাইকলে চা চিনি আনি দ্যাও ৷ ‘

‘ ভাত একটা টিপলে খবর হয় ৷  উয়ার নজর সুবিধার নোয়ায় ৷ ‘

‘ আরে নোয়ায় ৷ ‘ কথাটা উড়ি দিলেও অমিজল আন্দাজ কইরবার পাইছে ৷ হেকমত অমিজলের সংসারের সুখ সবার পায়না ৷ মোকো তো ঘুরি ঘুরি কয় , ‘ মমতাক পায়া  তোর তো দিন ভালোয় যায় ৷ মুই কানা শুকানোত পড়নু রে অমিজল ৷ ‘

‘ শীতের সমায় বউ ভালো ৷ ‘ অমিজল শুনতে শুনতে একবার ধমক দেয় ৷ তোর আর কতা নাই রে হেকমত ৷

হ কামের কতাত আসি , ভোটটা কােনটই দিবু ? চাচী , তোর ভোট জলিল মাষ্টারক দেইস নাকি অন্য কোনো চিন্তা করি থুছিস ? না , না তুই য্যাটে , মুইও স্যাটে ৷ অমিজল জানে হেকমতের সাথে উল্টাপাল্টা কয়া লাভ নাই ৷

গাড়ির শব্দ শুনি বাইর হয় মমতা ৷ ওমরা বুঝি আসিল ৷ আছরের আযান হইলো মসজিদে ৷ গামছা, লুঙ্গিখান আউগি দিয়া কয় ‘ হাতমুখ ভালো করি ধুয়া আসিয়া আগে খাও ৷ ‘ ঠাণ্ডাত আর এবেলায় গাও ধুবার না নাগে ৷ তোমরা যাও মুই খাবার দ্যাও ৷

‘ হইবে এলা ৷ মমতা অনেকক্ষন তোক দেখোনা ৷ আইজক্যা কি বার , কয় তারিখ মনে আছে ? ক্যা কি হইছে ৷ আজকার দিনে তোক মুই বিয়া করি ঘরত তুলছোম ৷ তুই কানা কিছুই মনে থুবার না পাইস ৷ বিয়ার বছরকি জন্য তোর জন্য এই শাড়িটা ‘ উপহার ‘ আনছম ৷ পিন্দি আয়তো দেখম৷ হইবে এ্যালা তো ৷

ভাইয়া মোর ? অহনা দৌড়ে ভাইয়াক পাঞ্জা করি ধরে ৷ মোর জন্যে কি আনছিস ভাইয়া ৷ এইয়ে – সোন্দর ড্রেরেস ৷ পড়ি আয়তো বু ৷

অমিজল কি ব্যাপার রে ? সারাদিন তোর দেখা নাই  ৷ ইতি কত কি ঘটি গেল ৷ অমিজল অবাক – টাস্কি লাগি গেল হেকমতের কথাত ৷ আব্বা – চাচা সবাই যায়া উজানটারির আবুল মন্ডলের বেটি বিউটির সাথে মোর বিয়ার নিশ্যান দিয়া আসিল ৷ সামনের সোমবার বিয়া ৷

কি সুসংবাদ ৷ তুই হামরা আইজ একসাথে এটে খাম ৷ আইজ অমিজল মমতার বিয়ার একবছর হইলো ৷ তাহলে তো মোকো কিছু দিবার নাগে ৷ মুই বাজার যাইম আর আসিম ৷ দৌড়ে বাইর হইলো হেকমত ৷ অমিজল মমতা ওর কাজে তাজ্জব হয়া গেল ৷ নির্মল শান্তির পরশে পরম আলিঙ্গনে মমতাকে বুকে জড়িয়ে আদর করে অমিজল ৷

 

লেখক: সাহিত্যিক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, রংপুর

238 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

ফান্দে পড়ি খুশি

গপ্পটা ম্যালাদিন আগের তকন মুই বিএসসি পড়ো আর পাশাপাশি চাকরির পড়া সাথে পরীক্কাও দেও।

পোত্তেক মাইনষ্যের একটা স্বপ্ন থাকে চাকরি করা, মোরও আছে।

তা কয়টা চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার পর জাইনবার পাননু প্রাইমারি ইশকুলের সহকারি শিক্ষক পদে ভাইভাত মোর রোল আলচে। মুই তো মহা খুশি নেকিতো পরীক্কা ভাল হইচে, ফির নারী আর পোষ্য কোটাও আচে।

মনে মনে একনা ভরসা পাওচু, মনে হওচে চাকরিটা হইবে।

এই খবর মোবাইলোত না দিয়া সরাসরি বাড়ি আসি দিনু। শুনিয়া মোর ছোট ভাই কইল এই চাকরি কইরবার পাবু?

মুই কনু ক্যান না পাইম।

তারপর কওচে প্রাইমারি-র ছইলেরা গ্যাদড়া খুব, পরিস্কার হয়া স্কুল আইসে না তার উপর নাকের স্যাদন। ফির সোন্দর করি কতা কয় না। তুই মুই করি কতা কয়।

তুই তো ফির স্ট্যান্ডার্ড কতা কইস (তখন বাড়ির মধ্যে মুই একমাত্র চলিত ভাষাত কতা কও আঞ্চলিক ভাষা পছন্দ করো না) মুই কনু যে দোয়া করিস চাকরি হইলে সউগ বদলে দেইম, ইন শা আল্লাহ।

কয়দিন পর ভাইভার ডেট চলি আইল। একটা খালাতো বইনোক ধরি ডিসি অফিস গেনু ভাইভা দিবার। ভাইভা বোর্ডত কয়টা প্রশ্ন করার পর মোর পড়ার বিষয় সম্পর্কে জাইনবার চাইল তকন কনু যে মুই ল্যাবরেটরি মেডিসিন (প্যাথলজি) বিষয়ে পড়ো। তখন এক স্যার মজা করি কয়া ফ্যালাল তোমাক চাকরি দেয়া যাবান্যায়, তোমরা এইটে থাইকপার ন্যান। তকন মুই একনা মিচা কতা কনু যে, মোর স্বপ্নের পেশা এইটা। চাকরি হইলে ছাইরবার ন্যাও। আসলে মোর স্বপ্ন আচিল পাইলট হওয়া। যেহেতু সেটা আর হওয়া সম্ভব নোয়ায় সেইজন্যে ভাগ্যের উপর ছাড়ি দিয়া মিছা কতা কনু।

তাছাড়া হামার দ্যাশত একটা সরকারি চাকরি সবায় সোনার হরিণ কইলেও মুই কও হীরা-র হরিণ।

তারপর মোক কইল মুই নাচ গান জানো কি না? মুই কনু স্যার নাচ না জানলেও গান চেষ্টা কইরবার পাও।

কইলো ঠিক আচে কন,

শুরু করনু

যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই……….

এরপর কইল ঠিক আচে তোরা এবার আইসো।

বাইরোত বেরাইতে আর সবায় হুড়মুড়ি পড়িল মোর উপর কি কি ধরাচিল সেইগলা জাইনবার তকনে।

মুই ও কনু কি কি ধরাইছে।

এরপরে মোর খালার বেটির সাথে চলি গেনু পুলিশ লাইন ইশকুল মাঠের ম্যালাত। ম্যালাত য্যায়া জামাকাপড় কিনি হাওয়াই-মিঠাই খাইতে খাইতে বাড়ি আনু।

মাসখানেক পর ফাইনাল রেজাল দেইল মোর এক বড় ভাই ফোন করি কইল মোর চাকরি হয়্যা গেইছে।

উয়ার কতা বেশ্বেস না করি মুই নেজে গেনু কম্পিউটার এর দোকান য্যায়া দেকো সত্যয় মোর চাকরি হইছে।

দোকান থাকি মেস যাবার ধরি খুশির ঠেলায় কোটে যে মোবাইল ফেলাচু আর মনে কইরবার পাওচু না। মন টা একনা খারাপ হইল মোবাইল টা হারেয়া। এলাও বাপ-মাক খুশির খবরটা দিবার পানু না।

মেস-ত য্যায়া রুমমেট এর মোবাইল থাকি খবরটা সবাকে জানানু। কতা কয়া মনে হইল সবার চ্যায়া খুশি মোর বাপ। মোর বাপও একজন ইশকুলের মাষ্টার আছিলো, তাঁর পথ ধরি তার বেটি হাটপে  সেই তকনে মনে হয় খুব খুশি। এরপরে আস্তা ঘাটে  যারে দেকা পাও তায় খালি মিষ্টি খাবার চায় আর কয় মুই চাকরি কইরবার পাইম তো? কায়ো কায়ো কয় এইবার ফান্দোত পলচিস। কয়জনের মোকত এই কতা শুনার পর পুছ করনু এই কতা-র মানে কি?

সবায় কওচে তুই যে পোচপাচ নিয়া বেড়াইস, এই চাকরি তোর জন্যে নোয়ায়। তুই ছাওয়ার ঘরে এদন কাজকারবার সহ্য কইরবার পাবার নেইস। এইগলা কতা আর মোর ভাই এর কতা শুনিয়া মনে হইল মোর কিছু ভাল না নাগলে বদলে ফেলাইম তাছাড়া বয়স তো আচে।

কিচুদিন পর জয়েন করার চিটি পানু, মনটা খারাপ হয়া গেলো চিটি প্যায়া।

বাড়ি থাকি স্কুল ম্যালাদূর। প্রায় ১৯ মাইল বাড়ি থাকি। পরেরদিন গেনু স্কুল দেইকপার। কি আর কইম দুক্কের কতা।

এমনি তো দূর তার উপর ফির আড়াই মাইল ঘাটা কাচা। এখান করি পাও ফেলাওচু আর ধুমার মতোন ধুলা উড়াওচে। আদখান সাদা হয়া স্কুল পৌছিনু। সবায় মোক দেকি মনে করচে মুই সাংবাদিক।যাই হোক কনু যে মুই ও তোমার সহকর্মী হবার যাওচু। সবার সাতে কতা কয়া ভালই নাগিল।

বাড়ি আসিয়া ভাবুচু এই এতদূর ঘাটা মুই ক্যামন করি যাইম নেত্তেদিন?

ভাবতে ভাবতে হঠ্যাৎ একটা সুপ্ত ইচ্চার কতা মনে হইল। ছোটতে ন্যাশনাল টিভিত দেকচিনু ইন্ডিয়ান নাইকাগুলা সাঁ সাঁ করি উড়ি যায় স্কুটার নিয়া। তকন থাকি ইচ্চা একটা চাকরি হইলে এখান স্কুটার কিনিম। তকন মনে হইল স্কুটার ই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান। বাড়িত সবাকে কনু স্কুটার কিনবার চাও। সবায় একমত হইল মোর কতার সাথে।

যেদিন অফিসিয়ালি ইশকুল গেনু পোত্থম দিন। সবায় খুশি। ইশকুলের ছাওয়াগুলা একেরে মোক দেইকপার জন্যে ঠেলাঠেলি শুরু করি দেচে। ওমাক কনু তোমরা ক্লাসত যাও মুই তোমার ক্লাসত যাইম।

একনা পড়ে হেড স্যার আর অন্য স্যারের ঘরে সাতে ক্লাসত গেনু য্যায়া দেকো মোর ভাই এর কতা সত্য, নাক দিয়া স্যাদন বেড়াওচে, স্কুল ড্রেস নাই সবারে, পিরান দেকি মনে হওচে খুবই গরীব।

সউগ ক্লাস দেকিয়া মন টা খারাপ হয়া গ্যাল। বার বার খালি মোর ভাই এর কতা মনে হওচে।

কয়দিন ধরি পরিচয় পর্ব চলার পর মোর খালি মনে হওচে পরিবর্তন দরকার।

একলায় কি পাইম?

খারাপ নাগা বিষয়গুলা নিয়া হেড স্যারের সাতে আলোচনা করনু।

একজন মাষ্টার কয়ায় ফ্যালাইল নয়া আলচেন তো এইজন্যে ত্যাল।

মুইও মুকের উপর কনু এই পেশায় থাকলে এই ত্যাল আজীবন থাকপে ইন শা আল্লাহ। এরপরে যেদিন ক্লাস নেওয়া শুরু করনু দেকো ছইলগুলা মোক ভয় করোচে গায়ের গোরত আইসবার চায় না, কতা বাড়বার চায় না। এর কারণ হিসাবে আবিষ্কার করনু মুই যেভাবে চলিত ভাষাত কতা কওচু ওরা এই ভাষাত অভ্যস্থ নোয়ায়। মুই তো ওমার মতোন আঞ্চলিক কতা কবার পাও না। ভাল নাগে না মোর এই রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা। তাইলে বুদ্দি? ওমার কাছাকাছি আইসবার গেইলে  তো মোক ওমার ভাষাতে কতা কওয়াই নাগবে। পরের ক্লাসত চেষ্টা করনু ওমার মতোন করি কতা কবার।

অনেকটা কবার পাও ওমার মতোন করি। এরপর সবায় মোক খুব পছন্দ করিল। মোর গোরত এই আঞ্চলিক ভাষা প্রিয় হয়া উঠিল।

পোত্থমবার উপলব্ধি করনু  এইটা মোর মায়ের ভাষা, মোর নিজের ভাষা!

এখন কি যে মজা নাগে কইতে!

এরপরে শুরু হইল ওমাক চলিত ভাষা শিখবার। সবাকে বুজানু ইশকুলত সবায় শুদ্ধ করি কতা কমো আর বাইরোত আঞ্চলিক ভাষায় কতা কমো।

কারণ এইটা হামার মায়ের ভাষা। হামার অস্তিত্বের শিকড় গাড়া এই ভাষার সাথে।

এরপরে থাকি কাছের বন্ধু আত্মীয় স্বজন সবারে সাথে মুই আঞ্চলিক ভাষাত কতা কও। আর মনে মনে ধন্যবাদ দেও মোর প্রথম স্টুডেন্ট গুলাক। ওরা নাই হইলে হয়তো বুজনুই না হয় আঞ্চলিক ভাষা কি জিনিস?

এরপরে আস্তে আস্তে মুই ইশকুলত সউগ ছাওয়ারে প্রিয় ম্যাডাম হয়া গেনু।;ওরা এখন নিয়ম মানে, সউগ কতা শোনে, পরিষ্কার হয়া ইশকুল আইসে। যারা কচিল মুই ফান্দে পড়ি কান্দিম এলা তামাক কবার মোনায় মুই এই ফান্দত পড়ি হাসো।

 

লেখক: তরুণ লেখক ও শিক্ষক, রংপুর

248 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

তোরা এ্যালা কোনটে….

হ্যালো…. ফেলানির বাপ, তোরা এ্যালা কোনটে কোনা? বউয়ের ফোন পেয়ে আদর আলী উত্তর দিলো, ক্যানে? মুই তো এ্যালা সিটি বাজারোত ঢুকপ্যার নাকচু।

ফেলানির মা চেঁচিয়ে বলতে লাগলো- সেই কোন সমায় বাড়ি থাকি বাইর হয়া গেইচেন আর এ্যালানি কন সিটি বাজারোত ঢোকেনছোল? তা এতোবেলা ধরি কি করি বেড়াইনেন?তাকে আগোত কন তো মোক? ইতি যে ছাওয়াডার জ্বরে গাওখ্যান পুড়ি যাবার নাকচে-সেডা ফমে আচে?

আদর আলী এবার একটু নরম সুরে বলল-ফমে কেমন না থাকে! এডা একটা কতা কইনেন ফেলানির মাও?দশটা নোহায় পাঁচটা নোহায়-দুনিয়া শুদ্দেয় ফেলানি হামার একনা ছাওয়াল।তার বাদে মোর কি একনাও ময়া নাই?

হইচে, হইচে; আর দরদ দেকপার নাগবের নয়।মুই কি কং সেডা আগোত মোন দিয়া শুনি নেও।ফেলানির মা এবার  ইনিয়ে-বিনিয়ে বললেন।সিটি বাজার থাকি আলু,কবি,শিমে,মূলে,পিঁয়েজ, কাঁচা আকালি নেন।আর পাইলে আদা-পাকা দেকি টমেটো নেন তো। আইসপ্যার সমায় অষুদের দোকানোত সমাচারের কতা কয়া ফেলানির বাদে টেবলেডের বড়ি নিয়ে আইসেন কিন্তুক।

ফেলানির মা যতবারই যত কথা বলুক না কেন আদর আলী স্ত্রীর মুখে নতুন করে সে কথাগুলো আর একবার শুনতে চাইবেই। এটা তার পুরোনো অভ্যেস। তাই সে জিজ্ঞেস করল- কি বা কইনেন ফেলানির মাও? অটো আর এশকার হরেনের শব্দে তোমার  কথাগুল্যা মুই সউগ শুনব্যারে নাই পাং ……।

ক্যানে? মোর কতা তোরা শুনব্যারে রে নাই পান? তাইলে শোনো ফির কং-আলু,কবি,শিমে,মূ্লে,পিঁয়েজ, কাঁচা আকালি আনব্যার কঁচুং। আর, অষুদের দোকানোত সমাচারের কতা কয়া ফেলানির বাদে টেবলেডের বড়ি নিয়ে আইসেন।

ও হো, এ্যালানে মুই তোমার কতা বুজব্যার পানু। তোরা কোনো চিন্তা না করেন।  এই ধরো মুই ঘন্ডাখানেকের ভেতরোত আসপ্যার নাকচোং।

ফেলানির মা বল্লেন,তৎকরি আইসেন।দেরী না করেন।ঠাণ্ডাও খুব বেশি হয়া গেইচে। চাইরো পাকে মাইনসোক যে হারে করুনায় ধরোচে।মুখ থাকি মাকস খুলব্যারে নন।কারো গার সাতে গাও নাগান না।অটোত চড়েন না।উয়াতে মাইনসে দেকচুং মাকস পড়ে না।হাটিয়াও না আইসেন। পাচে ভাংগা ডেরেনোত পড়বেন। টেহা নাগে নাগুক তোরা ইসকা নিয়্যা বাড়িত আইসেন। তোরা মোটে দেরী না করেন ফেলানির বাপ…..।  সাবধানে আইসেন। মুঁই এ্যালা মোবাইল থুনু কিন্তু ! মোর ম্যালা কাম পড়ি আচে।

রসিক আদর আলী  বললেন, আই লাভ ইউ ফেলানির মা…….মুঁই এ্যালায় আইসোচোং ………..।

 

লেখক: ছড়াকার, রংপুর।

264 Views

মুগ্ধতা.কম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ভাতের জন্য

– মা ভাত দে।

– ভাত নাইযে বাবা। বাড়িত বসি থাকি কি খাবার আসপে বাবা। আল্লাহ আল্লাহ কর। আইতোত বলে ত্রাণ দেবে। তারপর খাইস।

– মা এলা তো ঝড় বৃষ্টি নাই ত্রাণ কেনে দেবে?

– বাবারে দেশোত মহামারি নাগছে, ভাইরাস বেরাইছে। সবার কাম কাজ বন্ধ, কী খাইবে মানুষ? তারবাদে সরকার থাকি ঘরে ঘরে খাবার দেওছে বাবা। দেখিস না মুইও তো মেলা দিন হতে কামোত যাও না। মোক আম্মা কামোত যাবার মানা করছে।

-মা এই মহামারি কোনদিন শেষ হইবে? আব্বাও তো বাড়িত আইসে না কেমন আছে খবরো তো নেন না? আইজ আব্বার খোঁজ নেন তো।

– আচ্ছা বাবা ফোন দিম এলা।

সন্ধা গড়িয়ে রাত্রি হতে লাগলো। নিলুফা ত্রাণ নেয়ার জন্য  বাসা হতে  ছেলেকে আদর করে বের হলো পথিমধ্যে একজনের মোবাইল হতে স্বামী সুরুজ মিয়ার সাথে শেষ কথাটা বলে নিল নিলুফা।

আবার এগুতে লাগলো স্কুলের দিকে ত্রাণ নিতে। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করে দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত খাবার বস্তা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, হাজারো মানুষের  প্রচণ্ড ভিড়ে নিলুফা অন্যের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে পৃথিবী হতে চলে যান। কেউ জানে না কে এই নিলুফা  কী বা তার পরিচয়। সবাই চলে যাওয়ার পরে স্হানীয় মেম্বার কিছু লোক ডাকিয়ে তাকে সনাক্ত করে তার বাসায় নিয়ে আসে।

হাবাগোবা ছেলে মায়ের লাশ দেখে পাগলের মতো কান্না করে  আর চিৎকার করে

মা মাগো কি হইছে তোর।

কথা কও মা

মোক যে খু্ব ভোক নাগছে। কায় দেবে মোক ভাত। মা তুই মোক ছারি গেলু কেন

তার কান্নায় ভেঙে পরে পাশের বাড়ির আলেয়া, ফুলবানুরা তারাও মেনে নিতে পারছে না এই মৃত্যু। সন্ধায় যে মানুষটি ছিল তাদের সাথে এখন সে ওপারের বাসিন্দা।

 

লেখক: লেখক ও সংগঠক, রংপুর।

233 Views