মুক্তিযুদ্ধ Archives - মুগ্ধতা.কম

মুক্তিযুদ্ধ Archives - মুগ্ধতা.কম

রানা মাসুদ

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:৩০ অপরাহ্ণ

মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুর

মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের রয়েছে বিশেষ বীরত্বপূর্ণ গৌরবগাথা। মুক্তিযুদ্ধে রংপুর এবং রংপুরের  মানুষ এক বিস্তৃত ইতিহাস। ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল অধ্যায়। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের গৌরবগাথা সংকলিত করা দুঃসাধ্য। তবুও সম্পাদনা পরিষদ এর কলেবরের সীমাবদ্ধতার কারণে সংক্ষিপ্তকরণ করা হচ্ছে। ফলে অনেক ঘটনা বিস্তারিত চিত্র, চরিত্র তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না বলে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

এক অর্থে এভাবে বললে ভুল হবে না যে রংপুরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পূর্বেই। আবার একথাকে এভাবেও বলা যায় যে, মহান স্বাধীনতার আন্দোলন সংগ্রামের গর্বিত সূচনার এক অংশের ইতিহাস রংপুর।

পহেলা মার্চ ইয়াহিয়ার ভাষণে যখন ১৯৭১ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য গণপরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয় তখন সারাদেশে শুরু হয় বাঙালির প্রতিবাদ। বিক্ষুব্ধ মানুষ নেমে আসে রাজপথে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মার্চ ঢাকায় এবং মার্চ সারা পূর্ব পাকিস্তানের হরতাল আহŸান করেন। এবং পরবর্তী ঘোষণা মার্চ,১৯৭১ রেসকোর্সের মাঠের দেবেন বলে জানিয়ে দিলেন()

মার্চ হরতালের পক্ষে রংপুর শহরের কাচারি বাজার থেকে ছাত্রজনতার একটি মিছিল বের করা হয় যা পরবর্তীতে বিশাল রূপ লাভ করে। গগনবিদারী শ্লোগানে মিছিলটি শহর অতিক্রম করে আলমনগর এলাকায় গেলে মিছিলের মধ্যভাগে গুলির শব্দ শোনা যায়। দেখা যায় ১২ বছর বয়সী এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন। তিনি হলেন শংকু সমজদার। সেসময় মকবুল নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। অবাঙালিদের নেতা সরফরাজের বাড়ি থেকে মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়। শংকুর মৃত্যুর খবরে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। সারা শহর তখন বিক্ষুব্ধ, ইতোমধ্যে শহরে অবাঙালিদের হাতে আরো দুজন প্রাণ হারায়। তারা হলেন রংপুর কলেজের ছাত্র আবুল কালাম আজাদ সরকারি চাকুরে ওমর আলী। শরিফুল আলম মকবুল মোহাম্মদ আলী নামের দুজন ছাত্র আহত হন।()

কিশোর শংকুর দেহ থেকে নিঃসৃত রক্ত রংপুরের মাটিতে স্বাধীনতার অঙ্কুর, মুক্তি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ অনিবার্য করে তুলেছিল।’()

মার্চের রংপুরে গণঅভ্যুত্থানের সাহসী চেতনায় তৎকালীন বৃহত্তর জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় সংগ্রামের মূল ¯্রােতধারার সাথে ১৯৭১ এর মার্চ  শহিদ শংকু, ওমর আলী, আজাদ এবং মকবুলের রক্ত মিশে যায়।’()

মার্চ রংপুরের মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রথম প্রতিরোধ আরম্ভ করে। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের রংপুরের প্রথম শহিদ শংকু সমজদার (১২) প্রথম প্রাণদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় রংপুরের মুক্তিযুদ্ধ।() মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে কথা উঠে এসেছে।

১৭ মার্চ রংপুরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহŸায়ক রফিকুল ইসলাম গোলাপ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রেরিত স্বাধীন বাংলার পতাকা নমুনাসহ স্বাধীনতার ইশতেহার গ্রহণ করেন। ২৩ মার্চ রফিকুল ইসলাম গোলাপ ডিসির বাসভবনে এবং ইলিয়াস আহমেদ ডিসি অফিসে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। একই দিনে শহরের নবাবগঞ্জ বাজারের স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন ন্যাপ (ভাসানী) নেতা মাহফুজ আলী (জররেজ) () রংপুরে পতাকা উত্তোলন নিয়ে আরও ঘটনা আছে। শহিদ রণী রহমানসহ আরও কয়েকজন তৎকালীন রংপুর প্রেসক্লাব ভবনে (বর্তমান পায়রা চত্বর) স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করার কারণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হুলিয়ার শিকার হয়ে রংপুর থেকে আত্মগোপনে যান এবং রণী রহমান কুষ্টিয়ায় নিহত হন। অন্যদিকে মার্চ শহরে মিছিলের সময় অথবা আগে কোনো একটা সময়ে শেখ শাহী নামক তৎকালীন এক ছাত্রনেতা রংপুর প্রেসক্লাবের ছাদে উঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান। তবে দুটি ঘটনা কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে নয়।()

বঙ্গবন্ধুর মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর দেশের অন্যান্য স্থানের মতোই রংপুরের সব জায়গায় সংগ্রাম কমিটি গড়ে উঠতে থাকে। শুরু হয় পাড়ায়পাড়ায় গ্রামে গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। রংপুরে শুরু হয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন।

২৬ মার্চ শুক্রবার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে রংপুর জেলার মানুষ জঙ্গী প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ আওয়ামীলীগ নেতারা রংপুর জেলার প্রত্যেক থানায় প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।’()

রংপুর শহরের বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকে আলোচনার কথা বলে ক্যান্টনমেন্টে ডেকে নেওয়া হয়। যারা ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলেন তারা হলেন অ্যাডভোকেট নুরুল হক এম এন , অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান এম এন , সোলাইমান Ð এম এন সহ আরো কয়েকজন। পরবর্তীতে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়।()

২৭ মার্চ সকাল ১১ টায় মুন্সিপাড়ার বাসা থেকে হানাদার মিলিটারিরা মাহফুজ আলী জররেজ মিয়াকে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ধরে নিয়ে যায়।’(১০)

২৮ মার্চ রোববার, ১৯৭১। রংপুর তথা দেশের ইতিহাসে ঘটল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। সেদিন রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রে পরিপূর্ণ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখল করার অভিযানে ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে এগিয়ে যেতে থাকে। সেদিন পাকিস্তানি জল্লাদদের নির্বিচার গুলিতে অসংখ্য নিরীহ বাঙালি শহিদ হন। বীর রংপুরবাসীর বীরত্বের শোকের স্মৃতি বহন করছে শহরের অদূরে নিশবেতগঞ্জ এলাকা। এর আগে ২৩ মার্চ আব্বাসী নামের এক অবাঙালি সেনা অফিসার নিশবেতগঞ্জ এলাকায় জনতার হামলার শিকার হয়ে আহত এবং পরদিন মারা যান। সেনাবাহিনীর প্রতি ক্রোধ ছিল মূলত দেশ স্বাধীনের প্রত্যয়ে। ২৮ মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ বা ঘেরাও অভিযানে আপামর ছাত্রজনতা, রাজনৈতিক বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি উপজাতি সাঁওতাল ওঁরাও ¤প্রদায়ের বীর নারী পুরুষরা অংশ নিয়েছিলেন। তাদের সকলের বীরত্বগাথা আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।(১১)

এপ্রিল বৃহস্পতিবার কাউনিয়ার তিস্তা সেতুতে পাকিস্তানি সেনা বহনকারী একটি ট্রেনে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালায়। তুমুল সে সংঘর্ষে পাকিস্তানি মেজর এজাজ কাউনিয়া থানার ওসিসহ পাকিস্তানপন্থী ১৫ জন সেপাই নিহত হয়। অবশিষ্ট পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়। এই অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এটাই ছিল প্রথম দিককার সম্মুখযুদ্ধ। যুদ্ধে বাঙালিরা তথা রংপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে। যুদ্ধে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন আহমদের বাহিনীর সাথে তিস্তা বাজারের অ্যাপোলো ক্লাবের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।(১২)

পরদিন দুই দফায় সংঘর্ষের পর ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী তিস্তা রেল সেতুর দখল নিতে ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিকামী দুইজন ইপিআর সদস্য শহিদ এবং বেশকিছু পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।’(১৩)

এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মর্মান্তিক ঘটনার রাত। সেদিন ছিল শনিবার, মধ্যরাতে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী রংপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় মানুষ মাহফুজ আলী জররেজসহ ১১ জন বন্দি বাঙালিকে শহরের মাহিগঞ্জ রোডের শ্মশানে নিয়ে গিয়ে গুলি করে ১০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে গুলিবিদ্ধ তাজহাটের দীনেশ ভৌমিক (মন্টু ডাক্তার) প্রাণে বেঁচে যান।’(১৪) ঘটনার পর মূলত রংপুরের মানুষ পরিষ্কার বুঝতে পারেন পাকিস্তানি  হায়েনাদের নাগালে থাকা নিরাপদ নয়। একটা বড় সংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় যেতে শুরু করেন। ভারত সরকারের সহায়তায় গড়ে ওঠে শরণার্থী শিবির। চালু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ শিবির।মার্চের প্রথম থেকেই রংপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন একদল মুক্তিকামী মানুষ। এই দলে গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, নাট্যশিল্পী, সাংবাদিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক মানুষ সংগঠন যুক্ত ছিল।’(১৫)

সম্ভবত ১২ এপ্রিলের মধ্যেই তিস্তা ব্রিজের দখল পাকিস্তানিদের হাতে চলে যায়। এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বদরগঞ্জে বাঙালি ইপিআর বাহিনীর ডিফেন্সের উপর আক্রমণ করে। সকাল টা থেকে বিকেল টা পর্যন্ত চলে। হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা (ইপিআর) পিছু হটতে থাকেন। ১৫ ট্রাক পাকিস্তানি সৈন্য রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে গিয়ে এই হামলা চালায়।’(১৬) ‘১২ এপ্রিল৭১ তিন ট্রাকভর্তি চোখ মুখ, হাত বাঁধা মানুষকে ধরে এনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকার দক্ষিণ চন্দনপাট ইউনিয়নের বালারখাইল নামক স্থানে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করে।’(১৭)

১৫ এপ্রিল পীরগঞ্জের আংরার ব্রিজের উত্তর পাশের সংযোগ কেটে দেয় মুক্তিযোদ্ধারা। পরদিন ১৬ এপ্রিল বিকেল টায় রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকাগামী ৭টি গাড়ির একটি বহর সেখানে আটকা পড়লে ওঁত পেতে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালায়। সন্ধ্যা টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মুখোমুখি সংঘর্ষ চলে। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি জিপ গাড়ি পুড়ে যায় এবং অগণিত সেনা মারা যায় বলে ধারণা করা হয়। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে হানাদার বাহিনীর একটি সাঁজোয়া বহর এসে আহত নিহতদের নিয়ে রংপুর ফিরে যায়। পরদিন ১৭ এপ্রিল সকাল ৭টায় পাকিস্তানিরা উক্ত এলাকা ঘিরে ফেলে। চলে বৃষ্টির মতো গুলি। মুক্তিযোদ্ধারা সটকে পড়লে হানাদার বাহিনী উজিরপুর, মাঝিপাড়া, তুলারাম মহাজিদপুরের কিছু অংশ পেট্রোল দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।’’(১৮)

রংপুর অঞ্চল প্রাকৃতিক দিক থেকে সম্মুখ সমরের উপযুক্ত না হবার কারণে সে সময় অঞ্চলে অধিক সংখ্যক গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসময় গেরিলারা রংপুর শহরাঞ্চলে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে থাকে। এতে করে দখলদার বাহিনীর সদস্য সহযোগীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রকৃতিও বাঙালি জাতির সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে। ঘনঘন বৃষ্টিতে হানাদার বাহিনী শহর ছাড়া অন্যত্র যাতায়াত বন্ধ করে দেয়। প্রকৃতপক্ষে জুলাই থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সুসংগঠিত হয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাতে থাকে। এসময় বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রচÐ গেরিলা হামলা শুরু হয়।’(১৯) ‘রংপুর ছিল নম্বর সেক্টরের আওতাধীন। কোচবিহারের দিনহাটায় স্থাপন করা হয়েছিল মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বে বিএলএফ ক্যাম্প। এদিকে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আল শামস, ইপি ক্যাম্প মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং অবাঙালিদের সমন্বয়ে গঠন করে দখলদার বাহিনী।

রংপুর শহরের অভ্যন্তরে কোনো প্রত্যক্ষ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে কিংবা শহরে সঙ্ঘবদ্ধ গেরিলা আক্রমণ হয়েছে এরকম খবর এই সময়কালে পাওয়া যায়নি। তবে রংপুর জেলা শহরের চতুর্দিককার থানা সদরগুলো এবং ইউনিয়নগুলোতে বেশকিছু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রংপুর শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ করতে না দেওয়ার সুযোগে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের দোসরদের সহযোগিতায় গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট অত্যাচার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। সময় রংপুর টাউন হল, রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ এবং তদসংলগ্ন সংগ্রহশালা পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসরদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।(২০)

সেপ্টেম্বর৭১ ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা বাহিনী রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার শংকরদহের তালতলায় হানাদার বাহিনীর একটি কনভয়ের উপর আক্রমণ চালায়। এতে জন হানাদার বাহিনীর সদস্য এবং জন রাজাকার নিহত হয়। পরদিন ঘটনার প্রতিশোধ নিতে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য তালতলার সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়। হানাদারেরা এক পর্যায়ে তালতলা মসজিদে ঢুকে ১৭ মুসল্লিকে মসজিদের ভেতর গুলি চালিয়ে হত্যা করে।’(২১)

‘‘১৪ অক্টোবর৭১ নম্বর সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর নওয়াজেশ উদ্দিনের কমান্ডে ভূরুঙ্গামারী জয়মনিরহাট মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে দখল করে নেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মনে এতে করে বিজয়ের আনন্দ দানা বাঁধতে শুরু করে।(২২)

‘‘ নভেম্বর৭১ মুখতার ইলাহী একটি দলসহ টাউন হল মুক্ত করার অভিপ্রায়ে ভারতের সাহেবগঞ্জ থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুরের পথে রওয়ানা দেন। পথে লালমনিরহাটের আইড় খামার গ্রামে রাত্রিযাপনের জন্য থামলে গ্রামের পাকিস্তানি দালালেরা তাদের অবস্থানের খবর দেয়। নভেম্বর ভোরে প্রায় ৪০০ পাকিস্তানি হানাদার গ্রামটি ঘিরে ফেলে। এখানে পাকিস্তানি হানাদাররা মুখতার ইলাহী, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবুল কাশেম এবং এক বালক যোদ্ধাসহ ১১৯ গ্রামবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।’(২৩)

 একই সময়ে পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল হারাগাছ এলাকায় সাদা মসজিদের কাছে হানাদার বাহিনীর একটি মিলিশিয়া ক্যাম্পে আক্রমণ চালায় হারাগাছ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অবস্থানরত মিলিশিয়াদের ব্যাপক ক্ষতি করে।(২৪)

২৮ নভেম্বর৭১ তুমুল লড়াইয়ের পর নাগেশ্বরীর পতন ঘটে। নাগেশ্বরীতে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওঠে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিছু হটে ধরলা পার হয়ে কুড়িগ্রাম এসে অবস্থান গ্রহণ করে।  মুক্ত হয়ে যায় সমস্ত উত্তর ধরলা অঞ্চল।’(২৫) নভেম্বরের শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ডিমলায় অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীর উপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে পরাজিত হানাদার বাহিনী ডিমলা ছেড়ে নীলফামারী শহরে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা নীলফামারী শহরের দিকে এগুতে থাকে। সময় ভারতীয় মিত্রবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে এসে সশস্ত্র সমর্থন দিতে থাকে। আরো সাহসী হয়ে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। দেওয়ানগঞ্জচিলাহাটি, ডোমার, ডিমলায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা দলগুলো বিভিন্ন কোম্পানি কমান্ডারের নেতৃত্বে নীলফামারী সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের লক্ষে  বিপুল উদ্যমের সাথে এগুতে থাকে।’(২৬)

ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে ইতিহাস শুরু হয়। সারাদেশে পদে পদে মুক্তিবাহিনীর হামলায় পাকিস্তানি হানাদাররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এদিকে ভারতীয় পূর্বাঞ্চল কমান্ডের লে.জে. জগজিৎ সিং অরোরার অধিনায়কত্বে ঘোষিত হয় বাংলাদেশভারত যৌথ কমান্ড। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী এবং বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় মিত্রবাহিনী।’(২৭)   ডিসেম্বর যৌথবাহিনী কুড়িগ্রামে অবস্থিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপর স্থল বিমান হামলা চালাতে থাকে। হামলায় হানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে লালমনিরহাট রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে ফিরে আসে। ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ডিসেম্বর নম্বর সেক্টর কমান্ডার এম.কে বাশার কুড়িগ্রামের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন এবং বেসামরিক প্রশাসন চালু করেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে লালমনিরহাট আক্রমণ করে হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এই সময়ে নীলফামারী শহরকেও মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করেন। হানাদার বাহিনী আশ্রয় নেয় সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে একমাত্র রংপুর এবং সৈয়দপুর সেনানিবাস ছাড়া সম্পূর্ণ নম্বর সেক্টরের পুরোটাই মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।’(২৮)

ভারতীয় ৭১ মাউন্টেন ব্রিগেডের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সৈয়দপুরের মুখে পৌঁছায়। পাকিস্তান বাহিনীও নিজেদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য রংপুর সৈয়দপুর সেনানিবাসের দিকে পিছু হটতে থাকে।’(২৯)

রংপুরের মাটিতে মিত্রবাহিনীর প্রবেশ ঘটে ডিসেম্বরের তারিখের মধ্যে। জেলার পীরগঞ্জ থানায় ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী প্রবেশ করে। এরপর পীরগঞ্জের উত্তরে রংপুর যাওয়ার রাস্তায় দ্রæরোড øস্থাপন করে যৌথবাহিনী। এর কিছু সময় পরেই রংপুর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কনভয় যৌথবাহিনীররোড øএর সামনে এসে পৌঁছলে তারা ভারতীয় ট্যাংকের আক্রমণের মুখে পড়ে।(৩০)

ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জও আসে যৌথবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এরপর লচমন সিং রংপুর দখলের লক্ষ্যে ৬৬ মাউন্টেন ব্রিগেডের  আক্রমণ নিশানা (শলাকা) উত্তরে ঘুরিয়ে দেন। প্রথমে মিঠাপুকুর দখলে এনে ৬৬ ব্রিগেড রংপুরের দিকে অগ্রসর হবে।(৩১) ‘১৫ ডিসেম্বর সৈয়দপুর এবং তিস্তায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনী মিত্রবাহিনীর  তুমুল যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী তিস্তা ব্রিজের একটি গার্ডার উড়িয়ে দিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালিয়ে আসা রংপুর এবং সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্র বাহিনীর কাছে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।(৩২) ‘১৬ ডিসেম্বর দুপুরে সৈয়দপুর সেনানিবাসে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় ব্রিগেডের এক আলোচনা সৈয়দপুর থেকে কিলোমিটার দূরে দারোয়ানিতে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয় যে ১৭ ডিসেম্বর বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে ব্রিগেডসহ অন্যরা সৈয়দপুরের জামজামা বিমানবন্দরে আত্মসমর্পণ করবে। ১৭ ডিসেম্বর রংপুর ক্যান্টনমেন্টে আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়।(৩৩)

১৬ ডিসেম্বর রংপুর শহর এবং শহরতলীতে লড়াই চলতে থাকে। মুক্তিবাহিনী দমদমা ব্রিজের বাংকারে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীর উপর প্রচÐ আক্রমণ চালায়। এতে বহুসংখ্যক হানাদার বাহিনীর সদস্য নিহত এবং অনেকে প্রাণভয়ে ট্যাংক ছেড়ে পালিয়ে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়।(৩৪) ১৫ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর দুটি ব্রিগেড রংপুর শহরে প্রবেশ করে এবং রংপুর ক্যান্টনমেন্ট সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট অবরুদ্ধ করে রাখে।১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার রংপুর সেনানিবাসে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত হয়। সে মোতাবেক ঐদিন আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয়। এটি পরিচালনা করেন মিত্রবাহিনীর ৬৬ মাউন্টেন ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জে এস শর্মা।(৩৫)

১৭ ডিসেম্বর দুপুরের পর থেকে রংপুরে দেখা যেতে থাকে আনন্দ বিজয়ের Ð Ð চিত্র। রাস্তায় স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে মানুষের পদচারণা।১৭ ডিসেম্বর সকাল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা রংপুর শহরে আসতে শুরু করে। বিকেলে রংপুরের ডেপুটি কমিশনার সৈয়দ শামীম আহসান ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজরদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের কাছে উপস্থিত হন এবং বলেন, রংপুর শহরে মুক্তিপাগল মানুষ আনন্দ উল্লাসে রাস্তায় নেমে পড়েছে এবং চারিদিকে থেকে মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা দলে দলে স্বাধীন বাংলাদেশের রংপুর শহরে প্রবেশ করছে।’(৩৬)

এই লেখায় সংক্ষিপ্ত পরিসরের কারণে রংপুরের বধ্যভূমি গণহত্যার অংশটি উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি। আশা করছি সংক্রান্ত পৃথক একটি লেখা পরবর্তীতে সংকলিত হবে।

তথ্যসূত্র:

) ‘বিজয়ের ৪০ বছর’, পৃষ্ঠা১৫৫।

মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের ইতিহাস সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রন্থ।

) রফিকুল ইসলাম গোলাপআন্দোলনসংগ্রামঅপূর্ব শর্মা সম্পাদিত।  আইডিয়া প্রকাশন, পৃষ্ঠা৩৪,৩৫।

) মোস্তফা তোফায়েল হোসেন: বৃহত্তর রংপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা২০২, ২০৩।

) মুকুল মুস্তাফিজ: মুক্তিযুদ্ধে রংপুরগতিধারা প্রকাশপৃষ্ঠা২৮,২৯

) রানা মাসুদএকাত্তরের উত্তাল মার্চ: রংপুরের দিনগুলোপৃষ্ঠা৫০

) মেজর নাসির উদ্দিন: যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, পৃষ্ঠা১০০। দৈনিক যুগের আলো পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুল ইসলাম হক্কানীর প্রবন্ধ এবংমুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুর’  রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ, পৃষ্ঠা২৮।

মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুররঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ, পৃষ্ঠা৩২, ৩৩।

) মুকুল মুস্তাফিজ: মুক্তিযুদ্ধে রংপুরগতিধারা প্রকাশপৃষ্ঠা৩৩

১০) পূর্বোক্ত

১১) মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের ইতিহাস সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রন্থ।

১২) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, পৃষ্ঠা৫৩।

১৩) মো. আবুল কাশেম: কাউনিয়া উপজেলার ইতিহাস, পৃষ্ঠা১৪৬।

১৪) রংপুরের ইতিহাস (জেলা প্রশাসন), পৃষ্ঠা২২১  একাত্তরের উত্তাল মার্চ: রংপুরের দিনগুলোপৃষ্ঠা২২৩।

১৫) রফিকুল ইসলাম গোলাপআন্দোলনসংগ্রামঅপূর্ব শর্মা সম্পাদিত।  আইডিয়া প্রকাশন, পৃষ্ঠা২১,২২,২৩।

১৬) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (নবম Ð), পৃষ্ঠা৩৯৬।

১৭) মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুররঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ, পৃষ্ঠা৫৭

১৮) মোস্তফা তোফায়েল হোসেন: বৃহত্তর রংপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা২৫২, ২৫৩।

১৯) মুকুল মুস্তাফিজ: মুক্তিযুদ্ধে রংপুরগতিধারা প্রকাশপৃষ্ঠা৪৩।

২০) মোস্তফা তোফায়েল হোসেন: বৃহত্তর রংপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা৪৪।

২১) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, পৃষ্ঠা৪৪।

২২) মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুররঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ, পৃষ্ঠা৮৫।

২৩) কে, মওদুদ ইলাহী সম্পাদিতশহিদ কে, মুখতার ইলাহী এবং রংপুরের মুক্তিযুদ্ধপৃষ্ঠা৬৫।

২৪) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, পৃষ্ঠা৪৬ রংপুর  জেলার ইতিহাস, পৃষ্ঠা২৩১।

২৫) মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুররঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ, পৃষ্ঠা৮৬।

২৬) রংপুর  জেলার ইতিহাস (জে.প্র), পৃষ্ঠা২৩২।

২৭) বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ডিসেম্বর ২০২০, জনাব আকবর হোসেন এবং গোলাম শামদানী, ঝধৎধনধহমষধ.হবঃ, ডিসেম্বর, ২০২০।

২৮) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, পৃষ্ঠা৪৬, ৪৭ মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস: রংপুরএস,এম আব্রাহাম লিংকন, পৃষ্ঠা১৮৭, ১৮৮।

২৯) মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস: রংপুর, পৃষ্ঠা১৮৯, ১৯০।

৩০) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম: লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, পৃষ্ঠা৩৯৬।

৩১) মেজর নাসির উদ্দিন: মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা, পৃষ্ঠা২৮৮।

৩২) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, পৃষ্ঠা৪৭।

৩৩) মোস্তফা তোফায়েল: মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস, পৃষ্ঠা১১৭।

৩৪) মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, পৃষ্ঠা৪৭।

৩৫) পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা৮৯,৯০।

৩৬) ‘স্মৃতিতে রণাঙ্গনজেলা প্রশাসন, পৃষ্ঠা১২

মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুর
Comments Off
19 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:২৯ অপরাহ্ণ

মহান মুক্তিযুদ্ধে লালমনিরহাট জেলার ভূমিকা

৭ই মার্চ, ১৯৭১রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বাঙালি জাতি পাকিস্তানি দুঃশাসনেরর শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন হতে ঐক্যবদ্ধ হন।

৭ই ডিসেম্বর, ১৯৬৯জাতীয় পরিষদ এবং সতেরই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে কুড়িগ্রামলালমনিরহাট এলাকা থেকে রেয়াজ উদ্দিন আহমেদ এবং কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা পাটগ্রাম এলাকা থেকে আজিজুর রহমান নির্বাচিত হন। আর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে লালমনিরহাট থেকে আবুল হোসেন, কালীগঞ্জ থেকে করিম উদ্দিন আহমেদ এবং হাতীবান্ধা পাটগ্রাম থেকে আবিদ আলী নির্বাচিত হন। ক্ষমতা হসÍান্তরকে কেন্দ্র করে শুরু হয় পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর টালবাহনা। ফলে বাঙালি জাতির আর বুঝতে দেরি হলো না যে, এটা পাক বাহিনীর একটা দুরভিসন্ধি স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, মজুর সহ বাংলার আপামর জনতা।

৭ই মার্চ, ১৯৭১রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বাঙালি জাতি পাকিস্তানি দুঃশাসনেরর শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীন হতে ঐক্যবদ্ধ হন। প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণের খবর টেলিফোনের মাধ্যমে রাতারাতি লালমনিরহাটে পৌঁছে গেলে লালমনিরহাট শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠে। পশ্চিমা শোষক তাদের দোসরদের চিরতরে উৎখাত করার দৃঢ় সংকল্পে চারদিকে ¯øাগান উচ্চারিত হতে থাকে। অবাঙালি তথা উর্দূভাষী বিহারী অধ্যুষিত লালমনিরহাট শহরে বিরাজ করতে থাকে টানটান উত্তেজনা। পরের দিন সকালে বর্তমান লালমনিরহাট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় প্রঙ্গনে মো. শহিদুল্লাহকে আহবায়ক করে গঠিত হয় সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ঐদিন ছাত্রযুবকদের একটি বিরাট মিছিল লালমনিরহাট শহর প্রদক্ষিণ করে। মো. সামছুল আলম (নাদু) বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লালমনিরহাটে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা তৈরী করেন। নয়ই মার্চ নাজিম উদ্দিন আহমেদ লালমনিরহাট থানার পাশে প্রকাশ্য পাকিস্তানি পতাকায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যগণ সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। পরে অবাঙালি তথা উর্দূভাষী বিহারীরা দল বেঁধে এসে পতাকাটি নামিয়ে শহিদ মিনারটি ভেঙ্গে দেয়। এরপর থেকে লালমনিরহাটে শুরু হয় খন্ড খন্ড বিক্ষোভ মিছিল, পাকবাহিনী তাদের দোসরদের প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ এবং অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান। সংক্ষিপ্ত গেরিলা প্রশিক্ষণ প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন ক্যাপ্টেন আজিজুল হক।

১৫ই মার্চ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে আবুল হোসেনকে আহবায়ক করে গড়ে তোলা হয় সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের লালমনিরহাট থানা শাখা। প্রথম অবস্থায় পরিষদের অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন কমরেড চিত্তরঞ্জন দেব, আবদুল কুদ্দুছ, কমরেড শামসুল হক, কাজী মোসলেম উদ্দিন, ছাত্রনেতা মো. শহিদুল্লাহ প্রমূখ। স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোলরুম স্থাপিত হয় গোশালা রোড সংলগ্ন বর্তমান পাটোয়ারী ভবনে।

 ২৩শে মার্চ প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে বিকেলে খোর্দ্দসাপটানার তৎকালীন জিন্নাহ মাঠে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ মার্চ  স্বাধীনতার ঘোষনার পর লালমনিরহাটে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রংপুর থেকে পাকবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে কয়েকজন আনসার তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পাড়ে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান প্রধান সড়ক, রেলপথ এবং বিমান ঘাঁটি এলাকায় বেরিকেড সৃষ্টি করা হয়। পরদিন সকাল থেকে ছাত্র যুবকদের চারটি দলে বিভক্ত করে বর্তমান লালমনিরহাট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ঐদিনই দুপুরে থানাপাড়ার মিছিল নিয়ে তৎকালীন আপইয়ার্ড কলোনী অতিক্রম করার সময় বিহারীদের সাথে গোলযোগ বেঁধে যায় এবং এক পর্যায়ে কলোনীতে গোলাগুলি শুরু হয়। এসময় বিহারী জিয়ারত খানের ভগ্নিপতি .পি.আর জিয়াউল হকএর একটি টুটু বোর রাইফেলের গুলি শাহজাহানের বুকের ডান পাশের পাঁজরে আঘাত হানে। বিকেলে তিনি শহিদ হন। লালমনিরহাটে অবাঙালিদের হাতে প্রথম শহিদ তিনি। তার শহিদ হওয়ার খবর দ্রæ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে উঠে। শহর ব্যাপী চলতে থাকে বাঙালি অবাঙালিদের মাঝে ধাওয়াপাল্টা ধাওয়া প্রতিশোধপ্রতিরোধের পালা। পাকবাহিনী তিস্তা ব্রীজের পশ্চিম পাড়ে অবস্থান নিয়ে আবারও প্রচন্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে, লালমনিরহাটে শুরু হয় পাকবাহিনী অবাঙালি তথা উর্দূভাষী বিহারী কর্তৃক নির্মম হত্যাকান্ড এবং বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ সহ ব্যাপক ধ্বংসাত্বক কর্মকান্ড। পাকবাহিনী বিমান ঘাটিতে অবস্থান নিয়ে প্রথমে হত্যা করে মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের সাতপাটকী গ্রামের করিম বকস মন্ডলের দ্বিতীয় পুত্র আবুল কাশেম মন্ডলকে। লালমনিরহাট কলেজের এইচ.এস.সি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবুল কাশেম মন্ডলকে তারা বিমান ঘাঁটির পাকা রানওয়েতে আছাড় মেরে আহত করে, তারপর দুপা দুুদিকে টেনে ছিড়ে ফেলে। তিনি লালমনিরহাটে পাকবাহিনীর হাতে প্রথম শহিদ।

৫ই এপ্রিল, সকালে পাকবাহিনী ইলিয়াস হোসেনকে খুঁজতে জেলা শহরের গোশালা বাজার সংলগ্ন তার বাড়ীতে গিয়ে তাকে খুঁজে না পেয়ে তার বৃদ্ধ পিতা একলাল মিয়াকে ধরে মরাতে মারতে বর্তমান লালমনিরহাট রেলওয়ে ওভার ব্রীজের পশ্চিম পাড়ের রিক্সা ষ্ট্যান্ডে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। রেলওয়ে কর্মচারী আবুল মনসুরকে বিকেলে এখানে এনে অপর এগারো জন সহ এক লাইনে দাড় করিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয় এবং অন্যান্যদের মত তাকেও মৃত ভেবে ডি.আর.এম অফিসের পাশের একটি গর্তে ফেলে দেয়া হয়, কিন্তু গুলি লাগার পরও তিনি  সৌভাগ্যবশত বেঁচে যান। স্থানটি লালমনিরহাটের বৃহৎ বধ্যভূমি। রেলওয়ে কর্মকর্তাকর্মচারীসহ বহুলোককে এখানে ধরে এনে হত্যা করে তাদের মৃতদেহ ডি.আর.এম অফিসের পাশের একটি গর্তে ফেলা হয়।

লালমনিরহাটে বিহারীদের হাতে শাহজাহান শহিদ পাক বাহিনীর নিঃসংশ হত্যাকাÐের ঘটনায় প্রতিবাদী যুবক তমিজ উদ্দিনের হৃদয়কে ভীষণভাবে ব্যথিত করে। পরের দিনই ৬ই এপ্রিল, তিনি কাকিনার কয়েকজন যুবককে নিয়ে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। সংগ্রাম পরিষদ তমিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে কালীগঞ্জ থানার সকল অস্ত্র গোলাবারুদ জব্দ করে নেন। অন্যদিকে সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের কালীগঞ্জ শাখা গঠন করে তৎকালীন এম.পি.. করিম উদ্দিন আহমেদ ছাত্রযুবকজনতাকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন। পাকবাহিনী রেলযোগে কালীগঞ্জে প্রবেশ করে বর্তমান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গন, করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গন, ভোটমারী ভাখারীর পুল, শ্রীখাতা পাকার পুল সহ বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে দিনের পর দিন বিক্ষিপ্তভাবে বাড়ীঘরে অগ্নি সংযোগ সহ হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। পাকবাহিনী বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ লোকজন ধরে এনে মদাতী ইউনিয়নের মুশরত মদাতী গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হকের বাড়ীর সামনের বাঁশের ঝাড় বেষ্টিত পুকুর পাড়ে জবাই করে পুকুরে ফেলে দিতো। পুকুরটি মৃত দেহের স্তুপে পরিণত হয়েছিল। এটি কালীগঞ্জের বৃহৎ বধ্যভমি হিসেবে পরিচিত।

তৎকালীন হাতীবান্ধাপাটগ্রামের এম.পি.. আবিদ আলীর নেতৃত্বে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে হাতীবান্ধা ডাকবাংলো মাঠে জনসভা হয়। ৯ই মার্চ ডাকবাংলো মাঠের উত্তর পার্শ্বে সেনেটারি অফিসের সামনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন পূর্বক জব্বার আলী মিয়াকে আহŸায়ক করে সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের হাতীবান্ধা শাখা গঠন করা হয়। এপ্রিল মাসের প্রথমদিকে পাকবাহিনী হাতীবান্ধায় প্রবেশ করে। প্রাণ বাঁচাতে লোকজন ভারতের দিকে ছুটতে থাকেন। পাকবাহিনী হাতীবান্ধায় প্রবেশ করে প্রথমে গুলি চালায় শিংগীমারীর দিকে। সময় মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা জবাব দেন। পাকবাহিনী বড়খাতা, ভবানীপুর, সিন্দুর্না, গড্ডিমারী, শিংগীমারী, পারুলিয়া সহ বিভিন্ন স্থানে তারা ক্যাম্প স্থাপন পূর্বক ব্যাপক অগ্নি সংযোগ হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে হাতীবান্ধায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পূর্ব সিন্দুর্না নুন খাওয়ার কুড়া, দক্ষিণ সিন্দুর্না কাচারীঘর প্রাঙ্গন, পারুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গন, বড়খাতা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গন, বড়খাতা প্রধান সড়ক সংলগ্ন এলাকা সহ বিভিন্ন স্থানে তারা নিরীহ লোকজনদের ধরে এনে হত্যা করে। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিবাহিনী হাতীবান্ধার বড়খাতায় পাকবাহিনীর অবস্থানের উপর প্রবল আক্রমণ চালায়। জনসাধারণের সহায়তায় দিনের পর দিন আক্রমণের মাত্রা আরোও বাড়তে থাকে। এতে দিশেহারা পাকবাহিনী পর্যুদস্তু হয়ে পড়ে এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে নভেম্বরের ত্রিশ তারিখে হাতীবান্ধা পাকবাহিনী মুক্ত হয়।

 ১৫ মার্চ, আবিদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত হয় সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের পাটগ্রাম শাখা। পাকবাহিনী হাতীবান্ধা থেকে পাটগ্রামে প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রবল প্রতিরোধের মুখে তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পাটগ্রামের অধিকাংশ এলাকা মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময় পর্যন্ত পাকবাহিনী মুক্ত থাকে। এখানকার বুড়িমারী হাসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ছয় নং সেক্টর হেড কোয়ার্টার। পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের হাসর উদ্দিন দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিল সেক্টরের হেড কোয়ার্টার। কারণে বুড়িমারী মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ সময় শত্রুমুক্ত ছিল বলে জানান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। অক্টোবর মাসের দশ তারিখে পরিদর্শনে আসেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি হাসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে রাত্রি যাপন করেন ্এবং এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

৪ঠা ডিসেম্বর, ভারত আনুষ্ঠানিক ভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমাÐ গঠিত হয়, যা মিত্র বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াইয়ে আর মুক্তিকামী জনগনের দুর্বার প্রতিরোধের মুখে বড়খাতা, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী লালমনিরহাটে এক এক করে পতন হতে থাকে পাকবাহিনীর। তাদের উপর আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করলে পাকবাহিনী দ্রæ পিছু হটে লালমনিরহাটে এসে জমায়েত হতে থাকে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের গোপনীয় স্থান টেরপেয়ে চারিদিক থেতে লালমনিরহাটকে ঘিরে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে দিনে অর্থাৎ ডিসেম্বরের ছয় তারিখ ভোরে তারা তিস্তা ব্রিজ হয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে যায়। ফলে সে দিনই লালমনিরহাট জেলা পাকবাহিনী মুক্ত হয়।

লালনিরহাট মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্রে জানা যায় যে, জেলায় প্রায় ২০০০ জন মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। এঁদেও মধ্যে শহিদ হন ৩১ জন, ( লালমনিরহাটে ১০ জন, আদিতমারী জন, কালীগঞ্জে জন, হাতীবান্ধায় জন, পাটগ্রামে জন এবং কুমিল্লা জেলার জন) জেলায় হাজার ৫৪৪ জন মুক্তিযোদ্ধা  জীবিত রয়েছেন। ৩৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যু বরণ করেছেন।

৩০ লাখ শহিদ লাখের বেশী মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম Ð, একটি লাল সবুজের পতাকা। বাঙালির স্বাধিকার আন্দলন, বুকে লালন করা স্বপ্নের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার বাস্তব চিত্র যে এতোটাই নির্মম, মর্মান্তিক বেদনাদায়ক হতে পারে সেটা সত্যি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা নাম না জানা হাজারো দেশ প্রেমিক নারীপুরুষ, যারা দেশকে ভালোবেসে, মাতৃভুমিকে রক্ষা করার জন্য নিজের সবকিছু উজার করে দিয়ে, নিজেরি অজান্তে চলে গেছেন মৃদু পায়ে হেঁটে পরোপারের দিকে তাদের প্রতি রইলো বিন¤্র শ্রদ্ধা হাজারো সালাম।  

তথ্য সূত্র

১। লালমনিরহাট জেলার মুক্তিযুদ্ধের উইকিপিডিয়া।

২। লালমনিরহাট জেলার মুক্তি যুদ্ধ গণহত্যামানিক আব্দুর রাজ্জাক।

৩। মুক্তিযুদ্ধে লালমনিরহাট. আশরাফুজ্জামান Ðল। 

৪। চার শতাব্দীর লালমনিরহাট. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে লালমনিরহাট জেলার ভূমিকা
31 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:২৬ অপরাহ্ণ

ঠাকুরগাঁও জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

১৮৬০ সালে ঠাকুরগাঁওকে মহকুমায় রূপান্তরিত করা হয় ১০টি থানা নিয়ে। প্রসঙ্গত উলেখ্য যে, বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একটার পর একটা রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত হয় এবং প্রতিটি আন্দোলনেই ছিল ঠাকুরগাঁও জনসাধারণের সক্রিয় ভূমিকা। ঠাকুরগাঁও মহকুমা ছিল দিনাজপুর জেলার অর্ন্তভূক্ত। পরে ১৯৮৪ সালে ফেব্রæয়ারি মাসে ৫টি থানা বা উপজেলা নিয়ে গঠিত হয় ঠাকুরগাঁও জেলা। উপজেলাগুলো হচ্ছেঠাকুরগাঁও সদর, পীরগঞ্জ, বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল হরিপুর। ঠাকুরগাঁও জেলায় রুহিয়া নামক আর একটি থানা আত্মপ্রকাশ করে ২০১৩ সালে। বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলায় ৫টি উপজেলা ৬টি থানা। ঠাকুরগাঁও জেলায় সর্বত্রই ছিল কম বেশি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। এই জেলায় বিভিন্ন ধর্ম গোত্রের মানুষ বসবাস করে।

বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটলে ১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশে সৃষ্টি হয় দুটি রাষ্ট্রভারত পাকিস্তান। এরপর৫২এর ভাষাআন্দোলন, ৫৪এর নির্বাচন, ৬৬এর দফা, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০এর সাধারণ নির্বাচন। অবশেষ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভুদ্যয় ঘটে। জন্ম হয় এক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এটা বলা অবশ্যই অত্যুক্তি নয় য়ে, অত্যাচার শোষণ ষড়যন্ত্র চিরকালই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সুপ্ত শক্তির বহি:প্রকাশ ঘটায়। পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটার ব্যতিক্রম হয়নি। 

 ঠাকুরগাঁও যখন দিনাজপুর জেলার আওতাভূক্ত একটি মহকুমা ছিল তখন থেকে বঙ্গবন্ধুর আগমন পত্রিকা অনুসন্ধানে পাওয়া যায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল থেকে তিনটি সফরের তথ্য। ১৯৬৪ সালের মে, ১৯৬৯ সালের ১২ অক্টোবর এবং ১৯৭০ সালে ২২ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও আসেন এবং তিনি বিভিন্ন স্থানে তাঁর ¦ালাময়ী বক্তব্য দেন। আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখ করে ন্যায্য দাবী আদায়ের শেষ নিয়মতান্ত্রি সংগ্রামের কথা বলেন।২ এরপর থেকেই ঠাকুরগাঁওবাসী আওয়ামী লীগ সরকার তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের প্রতি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে এবং ছাত্র, রাজনীতিবীদ, সাধারণ জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে একাত্বতা ঘোষণা করে।      বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রদত্ত দফা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা মিলে আন্দোলন অত্যন্ত গতি লাভ করে। গোটা মহকুমার বিভিন্ন থানায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে কমিটি গঠন করা হয় এবং অভূতপূর্ব গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে দফা দাবির ¯øাগান উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়ী হলো। আর তখন থেকেই রাজনীতিবিদ ছাড়াও সামরিক জেনারেলরা ১৯৭১ সালের মার্চ মাস নাগাদ গণপরিষদের বাহিরে নানা ধরণের কর্মকান্ডে লিপ্ত হল। এর পেক্ষাপটে দেখতে পাই যে, সমস্ত ধরণের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা চরম পন্থা গ্রহণ করল। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানের দখলদারী বাহিণী পূর্ববঙ্গে শুরু করল গণহত্যা। ফলে নির্বাচিত সংখ্যাগুরু দলের নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণহত্যা মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।৩ ঠাকুরগাঁও মহকুমা থেকেও ১৯৭০এর নির্বাচনে জনাব মোশারফ হোসেন চৌধুরী জনাব মো. আজিজুর রহমান এমএনএ এবং জনাব কমর উদ্দিন ইসলাম, জনাব সিরাজুল ইসলাম, জনাব মো. ফজলুল করিম জনাব মো. ইকরামুল হক এমপিএ নির্বাচিত হন।৪ এই সময় থেকেই ঠাকুরগাঁওয়েও নিয়মিত মিটিং মিছিল জনসভা করতেন বাঙালি জনতাকে উদ্ভুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। আর এই আন্দোলন এখানকার মানুষকে আরও উজ্জীবিত করে এবং স্বাধীনতা আদায়ে দাবি সম্বলিত নানা শ্লোগানে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করলে ঠাকুরগাঁও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগএর নেতৃত্বে প্রথমে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে ঠাকুরগাঁও হাইস্কুলে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২রা মার্চ ঠাকুরগাঁওএর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট প্রতিবাদ মিছিল হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী ৩রা থেকে ৬ই মার্চ প্রতিদিন আন্দোলেনের নানা কর্মসূচী পালিত হয়। সময় একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে বিভিন্ন স্থানে নিহতদের স্মরণে ঠাকুরগাঁওয়ের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বাসভবন দোকানে কালো পতাকা উত্তোলন কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়। এসবের মাধ্যমে গোটা জনপদ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। শুরু হয় আন্দোলন। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এদিন প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল লতিফ মোক্তার এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশীদ মোক্তার এখানে বত্তৃতা করেন। সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম জর্জিসুর রহমান খোকা। ছাত্রনেতা , এইচ, এম, জর্জিসুর রহমান খোকা সাক্ষাৎকারে বলেন, ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ সরাসরি রেডিওতে প্রচারিত না হওয়ায় ঠাকুরগাঁওবাসী বিক্ষুদ্ধ হয় তবে কিছুকিছু সচেতন নাগরিক সেইদিনই বিবিসি, আকাশবাণী কলকতা থেকে শুনেছিলেন। পরেরদিন ৮ই মার্চে ভাষণটি প্রচারিত হলে সকলেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে।

৭ই মার্চের ভাষণ শোনার জন্য ঠাকুরগাঁও থেকে বিভিন্ন সংগঠন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঢাকায় গিয়েছিলেন। তাঁরা ৯ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ক্যাসেট নিয়ে ফিরে আসেন। মাইকে সে ভাষণ প্রচার করা হয় ফজলুল করিম এমপিএ সাহেবের বৈঠকখানা থেকে। ঠাকুরগাঁওবাসী ভাষণ শোনার পর ঐদিনই মিছিল বের করে এবং মিছিলটি সমস্ত শহর ঘুরে কালিবাড়ি হাটের পশ্চিমে পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে এসে শেষ হয়। মার্চ অফিসআদালত, ব্যাংকবীমা, স্কুলকলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। মহল্লায় মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। ১০ মার্চ এমপিএ ফজলুর করিমের অনুরোধে ঠাকুসগাঁও হাইস্কুলের শিক্ষক এম. ইউসুব ছাত্র, যুবকদের রাইফেল ট্রেনিং দিতে শুরু করেন। ১১ মার্চ জেলখানা খুলে দিলে কয়েদিরা আন্দোলনে যোগ দেয়। ২২ মার্চ পর্যন্ত এভাবেই চলে। ২৩ মার্চ মহকুমা প্রশাসককের কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করা হয়। থানা ভবনে পতাকা উত্তোলনে অবাঙালি প্রহরি কতৃক বাধাপ্রাপ্ত হলে তৎকালীন ওসি আবদুল গফুর নিজেই পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা নেন।৬ ২৪ মার্চ ঠাকুরগাঁওয়ে ছাত্রজনতার সকাল থেকেই উত্তাল মিছিল, মিছিলের সামনে মাঝে দেখা গেল সদ্য উত্তলনকৃত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ২৫ মার্চ পূর্বের ন্যায় মিছিল, মিটিং চলতে থাকে। শ্লোগানের পর শ্লোগান দিতে থাকে স্বাধীনতাকামী মুক্তি পাগল জনতা। তখনও জানত না ২৫ মার্চের সার্চলাইটের কথা।                      

২৫ এবং ২৬ মার্চের ঢাকার খবর জানতে না পেরে সকাল / টা নাগাদ নেতাকর্মীরা ফজলে করিম এম. পি. সাহেবের বৈঠকখানায় সমবেত হয়ে একটা ভীতিকর উত্তেজনা আর আলোচনার মাধ্যমে অপেক্ষা করতে থাকল সময়ের। তবে ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে ঢাকার পাকিস্তান হানাদান বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার খবর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উক্ত স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চের দিনের বেলার মধ্যপ্রহর থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পায় বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগঁওয়ের ছাত্রনেতা , এইচ, এম জর্জিসুর রহমান খোকা এবং মো. আব্দুল গোফরান। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা বার্তাটি শুনে এবং বর্বরোচিত আক্রমণে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর খবর জানতে পেরে শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র

২৭ মার্চ কারফিউ ভেঙে সকাল থেকে জনতার ভিড় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। চারিদিক থেকে Ð Ð মিছিল এসে মূল মিছিলে যোগ দিচ্ছিল। ঠাকুরগাঁওয়ের তৎকালীন সি. (ডেভ) আব্দুল ওহাব আন্ধার মানিক  ‘অমর কাহিনীকার গ্রন্থের শহিদ আলী সড়কনামক গ্রন্থে তাঁর অনুভূতিপ্রবণ লেখায় বলেছেন, ‘বেলা ১২ টা বেজে ১০ মিনিট। কেরামত আলীর মোক্তার সাহেবের বাসার সামনে মিছিলটি এসে থেমে গেল। দক্ষিন দিক থেকে দ্রæ বেগে ধেয়ে আসছিল একটি জীপ এক লরী সৈন্য। মেজরের জীপটা এসে সামনে থামল। উইং কমাÐার মেজর মোহাম্মদ হোসেন ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম জীপ থেকে নামলেন। তাদের দেখে মিছিলে অংশগ্রহণকারী জনতা যেন বারুদের মত ¦লে উঠল। মিছিল থেকে অসীম সাহসী, বলিষ্ঠদেহী মুখে চাঁপদাড়ি মধ্য বয়সের মোহাম্মদ আলী নামের এক রিক্সা চালক সামনে চলে আসে। মেজর মোহাম্মদ হোসেনের সামনে গিয়ে দৃপ্ত অকুতোভয় স্পষ্ট আওয়াজে চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা।সাথে সাথে পরপর তিনটি গুলির শব্দ হলো। একটা বিকট চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়লো একটি দেহ।এই রিকশাচালকই ঠাকুরগাঁওয়ের প্রথম শহিদ।

জনতার আন্দোলন দমন করতে ২৮ শে মার্চ শহরে ইপিআর টহল গাড়ি বাজার পাড়ার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল তখন বছরের নরেশ চৌহান তাদের জীর্ণ কুড়ে ঘড় থেকেজয় বাংলাশ্লোগান দিলে প্রাণ হারায়। ঘটনায় সংগ্রামী জনতার ক্ষোভ চরমে পৌঁছে। এদিন রাত ১০টার পর ইপিআরএর বাঙালি সৈনিকরা বিদ্রোহ করে ক্যাম্প থেকে করে বেরিয়ে আসেন। তাঁরাজয় বাংলা’, জনতা ইপিআর ভাই ভাইশ্লোগান দেন। তাঁরা চিৎকার করে বলতে থাকেনআমরা রিভোল্ট করেছি’, ‘আপনারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন তখনো অবিরাম গুলি চলছিল। এভাবেই ঠাকুরগাঁওবাসী অনেক সাহসী হয়ে ওঠেছিল।                                                                                                                  

ঠাকুরগাঁও ইপিআর হেডকোয়ার্টাসে ২৮ শে মার্চ রাত ১০টার পর বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করে পশ্চিমা সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাঙালি সেনাদের কাছে আগেই খবর ছিল যে, রাতে তাঁরা আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে আক্রান্ত হবার আগেই তাঁরা শত্রæদের আক্রমণের সিদ্ধান্ত করেন। ২৮ শে মার্চ থেকে ৩০ শে মার্চ পর্যন্ত বাঙালি সেনাদের হাতে বহু পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। ইপিআর ৯ম উইং ঠাকুরগাঁওএর উইং কমান্ডার ছিল পাঞ্জাবি মেজর মোহাম্মদ হোসেন এবং সেকেন্ডইনকমান্ড ছিল ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম। মেজর মোহাম্মদ মোহাম্মদ হোসেন ৩০ শে মার্চ বেলা ৩টা নাগাদ তার কোয়ার্টারে নিহত হয়। ক্যাপ্টেন নাবিদ সপরিবারে সৈয়দপুর সেনা ছাউনিতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঠাকুরগাঁও থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে খোঁচাবাড়ি এলাকায় জনসাধারণের হাতে সোপর্দ করা হলে তারও একই পরিণতি হয়। ঠাকুরগাঁওএর উইং এর অপারেশনে ১১৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এর মধ্যে ইপিআর ১০৪ জন। অন্যদের মধ্যে সেনাবাহিনীর জন এবং বিমান বাহিনীর জন। এদের অধিকাংশই ছিল কমিশন, জুনিয়র কমিমশন, নন কমিশন প্রাপ্ত অফিসার।৮ ঠাকুরগাঁওএর বাঙালি সেনাদের সাফল্য জনসাধারণের মনে ব্যপক প্রাণ সঞ্চার করে ৩১ মার্চ সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন কোমান্ড গ্রহণ করেন।

অবাঙালি অধ্যুষিত সৈয়দপুর এবং সেখানে অবস্থিত ক্যান্টনমেন্ট তখন পাকিস্তানিদের দখলে ছিল। তাদের অস্ত্র গোলাবারুদ এর তুলনায় ঠাকুরগাঁওএর ইপিআর ক্যাম্পে খুবই কম গোলাবারুদ ছিল। তবুও সৈয়দপুরের কাছে প্রতিরোধব্যূহ তৈরি করে বাঙালি ইপিআর বিদ্রোহীরা পাকবাহিনীকে বেশকয়েকদিন ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। ১৪ এপ্রিল পাকসেনারা ভারি অস্ত্র নিয়ে ভাতগাঁ ব্রিজের কাছে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। একসময় বাধ্য হয়ে তাঁদের পিছু হটতে হয়। অবশেষে ১৫ই এপ্রিল ঠাকুরগাঁও অনুপ্রবেশ করে। ডাকবাংলা ইপিআর ক্যাম্পে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। আরসিও অফিসে আলবদরদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এছাড়াও থানার আরও অন্য স্থানে কয়েকটি রাজাকার স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্যাম্প ঘাঁটি ছিল। এসব ক্যাম্প থেকেই হত্যা, নির্যাতন,ধর্ষণ, লুন্ঠন অগ্নিসংযোগ চালায়।৯ ঠাকুরগাঁও উপজেলায় সবচাইতে বড় গণহত্যা জাটিভাঙ্গা গণহত্যা। এখানে ২০০০ থেকে ২৫০০ মানুষকে হত্যা করা হয়। এছাড়াও রয়েছে টাঙ্গন ব্রিজ সংলগ্ন বধ্যভূমি, ফারাবাড়ি গণকবর, রুহিয়া রমানাথ হাটের গণকবর, বর্তমান পুলিশ লাইনের পূর্ব পাশে সাত জনের জোড়া কবর, ভেলাজান ভক্তি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি গণকবর এবাদেও রয়েছে আরও অনেক কবর।

ঠাকুরগাঁও ইপিআর ক্যাম্প ছিল আর একটি নির্যাতন কেন্দ্র। এখানে একটি বাঘের খাঁচায় দুটি পূর্ণ বয়স্ক চিতাবাঘ দুটি শাবক ছিল। এখানে প্রায় ৫০জন মানুষকে খাঁচায় ঢুকিয়ে খাওয়ানো হয়। পীরগঞ্জের তরুণ সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধাকে পাশবিক নির্যাতনের পর ছুঁড়ে দেয় বাঘের খাঁচায়। টেনেছিঁড়ে সেখানেই তাঁকে খেয়ে ফেলে। বাঘের খাঁচায় ঢোকানোর পরও বেঁচে গিয়েছিলেন এমন দুজন হলেন শফিকুল আলম চৌধুরী সিরাজদৌল্লা।১০ সিরাজদৌ এখনও বেঁচে আছেন।

পীরগঞ্জে মার্চের শুরুতেই মো. ইকরামুল হক এমপিএ, ডা. আব্দুল রাজ্জাক, অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফাসহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্রযুবকদের সংগঠিত যুদ্ধের জন্য তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। প্রশিক্ষণ দেন অত্র থানার সুবেদার নায়েক। ১৭ এপ্রিল পাকবাহিনী পীগেঞ্জে অনুপ্রবেশ করে। এদিন তারা অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফাসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজনকে হত্যা করে, অনেক বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে। ২৫ এপ্রিল পাকবাহিনী কলেজে, গোদাবাড়ি, শিয়ালগাজী, বাঘমারা, মশালডাঙ্গী, মিলন বাজার সাগুনীতে ক্যাম্প স্থাপন করে। কুঠিবাড়ি মশালডাঙ্গীতে রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল। এছাড়াও পাকবাহিনী শহরে ৮টি বড় ব্যাংকার তৈরি করে প্রতিরক্ষাব্যূহ সৃষ্টি করেছিল। ক্যাম্পগুলো ছিল নির্যাতনের কেন্দ্র। এছাড়া পাকবাহিনী রাজাকারদের দ্বারা অনেক নারী ধর্ষণের স্বীকার হন। মাসে পীগেঞ্জ ২০ হাজারেরও বেসি মানুষকে হত্যা করে। এখারকার উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমিগুলো রাইসমিল থেকে ব্রিজ পর্যন্ত স্থান, কলেজের পুকুর, ছাত্রাবাস সংলগ্ন পুকুর, বিশ মাইল, জামালপুর ফার্ম, খামার সেনুয়া, আজাদ স্পোটিং ক্লাবের পার্শে ভাস্কর্য শহিদ মিনার সংলগ্ন স্থান, লোহাগাড়া চার্চ, শিমুলবাড়ি এবং চানপুর। সবচেয়ে বড় গণকবর মুক্তিযোদ্ধা পুকুর কলেজ হোস্টেলের পুকুর। আংরা হাটেও গলকবর রয়েছে। এছাড়াও পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিনকে আটক করে দিন যাবত বর্বর নির্যাতনের পর ১০ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ১১ নভেম্বর বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করে।১১

বালিয়াডাঙ্গীতে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের অন্য স্থানীয় নেতারা মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠক। এঁদের নেতৃত্বেই মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৪ই এপ্রিল পাকবাহিনী বালিয়াডাঙ্গীতে অনুপ্রবেশ করে এবং ২০ এপ্রিল বালিয়াডাঙ্গী থানায় ক্যাম্প স্থাপন করে। পরে একইদিনে পারিয়া রোডে, দুলুয়াহাট, ধনতলা, খোচাবাড়ী হাঠ, আধারদিঘী এবং খকসায় ক্যাম্প স্থাপন করে। রাজাকারদের অনেকেই ছিল বিহারী। এখানে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ অন্যান্য অপকর্ম চালাত স্বাধীনতা বিরোধীরা সমগ্র উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সাধারণ মানুষের উপর। থানা ডেভলপমেন্ট অফিস পাকবাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র বন্দিশিবির ছিল। এখানকার উল্লেখযোগ্য গণকবরগুলো হলোবামুনিয়া, কুশলডাঙ্গী, সাপটীহাট, বাঙ্গাটলী, খাদেমগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে পাকসেনা রাজাকারদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের গণকবর রয়েছে। থানায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন।১২

পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য আজিজুর রহমান এমএনএ এর উদ্যোগে রালীশংকৈলে  সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। ২৭ মার্চ থেকে ডাকবাংলার মাঠে ছাত্রযুবকদের সশস্ত্র যুদ্ধের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন আবু সুফিয়ান, সাইফুল ইসলাম নফিজউদ্দিন। মে মাসে পাকবাহিনী রাণীশংককৈলে অনুপ্রবেশ করে থানায় স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে। এছাড়াও ভিবিন্ন স্বাধীনতাবিরোধী বিহারীদের ঘাঁটি ছিল। এরা বিভিন্ন স্থানে হত্যা, গণহত্যা, নারীনির্যাতন অগ্নিসংযোগ করে। এখানে সবচেয়ে বড় বদ্ধভূমি হলোখুনিয়াদিঘি এখানে হাজার মানুষকে হত্যা করে। এছাড়াও রয়েছে কামিপুর, নলদিঘি, মমরেজপুর, শিয়ালগাজী পুকুর, নেকমরদ কুশুমউদ্দিন বালিকা বিদ্যালয়ে গণকবর।১৩ রাণীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একটি বদ্ধভূমি রয়েছে।

হরিপুরে হামিদুর চৌধুরী, আলী আকবর, আজিজুল হক, কেরামত আলী চৌধুরী প্রমূখের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাÐ বেগবান হয়। এখানে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং আনছারমজাহিদদের সংগঠিত করে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হয়। ইপিআর সদস্যরা প্রশিক্ষণে সহযোগিতা করে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এখানে পাকবাহিনী অনুপ্রবেশ করে এবং যাদুরাণী হাটে ব্যাংকার খনন করে। স্থানীয়রাজাকারআলী বদরবাহিনীর সহায়হায় হত্যাকাÐ নির্যাতন চালায়। জুমারদিন নামাজে গমনরত মুসুল্লিদেরও সুকৌশলে ডেকে নির্মমভাবে হত্যা করে কামার পুকুরে নিক্ষেপ করে। কয়েকটি হত্যাকাÐ তিন শতাধিক লোক নিহত করে। হরিপুরের উল্লেখযোগ্য বদ্ধভূমি যুদ্ধের স্থানগুলো-‘কামারপুকুর বদ্ধভূমিকাঠালডাঙ্গী যুদ্ধ, শিশুডাঙ্গী বিল যুদ্ধ, বজরুজ যুদ্ধ বীরগড় যুদ্ধ। ১৪ বীর মক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মান্নান বলেন,-ঠাকুরগাঁও ডিসেম্বরের তারিখ শত্রæমুক্ত হয়। সকালে বিজয়আনন্দের মাঝেও সন্তানহারা মা, বিধবা স্ত্রী, নির্যাতিত নারীর কান্নাকাটি শোনা গেলেও আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে  ঠাকুরগাঁওবাসী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।

তথ্যসূত্রঃ

.         ফারজানা হক, জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা, ১৯৭১ : গণহত্যানির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট, খুলনা, জুলাই ২০২১, পৃ. ১৪

.        আনারুল হক আনা, উত্তরবঙ্গে বঙ্গবন্ধু, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, রাজশাহী২০২০, পৃ.২৮৫২৯১

.        আনু মাহমুদ, একুশ থেকে স্বাধীনতা, ঝিঙেফুল, ঢাকা প্রথম প্রকাশ, বইমেলা ২০৯, পৃ. ৪০

.        মেহাম্মদ এমদাদুল হক, মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, জনপ্রিয় প্রকাশনী, ঢাকা, পুনঃমুদ্রণ ২০১৫ পৃ. ৪০

.        মনতোষ কুমার দে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ৪র্থ Ð, প্রধান সম্পাদক, হারুনঅররশিদ, বাংলাদেশ এসিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা২০২০ পৃ. ১৬২

.        ফারজানা হক, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫১৬

.        মনতোষ কুমার দেপূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৫

.        শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ৫ম Ð, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৯৬

.        মনতোষ কুমার দেপূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৫

১০.      বিলু কবির, প্রামাণ্য সালাহউদ্দিন, গতিধারা, ঢাকা, ২৬ মার্চ ২০১২, পৃ.১১ এবং ৬২

১১.       মো. আসাদুজ্জামান, ৬ষ্ট Ð, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪২০

১২.      মো. আব্দুল ওয়াহাব, ৭ম Ð, পূর্বোক্ত, পৃ.

১৩.      মো. তাজুল ইসলাম, ৯ম Ð, পূর্বোক্ত, পৃ.১৩২১৩৪

১৪.      মো. ওসমান গনী, ১০ম Ð, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৪৭৩৪৯

ঠাকুরগাঁও জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
Comments Off
47 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:২৬ অপরাহ্ণ

রণরঙ্গিনী একাত্তরের কুড়িগ্রাম

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। দিনে দিনে আমাদেও স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনী অনেকের কাছেই শুধুমাত্রই থাকছে মুক্তিযুদ্ধের কল্পনা প্রসূত গল্প হিসেবেই। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে সেসবের পার্থক্য অনেক বেশি। অসীম সাহস নিয়ে শত্রæ মোকাবেলা করতে যারা বীরত্ব পূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের অনেকের লেখার হাত নেই। না বলতে বলতে, না লিখতে লিখতে, না আলোচনা করতে করতে নিজেদের অসম কৃতিত্বের কাহিনী ভুলে যাচ্ছেন বীরযোদ্ধারা। ১৯৭১ সালে সম্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন বহু মুক্তিযোদ্ধা আর

বহু মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের দ্বারা অত্যাচারিত নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। স্বাধীনতার যুদ্ধে বীরদের আত্মত্যাগ আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করে, ব্যথিত করে গর্বিত করে। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত যাওয়ার পর দীর্ঘ ১৯০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করে এই উপমহাদেশের মানুষ পেয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র। পাকিস্তানি শাসকরা যখন বাঙালিদের নতুন করে শোষণ পরাধীনতার শৃঙ্খলের বেঁধে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, ঠিক তখনই জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার অভ্যুদ্বয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তির মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বাঙালিদের লৌহ কঠিন ঐক্য গড়ে তুলেছিল। মাস রক্তক্ষয়ী গৌরবোজ্জল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বাংলার মানুষ অর্জণ করে স্বাধীন বাংলার লালসবুজের পতাকা। বাংলার এই স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে দীর্ঘ ২৪টি বছর। সংগ্রামের একমাত্র নেতা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সফলতার দুঃসাহসীক কাহিনী সমন্ধে জাতি আজও রয়ে গেছে অজ্ঞ। যুদ্ধের মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের রণকৌশল, প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার আলোকিত ঘটনাসমূহ বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের সহযোগীদের দ্বারা যে নির্যাতন গণহত্যা চালানো হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শোকাবহ হৃদয় বিদায়ক ইতিহাস। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির ২৩ বছরের রক্তঝরা সংগ্রাম শেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে সারা বাংলার জনগণকে অপরিসীম ত্যাগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একাত্তরের রণাঙ্গনের কোন সমন্বিত চিত্রাবলী আমাদের নেই। ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠীর চেতনার যে বিচ্ছিন্ন চিত্র আছে তার সমন্বয় সাধনের চেষ্টাও আশানুরুপ নয়। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ আজও মৃত্যুর বেদনা বহন করছি বুক ভরে। পাকিস্তানি বাহিনী বাংলার কুলাঙ্গার রাজাকার আলবদর বাহিনীর অনাচার অত্যাচারের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করছি চলচ্চিত্র, গল্প, কবিতা অথবা স্মৃতি কথায়। মুক্তিযোদ্ধারা সারা বাংলার মানুষের পক্ষেই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তাদেও একটাই লক্ষ ছিল বাংলার স্বাধীনতা অর্জন করা। বঙ্গবন্ধুর আহŸানে সাড়া দিয়ে বাংলার সর্বস্তরের জনগণ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধেও সমর্থনে থাকা মানুষগুলো ভালোবাসতো মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে খাওয়াতেন, বিশ্রাম এর ব্যবস্থা করতেন। হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আলবদরদের খবরা খবর গতিবিদি সম্পর্কে সর্তক করে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ এর রণাঙ্গনে সারা বাংলার ন্যায় কুড়িগ্রাম তৎকালীন মহুকুমা জেলার আনাচে কানাচে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিলো। বিভিন্ন বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প তৈরী করেছিলেন। স্বাধীন দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারীদের অবদান কোন অংশে কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে কুড়িগ্রাম মহুকুমা জেলা শহরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মজিবর রহমান তাঁর বাবা মরহুম মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ ভেন্ডার সাহেবের সাথে পরামর্শক্রমে নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প স্থাপন মানুষের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনের অসামান্য অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাএবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামপাওয়ার পরেই মফিজ উদ্দিন ভেন্ডার তার বড় ছেলে মজিবর রহমানের সাথে পরামর্শ ক্রমে বাড়ি ফাঁকা করে তাদের পরিবারের শিশুনারী বৃদ্ধদেরকে নিয়ে নাগেশ্বরীতে আত্মীয়র বাসায় উঠেছে। সাংবাদিক মজিবর রহমান মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে যুক্ত থেকে পুরাতন রেল স্টেশন এলাকায় যুবকদের একত্রিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প তৈরি করেন।

১০ মার্চ কুড়িগ্রামে ঘোষপাড়ায় আহমেদ আলী বকসীর গোডাউনে স্বাধীনতাকামী কুড়িগ্রামের সকল রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী এবং ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো এক সভা। সভায় গঠিত হলো ৫১ সদস্য বিশিষ্ট মহুকুমা সংগ্রাম কমিটি। এক সপ্তাহের মধ্যেই কুড়িগ্রামের আট থানা (লালমনিরহাট সহ) গঠিত হলো থানা সংগ্রাম কমিটি। আহমেদ আলী বকসীর গোডাউনে জেলা সংগ্রাম কমিটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হলো। আহমেদ হোসেন সরকারের টগরাইহাটের বাড়িতে গড়ে তোলা হলো প্রতিরোধ দুর্গ। কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়া, পুরাতন পোষ্ট অফিস পাড়া এবং পুরাতন স্টেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোদ্ধা তৈরির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হলো। ক্যাম্পগুলোতে অনেকেই সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে তত্ত¡াবধানে একদিকে চালাতে থাকলো ছাত্র যুবকদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, অন্যদিকে চালাতে থাকলো মিছিল মিটিং সহ ব্যাপক গণসংযোগ। অনুরূপ কর্মসূচি চলতে থাকলো প্রতিটি থানা সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে। ১৭ মার্চ কুড়িগ্রাম চিলড্রেন পার্কে ছাত্র সংগ্রাম কমিটির আহŸানে ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। সমাবেশের পরিকল্পনা করলেন সংগ্রাম কমিটিকে সাথে নিয়ে অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার। সমাবেশে সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মাঝে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হলো। ছাত্রনেতা আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, রওশন উল বারী, সিরাজুল ইসলাম টুকু, রোকনুদৌলা মন্ডল, মোকাররম হোসেন সাচ্চু সহ অনেকের নেতৃত্বে উপস্থিত ছাত্র জনতা নিজ নিজ শরীরের সুঁচ ফুটিয়ে রক্তে ভিজে স্বাধীনতার জন্য রক্ত শপথ উচ্চারণ করলো। ১৭ মার্চ কুড়িগ্রামের চিলড্রেন পার্কের ছাত্র সমাবেশের পর অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার গ্রামের বাড়ি রুঙ্গামারী শিংঝাড়ে চলে এলেন। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের বড় ভাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ তালুকদারের সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা করে স্থানীয় ছাত্র জনতাকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করার কাজ শুরু করলেন। অধ্যাপক গ্রামের বাড়ির এলাকায় ইপিআর, আনসার, ছাত্র জনতাকে সাথে নিয়ে ভূরুঙ্গামারীর আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। প্রথমে মাস খানেক মানিক কাজী গ্রামে শ্বশুর মরহুম মোসলেম উদ্দিন মাস্টারের বাড়িতে আস্থানা থাকলো সংগঠক অধ্যাপকের। এই আস্থানায় থেকে আশপাশের যুবকদেও সংগঠিত করার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। শ্বাশুরী মরিয়ম বেগম নিয়মিত রান্না কওে খাওয়াতেন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণকারী সকল মুক্তিযোদ্ধাদের। সামাদ তালুকদার চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলো। ২৫ শে মার্চ রাত ১২টায় শুরু হলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট। শুরু করা হয় ঘুমন্ত নিরস্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বর হামলা। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র চট্টগ্রামের কালুরঘাট অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার প্রচার করা হলো। আকাশ বাণী, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা বেতারের সংবাদের মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলার গণহত্যা নৃশংস ঘটনা প্রচার হতে থাকে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ওই দিন কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটি ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ঘোষপাড়াস্থ বকসী সাহেবের গোডাউনে এক জরুরী সভায় মিলিত হয়ে সুদীর্ঘ কর্মপন্থা নির্ধারণ করলো। ২৮ মার্চ কুড়িগ্রাম গহরপার্ক মাঠে জনসভায় সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখলেন এড. আমান উল্লাহ, সাংবাদিক মজিবর রহমান, মনছুর আলী টুনকু, ছাত্র নেতা আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, মো. সিরাজুল ইসলাম টুকু সহ অনেকেই। বক্তারা সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহŸান জানায়। মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির নেতারা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মর্মকথা তুলে ধরলেন সাধারণ মানুষের মাঝে।যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রæ মোকাবেলা করতে হবে এই উৎসাহ প্রদান করলে জনসভায় উপস্থিত সাধারণ জনগণ মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ¯øাগান দিতে থাকলো।

গহরপার্কের ওই দিনের জনসভায় কুড়িগ্রামের এসডিও মামুনুর রশিদ, এসডিপিও জালাল উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে। ২৮ মার্চ রংপুরের ইপিআরের ১০নং উইং সদর দপ্তরের বাঙালি সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন বিদ্রোহ করে সুবেদার বোরহান উদ্দিন, সুবেদার আরব আলী নায়েব সুবেদার নুর মোহাম্মদ সহ দলবল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোগদানের উদ্দেশ্যে তিস্তা নদী পাড় ঘেষে কাঁচা রাস্তা ধওে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে প্রবেশ করে। উলিপুরের থেতরাই এলাকার পানি আয়ালের ঘাট দিয়ে তিস্তা নদী পাড় হয়ে কুড়িগ্রামে প্রবেশ করে মহুকুমা সংগ্রাম কমিটিতে যোগ দেন। মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধরলা নদীর তীরবর্তী স্থানে পুরাতন স্টেশনে আনসার কমান্ডার সাংবাদিক মজিবর রহমানের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে উঠেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন। রংপুর ইপিআর ১০নং উইং সদর দপ্তরে বিদ্রোহ করে আসা সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন তার দলবল নিয়ে মফিজ উদ্দিন ভেন্ডার সাহেবের বাড়িতে অবস্থান করেই প্রতিরক্ষার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নির্দেশে কুড়িগ্রাম সীমান্তের সকল ইপিআর ক্যাম্পে অবাঙালি সৈনিকদের হত্যা করে অস্ত্র গোলা বারুদ সংগ্রহ করা হলো। কুড়িগ্রামের সীমান্তে সকল বাঙালি ইপিআর সৈনিকরা অস্ত্র গোলা বারুদ নিয়ে কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর তীরবর্তী এলাকার চরে সমবেত হলেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির নেতাদের সাথে নিয়ে ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মোজাহিদ এবং প্রশিক্ষিত ছাত্র জনতার সমন্বয়ে গঠন করলেন শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী। তিস্তা ব্যারেজ কুড়িগ্রাম লালমনিরহাটের প্রবেশদার। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ চেষ্টা করতে লাগলেন এই ব্যারেজ পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেন এই অঞ্চলে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি তার গঠনকৃত শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী দিয়ে তিস্তার পারে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করার পরিকল্পনা নিলেন। মার্চের শুরুতেই ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রæ রংপুর আশপাশের অঞ্চলের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নেতৃত্বে সিরাজুল ইসলাম টুকু, সেনাবাহিনীর সদস্য আবুল কাশেম (ড্রাইভার), সাংবাদিক মজিবর রহমান, আবুল কাশেম কমিশনার, মানিক, আব্দুস সামাদ, হবিবর, আমানুর রহমান, মোকছেদ, নুরুজ্জামান, গোলাম রব্বানী ড্রাইভার, আব্দুল করিম মধু, নজরুল ইসলাম, সেকেন্ড লে. ইউসুফ আলী, বাবর আলী ড্রাইভার, নুরল ইসলাম নোলেসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। কুড়িগ্রাম সীমান্তের ইপিআর ক্যাম্প থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র গোলা বারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বণ্টন করা হলো। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটির সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্বে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হওয়া ছাত্রজনতা প্রশিক্ষিত ইপিআর, পুলিশ, আনসার মোজাহিদের মাধ্যমে বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে যুদ্ধেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন অস্ত্র গোলাবারুদ বরাদ্দ দিলে কুড়িগ্রাম পোস্ট অফিস পাড়াস্থ সম্ভ্রান্ত নাজির আব্দুল গফুর সাহেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র রিভার ভিউ হাই স্কুলের ছাত্রলীগ সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম টুকু বাবার লাইসেন্সকৃত পয়েন্ট টু টু রাইফেল জমা দিয়ে থ্রি নট থ্রি রাইফেল বরাদ্দ পান। একই সাথে থ্রি নট থ্রি রাইফেল বরাদ্দ পেয়েছেন মোল্লা পাড়ার আমানুর রহমান, মুন্সি পাড়ার মো. নুরুজ্জামানসহ অনেকেই। কুড়িগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রাম শহরের মুখে ডিফেন্স নিলেন, যাতে করে পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে সহজে প্রবেশ করতে না পারে। কুড়িগ্রাম শহরের মুখে ডিফেন্স নেয়ার পূর্ব মুহুর্তে মো. নুরুজ্জামানের বরাদ্দ পাওয়া রাইফেলটির ট্রিগার আটকে যায়। মাধবরাম মুন্সি পাড়া গ্রামের নিধি মামুদের সাহসী ছেলে যুবক নুরুজ্জামান বরাদ্দ পাওয়া তার রাইফেলটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কুড়িগ্রাম শহরের মুখে ডিফেন্স নেয়ার উদ্দেশ্যে তরিঘরি করে অচল রাইফেলটি নিয়ে পুরাতন রেল স্টেশনের মফিজ উদ্দিন ভেন্ডারের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে হাজির হলেন নুরুজ্জামান। সে সময় ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন, সুবেদার বোরহান উদ্দিন সহ অন্য ইপিআর সদস্যরা বিশ্রাম করছিলেন। নুরুজ্জামান ব্যস্ত হয়ে উঠেন তার অচল রাইফেলটি সচল করার জন্য। বিশ্রামে থাকা ইপিআর সদস্য ঘুমন্ত আনিছ সাহেবকে জাগিয়ে তুললো সাহসী যুবক নুরুজ্জামান। ভেন্ডার সাহেবের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা আনসার কমান্ডার সাংবাদিক মজিবর রহমান শাসন মুলক একটু ক্ষিপ্ত হলেন নুরুজ্জামানের প্রতি। মজিবর রহমান নুরুজ্জামানকে উদ্দেশ্য করে কড়াগলায় বকাঝকা করলেন। তিনি নুরুজ্জামানকে বললেন, ‘বন্দুক চালাতে পারিস না, যুদ্ধ কেমন করে করবি। তোকে কে এই বন্দুক দিয়েছে। তুই এতো তাড়াতাড়ি বন্দুকটি নষ্ট করে ফেললি কেন।

নুরুজ্জামান দুচোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে– ‘বড় ভাই আমাকে শিখিয়ে দিলে আমি পারবো। বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছে দেশ স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি শোষকের কবল হতে মুক্ত করতে হবে।যুবক নুরুজ্জামানের সাহস মনোবল দেখে মজিবর রহমান ইপিআর সদস্য আনিছ সাহেব খুশি হয়ে একটি রড রাইফেলের নলায় বিশেষ কায়দায় ঢুকে দিয়ে ট্রিগারটি সচল কওে দিলেন। তারা নুরুজ্জামানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যা ভাই বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করবি। পাকিস্তানি সেনাদের কবল থেকে এই দেশকে মুক্ত করবি বন্দুক সচল হওয়ায় নুরুজ্জামান আনন্দিত হয়ে প্রতিরক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলো। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ চেষ্টা করতে লাগলেন এই ব্রীজ পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেন এই অঞ্চলে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি তিস্তার পাড়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করলেন। এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে কুড়িগ্রাম লালমনিরহাটকে নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে তিস্তা ব্রিজের উত্তর প্রান্তে মুক্তিবাহিনী প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধ হলো তিস্তার উত্তর প্রান্তে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে পিছু হটে যায় পাকিস্তানি বাহিনী।

এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কৌশলে হারাগাছ হয়ে লালমনিরহাটে প্রবেশ করল। অনেক ভারী অস্ত্রে সস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তি বাহিনীর তিস্তা ব্রিজের প্রতিরোধের উপর তীব্র থেকে তীব্রতর আক্রমণ শুরু করল। তীব্র চাপের মুখে ডিফেন্স প্রত্যাহার করে এপ্রিল কুড়িগ্রাম শহরে ফিরে আসলো মুক্তিযোদ্ধারা। এসেই চিলড্রেন পার্কে এক জনসভার মাধ্যমে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে আহŸান জানালো। শহর ছেড়ে জনগণ নিরাপদ স্থানে চলে গেলে কুড়িগ্রাম শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর কুড়িগ্রামের হেড কোয়ার্টার ধরলা নদীর উত্তরে নাগেশ্বরী থানায় স্থানান্তর করা হলো। এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী সাঁজোয়া বহর নিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে কুড়িগ্রামের দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর অপ্রতুল প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে এলোপাতারি গুলি বর্ষণ করতে থাকে। কুড়িগ্রাম জেলখানার ইনচার্জ সহ পাঁচ জন কারারক্ষীকে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করলো। ব্রাশে তৎক্ষনাৎ শহিদ হয় জন। আহত জেল ইনচার্জ ঐদিন দিবাগত রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পাকিস্তানি সেনারা এদিন কুড়িগ্রাম দখলে না নিয়ে কুড়িগ্রামের অভিমুখে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ফেরত গেল। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা টগরাইহাটের বড় ব্রীজ ছোট ব্রিজের আশপাশের এলাকা সহ বেলগাছা, কাঁঠালবাড়ী কুড়িগ্রাম নতুন শহর এলাকায় শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। ১৪ই এপ্রিল কুড়িগ্রাম দখলে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশের চেষ্টায় উপনীত হলো। মুক্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের

মুখে শহরে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী টগরাইহাট বড় ছোট পুলের পাড়ে ইটভাটার আশপাশ এলাকায় অবস্থান নিল। দিনের মধ্যভাগ হতে সারারাত ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। তুমূল গোলাগুলির মধ্য দিয়ে রাত অতিবাহিত হলে যুদ্ধে আরো জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলেন। পরের দিন হানাদার বাহিনী প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হতাহত নিয়ে তিস্তা অভিমুখে ফেরার পথে রেল লাইনের দুপাশের ইটভাটা আশপাশের বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ করে জ্বালাও পোড়াও সহ অনেক অসহায় গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করলো। মুক্তিযোদ্ধার হেড কোয়ার্টার নাগেশ্বরী থেকে ভূরুঙ্গামারীতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ এর নির্দেশে নতুন শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ সাধ্য অনুযায়ী আরো শক্তিশালী করা হলো। ২০ এপ্রিল টগরাইহাট ছোট পুলের পাড়ে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিলো। ট্রেনে করে পাকিস্তানি বাহিনী শহরে ঢোকার সময় মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে তুমূল যুদ্ধ চললো প্রায় ঘণ্টা ব্যাপি। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হলো। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বোমা ফেটে অনেকে ঝলসে গেল। নতুন শহরে প্রতিরোধে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে পাঁচগাছী ঘাট দিয়ে ধরলা নদীর ওপারে চলে আসতে লাগলো। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গরুর গাড়িমহিষের গাড়ি করে পাঁচগাছীযাত্রাপুর হয়ে চিকিৎসার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হেড কোয়াটার ভুরুঙ্গামারীতে নেয়া হয়। দিকে পাকিস্তানি বাহিনী কুড়িগ্রাম শহর পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে তারা কয়েকটি স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করলো। মুক্তিযোদ্ধা ভূরুঙ্গামারী হেড কোয়াটারের সাথে সমন্বয় করে ধরলা নদীর এপাড়ওপাড় যুদ্ধ চালাতে থাকলেন মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা পাঁচগাছী উত্তর নওয়াবশ ধরলা নদীর পাড়ে মতিয়ার রহমান সরদারের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ চালাতে থাকলেন। এই বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত ছিল। ধরলা নদীর পাশে ছড়া নদী বেষ্টিত থাকায় পাকিস্তানি বাহিনী খুব সহজেই ধরলা নদী পাড় হয়ে এই জায়গায় আসা দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। প্রতি রাতে তুমূল গুলি ছোড়াছুড়ির মধ্যদিয়ে চলছিল যুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনী শহরের এপাড় থেকে গুলি ছুড়তে থাকে। পাল্টা জবাবে মুক্তিযোদ্ধারা মতিয়ার রহমানের বাড়ি এবং বাড়ির আশপাশ এলাকা থেকে গুলি ছুড়তে থাকে। ক্রমশ যুদ্ধ বাড়তে থাকায় গ্রামের মানুষ এই এলাকা ছেড়ে যাত্রাপুর সহ বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে যেতে শুরু করে। মতিয়ার রহমান সরদার পাঁচগাছী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে তিনি সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। উত্তর ধরলা শত্রæ মুক্ত রাখতে পাটেশ্বরী বিএস কোয়াটার, আলমআজাদের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধার অস্থায়ী ক্যাম্প, নাগেশ্বরী ক্যাম্প রুঙ্গামারী কলেজ এবং পাইলট স্কুলের মুক্তিযোদ্ধারা ধরলা নদীর বাম তীরে অবস্থান নিয়ে প্রতি রাতে কুড়িগ্রামে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। দীর্ঘ সোয়া মাস ব্যাপী চলমান ছিল ধরলা নদীর এপাড়ওপাড়ের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুক্তিসেনারা জীবনকে বাজি রেখে উত্তর ধরলা যথাক্রমে নাগেশ্বরী রুঙ্গামারীকে হানাদার মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ এর ২৫ মে রাজাকারদের সহযোগিতায় ড্রামের ফারাজ তৈরি করে পাকিস্তানি সেনারা কৌশলে ধরলা নদী পাড় হতে সক্ষম হয়। শত্রæ পক্ষ ধরলা নদীর পাড় হলে প্রতিরোধে থাকা মুক্তিসেনারা শত্রæ পক্ষের প্রচন্ড আক্রমণের কবলে পড়ে যায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুক্তিসেনার দল ছত্র ভঙ্গ হয়ে একে অপরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ২৬ মে হানাদাররা তাদের আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর করতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ সরঞ্জাম ফুরিয়ে এলে ভোগডাঙ্গার প্রতিরক্ষা অবস্থান ভেঙ্গে যায়। যুদ্ধে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ছত্রভঙ্গ ভাবে পিছু হটতে হটতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কওে ফেললেন। রাজাকারের মাধ্যমে ভোগডাঙ্গার একটি পুরাতন বিল্ডিংয়ে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ার্লেস অপারেটরকে হাতে নাতে ধরে ফেললেন পাকিস্তানি সেনারা। ছলচাতুরী করে মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেটরকে দিয়ে ভুরুঙ্গামারীতে মুক্তিযোদ্ধার হেড কোয়ার্টারে বার্তা পাঠানো হলো যুদ্ধে থাকা ভোগডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা প্রয়োজন। এই বার্তা পেয়ে নাগেশ্বরী হতে বসন্ত নির্মলের সাদা জিপে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভোগডাঙ্গা আসতে থাকলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এম্বুশে পরে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলেন। আহত হলেন অনেকেই। বড় ট্রাকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের ২য় গাড়িটি রকেট লেন্সে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে গেলো। এতে করে আরো শহিদের সংখ্যা বাড়লো। বাড়লো আহতের সংখ্যাও। ভোগডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা করতে চাওয়া তৃতীয় বাসটি পথিমধ্যে থেমে যাওয়ায় হতাহতের হাত থেকে বেঁচে যায় সিরাজুল ইসলাম টুকু, ফজলুল সহ অর্ধ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। ২৭ মে ওঁৎপেতে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর এম্বুশে পরে মোট ১৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসনাবাদ এলাকায় আব্দুল ওয়াহাব প্রধান, আসাদ আলী, রইচ উদ্দিন, আব্দুল জব্বার, আবুল কালাম আজাদ, আবুল কাশেম, সেকেন্দার আলী, আব্দুল আলী, এস.এম আবুল কাশেম, আনছার আলী, আবুল ড্রাইভার, খয়বর আলী, গোলাম রব্বানী ড্রাইভার, আফজাল হোসেন ড্রাইভার, দেলোয়ার হোসেন, আতিকুর রহমান মোজাম্মেল হক শহিদ হন। ২৭ মে নাগেশ্বরী দখলে নিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নির্দেশ সিরাজুল ইসলাম টুকু সহ ১৫১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শত্রæকে সহজে রুঙ্গামারী দখলে নেয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে রায়গঞ্জ ব্রিজটি বম্পিং করে গুঁড়িয়ে দিলো। এরপর ২৮ মে ভূরুঙ্গামারী দখলে নিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের প্রচেষ্টায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চিমবঙ্গে কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জে সমবেত হলো। পরে সাহেবগঞ্জে স্থাপন করা হলো মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়াটার। কুড়িগ্রাম কলেজের ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার সহযোগিদের সাথে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের প্রচেষ্টায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জে সমবেত হলো। পরে

সাহেবগঞ্জে স্থাপন করা হলো মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়ার্টার। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার সহযোগিদের সাথে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন। ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম কালমাটিতে বড়ভাই আজিজ তালুকদারের শ্বশুর আলহাজ্ব শামসুদ্দিন সাহেবের বাড়িতে এবং তার অন্যান্য আত্মীয়দের বাড়িতে অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তুললেন। বাংলাদেশের আশপাশের গ্রামের ছাত্র জনতাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণের কাজ পুরোদমে শুরু করা হলো। কালমাটি গ্রাম একেবারেই সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল হতে

মুক্তিযোদ্ধা শিবিরকে দেড় কিলোমিটার দূরে বামনহাটের বিজয় বাবুর বাড়িতে স্থানান্তর করলেন অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদার। ৭১এর পহেলা মে থেকে অধ্যাপক বামনহাট যুব শিবিরের ক্যাম্প অধিনায়ক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছেন। ক্যাম্পকে সহযোগিতা করছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শামসুল হক চৌধুরীসহ স্থানীয় অন্যান্য রাজনৈতিকরা। বামনহাট যুব শিবির হতে মানিক কাজী গ্রামের শ্বশুর বাড়ি শিংঝাড় গ্রামের নিজ বাড়ি এবং কালমাটি গ্রামের আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর নিয়মিত নিতেন এই বুদ্ধিজীবি। ১২ জুলাই কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সুশৃঙ্খল নিয়মাতান্ত্রিক ভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রত্যেক সেক্টরের সীমানা নির্ধারণ সেক্টর অধিনায়ক মনোনীত করা হল। কুড়িগ্রাম সীমানা নির্ধারণ সেক্টর অধিনায়ক মনোনীত করা হল। কুড়িগ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম দিকের (চিলমারী উলিপুরের কিয়দাংশ ছাড়া) এলাকা সমূহ ৬নং সেক্টরে সাহেবগঞ্জ সাব সেক্টর এবং উলিপুর আংশিক চিলমারী শহর পূর্ব পাশ্বের এলাকা সমূহ ১১নং সেক্টর মানকারচর সাব সেক্টরে অন্তর্ভূক্ত হল। ৬নং সাব সেক্টরের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন মনোনিত হয়েছে। ১১ নং সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হলেন মেজর আবু তাহের এবং মানকারচর সাব সেক্টর কমান্ডার হলেন উইং কমান্ডার হামিদুল্ল্যাহ খান। ৬নং সেক্টরের অধিনায়ক এম কে বাশারের নির্দেশে বামনহাট যুব শিবিরের কর্মকান্ড চালাচ্ছেন অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদার। বিশিষ্ট শিক্ষক এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি হওয়ার সুবাদে বামনহাট মুক্তিযোদ্ধার যুব শিবির হতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে অধ্যাপক স্থানীয় যুবক জনতাকে রিক্রুট করা এবং মোটিভেশনের কাজ করছেন। যুদ্ধ শিবিরে বেশ কিছু শিক্ষক এবং ছাত্র যোগদান করায় ভারতীয় সেনা বাহিনী বামনহাট ক্যাম্পকে হেড মাস্টার্স ক্যাম্প ওয়াহাব তালুকদারকে ক্যাম্পের অধিনায়ক না বলে অধ্যক্ষ বলে সম্বোধন করতো। ওয়াহাব তালুকদার ক্যাম্পের বয়োজ্যৈষ্ঠ যোদ্ধাদের রেকি পেট্রোল নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যৎ অপারেশনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতেন। বাংলাদেশের ভিতরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করে উপদেশ দেওয়া অসুবিধা দূরীকরণের কাজ করছেন অধ্যাপক। আগস্ট একটি অপারেশনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন ওয়াহাব তালুকদার। ৯টায় সকালের নাস্তা (পান্থাভাত) খেয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াহাব তালুকদার বেড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করতে রওনা হলেন তিনি। পথিমধ্যে বড়ভাই সামাদ তালুকদারের সাথে দেখা হয় এবং তাকে ঐদিন কোথাও যেতে নিষেধ করলেও তিনি শোনেননি। যাত্রাসঙ্গী ছিলেন আবুল কাশেম মাস্টার, ডা: মজিবর রহমান, কালমাটি গ্রামের পঞ্চায়েত আব্দুর হামিদ হামু, সর্বকনিষ্ঠ যোদ্ধা মোজাম্মেল হক খোকা। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ভিতরে অবস্থানরত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা তাদের সহযোগিতা করা। মুক্তিযোদ্ধার গেরিলা দলটিকে অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার যুদ্ধের বিষয়ে সেক্টর সদর দপ্তর প্রণীত নির্দেশ ব্যক্তিগত পরামর্শ দিচ্ছেন। গেরিলা দলের সবাই ক্ষুধার্ত। দীর্ঘক্ষণ জঙ্গলে অবস্থান করায় খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেনি তাদের দলনেতা। অধ্যাপকের সাথে থাকা কয়েকজন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাকে নিকটবর্তী গ্রাম থেকে খাদ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দিলেন। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা বিশ্রাম করছে। পুরো দলের নিরাপত্তার জন্য তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ফরহাদকে তাদেও অবস্থানের কিছুদূরে বগনী ব্রিজের পূর্ব পার্শ্বে একটি উঁচু গাছে উঠিয়ে দিয়ে পাহারায় নিয়োজিত করলেন। দোসরদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বগনী ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের তথ্য জানতে পারলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল অতি গোপনে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পরিত্যক্ত রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে অবস্থান নেয়। সময় ফরহাদ তাদের এগুতে দেখে চিৎকার করে মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই শত্রæ দলের একজন সৈনিক ফরহাদের উপর গুলি চালায়। সাথে সাথেই ফরহাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে গাছ থেকে নিচে পড়ে শহিদ হন। গুলির শব্দে অন্যন্য মুক্তিযোদ্ধারা সতর্ক হলেও তাদের কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই পাকিস্তানিরা তাদের উপর প্রচন্ডভাবে মর্টার মেশিনগানের গুলি অতর্কিতভাবে চালাতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই ছত্রভঙ্গ হয়ে হতভম্ভ হয়ে যান। সময় অধ্যাপক আব্দুর ওয়াহাব তালুকদার মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পিছনে নিরাপদ স্থানে হটে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সকল মুক্তিযোদ্ধাদের পিছনে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি নিজে রেল লাইনের পাশ দিয়ে নিরাপদ অবস্থান খোঁজার জন্য দ্রæ দৌড়াতে থাকেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি বাহিনী যেন কোন ক্রমেই অন্য কোন মুক্তিযোদ্ধাদের অনুসরণ করতে না পারে। সময় তার সহযোগি যোদ্ধারা তাকে রেল লাইন দিয়ে সোজা না গিয়ে পাশের কোন রাস্তা দিয়ে ঢুকে পড়ার কথা বললেও তা তিনি শুনলেন না। হয়তোবা তিনি ভেবেছিলেন হানাদার বাহিনী ভারতে প্রবেশ করবে না। তাই তিনি সোজা দৌড়াতে থাকেন এবং শত্রæ পক্ষ ব্রাশ ফায়ার করতে করতে তাকে অনুসরণ করে প্রায় / (আধা) কিলোমিটার ভারতের ভিতরে প্রবেশ করে। তখন তাকে লক্ষ্যকৃত পাকিস্তানিদের ছোঁড়া গুলি প্রথমে তার পায়ে লাগলো। তিনি আহত অবস্থায় জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করেন। হানাদার বাহিনী তাকে অতিক্রম করে আরো ভিতরে প্রবেশ করে। অধ্যাপক আহত অবস্থায় তীব্র যন্ত্রণা কাতরাতে থাকেন। একজন মৃত্যু পথের যাত্রীর জীবনে বেঁচে থাকাই শেষ সাধ হলেও বেঁচে থাকার সাধ্য যে থাকে না তা ঘটেছে এই মুহুর্তে, এটা যে কতো মর্মস্পর্শী এবং হৃদয় বিদারক তা শুধু তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। নরপিচাশের দলটি জঙ্গল থেকে শব্দ শুনে তাকে ধরে ফেলে। সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র পেয়ে রক্ত পিপাসু হানাদাররা আক্রোশে ফেঁটে পড়ে এবং হাতের ঘড়িসহ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয়। ব্যায়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অধ্যাপকের বুকটাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের পড়নের লুঙ্গি শার্ট রক্তে ভিজে মাটিতে চুয়ে চুয়ে পড়লো। শহিদ অধ্যাপকের রক্তে ভিজে গেলো বাংলার মাটি। এই রক্তে ভেজা মাটি আগাম জানিয়ে দিলো স্বাধীন বাংলার বিজয়ের শুভ বার্তা। শত্রæপক্ষ মৃত্যু নিশ্চিত করে শহিদ বুদ্ধিজীবির রক্তাক্ত দেহটিকে পার্শ্ববর্তী ডোবায় ফেলে দিয়ে চলে আসে। স্থান ত্যাগ করার সময় আশপাশের গ্রামের উপর লক্ষ্যহীনভাবে অনবরত মর্টার মেশিনগান ফায়ার করতে থাকে। আশপাশের গ্রামের প্রায় ৩২ জন নারী, পুরুষ শিশু লক্ষ্যহীন ফায়ারে আহত হলো। আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার বন্দোবস্ত না থাকায় গ্রামবাসী তাদের ভারত সীমান্তে অবস্থানরত বিএসএফ এর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বিএসএফের সংবাদের ভিত্তিতে কিছুক্ষণ পর কুচবিহার সেনানিবাস থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জোশী আসেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কিছু সামরিক গাড়ী এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে আহতদের কুচবিহার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেয়। অধ্যাপক ওয়াহাবের মরদেহ তার সহযোদ্ধা স্থানীয় জনগণ গোলাগুলি বন্ধ হলে ডোবা থেকে উদ্ধার করে ভারতের কুচবিহার জেলার দিনহাটা মহুকুমার কালমাটি (ভারতবাংলাদেশ বর্ডার পিলার নং৯৫৪ সংলগ্ন) নামক স্থানীয় মসজিদ চত্ত¡রে নিয়ে আসে। অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদারের পরিবার এই গ্রামের আত্মীয়ের বাড়িতে যুদ্ধকালীন সময়ে অবস্থান করছিল। মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ ভেন্ডার সাহেবের পুত্র মজিবর রহমান, আজিজুল ইসলাম বড় খোকা, আনিসুর রহমান বাবুল, জামাতা কফিল উদ্দিন হারুন উর রশিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে রণাঙ্গণে সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। পুরাতন রেল স্টেশনের আশপাশ গ্রামের প্রায় সকল বাড়ি থেকেই অনেক যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। পুরাতন রেল স্টেশন এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে ক্রীড়াবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম টুকু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কেষ্ট সরখেল, হোসেন আলী মংলা, ওছমান গনী, আবুল কাশেম, ফয়জার রহমান, বদিউল আলম সাজু, গোলাম রব্বানী ড্রাইভার, আয়নাল হক, গোলাম রব্বানী, মানিক মিয়া, হানিফ মিয়া, মাহফুজার রহমান মাফু, মোস্তাফিজার রহমান মধু, নুরল ইসলাম নোলে, আব্দুল মজিদ, আজিজুল ইসলাম, মো. নুরুজ্জামান, মো. আফজাল হোসেন, আব্দুল জব্বার ড্রাইভার, আব্দুল জব্বার ছক্কু, আব্দুর রহমান, একেএম সাইফুল আলম জিলু, মহির উদ্দিন ড্রাইভার, একাব্বর আলী, আফজাল হোসেন (ট্যানারী), আব্দুল জলিল, আব্দুস সবুর বাবুল, মো. রিয়াজুল ইসলাম, আব্দুল আহাদ, এবিএম মুসা, আব্দুস সামাদ সহ আরো অনেকে। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে কুড়িগ্রাম শহর ছাড়া মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে। পাকিস্তানি সেনাদের সমর্থনে থাকা শহরের বেশ কয়েকটি বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা উড়েছিল। পাকিস্তানের দোসরেরা তাদের নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে সেখানেও পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছিল। উত্তাল একাত্তুরে সারা বাংলার মুক্তিকামী মানুষগুলো পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে মুক্তি পেতে এবং স্বাধীনতা পেতে সামর্থ অনুযায়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কুড়িগ্রাম মহুকুমার থানার মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক দুঃসাহসীক যুদ্ধ কলায় কোনঠাসা ছিল পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। কুড়িগ্রাম মহুকুমার সদর, নাগেশ্বরী, রুঙ্গামারী, রাজারহাট লালমনিরহাট ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৬নং সেক্টরের অধীনে এবং উলিপুরচিলমারী রৌমারী থানা ১১নং সেক্টরের আওতাধীনে থাকা মুক্তিযোদ্ধার নিয়মিত বাহিনী গেরিলা বাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ব্যুহ তৈরি করে। মফিজ উদ্দিন আহাম্মেদ ভেন্ডারের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়া ২য় পুত্র আজিজুল ইসলাম বড় খোকা বড় জামাতা মো. কফিল উদ্দিন ভারতে মুক্তিযোদ্ধা হায়ার ট্রেনিং করে ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, রুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম সদর লালমনিরহাট তিস্তাপাড়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করতে থাকে। কনিষ্ঠ পুত্র আনিছুর রহমান বাবুল ভারতে হায়ার ট্রেনিং শেষ করে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও দিনাজপুর এলাকায় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২য় জামাতা হারুনঅররশিদ ভারতের হায়ার ট্রেনিং শেষে লালমনিরহাট, বুড়িমারী, ফুলবাড়ী, তিস্তা হারাগাছ এলাকায় মুক্তিবাহিনীর সাথে যুক্ত থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। জ্যেষ্ঠ পুত্র সাংবাদিক মজিবর রহমান মুক্তিযোদ্ধার নিয়মিত বাহিনীতে থেকেই কুড়িগ্রাম মহুকুমার থানায় মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপন লড়াই করতে থাকেন বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন করতে প্রথম পাকিস্তানি সেনা মুক্ত করা হয় কুড়িগ্রামের রুঙ্গামারী বাগভান্ডার। মরণাপন যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নতি স্বীকার করে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ এর ১৪ নভেম্বর ভূরুঙ্গামারী হানাদার মুক্ত করে। ২৩ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী, মিত্র বাহিনী বিমান বাহিনীর যৌথ সারাষী আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং রাজাকার বাহিনীর রায়গঞ্জ ব্রিজের শক্ত প্রতিরক্ষা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় রায়গঞ্জ ব্রীজ হানাদার মুক্ত হলো। মুক্তিযোদ্ধারা ২৮ নভেম্বর নাগেশ্বরী শত্রæমুক্ত কওে স্বাধীন করা হয়। নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, উলিপুর, রাজারহাট সহ আশপাশ এলাকায় যুদ্ধেরত মুক্তিযোদ্ধার নিয়মিত বাহিনী গেরিলা বাহিনীর কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে থাকে। প্রবল চাপের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে পালিয়ে রংপুরে পিছু হঠতে থাকে। ১৯৭১ইং ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরের ওভার হেড পানির ট্যাংকিতে কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে হাই কোম্পানি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম পাকিস্তানি শত্রæমুক্ত হয়ে পানির ট্যাংকিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা পত্পত্ করে উড়তে থাকে। টগরাইহাটরাজারহাট অপরদিকে কাঁঠালবাড়ীছিনাই এবং উলিপুরদলদলিয়া হয়ে তিস্তায় ঢুকে পরে মুক্তিবাহিনী। তিস্তায় ১০ দিন টানা যুদ্ধ চলে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। নির্মমভাবে নির্যাতন করে অসহায় গ্রামবাসীকে হত্যা করে। পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পরাস্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে বিভিন্ন এলাকায় নির্মম গণহত্যা চালায়। এর মধ্যে ১৪ এপ্রিল সদরের বেলগাছা টগরাইহাটে গণহত্যা, জুন কাঁঠালবাড়ী গণহত্যা, অক্টোবর রৌমারীকোঁদালকাটি গণহত্যা, ১৩ নভেম্বর উলিপুর, হাতিয়া গণহত্যাকান্ত ছিল নির্মম। বেদনাবহ এসব গণহত্যায় শহিদ হয়েছে অসংখ্য নারীপুরুষ। পাকিস্তান বাহিনীর কুড়িগ্রাম হেড কোয়ার্টার, চিলমারী, উলিপুর ভূরুঙ্গামারী ক্যাম্পে অসংখ্য অবলা নারী পাশবিক লালসার শিকার হয়ে সম্ভ্রম হারিয়েছেন। পাকিস্তানের দোসর, দালাল, কুলাঙ্গার মানুষ ব্যতিত সমগ্র কুড়িগ্রামের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। কুড়িগ্রামের সন্তান ৯৯ জন শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা গণহত্যার শিকার হাজারহাজার নরনারীর আত্মত্যাগ এবং সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে ১৯৭১ ইং সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত হয়।

মুক্তিবাহিনী ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে হতভম্ভ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইং ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্ম সমর্পণ করে। পাকিস্তান সেনাদের আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ মাসের রক্তক্ষয়ি মুক্তিযুদ্ধেও অবসান ঘটে।

তথ্যসূত্র:

) দেশটাকে ভালোবেসেকাজী সাজ্জাদ জহির রায়হান

) কুড়িগ্রাম আমার কুড়িগ্রামমোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন

) রক্তে ভেজা মাটি স্বাধীনতাআমানুর রহমান খোকন

) সংকল্পে মহান মুক্তিযুদ্ধআমানুর রহমান খোকন

রণরঙ্গিনী একাত্তরের কুড়িগ্রাম
23 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:২২ অপরাহ্ণ

দিনাজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুর বাসীর দুঃসাহসিক ভূমিকা দিনাজপুরের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি দিনাজপুরের গর্ব। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল দিনাজপুরে এবং দিনাজপুরে সেই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল পাকিস্তানিদের দুর্জেয় ঘাঁটি কুঠিবাড়ী ব্যারাক থেকে। কয়েকজন নামহীন, খ্যাতিহীন, পদমর্যাদাহীন বাঙালি ইপিআর জওয়ান শুরু করেছিলেন সেই সংগ্রাম।বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্র্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে অন্যান্য অঞ্চলের মতো দিনাজপুরের সর্বস্তরের জনতা,বিশেষ করে ছাত্র,যুব এবং বুদ্ধিজীবি পেশাজীবি ¤প্রদায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। ২৫শে মার্র্চের কালরাত্রির অন্ধকারে পাক হানাদার বাহিনীর সুপরিকল্পিত আক্রমণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনার মতো বড় বড় শহরগুলিতে শুরু হয়েছিল নির্বিচারে গণহত্যা, সর্বত্র জ্বালাওপোড়াও নিষ্ঠুর নির্মম তান্ডব। সেই দুঃসংবাদ দূরের জেলা দিনাজপুরে এসে পৌঁছেছিল যদিও একটু দেরিতে, কিন্তু বারুদের স্তুপে অগ্নিসংযোগ করার মতোই বিদ্যুৎগতিতে প্রতিরোধ যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছিল ঢাকা, চট্টগ্রামের পরপরেই দিনাজপুরে।এ সময় দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান এমএনএ এবং অধ্যাপক ইউসুফ আলী এমএনএ। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন ডা. ওয়াকিল উদ্দিন আহমদ এমএনএ, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী এমএনএ এবং এম আব্দুর রহিম এমপি, কমর উদ্দিন আহমদ এমপি, অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম এমপি, মো. ফজলুল করিম এমপি, মো. ইকরামুল হক এমপি, মো. গোলাম রহমান এমপি, এস এম ইউসুফ এমপি, মো. খতিবুর রহমান এমপি, সর্দার মোশাররফ হোসেন এমপি, কাজী আব্দুল মজিদ চোধুরী এমপি প্রমুখ। একমাত্র কাজী আব্দুল মজিদ এমপি ছাড়া অন্যান্য এমএনএ এমপিগণ আওয়ামীলীগ দলভুক্ত ছিলেন।আওয়ামী লীগ দলভুক্ত আওয়ামী লীগ বহির্ভূত যে সকল প্রভাবশালী নেতা কর্মী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় শামিল হন তাদের মধ্যে বর্ষীয়ান নেতা দুর্গামোহন রায় (প্রাক্তন এমপি), ডা. নইম উদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আজিজুল ইসলাম জগলু (আওয়ামীলীগ), ন্যাপপন্থি নেতা গোলাম রহমান, ভাসানীপন্থি নেতা এসএ বারী, তেভাগা আন্দোলনের নেতা গুরুদাস তালুকদার, কমিউনিস্ট নেতা রফিক চৌধুরী, জনগণের নেতা হবি চেয়াম্যান, ছাত্রনেতা এমএ তোয়াব, আসলেহ ভাই, ভাদু ভাই, মজু ভাই, তানু ভাই, দলিল ভাই, জর্জ ভাই, ছুটু ভাই, মাহতাব সরকারের নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রাজনীতিনিরপেক্ষ অনেক বুদ্ধিজীবি নাগরিকও একাত্ম হন। তাদের মধ্যে বালুবাড়ীর আমিন উদ্দিন আহমেদ, মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী ছগন লাল, লোহিয়া, গোপাল ভৌমিক প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।৭ই মার্র্চের পর থেকেই আন্দোলনের পথ ছেড়ে শুরু হয় আক্রমণের প্রস্তুতি। দৈনন্দিন মিটিংমিছিল ছাড়াও যুবকদের সমন্বয়ে শহরে কয়েকটি গুপ্ত প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। আওয়ামী লীগ কর্তৃপক্ষ গোপনে ৫শ তরুণকে গেরিলা ট্রেনিং দেয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করে। কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় জর্জ ভাইয়ের উপর। তিনি তখন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত একজন ইপিআর। একাডেমী প্রাঙ্গনে ড্রিল শিক্ষা দেওয়ার ছদ্মাবরণে তরুণদের অস্ত্র শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় আহমদ আলী খানকে। এছাড়া আনসার ক্লাব, মুজাহিদ ক্লাব এবং শহর গ্রামের অনেক সংগঠন ক্লাবেও গোপন প্রক্রিয়ায় গেরিলা প্রশিক্ষণের উৎসাহ ছড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও ছাত্রযুবশ্রমিক সংগঠনগুলি স্বল্পকালের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। উৎসাহিত হয়ে ওঠেন সচেতন জনসাধারণও।ইতোমধ্যে সৈয়দপুরে বাঙ্গালিবিহারি দাঙ্গার খবর ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরবঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান ঘাঁটি ছাড়াও সৈয়দপুর ছিল বিহারিদের বড় একটি আবাসস্থল। সাদা পোষাকে পাকসেনারা বিহারিদের সঙ্গে দাঙ্গায় যোগ দিয়ে বাঙ্গালি নিধনে নেমে পড়ে। এভাবে বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয় সৈয়দপুরের অলিগলি রাজপথ। গণ নিধনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দিনাজপুর, রংপুর শহরসহ সৈয়দপুরের চারিদিকের গ্রামাঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।উত্তেজনায় ফেটে পড়ে আপামর জনতা।প্রতিশোধের আক্রোশে ফুঁসে ওঠেন অঞ্চলের নির্ভীক নেতা দীর্ঘকালীন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহ মাহতাব বেগ। তিনি পুত্র কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে বন্দুক হাতে সৈয়দপুর সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং দুর্দমনীয় সাহসে সৈয়দপুর সেনানিবাসের ওপর শুরু করেন এলোপাথাড়ি গুলি। সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পাল্টা গুলি ছুটে আসে তাদের দিকে। নিহত হন মাহতাব বেগ তার সঙ্গীরা। এভাবে আনুষ্ঠানিক মুক্তিযুদ্ধ শুরু না হতেই জনপ্রিয় নেতা মাহতাব বেগ প্রথম শহিদ হন। তার আত্মত্যাগ পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিরোধ প্রতিহত করতে প্রেরণা যোগায়। এর কিছু দিনের মধ্যে দিনাজপুরে শুরু হয়ে যায় মারমুখী মুক্তিযুদ্ধ।ঐ সময় দিনাজপুররংপুর জেলা সামরিক শাসনের একই সেক্টরের অধীন ছিল। সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স ছিল দিনাজপুর শহরের দক্ষিণপশ্চিম উপকন্ঠে কাঞ্চন নদীর পূর্বতীরে প্রাচীন কুঠিবাড়ী ভবনে। তখন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল তারেক রসুল কোরেশী। জুলুম সাগরের পাড়ে রাজাদের নির্মিত জুলুম সাগর কুঠিতে তার বাস ভবন ছিল। অপর পদস্থ সেনা অফিসার ছিলেন মেজর তারেক আমীন। তিনি থাকতেন দিনাজপুর হাইস্কুলের পূর্ব ধারে একটি ভাড়া বাসায়। সিকিউরিটি মেজর রাজা থাকতেন পাহাড়পুরে অমিয় কুঠিতে। এছাড়া মেজর জিলানী, মেজর দুররানী, মেজর নাসের আরো / জন সেনা অফিসার ছিলেন যারা সবাই ছিলেন অবাঙ্গালি বা পাঞ্জাবি। কুঠিবাড়ী ব্যারাকের অধিকাংশ জওয়ান ছিলেন অবাঙ্গালি।পদস্থ বাঙ্গালি সেনা অফিসার ছিলেন মুষ্টিমেয়। বিভিন্ন সূত্রে যে নামগুলি জানতে পারা যায়, তারা হলেন

হলেন সেক্টর এডজুটান্ট ক্যাপটেন নজরুল হক, মেজর ডা. মাকসুদ হোসেন চৌধুরী, ক্যাপটেন নাজির আহমদ, ক্যাপটেন ইদ্রিস, সুবেদার মেজর আব্দর রউফ প্রমুখ। এছাড়া ছিলেন কোয়ার্টার মাস্টার আবু সাইদ খোন্দকার, হাবিলদার ভুলু, প্লাটুন হাবিলদার নাজেম, সুবেদার আরব আলী, সেক্টর স্টোরম্যান একরামুল হক, হাবিলদার আবুল কালাম, নায়েক আবদুল হাকিম, নায়েক আবদুল আজিজ, হাবিলদার ইসহাক, হাবিলদার রেজাউর রহমান, হাবিলদার আবদুল সোবহান, সিপাহী মোস্তাফিজুর, সিপাহী কাঞ্চন আলী, ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। সব মিলে বাঙালি ইপিআর ২০/২৫ জনের বেশী হবে না। কুঠিবাড়ীর একই সেনা বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারী হয়েও বাঙালিঅবাঙালি বৈষম্য ছিল প্রকট। বাঙ্গালিরা ছিল পদে পদে উপেক্ষিত, নিগৃহিত। ২৬ মার্চ রাতে দক্ষিণ কোতয়ালীর গদাগাড়ী হাটে সর্বসাধারণের এক বৈঠকে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হবার তথ্য পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক এবং এমপি আব্দুর রহিমেরকে বি এম কলেজ ক্যাম্পনামক রচনায়। ক্যাম্প গঠনে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন আব্দুর রহিম এমপি। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ার সরকার, ইয়াকুব আলী মাস্টার, গোলাম রহমান মাস্টার, নাদির চৌধুরী, আশরাফ সিদ্দিকী, কামাল হাই, জর্জ ভাই, হবি চেয়ারম্যান, মহিউদ্দিন মাস্টার, বেশার উদ্দিন মাস্টার, ইউসুফ আলী মাস্টার, মো. মহসীন, সেকেন্দার আলী, সফর আলী প্রমুখসহ অনেক বুদ্ধিজীবি,ছাত্র যুবনেতা। অনেক বাঙ্গালি ইপিআর, পুলিশ আনসার মুজাহিদ সদস্যও এই ক্যাম্পের সঙ্গে জড়িত হন। দিনাজপুরে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কেবিএম কলেজ ভিত্তিক সংগঠনটি যুদ্ধ প্রস্তুতির একটি অগ্রণী সাহসী প্রচেষ্টা ছিল।

২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে কুঠিবাড়িতে বরাবরের মতো উৎসবের আয়োজন করা হয়। তবে সেবারের আয়োজনে কিছু ব্যতিক্রম বাঙ্গালি জওয়ানদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। ২০ মার্চ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনীর ফার্স্ট ফিল্ড কোম্পানীর ১৫০ জন সেনা বিশেষ উদ্দেশ্যে দিনাজপুরে এসে পৌঁছায়। তারা বড় মাঠের বদলে সার্কিট হাউস চত্বরে ছাউনি ফেলে, যা আগে কখনো হয়নি। এমনকি প্রজাতন্ত্র দিবসের উৎসবে সব সেনা কুচকাওয়াজে অংশ নেয়, যা আগে কেবল ইপিআর পুলিশ বাহিনীই প্রদর্শন করত। প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবার পরও সেনারা সার্কিট হাউস চত্বরেই থেকে যায়। ফলে বাঙ্গালি জওয়ানদের মনে সন্দেহ শংকা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠতে থাকে।প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ভোজের আয়োজন ছিল। আরো ছিল আনন্দ বিনোদনের ব্যবস্থা। কুঠিবাড়ীর পাকিস্তানি অফিসার ইপিআরগণ সবাই আমন্ত্রিত ছিল। কিন্তু বলা হলো, পাকিস্তানি সেনা অফিসার এবং অবাঙ্গালি ইপিআরগণ ইউনিফরম পরিহিত অবস্থায় অস্ত্রসহ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে করতে পারবেন, কিন্তু বাঙ্গালি ইপিআরগণ তা পারবেন না। তাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে অস্ত্র জমা দিয়ে সাদা পোষাকে। ছাড়া বাঙ্গালি জওয়ানদের জন্য আলাদা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা হয়। এটা ছিল বাঙ্গালি জওয়ানদের এক সঙ্গে বন্দী করার কৌশল। মতলব বুঝতে পেরে বাঙ্গালি জওয়ানরা অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকার করেন।পাকিস্তানি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কোরেশী ছিলেন ধুরন্ধর এক ব্যক্তি। তার প্রথম পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি ভিন্ন পথ ধরলেন। বাঙ্গালি জওয়ানদের মনোবল ভেঙ্গে দিতে তিনি পরের দিন ২৪ মার্চ তারিখে ব্যারাক সংলগ্ন আম বাগানে আম দরবার আহবান করেন। সঙ্গে কারো হাতিয়ার থাকবে না, আসতে হবে সিভিল পোষাকে। বাঙ্গালি ইপিআরদের কটাক্ষ করে শুরু হয় কর্নেল কোরেশীর বাজখাই কন্ঠের সামরিক বক্তৃতা। ‘‘তোমরা বাঙ্গালিরা হারমখোর গাদ্দার জাতি। তোমাদের মধ্যে ঈমান নাই, ইসলাম নাইদেশপ্রেমও নাই। তা না হলে পাকিস্তানি অফিসের সিক্রেসি আউট হয়ে বাইরে যায় কি করে? তোমাদের কাছে এর জবাব চাই। নইলে তুম লোক কো সাথ এ্যয়সা কারওয়াই পড়ে গা, যেয়সা কুত্তা কা সাথ কিয়া যাতা হ্যায়।’’দরবার শেষে দিনই বাঙ্গালি সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন নাজির আহমদকে ডেকে অর্ধেক বাঙ্গালি জওয়ানকে অবিলম্বে ট্রাকে করে ঠাকুরগাঁয়ে এবং অবশিষ্টদের দশ জনের দল করে সীমান্তে পাঠানোর জন্য জরুরি নির্দেশ দেয়া হয়। বাঙ্গালি জওয়ানরা যেন সমবেত হওয়ার সুযোগ না পায়, সে উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করা হয়।এভাবে পরিস্থিতি সংকট থেকে মহাসংকটের দিকে এগুতে থাকে। এসে যায় পরিকল্পিত ২৫ মার্র্চের কালরাত্রি। রাতের অন্ধকারে রাজধানীর নিরীহ নিদ্রিত জনসাধারণের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হায়েনারা। শুরু হয় বর্বর গণহত্যা। আতংক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে জেলা শহর হতে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে। পরদিন ২৬ মার্চ সকাল ১১টায় কারফিউ জারি হয় দিনাজপুর শহরে।২৬ মার্চ দিনাজপুর শহরের পরিস্থিতি রীতিমত থমথমে। শহরবাসী গৃহবন্দী। যোগাযোগ বন্ধ। টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন। সব দিক থেকে দিনাজপুর এক অবরুদ্ধ শহর। পাঞ্জাবি, পাঠান বিহারিরা টহল দিচ্ছে শহরে। চারদিকে নিরপরাধ লোককে গুলি করে মেরে ফেলার গুজব।জনসাধারণ ভীতসন্ত্রস্ত। বাঙ্গালি ক্যাপ্টেন নজরুল হক জেলা প্রশাসক ফয়েজ উদ্দিন আহমদ সার্কিট হাউসে নজরবন্দী।২৬ মার্চ দশ মাইল এলাকায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করতে যাওয়া হবি চেয়ারম্যানের ছোট ভাই মনু মিঞা সঙ্গী পাঁচ জন তরুণ বীর সন্তানকে ধরে আনা হয় কুঠিবাড়ীতে। সেখানে তাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে লাশ ঘাঘরার খালপাড়ে ফেলে রাখা হয়। বীভৎস দৃশ্য দেখে কুঠিবাড়ির মুষ্টিমেয় বাঙ্গালি জওয়ান বিদ্রোহ করেন। নজরবন্দী জেলা প্রশাসক ফয়েজউদ্দিন আহমদকে অস্ত্রের মুখে বাধ্য করা হয় তার সইযুক্ত একটি চিরকুট লিখতে। সেই চিরকুটে সময় শহরে অবস্থানরত এমএনএ এবং এমপিদের সার্কিট হাউসে একটি মিটিং আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিরকুটে বলা হয়েছিল: “আমার বাসায় আমার সঙ্গে চা খেলে আমি খুব খুশী হবো।সব রাজনৈতিক নেতাকে এক জায়গায় জড়ো করে হত্যা করার ষড়যন্ত্র সেদিন বাস্তবায়িত হয়নি। ফাঁস হয়ে গিয়েছিল সে ষড়যন্ত্র। জনতার ঘৃণা আরো প্রবল হয়ে ওঠে। গোয়েন্দা সূত্রে পাক কর্তারা তা জানতে পারেন। তাই দায়সারা মিটিং সেরে নেতাদের বেকায়দা সৌজন্য প্রকাশ ছাড়াই বিদায় দেয়া হয়।জনসাধারণ,বিশেষ করে শহরের পশ্চিমাঞ্চলের জনসাধারণ,জানতে পারেন সার্কিট হাউসে বৈঠকের নামে তাদের রাজনৈতিক নেতারা বন্দী। এসব গ্রামের / হাজার লোক লাঠিসোটা, বল্লম নিয়ে ঝড়ের মত ছুটে আসে। কারফিউ ভঙ্গ করে তারা কাঞ্চন নদীর পশ্চিম পাশের বাঁধে জড়ো হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলীসহ নেতারা সার্কিট হাউসে বন্দী হননি, প্রাণ নিয়ে নিরাপদেই ফিরে আসেন।তিনি সার্কিট হাউস থেকে বাড়িতে ফিরে শুনতে পান হাজার হাজার জনতা নদীর ওপারে তার অপেক্ষায় আছে। অধ্যাপক ইউসুফ তৎক্ষণাৎ সেখানে ছুটে যান। লোকজন তাকে নিরাপদ অবস্থায় দেখতে পেয়ে আনন্দে উল্লাসে হর্ষধ্বনি করে স্বাগত জানায়। কিন্তু আনন্দের মধ্যে হঠাৎকরে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ধরাশায়ী হয় / জন লোক। জনসাধারণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই আরো কয়েকটি নৃশংস ঘটনা ঘটে যা অগ্নিকুন্ডে ঘৃতাহুতির কাজ করে। মুক্তি সংগ্রামীদের কাছে মোটর সাইকেল যোগে বিপ্লব সংক্রান্ত একটি জরুরি মেসেজ পৌঁছে দিতে গিয়ে দশ মাইলের কাছে পাক সেনাদের গুলিতে মারা যান কলেজ ছাত্র বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী জিন্না।ঐ সময় কুঠিবাড়ীতে তিন জন অস্ত্র চালনায় সিদ্ধহস্ত বাঙ্গালি সেনাছিলেন। একমাত্র কামান চালক ছিলেন হাবিলদার নাজেম। তাছাড়া ইঞ্চি বেড়ের তিনটি মর্টার ছিল সেখানে, যেগুলি এরা তিন জনই ব্যবহার করতে জানতেন। এই তিন হাবিলদারের সার্ভিস কুঠিবাড়ীতে তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তা ছাড়া সময় কুঠিবাড়ীতে আরো একজন বাঙ্গালি সুবেদার ছিলেন, নাম আরব আলী। চাতুর্যে নৈপুণ্যে তিনিও ছিলেন বিশিষ্ট।২৭ মার্চ কুঠিবাড়ীর অস্ত্রাগার পাহারায় ছিলেন হাবিলদার খালেক। তিনি পাঞ্জাবি। আনসার আলী অপর একজন সহকারি পাহারাদার ছিলেন, তারাও পাঞ্জাবি। তখন বিকাল ৩টা থেকে ৪টা হবে। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগকারী সিগন্যাল সেটের জিপ বিদ্যুৎগতিতে আবার ব্যারাকে প্রবেশ করে। তা দেখে চূড়ান্ত দুঃসংবাদ ভেবে নিয়ে বাঙ্গালি জওয়ানদের পক্ষে আর স্থির থাকা সম্ভব হয়নি। তাদের অব্যর্থ গুলি ছুটে যায় অস্ত্রখানার পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত হাবিলদার খালেকও অপর দুই পাঞ্জাবি সেনার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তিন জনই খতম। অবাঙ্গালি ইপিআরগণ কোনো কিছু বুঝে উঠারআগেই কুঠিবাড়ী অস্ত্রাগার বাঙ্গালি জওয়ানদের দখলে। আশপাশের অন্যান্য অবাঙ্গালি জওয়ানরাও খতম হয়।কুঠিবাড়ীতে গুলির আওয়াজ শোনামাত্র শহরের সর্বত্র শুরু হয়ে যায় আতসবাজির মতো অনর্গল গুলিবর্ষণ। ছুটোছুটি, চিৎকার, আর্তনাদ আর গোলাগুলির ধোঁয়া চারদিকে। বাঙালি ইপিআরদের ঝটিকা আক্রমণে দিশেহারা পাকিস্তানি ইপিআর সদস্যরা প্রয়োজনীয় ডিফেন্স নিতে পারার আগেই কুঠিবাড়ী বাঙ্গালি জওয়ানদের দখলে এসে যায়। বিকেল ৫টার মধ্যেই অন্যান্য পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা ব্যারাকের বাইরে ছিলেন বলে তারা প্রাণে রক্ষা পান।কুঠিবাড়ী পতনের পর সেখানে উত্তেজিত নেতা, জনতা জওয়ান সবাই একাকার হয়ে গিয়েছিলেন।বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে অধ্যাপক ইউসুফ আলী, এম আব্দুল রহীম এবং তরুণ নেতাদের মধ্যে আশরাফ সিদ্দিকী, বেশার উদ্দিন মাস্টার, মহিউদ্দিন মাস্টার, নাদির চৌধুরী, জর্জ ভাই, শফিকুল হক ছুটু প্রমুখ সেখানে উপস্থিত থেকে বিপ্লবীদের তদারকির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া শহরে বাইরের গ্রামগুলি থেকে ছুটে আসা মুক্তি সংগ্রামী যুবকরাও ছিলেন অনেক। তাদের মধ্যে রবার্টলুইস ভাইয়েরা, আবুল কাশেম অরু, মজুখাঁ, আমজাদ হোসেন, রফিকুল ইসলাম, হালিম গজনবী, মকছেদ আলী মঙ্গোলিয়া, আবুল হায়াত, আমানুল্লাহ, গেরা, সইফুদ্দিন আখতার এবং দূর গ্রামের মনসুর আলী মুন্সী (বিজোড়া) নজরুল ইসলামের (তেঘরা) নাম উল্লেখযোগ্য।

৩০ মার্র্চের মধ্যেই দিনাজপুর শহর শত্রুমুক্ত হয়। ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২২টি থানা সহ সমগ্র দিনাজপুর জেলা পরাধীনতার কবলমুক্ত মুক্তাঞ্চল ছিল। জেলা ছাত্রলীগের ছেলেরা বীরদর্পে তাদের গণেশতলা অফিসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিল। সৈয়দপুর থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর পাল্টা হামলা প্রতিহত করতে বাঙ্গালি ইপিআর, পুলিশ আনসারদের নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রামীদের সমন্বয়ে দশ মাইল, রাণীরবন্দর, মোহনপুর,এমনকি বিহারি কলোনী উপশহরেও সামান্য অস্ত্রশস্ত্র দিয়েই অগ্রগামী ফ্রণ্ট স্থাপন করা হয়। নেতাকর্মীদের চেষ্টায় ফ্রণ্টে নিয়োজিত মুক্তি সংগ্রামীদের নিয়মিত খাবার প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহ করতে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে দেশ প্রেমিক জনতা। পাশাপাশি আইনশৃংখলা রক্ষা অবাঙ্গালিদের জানমাল রক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হয়।এর মধ্যে আওয়ামী লীগ অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলির সমন্বয়ে ইনস্টিটিউট মাঠে অনুষ্ঠিত সভায় জনসাধারণের উপস্থিতিতেসর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদগঠিত হয়। আহবায়ক নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আজিজার রহমান (এমএনএ) পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হন অধ্যাপক ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিম, অ্যাডভোকেট শাহ মাহতাব, অ্যাডভোকেট গোলাম রহমান, অ্যাডভোকেট এস বারী, অ্যাডভোকেট আজিজুল ইসলাম জগলু, অ্যাডভোকেট তেজেন নাগ, প্রাক্তন এমপি দুর্গামোহন রায়, গুরুদাশ তালুকদার, রফিক চৌধুরী, মির্জা আনোয়ারুল ইসলাম তানু, হবি চেয়ারম্যান, গোপাল ভৌমিক, ছগণ লাল লোহিয়াসহ আরো অনেকে। শহরের বিশিষ্ট সিগারেট ডিলার সৈয়দ হাসমতুল্লার মুন্সীপাড়ার একতালা বাড়িটিতে সংগ্রাম পরিষদের অফিস স্থাপন করা হয়। এই বাড়ি থেকেই ৩০ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা সংগ্রাম পরিষদের যাবতীয় কার্যাবলী পরিচালিত হয়।এ সময় বহু বিদেশী সাংবাদিক ফটোগ্রাফার সদ্যমুক্ত দিনাজপুরে প্রবেশ করেন। পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিকরা অনেকে আসেন। এপ্রিল তারিখে ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত বিরাট জনসভায় বিবিসির জন সাংবাদিক কলকাতা থেকে জিপে করে এসে সভায় যোগদান করায় সভাটি জনারণ্যে পরিণত হয়। বিবিসির দলটিতে ছিলেন পিটার হেগেল হান্ট, উইলিয়াম ক্রলি, মার্ক টালি প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিক। তাদের ধারণকৃত ভিডিও সংবাদ বিবিসি সবকটি চ্যানেলে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে উঠতে শুরু করে।

১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দিনাজপুরকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে রক্ষা করা সম্ভব হলেও কৌশলগত কারণে পরিস্থিতি বিপরীত দিকে মোড় নেয়। রাতেই সৈয়দপুর ঘাঁটি থেকে হানাদার বাহিনী বিপুল অস্ত্রশস্ত্র সাঁজোয়া বহর নিয়ে দিনাজপুর শহরের দিকে অগ্রসর হয়। সড়ক পথের পরিবর্তে একটি দল আসে রামডুবী হাট হয়ে মেঠো পথ ধরে চেহেলগাজীর দিকে, অপর একটি দল আসে রাজবাড়ী শালবনের ভেতর দিয়ে এবং তৃতীয় দলটি আসে পার্বতীপুর হয়ে মোহনপুরের পথে। তারা একসঙ্গে সুপরিকল্পিতভাবে শহরের উপর ছাঁপিয়ে পড়ে। সময় বাঙ্গালি সংগ্রামীদের পক্ষে পিছু হটা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না। হানাদারদের অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণে বহু বাঙ্গালি প্রাণ হারায়, আহত হয় আরো অনেকে। সন্ধ্যা হবার আগেই সমস্ত শহর খালি হয়ে যায়।তারপর থেকে মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করে প্রবাসী সরকারের তৎপরতায়। নিয়মিত মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। উদ্বাস্তু বাঙ্গালি ছাত্র যুবকরা মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে। দেশোদ্ধার করতে অবিরাম অবিশ্রান্ত গতিতে হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলে ১৬ ডিসেম্বর শত্রুবাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পরাজিত হানাদার বাহিনী মুক্তিবাহিনীর হাই কমান্ডের নিকট আত্মসর্ম্পণ করে। দিনাজপুরে বিজয় উৎসব উদযাপিত হয় তার চার দিন পরে অর্থাৎ ২০ ডিসেম্বর তারিখে। ১৭ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের আগেই দিনাজপুরের বিভিন্ন রনাঙ্গণ থেকে বিজয়ী মুক্তিসেনারা বীরদর্পে শহরে এসে পৌঁছায়। প্রত্যাগত মুক্তিসেনারা দিনাজপুর স্টেডিয়াম, মহারাজা হাইস্কুল ভবন প্রভৃতি স্থানে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরী করে অবস্থান গ্রহণ করেন।দিনাজপুর রণাঙ্গনের বিভিন্ন সেক্টরে দায়িতরত দলনেতাদের মধ্যে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বেশারউদ্দিন মাস্টার, রেজাউল ইসলাম, নজরুল, ইদ্রিস, মঙ্গোলিয়া, আবুল কাশেম অরু, আবুল হায়াত, আশরাফ সিদ্দিকী, নাদির চৌধুরী, সফর আলী, আনোয়ারুল কাদির জুয়েল, শফিকুল হক ছুটু, গেরা, তোয়াফ, আমানুল্লা, জর্জভাই, মমিনউদ্দিন, মজু খাঁন, হবি চেয়ারম্যান দ্রæ শহরে এসে পৌঁছান। এমপিদের মধ্যেও অনেকে এসে পৌঁছাতে সক্ষম হন। ফলে সকাল না হতেই মুক্তি সেনায় সারা শহর ভরে যায়। স্বাধীনতার গানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারিদিক।

২০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বড়মাঠে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ইতোমধ্যে ভারতের শরণার্থী শিবির থেকে শহরের শীর্ষস্থানীয় নেতাগণ, মান্যগণ্য ব্যক্তিগণ প্রায় সবাই দিনাজপুরে এসে পৌঁছান। গোরশহিদ মাজার সংলগ্ন মাঠে উন্মুক্ত খোলা মঞ্চ তৈরী করে অসাধারণ উদ্দীপনা উল্লাস মুখর ণপরিবেশে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে দিনাজপুরে স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলন পর্ব শুরু হয়। পবিত্র কোরআন পাঠের পর গৌরবজনক মহান কাজের দায়িত্ব ওসামরিক অভিবাদন গ্রহণ করেন আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহীম। তিনি তখন যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের উত্তর জোনের অর্থাৎ দিনাজপুররংপুরবগুড়া জেলার পুনর্গঠন পুনর্বাসন কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান অধিনায়ক।মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও তখনো দেশের সর্বত্র হানাদার বাহিনীর অসংখ্য নাশকতার চিহ্ন ছড়িয়ে ছিল। বিশেষ করে দিনাজপুরের পথেঘাটে মারাত্মক বিস্ফোরক অস্ত্র মাটির নিচে পুঁতে রাখা ছিল। এছাড়া শত্রুদের ফেলে যাওয়া অসংখ্য আগ্নেয়াস্ত্রও পড়ে ছিল যেখানে সেখানে। এসব অস্ত্রমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জেলার পথঘাটে চলাচল ছিল বিপজ্জনক। তাই এসব স্থান অস্ত্রমুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধারা নিয়োজিত হয় এবং প্রতিদিন প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে প্রত্যন্ত এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র নির্ধারিত রক্ষণাগার মহারাজা হাইস্কুলে এনে জড়ো করা হয়। অস্ত্র সংগ্রহের এই কাজ চলার সময় জানুয়ারি,১৯৭২ সালে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। দিন সন্ধ্যার সময় এক ভূমি মাইন বিস্ফোরণে গোটা শহরসহ আশেপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। নিহিত হন মহারাজা হাইস্কুল ভবনে অবস্থানরত অনেক মুক্তিসেনা।বিশাল স্কুল ভবনটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়,ক্ষতিগ্রস্ত হয় আশেপাশের বহু বাড়ি ঘর সম্পদ।পরের দিন উদ্ধারকৃত দেহাবশেষগুলি সামরিক মর্যাদায় পবিত্র ভূমি চেহেলগাজীর মাজার প্রাঙ্গনে সমাহিত করা হয়। অগণিত শোকার্ত মানুষ শোক মিছিলে যোগদান করে। এতো বড় শোক মিছিল দিনাজপুরে আর কখনো হয়নি। বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধান চালিয়েও সে সময় বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক নাম, পরিচয় সংখ্যা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৬৯৭ সালে গভীর অনুসন্ধানের পর বিস্ফোরণের কারণ উদঘাটিত হয়। উদ্ধার করা হয় শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঠিকানা।মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুর রণাঙ্গণঃ মহান মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুর নং সেক্টরের অধীন ছিল। নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার এম কে বাশার এবং নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক মেজর কিউ এনজামান।যাদের রক্তে মুক্ত ভুমি মহান মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুর জেলার কত জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়েছেন, তার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে শহিদদের অমর স্মৃতির নিদর্শন হিসাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্ত¡রে নির্মিত হয়েছে শহিদ বেদী। সেই শহিদ বেদীতে জেলার ১৩৪ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার নাম উৎকীর্ণ রয়েছে। প্রতি বছর মহান স্বাধীনতা জাতীয় দিবসে কৃতজ্ঞ দিনাজপুরবাসী বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই শহিদ বেদীতে।

দিনাজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
26 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:২০ অপরাহ্ণ

স্মৃতিতে গাইবান্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধ

স্মৃতি কখনো কখনো মানুষের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে। স্মৃতি বিস¥রণ মানুষের জন্য কল্যানও হয়, কেনো না যদি সেই স্মৃতিতে মানুষ বিতারিত হতো তাহলে প্রয়োজনের মৃত্যু তাকে স্মৃতি ভ্রষ্ট করে তুলত। এই স্মৃতি বিস্মরণ কখনো কখনো জাতি কে তার নিজস্ব গতি পথ থেকে অন্যত্র ধাবিত করে তোলে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সমগ্র অস্তিত্বকে জাতির উৎসের সন্ধানে যেভাবে আলোড়িত করেছিল বাঙালিকে অশান্ত ক্ষুব্ধ যন্ত্রনা, কিংবা আন্দোলিত এবং উদ্বীপিত করেছিল সেই চেতনা যেন ১৯৭১ এর পহেলা মার্চ পূর্বঘোষিত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করা হলে পূর্ববাংলায় গণবিস্ফোরণ ঘটে। অন্যান্য স্থানের মতো গাইবান্ধাতেও অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষিত সকল কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হতে থাকে। ৩ মার্চ গোটা গাইবান্ধায় পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। সরকারি-বেসরকারি, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সকল প্রকার যান-বাহন চলাচল বন্ধ থাকে। বিকেলে আওয়ামীলীগের উদ্বোগে নবনির্বাচিত এম,এন,এ লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নামে যৌথ ভাবে আন্দোলন সংগ্রামের কর্মসূচী পালন করতে থাকে। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের নির্দেশনা অনুসারে সদর উপজেলাসহ মহকুমার সর্বত্র সরকারি- বেসরকারি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। বন্ধ হয়ে যায় সকল প্রকার খাজনা ট্যাক্স আদায়। প্রতিটি বাড়িতে উড়তে থাকে কালো পতাকা। প্রায় প্রতিদিন মহকুমার শহরে লাঠি-সোটাসহ পতাকা হাতে মিছিল হতে থাকে। ১২ মার্চ গাইবান্ধা মিউনিসিপ্যালিটি পার্কে আওয়ামীলীগের উদ্যোগে এম,এন,এ লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় স্বাধিকার আদায়ে দৃঢ় শপত গ্রহন করা হয়। একই দিনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা গনেশ প্রশাদের সভাপতিত্বে একটি ছাত্র সভাও অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ই মার্চে মহকুমার আওয়ামীলীগের সভাপতি এম,এন,এ লুৎফর রহমানকে আহবায়ক এবং সদর উপজেলার এমপিএ ওয়ালিউর রহমান রেজা ও মহকুমা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ আতাউর রহমান কে যুগ্ন আহবায়ক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট মহকুমার সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। অন্য ১৪ জন সদস্য হলেন নবনির্বাচিত দুই এম.এন.এ শাহ্ আব্দুল হামিদ ও ডা. সোলাইমান মন্ডল, ৫ এমপিএ ডা. মফিজার রহমান, আবু তালেব মিয়া, জামালুর রহমান প্রধান, আজিজার রহমান, শামসুল হোসেন সরকার, ভাষা সৈনিক মতিউর রহমান, হাসান ইমাম টুলু, গোলাম কিবরিয়া, নির্মলেন্দু বর্মন,হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ খালেদ ও নূরুল আবছার তারা মিয়া। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীরা উদ্যোগী হয়ে এলাকা ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটির গঠন করতে থাকে। তৎকালীন অবাঙালি মহকুমা প্রশাসক এস.এস.জি.এ রিজভী ও অগ্রনী ব্যাংক কর্মকর্তা রেজা শাজাহান প্রশাসনিক কার্যক্রমে মহকুমা সংগ্রাম কমিটিকে সহযোগিতা করেন।

২৩ শে মার্চ রিপাবলিকান দিবস ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার সর্বত্র পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলরের নির্দেশ দেয়। অন্য দিকে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও স¦াধীন বাংলা শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ ঐ দিন দেশব্যাপী ‘প্রতিরোধ দিবস’ আহবান করে। সেই সকল কর্মসূচী সফল করতে ২৩ মার্চ গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে (বর্তমান স্বাধীনতার বিজয়স্তম্ভ চত্বর) ছাত্রলীগের মহকুমা সভাপতি এম.এন.নবী লালুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ছাত্র জনতার সমাবেশে বক্তৃতা করেন আওয়ামীলীগ নেতা নির্মলেন্দু বর্মন, মোহাম্মদ খালেদ, ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল আরেফিন তারেক, সৈয়দ শামস্ উল আলম হীরু, সদরুল কবীর আঙ্গুর, আমিনুল ইসলাম ডিউক প্রমুখ। সমাবেশ শেষে পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। ২৪ শে মার্চ গাইবান্ধা শহরে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঐদিন বিকেলে ভিএইড রোডস্থ বার্মা ব্যংক ভবনে গাইবান্ধা শহরে অবস্থানকারী অবসর প্রাপ্ত বা ছুটিতে আসা সেনা, নৌ, বিমান ও আনছার বাহিনীর সদস্যদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ শে মার্চ সকালে গাইবান্ধার ওয়্যারলেস কেন্দ্রের মাধ্যমে মহকুমা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক লুৎফর রহমান এম,এম,এ যুগ্ন আহবায়ক ওয়ালিউর রহমান রেজা এমপিএ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা পেয়ে যান। ঐদিন মহকুমা সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাসান ইমাম টুলুর নেতৃতে¦ গাইবান্ধা ট্রেজারি থেকে দু’শ রাইফেল ও গোলাবারুদ এবং আনসার ক্যাম্পে অস্ত্রগুলো নিয়ে ছাত্র যুবকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ২৭শে মার্চ থেকে গাইবান্ধা কলেজ এবং ইসলামিয়া হাই স্কুল মাছে যুদ্ধের প্রশিক্ষন শুরু হয়। গাইবান্ধা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ অহিদউদ্দিন আহম্মেদ রোভার স্কাউটের তিন’শ কাঠের রাইফের নিয়ে প্রশিক্ষনের সহায়তা করেন।

এরই ধারাবায়িকতায় থানা সদরগুলোসহ বিভিন্ন এলাকায় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হতে থাকে। বিভিন্ন থানা সংগ্রাম কমিটির আহŸায়ক ছিলেনঃ সুন্দরগঞ্জমোসলেম আলী, সাদুল্লাপুরআবু তালেব মিয়া, পলাশবাড়ীতোফাজ্জল হোসেন, গোবিন্দগঞ্জজামালুর রহমান প্রধান, সাঘাটাআতাউর রহমান। এরা সবাই ছিলেন আওয়ামীলীগের নেতা। সুবেদার আলতাফ হোসেন তার অধীনস্ত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের নিয়ে দেশ মুক্ত করার সংগ্রাম সংগঠিত করতে গাইবান্ধা চলে আসেন। আলতাফ সুবেদার নামে এই সাহসী যোদ্ধা গাইবান্ধা কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্ত করে দেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনের আহŸান জানান। শহরের বিভিন্ন স্থানে চলতে থাকে সশস্ত্র প্রশিক্ষন। অন্যান্য থানাগুলোতেও চলতে থাকে মুক্তি সংগ্রামে প্রস্তুতি।

গাইবান্ধার বীর সন্তানেরা ছড়িয়ে পড়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজিবপুর চিলমারীর মুক্ত এলাকায় এবং ব্রক্ষপুত্রের পূর্ব পাড়ের নিরাপদ স্থানে। গাইবান্ধা নির্বাচিত প্রতিনিধির অনেকেই বি এস এফ (সীমান্ত নিরাপত্তারক্ষী) এর সাথে যোগাযোগ করে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ছুটে যাওয়া দামাল সন্তানদের সংগঠিত করে তাদের আশ্রয় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য শিবির স্থাপনে তৎপর হন। লুৎপর রহমান এমএনএ মুক্তিযুদ্ধ কালে নর্দান জোনাল কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য মানকারচরে মুক্তিযুদ্ধ শিবির প্রধানের দায়িত¦ পালন করেন। গাইবান্ধা সদরের এমপিএ ওয়ালিউর রহমান রেজা মুজিবনগর সরকারের সিভিল এ্যাফেয়ার্স এ্যাডভাইজার হিসেবে নম্বর সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেন। সাঘাটাফুলছড়ি থেকে নির্বাচিত এমপিএ ডা. মফিজার রহমান মুক্তিযুদ্ধকালে আসামের কাকড়িপাড়া মুক্তিযোদ্ধা যুব ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মুজিবনগর সরকারের উত্তরাঞ্চলীয় সাব সেক্টরের বেসরকারি গোয়েন্দা শাখার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন। সাদুল্লাপুর থেকে নির্বাচিত এমপিএ আবু তালেব মিয়া গোয়ালের চর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। গাইবান্ধা মহকুমা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আতাউর রহমান ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার রায়গঞ্জ থানাধীন ধানেশ্রী সেন্ট্রাল ইয়্যুথ ক্যাম্পের ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করেন।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সীমান্ত এলাকায় যুবকদের সংগঠিত এবং প্রশিক্ষণের জন্য ১১০টি যুব অভ্যর্থনা শিবির খোলা হয়। এর মধ্যে মানকার চরের সরণতলী এবং কুচবিহারের খোচাবাড়ি শিবিরের ক্যাম্পইনচার্জের দায়িত্ব পান গাইবান্ধার দুই এমটিএ যথাক্রমে ডা. মফিজার রহমান এবং ওয়ালিউর রহমান রেজা। শিবিরগুলোতে নবাগতদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গাইবান্ধা বিভিন্ন অঞ্চল স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সংগঠকদের অন্যতম আলী মাহবুব প্রধান আনসার কমান্ডার আজিম উদ্দিনের তত্ত¡াবধানে বড়াইবাড়িতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করার সিদ্ধা নেয়া হয়। ওদিকে বড়াইবাড়ি ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দ্রæ বৃদ্ধি পায়। মানকার চরে অবস্থানরত এম.এন. এবং এম.পি. সহ নেতৃবৃন্দের সার্বিক সহযোগিতায় পরিচালিত বড়াইবাড়ি ক্যাম্প থেকে ব্যাপক প্রশিক্ষনেন জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাকড়িপাড়ায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১ম ব্যাচ হিসেবে ১১৩ জনকে ভারতের তরা পাহাড়ে প্রেরণ করা হয়।কাকড়িপাড়ায় প্রাথমিক প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকে। তুরায় চলে ১১৩ জনের গেরিলা প্রশিক্ষন। এসময় মুক্তিযুদ্ধে বেগবান হতে থাকে এবং মুক্তিযোদ্ধারা সফলতা অর্জন করতে থাকেন।ক্রমান্বয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এছাড়া উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ শেষে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

একাত্তরের ১৭ এপ্রিল গাইবান্ধা শহরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হেলাল পার্কে (বর্তমান শাহ্ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম) মহকুমার সদর দপ্তর স্থাপন করে। শহরে ঢুকেই তারা গাইবান্ধা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাদারগঞ্জ প্রতিরোধ যুদ্ধে আহত বীরযোদ্ধা নুরুল আমিনকে হত্যা করে। এরপর কামারপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ চলার খবর পেয়ে সেখানে যাওয়ার পথে তারা হাট ²ীপুরে হত্যা করে পাঁচজন সাধারণ মানুষকে। পরবর্তীকালে ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা গাইবান্ধার শহরবন্দর, গ্রামগঞ্জে হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা সংঘঠিত করে। আর সকল কাজে তাদের সহায়তা করে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের সমন্বয়ে গঠিত শান্তি কমিটি (পিস কমিটি), রাজাকার, আলবদর, ফজলুল হক ব্যাটালিয়ান, অবাঙালি মুজাহিদ বাহিনী।

১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর রাতে কোম্পানি কমান্ডার সাইফুল আলম সাজা এবং গোয়েন্দা গ্রæপের প্রধান ফজলুল রহমান রাজার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় দলের সাথে যুদ্ধে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়। তৎকালীন গাইবান্ধা মহকুমার সদর থানার সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা গ্রামে এই হত্যাকান্ড ঘটে।

গাইবান্ধা মহকুমার পলাশবাড়ী থানার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ী এলাকায় স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সংঘটিত হয়েছিল নির্মম এক হত্যাকান্ড। ১৯৭১ সালের ১১ জুন পাকিস্তানি হানাদার এবং তাদের এদেশীয় দোসররা হত্যা করেছিল ঢাকারংপুর মহাসড়ক থেকে কিলোমিটার দূরের এই এলাকার শতাধিক মানুষকে।

১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের নিভৃতপাখেড়া গ্রামে সকাল ১০টার পর হঠাৎ করেই উপস্থিত হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারা গ্রামের স্কুল শিক্ষক দীনেশ চক্রবর্তীসহ ৪জন এবং পাশ^বর্তী ক্রোড়গাছা গ্রাম থেকে কৃষি কাজ করতে আসা জন সহ মোট ৭জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে পাশের বাঁশের ঝাড়ে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

বোনারপাড়ার রেলওয়ে লোকোসেডের স্টিম ইঞ্জিন পাম্প মেশিনের ¦লন্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালের ১৭ নভেম্বর বোনারপাড়ায় পাকিস্তানি হানাদাররা এক নির্মম গণহত্যা সংঘটিত করে। ঐদিন সকাল ৯টার দিকে পাকিস্তানি সেনা অবাঙালিরা বোনারপাড়ার পাশর্^বর্তী শিমুলতাইড় গ্রামের মধ্যপাড়া ঘিরে ফেলে। এলাকা থেকে হানাদাররা ৩০ জন বাঙালিকে আটক করে বোনারপাড়া রেলের এনএ খান রিত্রেæয়েশন ক্লাবে নিয়ে আসে। সেখানে নির্যাতন জিজ্ঞাসাবাদের পর ১৩ জনকে আটক রেখে বাকীদের ছেড়ে দেয়। ঐদিন রাতে  আটক ১৩ জনকে নির্যাতন করে অর্ধমৃত অবস্থায় লোকশেডের স্টিম ইঞ্জিন পাম্প মেশিনের ¦লন্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর আরো অনেককেই এভাবে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সালে জুন সাঘাটা থানার বোনারপাড়া ইউনিয়নের দলদলিয়া গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা তাদের এদেশীয় দোসর অবাঙালিরাসহ ভোরবেলা ঘিরে ফেলে। তারপর হিন্দু প্রধান গ্রামটিতে শুরু করে নারকীয় তান্ডব। অনেক গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙ্গে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের চিৎকার আর দৌড়াদৌড়িতে। হানাদাররা শুরু করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, পৈশাচিক নির্যাতন। রেহাই পায়নি বৃদ্ধ, নারী, শিশু কেউই।

১৯৭১ সালের ১১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সামরিক অফিসারদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সমগ্র  বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টর বিভক্ত করা হয়। মেজর জিয়ার নেতৃত্বে জেড ফোর্স গঠন করা হয়। গাইবান্ধা অঞ্চল ছিল এই জেড ফোর্সের অধীন। সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর নির্দেশে জেড ফোর্স সিলেট অঞ্চল চলে গেলে অঞ্চল হয়ে উঠে ১১ নম্বর সেক্টর। এতে নেতৃত্ব দেন মেজর আবু তাহের। উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১৩জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে মানকার চরের কামাক্ষা মন্দিরের টিলায় ১১ নম্বর সাব সেক্টরের গোড়া পত্তন ঘটে। এই সাবসেক্টরের কমান্ডের দায়িত্ব পান বিমান বহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার মো. শফিক উল্লাহ এবং পরবর্তীতে ফ্লাইট লেঃ হামিদুল্লাহ খান। কামালপুরে সম্মুখ যুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার মেজর তাহের গুরুতর আহত হলে হামিদুল্লাহ খান সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব লাভ করেন। এই সাব সেক্টরের উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন খায়রুল ইসলাম ওরফে নজরুল ইসলাম, এম এন নবী লালু, রোস্তম আলী, মাহাবুব এলাহী রঞ্জু, আমিনুল ইসলাম সুজা, ছোট নূরু,মবিনুল ইসলাম জুবেল, মোজাম্মেল হক মন্ডল, রফিকুল ইসলাম হিরু, বজলার রহমান, মহসীন, গৌতম, সামছুল আলম, বজলু, বন্দে আলী, মান্নান, নাজিম, বক্কর, তোতা, আহসান, কাসেম, হায়দার, মজিবর, জিন্নু,মহব্বত প্রমুখ। জুনের প্রথম দিকে তুরায় প্রথম ব্যাচ ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। কোম্পানি কমান্ডার আমিনুল ইসলাম সুজার অধীনে তিনটি প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন এমএন নবী লালু, মাহাবুব এলাহী রঞ্জু রোস্তম আলী কোম্পানি কমান্ডারের দায়িত¦ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অপারেশন শুরু করতে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এখানে কিছু দুঃসাহসিক যুদ্ধের বর্ণনা উপস্থাপন করা হলো।

মাহাবুব এলাহী রঞ্জু রোস্তম আলীর নেতৃত্বাধীন দুটি সেকশন এল এম, জি, স্টেনগান, এস এল আর, রাইফেল গ্রেনেড নিয়ে যৌথভাব গাইবান্ধা উপজেলাধীন বাদিয়াখালী রোডব্রিজ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন।

২৯ মে কাজিউল ইসলাম নৌকা যাত্রীদের কাছে জানতে পারেন যে সুন্দরগঞ্জ কালীবাজারে হানাদার বাহিনী কয়েকজন রাজাকার নিয়ে অবস্থান করছে।

১৮ আগস্ট ভোর না হতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য অন্যতম যুদ্ধ কোদালকাটির যুদ্ধ শুরু হয়। হানাদার বাহিনী নৌ, স্থল ও আকাশ পথে একযোগে আক্রোমন করে। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হানাদার বাহিনীর ত্রিমুখী বর্বরোচিত হামলা প্রতিরোধ হাতে থাকে জেড ফোর্স অধিনায়ক মেজর জিয়ার সার্বিক নেতৃত্বে। সুবেদার আলতাফের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ৩মটারটি এক পর্যায়ে বিকল হয়ে যায়। সুবেদার আলতাফ উন্মাদের মত ছুটাছুটি করতে থাকেন। মুখোমুখী যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী যুদ্ধরত রাইফেল, স্টেন ও এলএমজিধারী বীর যোদ্ধাদের যুদ্ধে কভারিং ফায়ার সম্ভব হচ্ছিল না। এদিকে হানাদার বাহিনীর গানবোট থেকে শেলিং, এয়ার এ্যাটাক ও ভারী অস্ত্রসহ মেশিনগানের গুলির গগণবিদারী শব্দে মানকার চরাঞ্চল যেমনি কাঁপতে থাকে তেমনি গাছ-পালা, ঘরবাড়ি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হতে থাকে। ভোর রাত থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর ত্রিমুখী হামলার গুলি বর্ষণ এক মুহুর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। ২ এম এফ কোম্পানী সম্মুখভাগের (পশ্চিমমুখী) ডিফেন্স উইথড্র করতে তখন বাধ্য হয়েছে এবং ফাস্ট বেঙ্গলের পশ্চিমমুখি একটা অংশ উইথড্র করে। মুক্তিযোদ্ধারা আগের দিনের প্রতিশ্রæতি সরবরাহ পায়নি এবং বিএসএফ এর কাভারিং ফায়ার হয়নি। ইতিমধ্যে মজিদ মুকুলের নেতৃত্বাধীন অংশের  ইতিমধ্যে পশ্চিম পার্শ্বের বাংকারগুলো ঘেরাও হয়েছে। এটিএম খালেদ দুলু ও শওকত আলী ঘেরাও থেকে আখক্ষেতে সুযোগ বুঝে আতœগোপন করেন। কিন্তু বাদিয়াখালীর বীরযোদ্ধা আলতাফ ও সামাদ রক্ষা পান না। দুজনকেই বাংকারের মধ্যেই হানাদাররা খুচিয়ে হত্যা করে। তাঁদের চিৎকার শুনে পাশের বাংকার থেকে বেরিয়ে দেওয়ানগঞ্জের বীরযোদ্ধা নজরুল পাশের বাংকারে অবস্থানরত মজিদ মুকুলকে অনুরোধ করে উইথড্র করতে। কিন্তু শহিদ সামাদ ও আলতাফের করুণ চিৎকার শুনে তিনি তার দলবল নিয়ে পিছু হটে যেতে পারেননি। নজরুল আখ ক্ষেতে ঢুকতেই পদব্রজে সারিবদ্ধভাবে আগত হানাদারদের জুজনে ইয়া আলী’ বলে মজিদ মুকুলের বাংকারে চার্জ করে। মজিদ মুকুল বাংকারের এক পাশে অবস্থান নিয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণ করেন। সর্ববামের ডিফেন্স থেকে হাবিলদার মকবুল মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করেন মজিদ মুকুলের বাংকারের চার্জকারী হানাদারদের উপর। বীর সহযোদ্ধা মকবুলের মেশিনগানের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে হানাদার শত্রæসেনারা। এমনি সময়ে নিহত শত্রæ সেনাদের পিছন সারি মজিদ মুকুলের বাংকার অতিক্রমেকালে ২ এম এফ কোম্পানীর উত্তর পশ্চিমমুখী ডিফেন্সের সাহসী বীর বাঙালী সৈনিক বরিশালের কাশেম তার হাতে থাকা এল এম জি থেকে ব্রাশ ফায়ার করলে বেশ ক’জন শত্রæ সেনা নিহত হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত শত্রæ সেনারা গানবোট থেকে মাঝে মাঝে মেশিনগানের গুলি ছুড়ছে আর দু’একটা করে শেলিং করছে। বীরযোদ্ধা এবি সিদ্দিক সুফী খবর পৌঁছায় যে আমাদের মর্টারটি বিকল হবার আগেই তাদের মর্টার বিকল হয়েছে। পাশের সেকশন থেকে মজিদ রকেট লাঞ্চার দিয়ে শেলিং করে শত্রæসেনাদের একটা গানবোট ও একটা লঞ্চের মারত্মক ক্ষতিসাধন করেছেন। আর তিনিসহ বীর সহযোদ্ধা আনোয়ারুল কাদির ফুলমিয়া, রঞ্জু, আলমগীর, শাহ্ শরিফুল ইসলাম বাবলু, ডা. মনছুর এবং হাবিলদার মনছুর, নায়েক মফিজ উল্লাহ ও নায়েক আবু তাহেরের কভারিং ফায়ারে নায়েক রেজাউল তার সেকশন নিয়ে উইথড্র করতে পেরেছিলেন। এদিকে বীর সেনা বিক্রমপুরের আবুল কাশেমের নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন, হান্নান, বাবলু, রেজা নদীর পূর্বপাড়ে গিয়ে মজিদ মজিদ মুকুল, দুলু ও নজরুলকে পার করে নিয়ে আসে। জেড ফোর্স তাদের ডিফেন্স উইথড্র করলে, হানাদার বাহিনী তাদের সহযোদ্ধা হানাদারদের মরদেহ দেখে কোদালকাটি চরের বাসিন্দা যে দু’চারজন মানুষ ছিলেন তাদেরকে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসখ্যাত কোদালকাটির যুদ্ধে ৩৫০ জন পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য নিহত হয়। জেড ফোর্সের এম এফ কোম্পানী হানাদার বাহিনীর ৩টা এল এম জি স্টেনগান ৬টা চাইনিজ রাইফেল এবং প্রচুর গোলাবারুদ হেলমেট দখল করতে সক্ষম হয়। ১৮ তারিখের ত্রিমুখী আক্রমণের পূর্ববর্তী দিন হানাদারদের সাথে গুলি বিনিময় হয়েছিল। এক সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধে জেড ফোর্সের এম এফ কোম্পানীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

কোদালকাটি যুদ্ধে সুবেদার আলতাফের নেতৃত্বাধীন ২ এম এফ কোম্পানী ও লেঃ আসাদের নেতৃত্বাধীন ফাস্ট বেঙ্গলের একটা কোম্পানীর বীরযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও লোকবল হারিয়ে লঞ্চযোগে চিলমারিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

রসুলপুর ¯øুইস গেটে অবস্থানকারী পাকিস্তানি সেনাদের উপর আক্রমণ করা হয়। কালাসোনার চরে ইউপি সদস্য  মকসুদ আলী ও রহিম উদ্দি সরকার সহায়তায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের কোম্পানি কমান্ডার এম এন নবী লালু ১৫ অক্টোবর রাতে খবর পান ¯øুইস গেটের হানাদারদের বেশ কজন গাইবান্ধায় যাওয়ায় শত্রæসেনার সংখ্যা কম। তিনি প্লাটুন কমান্ডারদের সাথে পরামর্শক্রমে ত্বরিত ¯øুইস গেটে আত্রæমণের সিদ্ধান্ত নেন। তখন কালাসোনার চরে সুন্দরগঞ্জ ও দারিয়াপুর ব্রিজ অপারেশরের জন্য রঞ্জু কোম্পানি অবস্থান নিয়েছিলো। পাশের চরেই ছিল রোস্তম কোম্পানি।

১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর রাতে কোম্পানি কমান্ডার সাইফুল আলম  সাজা এবং  গোয়েন্দা গ্রæপের প্রধান ফজলুর রহমান রাজার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় দলের সাথে পাকিস্তানি সেনাদের এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় গাইবান্ধা মহকুমার সদর থানার সাহাপাড়া ইউনিয়নের নান্দিনা গ্রামে।

৯ আগস্ট দিবাগত রাতে মাহাবুব এলাহী রঞ্জু কোম্পানির পচিশ জনের একটি দল বড় আকারে একটি নৌকায় চেপে বিশাল ব্রক্ষপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে পশ্চিম তীরের ফুলছড়ি থানাধীন রতনপুর চরের আতিকুল্লা চেয়ারম্যানের খামার বাড়িতে আশ্রয় নেয়।

৩ নভেম্বর ভোরবেলা কালাসোনার চর থেকে রঞ্জু কোম্পানির একটি প্লাটুন প্রায় শুকিয়ে যাওয়া মানস নদী পার হয়ে পশ্চিম পাড়ের বালাসি খেয়া ঘাট অভিমুখে রওনা দেয়। উত্তরের রসুলপুর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা এসে ঘাটের আশেপাশের গ্রামে অত্যাচর ও লুণ্ঠন করে থাকে। গাইবান্ধা রণাঙ্গানে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রোস্তম কোম্পানির বহুল আলোচিত অভিযান সংঘটিত হয় গাইবান্ধা মহকুমার সাঘাটা থানার পদুমশহর ইউনিয়নের বোনারপাড়া তিস্তামুখ ঘাট রেললাইন কুমারগাড়ী নামক স্থানে। কোম্পানির গোয়েন্দা শাখা বিভিন্ন সূত্রে খবর পায় যে ২২ আগষ্ট সকাল ১০ টার ব্রিগেড সদর রংপুর হতে একটি মিরিটারি স্পেশাল ট্রেন তিস্তামুখ ঘাটে আসবে। এই খবর পেয়ে রোস্তম কোম্পানির যোদ্ধারা ২০আগষ্ট গলনার চরের হাইগ আউট হতে তৎকালীন সগুনা ইউনিয়নের বেলতলী গ্রামের মফিজ মন্ডলের বাড়িসহ কয়েকটি বাড়িতে হাইড আউট করে।১৮ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা-ফুলছড়ি সড়কের ভাঙ্গামোড় নামক স্থানে এই এ্যামবুশ পাতা হয়েছিল। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হানাদার বাহিনীর কনভয় যাতায়াত করত। গাইবান্ধা- বোনারপাড়া রেলপথে আলাই নদীর উপর সন্নাসদহ রেলব্রিজ (পদুম শহর ইউনিয়ন) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এই ব্রিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে ১০ জন রাজাকার নিয়োজিত ছিল। তারা ব্রিজের পাশের জনগনকে নানাভাবে অত্যাচার নির্যাতন করত। ২০ জুন সাঘাটা থানার  কামালেরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ডিফেন্স থেকে এই রেইড পরিচালনা করা হয়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা রোস্তম আলীর নেতৃত্বে ২২ জনের মুক্তিযোদ্ধার দল ১০টার দিকে সাঘাটা থানার উপর তিন দিক থেকে আক্রমণ করা হয়। ভরতখালী স্টেশন সংলগ্ন এই ব্রিজের এক পাশে রেল গাড়ি ও অপর পাশের্^ লোকজন চলাচল করত। ভরতখালী বাজারে জুট র্বোডের গুদাম ছিল। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুর্দ্রা অর্জনের প্রধান পণ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সোনালি আঁশ পাট। সরকার অর্থনীতি দুর্বল করার মানসে ঐ পাট গুদামে অগ্নিসংযোগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গাইবান্ধা জেলায় হানাদার বাহিনীর সাথে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয় ২৪ অক্টোবর সাঘাটা থানার ত্রিমোহিনী ঘাটে। বাংলাদেশের অন্যতম অবাঙালি অধ্যুষিত সাঘাটা থানা সদর বোনারপাড়ার উপর সর্বাতœক আক্রোমণের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২৬ অক্টোবর।

সাঘাটা থানার সওলা ইউনিয়নের পুরাতন ভরতখালী একটি প্রসিদ্ধ হাট। এই বন্দরে সরকারি বেসরকারি অনেক পাট গুদাম ছির। গুদামগুলিতে প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়নগঞ্জে মাধ্যমে বিদেশে রফতানীর জন্য বিপুল সংখ্যক বেল বাঁধা পাট ছিল। মহিমাগঞ্জ চিনিকল এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনিকল। এটি ছিল একটি লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠান। এই মিলটি ধ্বংস করতে পারলে পাকিস্তানি সরকারের অর্থনীতি দুর্বল হবে সেই লক্ষ্যে রোস্তম আলী খন্দকারের দল ১৩ নভেম্বর এই মিলটির উপর আক্রমণ চালিয়ে চিনিকলটি ক্ষতিগ্রস্ত করে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে রোস্তম আলী খন্দকারের নেতৃত্বে দ্বিতীয়বার সাঘাটা থানা আক্রমণ করা হয়। থানার অধিকাংশ পুলিশ সদস্য এই দলের কাছে আতœসমর্পণ করে, কিছু পালিয়ে যায়। বোনারপাড়া তিস্তামুখ রেলপথের মধ্যবর্তী স্থানে সিংড়া ব্রিজের অবস্থান (পদুম শহর ইউনিয়ন) ২০ জন রাজাকার এই ব্রিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। রাজাকাররা পাশ^বর্তী এলাকার জনগনকে বিভিন্নভাবে দায়িতে¦ নিপীড়ননির্যাতন করতো। উপর্যুপরি কয়েকটি অপারেশন শেষে গলনার চরের হাইড আউটে মুক্তিযোদ্ধারা সমবেত হয়। গাইবান্ধা শহর থেকে মহকুমার উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য গাইবান্ধাসুন্দরগঞ্জ সড়কের দারিয়াপুর সেতুটি ধ্বংসের পরিকল্পনা করে মুক্তিযোদ্ধারা। সে অনুযায়ী মাহাবুব এলাহী রঞ্জু নেতৃত্বে তার কোম্পানির ১০০ জন সদস্য সুন্দরগঞ্জ থানার শ্রীপুরে অবস্থান করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সাদুল্লাপুর থানা আক্রমণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধারা। কমান্ডার সাইফুল আলম সাজা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান রাজার নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত করে। রোস্তম আলী খন্দকারের দলের সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধা রফিকুল, আফজাল   খালেক সাঘাটা থানার কচুয়া ইউনিয়নের বুঝরি হকে মুক্তিবাহিনীর তথ্য সংগ্রহরত পাকিস্তান আর্মি ইন্টেলিজেন্স এর একজন অফিসারকে দিনের বেলা ধরে আনে।

যাঁদের রক্তত্যাগে বাংলাদেশ তাঁদের মধ্যে গাইবান্ধার বীর দামাল সন্তান শহিদ বীরমুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন:

সদর উপজেলা, গাইবান্ধা:

১। আবুল কাশেম খোকা, পিতা: ইসমাইল হোসেন, পশ্চিম পাড়া, গাইবান্ধা শহর,

২। নজরুল ইসলাম, পিতা: নিজামউদ্দিন, মুন্সীপাড়া, গাইবান্ধা শহর,

৩। আসাদুজ্জামান নবাব, পিতা: আজিজার রহমান, মুন্সীপাড়া, গাইবান্ধা শহর,

৪। শহিদুল হক চৌধুরী, পিতা: আবু মো. ফজলুল করিম, স্টেশন রোড, গাইবান্ধা,

৫। .কে.এম. হামিদুর রহমান, পিতা: কামাল উদ্দিন, থানাসিংপুর, বোয়ালি,

৭। আহম্মেদ আলী, পিতা: মোঃ শমসের আলী,কুজতলা,

৮।এ.কে.এম মাহবুবর রহমান জাহাঙ্গীর, পিতা: আব্দুর সালাম, স্কুলের বাজার, কুপতলা

৯। হায়দার আলী ব্যপারী, পিতা: হাফেজ উদ্দিন বেপারী, মীরপুর সাহাপাড়া,

১০। আব্দুস সালাম, পিতা: গোলজার রহমান আকন্দ, চকবরুল, বাদিয়াখালী,

১১। আলতাফ হোসেন, পিতা: গরীবউল্লাহ,রামনাথের ভিটা, বাদিয়াখালী,

১২। আবুল হোসেন, পিতা: কালু শেখ, রিফাইতপুর, বাদিয়াখালী,

১৩। আবুল হোসেন, পিতা: কাইম উদ্দিন, রিফাইতপুর, বাদিয়াখালী,

১৪। ছাবেদ আলী, পিতা: জমসের আলী, বালাআটা, গোবিন্দপুর, লক্ষ¥ীপুর,

১৫। আবুল হাসান, পিতা: রশিদুজ্জামান, পূর্ব কোমরনই, খোলাহাটি,

১৬।ডা. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, পিতা: সিদ্দিক হোসেন, স্টেশন রোড, গাইবান্ধা শহর,

১৭। আবু তালেব মিয়া, পিতা: মো. আব্দুর মজিদ,

১৮। আব্দুস সোবহান, পিতা: আব্দুল মজিদ, মুন্সীপাড়া, গাইবান্ধা শহর,

১৯। আব্দুল মোতালেব, পিতা: মহসিন আলী মন্ডল, থানাসিংহ, বোয়ালী

২০। সদরুজ্জামান হক, পিতা: হায়াত উদ্দিন আহমেদ, সাদুল্লাপুর রোড,

২১। আজিজুল হক, পিতা: কাউসার উদ্দিন, নারায়নপুর,

২২। গিয়াস উদ্দিন প্রাথানিক, পিতা: দসিম উদ্দিস প্রাথানিক, পশ্চিম বারবলদিয়া, মালিবাড়ী,

২৩। মহির উদ্দিন সরকারম পিতা: সফর মাহমুদ, গোবিন্দপুর, গাইবান্ধা শহর।

সুন্দরগঞ্জ:

০১। আব্দুল আজিজ, মৃত. বাবর উদ্দিন বেপারী, ধুমাইটারী ২। মুসলিম উদ্দিন, মৃত. জামাল উদ্দিন, ঝিনিয়া, ৩। করিম মন্ডল, পিতা: আউস উদ্দিন মন্ডল, পশ্চিম ছাপরহাটি।

সাদুল্লাপুর:

১। মজিবর রহমান, পিতা: গোলজার রহমান, বুজরক পাটানোছা, বনগ্রাম, ২। আবুবকর সিদ্দিক, পিতা: বছির উদ্দিন মন্ডল, ঘেগার বাজার, ফরিদপুর, ৩। রেজাউল করিম, পিতা: আব্দুল জোব্বার মাস্টার, রসুলপুর।

পলাশবাড়ী:

১। খায়রুল খন্দকার, পিতা- হাবিবর রহমান খন্দকার, বালাবামুনিয়া, পবনাপুর, ২। আঞ্জু মন্ডল, পিতা-ইমাম উদ্দিন নয়া মিয়া, পবনাপুর ৩। আবুল কাশেম, পিতা আব্দুল করিম প্রধান, পারবামুনিয়া, পবনাপুর, ৪। এ.কে.এম গাজী রহমান, পিতা মো. আজগর আলী, বালাবামুনিয়া, পবনাপুর, ৫। আব্দুল হামিদ প্রধান, পিতা কদম আলী প্রধান, বালাবামুনিয়া, পবনাপুর, ৬। কে, এম আতিয়ার রহমান, পিতা মতিয়ার রহমান খন্দকার, বালাবামুনিয়া, পবনাপুর, ৭। মাহতাব আলী, পিতা মনির উদ্দিন প্রধান, হরিনাবাড়ি, হরিনাথপুর, ৮। ফজলে হোসেন, পিতা-হেদায়েত উল্লাহ, হরিনাবাড়ি, হরিনাথপুর, ৯। আব্দুল কাদের, পিতা- সমশের উদ্দিন, হরিন বাড়ি, হরিনাথপুর, ১০। শওকত আলী সাবু, পিতা- ময়েনউদ্দিন প্রধান শোকটা, জামালপুর, পলাশবাড়ি, ১১ গোলাম রব্বানী, পিতা- ফরহাদ আলী সরকার, সাতারপাড়া, বেতকাপা, ১২। আব্দুল লতিফ, পিতা- জালাল উদ্দিন ব্যাপারী, সাতারপাড়া, বেতকাপা, ১৩। মোকছেদ আলী মন্ডল, পিতা- নাজির উদ্দিন মন্ডল, নান্দিশহর, বেতকাপা, ১৪। মোজাম্মেল হক মন্ডল, পিতা- সাফায়েত উল্লাহ পূর্ব নারায়নপুর, বেতকাপা, ১৫। মো. আফছার আলী, পিতা- মো. কবেজ উদ্দিন, জালাগাড়ি, মহোদীপুর, ১৬। আব্দুস সামাদ, পিতা- আহসান উদ্দিন মুন্সি, ফরকান্দাপুর, মহোদীপুর, ১৭। শাহজাহান আলী বাদল, পিতা- আজিম মিয়া, কালিঙ্গি, মহোদীপুর, ১৮। দেলোয়ার হোসেন, পিতা- সৈয়দ আশরাফ, ঝালিসি, মহোদীপুর, ১৯। অজিত চন্দ্র বর্মন, পিতা- গোপাল চন্দ্র বর্মন, বড় শিমুলতলা, কিশোরগাড়ি, ২০। মংপু রাম- বর্মন, পিতা- রজনী কান্ত বর্মন, বড় শিমুলতলা, কিশোরগাড়ি, ২১। আব্দুল মান্নান, পিতা- অজ্ঞাত, গিরিধারী, পলাশবাড়ি, তাজুল ইসলাম, পিতা- দেলোয়ার হোসেন, বালাবামুনিয়া, পবনাপুর, ২৩। নুরুন্নবী প্রধান, পিতা- আমিন প্রধান, বরকতপুর, পবনাপুর, ২৪। সুবেদার নুরুল্লা, পিতা আব্দুল হক মুন্সি, আমলাগাছি, বরিশাল, ২৫। সিপাহী আব্দুল মজিদ, মানিকউল্লাহ মন্ডল, নাদিশহর, বেতকাপা, ২৬ এসএম হুদা, পিতা-সোবহান সরকার, দয়ারপাড়া, পলাশবাড়ি।

গোবিন্দগঞ্জ:

১। আব্দুল মান্নান আকন্দ, পিতা- ওসমান আলী আকন্দ, গোলাপবাগ, গোবিন্দগঞ্জ, ২। মনোরঞ্জন মোহন্ত বাবলু, পিতা দেবেন্দ্র নাথ মোহন্ত, গোলাপবাগ, গোবিন্দগঞ্জ, ৩। বাবু দত্ত, পিতা- ইন্দ্রেশ্বর দত্ত (বুনু দত্ত), গোলাপবাগ, গোবিন্দগঞ্জ, ৪। আ. হারেছ আকন্দ, পিতা- ওসমান আলী আকন্দ, তুলশীপাড়া, গোবিন্দগঞ্জ, ৫। জালাল মাহমুদ, পিতা- জিতু মন্ডল, কাটাবাড়ী, কাটাবাড়ী, ৬। মো. ভোলা শেখ, পিতা- আবেদ আলী শেখ, হামিদপুর, ঘোড়াঘাট, ৭। দেলোয়ার হোসেন দুলাল, পিতা- সৈয়দ আশরাফ আলী, কাটাবাড়ী, ৮। গোলাম হায়দার, পিতা- সিরাজুল হক, রোগদহ, কাটাবাড়ী, ৯। আলতাফ হোসেন, পিতা- মফিজ উদ্দিন, গোপালপুর, মহিমাগঞ্জ, ১০। মো. মনোয়ারুল হক, পিতা- হাছেন আলী সরকার, বিরাট, শাখাহার, ১১ সিরাজুল ইসলাম, পিতা- হাসান আলী, শাখাহার, ১২। ফেরদৌস সরকার, পিতা- খালেছ উদ্দিন সরকার, শাখাহার, ১৩। তোবারক আলী সাবু, পিতা- মমতাজ আলী, নীলকণ্ঠপুর, শালমারা, ১৪। ফজলুল করিম, পিতা- দেলোয়ার হোসেন, পুনতাইড়, মহিমাগঞ্জ, ১৫। মোজাম্মেল হক, পিতা মোজাহার আলী প্রধান, উত্তর ধর্মপুর, রাখাল বুরুজ, ১৬ মাহবুবুর রহমান, পিতা আফতাব উদ্দিন, রামপুরা, হরিরামপুর, ১৭। খয়বর আলী,

পিতা- কাদের বহু দিঘলকান্দি, কামারদহ, ১৮। সৈয়দ আশরাফুল আলম, পিতা- সৈয়দ আব্দুল গফুর, ধর্মকাজী পাড়া, কোচাশহর, ১৯ অমূল্য চন্দ্র কর্মকার, পিতা-প্রসন্ন কর্মকার, শ্রীপতিপুর, মহিমাগঞ্জ, ২০। আঃ সাত্তার, পিতা- নছির উদ্দিন, পুনতাই, মহিমাগঞ্জ, ২১। অমরলাল চাকী, পিতা- অমৃতলাল চাকী, ফতেউল্লাপুর, গোবিন্দগঞ্জ, ২২। আলতাফ হোসেন, পিতা- মফিজ উদ্দিন, গোপালপুর, মহিমাগঞ্জ, ২৩। রিয়াদ হোসেন, পিতা-হারেজ উদ্দিন, কামদিয়া, ২৪। আ. মজিদ ফকির, পিতা- নঈম উদ্দিন ফকির, বিশ্ববাড়ী, তালুককানুপুর, ২৫। কছি মৃধা, পিতা বাসরত উরা, গোপালপুর, মহিমাগঞ্জ, ২৬। কুদ্দুস, পিতা- অজ্ঞাত, পাটোয়া, নাকাই, ২৭ আ. সাত্তার মন্ডল, পিতা- আফাতুল্লা, নিয়ামতের বাইগুনি, সোনাতলা, ২৮। ছানোয়ার হোসেন, পিতা-আজিজার রহমান, নিয়ামতের বাইগুনি, সোনাতলা।

সাঘাটা:

১। নাজিম উদ্দিন পিতা ইয়াকুব আলী গ্রাম: হাসিলকান্দি, ২। আনসার আলী পিতা আব্দুল মজিদ প্রধান গ্রাম: থৈকরেরপাড়া, জুমারবাড়ি, ৩। আব্দুল হাই সর্দার পিতা – আব্দুল বাকী সর্দার গ্রাম: শ্যামপুর, মুক্তিনগর, ৪। মোবারক আলী পিতা হোসেন আলী গ্রাম: মাদুরা, ভরতখালী, সাঘাটা, ৫। আব্দুস সোবহান, পিতা ইয়াসিন আলী, গ্রাম: আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ি, ৬। ওসমান গনি, পিতা- বাহাদুর শেষ গ্রাম: মামুদপুর, জুমারবাড়ি, ৭। আফজাল হোসেন, পিতা আব্দুল করিম, গ্রাম: গরাবেড়া, হলদিয়া, ৮। মজিবর রহমান পিতা নছির আলী গ্রাম: রামনগর, কচুয়া, ৯। হবিবর রহমান, পিতা নছির আলী গ্রাম: রামনগর, কচুয়া, ১০। কাবেজ আলী, পিতা- কোমর উদ্দিন, গ্রাম: কালপানি, বোনারপাড়া, ১১। মছির আলী পিতা আব্দুল গনি মন্ডল, গ্রাম: শিমুলকাইড, বোনারপাড়া, ১২। আব্দুস সাত্তার, পিতা- ফইম উদ্দিন, গ্রাম: সাঘাটা।

ফুলছড়ি:

১। শহিদুল্লা, পিতা- সাহেব আলী, গজারিয়া, ২। হাবিবুর রহমান, পিতা- জয়নাল সরকার, গজারিয়া। ৩। ছলিম উদ্দিন, পিতা- করব উদ্দিন হরিপুর, উদাখালী, ৪। শহিদুল ইসলাম, ফুলছড়ি, ৫। মসির আলী, ঘরভাঙ্গা, ফুলছড়ি ৬। জবেদ আলী, পিতা বাদল উদ্দিন ব্যাপারী, উড়িয়া। আলী, ঘরভাঙ্গা, ফুলছড়ি ৬। জবেদ আলী, পিতা বাদল উদ্দিন ব্যাপারী, উড়িয়া।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র গাইবান্ধা পৌরসভার গোডাউন রোডের বছির উদ্দিন আহমেদ এর পুত্র বদিউল আলম চুনীকে আহসানউল্লা হল থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি সহায়তা করতেন।

এই তালিকায় বাইরে অজ্ঞাত কিছু শহিদ মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। সেকারণে শহিদ তালিকাটি অসম্পূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও স্মৃতিস্তম্ভ:

একাত্তরের শহিদদের স্মরণে গাইবান্ধায় স্মৃতিফলক, স্মারকচিহ্ন, শুভগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গাইবান্ধা সদর উপজেলার পৌরপার্কের স্বাধীনতার বিজয়স্তম্ভ, স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ, পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে স্মৃতিযুদ্ধ মুন্সীপাড়া শহিদ মিনার, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সামনের শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ, শহি সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সড়ক, পশ্চিমপাড়ার শহিদ আসাদুজ্জামান নবাব পত্রিকা ফলক, পুলিশ লাইনের পার্শ্ববর্তী মাতৃভান্ডারের দুই ভাইয়ের সমাধিস্তম্ভ, খালেদ মুলু বীর প্রতীক সড়ক, পৌরপার্কের খালেন দুলু বীর প্রতীক পত্রিকা ফলক, সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগরে পাঁচ শহিদের কবর ও স্মৃতিফলক, ত্রিমোহনী ঘাট স্মৃতিস্তম্ভ, শিমুলতাইড় গ্রামের স্মৃতিস্তম্ভ, বোনারপাড়া শহিদ নামফলক, ফুলছড়ি উপজেলার বধ্যভ‚মির শহিদ

মিনার, গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালি স্মৃতিস্তম্ভ, পাখেড়া গ্রামের গণকবরের শহিদ মিনার, পলাশবাড়ী বধ্যভ‚মির স্মৃতিস্তম্ভ, দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর বধ্যভ‚মির স্মৃতিস্তম্ভ, মুংলিশপুর-জাফর স্মৃতিফলক, সুন্দরগঞ্জ গোয়ালের ঘাট বধ্যভ‚মির শহিদ মিনার। এছাড়াও শহিদ ফজলুল করিমের স্মৃতিতে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়ন ও সাঘাটার পাঁচ শহিদ স্মরণে মুক্তিনগর ইউনিয়ন নামকরণ করা হয়েছে।

দেশের অন্যান্য স্থানের মতো গাইবান্ধাতেও  মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানি সেনাদের লড়াই অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে ২৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা খবর পায় পাকিস্তানি সেনারা গাইবান্ধা ছেড়ে চলে গেছে। ঐ দিন মুক্তিযোদ্ধারা এগোতে থাকে এবং রসুলপুরে ¯øুইস গেট উড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডিনামাইড সেট করে। কিন্তু সেটা অকেজো হয়ে যায়। ওখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা কঞ্চিপাড়া আসে। রসদ ফুরিয়ে গেলে তারা আবার রসুলপুরে পজিশন নেয়। পরদিন বিকাল ৪টায় পাকিস্তানি বিমান ঐ এলাকা এবং মোল্লার চরে বোমা বর্ষণ করে। আহত হয় বেশ কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা। ৬ ডিসেম্বর সকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর দুটি বিমান গাইবান্ধা রেলস্টেশনের পাশে বোমা ফেলে এবং বিকালে ট্যাংক নিয়ে মিত্রবাহিনী প্রবেশ করে শহরে। অপরদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুর এলাহী রঞ্জুর নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ৬ ডিসেম্বর কালাসোনার চর থেকে শহরের পাশর্^বর্তী গ্রামে রউফ মিয়ার বাড়িতে রাত কাটিয়ে পরদিন ৭ ডিসেম্বর সকালে বিজয়ীর বেশে হাজার হাজার মানুষের আনন্দ উৎসবের মধ্যে শহরে প্রবেশ করে। ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন এসডিও মাঠে এক গণসংবর্ধনা দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। দশ হাজারের বেশি মানুষ ঐ সংবর্ধনায় উপস্থিত হয়। কোম্পানি কমান্ডার মাহাবুর এলাহী রঞ্জু (বীর প্রতীক) তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে আনসার ক্যাম্পে অবস্থান গ্রহন করে। ৪ ডিসেম্বর রোস্তম কোম্পানি সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে হানাদার মুক্ত করে ফুলছড়ি থানা। কোম্পানি কমান্ডার মফিজুর রহমান খোকা সুন্দরগঞ্জ থানা মুক্ত করে ওখানে অবস্থান নেন। কোম্পানি কমান্ডার রোস্তম আলী খন্দকার ও টু আই সি গৌতম চন্দ্র মোদকের নেতৃত্বে বেতলতলী গ্রামের মফিজ উদ্দিন মন্ডলের বাড়ির হাইড আউট থেকে ৪৫০ জনের মুক্তিযোদ্ধা দল বিজয় উল্লাসে ৮ ডিসেম্বর বিকালে বোনারপাড়া আসে। সাদুল্লাপুর ও পলাশবাড়ি থানা ৬ ডিসেম্বর এবং গোবিন্দগঞ্জ থানা ১১ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়। এভাবেই গাইবান্ধা শহরসহ আশপাশের এলাকামুক্ত হয়।

গাইবান্ধার ইতিহাস ৩য় খÐ থেকে সংকলিত

তথ্য সূত্র:

১। মূলধারা’ ৭১-মাঈদুল হাসান, ২। আমরা স্বাধীন হলাম-কাজী সামসুজ্জামান, ৩। একাত্তরের ধ্বণি- বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা এ্যাকশন কমান্ড কাউন্সিল, গাইবান্ধার প্রকাশনা, ৪। মুক্তিযুদ্ধের উত্তর রণাঙ্গণ-উইং কমান্ডার (অবঃ) হামিদুল্লাহ খান, বীর প্রতীক- ভোরের কাগজ, ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৯১, ৫। একাত্তরের গাইবান্ধা- ড. মাহবুবর রহমান, ৬। গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ, গাইবান্ধা জেলা- জহুরুল কাইয়ুম, ৭। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গাইবান্ধা জেলা ইউনিট, ৮। হৃদয়ে একাত্তর- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও ষষ্ঠ সংখ্যা, সম্পাদক জহুরুল কাইয়ুম, ৯। বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত সংখ্যা) সেপ্টেম্বর-২০০৩, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

স্মৃতিতে গাইবান্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধ
20 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:১৪ অপরাহ্ণ

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নীলফামারী

বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্জন ১৯৭১-এর বিজয়। মুক্তিযুদ্ধ বহুমাত্রিক, এটি বিরাট সংখ্যার ধারণাতীত ত্যাগ, অশ্রæ, বেদনাভোগের সফল পরিণতি। মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পরেও এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মানেই অনিবার্য দু:খ-কষ্টের মাধ্যমে অর্জিত একটি বীরত্বপূর্ণ বিজয়ের ইতিহাস। আর বিজয়ের ইতিহাস বলতে রণাঙ্গনের সশস্ত্র বিজয়ের কথা বলা হয়। আবার রণাঙ্গনে বিজয়ের প্রসঙ্গে অবধারিত হয়ে ওঠে ১১টি সেক্টরের বিজয় এবং সে বিজয় অর্জনে সেক্টর ও সাব-সেক্টর নেতৃত্বের ভূমিকা। আলোচ্য প্রবন্ধে ৬নং সেক্টরের একটি সাব-সেক্টরের কিছু অংশ নিয়ে সাজানো হয়েছে। ১৯৭১ সালে নীলফামারীর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত হয়েছে প্রবন্ধটি। স্বদেশি আর বিদেশি শত্রæর ধারাবাহিক আক্রমণ নীলফামারীর ইতিহাসের চাকাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করলেও, আন্দোলন সংগ্রামে তা থেমে থাকেনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নীলফামারীর সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথায় লিপিবদ্ধ হয়েছে নীলফামারীর ইতিহাস। কৈবর্ত বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ, প্রজাবিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীলবিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬-দফা, ৬৯’-এর গণঅভ্যুত্থান প্রভৃতিতে নীলফামারীর সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নীলফামারীর ইতিহাস সমৃদ্ধির এক একটি পর্যায় বটে। ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামে নীলফামারীর অবদান অগ্রগণ্য। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে নীলফামারীর মতো একটি ছোট্ট, শান্ত জনপদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি শব্দমালাকে বুকে ধারণ করে নীলফামারীর সাধারণ মানুষরাও অসহযোগ আন্দোলনকে বেগবান করতে থাকে। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন- ‘আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে।’ ঠিক তাই হয়েছিলো বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো নীলফামারীতেও সবকিছু বন্ধ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। পরবর্তীতে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই সবকিছু চলতে থাকে। ১৯৭১ সালে নীলফামারীতে যারা মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় মাথায় তুলে নিলেন তাদের মধ্যে সিনিয়র একদল ছিলেন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। অন্যদিকে ছাত্রদের পক্ষ থেকেও নীলফামারীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কমিটি গঠন করা হয়েছিলো।

৬ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশার ও নীলফামারী সাব-সেক্টর কমান্ডার লে: ইকবাল রশিদ

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ছিল অত্যন্ত সুবিন্যস্ত একটি সশস্ত্র বাহিনী। সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ঝাপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালীর উপর। উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা পাকবাহিনীর জিওসি ছিলেন মেজর জেনারেল নজর হোসেন সাহ, তার অধীনে ছিল সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত ২৩ৎফ ওহভধহঃৎু ইৎরমধফব এর ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শাফী, যার অধীনে ছিল- ৩৪ পাঞ্জাব; ২৫ পাঞ্জাব; ৪৮ পাঞ্জাব; ২৬ ফ্রন্টিয়ারস ফোর্স; ৮ পাঞ্জাব; ৮৬ মুজাহিদ। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরুতেই ৩৪, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ন নীলফামারী দখল করে নেয়। ১৯৭১-এর মুক্তির সংগ্রামে নীলফামারী মহকুমা ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। ৬নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন খাদেমুল বাশার। এ অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শুধু নীলফামারী নয় বরং বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর নিয়ে এই সেক্টর ছিল। এই সেক্টর বাহিনী গঠিত হয় নিয়মিত বাহিনীর সাথে সাবেক ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ ও বেসামরিক জনগণদের নিয়ে। ৬ নং সেক্টরের লিয়াজো অফিসার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম। চিলাহাটি সাব-সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যন্ট ইকবাল রশিদ। তাঁর দায়িত্বপূর্ণ এলাকা ছিল সমগ্র নীলফামারী। তিস্তা নদীর পশ্চিম প্রান্তে এ সাব-সেক্টরের অবস্থান ছিল। লেঃ ইকবাল রশিদের নেতৃত্বে ডিসেম্বরে চিলাহাটী থেকে ডোমার এবং নীলফামারীর দিকে এগিয়ে যায়। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধে নীলফামারীতে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেছিলেন।

মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগ হয় মিত্রবাহিনী যার উত্তরাঞ্চলের প্রধান ছিলেন জিওসি লে: জেনারেল এম এল তপন এবং তার অধীনে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার পি এন কাথপালিয়া। একইসাথে মেজর জেনারেল পি সি রেড্ডি ছিলেন মিত্রবাহিনীর উত্তর-পশ্চিম সেক্টরে। তিনি ৬ মাউন্টেন ডিভশনের প্রধান ছিলেন। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান আকস্মিকভাবে ভারতের পশ্চিম অংশে আক্রমণ চালায়, যা যুদ্ধের নাটকীয় পরিণতি ঘটায়। সেদিন থেকেই বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো নীলফামারী অঞ্চলের পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে চলতে থাকে মিত্র বাহিনীর অভিযান। ১৯৭১ সালে ১৩ ডিসেম্বর তারিখে সংঘটিত ইছামতির যুদ্ধ। নীলফামারীর ইতিহাসে এটি একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ। খানসামা-দারোয়ানী সড়কের ব্রিজ এলাকা থেকে ১৩ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় আক্রমণ শুরু হয়। ২১, রাজপুত ব্যাটেলিয়ানের একটি কোম্পনী এই যুদ্ধে সম্মুখে থেকে যুদ্ধ করেছে। পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ন সাংঘাতিক ক্ষিপ্রতার সাথে গড়ে তুললো প্রতিরোধ। উভয়পক্ষই প্রাণপন যুদ্ধ চালালো। প্রায় ৩০ মিনিট পরেই পি এন কাথপালিয়ার নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী অক্ষত অবস্থায় ইছামতি ব্রিজ দখল করে নেয়। মিত্র বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা এতোটাই ছিলো যে ৩০ মিনিট পরেই ৪৮, পাঞ্জাব কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পরে। এক পর্যায়ে পাকসেনারা দ্রæতই খরখড়িয়া নদীর দিকে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। খরখড়িয়ার যুদ্ধে ৪৮, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ন সর্বশেষ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। ইছামতি থেকে রাজপুত ব্যাটলিয়নের সেনা সদস্যরা কাথপালিয়ার নেতৃত্বে দ্রæতই খরখড়িয়ার দিকে এগুতে থাকে। ফলে ওই দিনের শেষভাগে খরখরিয়ার প্রান্তরে রাজপুত ব্যাটেলিয়নকে আরেকটি যুদ্ধে অবতির্ন হতে হলো। এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনী সম্পূর্ণভাবে ৪৮, পাঞ্জাবকে পরাস্থ করে গ্রেফতার করে মিত্রবাহিনী। দিনের শেষভাগে সূর্যাস্তের আগে গোধুলী লগ্নে একটা মল্লযুদ্ধ সম্পন্ন হলো। ৪৮, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়নের প্রচুর সৈন্য মুহূর্তেই হতাহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন-যা নীলফামারীতে খরখড়িয়ার যুদ্ধে ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে রইলো নীরফামারীর ইতিহাসের পাতায়।

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সৈয়দপুরে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হয়। এই আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানটি ছিল মূলত: সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত ২৩ৎফ ওহভধহঃৎু ইৎরমধফব এর ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শাফীর সাথে মিত্রবাহিনীর ৭১, মাউন্টেন ব্রিগেডের অধিনায়ক পি এন কাথপালিয়ার মধ্যে আত্মসমর্পন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে ৪৮, পাঞ্জাবের অধিনায়ক একজন ধোপার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ প্রস্তাব পাঠায়। অবশেষে জিওসি পিসি রেড্ডি নীলফামারী মহকুমার দারওয়ানিতে হেলিকাপ্টারে আসেন। নীলফামারীর দারওয়ানিতে রেড্ডির সাথে দুপুর আড়াইটায় আলোচনা সম্পন্ন হয়। ২৩, ব্রিগেড কমান্ডার ইকবাল শাফী তার সকল বাহিনী একত্র করার জন্য ১৭ তারিখ বিকেল পর্যন্ত সময় চান। আলোচনার শর্ত অনুসারে অঅত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হয় জমজম বিমান বন্দরে ১৫ টা ৪৫ মিনিটে। মিত্রবাহিনীর ২১, রাজপুতকে সকল অস্ত্র আটক করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ১২, রাজপুতকে সকল যুদ্ধবন্ধিদের দেখাশুনা করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ৫, গ্রেনেদিয়ারসকে সৈয়াদপুরের আাইন শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ৭, মারাঠা সৈয়দপুরে রিজার্ভ রাখা হয়। ৭, মারাঠা পুকুর ডোবা থেকে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করে। ১৭ ডিসেম্বর সৈয়দপুরে আম্মসমর্পণ করেন ১১১ জন অফিসার, ১৫৫ জন জেসিও, ৪৪৩২ জন সৈনিক, অন্যান্য ৭৯, বেসামরিক ৩৭, মোট ৪৯৪১ জন। এভাবেই নীলফামারীতে যুদ্ধ পরিস্থিতির যবানিকা ঘটে।

পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি জনযুদ্ধ। জনযুদ্ধ তত্তের প্রবক্তা মাও সেতুং বলেছিলেন- ‘জনযুদ্ধ সবসময়ই বিপ্লবী যুদ্ধ, বিপ্লবী যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ; এটি শুধুমাত্র জনগণকে সংঘবদ্ধ করে তাদের উপর নির্ভর করে চালানো যেতে পারে।’ জনযুদ্ধের এই সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, জনযুদ্ধের তত্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে। আর নীলফামারীর মতো আঞ্চলিক পর্যায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ ছিল অবরুদ্ধ দেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত কারিগর। অথচ স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৫০ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধে প্রভূতভাবে বিপুল অবদান রাখা স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতিহাসগুলো লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে উপযুক্তভাবে মূল্যায়ন করা থেকে রাষ্ট্র আজও অনেক দূরে। আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়ে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে তা না হলে জাতিয় ইতিহাস কখনই সমৃদ্ধ হবে না।

লেখক : আইনজীবী ও পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নীলফামারী
23 Views

মুগ্ধতা.কম

১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ , ৫:১৪ অপরাহ্ণ

পঞ্চগড়ে মুক্তিযুদ্ধ: বিজয় এলো যেভাবে

২৯ শে নভেম্বর ঐতিহাসিক পঞ্চগড় মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার বীর মুক্তিসেনারা ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সহায়তায় পঞ্চগড়কে পাকসেনাদের কবল থেকে দখলমুক্ত করতে সমর্থ হয়। পঞ্চগড়ের মাটিতে পাকিস্তানের পতাকা জ্বালিয়ে দিয়ে উড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা। বর্তমানে এই দিনটিকে মুক্তিযোদ্ধারা পঞ্চগড় মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে এই ঐতিহাসিক দিনটির কথা তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখনো জানে না।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা সৈয়দপুর, দশমাইল এসব এলাকায় পাকবাহিনীর তীব্র আক্রমনে টিকতে না পেরে পিছু হটতে থাকে। একাত্তরের ১৪ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধারা পঞ্চগড় জেলার সিএন্ডবি মোড়ে অবস্থান নেয়। ১৭ এপ্রিল পাকসেনারা ভারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে পঞ্চগড় আক্রমণ করে। এ আক্রমণে টিকতে না পেরে মুক্তিসেনারা পিছু হটে তেঁতুলিয়া উপজেলার মাগুরমারি এলাকায় অবস্থান নেয়। ওই দিন রাতেই চাওয়াই নদীর উপর ব্রীজে ডিনামাইট চার্জ করে ব্রীজটি উড়িয়ে দেয়। ব্রীজ উড়িয়ে দেয়ায় পাকসেনারা নদীর এপারে অমরখানা নামক স্থানে অবস্থান নেয়। নদীর এপারে পাকবাহিনী ওপারে মুক্তিবাহিনী। জুলাই মাসে প্রতিদিনই হয় খন্ড যুদ্ধ ও গুলি বিনিময়। চাওয়াই নদীতে ব্রীজ না থাকায় পাকসেনারা তেঁতুলিয়ার দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তেঁতুলিয়ার পুরো অঞ্চলই ছিলো মুক্তাঞ্চল।

মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড় ছিল ৬ নং (ক) সেক্টরের আওতাধিন। এ অঞ্চলে মোট ৭ টি কোম্পানির অধিনে ৪০টি মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ৬ নং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এম কে বাশার, স্কোয়াড্রন লিডার সদরুদ্দিন, ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার, লেফটেন্যান্ট মাসুদুর রহমান, লেফটেন্যান্ট আব্দুল মতিন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট হাসান আলী (আই ও), মেজর কাজিম উদ্দিন, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুব আলম এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগীতা ও পরামর্শ দেন তৎকালীন সংসদ সদস্য মুজিবনগর সরকারের সিভিল এ্যাডভাইজার সিরাজুল ইসলাম।

২০ নভেম্বর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর আর্টিলারি সহায়তায় ইপিআর, আনছার-মুজাহিদ ও মুুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে পাক সেনাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাটি অমরখানা ক্যাম্পে আক্রমন করে। যৌথ বাহিনীর আক্রমনে টিকতে না পেরে পাকসেনারা জগদল বাজার এলাকায় অবস্থান নেয়। পরে জগদলে টিকতে না পেরে পঞ্চগড়ে অবস্থান নেয়। ২৮ নভেম্বর শিংপাড়া, মলানি, মিঠাপুকুর এলকায় ডিফেন্স গড়ে মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত মাস মিত্র বাহিনীর সহযোগীতায় পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অমরখানা, জগদল, শিংপাড়া, তালমাসহ নতুন এলাকা হানাদার মুক্ত হতে থাকে। ২৮ নভেম্বর পঞ্চগড় সিও অফিস এবং একই দিনে আটোয়ারী ও মির্জাপুর মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা।

পাক বাহিনী মূলত ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শুরু থেকেই কার্যত মুক্তিবাহিনীর চতুর্মূখী আক্রমণের তীব্রতার মুখে পঞ্চগড় শহর থেকে অমরখানা ও তালমার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পঞ্চগড় এলাকায় তারা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ ব্যাটালিয়ন। নভেম্বর মাসের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পঞ্চগড়ে পাক সেনাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাটি অমর খানা ও পরে জগদল ছেড়ে পঞ্চগড়ের দিকে পালিয়ে যায় খানসেনারা। ২৬শে নভেম্বরের মধ্যে পঞ্চগড় শহরের চারদিকে ৭ম মারাধা, ২১ রাজপুত এবং ১৮ রাজপুত রাইফেল রেজিমেন্টের প্রায় ৩ ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য অবস্থান নেয়। ২৯শে নভেম্বর সকাল ৮টার দিকে শহরে প্রবেশের অনুমতি আসে। প্রতিটি কোম্পানী সেকশন ও প্লাটুন অনুযায়ী আসতে থাকে শহরের দিকে। প্যান্ট লুঙ্গি ও সাধারণ পোশাক পরিহিত, মাথা ও কোমরে গামছা জড়ানো মুক্তিযোদ্ধার দল কাধে স্টেনগান, রাইফেল, এস.এল.আর, এল.এম জি.ও ২ ইঞ্চি মর্টার ঝুলিয়ে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ও পুড়ে খাক হয় যাওয়া শহরে একের পর এক প্রবেশ করতে থাকে। কোন দিক থেকে কোন বাঁধা পায় না মুক্তিযোদ্ধারা। তবে কিছু কিছু ঘর বাড়িতে তখনও আগুন জ্বলছিল। বোঝা যায় কিছুক্ষণ আগেও পাকসেনারা শহরেই ছিল। দখলে আসে পঞ্চগড়। তবে তখনও সুগারমিল এলাকায় বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চলছে। পঞ্চগড় শহর তখন যেন শ্মশান ঘাট। ঘর-বাড়ি দোকান সব ভস্মিভূত। তখনও কোন রকমে টিকে ছিল লাল রঙ্গের টিনের থানা ভবন ও পার্শ্ববর্তী ডাক বাংলো। অসংখ্য পরিত্যক্ত ব্যাংকার পড়ে ছিল। হাজার হাজার নিক্ষিপ্ত গোলা উড়ে এসে আঘাত হেনেছে পঞ্চগড় শহরের মাটিতে। তারপর শুরু হয় পঞ্চগড় চিনিকল এলাকায় যুদ্ধ। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সাথে সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী প্রবল আক্রমণ গড়ে তোলে পঞ্চগড় চিনিকল এলাকায়। অবশেষে মুক্তিবাহিনীদের সাথে না টিকতে পেরে খান সেনারা ময়দানদিঘি, বোদা ও পরে ঠাকুরগাঁর দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এই যুদ্ধে চিনিকল এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর রশিদ। ২৯শে নভেম্বর মুক্ত হয় পঞ্চগড়। ধ্বনিত হতে থাকে ‘‘জয় বাংলা’’ ধ্বনি। পঞ্চগড় মুক্ত করার যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীর প্রায় ২৫০ জন হতাহত হয়। পাক সেনাদের মধ্যে ২০০ জন হতাহত হয় এবং ২৭ জনকে জীবিত আটক করা হয়। এ দিনটি পঞ্চগড়ের মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলবার নয়। তাইতো এ দিন এলেই তাদের কানে বাজে ‘‘জয় বাংলা’’ ধ্বনি। কিন্তু দেশের সূর্যসন্তানদের গৌরবের এই কীর্তি আজও অজানা রয়ে গেছে তরুণ প্রজন্মের কাছে। পঞ্চগড় মুক্ত দিবসে তরুণ প্রজন্মের কাছে এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার দাবি মুক্তিযোদ্ধাদের।

তথ্য সূত্র: বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমের ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ ও ড. নাজমুল হকের পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

পঞ্চগড়ে মুক্তিযুদ্ধ- বিজয় এলো যেভাবে
22 Views