উপভাষা, ভালোবাসা

উপভাষা, ভালোবাসা : রংপুরী ভাষা

আনওয়ারুল ইসলাম রাজু

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ , ৭:০৪ অপরাহ্ণ ; 293 Views

ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল বা ভূখণ্ডে বসবাসরত মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। আবার, প্রত্যেক ভাষারই প্রমিত রূপের পাশাপাশি আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষা রয়েছে। উপভাষা  হচ্ছে  প্রমিত ভাষার (ঝঃধহফধৎফ খধহমঁধমব) পাশাপাশি প্রচলিত অঞ্চলবিশেষের জনগোষ্ঠী কর্তৃক ব্যবহূত আঞ্চলিক ভাষা। পৃথিবীর সর্বত্রই প্রমিত ভাষার পাশাপাশি এক বা একাধিক আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা (উরধষবপঃ) ব্যবহৃত হযয়ে থাকে। প্রমিত ভাষার সঙ্গে উপভাষার ব্যবধান ধ্বনি, রূপমূল, উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত কাঠামোর মধ্যে নিহিত থাকে। সাধারণত প্রমিত ভাষায় ভাষাভঙ্গির সংখ্যা বৃদ্ধি, ভৌগোলিক ব্যবধান এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসগত পার্থক্যের কারণে উপভাষার সৃষ্টি হয়। অঞ্চলভেদে স্থানীয় রীতি-নীতি, আচার-আচরণ ও পরিবেশগত কারণে একই ভাষায় ব্যবহৃত ও প্রচলিত শব্দ, শব্দের অর্থ ও উচ্চারণগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কোন ভাষাকে আশ্রয় করে এরূপ সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত শব্দ বা বাক্যসমূহই  উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে চিহ্নিত। প্রমিত ভাষা দেশের সর্বস্তরে ব্যবহৃত হয়; লিখিত পদ্ধতির ক্ষেত্রেও তা অনুসৃত হয়, কিন্তু উপভাষার ব্যবহার কেবল বিশেষ অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে  কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাহিত্য ও সঙ্গীতেও উপভাষার সার্থক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাভাষী জনগণের অঞ্চলভেদে বাকভঙ্গির কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।  বাংলা ভাষার  যেমন আছে পরিশীলিত প্রমিত রূপ, তেমনি  বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক আঞ্চলিক বাংলাভাষা বা উপভাষা প্রচলিত রয়েছে। বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর আঞ্চলিক ভাষার সৌন্দর্য। অসাধারণ সব শব্দের বিন্যাস দিয়ে বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলো আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। একই শব্দ কত রকমভাবে যে ব্যবহৃত হয় এবং তা মধুর শোনায়, তা শুধু প্রতিটি অঞ্চলে গেলেই দেখা যায় এবং শোনা যায়।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত রংপুর অঞ্চলেও পরিশীলিত ও মার্জিত বাংলা ভাষার সমান্তরাল আঞ্চলিক বাংলাভাষা বা উপভাষা  প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে রংপুরের গ্রামাঞ্চলের মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এই ভাষা ব্যবহার করেন। রংপুরের এই আঞ্চলিক উপভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বিশেষ বৈশিষ্টম-িত। প-িতেরা ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে রংপুরের এই আঞ্চলিক উপভাষাকে উদীচ্য বা বরেন্দ্র উপভাষার  গোত্রভূক্ত  এবং ‘বঙ্গকামরূপী’ ভাষার উত্তরসূরী বলে চিহ্নিত করেছেন।

উল্লেখ্য, ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলা উপভাষাসমুহকে প্রধানত ৫টি শ্রেণিতে  ভাগ করেছেন । যথা:

১.         রাঢ়ী উপভাষা

২.        বঙ্গালী উপভাষা

৩.        বরেন্দ্রী উপভাষা

৪.        ঝাড়খণ্ডী উপভাষা

৫.        রাজবংশী উপভাষা

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা এই শেষোক্ত  রাজবংশী উপভাষা গোত্রের অন্তর্ভূক্ত। এটি একটি ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত বাংলার উপভাষা ভাষা। বরেন্দ্রী ও বঙ্গালী উপভাষার মিশ্রণে এই ভাষা গড়ে উঠেছে। রাজবংশী উপভাষা  পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার; আসামের বঙাইগাঁও, কোকড়াঝাড়, গোয়ালপাড়া, ধুবড়ী জেলা এবং বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের সব জেলায় প্রচলিত। এই উপভাষা  কামরূপী, বঙ্গকামরূপী, রংপুরি ভাষা নামেও পরিচিত। একে কেউ কেউ বর্তমানে পৃথক ভাষা হিসেবে গণ্য করেন। এই উপভাষার  একাধিক কথ্য রূপ প্রচলিত।

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার  উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:

১.         অনুনাসিক বর্ণ রক্ষিত

২.        শ্বাসাঘাতের নির্দিষ্ট সহান নেই

৩.        অধিকরণ কারকে অ, এ, তে বিভক্তির স্থলে ‘ত’ বিভক্তির প্রয়োগ। যেমন- হাটে বুঝাতে হাটত, গাছে>গাছত, বাড়িতে>বাড়িত ইত্যাদি।

৪.        ক্রিয়াপদের আগে নঞ্চর্থক অব্যয়ের ব্যবহার যেমন- না শোনং, না যাইম, না খাইম ইত্যাদি।

৫.        শব্দের আদি ‘র’ ধ্বনির স্থলে অ’ এবং ‘অ’ ধ্বনির স্থলে ‘র’ এর ব্যবহার। যেমন- রাজা>আজা, রস>অস, রংপুর>অমপুর, রক্ত>অক্ত, আম>রাম, আইন>রাইন ইত্যাদি। এজন্যেই  রংপুরী ভাষায় ‘রামবাবুর আমবাগান’-এর উচ্চারণ হয়- আমবাবুর রামবাগান।

৬.        শব্দের আদি ‘ল’ এর স্থলে ‘ন’ এবং ‘ন’ এর স্থলে ‘ল’ ধ্বনির উচ্চারণ রংপুরের ভাষার আরা একটি উল্লে¬খযোগ্য বৈশিষ্ট্য।  যেমন- লাট>নাট,  লাল >নাল, লাগে >নাগে,  লবন>নবন ইত্যাদি।

৭.        ঘোষ ব্যঞ্জণ ধ্বনির অল্পপ্রাণ অঘোষ উচ্চারণ হয়।  যেমন গাছ>গাচ, মাছ>মাচ,বন্ধু>বন্দু।

৮.         শব্দের আদি, মদ্য ও অন্ত স্বধ্বনির পরিবর্তন হয়। যেমন- যৌবন>যৈবন, নুতন>নউতন।

৯.        আদি ও মধ্য ‘এ’ ধ্বনির ‘এ্যা ’ উচ্চারণ- দেখিয়া>দ্যাখিয়া, বিদেশ>বৈদ্যাশ।

১০.       ‘দ’ দ্বনির ‘ড’ উচাচারণ- দাড়িয়া>ডারিয়া।

১১.       অপিনিহিতর ব্যবহার: অদ্য > আইজ , কল্য > কাইল

১২.       শব্দের মধ্যবর্তী স্থানে অতিরিক্ত স্বরবর্ণের ব্যবহার, যেমন : গেলে > গেইলে, বোন > বইন।

১৩.      শব্দের মধ্যবর্তী ব্যঞ্জনবর্ণ লোপ : কহিল > কইল।

১৪.       ক্রিয়া পদের শেষে  ‘ঙ’, ‘ঞ’ ‘ং’ ধ্বনির সংযোগ-খাই>খাং, যাই>যাং,খাচ্ছি>খাইচোং, যাচ্ছি>যাওচোং,  শুনব> শোনং।

১৫.      ‘ছ’ এর ব্যবহার ‘চ’ রূপে : মাছ > মাচ।

১৬.      ‘জ’ এর স্থলে ‘ঝ’ এর ব্যবহার।

১৭.       অপাদান কারকে ‘হাতে’’, ‘টে’ বিভক্তির প্রয়োগ। ‘‘বইখান কারটে আনলু’’।

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার কতিপয় শব্দ :

অকে, অমপুর, অক্ত, আঙা, আন্দন, উদিনকা, আইগন্যা, ক্যাংকা, ফ্যাদলা, এইংকা, উন্দাও, বাইগোন, বাহে, সুন্দরী, তাংকু, দলান, ঢ্যানা, বাড়ুন, গাবরু, কাপাট, কইনা, এইকনা, ছাওয়া ইত্যাদি ।

এছাড়া, অনেক প্রমিত বাংলা শব্দের আঞ্চলিক উচ্চারণ বিশেষভাবে প্রচলিত । যেমন- অভাব/আকাল>মঙ্গা, অদ্ভূদ>আচাভূয়া, অবিবাহিত যুবক>ঢ্যানা, উলঙ্গ>উন্দাও, উঠান>আইগনা/খুলি,  এতটুকু>  এত্তকোনা/এ্যাকনা, এতে> ইতি, এমন>এমতোন, এরকম> এংকা,ঐদিকে>উতি, কনে>কইনা, কচ্ছপ>দুড়া, কবুতর>কতৈর, কূয়া>চুয়া, কেমন>ক্যাংকা, কৃপণ>কশটিয়া, চোয়ানো>ওশশে, ছেলে>চ্যাংরা, ঝাটা>বাড়–ন, ডাল>ঠ্যাল, ডিম>ফল,  দরজা>কাপাট,  দরজা>কাপাট, বর>গাবরু, বোতাম>গুদাম, বৈঠকখানা >খাংকা/ডারিয়াঘর,   মেয়ে> চ্যাংরি, সন্তান> ছাওয়া, শুপারি>গুয়া, হিংসুটে >টেটিয়া, বাপু-হে>বাহে, বেগুন>আইগন, পরিবেশন>পস্যন, রন্ধন>আন্দন,  সুপারি>গুয়া,  শেষ হওয়া> ওড়ে যাওয়া, হঠাৎ >হুমফাইট,   ক্ষুধা>ভোক   ইত্যাদি।

রংপুরের আঞ্চলিক উপভাষার উদাহরণ-

ক. ‘এ্যাকনা মাইনসের দুকনা ব্যাটা আছিল। তার  ছোটকোনা উয়ার বাপোক কইরো, বা, মোর পাইস্যা কড়ির বাগ মোক দেও। ওই কতাতে তাঁয় উমার ঘরোক সব বাটি দিলো।’

খ. ‘একদিন চেংটু আসি দ্যাওয়ানীক কইলো, ও বাহে দ্যাওয়ানীর ব্যাটা হাটাতো অমপুর যাই। হামার ঐ্যাকনা মোকদ্দমা আছে। দ্যাওয়ানী কইলো মুই আজ যাবার পাবার নও, হামার বাড়িত আইজ সাগাই আসপে।’

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণগত সহজবোধ্যতা, সাবলীলতা ও শ্রুতিমাধুর্য অসামান্য। রংপুরের এ ভাষাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি। রচিত হয়েছে এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতের সুবিশাল সম্ভার। রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত ভাওয়াইয়া, পালাগান,  লোককথা, মেয়েলী গীত, কিস্সা কাহিনী,  ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ-প্রবচন  ইত্যাদিসহ লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতের অন্যান্য শাখায়  আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে।  কেবলমাত্র লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতেই নয় প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের অনেক কবি-সাহিত্যিকও তাদের সাহিত্যকর্মে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ  করেছেন।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদের অনেক পদে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার রীতি ও শব্দের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।  যেমন-

‘টালত ঘর মোর নাহি  পরবেসী।

হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী ॥’ – (৩৩নং পদ, ঢেন্ঢপাদানম্)

অধিকরণ কারকে অ, এ, তে বিভক্তির স্থলে ‘ত’ বিভক্তির প্রয়োগ রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন- হাটোত, গাছোত ।

অন্যত্র-

‘অপনা মাংসে হরিণা বৈরী।

খনহ ন ছাড়ই ভুসুকু অহেরী ॥

তিন নছুবই হরিণা পিবই ন পাণী।

হরিণা হরিণীর নিলঅ ন জানী ॥

তরঙ্গতে হরিণার খুর ন দীসই।

ভুসুকু ভণই মূঢ়া-হিঅহি ন পইসই ॥’

-( ৬নং পদ, ভুসুকুপাদানম্)

ক্রিয়াপদের আগে নঞ্চর্থক অব্যয়ের ব্যবহার রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার  আর একটি বৈশিষ্ট্য  যেমন- না শোনং, না যাইম, না খাইম ইত্যাদি।

ষোড়শ শতকের কবি মুহম্মদ কালার  ‘নেজাম পাগলার কেচ্ছা’ কাব্যে ব্যব‎হত রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার নমুনা :

‘শুন পিতা কহি আমি তোমারো মোক্ষত

মনে মোর এহি সাদ কহিল তোমাত।

দিব্য এক সহানো চাইয়া মন্দির নিম্মাইব।

চাইর দিকে চাইর মন্দির মদ্ধে তো দলান

চাইর রাজকন্যাকে রাখিব আনিয়া

মন্ধেতো দলান ঘর বসিতা।

চাইর কন্যার ররৈস দেখিব নএ আনে।’

রংপুরের ভাষাতে বাক্য মধ্যে বিশেষ জোর বোঝাতে গিয়ে অনাবশ্যকভাবে “হ এ’ একটি পদ ব্যবহার করা হয়। কবি মুহম্মদ কালার  ‘নেজাম পাগলার কেচ্ছা’য়  এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

‘আজি কালির মইধ্যে যদিনা আইল হএ।

য় বোসে য়ভাগিনীর মরণ নিছ এ।

জলে ঝম্প দিআ নহে য়নলে পশিয়া।

নহে প্রাণ তাজিলায় হএ গরল ভক্ষিআ।’

অষ্টাদশ শতকের কবি  হেয়াত মামুদের রচনায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অনেক শব্দ রয়েছে।  বেগম  রোকেয়ার রচনাতেও  রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অনেক শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। নাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর নাটক ‘ছেঁড়াতার’, সৈয়দ শামসুল হক এর নাটক ‘নুরলদীনের সারাজীবন’, নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদের কাব্য ‘হামার অমপুর’, আবুল কাশেমের গ্রন্থ ‘হামার দ্যাশ হারাগাছ’, সিরাজুল ইসলাম সিরাজের নাটক ‘মরা মানুষের মিছিল’, আনিসুল হক এর নাটক ‘নাল পিরান’, মকসুদুল হক এর গীতিনাট্য ‘শঙ্খামারীর ঘাট’, সাখাওয়াত হোসেনের  নাটক ‘বাহে নিধূয়া পাথার’, নাসিমুজ্জমান পান্নার ‘নাকফুল’, মুহম্মদ আলীম উদ্দিনের উপন্যাস ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন গ্রন্থে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার  সফল প্রয়োগ ঘটেছে। মতিউর রহমান বসনীয়া ‘রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ রচনার পাশাপাশি অনেক কবিতা লিখেছেন এ ভাষায়। এ ধরণের নানা সাহিত্যকর্ম এবং রংপুর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষার বিপুল শব্দসম্ভারকে আশ্রয় করে আবহমান কাল ধরে প্রবহমান রয়েছে  রংপরের সমৃদ্ধ  আঞ্চলিক ভাষা। সর্বোপরি, রংপুরের লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতি মূলত গড়ে উঠেছে এই আঞ্চলিক উপভাষাকে কেন্দ্র করেই।

উল্লেখ্য, আঞ্চলিক ভাষাই মূলত: মানুষের প্রকৃত মাতৃভাষা। আঞ্চলিক ভাষার মধ্যদিয়েই মানুষের সবধরণের অনুভুতি-অভিব্যক্তির স্বত:স্ফূর্ত ও স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটে থাকে। সেই সাথে ভাষার প্রকৃত ও স্বাভাবিক প্রাণপ্রবাহ সচল থাকে তার আঞ্চলিক ভাষার মধ্য দিয়ে। প্রমিত ভাষার মূল কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত: আঞ্চলিক ভাষাকে ভিত্তি করেই। আঞ্চলিক ভাষার ধ্বনি, রূপমূল, উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত কাঠামোর মধ্যে নিহিত থাকে প্রমিত ভাষার মৌলিক উপাদান। একারণে ভাষাতাত্ত্বিকগণের কাছে আঞ্চলিক ভাষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ম্যাক্সমূলার বলেছেন-ঞযব ৎবধষ ধহফ হধঃঁৎধষ ষরভব ড়ভ ষধহমঁধমব রং রহ রঃং ফরধষবপঃং. ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন- ভাষাতত্ত্বের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান আঞ্চলিক ভাষার সাহায্যে হতে পারে। আঞ্চলিক ভাষাকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাহিত্যিক প্রভাবে সাহিত্যের ভাষা গড়ে ওঠে। আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যেই সাহিত্যিক ভাষার ইতিহাস বজায় থাকে। কিন্তু, আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির দ্রুত প্রসার এবং  বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির লাগামহীন অনুপ্রবেশের প্রেক্ষাপটে  রংপুরসহ অন্যান্য অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলতে বসেছে। এর ফলে শুধুমাত্র আঞ্চলিক ভাষাই নয়; আমরা হারাতে বসেছি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য অধ্যায়কে।

রংপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য  অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন। এ জনপদের ইতিহাসের প্রাচীনত্ব ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিশেষ করে রংপুরের সহজ, সাবলীল ও শ্রুতিমধুর  আঞ্চলিক ভাষা এ অঞ্চলকে ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিশেষত্ব দান করেছে। রংপুর অঞ্চলের এই ভাষাগত ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে  এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণের  গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অন্যান্য কার্যক্রমের সাথে আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষেণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই অংশ হিসেবে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর রংপুরের আঞ্চলিক  ভাষা সংরক্ষণ বিষয়ে এক বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষেণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ লক্ষ্যে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপসহ বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সংবাদপত্র ও অন্যান্য  গণমাধ্যমে এর ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি সরকারি ভাবেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।  #

তথ্যসূত্র :

১. রংপুর জেলার ইতহাস : রংপুর জেলা প্রশাসন।

২. রংপুর সংবর্তিকা : মুহম্মদ আলীম উদ্দিন।

৩. উইকিপিডিয়া।

৪. বাংলাপিডিয়া।

৫. ইন্টারনেটে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধ/নিবন্ধ।

মন্তব্য করুন